চতুর্দশ অধ্যায় : প্রথম পর্যায় ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ

প্রথম পর্যায় ও ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ
চতুর্দশ অধ্যায়

স্পেনীয় ক্ষুদ্র শাসকগণ

(১০১০-১০৯১)

একাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে হাজীবের হস্ত হইতে ক্ষমতা চলিয়া যায়। দশম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় হইতেই প্রশাসন ক্ষেত্রে উমাইয়া শাসকদের কোন কর্তৃত্ব ছিলো না। প্রদেশগুলি কেন্দ্র হইতে বিচ্ছিন্ন হইতে শুরু করে। রাজনৈতিক গুরুত্ব কেন্দ্র হইতে প্রদেশগুলিতে স্থানান্তরিত হয়। দৃশ্যপট হইতে আরব রাজতন্ত্র অপসারিত হয়। দেশের রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থার সুযোগ লইয়া আরব বার্বার ও স্লাভ নেতাগণ তাহাদের নিজস্ব রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। উমাইয়া সাম্রাজ্য বিচ্ছন্ন হইবার পর সাময়িক ভাবে বহু রাজ্যের উদ্ভব ঘটে। এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজাকে আলেকজান্ডারের পরবর্তীকালের উত্তরাধিকারীদের সহিত তুলনা করা যাইতে পারে। ক্ষুদ্র রাজ্যকে বাগদাদের রেইস ডে তাইফাস (মুলুকুল তাওয়াইফ) বলিয়া অভিহিত করা হইত। ১০০৯ খ্রীঃ আল আন্দালুসের ঐক্য বিনষ্ট হইতে আরম্ভ করে। তখন কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতা হারায় এবং গভর্নরগণ ও অন্যান্য আঞ্চলিক নেতৃবর্গ তাহাদের নিজের হস্তে ক্ষমতা গ্রহণ করে। মার্চসমূহের গভর্নরদের হস্তে সীমাহীন ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ফলে সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন জোরদার হইতে পারে না। নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মার্চের রাজধানী যথাক্রমে বাদাজোজ, টলেডো ও সারাগোসায় ছিল। অবশিষ্ট মুসলিম ভূখণ্ড ক্ষুদ্র ত্রিশটি রাজ্যে বিভক্ত হইয়া যায়। উহার মধ্যে কতিপয় রাজ্যের অস্তিত্ব অল্পদিনে বিলুপ্ত হয়। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ষড়যন্ত্র এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বও উহার সম্প্রসারণের নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার দরুন বিলুপ্ত হয়। এই সময়ের রাজনৈতিক পরিবেশ। ছিল খুবই বিশৃঙ্খলাপূর্ণ।

বেশ কয়েক বৎসর তাহারা তাহাদের মূল্যবান স্বাধীনতাকে রক্ষা করে। কিন্তু জনগণ নিরাপত্তাহীন ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া হতাশ হইয়া ওঠে এবং অতীতকে স্মরণ করিয়া অনুশোচনা প্রকাশ করিতে শুরু করে। তাইফাদের মধ্য হইতে কয়েকজন মাত্র সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। শক্তিকে সম্বল করিয়া একে অপরের সহিত বিশ্বাসঘাতকতা ও তাহাদের জনগণকে ব্যবহার করিয়া রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি করিতে সক্ষম হয়। গোত্রীয় প্রধানগণ ক্রমে ক্রমে তাহাদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব হারাইয়া ফেলে এবং তাহাদের আরব ও বার্বার সেনাগণের জায়গা দখল করে খ্রীষ্টান বেতনভুক্ত সৈনিকগণ। এই সৈনিকদের উপরই দেশের উত্তরাঞ্চলের নিরাপত্তা নির্ভর করিত।

রাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্ব হ্রাস পাইলেও নেতাগণ সাংস্কৃতিক, কৃষি ও উদ্যান উন্নয়নে একে অপরের সহিত প্রতিযোগিতা করিত। কর্ডোভার গোত্রীয় প্রধানগণ তাহাদের সামর্থ অনুসারে রাজপ্রাসাদের জাঁকজমকের অনুকরণ করিত। ক্ষুদ্ররাজ্যে শাসকগণ খুবই কর্মতৎপর ছিলেন এবং মন্ত্রীগণকে ইচ্ছা মাফিক কোণঠাসা করিয়া রাখিত। অপরদিকে নিকৃষ্ট চরিত্রের শাসকগণ তাহাদের মন্ত্রীদের দ্বারা পরিচালিত হইত। মন্ত্রীগণ শাসকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। তাহারা একদিকে শাসকগণকে জাকজমক ও জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত রাখিত অপরদিকে নিজেদের উচ্চ আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য শক্তি সঞ্চয় করিত। উহাদের মধ্যে আলমেরিয়ার আবুল আব্বাস ও গ্রানাডার স্যামুয়েল বিন মগডেলার নাম উল্লেখ করা যাইতে পারে।

বার্বার, আন্দালুসীয় ও নওমুসলিমদের লইয়া পৃথক পৃথক তিনটি গোত্র গড়িয়া ওঠে। উমাইয়া সাম্রাজ্য পতনের পর বার্বার ও স্লাভগণ বেশি লাভবান হয়। বাবার শাসকগণ গ্রানাডা ও গোয়াদালকুহভির দ্বীপসহ উহার দক্ষিণ উপকূল অধিকার করে। স্লাভাগণ দেশের পূর্ব দিকে অগ্রসর হইয়া উপকূলীয় শহর আলমেরিয়া ভ্যালেন্সিয়া ও তোরতোসা অধিকার করে। কিন্তু তাহারা বার্বার ও আন্দালুসীয়দের ন্যায় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হইতে বিরত থাকে। কতিপয় আরব অভিজাত তাহাদের নীতি অব্যাহত রাখে। তাহাদের এই আভিজাত্যের বিরুদ্ধে তৃতীয় আবদুর রহমান ও হাজীব আল-মনসুর প্রত্যক্ষ আক্রমণ চালান। একইভাবে মুসলমানগণ অবশিষ্ট মুসলিম স্পেনে তাহাদের প্রভুত্ব ও প্রভাব বিস্তার করে। আন্দালুসীয় শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল আব্বাসীগণ। আলমুত্তাদিদ (১০৪২-৬৮) সেভিলের ক্ষুদ্ররাষ্ট্রকে পূর্বে ও দক্ষিণ-পূর্বে বিস্তৃত করেন এবং কর্ডোভা ও গ্রানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। জাঁকজমকে সেভিলের রাজপ্রাসাদ কর্ডোভার রাজপ্রাসাদের সমকক্ষ ছিল।

উল্লেখযোগ্য ক্ষুদ্র শাসকদের মধ্যে কর্ডোভার বানু জাওহার, মালাগা ও আলজেসিরাসের বানু হাম্মুদ, সারাগোসার বানু হুদ এবং সেভিলের বানু আব্বাস ছিলেন আরব। গ্রানাডার বানু জিরি ও টলেডোর বানু জুনুন ছিলেন বার্বার এবং দক্ষিণপূর্ব স্পেনের ও বেলিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জের ক্ষুদ্র শাসকগণ যেমন আলমেরিয়ার খায়রান মুরসিয়ার জুহাইর, দেনিয়ার মুহিদ ও অন্যান্য শাসকগণ ছিলেন স্লাভ। এই ক্ষুদ্র শাসকগণ সর্বদা একে অপরের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত থাকিত এমন কি অপরকে ধ্বংস করিবার জন্য খ্রীস্টানদিগকেও সাহায্য করিত। ইফ্রিকার দুই শক্ত বার্বার শাসক মুরাবিতিন ও মুওয়াহিদীনদের কবলে পড়িয়া তাহারা দুর্বল হইয়া পড়ে, দেশের উত্তরাংশে একের পর এক খ্রীস্টান শক্তির উদ্ভব হয়।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজবংশ

১। কর্ডোভার জাহওয়ারী রাজবংশ (১০৩১-১০৭০ খ্রীঃ)

উমাইয়াদের শাসনের শেষ যুগে কর্ডোভার সিংহাসনে চতুর্থ আবদুর রহমানের ভ্রাতা হিশামের স্থলে রাজপ্রাসাদের জনৈক প্রভাবশালী সদস্য আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁহার পূর্বপুরুষ আবু ওবায়দা আল কালবী আরব দেশ হইতে স্পেনে আগমন করিয়াছিলেন। তৃতীয় হিশাম ইবনে জাহওয়ারকে ভক্তি শ্রদ্ধা করিতেন। কিন্তু তাহার প্রধান মন্ত্রী হাকাম তাহাকে ঘৃণা করিতেন। হাকাম ইবনে জাহওয়ারকে ক্ষমতা হইতে অপসারণ করিতে ব্যর্থ হন। হাকামের অবিরাম প্রচেষ্টায় ইবনে জাহওয়ার সতর্কতা অবলম্বন করেন। তিনি শুধু হাকামকে অপসারণের ষড়যন্ত্রেই লিপ্ত হইলেন না রাজত্ব উৎখাতের চেষ্টায়ও আত্মনিবেশ করিলেন। তাহাকে এই ষড়যন্ত্রে সহযোগিতা করিলেন উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ যাহারা উমাইয়া শাসনের শেষ আমলে দেশকে শাসন করিবার জন্য কর্ডোভায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। কিন্তু তিনি জনগণকে বিশ্বাস করিতে পারিতেছিলেন না কারণ জনগণের আনুগত্য ছিল রাজতন্ত্রের প্রতি। রাজ্যের উপদেষ্টা পরিষদের উপর নহে।

তাহার উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি একজন দুর্বল শাসকের অনুসন্ধানে ছিলেন। তিনি তৃতীয় হিশামের আত্মীয় জনৈক উমাইয়াকে সিংহাসন দখল করিবার জন্য বিদ্রোহ করিতে প্ররোচিত করিলেন। তিনি কর্ডোভাবাসীদের সহযোগিতায় তৃতীয় হিশাম ও তাহার প্রধান মন্ত্রী হাকাম ইবনে মাইককে ক্ষমতাচ্যুত করেন। হিশামকে কারারুদ্ধ করে পরে নির্বাসিত করা হয়। খেলাফতের অবসান ঘোষণা করা হইলে ১০৩১ খ্রীস্টাব্দে উপদেষ্টা পরিষদ রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। তাহারা জাহওয়ারকে উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত করেন এবং তাহার উপর রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বময় ক্ষমতা ন্যস্ত করেন। মুহাম্মদ ইবনে আব্বাস ও আবদুল আজিজ ইবনে হাসানের ন্যায় কর্ডোভায় সুধীদের সমন্বয়ে গঠিত উপদেষ্টা পরিষদের নামে রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালনা করিতেন।

আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার

আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ার ছিলেন একজন আত্মোৎসর্গিত ও নিঃস্বার্থ প্রশাসক। বার্বারদের ক্ষমতা গ্রহণের পর আরব নেতাগণ দ্বিতীয় হিশামের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। তাঁহার নিকট আত্মসমর্পণ ব্যতীত ইবনে জাহওয়ারের অন্য কোন উপায় ছিল না। সুতরাং আরব ও স্লাভগণ বার্বার শক্তির বিরুদ্ধে একমাত্র নেতার অধীনে একতাবদ্ধ হন। ১০৩৫ খ্রীঃ তিনি কর্ডোভাবাসীকে দ্বিতীয় হিশামের প্রতি অনুগত্য প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করেন। কিন্তু আবুল কাসিম যখন দ্বিতীয় হিশামের সহিত কর্ডোভার সিংহাসনে আরোহণ করিতে চেষ্টা করেন, জাহওয়ার ইহার বিরোধিতা করেন। তিনি খোত্বা হইতে হিশামের নাম অপসারণ করেন এবং খলিফাকে

প্রতারক ও ভণ্ড হিসাবে জনগণের নিকট প্রচার করেন। আবুল কাশেম বাধ্য হইয়া ভগ্নহৃদয়ে সেভিলে প্রত্যাবর্তন করেন।

সিনেটের দুইজন সদস্য মুহাম্মদ ইবনে আব্বাস ও আবদুল আজিজ ইবনে হাসান নামে তাহার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করে। তিনি উদ্ধত বার্বারগণকে বরখাস্ত করেন। বানু ইফরানের বিরুদ্ধে কর্ডোভাবাসীদের কোন অভিযোগ না থাকায় তিনি তাহাদিগকে বহাল রাখেন এবং ন্যাশনাল গার্ডদের দ্বারা অন্যদের জায়গা পূরণ করেন। তিনি কখনও রাজা উপাধি গ্রহণ করেন নাই এবং তিনি তাহার জীর্ণ কুটিরে বাস করিতেন এবং সিনেটের অনুমোদন ব্যতীত তিনি কখনও কাহাকেও কোন উপঢৌকন দিতেন না। তাহার দক্ষ প্রশাসনের কারণে ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি সাধিত হয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষের মূল্য কমিয়া যায় এবং জনগণের মধ্যে শান্তি ফিরিয়া আসে কিন্তু অতীতের জাঁকজমক ও রাজনৈতিক প্রাধান্য কখনও ফিরিয়া আসে নাই।

আবদুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ার

(১০৪৫-১০৬৪)

