সৈকত মুখোপাধ্যায়

আশ্বিনের এক শারদ-প্রাতে ভবানীপুরের মৃদুল মালাকার-এর বিছানার পাশে কুহু-কুহু শব্দে কোকিল ডেকে উঠল।
মৃদুল সদ্য প্রেমে পড়েছে। তাই, রাত্রির প্রথম তিনটে প্রহর বিনিদ্র কাটিয়ে ভোরের দিকে অঘোরে ঘুমোচ্ছিল। কিন্তু অবাক কাণ্ড, তার মোবাইলে কোকিল-কণ্ঠে রিং টোন বাজামাত্র সে সেই গভীর ঘুম থেকে এক লহমায় জেগে উঠল এবং চৌকি থেকে লাফ মেরে নেমে কল রিসিভ করল।
অবশ্য পূর্বাপর ঘটনা জানলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই কলটির জন্যই মৃদুল গত দুদিন ধরে ঘুমের মধ্যেও কান খাড়া করে থেকেছে। এই নম্বরটার জন্যেই সে 'কুহু কুহু' রিং টোন সিলেক্ট করে রেখেছে। বাকি সব কলের জন্য নেড়ি কুকুরের ডাক।
এ হল হাতিবাগানের শর্মি দত্তবণিকের মোবাইল নম্বর। এই নম্বরে এস এম এস করে পাঠানো গত দুদিনের যাবতীয় আবেদন-নিবেদনের উত্তরে শর্মির দিক থেকে এই প্রথম সাড়া। এতটা অবশ্য মৃদুল আশা করেনি। সে ভেবেছিল মেসেজের উত্তরে মেসেজই আসবে—অবগুণ্ঠিতা নববধূর মতো ভীরু, সলজ্জ ভাষায়। বোঝাই যাচ্ছে, শর্মি যথেষ্ট অ্যাডভান্সড মেয়ে, এবং সে তাকে প্রগাঢ় বিশ্বাস করেছে। মৃদুল পরম আদরে একবার মোইলটার গায়ে হাত বোলল। তারপর সেই আদরের সবটুকু গলায় ঢেলে বলল, 'হ্যালোওও'!
উলটো দিকে বাজ পড়ার মতো শব্দ হল—'কে হে তুমি স্কাউন্ড্রেল? গত দুদিন ধরে আমার মেয়ের ফোনে কুপ্রস্তাব পাঠাচ্ছ?'
'কুপ...কুপ...কুপ!' একটু আগেই যে মৃদুল পাখি হয়ে আকাশে উড়েছিল, সেই-ই ভয়ে এবং বিস্ময়ে কূপমণ্ডুকের মতো আওয়াজ ছাড়তে লাগল। কুপ্রস্তাব! নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না। হাজার বছরের বাংলা প্রেমের কবিতার মণিমুক্তো সেঁচে সে মেসেজগুলো বানিয়েছিল। সেগুলোকে শর্মির বাবা বলছেন 'কুপ্রস্তাব'!!
