সৈকত মুখোপাধ্যায়

প্রিয়তমা নাইটি,
আমাকে তুমি নামে হয়তো চিনবে না, কিন্তু দেখেছ অনেকবার। আমার নাম বারমুডা। হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই যে চেক-কাটা ঢোলা মতন হাফপ্যান্ট—ওইটাই আমি। কাল তোমাকে আর আমাকে এক সঙ্গে ওয়াশিং-মেশিনে ঢুকিয়ে পাঁচুর মা আড়ং ধোলাই দিয়েছিল। তারপরেও সারা দুপুর বারান্দার তারে আমরা পাশাপাশি মেলা ছিলাম। মনে পড়ছে কি?
আহা, প্রথমে সাবান জলের সমুদ্রে একসঙ্গে সেই উথাল পাথাল স্নান। তারপর দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে ঘনিষ্ঠ সান-বাথ। বারান্দার খোলা হাওয়ায় তোমার গোলাপি ছিট-কাপড়ের শরীর ফুরফুর করে উড়ছিল। তোমার গায়ের ডিটারজেন্টের গন্ধ ভেসে আসছিল আমার নাকে। আমার কেমন যেন নেশা ধরে যাচ্ছিল। সেই নেশার ঘোর এখনও কাটছে না। ঘুরতে-ফিরতে কেবলই তোমার এক্স এক্স এল সাইজ শরীরটা দেখছি প্রিয়তমা। সেই জন্যেই তোমাকে এই প্রেমপত্র লিখছি।
তবে শুধু শরীরের ছোঁয়ায় ভুলবার ছেলে এই বারমুডা নয়। তোমাকে আমার ভালোলাগে তার কারণ তোমার আর আমার 'ক্লাস' এক, যাকে বলে শ্রেণিচরিত্র। দ্যাখো, বারমুডা পরা পুরুষের হাত ধরে কাঞ্জিভরম পরা নারী হাঁটছে, এরকম দৃশ্য তুমি কখনও দেখতে পাবে না। আবার নাইটি পরা মেয়েকে নিয়ে ডিনার খাচ্ছে থ্রি-পিস স্যুট পরা ছেলে—এটাও অসম্ভব ভাবনা। নাইটির পাশাপাশি যদি কাউকে মানায় তা হলে সে হল বারমুডা! বারমুডা! বারমুডা!
আমরা বিবর্তনের ধারায় একইসঙ্গে জন্ম নিয়েছি। মেটিয়াবুরুজের একই পাড়ায় আমাদের সেলাই, গাড়িয়াহাটের একই ফুটপাথে আমাদের চৈত্র-সেল। তুমি আর আমি দুজনেই ফ্ল্যাটবাড়ির প্রাোডাক্ট। সেইজন্যেই তোমাকে এত ইয়ে...মানে কামনা করি।
'ফ্ল্যাটবাড়ির প্রাোডাক্ট' শুনে নাক কুঁচকিয়ো না প্রাণাধিকা। সাড়ে পনেরো আনা বাঙালিই এখন ফ্ল্যাটবাড়ির জীব—আটশো স্কোয়ারফিট টবের বাঙালি-বনসাই। তাদের সব কিছুই ছোট ছোট। ছোট ল্যাপটপ, ছোট সেলফোন। কম্পিউটারের স্ক্রিনে ছোট ব্লু-ফিল্ম, বালিশের পাশে ছোট জোক-বুক। পোষ্য বলতে একটা খেঁকি টাইপের ছোট স্পিতজ কুকুর। বিয়ের পিঁড়ির মাপের ব্যালকনিতে ছোট্ট টবে মরণাপন্ন চারা গাছ। ঘুমোবার আগে আর ঘুম থেকে উঠে কয়েকটা ছোট ছোট ট্যাবলেট—অনিদ্রার, প্রেশারের, সুগারের।
কাজেই তাদের সর্বক্ষণের পোশাকগুলিও যে ছোট হবে তাতে আর আশ্চর্য কী? আরে, আমাদের কথাই বলছি।
আমাদের কাচা সহজ, মেলা সহজ। শাড়ি, ধুতি পরে কে সময় নষ্ট করে বলো তো। পটাক-সে অঙ্গে গলিয়ে নাও নাইটি কিংবা বারমুডা। যাও, নির্দ্বিধায় বেরিয়ে কর্তব্যকর্মগুলো সেরে এসো।
এই তো, আমার দাদা বেরোলেন বাজারে। দাদার মগজে গতরাতের অ্যালকোহলের কুয়াশা, চোখের নীচে পুঁটলি। বি-ফ্ল্যাট ছেড়ে গলা আর ওপরে উঠছেই না। দাদার চুলে পুরোনো কলপের কারণে তিন রকমের রং—ওপরে কালো, মাঝখানে সিপিয়া আর গোড়ায় সাদা। দাদার বেঁটে শরীরে এতবড় ভুঁড়ি, গলায় সোনার চেন, বাহুতে এক গোছা দুব্বোঘাসের তাগা, গায়ে টুকটুকে লাল টি-শার্ট। আর কোমরে? ঠিক ধরেছ। কোমরে আমি।
বারমুডার পায়া গলে বেরিয়ে আছে দাদার নির্লোম রোগা রোগা দুটো ঠ্যাঙ। যে দুটো পা দশটা সিঁড়ি ভাঙতে গেলে দশবার ভাবে, একশো মিটার দূরে কোথাও যেতে হলে হাত দেখিয়ে অটো দাঁড় করায়, সেই নির্জীব, অলস, অস্বাস্থ্যে চোষা দুটি উরুকে ঘিরে আমি লটর পটর করছি।
তবে একটা জিনিস মানতেই হবে, আমাদের প্রতি দাদা বউদির টানটা কিন্তু মারাত্মক। আর কোনও পোশাক ওনারা আজকাল চোখেই দ্যাখেন না। সকালে মেয়েকে স্কুলে দিতে যেতে হবে। দাদা বেবি-কে ব্যাকসিটে বসিয়ে মোটরসাইকেলে স্টার্ট দিলেন। অঙ্গে? কেন? বারমুডা।
সাহেবি কেতার স্কুল। ছেলেমেয়েরা সব ব্লেজার-টেজার গায়ে চড়িয়ে, বুকে ব্যাজ লাগিয়ে, মর্নিং ম্যাম, মর্নিং স্যার, বলতে বলতে স্কুলে ঢুকছে। ওদিকে স্কুলগেটের সামনে তখন তাদের জনক জননীরা নাইটি আর বারমুডা পরে ভাঁড়ে চা খাচ্ছেন। ব্যাটাচ্ছেলে প্রিন্সিপাল একবার দৃশ্যদূষণের কথা বলেছিল। রিকোয়েস্ট করেছিল ছেলেমেয়েদের স্কুলে দিতে আসার সময় শাড়ি সালোয়ার প্যান্ট শার্ট পরে আসতে। আর যায় কোথায়? পেরেন্টসরা প্রিন্সিপালের গর্দানটাই নামিয়ে দেন আরেকটু হলে। যেমন ইচ্ছে সাজতে দেবে না? 'গো অ্যাজ ইউ লাইক' খেলতে দেবে না! মামার বাড়ি নাকি? মিডিয়ার সামনে ক্ষমা-টমা চেয়ে কোনওরকমে সে যাত্রায় প্রিন্সিপালের চাকরি বাঁচল।
তবে এতটা বারমুডা নির্ভরতার জন্যে অসুবিধে কি আর হয় না? মাঝে মাঝে হয়। এই তো গত সপ্তাহেই বউদির মায়ের স্ট্রোক হল। তুরন্ত ট্যাক্সি এল। দাদা শাশুড়িকে নিয়ে ট্যাক্সিতে চড়তে যাচ্ছেন, ভেতর থেকে শাশুড়ি চিঁ চিঁ করে বললেন, বাবা অশোক। তুমি যদি এরকম ফুলছাপ ইজের পরে, খোকা সেজে হাসপাতালে যাও, তাহলে কি আর আমার অ্যাডমিশন হবে? শাশুড়ির মেয়েও পেছন থেকে বলল, হ্যাঁ, মা ঠিকই বলেছে। ওরকম সুপার-স্পেশালিটি হসপিটালে তুমি এরকম স্যাবি ড্রেস পরে যেতে পারবে না। প্লিজ পুট অন ইওর ট্রাউজারস।
কী আর করা যাবে? দাদা গজ গজ করতে করতে ঘরে ফিরে বারমুডার ওপরেই ট্রাউজারস চাপিয়ে ফিরে এলেন। এবার হাসপাতালের সামনে ট্যাক্সির ভাড়া মেটাতে গিয়ে হাতে হ্যারিকেন। পার্স তো রয়ে গিয়েছে বারমুডার পকেটে। অগত্যা ভীড়ে ঠাসা রাস্তার ধারে দাদাকে প্যান্ট খুলতে হল। প্যান্ট খুলে বারমুডার সাইড-পকেট থেকে পার্স বার করতে হল। এদিক থেকে সিটি, ওদিক থেকে টিটকিরি। ভোলা জামাইকে দেখে ট্যাক্সির ভেতরেই মেনকার আরেকটা স্ট্রোক হয়ে গেল।
কিছু মনে করো না। তোমারও কিছু অসুবিধের দিক রয়েছে। সেগুলো আমি জানি, মানে জেনে ফেলতে বাধ্য হই। কী করব? সর্বক্ষণ লগে লগে থাকি তো।
নাইটির পকেট থাকে না। এটা একটা বড় অসুবিধে। দ্যাখো, গত পরশু কবি সুমন সান্যালের প্রেমপত্রটা লুকোতে গিয়ে বউদির কি নাকানি চোবানি। আঁচল নেই, পকেট নেই—চিঠিটা লুকোবে কোথায়? এদিকে দাদা হঠাৎ ঘরে ঢুকে পড়ে ঠাহর করার চেষ্টা করছে, বউদি কবিতার বইয়ের ভেতর থেকে যে কাগজটা বের করে হাতে মুঠো পাকিয়ে রেখে দিল সেটা আদতে কী?