১০৪৫ খ্রীঃ আবুল হাজম ইবনে জাওহারের মৃত্যুর পর তাহারই ন্যায় সৎ প্রতিভাবান ও যোগ্য শাসক তাহার পুত্র আবুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ার উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। তিনিও তাহার পিতার ন্যায় সুবিচার প্রতিষ্ঠা করেন এবং শহরের সুধী ও বিদ্বান ব্যক্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন। তিনি ইব্রাহিম বিন জাহওয়ারের মত যোগ্য ব্যক্তিকে তাঁহার উজির নিযুক্ত করেন এবং শহরে দীর্ঘ বিশ বৎসর কাল নিরপেক্ষ ও নিঃস্বার্থ শাসন পরিচালনা করেন।

আবদুল মালিক

১০৬৪ খ্রীঃ বৃদ্ধ আবদুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ার তাহার দুইপুত্র আবদুর রহমান ও আবদুল মালিকের পক্ষে ক্ষমতা ত্যাগ করেন। আবদুর রহমানের উপর অর্থ দফতর ও সাধারণ প্রশাসনের ভার অর্পিত হয়। আবদুল মালিক সেনাবাহিনীর দায়িত্বে নিযুক্ত হন। আবদুল মালিক তাহার ভ্রাতা হইতে বেশি ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। ওয়াজির ইবনুল সাক্কারের সুযোগ্য প্রশাসনের ফলে রাজ্যে কিছু দিনের জন্য শান্তি বিরাজ করে। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার জন্য তাহাকে সকলেই প্রশংসা করিতেন। তিনি ছিলেন কর্ডোভার শত্রুদের হৃদয়ে ত্রাস সৃষ্টিকারী। কর্ডোভা অধিকারের উদ্দেশ্যে সেভিলের রাজা মুতামিদ, আবদুল মালিক ও ইবনুল সাক্কার মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করেন। ফলে ওয়াজির নিহত হয়। ওয়াজিরের প্রতি অনুগত অধিকাংশ অভিজাত ব্যক্তি ও কর্মচারী আবদুল মালিককে ত্যাগ করে। পরিত্যক্ত শাসক প্রজাতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু মুছিয়া ফেলেন। এই সুযোেগে ১০৭০ খ্রীস্টাব্দে টলেডোর মামুন কর্ডোভা আক্রমণ করেন। আক্রমণের সময় আবদুল মালিকের পক্ষে মাত্র ২০০ সৈন্য ছিল। এই স্বল্প সংখ্যক সৈন্যের আনুগত্য সম্পর্কেও সন্দেহ ছিল। আবদুল মালিক শত্রু নিধনের জন্য সেভিলের মুতাসিককে আমন্ত্রণ জানান। ইতিমধ্যে মুতাসিকের মৃত্যু ঘটে। শত্রু অবরোধ তুলিয়া লইতে বাধ্য হয় সত্য কিন্তু কর্ডোভাবাসী তাহাদের প্রভুর বিরুদ্ধে

ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং মুতামিদের সহিত যোগদান করে। মুতামিদ কর্ডোভা অধিকার করিয়া আবদুল মালিক ও তাহার বৃদ্ধ পিতাসহ সমস্ত পরিবারকে সাল্টেশের কারাগারে বন্দী করেন। বৃদ্ধ আবুল ওয়ালিদ এই ঘটনার পর চল্লিশ দিন জীবিত ছিলেন। মামুন ও মুতামিদ কর্ডোভা দখলের জন্য দীর্ঘ কয়েক বৎসর যুদ্ধ করেন। ইবনে উক্কাশা নামে জনৈক ব্যক্তি মামুনকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করে। মামুনের নিকট হইতে মুতামিদ বলপূর্বক কর্ডোভা দখল করেন। এইরূপে অল্পদিনের মধ্যে কর্ডোভা টলেডোর মামুনের নিকট হইতে সেভিলদের অধিকারে চলিয়া যায়।

২। মালাগা ও আলজেসিয়ার বানু হামুদ

(১০১০-১০৫৭ খ্রীঃ)

বানু হাম্মুদগণ ছিলেন মৌরিতানিয়ার ইদ্রিসী বংশোদ্ভূত। তাহারা নিজেদিগকে বার্বার বলিয়া দাবী করিলেও আদতে ছিল আরব। শায়েখ হাম্মদ বিন মায়মুন বিন আহম্মদ বিন আলী বিন উবায়দুল্লাহ বিন উমর বিন ইদ্রিসের দুই পুত্র হাজীব আলমনসুরের সময় আফ্রিকা হইতে কর্ডোভায় আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং সামরিক অফিসার হিসাবে চাকুরীতে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে সুলায়মান আল মুস্তাইনের খিলাফতে বড় ভাই আল কাসিম আলজেসিরার গভর্নর এবং ছোট ভাই আলী তাঞ্জিয়ার ও সিউটার গভর্নর পদে নিযুক্ত হন। আলী মালাগা অধিকার করেন। তিনি অপদার্থ উমাইয়া শাসক সুলায়মান আল মুস্তাইনকে ১০১৫ খ্রীঃ পরাজিত করিয়া কর্ডোভা দখল করেন। তিনি “আমিরুল মুমিনীন” খেতাব ধারণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি তাঁহার দাস কর্তৃক নিহত হলে ১০১৮ খ্রঃ মার্চ মাসে তাহার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আল কাসিম তাহার স্থলাভিষিক্ত হন। সুবিচারক ও বুদ্ধিমান কাসিম শান্তি প্রতিষ্ঠার পর আবিসিনিয়ান স্লাভ ও আসওয়াদী স্লাভদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গড়িয়া তোলেন। ইহার ফলে আরব ও বার্বারগণ অসন্তুষ্ট হইয়া ইয়াহিয়া ইবনে আলীর সহিত যোগদান করে। কাসিম তাহার ভ্রাতুস্পুত্র ইয়াহিয়া ইবনে আলী কর্তৃক ১০২১ খ্রীঃ সিংহাসনচ্যুত হন। তিনি মালাগার সিংহাসন পুনর্দখল করেন এবং প্রায় সাত বৎসর (১০১৮-১০২১) ও (১০২২-১০২৫) খ্রীস্টাব্দ রাজত্ব। করেন।

কাসিমের মৃত্যুর পর ইয়াহিয়া ইবনে আলী মালাগার সিংহাসন পুনর্দখল করেন এবং আলজেসিরা অধিকার করেন এবং প্রায় দশ বৎসর (১০২১, ১০২৫-৩৫) শাসন করেন। তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা ও দক্ষ শাসক। তিনি রাজ্যের মধ্যে শান্তি শৃংখলা প্রতিষ্ঠিত করেন এবং বহির্বিশ্বে শ্রদ্ধা অর্জন করেন। তিনি সেভিলের শাসক কাজী আবুল কাসিমের পুত্রকে তাহার প্রাসাদে জিম্মি হিসাবে প্রেরণ করিতে বাধ্য করেন। ইয়াহিয়া স্পেনীয় আরবদের বিরুদ্ধে বার্বার নেতাদের সহিত ঐক্যফ্রন্ট গঠন করেন এবং কর্ডোভা ও সেভিলের অস্তিত্বকে বিপন্ন করিয়া তোলেন কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট দীর্ঘস্থায়ী হয় না এবং বার্বার নেতাগণ একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। তিনি সেভিল আক্রমণ করিলে ১০৩৫ খ্রীঃ নভেম্বর মাসে কাজীপুত্র ইসমাইল কর্তৃক পরাজিত ও নিহত হন।

ইয়াহিয়ার পর তাহার ভাতা প্রথম ইদ্রিস মালাগাতে এবং তাহার পিতৃব্যপুত্র মুহাম্মদ আলজেসিরার ক্ষমতা দখল করেন। ইদ্রিস তাহার পিতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। তাহার সেনাবাহিনী সেভিলের অন্তর্গত এচিজাতে আবুল কাসিমের পুত্র ইসমাইলকে পরাজিত ও নিহত করেন। অল্পদিনের মধ্যে ইদ্রিস দেহ ত্যাগ করেন। ইয়াহিয়ার মৃত্যুর পর তাহার ছয়জন উত্তরাধিকারী ১০৫৭ খ্রীঃ পর্যন্ত মালাগা শাসন করেন। তাহার অপর দুইজন উত্তরাধিকারী ১০৫৮ খ্রীঃ পর্যন্ত আলজেসিরা শাসন করেন। পরবর্তীকালে মালাগা, গ্রানাডার বার্বার জিরিদ-যুবরাজ বাদিস বিন হাব্বসের অধিকারে চলিয়া যায় এবং সেভিলের আব্বাসীদরা দখল করে আলজেসিরা। ইয়াহিয়াকে সমর্থন করেন বার্বার মন্ত্রী ইবনে বাকান্নাহ এবং তাহার পিতৃব্য পুত্র হাসান ইবনে ইয়াহিয়াকে সমর্থন করেন স্লাভমন্ত্রী নাজা। হাসান মালাগা অধিকার করেন। ইবনে বাকান্নাহ ও তাহার প্রার্থী নাজার ষড়যন্ত্রের ফলে মৃত্যুমুখে পতিত হন। হাসানের পুত্রকে হত্যা করিয়া ও তাহার ভ্রাতা ইদ্রিসকে কারারুদ্ধ করিয়া নাজা জোরপূর্বক সিংহাসন দখল করেন। মুহাম্মদের নিকট হইতে আলজেসিরা দখলের জন্য অভিযানে বাহির হইলে সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম কালে স্লাভ সৈন্যদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দরুন ১০৪৩ খ্রীঃ জনৈক বার্বার সৈন্যের হস্তে নিহত হন। হাসানের ভ্রাতা ইদ্রিসকে জেল হইতে মুক্ত করিয়া রাজা বলিয়া ঘোষণা করা হয়।

দ্বিতীয় ইদ্রিস

(১০৪২-৬, ১০৫৩-৫ খ্রীঃ)

দ্বিতীয় ইদ্রিস ছিলেন দয়ালু ও দাতা। তিনি প্রতিদিন দরিদ্রদের মধ্যে ৫০০ ডুকাই (স্বর্ণমুদ্রা) বিতরণ করিতেন। তিনি বন্দীদের মুক্তিদান করেন এবং দেশ হইতে বহিস্কৃত ব্যক্তিদের দেশে প্রত্যাবর্তনের আহবান জানান। এতদ সত্ত্বেও তিনি ছিলেন দুর্বল শাসক। গ্রানাডার রাজা বাদিসের দাবীতে তিনি তাহার সুযোগ্য প্রধান মন্ত্রী মুহাম্মদকে হস্তান্তর করেন। মুহাম্মদের প্রতি বাদিস অসন্তুষ্ট ছিলেন। দ্বিতীয় ইদ্রিসের বিরুদ্ধে তাহার পিতৃব্য পুত্র মুহাম্মদ বিদ্রোহ ঘোষণা করেন ও অতি সহজে মালাগা দখল করেন এবং ১০৪৬-৭ খ্রীঃ আইরসের দুর্গে তাহাকে বন্দী করেন। মুহাম্মদ ছিলেন অতি চতুর ও ধূর্ত। তিনি শিবির-জীবন ভালবাসিতেন। জনসাধারণ দ্বিতীয় ইদ্রিসকে মুক্ত করিয়া সিংহাসনে বসাইতে চেষ্টা করে কিন্তু ব্যর্থ হইয়া তাহার আনুগত্য স্বীকার করেন। দ্বিতীয় ইদ্রিস সিউটা ও তাঞ্জিয়ারের গভর্নর সাকোত ও রিজক আল্লাহর নিকট যান এবং সেখান হইতে রোভার বার্বার নেতার নিকট পলাইয়া যান। জনগণ মালাগার মুহাম্মদের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং আলজেসিয়ার মুহাম্মদকে খলিফা বলিয়া ঘোষণা করে। কিন্তু পরবর্তী ব্যক্তি আইনের শাসন ও শৃংখলা আনয়নে ব্যর্থ হইয়া আলজেসিরায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং সেখানে ১০৪৮-৯ খ্রীঃ দেহ ত্যাগ করেন। মালাগার মুহাম্মদও কয়েক বৎসর পর ১০৫৩ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন এবং ভ্রাতুপুত্র তৃতীয় ইদ্রিস মালাগার শাসনভার গ্রহণ করেন। ইদ্রিস অতি দ্রুত আইন

শৃংখলা ফিরাইয়া আনেন এবং ১০৫৫ খ্রীস্টাব্দে তাহার মৃত্যু পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করেন। অপর একজন হাদিদ সিংহাসন অধিকার করেন। বহু সংখ্যক বার্বার ও আরবসেনা জনৈক আরব নেতা কাজী আবদুল্লা জুজামীর নেতৃত্বে বাদিস বিন হাম্বুসের সহিত যোগদান করে। বাদিস বিন হাব্দুস অতি সহজে ১০৫৭ খ্রীস্টাব্দে মালাগা অধিকার করেন এবং হাম্মুদিদের নির্বাসিত করেন।

মুসলিম শাসন আমলে মালাগা বন্দরও ব্যবসা কেন্দ্র হিসাবে বিখ্যাত ছিল। দারুল সানা নামে ইহার একটি জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্র ছিল। মালাগার প্রধান মসজিদকে পরবর্তীকালে খ্রীস্টান কর্তৃক গীর্জায় পরিবর্তিত হয়।