উলটো দিকে উচ্চস্বরে শাসানি চলতেই থাকল—'ফের যদি দেখেছি এই ফোনে মেসেজ পাঠিয়েছ, তবে তোমাকে সাইবার ক্রাইম-এর কেসে ফাঁসিয়ে জেলের ঘানি ঘোরাব। আমাকে চেনো না। আই জি ক্রাইম আর আমি মাধ্যমিক পরীক্ষায় টুকতে গিয়ে একসঙ্গে ধরা পড়েছিলাম। শালা ইনভিজিলেটর দুজনকেই একসঙ্গে পরীক্ষার হল থেকে বার করে দিয়েছিল।
সে যাক। যেটা বলতে চাইছি সেটা হল, মেসেজ পাঠিয়েও কোনও লাভ নেই। কারণ শর্মির এই মোবাইল ফোনটা আমি সিজ করে নিয়েছি। তা ছাড়া বাড়ির ল্যান্ড লাইনেরও তার-ফার সব ছিঁড়ে দিয়েছি। সবচেয়ে ভালো হত তোমার মুণ্ডুটা ছিঁড়তে পারলে, কিন্তু তার তো ইমিডিয়েট কোনও উপায় দেখছি না। কারণ, তুমি কোথাকার লোফার, তাই তো জানি না।
আর শোনো, ওই যে জিগ্যেস করেছ না, তুমি কি আমার সারা জীবনের সঙ্গী হবে টবে, উত্তরটা আমিই দিয়ে দিচ্ছি। নোওওও। আগামী মাসে শর্মির বিয়ে দিয়ে ক্যালিফোর্নিয়া পাঠিয়ে দিচ্ছি। শর্মি কোনও দিন তোমার হবে না। তুমি যত বড় হুলিগানই হও না কেন।'
ল্যান্ড ফোনের মতো মোবাইল ফোনকে ঝড়াং করে ক্রেডলে নামিয়ে রাখা যায় না। তবু শর্মির বাবা ফোনটা ডিসকানেক্ট করার সময় মৃদুল অবিকল সেই ঝড়াং শব্দটাই শুনতে পেল।
শর্মির বাবা কেন যে তাকে 'হুলিগান' বলছেন, কে জানে। সম্ভবত কথাটা তাঁর জোরালো মনে হয়েছে। মৃদুল খুব ভালো ছেলে। সদ্য বিএ পাশ করে রাইটার্সে ক্লার্কের চাকরি পেয়েছে। সে মোটেই হুলিগান নয়। তবে গত এক মাস ধরে তার বুকের মধ্যে বিরহী হুলোর গান বাজছে। দিন নেই, রাত নেই, 'মিঁয়াও, মিঁয়াও, শর্মি আও আও' বলে তার অন্তরাত্মা কেঁদে বেড়াচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাতও ওই এক মাস আগেই। কী কুক্ষণে যে সেদিন মৃদুল তার পাড়ার গেনুদাকে নিয়ে পৃথিবীর একমাত্র বাংলা লিপি-জ্যোতিষী হাতিবাগানের সুরেশচন্দ্র দত্তবণিকের কাছে গিয়েছিল, তা বিধাতাই বলতে পারবেন। লিপি-জ্যোতিষ ব্যাপারটা সম্বন্ধে তার আগে মৃদুল কিছুই জানত না। ইংরেজিতে নাকি 'গ্রাফোলজি' বলে একটা শাস্ত্র রয়েছে। সেই শাস্ত্র জানলে মানুষের হাতের লেখা দেখে তার চরিত্র বদলে দেওয়া যায়। সুরেশবাবু সেই বিদ্যাকেই বাংলায় আমদানি করেছেন। শুধু তা-ই নয়, তিনি তাঁর ক্লায়েন্টদের হাতের লেখা বদলে দিয়ে তাদের ভাগ্যও বদলে দিতে পারেন বলে দাবি করেন।
গেনুদাই কাকুতিমিনতি করে মৃদুলকে নিয়ে গেলেন হাতিবাগানে। বললেন, 'ব্যবসায় ঝাড় খেতে খেতে বৃন্দাবন হয়ে গেলাম রে মৃদুল। সব রকমের জ্যোতিষী দেখিয়েছি। সবাই ফেল মেরে গিয়েছে। শেষ ভরসা এই লিপি-জ্যোতিষী দত্তবণিক।'
মৃদুল গাঁইগুঁই করে বলল, 'তা আপনি যাচ্ছেন, যান না। আবার আমাকে কেন?'
'বড্ড মাথা ঘোরে রে ভাইটি আমার। পড়েটড়ে গেলে একটু ধরতে পারবি।'
লিপি-জ্যোতিষী সুরেশবাবু গেনুদার হাতের লেখার স্যাম্পল দেখেই মাথাঘোরার রোগটা ধরে ফেললেন। হাতিবাগানে তাঁর বসতবাড়ির বাইরের ঘরটা সুরেশচন্দ্রের চেম্বার। সেই ঘরে বসে, একটা লাল শালুতে বাঁধানো খেরোর খাতা গেনুদার দিকে এগিয়ে দিয়ে সুরেশচন্দ্র বললেন, 'লিখুন দেখি'।
'কী লিখব'? প্রশ্ন গেনুদার।
'যা ইচ্ছে লিখুন না মশাই। আপনার ভাষা নিয়ে তো আমার কাজ নয়। আমার কাজ অক্ষরগুলোর চেহারা নিয়ে। কনটেন্ট নয়, ফর্ম। চটপট লিখুন।'
গেনুদা সময় নিয়েই লিখলেন—এখানে শায়িত আছে বাকুড়ার গেনুরাম মাণ্ডি/ বোকামিতে লক্ষ-য় এক সে/ অর্ধেক পুঁজি তার মেরেছিল দেনাদার (সানড্রি)/ বাকি আধা ইনকাম ট্যাক্সে। পাশ থেকে উঁকি মেরে লেখা দেখে মৃদুলের বুক কেঁপে উঠল। বলল, 'আপনি তো দেখছি এপিটাফ লিখেছেন। এত ভেঙে পড়লে চলবে? আমরা আছি তো!'
