প্রথম অধ্যায় : মুসলমানদের স্পেন বিজয়

মুসলমানদের স্পেন বিজয়
প্রথম অধ্যায়

আফ্রিকায় মুসা

২,০০০ সৈনিকের সেনাপতি কুতাইবা মধ্য এশিয়া এবং চীনা তুর্কীস্তান দখল করেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম পশ্চিম ভারতের সিন্ধু এবং মুলতান অধিকার করেন। ইয়ামানের অধিবাসী মুসা বিন নুসাইর মিশরের শাসন কর্তা আবদুল আজিজ কর্তৃক আফ্রিকার গভর্নর নিযুক্ত হন। মুসা আফ্রিকার পশ্চিম সীমান্ত আইবেরিয়ান উপদ্বীপ জয় করেন। মুসার অধীনে ইফ্রিকিয়া মিশরের নাগপাশ হইতে স্বাধীনতা লাভ করে। বিজিত অঞ্চলে তাহার শাসনকে সুসংহত করিয়া দুই পুত্রের সহযোগিতায় মুসা দ্রুত গতিতে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হন এবং তাঁহার দাসত্ব হইতে মুক্তিপ্রাপ্ত ক্রীতদাস তারিক বিন জিয়াদকে তাঞ্জিয়াতে প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করেন।

৭১১ খ্রীস্টাব্দে মেজোরকা ও সার্দিনিয়াতে মুসা কর্তৃক নৌবাহিনী প্রেরিত হয়। সেই সময় গথিক স্পেনের অন্তর্গত জিব্রাল্টার প্রণালীর দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত সিউটার (সেপ্টেম) শাসনকর্তা ছিলেন কাউন্ট জুলিয়ান।

তারিকের স্পেনে পদার্পণ

সিউটার গভর্নর জুলিয়ান এবং উত্তর আফ্রিকার স্পেনীয় উদ্বাস্তুদের অনুরোধে মুসা বিন নুসাইর স্পেন অভিযানে নেতৃত্ব দানের জন্য দামেস্কের খলিফা ওয়ালিদের অনুমতি প্রার্থনা করেন। খলিফা লুণ্ঠনের উদ্দেশ্যে শুধু আকস্মিক আক্রমণের আবেদন মঞ্জুর করেন। মুসার প্রতি বিশ্বস্ততার প্রমাণ স্বরূপ জুলিয়ানের অনুগত কিছু ব্যক্তি ৭০৯ খ্রীস্টাব্দের অক্টোবর মাসে জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করিয়া স্পেন আক্রমণ করে। মুসা তাহার ক্রীতদাস তারিককে ৭১০ খ্রীস্টাব্দের জুলাই মাসে চার শত পদাতিক ও একশত অশ্বারোহী বার্বার সৈনিক সহ স্পেনের দক্ষিণ উপকূল জরিপ এবং প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের জন্য প্রেরণ করেন।

তাহারা চারিটি জাহাজ যোগে স্পেন পৌছেন। তারিক বিন জিয়াদ কার্য সমাধা হইলে প্রত্যাবর্তন করেন এবং অভিযান পরিচালনার অনুকূলে রিপোর্ট পেশ করেন। মুসা বিরানব্বই হিজরীর ৮ই রজব (৩০শে এপ্রিল ৭১১ খ্রীঃ) ৩০০ আরব ও ৭০০০ বার্বার সৈন্যের একটি দল তাঞ্জিয়ারের শাসনকর্তা তারিক বিন জিয়াদের নেতৃত্বে স্পেনে প্রেরণ করেন। পরবর্তীকালে সৈন্য সংখ্যা ১০,৩০০ অথবা ১২,০০০ হাজারে উন্নীত হয়। কাউন্টজুলিয়ান কর্তৃক প্রেরিত চারটি জাহাজে তারিক জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করিয়া স্পেনের পার্বত্য অঞ্চলে অবতরণ করেন। এই স্থান আজও জাবালুত তারিক (তারিকের পর্বত) নামে তাঁহার স্মৃতি বহন করিতেছে। পরবর্তী কালে তিনি সেখানে রাবাত নামে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। আলজাসিরা শহরকে ঘাঁটি হিসাবে সুরক্ষিত করিয়া

