মাতা নিম্বুপানি

সৈকত মুখোপাধ্যায়

এই গল্পটা একেবারেই পড়ে পাওয়া। মানে আক্ষরিক অর্থেই পড়ে পাওয়া। সে দিন সিঁড়ি থেকে পড়ে না গেলে গল্পটা পেতাম না।

যদিও আমার বয়স সত্তর বছর। তবুও মাথাঘোরার রোগ নেই। দিনদুপুরে মদও খাই না। তবুও বেলা বারোটার সময় নিজের ফ্ল্যাটের সিঁড়ি থেকে পড়ে গেলাম কেমন করে?

আপনারা আর কিছু জিগ্যেস করার আগে আমি নিজেই গোটা ঘটনাটা জানিয়ে দিতে চাই। ব্যাপারটা হয়েছিল কী, আমি ব্যাঙ্ক থেকে পেনশন তুলে বাড়ি ফিরছিলাম। বাড়ি নয়, ফ্ল্যাট।

১৬/২ নাকতলা রোডের গণপতি অ্যাপার্টমেন্টের প্রতি তলায় দুটো ফ্ল্যাট। একেবারে ওপরের ফ্লোরে, মানে চারতলায় বাঁ-দিকের ফ্ল্যাটটা আমার আর ডান দিকেরটা শিবেন মাইতির।

শিবেন মাইতি লেদার গুডসের ব্যবসায়ী। বয়স হবে পঁয়তাল্লিশের আশেপাশে। তার সঙ্গে আমার দেখাসাক্ষাৎ কম হয়। কারণ, বছরের মধ্যে ন'মাসই সে ভারতের বিভিন্ন জায়গায় মালের নমুনা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তবে যেটুকু দেখেছি তাতে মনে হয়েছে, শিবেন নিতান্তই এক চর্মময় চরিত্র। ছাগলের চামড়া, মোষের চামড়া আর গরুর চামড়ার বাইরে অন্য কিছুতে তার রুচি নেই। রুচির অভাবটা শিবেনের চেহারা এবং পোশাকআশাকেও বড্ড পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে।

শিবেনের বউ বীথি আবার উলটো রকমের মেয়ে। বীথি রূপসী নয়, কিন্তু ভারি প্রাণবন্ত। বয়স এখনও বোধহয় পঁয়ত্রিশ পেরোয়নি। খুব হাসিখুশি মেজাজ, নানা ব্যাপারে ইন্টারেস্ট। গল্প-কবিতার পোকা। শিবেন বেশির ভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকে বলে বীথিকে বাজারহাট সবই করতে হয়। তাই দিনের মধ্যে দশবার ওর মুখোমুখি হই। প্রত্যেক বারই দেখি গদ্যজাতীয় পণ্যের সঙ্গে পদ্যজাতীয় কিছুও ওর হাতে শোভা পাচ্ছে। ধরুন, বাজারের থলির মধ্যে থেকে এক আঁটি পুঁইশাককে ঠেলেঠুলে মুখ বাড়াচ্ছে একটি সাহিত্যপত্র। প্লাস্টিকের বালতির ভিতরে শুয়ে বাড়ি ঢুকছে রজনীগন্ধার তোড়া—যেন মিষ্টির ঝাঁকার মধ্যে শুয়ে দুর্গ ছাড়ছেন শিবাজি মহারাজ। একটু বেশি রাত্তিরে বীথির মিউজিক প্লেয়ার থেকে নরম সুরে কোনও না কোনও গান ভেসে এসে আমার ঘরে ঢুকে পড়ে।

আমিও একটু হেসেখেলে, মজা করে থাকতে ভালোবাসি বলে বীথির সঙ্গে আমার খুব পটে। ও মাঝে মাঝে আমাকে কিছু মনের কথা বলে ফেলে। বুঝতে পারি, বাইরের খুশিয়াল ভাবটার আড়ালে বীথির মনে একটা কষ্টের কাঁটা বিঁধে আছে। কষ্টটা আর কিছুই নয়—মনোযোগ না পাওয়ার কষ্ট। শিবেন তার বউয়ের ব্যাপারে একেবারেই উদাসীন। তা ছাড়া দিনের পর দিন একা সংসার চালানোরও তো ধকল আছে। ছেলেমেয়ের স্কুল, ডাক্তার, মিস্ত্রি—সব একা হাতে সামলাতে হয় বীথিকে।

কিন্তু আমি নিজেই তো বুড়ো মানুষ, দেখে যাওয়া ছাড়া আমারই বা কী করার আছে?