টেবিলের উলটোদিক থেকে সুরেশচন্দ্র ভয়ংকর ধমক দিয়ে উঠলেন, 'চোওওপ! বলে, আমরা আছি তো! আরে, যার 'ব'গুলো এমন গোল গোল আর 'ট' গুলো তিনকোণা মতো, তার নির্ঘাত মাথার গণ্ডগোল আছে। আর যার মাথার গণ্ডগোল আছে, তার কেউ নেই, সুরেশ দত্তবণিক ছাড়া। মাথা ঘোরে তো আপনার?' এ প্রশ্নটা গেনুদাকে।
'আজ্ঞে হ্যাঁ'। বিস্ময়-মুগ্ধ গেনুদার জবাব।
'এই যে বাঁকুড়া লিখতে গিয়ে ব-এর মাথায় চন্দ্রবিন্দু দেননি, তার কারণ কী জানেন?'
'অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলুম বোধহয়।'
'আজ্ঞে না। চন্দ্রের স্থানটা আপনার কমজোরি। ওই জন্যই মাথা ঘুরছে। চন্দ্রবিন্দুটা বেশি করে লিখতে হবে। একটা বই বলছি, মির্জাপুরের ফুটপাথ থেকে কিনে নেবেন। প্রাপ্তবয়স্কদের ভূতের গল্পের বই। নাম 'শ্মশানপুরীর সুলেখাবউদি'। চ্যাপ্টার থ্রি, পেজ টোয়েন্টি টু। ''কঙ্কালটা বলল, সুঁলেঁখাঁ তোঁমার ওঁই তঁনুলঁতার মোঁহে আঁমি বেঁচে থাঁকতে পাঁগল ছিঁলাম, মঁরে গিঁয়েও পাঁগল আঁছি...'' এখান থেকে ''পরম আদরে কঙ্কালের খুলিতে গাবের আঠা মাখাতে মাখাতে সুলেখা বউদি বলল, তোঁমার মঁতন এঁমন কঁঠিন আঁলিঙ্গনে আঁমাকে জীবনে মঁরণে কেঁউ বাঁধেনি গোঁ, কেঁউ বাঁধেনি'' অবধি রোজ ছ'বার করে লিখবেন। হাতের লেখার দিকে মন দেবেন, বিষয়ের দিকে নয়। মনে থাকবে?'
বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নাড়ল গেনুদা। তারপর আরও আধ ঘণ্টা ধরে সুরেশচন্দ্রের কাছে নানারকম অ, আ, ক, খ শিখে, তাঁর হাতে তিনশো এক টাকা দক্ষিণা দিয়ে গেনুদা বাইরে বেরোলেন। পিছন পিছন পাঁচন-গেলা মুখে তার সঙ্গী। সেই দিনই, লিপি-জ্যোতিষীর বাড়ি থেকে বেরিয়েই মৃদুল মালাকার তার নিয়তির মুখোমুখি পড়ে গেল।
সুরেশচন্দ্রের এক মাত্র কন্যা শর্মি তখন ক্লাস সেরে বাড়িতে ঢুকছিল। পশ্চিমের রোদ লেগে ফরসা মুখে হালকা লালিমা। ছোট্ট কপালে দুটি অলকের গুছি ঘামে চিপকে রয়েছে। চিবুকের ডগাতেও চিকমিক করছে কুচি কুচি ঘাম। জিনিয়াস হতে গেলে নাকি নাইন্টি পারসেন্ট পারসপিরেশন লাগে, আর টেন পারসেন্ট ইনসপিরেশন। প্রেমের ফর্মুলাও নিশ্চয়ই কাছাকাছিই হবে। মৃদুল তন্মুহূর্তে স্বেদসিক্তা শর্মির যাকে বলে হেড-লং প্রেমে পড়ে গেল।
আদতে বরিশালের বাঙাল মৃদুলের জেদ সাংঘাতিক। ভয়ংকর উদ্যমে, নতুন চাকরি প্রায় খুইয়ে, মৃদুল বেথুন কলেজের গেটে রোজ বিকেল বিকেল পৌঁছে যেতে লাগল। শর্মির সঙ্গে তার চোখাচোখি হল। ক'দিন বাদে শর্মি তাকে কিঞ্চিৎ প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে অভিনন্দিত করল এবং মাত্র গত তরশুর আগের দিন বান্ধবীদের ঘেরাটোপ থেকে একটু পিছিয়ে এসে হাতের মুঠো থেকে টুক করে মোবাইল নম্বর লেখা কাগজের চিরকুট ফেলে দিয়ে নিরীহ মুখে বাড়ির পথ ধরল। বোঝাই যাচ্ছে, শুধু রূপ দেখে ভোলার মেয়ে সে নয়। আগে মৃদুলের মুখ থেকে তার সমস্ত হালহকিকৎ শুনতে চায়, এবং সেই জন্যই ফোন নম্বর সম্প্রদান।
সেই চিরকুট অবিকল রুমাল-চোর খেলার কায়দায় ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে মৃদুল হেদুয়ার বেঞ্চে বসে পড়ে ফেলল। দেখল, ফোন নম্বরের তলায় লেখা 'ডোন্ট কল। সেন্ড মেসেজ ওনলি।' কেন এই সাবধানতা, তা বুঝতে মৃদুলের অসুবিধে হল না। শর্মির দাপুটে বাবাকে সে মাত্র কিছু দিন আগেই স্বচক্ষে দেখে এসেছে। অতএব দুদিন ধরে সে কেবল নিজের বায়োডাটা এবং নির্বাচিত প্রেমের কবিতা এস এম এস করে গেল। তারপর যখন সবে ভাবছে কার্যসিদ্ধি হল, তখনই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো সুরেশচন্দ্রের ফোন।
আর এখন শর্মি গৃহবন্দি। বাজেয়াপ্ত তার মোবাইল। বিবাহলগ্ন সমাসন্ন। অত:কিম?
'নিন, লিখুন!' বললেন সুরেশচন্দ্র দত্তবণিক।
'কী লিখব?' জিগ্যেস করল মৃদুল।
আজ সে নিজেই ক্লায়েন্ট, লিপি-জ্যোতিষীর কাছে একাই এসেছে। ঢোকার পর সুরেশবাবু একবার মাত্র জিগ্যেস করেছিলেন, 'চেনা চেনা লাগছে কেন বলুন তো?' তারপর ও ব্যাপার নিয়ে আর ঘাঁটাননি।
মৃদুলের প্রশ্নের উত্তরে সুরেশবাবু আগের মতোই জবাব দিলেন, 'যা প্রাণ চায় লিখুন। কনটেন্টটা জরুরি নয়, ফর্মটাই জরুরি।'
কলমটা হাতে নিয়ে মৃদুল আড় চোখে দেখল, সুরেশচন্দ্র দত্তবণিক তার সামনে লাল খেরোর খাতা মেলে ধরে বসে আছেন। পরনে রক্তাম্বর। মুখের ভাব যাকে বলে ভ্রূকুটিকুটিল। আগের দিন ডান হাঁটুর কাছে একটা মোবাইল ফোন নামানো ছিল। আজ মৃদুল দেখল, বাঁ-হাঁটুর কাছে আর একটা। কথা বলতে বলতেই সুরেশবাবু মাঝে মাঝে সেটার স্ক্রিনে কী মেসেজ এল দেখছেন।