৩। গ্রানাডার বাজিরি রাজবংশ

(১০১২-১০৯০ খ্রীঃ)

গ্রানাডার বানুজিরি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জাওবী বিন জিরি নামে (১০১২-১৯) জনৈক বার্বার নেতা। এই রাজবংশ ১০৯০ খ্রীঃ হইতে মুরাবিতিনদের দ্বারা অধিকৃত হওয়া পর্যন্ত প্রায় আশি বৎসর স্বাধীনভাবে গ্রানাডা শাসন করেন। বার্বারদের সানহাজাহ গোত্রের শাখা ছিল জিরিড বংশ। দুইজন জিরি যুবরাজ বুলুগগিন ও আল মনসুর তাহাদের শাসনে অসন্তুষ্ট হইয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতা জাওবী বিন জিরির সহিত যোগদান করে, এবং বহু সংখ্যক বার্বারকে সঙ্গে লইয়া আফ্রিকা হইতে স্পেনে আসেন। তাহারা কর্ডোভার দ্বিতীয় আমীরের প্রধান মন্ত্রী আবদুল মালিক আল-মুজাফফরের সেনা বাহিনীতে যোগদান করে। আমীরদের দ্বারা গঠিত সেনাবাহিনীতে বার্বারগণ বিশেষ শক্তি হিসাবে পরিগণিত হয়। বানুজিরি-রাজবংশ খলিফা সুলায়মান মনসুরের নিকট হইতে জায়গীয় হিসাবে এলভিরা গ্রহণ করেন।

জাওবী

জাওবী বিন জিরি প্রথমে এলভিরা হইতে স্বাধীনভাবে রাজ্য শাসন করেন। পরে জেনিল নদীর তীরে গ্রানাডায় তাহার নতুন রাজধানী স্থাপন করেন। তিনি কর্ডোভার গৃহযুদ্ধে আলী বিন হাম্মদের পক্ষে এবং আবদুর রহমান আল মুরতাজার বিরুদ্ধে ১০১৬/১৭ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। তিনি গ্রানাডা অঞ্চলে তাহাকে পরাজিত করেন। তিনি ছিলেন ফাতেমীদের সমর্থক এবং পূর্ব-স্পেনে সফলতা লাভ করেন। কিন্তু ফাতেমী বিদ্বেষী বার্বার জানাতাহ গোত্র স্পেনের পশ্চিমে ও মধ্য আন্দালুসিয়ায় আধিপত্য বিস্তার করে। তাঁহার পূর্ব পুরুষের দেশ ইফ্রিকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জাওবী তাহার ভ্রাতুস্পুত্র আব্দুস বিন মাকসানকে গ্রানাডা শাসনের দায়িত্ব অর্পণ করিয়া ইফ্রিকিয়ায় গমন করেন। ৩০শে জুলকদর ৪০৬ হিঃ/১০ই মে ১০১৬ খ্রীঃ বাদিস বিন আল-মনসুরের মৃত্যুর পর তাহার অপ্রাপ্ত বয়স্ক পুত্র নয় বৎসরের যুবরাজ আল মুইজ কায়রোওয়ানের সিংহাসনে আরোহণ করেন। যুবক শাসকের নিকট হইতে অনুমতিপত্র লইয়া তিনি আল মুনাফকাহ (আল মুনাকার) হইতে যাত্রা করিয়া তাহার সমর্থক সানহাজাহদের জন্য উত্তম ও অধিক নিরাপদ জায়গার সন্ধানে ৪১০ হিঃ ১০১৯-২০

খ্রীস্টাব্দে উত্তর আফ্রিকায় প্রবেশ করেন। কিন্তু তাহার এই আকাঙ্ক্ষিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় না এবং তিনি কলঙ্কজনক মৃত্যু বরণ করেন।

হাব্বুস

নতুন শাসক আব্দুস বিন মাকসান নিজেকে স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করেন এবং রাজকীয় টাইটেল ‘হাজীব সাইফ-উদ-দৌলা’ খেতাব গ্রহণ করেন। তিনি রাজ প্রাসাদ, মসজিদ ও বহু অট্টালিকা নির্মাণ করিয়া রাজধানীকে সুন্দর করিয়া গড়িয়া তোলেন। এলভিয়ার প্রাচীন রাজধানী ক্যাস্টিলিয়া ১০১০ খ্রীঃ গোলযোগের ফলে বিধ্বস্ত হয়। জিরি রাজবংশের প্রথম শাসক জাওবী বিন জিরি এলভিরা দখল করিবার পর গ্রানাডায় তাহার নতুন রাজধানী স্থাপন করেন এবং তদ্বীয় পুত্র হাব্দুস সেখানে বিচারালয় স্থানান্তর করেন এবং ইহাকে আকারে বর্ধিত করেন। গ্রানাডার চতুর্দিকে প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত করা হয়। রাজকীয় প্রাসাদ (আল-কাসর) নির্মাণ করিয়া ইহাকে সৌন্দর্যমন্ডিত করা হয়। সমসাময়িক ঐতিহাসিকগণ ইহার ভূয়সী প্রশংসা করেন। হাব্দুস জায়েন ও কাবরা অধিকার করিয়া তাহার ক্ষুদ্র রাজ্যের সীমা সম্প্রসারণ করেন এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার গোত্র প্রধানদের সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন। তিনি সাধারণ জীবন যাপন করিতেন এবং রাজ্য শাসনের ভার স্যামুয়েলের উপর ন্যস্ত করিয়াছিলেন। স্যামুয়েল ছিল উচ্চ রুচিসম্পন্ন ইহুদী এবং আরবী ভাষা ও সাহিত্যে পণ্ডিত। হাব্দুস দশ বৎসর রাজ্য শাসন করেন এবং ১০৩৮ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যু বরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী স্যামুয়েল

স্যামুয়েল হা-লেভী-বেন নাগডেলা ইসমাইল বিন নাগজালাহ (৯৯৩-১০৫৭ খ্রীঃ) ছিলেন তাহার সময়কার একজন বিখ্যাত পণ্ডিত ব্যক্তি। হালুসের উজির আবুল কাসিম ইবনে আরীফের প্রাসাদের নিকটবর্তী একটি ছোট দোকানের মালিক হিসাবে তিনি তাহার জীবন শুরু করেন। স্যামুয়েলের গুণে মুগ্ধ হইয়া উজির তাহাকে তাহার সহকারী হিসাবে নিয়োগ করেন। আবুল কাসেমের মৃত্যুর পর স্যামুয়েল প্রধান মন্ত্রী নিযুক্ত হন। মুসলিম স্পেনে তিনিই প্রথম ও শেষ ইহুদী প্রধানমন্ত্রী। তাহার সুশাসনে রাজ্যে সুখ ও শান্তি বিরাজ করে এবং মুসলিম ও অমুসলিম সকলেই খুব সুখে বসবাস করে। পূর্ব স্পেন ব্যতীত সমস্ত ইহুদীগণ ১০২৭ খ্রীঃ তাহাকে রাজকীয় উপাধি নাগিদ’ দ্বারা ভূষিত করেন। তিনি ছিলেন একাধারে কবি ও দার্শনিক। তিনি হিব্রু ভাষায় তালমুদের ভূমিকা রচনা করেন এবং ব্যাকরণ বিষয়ে বাইশ খানা গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। ইহার মধ্যে “রিচেস’ (Riches) গ্রন্থটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য তাহার পাণ্ডিত্যের জন্য তিনি সুদূর পারশ্য প্যালেস্টাইন ও মিশরেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ১০৫৫ খ্রীস্টাব্দে দেহ ত্যাগ করেন। স্যামুয়েলের পর (ইসমাইল) তাহার অযোগ্য ও অপদার্থ পুত্র ইউসুফ উজির পদে অধিষ্ঠিত হন। ভাবী উত্তরাধিকারীকে তিনি বিষ প্রয়োগে হত্যা করেন এবং ইহুদী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন। তিনি কোরান শরীফের আয়াত সম্পর্কে

বিদ্রুপ করিতেন এবং ইসলাম ধর্ম মিথ্যা বলিয়া প্রকাশ্যে প্রচার করিতেন। তাহার ইসলাম বিদ্বেষ ও দমনমূলক নীতি স্বাভাবিক ভাবেই আরব ও বার্বারগণ পছন্দ করিতেন

অতঃপর এলভিরার আরব ফকিহ ও কবি আবু ইসহাক (মৃঃ ১০৬৬) জন সাধারণকে ইউসুফের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করেন। ১০৬৬ খ্রীস্টাব্দের ৩০ শে ডিসেম্বর মাসে ৩,০০০ হাজার ইহুদীসহ ইউসুফ নিহত হন।

বাদিস

ক্ষুদ্র শাসনকর্তাদের মধ্যে বাদিস ও আল মুতাদিদ ছিলেন বিশেষ বিখ্যাত। বাদিস ও আল মুতাদিদ যথাক্রমে গ্রানাডা ও সেভিলের গুরুত্বপূর্ণ সিংহাসন অলংকৃত করেন। বার্বার ও আরব এই দুই শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলশ্রুতি হিসাবে তাহারা দুইজন আত্মপ্রকাশ করেন। বাদিস রক্তে বার্বার ও জন্মগতভাবে স্পেনীয় ছিলেন। আরবী ভাষা তিনি ভাল বলিতে পারিতেন না। তিনি বার্বারদিগকে অশিক্ষিত ও অশালীন করিয়া গড়িয়া তোলেন। বাদিস ১০৩৮ খ্রীঃ তাহার পিতা হাব্বসের উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হন। তাহার দীর্ঘ ও সফল শাসন স্থায়ী হয় পঁয়ত্রিশ বৎসর (১০৩৮-১০৭৩ খ্রীঃ)। তাহার শাসনকালে স্পেনে জিরি শাসন চরম সীমায় পৌছে। গ্রানাডা ও আলমেরিয়ার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান ছিল। সেই সময় আলমেরিয়া শাসিত হইত জুহায়ের কর্তৃক। তাহার উজির ছিলেন ইবনে আব্বাস। তিনি স্যামুয়েলের চাইতে কোন ক্রমে কম উল্লেখযোগ্য ছিলেন না। রাজা এবং উজির উভয়েই সাহিত্য কর্মের প্রতি আগ্রহী ছিলেন এবং রাজকীয় লাইব্রেবির জন্য ১,০০,০০০ লক্ষ গ্রন্থ সংগ্রহ করেন। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখিবার জন্য ও আলমেরিয়ার রাজার সহিত চুক্তি রক্ষার্থে বাদিস জুহায়েরকে আহবান জানান। গ্রানাডার রাজাকে অত্যন্ত বিস্মিত করিয়া তিনি বহু সংখ্যক সৈন্যসহ আগমন করেন। তিনি কোন এক মজলিসে বাদিকে অপমান করেন এবং বাদিসের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন। বাদিসের ক্রুদ্ধ সৈন্যগণ ওৎ পাতিয়া থাকিয়া ১০৩৮ খ্রীঃ তাহাদের প্রত্যাবর্তনকালে আলপুয়েন্তের গিরিসংকটে জুবায়েরকে আক্রমণ করে। জুহায়ের বহুসংখ্যক সেনাসহ আলপুয়েন্তের গিরিপথে নিহত হন। জুবায়েরের প্রধান মন্ত্রী ইবনে আব্বাসও ধৃত হইয়া নিহত হন। আলমেরিয়া অবশ্য ভ্যালেন্সিয়ার মনসুর আল-মাগমিরি কর্তৃক আক্রান্ত হয়। বাদিসের বিরুদ্ধে তাহার আরব প্রজাগণ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। ষড়যন্ত্রকারীদের নেতা ছিলেন জনৈক আরব দুঃসাহসী আবুল ফাতহ যিনি বাগদাদে সাহিত্য, দর্শন ও জ্যোতির্বিদ্যা শিক্ষা করেন এবং তিনি ছিলেন একজন সাহসী যোদ্ধা, তিনি তাহার জন্মস্থান জুরজান ত্যাগ করিয়া ১০১৫ খ্রীস্টাব্দে স্পেনে আগমন করেন। দেনিয়া ও সারাগোসার বিচারালয়ে তিনি চাকুরী করেন এবং গ্রানাডাতে বসতি স্থাপন করেন। তিনি প্রাচীন কাব্য বিশেষ করিয়া আবু আব্বাস কর্তৃক রচিত হামাসা’র (কবিতা সংকলন) উপর বক্তৃতা দান করিতেন। তিনি বাদিসের পিতৃব্য পুত্র ইয়াজিরকে সিংহাসন দখলের জন্য অনুপ্রাণিত করেন কিন্তু এই ষড়যন্ত্র ফাঁস হইয়া যায়। ইয়াজির ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীগণ সেভিলে পলায়ন করে

কিন্তু আবুল ফাতহ ধৃত হইয়া ১০৩৯ খ্রীঃ নিহত হন। একই বৎসর বাদিস তাহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা বুলুগগীনকে হত্যা করেন যিনি ইবনে আব্বাসকে হত্যা করিতে বিলম্ব করেন। বাদিস ভ্যালেন্সিয়া ও সেভিলে সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন ও তাহাদের কিছু এলাকা দখল করেন। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক শত্রুকে দমন করিয়া তিনি মালাগার শাসক ও হামুদিদের সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করেন এবং উহাকে ১০৫৮ খ্রীঃ তাহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন।

ঐ সময় আব্বাসীদগণ সেভিলের ক্ষমতা গ্রহণ করেন এবং আলমুতাদিদ ইবনে আব্বাস জেরেজ (আঃ শারিশ) ও আরকোসকে নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। সেভিলের ক্ষমতা গ্রহণে আরবদিগকে বাধা প্রদান করেন একমাত্র গ্রানাডার বানু জিরি গোত্রের বার্বার প্রধান। আরবদের বিদ্রোহ সত্ত্বেও বাদিস তাহার সাম্রাজ্যকে অক্ষুন্ন রাখিতে সমর্থ হন। তিনি তাহার রাজধানীকে সুন্দর ও সম্প্রসারণ করেন এবং রোমানদের প্রাসাদ আলকাজাবার ধ্বংসাবশেষের উপর তিনি বিখ্যাত দারদিক আল রিহ (House of the weather Cock) প্রাসাদ নির্মাণ করেন। ইহা এখনও অক্ষত অবস্থায় আছে এবং কাসা ডে গালও বলিয়া পরিচিত। তাহার সময়ে ১০৫৫ খ্রীঃ ডাররো নদীর উপর গ্রানাডার কাজি আলী বিন মুহাম্মদ বিন তাওবাহ পুয়েন্টে ডেল কাজি নামে একটি সেতু নির্মাণ করেন। তাহার সময়ে আরও অনেক সরকারি ইমারত নির্মিত হয়। সালুকা নামে পর্বতটিকে বাদিস সুরক্ষিত করেন। পরবর্তীকালে সেখানে আলহামরা প্রাসাদ নির্মিত হয়।

বাদিসের উত্তরাধিকারীগণ

১০৭৩ খ্রীস্টাব্দে বাদিসের মৃত্যু হয়। তিনি তামিম ও আবদুল্লাহ নামে দুই প্রৌ-পুত্রকে যথাক্রমে মালাগা ও গ্রানাডা শাসনের জন্য রাখিয়া যান। খ্রীস্টানগণ এই সময় একের পর এক শহর জয় করিতে শুরু করিলে সেখানকার মুসলমানদের রক্ষা করিবার জন্য ইফ্রিকিয়া হইতে ইউসুফ বিন তাশুফিনকে আমন্ত্রণ জানান হয়। ১০৮৬ খ্রীস্টাব্দে জাল্লাকার যুদ্ধ সংঘটিত হয় যাহা পরে আলোচিত হইবে। এই যুদ্ধে ইউসুফ জয়লাভ করেন ও চতুর্থ আলফন্সে পরাজিত হন। তামিম ও আবদুল্লাহ তাহাদের সৈন্য লইয়া যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। সেই সময়কার মুসলিম রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ও অকর্মণ্য ছিলেন আবদুল্লাহ। তাহার দরবার পরিপূর্ণ ছিল শঠ ও ধূর্ত লোকদের দ্বারা। কাজী আবু জাফর তাহাকে সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণা দেন। দ্বিতীয়বার যখন ১০৯০ খ্রীস্টাব্দে ইউসুফ বিন তাশুফিন স্পেনে আগমন করিয়া গ্রানাডা অবরোধ করেন সেই সময় কাজী আবু জাফর আবদুল্লাহকে পরিত্যাগ করেন। জিরির প্রাসাদ বিধ্বস্ত হয়। আবদুল্লাহ ও তাম্মিমকে বন্দী করিয়া মরক্কোর আগামতে লইয়া যাওয়া হয়। আবদুল্লাহ ছিলেন একজন সুন্দর হস্তলিপিকার এবং তিনি কোরান শরীফ নকল করিয়া উহাকে সুসজ্জিত করেন।

৪। আলমেরিয়া, মুরসিয়া, দেনিয়া ও বেলিয়ারিক দ্বীপের ক্ষুদ্র স্লাভ

শাসকগণ (সিঃ ১০১৩-১১১৫ খ্রীঃ) দেশের দক্ষিণাংশের বার্বারদের ন্যায় দক্ষিণ-পূর্ব অংশে ও বেলিয়ারিক দ্বীপসমূহে স্লাভগণ স্বাধীন ক্ষুদ্র রাজ্য কায়েম করে। শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তাহারা উন্নতির চরমে পৌছে এবং একাদশ শতাব্দীর তৃতীয়াংশে ক্ষুদ্র বার্বার ও আরব শাসকগণ তাহাদিগকে পরাজিত করেন। তবুও তাহারা ১১১৫ খ্রীস্টাব্দে পর্যন্ত বেলিয়ারিক দ্বীপসমূহে তাহাদের শাসন বজায় রাখেন। এই সমস্ত ক্ষুদ্র স্লাভ শাসকদের মধ্যে আলমেরিয়ার খায়রান (মৃত্যু হিঃ ৪১৯/১০২৮ খ্রীঃ) মুরসিয়ার জুবায়ের (মৃত্যু হিঃ ৪২৯-১০৩৮ খ্রীঃ) দেনিয়া ও বেলিয়ারিক দ্বীপসমূহের মুজাহিদ মৃত্যু হিঃ ৪৩৬-১০৪৫ খ্রীঃ) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইহাদের মধ্যে মুহিদ ছিলেন সবচেয়ে ক্ষমতাশালী। খায়রানের সহিত তিনি কর্ডোভার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন এবং চতুর্থ আবদুর রহমানের শাসনকাল পর্যন্ত কার্ডোভাতে উমাইয়া শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। স্লাভ শাসকগণ অধিকাংশ সময় নিজেদের কর্মদ্যোগ ও সামরিক শক্তিকে খ্রীস্টান শাসকদের সহযোগিতায় নিজ সম্প্রদায় ও প্রতিবেশীদের ধ্বংস করিবার কাজে ব্যয় করেন। শাসক হিসাবে স্লাভগণ খুবই দুর্বল ছিলেন। আলমেরিয়া, মুরসিয়া ও ভ্যালেন্সিয়া তাহাদের রাজ্যের অংশ হইলেও ইহা কখনও বিরাট সাম্রাজ্যের রূপ পরিগ্রহ করে নাই।

৫। সারাগোসার বানুহুদ

(১০১০-১১১৮ খ্রীঃ)

স্পেন বিজয়ের পর অনাবাদী জমি ও দেশের উত্তরাংশের পার্বত্য অঞ্চল বার্বারদিগকে জায়গীর হিসাবে প্রদান করা হয়। ইহাতে খ্রীস্টান লুণ্ঠনকারীগণ এই অঞ্চল আক্রমণ করিতে শুরু করে। তাজিবী বার্বারগণের নেতা মুহম্মদ বিন হাশিম বিন আবদুর রহমান আল তাজিবী তৃতীয় আবদুর রহমান কর্তৃক আরাগণ প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত হন। অপরদিকে তাহার উত্তরাধিকারীগণ সারাগোসা প্রদেশ শাসন করেন। উমাইয়া সাম্রাজ্য পতনের সময় মুহাম্মদ হাশিমের জনৈক পৌত্র মুতরিক আপার মার্চ (এবরো নদীর উপত্যকা) শাসন করিতেন। তাহার পুত্র মুনজির নিজেকে স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করেন এবং বার্সিলোনা ও ক্যাস্টাইলের খ্রীস্টান সর্দারদের সহিত মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন। তিনি তাহার মৃত্যু পর্যন্ত (১০২৩ খ্রীঃ) সফলতার সহিত রাজ্য শাসন করেন ফলে সারাগোসা সমৃদ্ধশালী হইয়া ওঠে। তাহাদের পুত্র ও পৌত্র শাসক হিসাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেন। তাহার পুত্র ইয়াহিয়া ১০২৯ খ্রীঃ মৃত্যুবরণ করেন ও পৌত্র দ্বিতীয় মুনজির ১০৩৯ খ্রীঃ গৃহযুদ্ধে নিহত হন। তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল্লাকে লেরিদার গভর্নর পরাভূত করেন। আবু আইয়ুব বিন মুহাম্মদ বিন হুদা সুলায়মান সারাগোসার শাসন ক্ষমতা দখল করিয়াছিলেন, তিনি আল মুস্তাইন’ উপাধি ধারণ করেন এবং একটি রাজবংশের প্রতিষ্ঠা হয়। তাহারা ১১২৮ খ্রঃ পর্যন্ত সারাগোসা, লেরিদা, কালতাইউদ ও টুডেলা শাসন করেন।

এই বংশ হুদের নামানুসারে বানু হদ রাজবংশ নামে খ্যাত। বানু হুদ মূলতঃ একজন আরব ছিলেন। তিনি স্পেন বিজয়ের সময় সেখানে আগমন করেন। তাহার পূর্ব পুরুষ সাকিম ছিলেন রসূলের সাহাবী আবু হুযাইফার মুক্ত দাস। আবু আইয়ুব সুলায়মান তাহার পুত্রগণকে বিভিন্ন শহরে গভর্নর নিযুক্ত করেন। তিনি এবং তাহার পুত্রগণ পার্শ্ববর্তী খ্রীস্টানদের সহায়তায় সারাগোসার ক্ষুদ্র রাজ্যটি স্বাধীনভাবে শাসন করেন। দুর্ভাগ্যবশতঃ আমরা এই বংশের শাসকদের সম্পর্কে খুব সামান্যই ঐতিহাসিক বিবরণ পাইয়াছি। তাহাদের শাসনকাল সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ও বিতর্কমূলক বিবরণ পাওয়া যায়।

তাহার পুত্র আহাম্মদ আল মুক্তাদির আল-দৌলা তাহার মৃত্যুর পর ১০৪৬ খ্রীঃ সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি পঁয়ত্রিশ বৎসর রাজ্য শাসনের পর ১০৮১ খ্রীস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তিনি ছিলেন একজন সুযোগ্য শাসক, তিনি দার-আল সরুর (আনন্দ ভবন) সহ বহু সরকারি ইমারত নির্মাণ করেন। তাহার প্রৌপুত্র আহমদ আল মুস্তাইন ভালতিয়েরার যুদ্ধে খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। এই যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন এবং ১১১০ খ্রীস্টাব্দে নিহত হন। রামিরোর নেতৃত্বে ১১১৮ খ্রীস্টাব্দে খ্রীস্টানদের দ্বারা সারাগোসা অধিকৃত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাহার পুত্র আবদুল মালিক ইমাদ উদ-দৌলা শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

তাহাদের শাসন আমলে শিল্পকলা ও স্থাপত্য বিদ্যার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। অদ্যাবধি বিদ্যমান সারাগোসায় আল-জাফরিয়া প্রাসাদসহ বহু অট্টালিকা নির্মিত হয়। তাইফাসের প্রাচীন অট্টালিকার কয়েকটি ব্যতীত সবগুলিই কালের গহবরে বিলীন হইয়া গিয়াছে। ইহাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য হইল আল-জাফরিয়ার মসজিদ। সারাগোসার এই মসজিদটি নির্মাণ করেন আমীর জাফর। ইহার প্রবেশ দ্বারসমূহ এখনও বিদ্যমান আছে। আল-জাফরিয়া প্রাসাদ প্রচুর সুখ্যাতি অর্জন করে। সমসাময়িক কালের ঐতিহাসিকগণ ইহাকে ‘আনন্দ মহল’ বলিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। বানু শাসক আল মুক্তাদির উমাইয়াদের অনুকরণে উহাকে নির্মাণ করেন। বিশেষ করিয়া দ্বিতীয় হাকামের নয়নাভিরাম (Sumptuous) শিল্পশৈলীর অনুসরণে এই প্রাসাদের নির্মাণ শৈলীর প্রশংসা করিয়া তিনি একটি কবিতা রচনা করেন। অবশ্য ইহাতে উমাইয়াদের তুলনায় নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহৃত হয় কিন্তু ইহাকে খুবই সুনিপুণভাবে সুসজ্জিত করা

৬। টলেডোর বানু জুন রাজবংশ

(১০৩৫-১০৮৫ খ্রীঃ)।

বানু জুন্নন বার্বারদের হাওয়ারা শাখার অন্তর্গত। তাহারা টলেডো ক্যাস্টাইলের খ্রীস্টানদের দ্বারা অধিকৃত হওয়ার সময় পর্যন্ত প্রায় পঞ্চাশ বৎসর শাসন করেন। বানু