যাই হোক, এ বার সেই পড়ে যাওয়ার কথায় ফিরি। সেদিন যখন সিঁড়ি দিয়ে উঠছি, প্রায় চারতলায় পৌঁছে গিয়েছি, এমনসময় হঠাৎই বীথির ফ্ল্যাটের দরজার কাছে দড়াম করে একটা আওয়াজ হল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি সুদর্শন যুবককে তড়াক করে লাফিয়ে উঠতে দেখলাম, এবং পরক্ষণেই বীথির ক্রুদ্ধ মুখটা দরজার বাইরে বেরিয়ে এল। ওর হাতে একটা প্লাস্টিকের বালতি ছিল। আমি কিছু বুঝে উঠবার আগেই প্রবল বিক্রমে বীথি সেই বালতিটা তুলে ধরে, হুড়ুস করে ভিতরের মালটা ছুড়ে দিল সেই সুদর্শনের উদ্দেশ্যে।

কিন্তু সুদর্শনটি যেহেতু যুবা, তাই তার রিফ্লেক্স ভালো। সে নীচু হয়ে বিপদটা কাটাল এবং আর এক বারও পিছন দিকে না তাকিয়ে রোলার-কোস্টারের মতো তীব্র বেগে নীচে নেমে গেল। বৃদ্ধ আমি বাঁচলাম না। ভিজিয়ে রাখা জামাকাপড় সমেত বালতিভরতি সাবানজল আমার গায়ের ওপর এসে পড়ল, এবং আমি গড়িয়ে পড়লাম সিঁড়ির চাতালে।

ফ্ল্যাটবাড়ির সিঁড়ি বেশি উঁচু হয় না বলে রক্ষে। পড়ে গেলেও ব্যথা পাইনি। ইতিমধ্যেই বীথি নেমে এসে আমাকে ধরে তুলেছে। একটু আগেই তার চোখে যে আগুন দেখেছিলাম, তার জায়গায় এখন জল। খালি বলছে, 'ছি ছি মেসোমশাই। এ আমি কী করলাম। আপনার বুকে ব্যথা করছে না তো? চোখে অন্ধকার দেখছেন না তো?' যত বলি, আরে না না, আমার কিচ্ছু হয়নি, কে শোনে।

কিছুতেই বীথি আমাকে আমার নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকতে দিল না। একরকম টানতে-টানতেই ওর ঘরে নিয়ে গেল। দরজার মুখোমুখি একটা বড় আয়না ছিল। সেদিকে তাকিয়ে দেখি, আমার মাথায় কী জানি কেমন করে দুটি ভোঁতা, পুরুষ্টু শিং গজিয়েছে। মুখটা অনেকটা এঁড়ে বাছুরের মতো লাগছে। চশমাটা চোখে পরে দেখলাম শিং নয়, কালো ব্রেসিয়ার। তার কাপ দুটি আমার ব্রহ্মতালুর ওপর খাড়া হয়ে রয়েছে। সাবানজলে ভেজানো জামাকাপড়ের সেই শেষ স্যাম্পলটিকে তাড়াতাড়ি মাথা থেকে নামিয়ে এক দিকে ছুড়ে ফেললাম। বীথি ততক্ষণে শুকনো তোয়ালে দিয়ে আমাকে মোছাতে শুরু করেছে।

পুরো ব্যাপারটাতে নিজের চেয়ে বেশি বীথির জন্যই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম। তাই বীথি আমার ভিজে মাথাটাকে তার বাহুঘের থেকে মুক্তি দেওয়ামাত্র জিজ্ঞাসা করলাম, 'বীথি, ছোঁড়াটা কি তোমার ইয়ে, মানে শ্রীলতাহানি...ও কি কুরিয়ার সার্ভিসের লোক সেজে ঢুকে পড়েছিল? আমি কি ওয়ান জিরো জিরোতে একটা ফোন করব?'

বীথি আমার সব কথাতেই জোরে জোরে মাথা নাড়াচ্ছিল। পুলিশে ফোন করার কথায় একেবারে হাঁউমাউ করে আমার মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে বলল, 'না না মেসোমশাই। এইমাত্র যা দেখলেন, তা যেন কাকপক্ষীতেও না জানে। আমার অপমানের তা হলে আর শেষ থাকবে না।'

আমি বললাম, 'ব্যাপারটা কী, একটু খুলে বলবে?'

বীথি বোধহয় কাউকে বলতেই চাইছিল। যে কোনও গোপনীয়তার একটা গুরুভার থাকে। একা বেশিক্ষণ বওয়া যায় না। তাই কিচেন থেকে দুকাপ গরম কফি নিয়ে বেরিয়ে এসে বীথি আমার উলটো দিকের চেয়ারে বসল। তারপর বলল, 'মেসোমশাই আপনি বোধহয় আমার বাবার বয়সি। তবুও মনের দিক থেকে যথেষ্ট আধুনিক। তাই আপনাকে পুরো ঘটনাটা বললে আপনি বোধহয় আমাকে খারাপ ভাববেন না।'

এই বলে মুখে ওড়না চাপা দিয়ে বীথি মিনিটখানেক ফিচ ফিচ করে কাঁদল। তার পর নাকটাক মুছে বেমক্কা বলে বসল, 'আজ একটু আগে যা ঘটল, তা সবই মাতা নিম্বুপানি ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন।'

অবাক হয়ে বললাম, 'মাতা নিম্বুপানি! এ রকম কোনও নাম তো কস্মিনকালেও শুনিনি। তাকে পেলে কোথায়?'

বীথি বলল, 'গাড়োয়ালে'।

তারপর গড় গড় করে বলে চলল, 'গত চার বছর নাকতলা ছেড়ে কোথাও যাইনি। এবার অনেক কষ্টে শিবেনকে হ্যাপিভ্যালি ট্রাভেলস-এর সঙ্গে কেদারবদ্রী যাওয়ার কথায় রাজি করিয়ে ছিলাম। গত মাসের পনেরো তারিখে আমাদের হোল ফ্যামিলির রওনা হওয়ার কথা ছিল। আর বারো তারিখে শিবেন জানাল, ওর যাওয়া হবে না। কী একটা মাল কিনবার জন্য ওকে নাকি তক্ষুনি কানপুরে যেতে হবে। মাথার মধ্যে আগুন জ্বলে গেল। বললাম, 'তুমি কানপুর কিংবা যমপুর যে চুলোয় ইচ্ছে চলে যাও। আমি কেদারবদ্রী যাবই। গেলামও তাই। ছেলেমেয়েকে নিয়ে যথাসময়ে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছোলাম এবং সেখান থেকে ট্রাভেল এজেন্টের সুন্দর ব্যবস্থাপনায় দিব্যি গোটা ট্যুরটা কমপ্টিও করে ফেললাম। শুধু যে সিটটায় শিবেনের বসার কথা ছিল, সেখানে বসে পুরো ট্যুর আমার সঙ্গে ঘুরল কবি নালক মৈত্র। ওই যাকে একটু আগে সিঁড়িতে দেখলেন।

আমি গলায় কফি আটকে বিষম খেয়ে মরতে মরতেও কোনও রকমে বেঁচে গেলাম।

বীথি বলে চলল—'আপনার কাছে লুকোব না মেসোমশাই। নালককে দেখে থেকে আমার মনটা ভীষণ উচাটন হয়ে উঠেছিল। ওর বয়স তো আমার আশেপাশেই হবে। কথায় কথায় জানলাম, বিয়ে করেনি। বোধহয় জোরালো হাফসোল খেয়েছিল। এখনও চোট সামলে উঠতে পারেনি।

তা হোক। কিন্তু ওর কী সুন্দর চেহারা—টল, ডার্ক, হ্যান্ডসাম। ঘাড় অবধি লম্বা লম্বা চুল। মুখে চে গেভারার মতো হালকা পাতলা দাড়ি। গায়ে নামাবলি ছাপ কুর্তা। সবচেয়ে বড় কথা, কী আশ্চর্য মায়াভরা দুটো চোখ। আমি একেবারে কলেজ গার্লের মতো নালকের প্রেমে পড়ে গেলাম। কিন্তু নালকের দিক থেকে তেমন উৎসাহ দেখলাম না।

উৎসাহ আসবেই বা কোত্থেকে? আমাকে যে দেখতে বিচ্ছিরি, সে আমি ভালোই জানি। তাই মনের দু:খ মনেই চেপে রেখে নালকের সঙ্গে কলকাতার রাস্তার জ্যামজট আর সকালে হোটেলের ব্রেকফাস্টে দেওয়া আলুর পরোটার উপাদেয়তা নিয়ে আলোচনা করেই গোটা ট্যুরটা প্রায় কমপ্টি করে আনলাম।

ওর সঙ্গে ওই তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বক বক করতে একদম ভালো লাগত না। তাই বোধহয় ভগবান একটু দয়া দেখালেন। হঠাৎই ফ্যারেঞ্জাইটিস হয়ে আমার কথা বলা বন্ধ হয়ে গেল। সহযাত্রীরা আহা উহু করলেন ঠিকই, কিন্তু আমি মনে মনে বললাম, 'বাঁচা গেল'।

এই সময়ই ঘটল সেই দুর্ঘটনাটা।

পাহাড়ি পথে এমন দুর্ঘটনা অবশ্য আকছার হয়। ধস নেমে রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। শুনলাম, পায়ে হেঁটে তিন কিলোমিটার ঘুরে যদি হনুমানচটি পৌঁছোতে পারি, তা হলে সেখান থেকে আমাদের অন্য একটা বাসে তুলে দেওয়া হবে।

সেই পায়ে হাঁটা রাস্তার মধ্যেই দেখতে পেলাম মাতা নিম্বুপানির সাধনস্থল। বিশু নামে যে স্থানীয় ছেলেটি আমাদের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল, সেই আঙুল তুলে একটা গুহার দিকে দেখিয়ে বলল, 'দেখিয়ে ম্যাডাম, ওহি হ্যায় মাতা নিম্বুপানিকা ডেরা। বহুৎ বড়া সাধিকা হ্যায় মাতাজি।'

বিশুর কথায় বুঝলাম মাতা নিম্বুপানি পাওহারিবাবার থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই। তিনি বাতাস খেতেন। ইনি দিনান্তে এক গেলাস লেবুর জল খান। ব্যস। আর কিছু নয়। সবচেয়ে বড় কথা, মাতাজি ত্রিকালজ্ঞা। ইচ্ছে হলে যে কারও ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান গড় গড় করে বলে দিতে পারেন।

পুরুষদের সেই গুহায় প্রবেশ নিষেধ। আমাদের দলের মহিলারা কিন্তু সাধিকাদর্শনের জন্য ভারি উদগ্রীব হয়ে উঠলেন। ভূত আর বর্তমান না জানলেও চলে, কিন্তু ভবিষ্যৎ জানার কৌতূহল কার না থাকে।

কিন্তু বিশু ছোকরা তাদের উৎসাহে জল ঢেলে দিল। সে জানাল, মাতাজির সামনে যেতে হলে মনকে পরিষ্কার করে যেতে হবে। হাটখোলার শেফালিদি খেঁকিয়ে উঠলেন, 'আমাদের মন কি অপরিষ্কার নাকি রে ড্যাকরা? বলে ঠাকুরকে জল-বাতাসা না দিয়ে আজ অবধি অন্ন স্পর্শ করিনি।'

অবিচলিত বিশু বলল, ওতে হবে না। অন্তত তিন দিন সাস-বহু সিরিয়াল না দেখে থাকতে হবে, আর তিন দিন পরনিন্দা-পরচর্চা করা চলবে না। তবেই মাতা নিম্বুপানি গুহায় ঢুকতে দেন। তা না হলে উনি ঠিক বুঝতে পারেন এবং ধুনি থেকে জ্বলন্ত কাঠকয়লা তুলে ছুড়ে মারেন।

এই শুনে শেফালিদি সমেত সবাই দশ পা পিছিয়ে গেল। সিরিয়াল না হয় আমরা কেউ তিন দিন দেখিনি। গাড়োয়ালের ওই সব দুর্গম জায়গায় টিভিই নেই তো সিরিয়াল। কিন্তু 'পিএনপিসি' যা হয়েছে, তা তো কহতব্য নয়। আমাকে আর নালককে জড়িয়ে কম করেছে নাকি? আমি যেন কিছু শুনতে পাইনি?

কিন্তু আমার ব্যাপার আলাদা। ফ্যারেঞ্জাইটিসের ঠেলায় ইচ্ছে থাকলেও গত তিন দিন পরনিন্দা, পরপ্রশংসা কিছুই করতে পারিনি। বুঝলাম আমিই সেই এলিজিবল ক্যান্ডিডেট। বুক ফুলিয়ে নিম্বুপানির গুহায় একাই ঢুকে পড়লাম।

মাতাজির বয়স কম। তদুপরি সুন্দরী। উপরন্তু অমন কঠিন ডায়েটের জন্যই সম্ভবত ফিগার জিরোর নীচে দু-এক ঘর চলে গিয়েছে। সন্দেহ হচ্ছিল, কোনও অপমানিতা সুপারমডেল মুম্বাই ছেড়ে গেরুয়া পরে গুহাবাস করছেন না তো? অবশ্য একটু পরেই সেই পাপ সন্দেহ ঘুচে গেল। মাতাজিই ঘুচিয়ে দিলেন।

সঙ্গে এক বোতল লেমন স্কোয়াশ ছিল। সেটাই প্রণামী হিসেবে মাতাজির পায়ের কাছে নামিয়ে রাখলাম। মাতাজি তো ভারি খুশি। ইশারায় ভবিষ্যৎ জানতে চাইলাম। তিনি আমার কপালের মাঝখানে কড়ে আঙুলের ডগাটি টিপে রেখে গড় গড় করে আমার মন পড়ে চললেন। লজ্জায় কোথায় পালাব, বুঝতে পারছিলাম না। ভাগ্যিস সেই মুহূর্তে গুহার ভিতরে আর কেউ ছিল না। শেষকালে মাতাজি বললেন, 'তুমকো মিল জায়েগা।'

উত্তেজনাটা বোধহয় শক থেরাপির কাজ করল। হঠাৎই আমার গলার স্বর ফিরে এল। বললাম, 'কেয়া মিলেগা মাতাজি।'

মাতাজি বললেন, 'আশিক। মগর উসকো তুম খো বৈঠেগি'।

প্রেমিককে পেয়েও হারাব? বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। আকুল হয়ে প্রশ্ন করলাম, 'লেকিন কিঁউ? ক্যায়সে?'

মাতাজি যা বললেন, শুনে আমি হাসব, না কাঁদব বুঝে উঠতে পারলাম না। তিনি বললেন, একটি যুবতী মেয়ের প্রতি কামনায় অধীর হয়ে আমি আমার প্রেমিককে হারিয়ে বসব।

অত্যন্ত রাগত স্বরে বললাম, 'মাতাজি, আপনি কি আমাকে বাই-সেক্সুয়াল ভাবলেন?'

মাতাজি বললেন, 'বেসক শেয়াল? উও কেয়া হ্যায়?'

আমি বললাম, 'আহা শেয়াল নয়, উভকামী।'

মাতাজি বললেন, 'হেকিমিতে কিছু হবে না। আগামী এক মাস প্রতিদিন কোনও ভিক্ষুককে চুইংগাম ভিক্ষা দিয়ে দ্যাখো, যদি কিছু শুধার হয়।

বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলতে দুলতে হনুমানচটি পৌঁছোলাম। বাসে উঠে বসামাত্র পাশ থেকে নালক আমার হাতে কবিতার পুরিয়া গুঁজে দিল। বেশ কাঁচা কবিতা, বীথির সঙ্গে প্রীতি, স্মৃতি, এমনকী চাণক্যনীতির অবধি মিল দিয়েছে। কিন্তু মোদ্দা কথাটা ওই—কবি নালক মিত্র আমার প্রেমে পড়েছেন।

মাতাজির ভবিষ্যদ্বাণীর প্রথম অংশটা এই ভাবে মিলে যাওয়ায় আনন্দ যেমন হল, তেমনই একটা সংশয়ও বুকের মধ্যে বাসা বাঁধল। শুনতে যতই অবিশ্বাস্য হোক, পরের অংশটাও কি তা হলে মিলে যাবে? এক তরুণীর প্রতি কামনায় নালককে পেয়েও হারাব?

মন বলল, অসম্ভব।

তার পর তিনটে দিন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে নালককে বললাম, 'আরও অন্তরঙ্গ ভাবে তোমাকে পেতে চাই। কালই আমার ছেলেমেয়ের স্কুল খুলছে। কাজের মেয়েটা কাজ সেরে চলে যাবে এগারোটার মধ্যে। তুমি বারোটায় আমার ফ্ল্যাটে চলে এসো।

আজকে ছিল সেই অ্যাপো।

ছেলেমেয়েরা স্কুলে চলে গেল। ন'টার সময় কাজের মেয়ে কাবেরীর আসার কথা। সে কিন্তু এল না। কুড়ি দিন পর বেড়িয়ে ফিরেছি। আমার ছেলের আর মেয়ের অন্তত দশখানা গরম জামাকাপড় ভিজিয়ে রেখেছিলাম। তারপর প্রতি দিনের এঁটো বাসনপত্র যেমন জমে, তেমনই জমেছে। ঘরদোরও ধুলোয় ধুলো হয়ে রয়েছে। কাবেরী না এলে কী হবে, সেকথা ভাবতেই বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল।

সাড়ে ন'টা বাজল। কলিংবেলের আওয়াজ শুনে জোরে পা চালিয়ে গিয়ে দরজা খুললাম। দেখি কেবল অপারেটরের লোক ভাড়া নিতে এসেছে।

দশটা বাজল। আবার কলিং বেল। দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললাম। দেখি এক অনামুখো ছোকরা রান্নাঘরের চিমনি বিক্রি করতে এসেছে। তাকে যে ভাষায় দূর করলাম, ভাবলে নিজেরই এখন লজ্জা লাগছে।

অথচ দিনটা কত অন্য রকম হওয়ার কথা ছিল। ভেবেছিলাম নিজেকে একটু সাজিয়ে রাখব। মুখে একটু আলুর রস, চুলে একটু হেনা। কিছুই হল না। ইচ্ছেই করছিল না কিছু করতে। তখনও আশা করছি কাবেরী চলে আসবে। যদি নালকের সঙ্গে একই সময় চলে আসে? ধুর, তাতেই বা কী? একটু না হয় আস্তে-আস্তেই কথা বলব। না হয় যতক্ষণ কাবেরী থাকবে, ততক্ষণ একটু দূরত্ব রেখেই বসব।

সাড়ে এগারোটা। আবার কলিংবেল। এ বার কাবেরী না হয়ে যায় না। প্রায় উড়ে গিয়েই দরজা খুললাম। না, কাবেরী নয়। বোকা-বোকা চেহারার একটা লোক শোকার্ত মুখে বলল, 'মিসেস গঞ্জালেস, আপনি যে কফিনটার অর্ডার দিয়েছিলেন সেটা তৈরি হয়ে গিয়েছে।'

আমি বললাম, 'চমৎকার। তা হলে এই বার ওই কফিনটার মধ্যে শুয়ে আপনি কবরে চলে যান।' এই বলে দরজাটা যত জোরে পারি বন্ধ করলাম।

অবশেষে বারোটার সময় ক্লান্ত পায়ে বাথরুমে ঢুকে, হাঁটুর ওপর সালোয়ার গুটিয়ে কাপড় কাচতে বসলাম। সেই সময় আবার কলিংবেল।

সত্যি বলছি মেসোমশাই, তখন আমার মনে নালকের 'না' অবধি ছিল না। আমি মনে-প্রাণে তখন কামনা করছিলাম কাবেরী নামের সেই নচ্ছার তরুণীকে। তার আঁটোসাটো কালোকোলো চেহারাটা ছাড়া আমি আর কিছুই দেখতে চাইছিলাম না, কিচ্ছু না। অথচ দরজা খুলতেই দেখি নালক, একটা লাল গোলাপ আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে হাসি হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে।

মুহূর্তে মাথায় আগুন জ্বলে গেল। ভেজানো কাপড়ের বালতিটা হাতে নিয়েই দরজা খুলতে এসেছিলাম। 'তবে রে ন্যাকাচৈতন্য' বলে সেই বালতিটা তুলে ধরে...।

আবার একটু ফিঁচ ফিঁচ করে কাঁদল বীথি। তারপর বলল, 'ভাগ্যকে কে খণ্ডাবে বলুন। তবে এক দিক দিয়ে ভালোই হল। আমার একটা শিক্ষা হল।'

'কী শিক্ষা?' আমি জিগ্যেস করলাম।

'এটাই শিখলাম যে, কুড়িতে যা মানায়, পঁয়ত্রিশে তা মানায় না। প্রায়োরিটির হেরফের হয়ে যায়।'

হতবাক হয়ে বীথির কথাগুলোই ভাবছিলাম। এমন সময় দরজার কাছ থেকে ভারি বিস্মিত গলার ঝংকার ভেসে এল—'কী ব্যাপার গো বউদি? পুরো সিঁড়ি যে জলে থইথই করছে!'

কাবেরী এসেছে। আমি উঠে পড়লাম। নিজের ফ্ল্যাটে ঢোকার আগে প্যাসেজ থেকে লাল গোলাপটা কুড়িয়ে নিলাম। মনে মনে বললাম, হায় গোলাপ। তুচ্ছ ডিটারজেন্ট পাউডারের কাছে হেরে গেলে?

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%