মৃদুলের মনে হল তার হৃৎপিণ্ডের দু-একটা লাব-ডুব হড়কে গেল। ওটাই যে শর্মির বাজেয়াপ্ত মোবাইল, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ওই ফোনটার ইনবক্সেই তার প্রেম-নিবেদন ধরা আছে। হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই ভয়ের চোটে মৃদুলের কাঁপুনি লেগে গেল। তার মনে হল, মেয়ের প্রেমিকের নম্বরটা কোনও কারণে যদি এক্ষুনি একবার সুরেশবাবু ডায়াল করেন, তা হলে ফোনটা বাজবে তার পকেটের মধ্যে। সে ধড়ফড় করে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে নিজের মোবাইলটাকে সেখানেই সুইচ টিপে অফ করে দিল। তারপর একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে হাতটা পকেট থেকে বার করে আনল। তির্যক দৃষ্টিতে তার হাতের গতিবিধি আর পরবর্তী বডি-ল্যাঙ্গোয়েজ লক্ষ করে সুরেশবাবু গম্ভীর গলায় মন্তব্য করলেন, 'কোনও ভালো স্কিন স্পেশালিস্টকে দেখিয়ে নিন। এসব জিনিস পুষে রাখা কাজের কথা নয়।'
তারপর আবার তাগাদা দিলেন, 'কই লিখুন।'
মৃদুল ভেবেচিন্তে লিখল—'রাম থাকে আমবনে। গায়ে তার চাকা চাকা দাগ। বাঘ বনে ফুল পাড়ে, পাখা মেলে ওড়ে। মাছি আম খায়। গায়ে তার লাল শাল।' তারপর ভয়ে ভয়ে খাতাটা সুরেশবাবুর সামনে এগিয়ে দিল। সুরেশবাবুও অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে লেখাগুলো দেখতে দেখতে বললেন, 'ভালোই হয়েছে। র-এর ফুটকিগুলো বেশ জোরালো ভাবে দিয়েছেন। তার মানে চরিত্রের দৃঢ়তা আছে। সহজে হাল ছাড়েন না।'
মৃদুলের মুখে একটা নিশ্চিন্ততার হাসি ফুটে উঠেছিল। তবে চট করে সেই হাসি লুকিয়ে সে মুখে ভারি বিপন্ন ভাব ফুটিয়ে তুলল এবং বলল, 'সেইখানেই তো গণ্ডগোল স্যার। দৃঢ়তা এই আসছে, এই চলে যাচ্ছে।'
'বলেন কী? আপনি অন্য কোনও দৃঢ়তার কথা বলছেন না তো? ওটা কিন্তু ওই পাশের গলির হেকিম সাহেবের কেস।'
প্রেমিকার বাবার মুখে এখন সন্দেহের কথা শুনে মৃদুল লজ্জায় লাল হয়ে গেল। বলল, 'ছি:, কী যে বলেন! চরিত্রের কথাই বলছি। এই তো দেখুন না, কালকেই অফিসে খাব না, খাব না করেও পঞ্চাশ টাকা ঘুষ খেয়ে ফেললাম। অবাক কাণ্ড স্যার, তার পরেই ফাইলে নোট দিতে গিয়ে দেখি লেখাগুলো সব জল না পাওয়া চারাগাছের মতো এদিক-ওদিক নেতিয়ে পড়েছে। র-এ ফুটকি দিতে পারছি না, ট-এর টিকি দিতে পারছি না। কেলেঙ্কারির একশেষ।'
'বলেন কী? আপনার তো ইউনিক কেস মশাই। ক্লোজ ওয়াচ করতে হচ্ছে। হুঁ হুঁ হুঁ। আচ্ছা তা হলে এ বার একটু রেফ দিয়ে কিছু লিখুন দেখি। রেফ হচ্ছে আমাদের সুষুম্নার মতো, বুঝলেন না? অনন্তের সঙ্গে আমাদের ইড়া-পিঙ্গলাকে যুক্ত করে রাখে। বল, বীর্য—সব ওইখান থেকেই আসে। লিখুন দেখি রেফ দিয়ে।'