আমার ছ'টা পকেট আছে বলে দাদার কত সুবিধে। কোনওটায় পরকীয়া প্রেমপত্র, কোনওটায় গাঁজার পুরিয়া, কোনওটায় আবার স্থানীয় নেতাকে দেওয়া মাসোহারার হিসেব। দাদার কোনও সিক্রেট জিনিস ঘরে থাকে না, সব বারমুডার পকেটে।
তারপর মনে আছে, গতমাসে পুরী বেড়াতে যাবার কথা? উ:, বিচের ওপর লক্ষ লক্ষ বঙ্গসন্তানের সে কী খিল্লি! ব্রেকারের মুখে সে কী এঁড়ে বাছুরের মতো লম্ভঝম্প! বউদি তো তোমাকে গায়ে চড়িয়ে দৌড়তে দৌড়তে ঝপাং করে জলে। একটা বড় ঢেউয়ের দুলুনি। তুমি বউদির গা ছেড়ে মাথার ওপরে। বিচে দাঁড়ানো ছেলে ছোকরাদের মোবাইলে পটাপট স্ন্যাপ। দশ মিনিটের মধ্যে সেই নটখটি নাইটির ছবি ইউ-টিউবের মোস্ট ওয়ান্টেড আইটেম।
তা সে তো তোমার দোষ নয়, ঢেউয়ের দোষ। তুমি বউদিকে সাহস দিয়েছিলে সমুদ্রে ঝাঁপাতে। শাড়ি পরলে ওরকম সাহস আসত নাকি থোড়াই?
আমি দাদাকে সাহস দিয়েছি বুড়োবুড়িকে উৎখাত করে তাদের মাথাগোঁজার জায়গায় ফ্ল্যাটবাড়ি প্রাোমোট করতে। ধুতি বা প্যান্টে ওই মনোবল আসত কখনও? মোটরবাইকটি ত্যারছা করে দাঁড় করিয়ে দাদা যখন সোনারপুরের সাইটে মিস্তিরি খাটায় তখন দেখো তো খেয়াল করে, শুধু আমার জন্যেই দাদাকে কেমন সাহসী দেখায়।
আমি উত্তর অ্যাটলান্টিকের সোনালি সৈকতের মায়া জড়ানো বারমুডা; আমার আধুনিকতাই ফোঁপড়া বাঙালিকে আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে। বাঙালি ভাবছে, বিদেশি পোশাক পরেছে বলে সেও ভুবনগ্রামের এক ব্যাঁদড়া বালক। স্বপ্ন দেখছে—বিকিনি-বালিকার কোমর জড়িয়ে, চওড়া ছাতিতে জল কাটতে কাটতে হাঙর-সমুদ্রে সার্ফিং করতে যাচ্ছে।
ছোট স্বপ্ন অবশ্যই, তবে স্বপ্ন তো। ধুতি লুঙ্গিতে এসব স্বপ্ন থোড়াই আসত।
তুমিও সেই একই কাজ করে চলেছ। বঙ্গনারীকে সস্তায় দু:সাহসী করে তুলছ।
তোমাকে এত কথা বলছি একটাই কারণে। ক'দিন ধরে দেখছি তুমি ব্লু-জিনসের ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করছ। ও ভুলটা কোরো না। জিনস কিন্তু গুন্ডা প্রকৃতির ছেলে। তোমাকে ফাঁসিয়ে দেবে। মানে ওর মেটালের বোতাম কিংবা ধারালো লেবেলে লেগে তোমার সস্তার কাপড় ফেঁসে যাবে।
আরেকবার ভেবে দ্যাখো নাইটি, মাই সুইট-হার্ট! আমরা দুজনেই আগে ছিলাম রাতের পোশাক। এখন দাবানলের মতন দিনের আলোয় ছড়িয়ে পড়ছি। কিংবা এমনও হতে পারে, রাতটাই চুপিচুপি ডালপালা মেলছে বাঙালির দিনের মধ্যে।
তা সে যাই হোক, এ আমাদের যৌথ জয়। এমন জমি দখলের রেকর্ড আর কারুর নেই। তাই বলছিলাম কী, চলো আমরা বিয়ে করি।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।