জুনুনরা মুসলিম শাসনের প্রথম দিকে স্পেনে আগমন করে। তাহারা দাঙ্গাহাঙ্গামা প্রিয় ছিল। প্রথম মুহাম্মদ ও আবদ-আল্লাহর শাসন আমলে টলেডোর উত্তর-পূর্বে গোয়াদিয়ানা নদীর তীরে অবস্থিত শান্তাবারিয়াতে তাহারা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। হাজীব আল-মনসুরের শাসন কালে তাহারা সেনা বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিল। উমাইয়াদের পতনের পর টলেডোর অধিবাসীগণ বানু জনকে তাহাদের শাসন করিবার জন্য আহবান জানান। আবদুর রহমান বিন আমীর বিন মুজাররিফ বিন জুনুন শান্তাবারিয়ার শাসক তাহার পুত্র ইসমাইলকে ১০৩৫ খ্রীস্টাব্দে টলেডোতে প্রেরণ করেন। ইয়াইশ বিন মুহাম্মদ বিন ইয়াইশ যিনি টলেডোর স্বাধীন শাসক হিসাবে নিজেকে ঘোষণা করেন, ইসমাইল বিরোধীতা করেন এবং ইবনে মুয়ারিককে পরাভূত করিয়া ইসমাইল টলেডো দখল করেন এবং ‘আল জাফীর’ উপাধি ধারণ করেন। টলেডোর আবু বকর বিন আল হাদিদীকে তাহার উজির নিযুক্ত করেন। তিনি ১০৪৩/৪ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। ইয়াহিয়া বিন আল-মামুন বিন ইসমাইলঃ ইসমাইলের পুত্র ইয়াহিয়া আলমামুন’ উপাধি ধারণ পূর্বক তাহার স্থলাভিষিক্ত হন। তাহার বংশের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত এবং তিনি সুদীর্ঘ বত্রিশ বৎসর (১০৪৩-১০৭৫ খ্রীঃ) সাফল্যের সহিত রাজ্য শাসন করেন। তাহার শাসনের প্রথম দিকে তিনি গোয়াদালাজারার ওয়াদী আল হাজারার (Wadi-al-Hajara) অধিকার লইয়া সারাগোসার সুলায়মান বিন হুদের সহিত বিরোধে লিপ্ত হন। মামুন পরাজিত হইয়া তালাভেরায় যাইতে বাধ্য হন এবং ক্যাস্টাইল ও লিওনের রাজা প্রথম ফর্ডিনান্ডের সহিত মৈত্রীচুক্তি সম্পাদন করিয়া তাহার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন। মামুন খ্রীস্টানদিগকে সেনাবাহিনীতে গ্রহণ করিয়া প্রতিবেশী মুসলিম রাজ্য দখল করেন।

খ্রীস্টানগণ ভ্যালেন্সিয়া আক্রমণ করিলে তিনি আবদুল মালিক আল মুজাফফরের সাহায্যে অগ্রসর হন এবং ১০৬৫ খ্রীঃ খ্রীস্টানদিগকে তাড়াইয়া দিয়া নিজেই শহর অধিকার করেন। তিনি বাদাজোজের আফতাসিদ শাসক মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-মুজাফফরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন এবং মুরসিয়া ও অন্যান্য পাশ্ববর্তী দেশসমূহ অধিকার করেন। এমন কি কর্ডোভা নগরী পর্যন্ত তিনি আক্রমণ চালান। আবদুল মালিক বিন জাহওয়ার কর্ডোভার শাসক মুতামিদের সাহায্যে এই আক্রমণ প্রতিহত করেন। কর্ডোভাবাসীদের নেতা ইবনে উক্কাশা কর্ডোভার নব নিযুক্ত ভাইসরয়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। তিনি মুতামিদের ভাবী উত্তরাধিকারী ছিলেন এবং টলেডোর রাজা মামুনের নিকট কর্ডোভা হস্তান্তর করেন কিন্তু মামুন ইবনে উক্কাশার বিশ্বাসঘাতকতা স্মরণ করিয়া তাহাকে মোটেই বিশ্বাস করেন না। ইবনে উক্কাশা মামুনের শত্রুতা জানিতে পারিয়া ১০৭৫ খ্রীঃ জুন মাসে তাহাকে বিষ প্রয়োগ করেন। মুতামিদ এই বিভ্রান্তিকর অবস্থার সুযোগ লইয়া কর্ডোভা আক্রমণ করেন এবং ইবনে উক্কাশাকে হত্যা করিয়া শহর

অধিকার করেন এবং ওয়াদী আল-কবীরের উপত্যকাসহ টলেডো রাজ্যের আরও কিছু অংশ অধিকার করেন। মুসলিম প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করিবার জন্য ক্যাস্টাইল ও লিওনের খ্রীস্টানদের সহিত মৈত্রীসূত্রে আবদ্ধ হন এবং ষষ্ঠ আলফন্সেকে (১০৬৫-১১০৯ খ্রীঃ) তাহার প্রাসাদে আমন্ত্রণ করেন। তাহার রাজত্বকালে দেশের মধ্যে শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করে।

ইয়াহিয়া আল কাদির

“আল কাদির” উপাধি ধারণ করিয়া মামুনের প্রৌপুত্র দুর্বল ইয়াহিয়া মামুনের পরে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাহার দুর্বলতার কারণেই রাজ্যের ধ্বংস সাধিত হয়। তিনি নিজে ষষ্ঠ আলফন্সের সহিত মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হন। তিনি তাহার রক্ষাণাবেক্ষণের প্রতিদানে অধিক পরিমাণে অর্থ দাবী করেন। খ্রীস্টানদিগকে অর্থ দেওয়ার জন্য তিনি তাহার গরীব প্রজাদের নিকট হইতে অধিক পরিমাণে কর আদায় করিতে শুরু করেন। ইহার প্রতিবাদ করিলে তিনি বহু বিশিষ্ট নাগরিক এমন কি উজির আল-হাদিদীকে পর্যন্ত হত্যা করেন। অসন্তুষ্ট জনগণ বিদ্রোহ ঘোষণা করে। শহর হইতে আল কাদির বিতাড়িত হইয়া বাদাজোজের শাসক মুতাওয়াক্কিলকে সিংহাসন অধিকারের জন্য আহবান জানান। অসহায় কাদির ষষ্ঠ আলফন্সের সাহায্য প্রার্থনা করেন। তিনি দীর্ঘ সাত বৎসর অবরোধের পর ১০৮৫ খ্রীঃ টলেডো অধিকার করেন। কাদির তাহার মিত্রদের দ্বারা অপসারিত হন এবং তাহার মৃত্যুকাল (১০৯২ খ্রীঃ) পর্যন্ত ভ্যালেন্সিয়াতে অবশিষ্ট জীবন যাপন করেন।

টলেডো পতনের ফল ও প্রভাব ছিল বহুবিধ। এই সুরক্ষিত নগরীর পতনের সাথে সাথে নিম্ন ও মধ্য মার্চের বিস্তৃত অঞ্চল চিরদিনের জন্য খ্রীস্টানদের করতলগত হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের খ্রীস্টান শাসকগণ উমাইয়া সাম্রাজ্যের বিশৃঙ্খলার সুযোেগ লইয়া কর গ্রহীতা ক্ষুদ্র মুসলিম শাসকদের কর দেওয়ার পরিবর্তে তাহাদের নিকট হইতে কর গ্রহণ করিতে শুরু করে। টলেডো অধিকারের ফলে দেশের দক্ষিণাংশে মুসলমানগণ অরক্ষিত বোধ করে। কেননা এখান হইতেই মুসলমান শাসকগণ খ্রীস্টান রাজ্যে অভিযান পরিচালনা করিতেন। এখন সম্পূর্ণ বিপরীত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। খ্রীস্টান শাসকগণ দেশের দক্ষিণাংশে মুসলিম এলাকায় এখান হইতে অভিযান চালাইয়া সন্ত্রাসের রাজ্য কায়েম করে।১১

৭। সেডিলের বানু আব্বাস রাজবংশ

(১০২৩-৯১ খ্রীঃ)

কর্ডোভার উমাইয়া খিলাফতের পতনের পর যে সমস্ত রাজবংশের উদ্ভব হয় তাহাদের মধ্যে আরব বংশোদ্ভূত সেভিলের রাজবংশের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।১২

আব্বাসীগণ আল-হীরার পুরাতন লাখমী রাজবংশের অন্তর্গত বলিয়া দাবী করিত। প্রকৃত পক্ষে তাহারা ইয়ামানের লাখমী গোত্রের লোক ছিল। তাহাদের পূর্বপুরুষ ইতাফ বিন নুয়াইম হিমসের (ইমেসা, সিরিয়া ও মিশরের সীমান্তবর্তী শহর) জিলা শহর আরীশ

হইতে বালজ ইবনে বিশরের সহিত স্পেনে আগমন করেন। তিনি গোয়াদালকুইভির নদীর তীরে অবস্থিত ইয়ামিন নামক পল্লীতে বসতি স্থাপন করেন।

প্রথম আবুল কাসেম মুহাম্মদ

আব্বাসের প্রৌপুত্র ইসমাইলের পুত্র প্রথম আবুল কাশেম মুহাম্মদ (১০২৩ খ্রীঃ) এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। আবুল কাসেম ছিলেন একজন সুদক্ষ সৈনিক ও বিজ্ঞ বিচারক। তিনি সেভিলের কাজি ছিলেন। তিনি এতই জনপ্রিয় ছিলেন যে, শহরের প্রশাসনিক দায়িত্বও তাঁহার উপর ন্যস্ত হয়। তিনি একটি জনপ্রিয় সরকার গঠন করেন। তাঁহার প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন তাঁহার সমর্থক মুহাম্মদ বিন ইয়ারিম হাওজানী ইবনে হাজ্জাজ ও দ্বিতীয় হিশামের গৃহশিক্ষক আবু বকর জুবাইদী। তিনি আরব, বার্বার ও স্লাভগণের সমন্বয়ে গঠিত সেনাবাহিনী দ্বারা দুই ভাই নামে পরিচিত খ্রীস্টানদের শক্তিশালী দুর্গ (আঃ আল আখওয়ান, স্পেনঃ আলফোয়েন্স) অধিকার করেন। বন্দী খ্রীস্টানদিগকে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়। মালাগার শাসক ইয়াহিয়া বিন আলী (১০২৭ খ্রীঃ) সেভিল আক্রমণ করেন। সেই সময় তাহার পুত্র আব্বাসকে জামিন হিসাবে রাখিয়া আবুল কাসেম তাহার রাজ্যকে রক্ষা করেন। ইহার ফলে তাহার এই ত্যাগ তাহাকে জনপ্রিয় করিয়া তোলে। জুবাইদীসহ তিনি তাহার চারিজন সমর্থককে অপসারিত করেন। জুবাইদী কায়রোওয়ান হইতে আলমেরিয়াতে আগমন করিয়াছিলেন, তাহাকে কায়রোওয়ানেই নির্বাসিত করা হয় এবং সেখানে তিনি কাজি পদ গ্রহণ করেন। আবুল কাসিম বেজা ও বাদাজোজ এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা দখল করেন এবং এমনকি কর্ডোভার প্রেসিডেন্ট জাহওয়ারকে পর্যন্ত হুমকি প্রদান করেন। ১০৩০ খ্রীঃ তিনি বাদাজোজের আফতাসিদ শাসক মুহাম্মদকে মুক্তি প্রদান করেন যাহাকে পূর্বে বন্দী করা হইয়াছিল। চারি বৎসর পর ১০৩৪ খ্রীস্টাব্দে আবুল কাসিমের পুত্র ইসমাইল লিওন আক্রমণ করিবার জন্য গিরিপথ অতিক্রম করার সময় বাদাজোজের আফতাসিদগণ তাহাদের নেতা আবদুল্লাহর নেতৃত্বে তাহাকে আক্রমণ করে। ইসমাইল অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচিয়া যান।

এই সময়ে ১০৩৪ খ্রঃ মালাগার ইয়াহিয়া তাহার ক্ষমতা ও শক্তির এত উন্নয়ন করেন যে, তিনি বার্বার দলপতিদের নেতা হিসাবে পরিগণিত হন। কর্ডোভা ও সেভিলের অস্তিত্বকে তিনি বিপন্ন করিয়া তোলেন। এই বিপদকে মোকাবিলা করিবার জন্য আরব ও স্লাভগণ তাহাদের বিরোধকে ভুলিয়া যায়। গ্রোত্রপ্রধানের শাসনে অতিষ্ঠ জনগণকে একত্রিত করিবার জন্য এবং উমাইয়া শাসনের প্রতি অনুগত জনগণকে একত্রিত করিবার জন্য আবুল কাসিম দ্বিতীয় হিশাম নামের ছদ্মাবরণে জনৈক ব্যক্তিকে সংগ্রহ করেন। প্রকৃত পক্ষে এই ব্যক্তি ছিলেন খালাফ, কালাতারাভার মাদুর প্রস্তুতকারক। দ্বিতীয় হিশামের সহিত খালাফের যথেষ্ট সাদৃশ্য ছিলো ফলে জনগণ বিনাদ্বিধায় তাহাকে দ্বিতীয় হিশাম বলিয়া গ্রহণ করেন। এই সকল খলিফার সাহায্যে

আবুল কাসিম হাজীব হিসাবে আরব ও স্লাভ প্রভুদেরকে খলিফার পক্ষে অস্ত্র ধারণ করিতে অনুরোধ করেন। আরব নেতাগণ দ্বিতীয় হিশামের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে এবং এইরূপে কাসেম প্রতিবেশী দেশসমূহে তাহার প্রাধান্য কায়েম করেন। আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ারও ১০৩৫ খ্রীঃ নভেম্বর মাসে আত্মসমর্পণ করেন। ইসমাইল আরব ও স্লাভদের সম্মিলিত বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করেন এবং বার্বারদের শ্রদ্ধেয় নেতা মালাগার ইয়াহিয়াকে আক্রমণ করিয়া পরাজিত ও হত্যা করেন এবং কারমোনা অধিকার করেন। পরে তিনি আলমেরিয়ার শ্লাভ নেতা জুহায়েরকে আক্রমণ করিবার জন্য অগ্রসর হন। কারণ তিনি দ্বিতীয় হিশামের নিকট আত্মসমর্পণ করিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। সেভিলের অধিবাসীদের চাপে পড়িয়া জুবায়ের গ্রানাডার করদাতা বাসিন্দাদের সহিত মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হন। গ্রানাডার নেতা ও বিদ্বান ব্যক্তি জনৈক আবুল ফাতাহর ও বাদিসের পিতৃব্য পুত্র ইয়াহিয়ার সহযোগিতায় আবুল কাশেম গ্রানাডায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করেন কিন্তু ষড়যন্ত্র প্রকাশ হইয়া পড়িলে ১০৩৯ খ্রীস্টাব্দে আবুল ফাতাহ নিহত হন।

১০৪২ খ্রীস্টাব্দে প্রথম আবুল কাসিম মুহাম্মদ বিশ বৎসর রাজ্য শাসনের পর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সেভিলে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে লাঞ্ছিত ও অবহেলিত আরবগণ আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিল।

আবু আমর আব্বাস আল মতাদিদ

ছদ্মবেশী দ্বিতীয় হিশামের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আবুল কাসিমের স্থলাভিষিক্ত হন ছাব্বিশ বৎসর বয়স্ক তাহার পুত্র আবু আমর আব্বাস। আব্বাস “হাজীব” উপাধি গ্রহণ করেন এবং কিছুদিন পর আলমুতাদিদ বিল্লাহ উপনাম ধারণ করেন। তিনি ছিলেন বিরোধী দলের নেতা বাদিসের উপযুক্ত প্রতিপক্ষ। আল মুতাদিদ নিজে সমস্ত অভিযান পরিচালনা করিতেন। তিনি ছিলেন বিখ্যাত কবি। শিল্পকলা ও সাহিত্যের অনুরাগী এবং পিতার ন্যায় সুদক্ষ প্রশাসক। কিন্তু তিনি অতিরিক্ত মাসক্ত ও যাদুতে বিশ্বাসী ছিলেন। কথিত আছে তিনি শক্রর মাথার খুলিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির নামাঙ্কিত করিয়া ও তাহাদের অপরাধের বিষয়বস্তু লিখিয়া সুরাপাত্র হিসাবে ব্যবহার করিতে আনন্দ অনুভব করিতেন। ইহাও কথিত আছে যে আলমুতাদিদ শত্রুর মাথার খুলিতে ফুলগাছ রোপণ করতে ভালবাসিতেন। এইগুলিকে তাহার প্রাসাদের ছাদে ফুলদানী রূপে সাজাইয়া রাখিতেন। তিনি তাহার হেরেমে আটশত যুবতী ক্রীতদাসীকে রক্ষিতা হিসাবে রাখিয়া ছিলেন। তিনি ছিলেন কর্মঠ, নির্দয় ও দুর্দান্ত প্রকৃতির। তিনি হাজীব আল-মনসুরের ন্যায় নিজ পুত্র ইসমাইলের দেশদ্রোহীতার খবর পাইয়া ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে তাহাকে হত্যা করিয়া প্রজাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেন। আল মুতাদিদ তাহার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সুসংগঠিত গোয়েন্দা বাহিনী চালু করেন। তাহার ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে তিনি বার্বারদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন

এবং তাহার সাম্রাজ্যকে বার্বার রাজবংশের বানু বিরজাল, কারমুনা ও ইহার পার্শ্ববর্তী এলাকা পর্যন্ত সম্প্রসারণ করেন। তিনি মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে তাহার পিতা কর্তৃক অনুসৃত নীতি বজায় রাখেন। আবদুল্লাহ অতর্কিত ভাবে আক্রান্ত হন এবং ১০৪২ খ্রীস্টাব্দে নিহত হন।

পশ্চিম আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত তাহার রাজ্য সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে তিনি মেরতোলার বার্বার নেতা ইবনে তাইফুর ও তাহার মিত্র নিয়েবলার আরব নেতা মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া আল ইয়াহসুরীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং ১০৪৪ খ্রীঃ মেরতোলা জোরপূর্বক দখল করেন। পরবর্তী সুযোগে তিনি নিয়েবলার নেতা মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়া যিনি গ্রানাডার বাদিস, মালাগার মুহাম্মদ ও আলজেসিরার অপর মুহাম্মদ এবং বাদাজোজের মুজাফফর প্রভৃতি বার্বারদের দ্বারা গঠিত সম্মিলিত বাহিনীর সহিত মৈত্রী বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছিলেন, তাহাকে পরাজিত করেন। শেষোক্ত ব্যক্তি মুহাম্মদ বিন ইয়াহিয়ার সাহায্যে অগ্রসর হন। এবং মুতাদিদকে বিতাড়িত করেন। আবুল হাজম ইবনে জাহওয়ারের পুত্র আবুল ওয়ালিদ ১০৪৩ খ্রীঃ তাহার পিতার স্থলাভিষিক্ত হন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী আরব ও বার্বারদিগকে একত্রিত করিতে ব্যর্থ হন। বার্বারদের সম্মিলিত বাহিনী সেভিল আক্রমণ করিতে অগ্রসর হয় কিন্তু মুতাদিদ কর্তৃক বাধাপ্রাপ্ত হন। তাহার বাদাজোজ আক্রমণ ব্যর্থ হয়। মুতাদিদ নিয়েবলার ইবনে ইয়াহিয়াকে পরাজিত করেন। স্বপক্ষত্যাগীদের শাস্তি প্রদানের উদ্দেশ্যে মুজাফফর কিছুদিন পর তাহাকে আক্রমণ করেন। ইবনে ইয়াহিয়াকে সাহায্যের উদ্দেশ্যে মুতাদিদ অগ্রসর হন এবং বাদাজোজের সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। তিনি তাহার পুত্র ইসমাইলকে প্রেরণ করেন বেজার উত্তরে অবস্থিত এভোরা আক্রমণ করিবার জন্য। উহার শাসক মুজাফফর পরাজিত হন এবং তাহার ৩,০০০ সৈন্যসহ কারমোনার যুবরাজ যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়। কার্ডোভার আবুল ওয়ালিদের মধ্যস্থতায় ১০৫১ খ্রীঃ জুলাই মাসে মুজাফফর ও মুতাদিদ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করেন। মুতাদিদ অনতিকাল বিলম্বে নিয়েবলা আক্রমণ করেন এবং বাধা ব্যতীতই ইহার পতন ঘটে। হুয়েলভা ও সল্টেস ক্ষুদ্রদ্বীপের বাকরীট শাসক আবদুল আজিজও আত্মসমর্পণ করিয়া রাজ্যের কর্তৃত্ব মুতাদিদের হাতে ছাড়িয়া দিয়া কর্ডোভায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে মুতাদিদ তাহার তেরো বৎসর বয়স্ক যুবক পুত্রকে সিলভেস আক্রমণের জন্য প্রেরণ করেন। বনি মুজাইনাহ গোত্রের আরব নেতা প্রবলভাবে বাধা প্রদান করেন। ১০৫১-২ খ্রীঃ দুর্গ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং ইহার নেতা পরাভূত হয়। যুবরাজ মুহাম্মদ অতঃপর সান্তামেরিয়া ডে আলগারভের১৩ ও উহার শাসক মুহাম্মদ বিন সাইদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন। দীর্ঘ সময় বাধা প্রদানে সক্ষম না হওয়ায় আব্বাসীদের হাতে শহরের পতন ঘটে। ১০৫৫ খ্রীঃ মুতাদিদ তাহার পুত্র মুহাম্মদকে সিলভেস ও সান্তামেরিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করেন।

পশ্চিমে তাহার রাজ্য সম্প্রসারণের পর মুতাদিদ বার্বার যুবরাজদের অধিকৃত দেশের দক্ষিণ অঞ্চলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। তাহাদের অধিকাংশ তাহার সার্বভৌমত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করিয়া নেন। তিনি মরোনা ও রোন্ডা আকস্মিকভাবে পরিদর্শন করেন এবং সাদরে গৃহীত হন। যখন তিনি দ্রিামগ্ন ছিলেন বার্বার নেতাগণ তাহাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। রোন্ডার নেতার জনৈক আত্মীয় মুয়াদ ইবনে আবি কোরবার মনে আত্মীয়তাবোধ জাগ্রত হয় ও তিনি রক্ষা পান। মুতাদিদ দেশে ফিরিয়া রোন্ডা ও মরোনার নেতাদ্বয়ের জন্য উপঢৌকন প্রেরণ করেন। রোন্ডা, মরোনা ও জেরেজের মোট ষাট জন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ১০৫৩ খ্রীঃ আমন্ত্রণ জানান এবং তাহার জীবন রক্ষাকারী মুয়াদকে ব্যতীত সফলকেই হত্যা করা হয়। মুয়াদকে একটি অট্টালিকা ও ১২০০০ হাজার ডুকাট দান করেন। পরবর্তীকালে তিনি সেভিলের সেনাবাহিনীর নেতৃতুদান করেন। মুতাদিদ মরোনা, আরকোস, জেরেজ, রোন্ডা ও অন্যান্য শহর আরব সেনাদের সাহায্যে জয় করেন।

আরব নেতা মুতাদিদ যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী বার্বার নেতা বাদিস তখন শক্তি সঞ্চয়ে আত্মনিয়োগ করেন। শেষোক্ত ব্যক্তি সমস্ত আরব প্রজাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে কিন্তু তিনি চাপে পড়িয়া অতি কষ্টে এই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন হইতে বিরত থাকেন। বাদিস তাহার সমর্থক ও মরোনা, আরকোস, জেরেজ এবং রোভা হইতে আগত রিফিউজিদের অস্ত্রে সুসজ্জিত করিয়া সেভিলে অনুপ্রবেশ করেন। সেভিলের অধিবাসীগণ সর্বশক্তি দিয়া আক্রমণ প্রতিহত করে ফলে অনুপ্রবেশকারীগণ ছত্রভঙ্গ হইয়া যায় এবং বার্বার রিফিউজিগণ বিতাড়িত হইয়া ব্রিাল্টার প্রণালী অতিক্রম করিয়া আফ্রিকায় পৌছে। সেখানে দুর্ভিক্ষে তাহারা সপরিবারে ধ্বংস হয়। অবশেষে মুতাদিদ (১০৫৮ খ্রীঃ) আলজেসিরার হাম্মুদি বংশোদ্ভূত কাসিমকে আক্রমণ করেন। কাসিম পরাজিত হইয়া কর্ডোভায় আশ্রয় গ্রহণ করিতে বাধ্য হন। দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চলের অভিযান সম্পূর্ণ করিবার পর যে নকল দ্বিতীয় হিশামের পক্ষে তিনি রাজ্য শাসন করতেছিলেন ১০৫৮ খ্রীঃ তাহাকে অপসারণ করেন এবং তিনি স্পেনের আমীর বলিয়া নিজেকে ঘোষণা করেন এবং প্রাচীন রাজধানী কর্ডোভা অবরোধের দৃঢ় আশা পোষণ করেন। পূর্বেই তাহার সেনাবাহিনী কয়েক বার কর্ডোভা আক্রমণ করে। ১০৬৩ খ্রীঃ তিনি তাহার পুত্র ইসমাইলকে অধ্ব ধ্বংসপ্রাপ্ত আল-জাহরা শহরকে অধিকার করিতে আদেশ করেন। এই জন্য শক্তিশালী সেনাবাহিনীর প্রয়োজন ছিল। কেননা তিনি এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন যে কর্ডোভাবাসীদের সাহায্যে বাদিসগণ আগমন করিবে। অতিরিক্ত সেনা চাহিয়া ব্যর্থ হইলে মালাগার দুঃসাহসী আবু আবদুল্লাহর কুপরামর্শে আলজেসিরার ইসমাইল নিজেকে স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করিতে চেষ্টা করেন। তিনি ব্যর্থ হইয়া আত্মসমর্পণ করেন ও কারারুদ্ধ হন। বিজিলিয়ানী নেতাসহ তাহার

সমর্থকগণ নিহত হয়। একই পরিণতির ভয়ে ইসমাইল পলাইতে চেষ্টা করেন কিন্তু ধুত হইয়া মুতাদিদ কর্তৃক নিহত হন। বাদিসের অধীনে মালাগার অসন্তুষ্ট আরবগণ মুতাদিদের সহিত মিলিয়া বাদিসের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেন। নির্দিষ্ট দিনে মালগায় ও অপর পঁচিশটি শহর ও দুর্গে সাধারণ বিদ্রোহ দেখা দেয়। যুবরাজ আবুল কাসিম মুহাম্মদের নেতৃত্বে সেভিলের আব্বাসীগণ বিদ্রোহীদের সাহায্যে আগাইয়া আসেন। অতর্কিত আক্রমণে বার্বারগণ পরাজিত হয়। মালাগার ক্ষুদ্র রাজ্য যুবরাজের হস্তগত হয়। কিন্তু শাক্তিশালী দুর্গের পাহারায় নিযুক্ত নিগ্রোবাহিনী বাদিসের উদ্ধার কার্যে আসা পর্যন্ত তাহারা বাধা প্রদান করে। তিনি নিরস্ত্র সেভিলের অধিবাসীদের ধরেন এবং তাহাদের অনেকেই মাতাল অবস্থায় ছিল ফলে তাহাদিগকে চরমভাবে পরাজিত করিতে সমর্থ হন। আবুল কাসিম মুহাম্মদ রোন্ডাতে আত্মগোপন করেন। তাহার সাহসহীনতা ও অকর্মণ্যতার দরুন মুতাদিদ তাহার প্রতি বিরক্ত হন। কিন্তু হৃদয়বিদারক পণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষায় ক্ষমাপ্রার্থনা পত্র পাইয়া তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেন।

খ্রীস্টান অভিযানসমূহ

একাদশ শতাব্দীর প্রথমাংশে খ্রীস্টানগণ গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। ১০৫৫ খ্রীঃ ক্যাস্টাইল ও লিওনের রাজা প্রথম ফার্নান্ডো মুসলমানদের বিরুদ্ধে আক্রমণ পরিচালনা করেন। তিনি ১০৫৭ খ্রীস্টাব্দে আমীর মুজাফফরের নিকট হইতে বাদাজোজ, সারাগোসার রাজার নিকট হইতে ডুরোর দক্ষিণে অবিস্থত দুর্গসমূহ জবর দখল করেন এবং টলেডোর ধ্বংস সাধন করিয়া আলকালা ডে হেনারেস আগমন করেন। টলেডোর রাজা মামুন শত্রুকে প্রতিহত করিবার পরিবর্তে বাদাজোজ ও সারাগোসার শাসকদের অনুকরণ করেন। এবং তাহার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করিয়া নেন। ১০৬৩ খ্রীঃ ফার্নান্ডো সেভিলের এলাকার উপর অভিযান পরিচালনা করেন। যদিও আন্দালুসীয় মুসলিম শাসকদের মধ্যে মুতাদিদের শ্রেষ্ঠত্ব ছিল প্রশ্নাতীত তথাপি তিনি খ্রীস্টান শক্তির মোকাবিলা করিতে সমর্থন হন নাই।

মুতাদিদ বাৎসরিক কর প্রদান ও সেন্ট যুষ্টার মৃতদেহ ফার্নান্ডোর প্রতিনিধির নিকট হস্তান্তর করার শর্তে সেভিলের অববোধ অপসরণ করাইতে সমর্থ হন। শেষোক্ত ব্যক্তি তাহার দূত লিওনের বিশপ আলভিটুস ও আস্তোরগার বিশপ অর্ডোনিওকে প্রেরণ করেন। তাহারা সেন্ট যুষ্টার দেহকে আবিষ্কার করিতে ব্যর্থ হয় কিন্তু সেন্ট ইসিডোর দেহকে পায় এবং লইয়া যায়। প্রথম ফার্নান্ডো ছয় মাসের দীর্ঘ অবরোধের পর ১০৬৪ খ্রীঃ কোয়েম্বা দখল করেন। তিনি ৫০০ মুসলমানকে বন্দী হিসাবে লইয়া আসেন। এবং ডুরো ও মন্ডেগোর মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত দেশ ও শহরগুলিতে বসবাসকারী জনগণকে নির্বাসিত করেন। পরে তিনি ভ্যালেন্সিয়া আক্রমণ করেন। আবদুল মালিক যিনি ১০৬১ খ্রীঃ তাহার পিতা আবদুল আজিজের স্থলাভিষিক্ত হন। পাটেরনার নিকট যুদ্ধে পরাজিত হন এবং তাহার বিক্ষিপ্ত সেনাবাহিনীকে লইয়া পলায়ন করেন।

নরম্যানস কর্তৃক হুয়েস্কার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বারবাস্ট্রো দুর্গসমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। তাহারা মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে বহু লোককে হত্যা করেন। তাহাদের স্পেন ত্যাগের অল্পদিনের মধ্যে সারাগোসার শাসক মুক্তাদীর ৫০০ সেভিলবাসীর সাহায্যে ১০৬৫ খ্রীঃ বসন্তকালে বারবাস্ট্রো পুনরায় দখল করেন। প্রথম ফার্নান্ডো ভ্যালেন্সিয়া পুনর্দখলের চেষ্টা করেন কিন্তু আবদুল মালিক তাহার শ্বশুর টলেডোর মামুনের প্রেরিত সৈন্য ও রসদ দ্বারা শক্তি বৃদ্ধি করেন। খ্রীস্টান রাজা পশ্চাৎ অপসারণ করেন। ১০৬৫ খ্রীঃ নভেম্বর মাসে মামুন তাহার জামাতাকে সিংহাসনচ্যুত করিয়া ভ্যালেন্সিয়া অধিকার করেন। ১০৬৫ খ্রীঃ ডিসেম্বর মাসে ফার্নান্ডো মৃত্যু বরণ করেন। তাহার তিন পুত্রের মধ্যে রাজ্য বিভক্ত হয়। ষষ্ঠ আলফন্সের ভাগে পরে লিওন।

তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রসেড ঘোষণা করেন। এই সময় মুসলিম-স্পেন, উত্তর-স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার পক্ষ হইতে বিপদের সম্মুখীন হয়। ১০৬৭ খ্রঃ মুতাদিদ কারমোনাকে তাহার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন কিন্তু তিনি দুই বৎসর পর ১০৬৯ খ্রীঃ ফেব্রুয়ারিতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি জিব্রাল্টারকে সুরক্ষিত করেন এবং আফ্রিকার উদীয়মান আল-মুরাভিদ শক্তির কবল হইতে তাহার রাজ্যেকে রক্ষা করার জন্য সেখানে সেনাবাহিনী মোতায়েন করেন। ত্রিশ বৎসরের শাসন আমলে তিনি তাহার রাজ্যকে পশ্চিমে ও উত্তরে যথেষ্ট সম্প্রসারণ করেন, আমীরিদ স্বেচ্ছাতন্ত্রের সময় হইতে সংখ্যায় বৃদ্ধিপ্রাপ্ত বার্বারদের জীবনের বিনিময়ে ইং সম্ভব হয়। মুতাদিদ বার্বারদের অত্যন্ত ঘৃণা করিতেন। বার্বারগণ তাহার বংশের ঘোরতর শত্রু ছিল। তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ কূটনীতিক ও সমরবিদ কিন্তু তিনি কখনও শত্রুর বিরুদ্ধে সেনা পরিচালনা করেন নাই এবং শত্রুর শক্তিকে কিছু অংশেও খর্ব করিতে পারেন নাই। মুতাদিদ স্বয়ং কবি ছিলেন বলিয়া অন্য কবিদেরও পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন।

মুতামিদ

(১০৬৯-১০৯১ খ্রীঃ)

মুতাদিদের পর আবুল কাসিম দ্বিতীয় মুহাম্মদ আল মুতামিদ সর্ব যুগের একজন শ্রেষ্ঠ আরব কবি বলিয়া পরিচিত ছিলেন। স্পেনীয় আরবদের মধ্যে তিনি ছিলেন উচ্চাঙ্গের আরব সাহিত্যিক। তিনি বিদ্যা-বুদ্ধিতে তাহার পিতাকেও অতিক্রম করেন। তিনি ছিলেন একজন সুপণ্ডিত। তিনি শিল্পকলা, সাহিত্য আমোদ-প্রমোদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট ছিলেন। রাজনীতি হইতে কাব্যের রচনারীতি ও সুললিত ভাষার জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। তিনি সাধারণতঃ আনন্দোৎসবে দিন অতিবাহিত করিতেন। তিনি তাহার স্ত্রী ইতিমাদ আল-রুমাইকিয়াহ যিনি সৌন্দর্য ও রুচিতে ভারতের নূরজাহানের ন্যায় বিখ্যাত ছিলেন। তাহার প্রতি উৎসর্গীত প্রাণ ছিলেন। তাহার বুদ্ধিমত্তা বাগ্মিতাকে কর্ডোভার ওয়াল্লাহর সহিত তুলনা করা যায়। মুতামিদ তাহার শখ ও বাসনা পূর্ণ করিতে তৎপর ছিলেন। তাহার আনন্দ উপভোগের

জন্য তিনি কর্ডোভার নিকটবর্তী সিয়েররাতে বাদাম গাছ রোপণ করান।১৫ তিনি ইহার তুষারসদৃশ্য ফুটন্ত ফুলের সৌন্দর্য শীতের শেষ পর্যায়ে রুমাইকিয়াহকে দেখাইতে চাহিয়াছিলেন। তাহার জন্য স্লেভকন্যাদের লইয়া বিভিন্ন ফুলের সুগন্ধীযুক্ত প্রসাধনী ও গোলাপজল পূর্ণ ডোবায় ভ্রমণের ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।

তাহার উজির ইবনে আম্মার যিনি বিরাট পণ্ডিত ছিলেন, তিনি সিলভিসের গভর্নর থাকাকালীন সময় হইতে মুতামিদের সাথী ছিলেন। বার বৎসর বয়সে যুবরাজ আলগারভের রাজধানী সিলভেসের গভর্নর নিযুক্ত হইয়াছিলেন। এই আঞ্চলিক কবি ইবনে আম্মারের প্রভাবে তিনি সেখানে আগমন করেন। আল-আম্মার বয়সে যুবরাজ হইতে বড় ছিলেন। বুদ্ধিমত্তা চালাকীতেও ছিলেন শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কবি ছিলেন ভূইফোড়, দেখিতে কুৎসিৎ ও দরিদ্র। এই দুর্বলতা তাহার খ্যাতি ও প্রতিপত্তিতে বাঁধার প্রাচীর হইয়া দেখা দেয় এবং প্রভাবশালীদের মধ্যে স্থান লাভ করিতে ও অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত হইতে বিরত রাখে। তিনি সিলভিসের নিকটবর্তী গ্রাম শান্নারুশে জন্মগ্রহণ করেন। সিলভিস ও কর্ডোভাতে শিক্ষা লাভ করেন এবং সুবিশাল প্রশংসাবাদ রচনা করিয়া জীবিকা অর্জন করিতেন। মুতামিদ নিজেও একজন কবি ছিলেন। তিনি ইবনে আম্মারের কাব্যের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া তাহাকে সহযোগী নিযুক্ত করেন। সিলভিসে তাহার স্বল্পদিনের সাহচর্যে তিনি মুতামিদের আস্থা ও অনুগ্রহ লাভ করিতে সমর্থ হন। ফলে মুতামিদ তাহাকে সেভিলে লইয়া আসেন। একদিন সন্ধ্যাকালে গোয়াদালকুইভির নদীর তীরে শুভ্র তৃণাচ্ছাদিত প্রান্তরে (প্রাদে দে প্রাত) ভ্রমণকালে খচ্চর পালিকা সুকবি রূপবতী আল রুমাইকিয়াহর সহিত পরিচিত হইয়া তাহার প্রেমাসক্ত হন। এবং পরে তাহাকে বিবাহ করেন। তাহাদের অন্তরঙ্গতা মুতামিদ পছন্দ করিতেন না এবং তিনি যুবরাজের বিশ্বস্ত বন্ধু ইবনে আম্মারকে নির্বাসিত করেন। পিতার মৃত্যুর পর মুতামিদ সিংহাসনে আরোহণ করিয়া ইবনে আম্মারকে আলগারভের গভর্নর নিযুক্ত করেন। পরে তাহাকে ফিরাইয়া আনিয়া মন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। সিলভিসে ও সেভিলে ইবনে আম্মার এবং মুতামিদ আনন্দোৎসবের ও উপভোগের জীবন যাপন ত্যাগ করেন। সেখানে তাহারা কখনও কখনও গোয়াদালকুইভির নদীর তীরে অবস্থিত শুভ্র তৃণচ্ছাদিত প্রান্তরে ভ্রমণ করিতেন ও সাহিত্য বিষয়ে আলোচনা করিতেন।

আবুল ওয়ালিদ ইবনে জাহওয়ারের পুত্র আবদুল মালিকের শাসনকালে টলেডোর রাজা মামুন কর্তৃক কর্ডোভা আক্রান্ত হইলে মুতামিদ আক্রমণ প্রতিহত করিবার জন্য তাহাকে সাহায্য করেন। পরবর্তীকালে ১০৭০ খ্রীঃ কর্ডোভা নিজে দখল করিবার উদ্দেশ্যে মুতামিদ শুধুমাত্র তাহাকে সাহায্য করেন। ১০৭৫ খ্রীঃ জানুয়ারি মাসে তাহার ভাবী উত্তরাধিকারী আব্বাসকে কর্ডোভার গভর্নর নিয়োগ করেন। মামুনের ষড়যন্ত্রে কর্ডোভার জনৈক প্রভাবশালী ব্যক্তি ইবনে উক্কাশা নতুন গভর্নর ও তাহার সেনাপতি মুহাম্মদ বিন মারটিনকে হত্যা করেন। এইরূপে মামুন কর্ডোভার ভাগ্যবিধাতা হন কিন্তু

উক্কাশা ও মামুনের বৈরীতার সুযোগ গ্রহণ করিয়া মুতামিদ উক্কাশাকে শায়েস্তা করেন এবং ১০৭৮ খ্রীঃ কর্ডোভা পুনর্দখল করেন। ওয়াদী আল কাবির দখল করিয়া তিনি তাহার শক্তি বৃদ্ধি করেন।

ইবনে খাল্লিকানের মত সমর্থন করিয়া হিট্টি বলেন, স্পেনের ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজাদের মধ্যে মুতামিদ ছিলেন সর্বাপেক্ষা উদার১৬ জনপ্রিয় ও ক্ষমতাশালী কিন্তু তাহার জীবনের শেষ দিনগুলি প্রথম জীবনের আড়ম্বরপূর্ণ দিনগুলির তুলনায় দুঃখপূর্ণ ছিল। মুসলিম নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন সিংহতুল্য কিন্তু লিওনের ও ক্যাস্টাইলের খ্রীস্টানদের তুলনায় ছিলেন মেষ শাবক। তিনি প্রথম ফার্নান্ডোর পুত্র ষষ্ঠ আলফলোকে নিয়মিত কর প্রদান করিতেন বলিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করিতেন যে, আলফলো তাহাকে আক্রমণ করিবেন না। নিরাপত্তার সম্বন্ধে নিশ্চিত হইয়া তিনি আনন্দোৎসবে প্রমত্ত হইয়া দিন কাটাইতে থাকেন। ফলে কর আদায় হয় না এবং সৈন্যদের বেতন বাকী পড়ে ও তাহার কর্মচারীরা কর্মবিমুখ ও অলস হইয়া ওঠে।

অপরদিকে ক্যাস্টাইলের খ্রীস্টানগণ ক্রমে ক্রমে শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়িয়া তোলে এবং বিপুল সংখ্যক সেনা লইয়া সেভিল আক্রমণ করে। মুতামিদের বাধা প্রদানের সামর্থ ছিল না। কিন্তু তাহার প্রধানমন্ত্রী চতুর ইবনে আম্মার বিপদের সম্মুখীন হইয়া সেভিলে খ্রীস্টান রাজাকে দাবা খেলার আমন্ত্রণ জানান। হোল বলেন, “তিনি সারাদেশে সুপরিচিত ছিলেন, ষষ্ঠ আলফলো যিনি দৃঢ়ভাবে তাইফাসের উপর চাপ বৃদ্ধি করিতেছিলেন। তিনিও তাহাকে স্পেন উপদ্বীপের সর্বাপেক্ষা বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব বলিয়া মনে করিতেন।”১৭ খ্রীস্টান রাজা দাবায় হারিয়া যান এবং আগেকার তুলনায় দ্বিগুণ কর পাইয়া সন্তুষ্ট হন। এগার শত শতাব্দীর মধ্যভাগে খ্রীস্টানগণ স্পেনের প্রতিদ্বন্দ্বী বহু মুসলিম রাজ্যকে তাহাদের সামরিক নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করিতে বাধ্য করে।

ইবনে আম্মার আবুবকর ইবনে জাইদুনকে পরাজিত করিয়া মুরসিয়া অধিকার করেন, সেখানে তিনি ভিলসেচ বালজ দুর্গের আরব নেতা ইবনে রাশিকের সহযোগিতায় নিজেকে স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করিতে চেষ্টা করেন। তিনি স্বাধীনভাবে মুরসিয়া শাসন করিতে শুরু করেন। মুতামিদের কোপানলে পতিত হইয়া আব্বাসী শাসকের প্রেরিত সেনাবাহিনীর মোকাবিলা না করিয়া সারাগোসা পলাইয়া যান। ইবনে রাশিক তাহার সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করে। বানু সুহায়েল তাহাকে বন্দী করিয়া মুতামিদের নিকট বিক্রয় করে। সুতরাং পুনর্মিলনের অল্পদিন পরই ইবনে আম্মার মুতামিদের বিরাগ ভাজন হইয়া নিহত হন। তাহার পরে আবু বকর ইবনে জাইদুনকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। ষষ্ঠ আলফন্সে ১০৮৫ খ্রীঃ টলেডো অবরোধ করিয়া তাহার ইহুদী কর্মচারী ইবনে শালীবকে সেভিলে কর আদায়ের জন্য প্রেরণ করেন। ইবনে শালীব ভেজাল ধাতুর মুদ্রাগ্ৰহণ করিতে অস্বীকার করেন। মুতামিদ এই সমস্ত ধাতু দ্বারা মুদ্রা তৈয়ার করিয়া

চালু করিতেন। কারণ স্বর্ণ ও রৌপের অভাব ছিল। তাহার অসম্মানজনক ও কঠোর কথা বার্তায় মুতামিদ এত অসন্তুষ্ট হন যে তাহাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন। অতঃপর ষষ্ঠ আলফন্সে ১০৮৫ খ্রঃ টলেডো অধিকার করেন এবং সারা স্পেন দখল করিবার দৃঢ় আশা পোষণ করেন। তিনি মুজারাবদের সহযোগিতায় ৪,০০০ সৈন্য লইয়া সেভিলে অভিযান পরিচালনা করেন। আক্সরাফের আল-শারাফ শহরসমূহ লুণ্ঠন করিয়া ভূমধ্যসাগরের উপকূলবর্তী সমস্ত এলাকা পদানত করেন। ইহার পর সেভিলে গ্রানাডা, বাদাজোজ ও অপরাপর জায়গায় মুসলিম নেতাগণ অনুধাবন করেন যে খ্রীস্টানগণ স্পেনে মুসলিম শক্তির মূল উৎপাটন করিতে চায়। অতঃপর তাহারা সম্মিলিতভাবে তাহাদের সাধারণ শত্রুর মোকাবিলা করেন। মুতামিদের নেতৃত্বে তাহাদের সম্মিলিত বাহিনী খ্রীস্টান সেনাবাহিনীকে মোকাবিলা করিবার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এই জন্য তাহারা বাহিরের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ইবনে আদহাম, আবু জাফর কালাই, ও আবু ইসহাক ইবনে মোকানা যথাক্রমে কর্ডোভা, গ্রানাডা ও বাদাজোজের কাজিগণ প্রধানমন্ত্রী আবু বকর ইবনে জাইদুনের নেতৃত্বে ইফ্রিকিয়ার মুরাবিতিন, ইউসুফ বিন তাশুফিনের নিকট গমন করেন। ষষ্ঠ আলফন্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিবার জন্য স্পেন আগমনে তাহাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ইউসুফ স্পেনে আগমন করেন এবং ১০৮৬ খ্রীঃ ২৩শে অক্টোবর বাদাজোজের নিকট অনুষ্ঠিত জাল্লাকাহর (Sacralias) যুদ্ধে খ্রীস্টানগণকে পরাজিত করেন।

এই যুদ্ধে মুসলমানদের সৈন্যসংখ্যা ছিল ২০,০০০ হাজার অপরদিকে খ্রীস্টানদের সৈন্য সংখ্যা ছিল ৫০,০০০ হইতে ৬০,০০০ হাজার। এই অভূতপূর্ব পূর্ণ সাফল্যের ফল মুসলমানগণ ভোগ করিতে পারেন নাই। ইতিমধ্যে সিউটাতে ইউসুফের জ্যেষ্ঠপুত্রের মৃত্যু ঘটায় তাহাকে ইফ্রিকাতে প্রত্যাবর্তন করিতে হয়। তাহার বিদায়ের পর খ্রীস্টানগণ পুনরায় মুসলিম রাজ্যগুলিকে হয়রানী করতে শুরু করেন। মুতামিদের নেতৃত্বে ইউসুফ ৩০০০ হাজার আফ্রিকাবাসী সৈন্যকে রাখিয়া যান কিন্তু তিনি খ্রীস্টানদের প্রচণ্ড আক্রমণ প্রতিহত করিতে ব্যর্থ হন। তিনি পুনরায় ইউসুফকে আমন্ত্রণ জানান কিন্তু এইবার ফুকাহা ও জনসাধারণের অনুরোধে ইউসুফ নিজেই স্পেন শাসনের অভিপ্রায় প্রকাশ করেন এবং সুদূর তাগুসনদী পর্যন্ত আন্দালুসিয়ার সমগ্র অঞ্চল তাহার মরক্কো সাম্রাজ্যের সহিত একত্রিত করেন। ১০৯৫ খ্রীঃ মরক্কোর নিকট আগমাতে মুতামিদ নির্বাসিত হন ও সেখানেই দেহত্যাগ করেন। তাহার স্ত্রী ও কন্যাগণকে শারীরিক পরিশ্রম করিয়া জীবিকা অর্জন করিতে হয়। তাহার পতনের ঘটনা এক হৃদয় বিদারক কাহিনী।

মুতামিদ মধ্যযুগের উজ্জ্বল স্পেনীয় শাসকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। তিনি শিল্পকলা ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক এবং কাব্যের সমঝদার ও মেধার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন উদার ও ধৈর্য্যশীল কিন্তু বিলাসী ও আরাম প্রিয়। তিনি রাজ্যের

ব্যাপারে খুব সামান্য চিন্তা করিতেন। রাজা মুতামিদ ও প্রধানমন্ত্রী ইবনে আম্মার উভয়েই যেহেতু কাব্যচর্চা করিতে ভালোবাসিতেন সেইহেতু সেভিল সেই যুগের কবিদের তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়। আব্দুল জলিল ছিলেন তাহার প্রাসাদের বিখ্যাত কবি। মুতামিদের শাসন আমলে সেভিল সেই যুগের জ্ঞানীগুণিদের মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয়।

তথ্য নির্দেশ

১। এন্টনিও প্রিটো ওয়াই ভাইভ, লস রিইয়েচ দে তাইফাস, মাদ্রিদ, ১৯২৬. পৃঃ ১৬। ২। ঐ, পৃঃ ২৪-২৮।

সিসিলির বিখ্যাত ভৌগোলিক ছিলেন তাঁহার দৌহিত্র। ৪। প্রিটো ওয়াই ভাইভস্, লস রিইয়েচ, পৃঃ ২১. ২৮; আল-আন্দালুস, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৯৪১. পৃঃ ১৮; আলবোরনোজ, লা ইপানা মুসলমানা, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৪৪-৫৩। ইহুদীদের বিরুদ্ধে লিখিত কবির কবিতার ইংরেজি অনুবাদ; ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৬৫১৫২; এমিলিও গার্সিয়া কর্তৃক উক্ত আরবী কবিতার স্পেনিশ অনুবাদ Un alfaqni espanol Abu Ishaq, মাদ্রিদ, ১৯৪৪। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৬১৭-১৮। ও টীকা-১ দেখুন।

এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১২৩১। ৮। প্রিটো ওয়াই ভাইভস্ ,পৃঃ ৩৩-৪১; আল-বোরনোজ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৯১-৯২। ৯। প্রিটো, ঐ পৃঃ ৪৫-৫০; আল-বেরনোজ, ঐ, পৃঃ ৯৫। ১০। প্রিটো, পৃঃ ৫১-৫৫। ১১। ঐ, পৃঃ ৭৮, ও টীকা-২। ১২। আল-বোরনোজ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৩, ১২০, ৩৩৯ দেখুন। ১৩। শান্তা মারিয়া আলগাৰ্ব এখন ফারো নামে পরিচিত। ১৪। হোল, আন্দালুস, পৃঃ ২৫। ১৫। হিট্টি, পৃঃ ৫৩৯। ১৬। ঐ, পৃঃ ৫৩৮-৩৯। ১৭। আন্দালুস, পৃঃ ১৭২। ৭। এনসাই

সকল অধ্যায়
১.
উপক্রমণিকা (মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস)
২.
প্রথম অধ্যায় : মুসলমানদের স্পেন বিজয়
৩.
দ্বিতীয় অধ্যায় : দামেস্ক-খেলাফতের অধীন উমাইয়া আমীরদের শাসন
৪.
তৃতীয় অধ্যায় : স্বাধীন উমাইয়া আমীরদের রাজত্ব
৫.
চতুর্থ অধ্যায় : প্রথম হিশাম
৬.
পঞ্চম অধ্যায় : প্রথম হাকাম
৭.
ষষ্ঠ অধ্যায় : দ্বিতীয় আবদুর রহমান
৮.
সপ্তম অধ্যায় : প্রথম মুহাম্মদ
৯.
অষ্টম অধ্যায় : মুনজির ও আবদুল্লাহ
১০.
নবম অধ্যায় : উমাইয়া খিলাফত
১১.
দশম অধ্যায় : দ্বিতীয় হাকাম
১২.
একাদশ অধ্যায় : হাজীব আল-মনসুর
১৩.
দ্বাদশ অধ্যায় : স্পেনে উমাইয়া খিলাফতের পতন
১৪.
ত্রয়োদশ অধ্যায় : স্পেনের উত্তরাঞ্চলে খ্রীস্টান রাষ্ট্রসমূহের অভ্যুদয়
১৫.
চতুর্দশ অধ্যায় : প্রথম পর্যায় ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ
১৬.
পঞ্চদশ অধ্যায় : দ্বিতীয় পর্যায় – উত্তর আফ্রিকার শাসন
১৭.
ষষ্ঠদশ অধ্যায় : তৃতীয় পর্যায়ঃ নাসরী রাজবংশ
১৮.
সপ্তদশ অধ্যায় : মরিস্ক জাতি
১৯.
অষ্টাদশ অধ্যায় : স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনের কারণসমূহ
২০.
উনবিংশ অধ্যায় : শাসনকার্য ও প্রশাসন
২১.
পরিশিষ্ট-ক : ইক্রিতিশে কর্ডোভান মুসলমানদের শাসন
২২.
পরিশিষ্ট-খ : স্পেনে মুসলিম শাসকদের বংশানুক্রমিক তালিকা
২৩.
পরিশিষ্ট-গ : উত্তর-স্পেনে খ্রিষ্টান শাসকদের কালানুক্রমিক তালিকা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%