মৃদুল লিখল—বর্ষা নেমেছে, গর্মি আর নেই। আমহার্স্ট স্ট্রিটে চর্মকারেরা ঘোর কর্মচঞ্চল। স্বর্ণপদক হারিয়ে শেন ওয়ার্ন মর্মাহত। শর্মি তুমি বর্ণনাতীত সুন্দরী। দর্পণ তোমাকে বিম্বিত করে গর্বিত হবে।
সেই লেখা দেখে সুরেশচন্দ্র সত্যিই চিন্তায় পড়ে গেলেন। বললেন, 'দেখেছেন, রেফগুলো কেমন অপুষ্ট। কোনওটা ডান দিকে হেলে আছে, কোনওটা বাঁ-দিকে। নাহ, একটা সিটিংয়ে হবে না। আপনাকে আরও কয়েক বার আসতে হবে।'
ভারি উৎসাহিত ভাবে মৃদুল বলল, 'বেশ তো, বেশ তো। কোনও অসুবিধা নেই। আপনি আমাকে হোমটাস্ক দিয়ে দিন। আমি কালকেই দেখিয়ে যাব। এই রইল আজকের তিনশো এক টাকা, আর আগামী চার দিনের অ্যাডভান্স বারোশো চার—একুনে পনেরোশো পাঁচ। ব্যালেন্স নিয়ে ভাবছেন কেন স্যার? পরে নিয়ে নেব।'
লিপি-জ্যোতিষীর বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় মৃদুল ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল, দোতলার বারান্দা থেকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে শর্মি। অবশ্য সে যে খুব তাড়াতাড়িই অবাক ভাবটা কাটিয়ে উঠেছিল, তার প্রমাণ বাবার খেরোর খাতাতেই ছিল। পরের দিন মৃদুল হাতের লেখার স্যাম্পেল দিতে গিয়ে দেখল, আগের দিন যেখানে সে শেষ করেছিল, তার ঠিক নীচে গোটা গোটা মেয়েলি অক্ষরে লেখা—ঘোড়ার ডিম। আমি নাকি সুন্দরী?
অনুকূল বাতাস পেয়ে মৃদুলের কুলকুণ্ডলিনী সেদিন এমন জেগে উঠল যে, সুরেশবাবুর খেরোর খাতার চেহারা হল বর্ষার চিৎপুর রোডের মতো। অক্ষরগুলো যেন জমা জলে আটকে পড়া সারি সারি ট্রামের কামরা আর তাদের মাথার ওপর পরের পর এরিয়ালের— মতো উন্নত রেফ। ক্লায়েন্ট-এর এমন দ্রুত উন্নতিতে সুরেশচন্দ্র তো ভারি উৎফুল্ল। সেদিনের ক্লাস শেষ হল 'ৎ' দিয়ে। মৃদুল (আধুনিক কবিতার থেকে টুকে) খেরোর খাতায় লিখে এল—দত্তবণিকের তাৎক্ষণিকের পাব কি পরশ যৎসামান্য? পরের দিন তার নীচে মেয়েলি হাতের লেখায়—সাহস তো মন্দ নয়। সকাল ন'টায় চেম্বারে ঢুকে পোড়ো, বাবা আসার আগে। আমি থাকব।
এর ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় শর্মি মৃদুলের সঙ্গে ইলোপ করল, সোজা বাংলায় গৃহত্যাগ করল। সুরেশচন্দ্রের গিন্নি সামান্য গোয়েন্দাগিরির পর খেরোর খাতা আবিষ্কার করলেন এবং বিলাপ শুরু করলেন, 'এ কোন আহম্মকের হাতে পড়েছিলাম মাগোওওও। চোখের সামনে ছোঁড়া-ছুঁড়ি দুটো চিঠি চালাচালি করে বেরিয়ে গেল, আর এই মানুষটা ধরতেও পারল না।'
ঘাড় বাড়িয়ে মেয়ের হাতের লেখা অক্ষরগুলো দেখতে দেখতে সুরেশচন্দ্র সবে বলতে শুরু করেছিলেন 'হুঁ আমি ক'দিন ধরেই ভাবছিলাম এই ঢেউ-খেলানো হাতের লেখাটা কার! এ তো ঘোর স্বেচ্ছাচারিণীর হস্তাক্ষর। এ মেয়ে পালাবে না তো...'
হঠাৎ গিন্নির জ্বলন্ত চোখের দিকে চোখ পড়ায় তিনি ঢোক গিলে থেমে গেলেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইনএই বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী বিষয়বস্তু রয়েছে।
পড়া চালিয়ে যেতে নিশ্চিত করুন যে আপনার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি।