ষষ্ঠ অধ্যায় : দ্বিতীয় আবদুর রহমান

দ্বিতীয় আবদুর রহমান
(৮২২-৮৫২ খ্রীঃ)
ষষ্ঠ অধ্যায়

সিংহাসনে আরোহণ

দ্বিতীয় আবদুর রহমান আবু আল মুতরিফ নামে পরিচিত ছিলেন। আরব ঐতিহাসিকগণ তাহাকে আল আওসাত নামে অভিহিত করেন। তিনি ২০৬ হিঃ/৮২২ খ্রীঃ তাহার পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। তাহার সিংহাসনে আরোহণ উপদ্রবহীন ছিল না। প্রথম আবদুর রহমানের পুত্র আবদুল্লাহ যাহাকে জায়গীরদারী হইতে বঞ্চিত করা হইয়াছিল তিনি হাকামের মৃত্যুর পর তাহার পুত্রদের সহযোগিতায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করেন। হাকামের পুত্রগণ সরকারী উচ্চ পদে বহাল ছিলেন। তাহাদের নিকট হইতে কোন প্রকার সাহায্য না পাইয়া আবদুল্লাহ শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেন। তাহাকে মুরসিয়ার গভর্নর নিযুক্ত করা হয় এবং সেখানেই তিনি তাহার শেষ জীবন শান্তিপূর্ণ ভাবে অতিবাহিত করেন।

রাজ-সভাসদ

কথিত আছে আবদুর রহমান তাহার রাজত্বকালে চার ব্যক্তি দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাঁহাদের একজন ছিলেন ধর্মবেত্তা, একজন ছিলেন গায়ক, একজন ছিলেন খোজা ও চতুর্থ জন ছিলেন এক নারী। ধর্মবেত্তা ছিলেন বার্বার ফকিহ আবু মুহাম্মদ ইয়াহিয়া বিন ইয়াহিয়া (মৃঃ২৩৪হিঃ/৮৪৮ খ্রীঃ)। কর্ডোভার হাকামের প্রাসাদ অবরোধকারী জনতার প্রধান নেতা ছিলেন তিনি। ক্ষমতা দখলে বিফল ইয়াহিয়া অনুধাবন করেন যে রাজ্যের ক্ষমতা ও প্রভাব বিস্তারের জন্য শত্রুতা ত্যাগ করিয়া ফকিহদের উচিত উদীত শাসকের অন্তর জয় করা। তাহার পরামর্শে বিচারকদের নিয়োগ করা হইত। তিনি নিজে কোন পদ গ্রহণ করেন নাই। ইহার ফলে রাজ প্রাসাদে তাহার প্রভাব বৃদ্ধি পায়।

গায়ক ছিলেন ইরানী জিরাব তাহার উপনাম ছিল আবুল হাসান আলী ইবনে নাফি (৭৮৯-৮৫৭ খ্রীস্টাব্দে), তিনি ছিলেন আমীরের খুবই প্রিয়। তিনি প্রথমে ছিলেন বাগদাদে হারুন আল-রশিদের (মৃত ৮০৯ খ্রীঃ) রাজপ্রাসাদে। তিনি বিখ্যাত গায়ক ইসহাক আল মাওসীলির শিষ্য ছিলেন। এই বিদ্যায় তিনি তাহার গুরুকে অতিক্রম করিয়া যান ইহাতে তাহার গুরু ঈর্ষান্বিত হইয়া ওঠেন। এবং বাগদাদ ত্যাগ না করিলে তাহাকে হত্যা করিবার ভয় দেখান। তরুণ গায়ক তাহার গুরুর আদেশ অমান্য না করিয়া আফ্রিকার উদ্দেশ্যে বাগদাদ ত্যাগ করেন। ঐতিহাসিক আল কুতিয়াহ অন্য একটি ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন যাহা তাহার আব্বাসী রাজ প্রসাদ ত্যাগের ঘটনার সহিত সাদৃশ্যপূর্ণ। আল কুতিয়াহর মতে জিরইয়া খলিফা আমিনের প্রসাদে চাকুরী করিতেন। ৮১৩ খ্রীঃ আমিনের মৃত্যুর পর তাহার উত্তরাধিকারী মামুন কোন এক ব্যাপারে তাহাকে গালাগালি ও ভৎর্সনা করেন। সিংহাসনে আরোহণের জন্য ৮১৯ খ্রীস্টাব্দে মার্ভ হইতে মামুনের বাগদাদ আগমনের সময় জিরইয়াব আফ্রিকায় পলাইয়া যান। কায়রোওয়ানে আগলাবিদ শাসক প্রথম জিয়াদাত উল্লাহর (৮১৬-৮৩৭) রাজদরবারে নিজেকে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। একদিন তিনি আনতারা বাজাইবার সময় “আমার মা যদি কাকের মত কালো হইত” এই বাক্য দ্বারা জিয়াদাত উল্লাহর সম্মুখে গাহিতে শুরু করেন। ঘটনা ক্রমে জিয়াদাত উল্লাহর মাতা ছিলেন দেখিতে কালো।

ফলে ক্রোধান্বিত হইয়া জিয়াদাত উল্লাহ তাহাকে বেত্রাঘাত করেন ও নির্বাসন দণ্ড প্রদান করেন। প্রথম হাকামের আমন্ত্রণে তিনি ৮২১ খ্রীঃ স্পেনের উদ্দেশ্যে ইফ্রিকীয়া ত্যাগ করেন। কিন্তু তাহার স্পেনে পৌঁছার পূর্বেই আমীরের মৃত্যু ঘটে। ইহুদী গায়ক আল-মনসুর তাহাকে দ্বিতীয় আবদুর রহমানের দরবারে লইয়া যান। আমীর তাহাকে গভীর আন্তরিকতার সহিত গ্রহণ করেন। তিনি তাহাকে বসবাসের জন্য একটি চমৎকার গৃহ দান করেন। তাহার এককালীন ভাতা ব্যতীত বাৎসরিক ২৪,০০০ হাজার দিনার বেতন নির্ধারিত হয়। একবার আমীর জিরাবকে ৩০,০০০ দিনার দেওয়ার জন্য ট্রেজারীতে লিখিয়া পাঠান। কিন্তু প্রধান খাজাঞ্চী জনসাধারণের অর্থ হইতে ইহা দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন এবং এইরূপে জাতির প্রতি তাঁহার দায়িত্বের প্রমাণ দেন। প্রভাবশালী পরিবার হইতে খাজাঞ্চী নিয়োগ করা হইত বলিয়া তিনি শাসকের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াইবার ক্ষমতা রাখিতেন।

জিরইয়াব শ্রেষ্ঠত্বে স্পেনের অন্য গায়কদের অতিক্রম করিয়াছিলেন কারণ তিনি শুধু গায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, জ্যোতির্বিদ, ঐতিহাসিক ও ভূগোল বিশারদ। তিনি সংগীতের মাধ্যমে আমীরের হৃদয় জয় করিয়াছিলেন। কদাচিত তিনি রাজদরবারে তাহার প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করিতেন। তিনি বাগদাদবাসীদের আচার আচরণ প্রসাধন ও খাদ্যে বিভিন্ন প্রকারের ইরানী রীতিনীতি স্পেনে প্রবর্তন করেন এবং স্পেনবাসীদিগকে পোষাক পরিচ্ছদে সুরুচির ব্যবহার শিক্ষা দিয়াছিলেন। আব্বাসী ও স্পেনীয় মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক বিরূপতা সত্ত্বেও স্পেন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাগদাদের নিকট হইতে অনেক কিছু গ্রহণ করিয়াছিল।

জিরইয়াব স্পেনে একটি সংগীত বিদ্যালয় স্থাপন করিয়াছিলেন এবং সংগীত বিদ্যার ভিত্তি স্থাপন করিয়াছিলেন। জালজাল ছিলেন বাগদাদের বিখ্যাত গায়ক। তিনি উদ আল-শাব্বত পরিপূর্ণ বীণা (Perfect lute) নামে এক প্রকার নতুন বীণার প্রচলন করেন। প্রচলিত বীণায় চারটি তার সংযোজিত ছিল। জিরইয়াব ইহাতে পঞ্চম তার 5771S PCS 1 (And substituted eagle’s latons for wooden plectra) তাহার দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তার ছিল কচি সিংহের (Entail) অস্থি দ্বারা তৈয়ারী। ইহা অন্যান্য বীণার তার হইতে মজবুত ছিল। সুরের গভীরতা ও শব্দের পরিচ্ছন্নতা ইহার বৈশিষ্ট্য ছিল। জিরইয়াবের শিষ্যদের শিক্ষাদানের পদ্ধতির বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান করিয়াছেন মাক্কারী। তরুণ শিক্ষার্থীদের কোমরে চতুর্দিকে শক্ত করিয়া পাগড়ী বাঁধিয়া দিতেন স্বরকে দীর্ঘায়িত করিবার জন্য এবং তিন ইঞ্চি দৈর্ঘ্য ছোট এক খন্ড কাষ্ঠ শিষ্যের মুখে স্থাপন করিতেন চোয়াল প্রসারিত করিবার উদ্দেশ্যে। ইয়া হাজ্জাম অথবা আহ শব্দকে শিষ্যদের উচ্চ স্বরে চিৎকার করিতে বলিতেন। তাহার এই সংগীত বিদ্যালয় বহু বিখ্যাত গায়ক সৃষ্টি করে। বিদ্যালয়টি স্পেনে উমাইয়া খিলাফতের পতনের পূর্ব পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল।

সুলতানা তারুবের প্রিয়পাত্র রাজপ্রসাদের তত্ত্বাবধায়ক ক্রীতদাস নাসর ছিল খোজা। আরবী বলিতে পারিত না এইজন্য গান বাদ্য ও কাব্য চর্চায় মগ্ন থাকিতেন বলিয়া নাসর ও তারুবের বিরাট প্রভাব ছিল রাজ্যের প্রশাসন ব্যবস্থার উপর। সুলতানা তারুব ছিলেন অতিমাত্রায় লোভী। আমীরের প্রদত্ত জিনিষে তিনি কখনই তৃপ্ত ছিলেন

১০,০০০ (দশ হাজার) দিনার মূল্যের একটি হার সুলতানা পরিধান করিতেন। তারুবের নিজের পুত্র আবদুল্লাহর পরিবর্তে মুহাম্মদকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করায় যুবরাজ মুহাম্মদকে বিষ প্রয়োগের জন্য তারুব ৮৫০ খ্রীস্টাব্দে নাসেরকে প্ররোচিত করেন। এই ষড়যন্ত্র ফাঁস হইয়া গেলে আমীরের আদেশে মুহাম্মদের জন্য প্রস্তুত করা বিষ নাসর নিজে পান করে। এইরূপে খোজা নাসর নিজের হাতে মৃত্যুবরণ করে। ইয়াহিয়া তারুব এবং নাসর শাসককে পরামর্শ দেন ও রাজনীতিতে অংশ গ্রহণ করেন কিন্তু জিরইয়াব পোষাক পরিচ্ছদ ও আচার আচরণের ব্যাপারে আমীরের উপর প্রভাব বিস্তার করিয়াছিলেন।

তুদমির ও মেরিদার বিদ্রোহ

তাহার রাজত্বের প্রথম দিকে শহরবাসীদের অসন্তুষ্টির জন্য বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের অনভিজ্ঞতার দরুন এই বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়। ৭২২ খ্রীঃ ইয়ামানী ও মুজারীগণ পুনরায় তুমিরে গোত্রীয় গৃহযুদ্ধ শুরু করে। শান্তি স্থাপনের জন্য মুজারী নেতা আবুল শামাখ মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিমকে কর্ডোভাতে পাঠান হয় এবং তোরকাতে বিদ্রোহীদের শক্তি খর্ব করিবার উদ্দেশ্যে তাহাকে রাজকীয় বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়। তুমিরের রাজধানী লোরকা হইতে মুরসিয়ায় স্থানান্তরিত করা হয়। সাত বৎসর বিশৃংখলা চলার পর ৮২৮ খ্রীঃ সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।* ২১২ হিঃ / ৮২৮ খ্রীঃ মেরিদার খ্রীস্টান ও ইহুদীগণ প্রাক্তন কর আদায়কারী মাহমুদ ইবনে আবদুল জব্বার ও সুলায়মান বিন মারতিনের নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের কারণ ছিল নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের উপর কর আরোপ এবং মন্ত্রী ও কর আদায়কারী কর্মচারীদের অত্যাচার। লুইস বিদ্রোহীদের প্ররোচিত করেন। ১৮১৪ খ্রীঃ তিনি তাঁহার

পিতা চার্লমানের স্থলাভিষিক্ত হন।১১ ফ্রাঙ্ক রাজ লুইস মেরিদাবাসীদের নিকট নিম্নোক্ত পত্রটি প্রেরণ করেন ?

“সৃষ্টিকর্তা ও রক্ষাকারী খ্রীস্টের নামে সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহে লুইসের তরফ হইতে সম্রাট আগাষ্টাস মেরিদার জনগণ ও ধর্মগুরুদের নিকট সৃষ্টিকর্তার প্রণাম। In the name of the lord god and our saviour jessus christ. Louis by the grace of god, Emperor Augustus. আপনাদের অবর্ণনীয় দুঃখ দুর্দশা ভোগ এবং নিষ্ঠুর আবদুর রহমানের অত্যাচার ও ধন সম্পদের লুণ্ঠন সম্বন্ধে আমরা অবহিত হইয়াছি। তাঁহার পিতা আকুনাজের পদাঙ্ক অনুসরণ করিয়া আপনাদের উপর অবৈধ করের বোঝা চাপাইয়া দেওয়ার ফলে তাহার বন্ধুগণ শত্রুতে ও বিশ্বস্ত প্রজাকুল বিদ্রোহীতে পরিণত হইয়াছে। সত্যই সে আপনাদিগকে আপনাদের স্বাধীনতা হইতে বঞ্চিত করিবার ও আপনাদের উপর কর আরোপ এবং বিভিন্ন প্রকার অত্যাচার করিবার ইচ্ছা করিয়াছে। সৌভাগ্যবশতঃ আপনারা সাহসিকতার সহিত লোভী, অত্যাচারী ও অবিচারক এই শাসকের প্রতিরোধ করিয়া চলিয়াছেন। বিভিন্ন সূত্রে এই সব সংবাদ আমাদের নিকট আসিয়া পৌছিয়াছে। আপনাদিগকে সান্তনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এইমাত্র লিখিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছি। এবং স্বাধীকার আদায়ের এই সংগ্রামে অটল থাকিবার জন্য বলিতেছি। অত্যাচারী এই শাসক আমাদের ও আপনাদের উভয়ের শত্রু। তাঁহার বিরুদ্ধে সম্মিলিত ঐক্যফ্রন্ট গঠন করিবার প্রস্তাব করিতেছি। মহান স্রষ্টা চাহিলে আগামী গ্রীষ্মে আপনাদের সমর্থনে একদল সেনা পাঠাইবার আশা রাখি। যদি আবদুর রহমান অথবা তাহার সেনাবাহিনী আপনাদের বিরদ্ধে অগ্রসর হয় তাহা হইলে আমাদের সেনাবাহিনী শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়িয়া তুলিবে। আপনারা যদি তাহার বশ্যতা অস্বীকার করেন এবং আমাদের পক্ষ সমর্থন করেন—তাহা হইলে আমরা ঘোষণা করিতেছি যে, আপনাদের পূর্ব সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দান করা হইবে এবং কর মওকুফ করা হইবে। নিজস্ব জীবন ব্যবস্থা মোতাবেক আপনারা আপনাদের জীবন যাপন করিতে পারিবেন। দেশরক্ষা ব্যবস্থায় আপনারা আমাদের সহযোগী ও বন্ধু হিসাবে থাকিবেন। মহান স্রষ্টা

আপনাদের সুস্থ শরীরে রাখুন এই প্রার্থনা করি।”১২ ৮২৮ খ্রীস্টাব্দে বিদ্রোহীরা কর আদায়কারীদের গৃহ লুণ্ঠন করে ও কতিপয় কর আদায়কারীকে হত্যা করে। বিদ্রোহীদের সংখ্যা ছিল চল্লিশ হাজার। শান্তি প্রতিষ্ঠা করিবার উদ্দেশ্যে দ্বিতীয় আবদুর রহমান টলেডো হইতে আবদুর রহমানের নেতৃত্বে সেনাদল প্রেরণ করেন। নগর প্রাচীর ধ্বংস করা হয়। রাজকীয় বাহিনী প্রত্যাহারের

শর্তে মেরিদার বিদ্রোহীগণ আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘদিন যাবৎ তাহারা অরাজকতা ও অশান্তি সৃষ্টি করে। আমীর স্বয়ং অভিযান পরিচালনা ও শহর অবরোধ করিলে বিদ্রোহীগণ তাহাদের কার্য হইতে বিরত হয়। এই অভিযানে ৭,০০০ হাজার বিদ্রোহী। নিহত হয়। তাহাদের নেতা মাহমুদ সারাগোসায় পলাইয়া যায়। এবং ৮৪০ খ্রীস্টাব্দে সেখানে দ্বিতীয় আলফন্সের হস্তে নিহত হয়।

টলেডোতে বিদ্রোহ

মেরিদাতে শান্তি স্থাপনের পরপরই টলেডোতে সাংঘাতিক বিদ্রোহ দেখা দেয়। এই বিদ্রোহে অংশ গ্রহণ করে খ্রীস্টান, নব মুসলিম ও ইহুদীগণ। হাশিম নামে এক কর্মকার নব মুসলিম ছিলেন ইহার নেতা। এই হাশিম পরিখাদিবসের ঘটনা হইতে আত্মরক্ষা করিয়া কর্ডোভায় বসাবস করিতেছিলেন। হাকামের রাজত্বকালে কর্ডোভাতে তাঁহার পরিবারদের সহিত নিষ্ঠুর ব্যবহার করা হয়। ৮২৯ খ্রীঃ টলেডোতে প্রত্যাবর্তনের পর সে প্রতিশোধ হিসাবে আরব ও বার্বারদের গৃহ লুণ্ঠন করে। তিনি কান্টাব্রিয়া ও আমরুস দুর্গের ধ্বংস সাধনসহ বহু প্রহরীকে হত্যা করেন। বিদ্রোহীদিগকে দমনের জন্য সীমান্তের গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে ওয়াসিম সেনাদল প্রেরণ করেন কিন্তু রাজকীয় সেনাদল বিতাড়িত হয় এবং হাশিম পার্শ্ববর্তী জেলাসমূহে এক বৎসরকাল ধ্বংসাত্মক কার্য চালাইয়া যায়।

কেন্দ্র হইতে সাহায্য আসিবার সংগে সংগে ৮৩১ খ্রীঃ ইবনে ওয়াসিম সেনাবাহিনী লইয়া টলেডো অভিমুখে অগ্রসর হন। হাশিম পরাজিত ও নিহত হয় এবং বিদ্রোহীরা বিশৃঙ্খল হইয়া পড়ে কিন্তু সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন হয় না। ৮৩৪ খ্রীঃ যুবরাজ উমাইয়ার নেতৃত্বে টলেডোতে শান্তি আনিবার জন্য একদল সেনা প্রেরিত হয় কিন্তু এই অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যতদিন পর্যন্ত টলেডোবাসীরা ঐক্যবদ্ধ ছিল ততদিন আবদুর রহমান শহর দখল করিতে পারেন নাই। শেষ পর্যন্ত ইহা ৮৩৭ খ্রীস্টাব্দের ১৬ই জুন ২২২ হিঃ ৯ই রজব যুবরাজ ওয়ালিদ বিন হাকামের প্রবল আক্রমণের পর তাঁহার অধিকারে আসে। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘ আট বৎসর পর টলেডোতে শান্তি স্থাপিত হয়। আমিরুস দুর্গ পুনরায় নির্মাণ করা হয়। রাজধানী দেশের মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত হওয়ায় শাসকদের দুর্বলতা সত্ত্বেও বহিরআক্রমণের হাত হইতে রক্ষা পায়।

খ্রীস্টান নেতাদের আক্রমণ

সত্যিকার সীমান্ত বলিতে আন্দালুসের উত্তরে কিছু ছিল না। দুই দেশের মধ্যবর্তী স্থান মালিকানা বিহীন ভূমি হিসাবে গণ্য হইত। মুসলমান ও খ্রীস্টানগণ ইহা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করিত। মুসলিমগণ আপার মার্চের জন্য সারাগোসায়, মিডল মার্চের জন্য টলেডোতে ও লোয়ার মার্চের জন্য মেরিদাতে সেনানিবাস স্থাপন করিয়াছিল। আবদুর রহমানের শাসনের প্রথম দিকে লিওনের নেতা দ্বিতীয় আলফন্সে মদিনাত আল সালিম (মেদিনা সেলী) এবং আরাগোনা আকস্মিকভাবে আক্রমণ করে। উত্তরের অন্যান্য দলপতিগণও তাহার পদাঙ্ক অনুসরণ করে। গথিক

মার্চের কাউন্ট বরেল মুসলিম রাজ্য আক্রমণ করে ৮২৩ও ৮২৬ খ্রীঃ আবদুল করিম বিন মুগিছ এবং উবায়দুল্লাহ বিন প্রথম আবদুর রহমানের নেতৃত্বে মুসলিম সেনাদল আলভা আক্রমণ করে। খ্রীস্টানগণ সম্পূর্ণ রূপে পরাভূত হয় এবং তাহাদের দুর্গশহর লিওন হয় লুণ্ঠিত। তাহারা আত্মসমর্পণ করে মুসলিম বন্দীদের মুক্তিদেয় এবং প্রচুর জরিমানা এবং ভবিষ্যতে উত্তম ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দান করে।

এই সময় আইজন নামে জনৈক গথিক লর্ড আকিটেনের রাজা লুইস-পুত্র পেপিন জনগণের বিরুদ্ধে মুসলমানদের পক্ষ অবলম্বন করে। উমাইয়া সেনাপতি উবায়দুল্লাহ বিন আবদুল্লাহ যিনি আমীরের নাতি হইতেন, বার্সিলোনা পার্শ্ববর্তী এলাকা গারোন্নকে পদানত করিয়া ফ্রান্সের দিকে অবস্থিত পীরেনীজের স্পাইরণ ও ছেরডাগ্নের অভিমুখে সাফল্যের সহিত অগ্রসর হন।১৩ গথিক মার্চে মুসলমানদের সাময়িক সফলতা বিফল হইয়া যায়। ৮২৫ খ্রীস্টাব্দের পর উত্তরাঞ্চলে কোন গুরুতর বিশৃঙ্খলার কথা আমরা শুনিতে পাই নাই।

মুসলমান ও খ্রীস্টানদের মধ্যেকার এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি দশ বৎসর স্থায়ী হয়। মুসলিম সেনাদের পর পর তিন বার আস্তুরিয়া, গ্যালেসিয়া, আলেভা এবং ক্যাস্টাইল অভিযানের ফলে ৮৩৮ খ্রীস্টাব্দে এই যুদ্ধ বিরতির অবসান ঘটে। খ্রীস্টানগণ পাম্পলোনা পদানত করে এবং ঐ বৎসরই উহা মুসলমানদের হস্তগত হয়। বার্সিলোনা ও গ্যালেসিয়া মুসলমানদের অধিকারে আসে। উত্তর-পূর্ব স্পেন হইতে খ্রীস্টানগণ বিতাড়িত হয়। ৮৩৯ খ্রীস্টাব্দে রাজা লুইস মেদিনাসেলী (মদিনাত আল সালিম) আক্রমণ করেন কিন্তু প্রচুর ক্ষতিসহ পশ্চাদপসারণ করিতে বাধ্য হন। এই যুদ্ধের নেতৃত্ব দান করেন তুমিরের সীমান্ত গভর্নর মুসা বিন ফাতুন।

স্পেন ও আফ্রিকার বন্দর হইতে মুসলিম নৌযানসমূহ ভূমধ্যসাগরের তীরসমূহে আক্রমণ চালাইত এবং স্পেনীয় মুসলিম নৌসেনারা লোয়েরের মোহনায় বৃটানিতে অবস্থিত ওয়ে দ্বীপ আক্রমণ করিত। মাক্কারীর মতে, মুসলিম সেনারা বৃটেনের দ্বীপ পর্যন্ত অগ্রসর হইয়াছিল।১৪ ৮৪০ খ্রীস্টাব্দে লুইসের মৃত্যুর পর বিরাট বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। লুইসের মৃত্যুর পর তাহার পুত্র পেপিন ও কেশহীন চার্লস লানগুয়েডক অধিকারের জন্য যুদ্ধ করেন। এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করিয়া মুসলমানগণ রোন নদীর মোহনা দিয়া প্রভেঙ্গে প্রবেশ করে। নাভাররে প্রদেশের টুডেলার গভর্নর মুসা বিন মুসা ছেড়ডাগ্নে পদানত করিয়া লোয়ের, গারোন্ন ও স্লাতের ছিনসের মধ্য দিয়া মধ্য-ফ্রান্সের দিকে অগ্রসর হন ১৫ উর্গাল ও রিভাগোরসার মধ্য দিয়াও মুসলিম সেনাবাহিনী ফ্রান্সের দিকে অভিযান পরিচালনা করে। মধ্যস্থতাকারী তোলোসের কাউন্ট, উইলিয়াম কর্ডোভার সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং কেশহীন চার্লসের সর্দারদের নিকট হইতে বার্সিলোনা এবং ক্যাটালনিয়ান শহর দখল করিয়া নেয়।

৮৪০ খ্রীস্টাব্দের জুন মাসে দ্বিতীয় আবদুর রহমান স্বয়ং গ্যালেসিয়ার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। পরবর্তী বৎসর তাঁহার পুত্র মুতাররিফও গ্যালেসিয়ার বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। আরিয়াসের শাসনকর্তা আলফলোর উত্তরাধিকারী এবং পুত্র রামিরোর বিরুদ্ধে ৮৪৬ খ্রীঃ অন্য দুইটি অভিযান পরিচালিত হয়।

কনস্টান্টিনোেপল ও নাভাররের রাষ্ট্রদূতগণ

এশিয়া মাইনর দখলের পর আব্বাসীয়রা কনস্টান্টিনোপলের দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হয়। বাইজান্টানিয়োরা অতঃপর তাহাদের বিরুদ্ধে উমাইয়াদের সাহায্য কামনা করে। ২০৮ হিঃ/ ৮২৩ খ্রীঃ বাইজান্টাইন সম্রাট মিকায়েল দ্বিতীয় উন্নত জাতের ঘোড়া ও মূল্যবান উপহারসহ কর্ডোভায় দূত প্রেরণ করেন। অভ্যন্তরীণ গোলযোগের জন্য আমীর তখন বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করিতে পারেন নাই। কনস্টান্টিনোেপপালের সম্রাট মিকায়েলের উত্তরাধিকারী এবং পুত্র থিওফিলান মূল্যবান উপহারসহ কর্ডোভায় এক দূত প্রেরণ করেন এবং আব্বাসীদের বিরুদ্ধে উমাইয়াদের সাহায্য প্রার্থনা করেন। কিন্তু আবদুর রহমান অভ্যন্তরীণ ও সীমান্তের বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। পূর্বপুরুষ কর্তৃক অধিকৃত দেশ পুনর্দখলের মত সময় ও সামর্থ তাহার ছিল না। তবুও তিনি ইহার পরিবর্তে ইয়াহিয়া বিন হাকাম আল গাজ্জালের (১৫৬ হিঃ ৭৭৩- ২৫০ হিঃ / ৮৬৪ খ্রীঃ) নেতৃত্বে কনস্টান্টিনোপলে দূত প্রেরণ করেন। বাইজান্টাইনের সহিত সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়িয়া ওঠে।১৭

নাভাররের কাউন্ট যাহাকে ফ্রান্সের সম্রাট পরাভূত করিয়াছিলেন তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সম্পর্ক দৃঢ় করিবার উদ্দেশ্যে কর্ডোভায় দূত প্রেরণ করেন। কাউন্ট এবং আমীরের মধ্যে এই শর্তে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যে মুসলমানরা তাহাকে বহিরআক্রমণ হইতে রক্ষা করিবে। পরিবর্তে পীরেনীজ অতিক্রম করিয়া ফ্রান্স আক্রমণে নাভাররেগণ মুসলমানদিগকে সাহায্য করিবে। কিন্তু এইচুক্তি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয় নাই। দ্বিতীয় আবদুর রহমান মরক্কো হইতে তিউনিস পর্যন্ত বার্বার রাজ্য দখল করেন।

নরম্যান আক্রমণ

নরম্যানরা (মাজুস) জার্মান বংশোদ্ভূত। তাহারা অর্ধশতাব্দী ধরিয়া সমুদ্র তীরবর্তী, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করিয়াছিল। স্ক্যান্ডেনেভিয়ার অধিবাসী ও নৌপরিচালনায় সুদক্ষ এই সম্প্রদায় জলদস্যুতায় পারদর্শী ছিল। ২২৯ হিঃ জুলহাজ ৮৪৪ খ্রীঃ আগস্ট মাসে তাহারা লুসিতানিয়ার (বর্তমান পর্তুগাল) উপকূল হইতে আটটি জাহাজ যোগে আক্রমণ করে এবং উপকূলবর্তী শহর লিসবন ও কাদিম লুণ্ঠন করিয়া সেভিলের দিকে অগ্রসর হয়। তাহারা গোয়াদালকুইভিরের দ্বীপসমূহ ও সেভিল নগরীর ধ্বংসসাধন ও অসংখ্য লোককে হত্যা করে। তাহারা সেভিল ও তাহার পার্শ্ববর্তী গ্রামসমূহ হইতে মুসলমান, ইহুদী ও খ্রীস্টান অধিবাসীদিগকে বিতাড়িত করিয়া বিয়াল্লিশদিন ব্যাপী এক নারকীয় দৃশ্যের অবতারণা করে। গোয়াদালকুইভিরের পূর্বে ও সেভিলের দক্ষিণে অবস্থিত তাবলাদায় আবদুল ওয়াহিদ বিন ইস্কান্দারানী, আবদুল্লাহ বিন কুলাইব এবং মুহাম্মদ বিন রুস্তমের নেতৃত্বে

মুসলমানদের হাতে এক হাজার নরম্যান নিহত ও চারশত বন্দী হয়। তাহারা পলাইয়া গেলেও পুনরায় আগমন করিয়া উপকূলীয় শহর আক্রমণ ও আলজাসিরার ধ্বংস সাধন করে। পরবর্তীকালে মুসলমান ও নরম্যানদের মধ্যে একাধিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম দিকে নরম্যানগণ জয়লাভ করে এবং উপকূলীয় শহর লুণ্ঠন করিতে থাকে। কিন্তু মুক্তি পণের বিনিময়ে মুসলিম বন্দীদের মুক্তি দিয়া দেশ ত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। অতঃপর আমীর মুসলিম নৌবাহিনী গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। পরবর্তীকালে ইহা সুসংগঠিত ও সুদক্ষ নৌসেনাতে পরিণত হয়। সেভিলে নৌঘাটি স্থাপিত হয় এবং উপকূলবর্তী শহরগুলিকে পরবর্তী আক্রমণ হইতে সুরক্ষিত করা হয়। সামুদ্রিক আক্রমণ হইতে উপকূলীয় এলাকাকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ৮৪৪ খ্রীস্টাব্দের পর কিছু প্রহরী স্তম্ভ (Watch Tower) নির্মিত হয়।১৮

কর্ডোভার গোড়া খ্রীস্টানগণ

ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মতে, আবদুর রহমান ছিলেন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সমর্থক। আবদুর রহমানের শাসনের শেষ প্রান্তে (৩৩৬-৩৮ হিঃ/ ৮৫০-৮৫২ খ্রীঃ) কর্ডোভার ধর্মোম্মাদ খ্রীস্টানগণ মুসলমানদিগকে অবজ্ঞা ও অবহেলা করিতে থাকে এবং তাহাদের পয়গম্বরের বিরুদ্ধে কটুক্তি করিতে শুরু করে। খ্রীস্টান ও ইহুদী (Enlightened) বুদ্ধিজীবীদের আরবদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিল না। বরং তাহারা আরব শাসনে সন্তুষ্ট ছিল। তাহাদের ছিল ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং তাহারা রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিল। শিক্ষিত ও সাংস্কৃতিবান অনেক খ্রীস্টান ইউরোপের অনেক দেশে রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ধনী আরব (Magnet) তাহাদের জমিদারী ও ব্যবসা তত্ত্বাবধানের জন্য প্রতিভাবান খ্রীস্টানদিগকে নিয়োগ করিয়াছিলেন। আরবী ভাষার প্রকাশভঙ্গি ও রচনায় উপমা ব্যবহারের সুবিধায় মুগ্ধ হইয়া খ্রীস্টানগণ আরবী ভাষা শিখিতে শুরু করে। যদিও রোমান উচ্চারণ ভঙ্গিতে তাহারা কথা বলিত ১৯ তাহারা ল্যাটিন ভাষায় লিখিত বিষয়ের প্রতি অনিচ্ছা ও অবজ্ঞা প্রকাশ করিত।২০ ৮৫৪ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে হাজারে একজনও তাহাদের নিজ ভাষায় ভালোভাবে লিখিতে পারিত না। আরব সভ্যতার যাদুকরী শক্তিতে বিমুগ্ধ হইয়া এবং নিজেদের সাহিত্য দর্শন শিল্পকলার দীনতা পরিদর্শন করিয়া তাহারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করিয়াও আরবদের পোষাক পরিচ্ছদ ও আচার ব্যবহার নির্বিবাদে অনুকরণ করিতে শুরু করে। আররীতে বাইবেল অনূদিত হয়। এই সমস্ত সংস্কৃতিবান শিক্ষিত খ্রীস্টানদের দ্বারা বিশেষ গোষ্ঠী গড়িয়া ওঠে এবং আরবী শব্দ মুস্তারিবের বিকল্প মুস্তারাংশ (Lt. Muztarabes) নামে অভিহিত হয়।২২ কর্ডোভা, সেভিল, সারাগোসা এবং টলেডোর ন্যায় বড় বড় নগরীতে তাহারা মুসলমানদের সহিত খুবই ঘনিষ্ঠভাবে ও অন্তরঙ্গ পরিবেশে বসবাস করিত। আরবী ভাষা ও আরব প্রথার প্রতি আকৃষ্ট হওয়ায়

তাহাদিগকে কঠোর ভাবে বিরোধিতা করিত। গোঁড়া খ্রীস্টান সম্প্রদায় আরবদিগকে তাহারা জবর-দখলকারী বলিয়া মনে করিত। মুসলিম বিরোধী নীতি গ্রহণ করিলে তাহাদিগকে বিতাড়িত করা যাইবে এই ছিল তাহাদের বিশ্বাস। তাহারা আরবদের সহিত সহযোগিতা করিত না এবং মুজারাবদিগকে জাতিচ্যুত বলিয়া উপহাস করিত।

মুজারাবদের (আরবীয় খ্রীস্টানদের) প্রতি ধর্মান্ধ খ্রীস্টানদের ছিল তীব্র ঘৃণা। তাহারা শহরে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পেশায় নিযুক্ত ছিল। গ্রামগুলিতে ছিল তাহাদের প্রাধান্য। মফস্বল শহর সেরানিয়াতে দিন দিন তাহাদের সংখ্যা বৃদ্ধি হইতে থাকে। তাহারা জনসাধারণের মধ্যে অসন্তোষের ইন্ধন যোগাইতে শুরু করে। মতামত প্রকাশের অধিকার এমন যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করিত যে নামাজের সময় মসজিদে প্রবেশ করিয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ করিত। এই বিদ্বেষ প্রকাশের নেতা ছিলেন যাজক ইউলোজিয়াস ও তাহার যোগ্যতম সহযোগী ও বন্ধু আল ভোরো।

ইউলোজিয়াস ফ্লোরার নিকট একটিপত্র লিখেন। মুসলিম পিতা ও খ্রীস্টান মাতার গর্ভে ফ্লোরার জন্ম। চিঠির কিয়দাংশ : “পবিত্র আত্মা ভগ্নি ফ্লোরা। আপনি যখন আমাকে আপনার সুদীর্ঘ গ্রীবাদেশের বেত্রাঘাতের দাগ দেখাইতে ছিলেন, সে সময় সেখানে ঘন কুন্তলে আবৃত, লম্বা কেশদাম ছিল না। এই রূপে আপনি আমাকে সম্মান প্রদর্শন করিয়াছিলেন। আপনার ন্যায় আমাকে আপনি পবিত্র আত্মার সম্মান দান করিয়াছিলেন। আমি আপনার আঘাতের স্থানের উপর হস্ত স্থাপন করিয়াছিলাম। আমি চুম্বন দ্বারা আপনার জখম ভাল করিরাব, সুযোগ পাইয়াছিলাম। আফসোস কেন আমি ইহা করিলাম না।” চিঠির ভাষা হইতে মনে হয় সুন্দরী ফ্লোরার প্রতি ইউলোজিয়াস গভীরভাবে প্রেমাসক্ত ছিল। ফ্লোরার সহিত সাক্ষাতের পর ইউলোজিয়াস ধর্ম, বিদ্বেষী আন্দোলন পূর্ণদ্যোমে আরম্ভ করেন। দ্বিতীয় আবদুর রহমান তাহার সাম্রাজ্যের ধর্মীয় নেতাদের এক সভা আহবান করেন। আমীরের প্রতিনিধিত্ব করেন তাহার সেক্রেটারী এন্টনীপুত্র গোমেজ। বেইনাউডের মতে, “অতিমাত্রায় শত্রু ভাবাপন্ন কতিপয় ধর্মযাজকের প্রতিবাদ সত্ত্বেও বিশপ মত প্রকাশ করেন যে, অপর ধর্ম অবলম্বীদের বিরুদ্ধে উত্তেজনা সৃষ্টি করা বাইবেলের আদর্শ বিরোধী। ঘৃণা ও উত্তেজনা সৃষ্টি হইতে বিরত থাকা অতি পুণ্যের কাজ”।২৩ এই সভায় বিশপ হযরত মুহাম্মদ (দঃ) উপর অভিশাপের বিরুদ্ধে বিধিনিষেধ আরোপ ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করিয়া আদেশ জারী করেন। কিন্তু কোন কিছুই ঐ সমস্ত ধর্মান্ধদের বিরত করিতে পারেনা। তাহারা বিশপের ক্ষমতা ও আদেশকে অমান্য করে। ফ্লোরা পারফেকটাস এবং ইউলোজিয়াসের ন্যায় কর্ডোভার খ্রীস্টান যাজকগণ ধর্মোম্মাদের মত ইসলামের বিরুদ্ধে ও মুহম্মদ (দঃ) উপর অভিশাপ দিতে থাকে। অপরাধীদের কাজীর দরবারে হাজীর করা হয়। সেখানেও তাহারা ঘৃণা ও বিদ্বেষ প্রকাশ করে।

ইসলাম ও তাহার পয়গম্বরের বিরুদ্ধে গোঁড়া খ্রীস্টানদের কটুক্তি মুসলিম স্পেনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘটনা তাহাদের অনমনীয় মনভাবের পরিচায়ক। তাহারা মুসলমানদের শাসন এমন কি সমস্ত কিছুরই বিরোধিতা করে। প্রথমে এই সমস্ত লোকের প্ররোচনায় কোন গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই। কিন্তু আন্দোলনের প্রচণ্ডতা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোরতা অবলম্বন করা ব্যতীত উপায় থাকে না। ইউলোজিয়াস ও ইসহাকের ভগ্নি ফ্লোরা এবং মেরীসহ কতিপয় ধর্মোন্মাদ ব্যক্তিকে বন্দী করা হয়। বিশপ পারফেকটাস ইসাক এবং রাজপ্রাসাদের খ্রীস্টান প্রহরী সাঞ্চোসহ ১১ ব্যক্তিকে ৮৫০ খ্রীস্টাব্দে মৃত্যু দণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। এক বৎসর পর ২৪ শে নভেম্বর ৮৫১ খ্রীঃ জেলখানায় ফ্লোরা ও মেরিকেও প্রাণ হারাতে হয়। ইউলোজিয়াস মুক্তি পায়। আবদুর রহমানের মৃত্যুর পর ৮২৫ খ্রীস্টাব্দের পরও আন্দোলন অপ্রতিহত গতিতে চলিতে থাকে। এই আন্দোলন পরবর্তীকালে চার্চ কাউন্সিল কর্তৃক অনুমোদন লাভ করে। এই আন্দোলনে মৃত ব্যক্তিদের শহীদ ও সাধু পুরুষ বলিয়া ঘোষণা করা হয়। মুসলমানদিগকে স্পেন হইতে বিতাড়িত করিবার উদ্দেশ্যেই খ্রীস্টানরা এই জঘন্য প্রচারে লিপ্ত হইয়াছিল। এই আন্দোলনের ফলে বহু সংখ্যক মুজারা২৪ স্বধর্মীয়দের কার্যকলাপে জড়িত থাকার সন্দেহ হইতে বাঁচিবার উদ্দেশ্যে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্পেনে নব মুসলিমদের সংখ্যা বেশি বৃদ্ধি পায়।

পরলোক গমন : দ্বিতীয় আবদুর রহমান ২৩৮ হিঃ/ ৮৫২ খ্রীঃ রবিউল আওয়াল মাসে ৬২ বৎসর বয়সে জ্বরে আক্রান্ত হইয়া মৃত্যু বরণ করেন। তিনি ত্রিশ বৎসরের মত

করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাহার জ্যেষ্ঠপুত্র মুহাম্মদকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন।

চরিত্র ও কৃতিত্ব

দ্বিতীয় আবদুর রহমানের রাজত্ব কালে উমাইয়া সাম্রাজ্য দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইহার উজ্জ্বল ভবিষ্যত প্রতিভাত হইতে থাকে। অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও সীমান্তে অশান্তি থাকা সত্ত্বেও আবদুর রহমান তাহার শাসনের ত্রিশ বৎসরকাল স্পেনের সংস্কৃতির উন্নতির ক্ষেত্রে বিরাট অবদান রাখেন এবং তৎকালীন পৃথিবীতে স্পেন সভ্যতার ক্ষেত্রে বিশেষ আসন লাভ করে। রাজ্যের প্রশাসন যন্ত্রকে আব্বাসীয়দের অনুকরণে গড়িয়া তোলেন। মুদ্রা ব্যবস্থারও উন্নতি সাধন করেন। তিনি পুনর্গঠিত সরকারী সিল মোহরের প্রচলন করেন।

দ্বিতীয় আবদুর রহমান প্রশাসন যন্ত্রকে পুনর্গঠিত করেন। মন্ত্রীদিগকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমীর আবদুল করিম বিন মুগিছকে যিনি হিশামের প্রধান সেনাপতি ও প্রথম হাকামের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, পাইয়াছিলেন হাজীব হিসাবে। প্রতিভাবান ইসা বিন শহিদ আবদুর রহমান বিন রুস্তম, ইউসুফ বিন বখত এবং মুহাম্মদ বিন সালাম তাঁহার উজির নিযুক্ত হইয়াছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে আমীর নিজেই

নিয়োগপত্র দিতেন। খাজাঞ্চিগণ তাহাদের দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করিতেন। প্রধান খাজাঞ্চি জুদায়ের সংগীতকার জিরইয়াবকে খাজাঞ্চি খানা হইতে সংগীতের পুরস্কার হিসাবে আমীরের আদেশে ৩০,০০০ হাজার দিনার দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন এবং আমীর নিজ তহবিল হইতে সংগীতকারকে এই অর্থ প্রদান করেন। ইহা একটি ঐতিহাসিক ঘটনা।২৫ প্রশাসনকে সুদক্ষভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে তিনি কর বৃদ্ধি করেন। ইবনে সাঈদের মতে, কর ছয় লক্ষ দিনার হইতে দশ লক্ষ দিনারে বৃদ্ধি করা হয়।২৬ সৈন্য বিভাগের ব্যাপারে তিনি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেন। সৈন্য বিভাগের দায়িত্ব অর্পিত ছিল যুবরাজ মুহাম্মদ ও হাজীব আবদুল করিমের উপর। আবদুর রহমান তাঁহার পিতা কর্তৃক গঠিত দেহ-রক্ষীর সংখ্যা বৃদ্ধি করেন এবং যুদ্ধাস্ত্রের উন্নতি সাধন করেন। পূর্বের শাসন আমল অপেক্ষা তাহার রাজত্বকালে সীমান্ত প্রদেশ অধিক স্বাধীনতা ভোগ করে। তাহার শাসনকাল ছিল দুর্যোগপূর্ণ। কিন্তু তিনি কঠোর হস্তে সমস্ত বিদ্রোহ দমন করেন, এবং তাহার উত্তরাধিকারীর জন্য বিরাট সাম্রাজ্য রাখিয়া যান।

শিল্প ও চারুকলার প্রতি তাহার বিশেষ আকর্ষণ ছিল। তিনি ছিলেন সুদক্ষ স্থপতি। রাজপ্রাসাদ প্রদর্শনকালে গ্রীকদূত কর্ডোভা ও কর্ডোভার পার্শ্ববর্তী এলাকার ঐশ্বৰ্য্য ও সৌন্দর্যে গভীরভাবে অভিভূত হন। গোয়াদালকুইভিরের সুদীর্ঘ তীর ব্যাপী মনোমুগ্ধকর অট্টালিকা ও বাগান গড়িয়া উঠিয়াছিল। কর্ডোভা নগরীতে সিয়েররা ঝরণা হইতে শীশার পাইপের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে পানি আনা হইত। কর্ডোভা নগরীতে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য অসংখ্য হাম্মাম ছিল। পানি নিষ্কাশন ও পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থার চরম উৎকর্ষতা লাভ করে। মারবেল পাথরের তৈরি রাস্তা ও ঝর্ণাগুলি নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি। করে। নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ ও পুরাতন রাস্তাসমূহ মেরামত করা হয়। সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত সীমা পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধিত হয়। রাজ্যে প্রধান প্রধান শহরে মসজিদ নির্মিত হয়। সেভিল এবং জায়েনে আমীর সুদৃশ্য জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। কর্ডোভা মসজিদে অতিরিক্ত দুইটি বারান্দা (Porch) নির্মাণেও তিনি হাত দেন। পরবর্তীকালে তাহার পুত্র ও উত্তরাধিকারী প্রথম মুহাম্মদ উহা সমাপ্ত করেন। এই সংযোজনের ফলে মসজিদের সারির সংখ্যা ৮ হইতে ১৫ সারিতে উন্নীত হয়। মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে পৃথক মেহরাব নির্মাণ দ্বারা এই সংযোজন ২১৮ হিঃ/৮৩৩ খ্রীঃ করা হয়। মিম্বরের দক্ষিণ পার্শ্বে একটি মাকসুরা (সুরক্ষিত কক্ষ) ২৩৪ হিঃ/৮৪৮ খ্রীঃ নির্মিত হয়। ২১২ হিঃ৮২৭-২৮ খ্রীঃ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সীমান্ত শহরগুলিকে পুনর্নির্মাণ করা হয়। সেভিল নগরীর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা হয়। উপকূলীয় শহরগুলিকে নরম্যানদের আক্রমণ হইতে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে উপকূলীয় প্রহরী নিযুক্ত করা হয়। আটলান্টিক মহাসাগরে শত্রুদের গতিবিধির প্রতি লক্ষ্য রাখিবার উদ্দেশ্যে এবং জাহাজের যাতায়াতে পথ নির্দেশের জন্য উপকূল বরাবর প্রহরীস্তম্ভ নির্মিত হয়।

সমুদ্রগামী জাহাজ প্রস্তুতের একটি কারখানা সেভিলে স্থাপিত হয়। দুর্ভিক্ষের বৎসর সরকারি খাজনা মওকুফ এবং সরকারি খাদ্য গুদাম হইতে দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত জনসাধারণের মধ্যে খাদ্য বণ্টন করা হইত। ন্যায়পরায়ণতা ও দানশীলতার জন্য আমীরকে জনসাধারণ ভাল বাসিতেন। আবদুর রহমান শুধু চারুকলা ও স্থাপত্য শিল্পকেই ভালবাসিতেন না, তিনি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যেরও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। গ্রীক দর্শনের উপর লিখিত পুস্তকসমূহের তিনি ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছেন। নতুন এবং দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থসমূহ সংগ্রহের জন্য তাহার প্রতিনিধিরা প্রাচ্যের শহরগুলি ভ্রমণ করেন। বিজ্ঞানের উপর লিখিত গ্রীক ও ফার্সী ভাষার গ্রন্থগুলির আরবী অনুবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে আব্বাস ইবনে নাসীহ মেসোপটেমীয়ার লাইব্রেরিগুলি তন্ন তন্ন করিয়া অনুসন্ধান করেন।২৭ তাহার শাসনকালে কর্ডোভার লাইব্রেরি মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠ লাইব্রেরি রূপে গড়িয়া ওঠে। তাহার দুই পুত্র মুহাম্মদ এবং ওমর তাহাদের গৃহশিক্ষক ইবনুল মুসান্না (মৃঃ ২৭৩ হিঃ/ ৮৮৬-৮৭ খ্রীঃ) হাবিব বিন আউসের লিখিত কবিতার সংকলন স্পেনে বহন করিয়া আনেন। আমীর নিজেও একজন উচ্চাঙ্গের কবি ছিলেন। তাহার সভা কবি ওবায়দুল্লাহ বিন চালমান বিন বদর এবং আবদুর রহমান বিন শিমরের রচিত কবিতা তিনি শ্রবণ করিতেন। ইয়াহিয়া ইবনুল হাকাম ওরফে আল গাজ্জাল (মৃঃ ৮৬৪ খ্রীস্টাব্দ) তাহার সভার অন্য একজন বিখ্যাত কবি ছিলেন। তিনি মরমী ও ব্যঙ্গ কাব্য রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

আমীর কর্ডোভায় একটি অনুবাদ সংসদ স্থাপন করেন। এই সংসদ কর্তৃক গ্রীক ভাষায় লিখিত দর্শন ও বিজ্ঞানের গ্রন্থ আরবীতে অনূদিত হয়। অন্যান্য বিষয়ের পুস্তক প্রাচ্যের শহরগুলি হইতে আমদানী করা হইত। নতুন প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলিতে ব্যবহারের জন্য বাগদাদ ও প্রাচ্য শহরগুলি হইতে ঔষধপত্র আনয়ন করা হইত। গ্রীক এবং ফার্সী ভাষায় লিখিত বিজ্ঞান ও দর্শনের গ্রন্থগুলির আরবী অনুবাদসমূহ নূতন স্থাপিত মেডিক্যাল স্কুলগুলিতে ব্যবহার করা হইত। তাহার উদ্ভিদ ও প্রাণীজ বাগানের জন্য বিভিন্ন প্রকার প্রাণী ও উদ্ভিদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে তিনি প্রাচ্যের সর্বোত্র প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলিতে স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। গরীব ও দরিদ্র জনগণের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় দাতব্য প্রতিষ্ঠানসমূহ। জনসাধারণের মধ্যে বিদ্যাশিক্ষার প্রতি ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়। তাহার পরবর্তী বংশধরগণ বিশেষ করিয়া তৃতীয় আবদুর রহমান এবং দ্বিতীয় হাকাম ও অন্যান্য শাসকগণ তাহার প্রবর্তিত পথ অনুসরণ করেন। জীবনের কোন দিককেই আমীর উপেক্ষা করেন নাই। রাজদরবারে আনুষ্ঠানিকতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য এক নতুন আদেশ জারী করেন এবং ইরানী ও আরবীয় আচার অনুষ্ঠান ও খাওয়া পরার রীতি প্রচলন করেন। রাজপ্রাসাদে ব্যবহৃত তিরাজ (কারুকার্য খচিত সিল্কের কাপড়) তৈয়ারীর জন্য একটি সরকারী প্রতিষ্ঠান গড়িয়া ওঠে। তাঁতশিল্প

ও কাপড়ে সূচীকর্ম এবং কারুকার্যে উৎসাহিত করা হইত। দামী পর্দা এবং অন্যান্য মূল্যবান দ্রব্য প্রাচ্য হইতে আমদানী করা হইত। দ্বিতীয় আবদুর রহমানের রাজপ্রাসাদ জাঁকজমকের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। “আবদুর রহমানের শাসনকালে স্পেনের যে সমৃদ্ধি সাধিত হয় পূর্বের সুলতানদের আমলে তেমনটি হয় নাই বলিয়া ডজি মন্তব্য প্রকাশ করেন।২৮ রাজকীয় আড়ম্বর ও আঁকজমকে তিনি ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের সমকক্ষ ছিলেন। তাঁহার আড়ম্বর ও জাঁকজমক প্রিয়তা কর্ডোভার রাজদরবারে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন সাধন করে। উমাইয়াগণ তাহাদের শাসনের এক শতাব্দী কালের তিন চতুর্থাংশ ব্যয় করেন প্রশাসন যন্ত্রের পুনর্গঠনে ও নিজেকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিবার উদ্দেশ্যে। আবদুর রহমান ছিলেন প্রথম শাসক যিনি প্রাচ্যের আব্বাসীয়দের অনুকরণে সর্বপ্রথম স্পেনে রাজ ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। পণ্ডিত ব্যক্তি ও বিখ্যাত শিল্পীগণ তাহার দরবারে ভীড় করিত। আমীর সঙ্গীত ও দাবা খেলার প্রতি ভীষণ অনুরক্ত ছিলেন। আব্বাসীয়রাও অনুরক্ত ছিলেন এইরূপ আমোদ-প্রমোদের। সঙ্গীতপ্রিয়তা ছিল আরব স্পেনীয়দের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। সর্বশ্রেণীর লোকের মধ্যে ইহার প্রসার ঘটে। আবদুর রহমান তাহার প্রাসাদের কবি, গায়ক ও শিল্পীদের মুক্ত হস্তে দান করিতেন। বিখ্যাত তারুব ব্যতীত তাহার হারেমে ছিল শাফা, কালাম, ফজল নামে তিন অপরূপ সুন্দরী এবং একজন কবি ও গায়িকা যিনি হারুন-অর-রশিদের কন্যার সাথী ছিলেন এবং হারুন-অর-রশিদের প্রাসাদে থাকিয়া শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন ২৯ জিরইয়াব-এর প্রবর্তিত প্রাচ্য আচার-আচরণ ও পোশাক পরিচ্ছদের প্রতি আবদুর রহমানের বিশেষ অনুরাগ ছিল।

জিরইয়াব কর্তৃক প্রচলিত খাবারের মধ্যে ছিল শামি কাবাব ও কাবাব। জিরইয়াব আবহাওয়ার সাথে সঙ্গতি রাখিয়া পোশাক পরিধান করিতেন। চামড়ার টেবিল কভার, কাঁচের পাত্র এবং সম্মুখের দিকে ঝুলাইয়া কেশ বিন্যাসের রীতিও তিনিই প্রচলন করেন।

আবদুর রহমান সংগীত ও সুন্দরী ক্রীতদাসী পরিবৃত্ত হইয়া থাকিলেও সময় মত নামাজ আদায় করিতেন এবং ইসলামের আদর্শ মানিয়া চলিতে চেষ্টা করিতেন। তিনি একবার রমজান মাসের একটি রোজার পরিবর্তে ষাটটি রোজা রাখেন। তিনি ইসলামী আইন ও জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখিতেন। তিনি ছিলেন দার্শনিক ও কবি। তিনি জ্ঞানী গুণিদের কদর করিতেন। খ্রীস্টান, ইহুদী ও স্পেনীয় কারিগর, ব্যবসায়ী এবং খ্রীস্টান স্ত্রী ও চাকর চাকরানীদের সংস্পর্শে আসার ফলে প্রাচ্যের আচার অনুষ্ঠানে পরিবর্তন আসে। স্পেনে বসবাসকারী মুসলমানদের মধ্যে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে স্থানীয় উপভাষা ল্যাটিন প্রাধান্য লাভ করে।৩১ কালক্রমে আরব ও বার্বার অশ্বারোহীদের বংশধরেরা আন্দালুসিয়ান আবহাওয়ায় সহনশীল ও কোমল হইয়া ওঠে। বার্বার ও

স্পেনীয়দের রক্তের সংমিশ্রণে বাদামী কেশ ও নীল আঁখি বিশিষ্ট স্পেনীয়-আরবদের উদ্ভব হয়। প্রথম আবদুর রহমান যে সংস্কৃতি চালু করিয়াছিলেন দ্বিতীয় আবদুর রহমানের সময় উহা চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়। এই সংস্কৃতি না ছিল ইসলামের না ছিল আরব ও বার্বারদের। প্রাচ্য ও স্পেনীয়দের সংমিশ্রণে সৃষ্ট এই সংস্কৃতিকে স্পেনীয় মুসলিম সংস্কৃতি বলা যাইতে পারে।

তথ্য নির্দেশ

এক প্রকার কালো পাখিকে জিরিয়াব বলে। ইহা তোতা পাখীর চেয়ে বেশি স্মরণশক্তির অধিকারী, হোল, পৃঃ ১৬৯। জে রিবেরা, হিস্টোরিয়া ডি লা কনকুয়েজটা ডি ইস্পনা, মাদ্রিদ, ১৯২৬ মূল পূঃ ৬৮ (অনুবাদ পৃঃ ৫৩-৫৪)। মাক্কারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৮৭-৮৮; হিট্টি, হিস্ট্রি অব দ্যা আরবস পৃঃ ৫১৪ দ্রষ্টব্য। লেভি প্রভেঙ্কাল, লা সিভিলাইজেশন আরব এন ইস্পানা (স্পেনিশ অনুবাদ) পৃঃ ৬৮-৭০ দেখুন। হোল, আন্দালুস, পৃঃ ১৬৭-১৬৯ দ্রষ্টব্য। ফার্মার, হিস্ট্রি অব দ্যা এ্যারাবিয়ান মিউজিক, পৃঃ ১১৮-১৯। গায়ানগোস, ১ম খণ্ড ১১৬-১২১; হোল পৃঃ ১৬৭ দেখুন।

হোল, আন্দালুস, পৃঃ ১১৬; লেভি প্রভেঙ্কাল, লা ইস্পনা, পৃঃ ৭২ দেখুন। ৯। ইবনুল ইজারী, বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৯৪। ১০। ই, জি, গমেজ, হিস্টোরিয়া ডি ইস্পনা, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৩৯-৪১ দেখুন। ১১। ইভানা সাগরেদা, ১৩শ খণ্ড, পৃঃ ৪১৬ দেখুন। ১২। উম বাকেটের সংগ্রহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৩৭৯ রেনাউদ কর্তৃক উদ্ধৃত। (অনুবাদ এইচ. কে.

শেরওয়ানী) মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ১১৩-১১৪ দেখুন। ১৩। এইচ. কে. শেরওয়ানী, মুসলিম কলোনি, পৃঃ ১১৫। ১৪। ডম বাকেটের সংগ্রহ, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৩০৮, মুসলিম কলোনি, পৃঃ ১১৬। ১৫। মাক্কারী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৬১। ১৬। মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ১১৮। ১৭। ঐ, পৃঃ ১২০। ১৮। আল-দাবিব, পৃঃ ৪৮, টীকা-২; গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১১৪-১৫। ১৯। গ্রনেবাউম, জি, ই, ভন, সম্পাদিত ইউনিটি এ্যান্ড ভ্যারাইটি ইন মুসলিম সিভিলাইজেশন,

শিকাগো, ১৯৫৫, পৃঃ ২০৭। ২০। আরনল্ড, প্রিচিং অব ইসলাম, পৃঃ ১৩৭, ওয়াট, পৃঃ ৫৭, ৭২। ২১। হোল, আন্দালুস, পৃঃ ৩১। ২২। টলেডোর মোজারেবগণ ৬ষ্ঠ আল-ফন্সে কর্তৃক ১০৮৫ খ্রঃ টলেডো বিজিত হওয়ার পর বহুদিন

পর্যন্ত আরবি অক্ষরে স্পেনিশ লিখিত। ২৩। হোল, পৃঃ ৪৯।

২৪। এইচ. কে. শেরওয়ানী, মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ১২৩; হেইনস্, সি আর, খ্রীস্টানিটি-এ্যান্ড ইসলাম

ইন স্পেন, লন্ডন, ১৮৮৯। ২৫। লেভি প্রভেঙ্কাল, লা-ইস্পানী, পৃঃ ৩৪ দেখুন। ২৬। ইফতিতাউদ আল-আন্দালুস পৃঃ ৬৮-৬৯। ২৭। আল-মাক্কারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১২৪। ২৮। লেভি প্রভেঙ্কাল, লা-ইস্পনা, পৃঃ ৬৪, ৮৫। ২৯। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৬০। ৩০। আল-মাক্কারী, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৬২; ইবনুল কুতাইবা, পৃঃ ৫৮, ইবনুল আছির, ৭ম খণ্ড, পৃঃ ৪৬। ৩১। লেভি প্রভেঙ্কাল, লা-ইস্পনা, পৃঃ ১৯।

সকল অধ্যায়
১.
উপক্রমণিকা (মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস)
২.
প্রথম অধ্যায় : মুসলমানদের স্পেন বিজয়
৩.
দ্বিতীয় অধ্যায় : দামেস্ক-খেলাফতের অধীন উমাইয়া আমীরদের শাসন
৪.
তৃতীয় অধ্যায় : স্বাধীন উমাইয়া আমীরদের রাজত্ব
৫.
চতুর্থ অধ্যায় : প্রথম হিশাম
৬.
পঞ্চম অধ্যায় : প্রথম হাকাম
৭.
ষষ্ঠ অধ্যায় : দ্বিতীয় আবদুর রহমান
৮.
সপ্তম অধ্যায় : প্রথম মুহাম্মদ
৯.
অষ্টম অধ্যায় : মুনজির ও আবদুল্লাহ
১০.
নবম অধ্যায় : উমাইয়া খিলাফত
১১.
দশম অধ্যায় : দ্বিতীয় হাকাম
১২.
একাদশ অধ্যায় : হাজীব আল-মনসুর
১৩.
দ্বাদশ অধ্যায় : স্পেনে উমাইয়া খিলাফতের পতন
১৪.
ত্রয়োদশ অধ্যায় : স্পেনের উত্তরাঞ্চলে খ্রীস্টান রাষ্ট্রসমূহের অভ্যুদয়
১৫.
চতুর্দশ অধ্যায় : প্রথম পর্যায় ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ
১৬.
পঞ্চদশ অধ্যায় : দ্বিতীয় পর্যায় – উত্তর আফ্রিকার শাসন
১৭.
ষষ্ঠদশ অধ্যায় : তৃতীয় পর্যায়ঃ নাসরী রাজবংশ
১৮.
সপ্তদশ অধ্যায় : মরিস্ক জাতি
১৯.
অষ্টাদশ অধ্যায় : স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনের কারণসমূহ
২০.
উনবিংশ অধ্যায় : শাসনকার্য ও প্রশাসন
২১.
পরিশিষ্ট-ক : ইক্রিতিশে কর্ডোভান মুসলমানদের শাসন
২২.
পরিশিষ্ট-খ : স্পেনে মুসলিম শাসকদের বংশানুক্রমিক তালিকা
২৩.
পরিশিষ্ট-গ : উত্তর-স্পেনে খ্রিষ্টান শাসকদের কালানুক্রমিক তালিকা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%