তারিক জিব্রাল্টার হইতে উপকূল পথে পশ্চিম দিকে অগ্রসর হন এবং কারতেয়া ও লাগুন দে জান্দা অধিকার করেন। দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলের গভর্নর থিওডোমির এই সংবাদ পাইয়া বিচলিত হইয়া রাজা রডারিককে মুসলিম বাহিনীর আগমন সম্পর্কে অবহিত করেন।

ওয়াদী লাক্কোর যুদ্ধ ও ভিজিগথদের পরাজয়

মুসলমানদের স্পেনে আগমনের সময় রডারিক দেশের দক্ষিণাঞ্চলে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। তারিকের অভিযানের খবর পাইয়া রডারিক দ্রুত রাজধানী টলেডোতে প্রত্যাবর্তন করেন। রাজধানীতে পৌছিয়া তিনি সামন্ত রাজদেরকে তাহাদের নিজ নিজ সৈন্যদল লইয়া কর্ডোভাতে তাঁহার সহিত মিলিত হইতে আদেশ করেন। তাঁহার নিজেরও বিরাট সেনাবাহিনী ছিল। সামন্ত রাজদের সেনাসহ তাঁহার অধীনে সম্মিলিত সেনা বাহিনীর সংখ্যা ছিল এক লক্ষ। অপরদিকে তারিকের সৈন্য ছিল মাত্র বার হাজার। উভয় পক্ষের এই অসম সেনাবাহিনী ২৭শে রমজান ৯২ হিজরী (১৯শে জুলাই ৭১১খ্রীঃ) আরকোশ দে-লা ফ্রন্টের সন্নিকটে শারিশাতে (স্পেঃ জেরেজ) ওয়াদী লাক্কোর (রিবারবেট বা গোয়াদালেট) উপত্যকায় লাগুন দে-জান্দা নদীর উপকূলে মেদিনা সিনিয়ার শহর ও হ্রদের মধ্যবর্তী স্থলে তাহাদের শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘটিত এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ স্থায়ী হয় সাত দিন। উইতিজার পুত্র আচিলা ও ভ্রাতা বিশপের আক্রোশ ও অনিচ্ছা সত্ত্বেও রডারিকের অনুরোধে স্পেনের সম্মিলিত বাহিনী পরিচালনা করিতে বাধ্য হন। তাহারা আন্তরিকভাবে স্পেনে মুসলিম শাসনকে অভিনন্দন না জানাইলেও রাজা রডারিকের পতন কামনা করিতেন মনেপ্রাণে। তাহাদের ঘৃণা ও বিদ্বেষই অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দখলকারী রডারিকের পরাজয়ের মূল কারণ। তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল মুসলিম বাহিনী গনিমতের মাল লইয়া ফিরিয়া যাইবে এবং রডারিক যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত অথবা পরাজিত হইবে। এই সুযোগে তাহাদের পক্ষে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করা নিরাপদ হইবে। পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক প্রথম আক্রমণেই তাহারা যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন করে। রডারিকের পরিচালনাধীনে ছিল উন্নতমানের অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত সুশিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী। এই সেনাদলের অন্তর্ভুক্ত ছিল সাফগণ (ভূমিদাস)। তাহারা শত্রুদের আক্রমণের সাথে সাথে যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পশ্চাদপসারণের জন্য পূর্ব হইতেই প্রস্তুত হইয়াছিল। মুসলিম বাহিনীর প্রথম আক্রমণ প্রতিহত করিতে সক্ষম হইলেও শেষ পর্যন্ত তারিকের প্রচণ্ড আঘাতের সম্মুখে গথিকবাহিনী পরাজয় বরণ করিতে বাধ্য হয়। রাজা রডারিক যুদ্ধক্ষেত্র হইতে পলায়ন কালে নদী পার হইবার সময় দুর্ঘটনায় পতিত হন এবং শোচনীয়ভাবে মৃত্যু বরণ করিয়া ইতিহাসের পাতা হইতে চিরবিদায় গ্রহণ করেন।

সমস্ত সৈন্যকে একই সংগে যুদ্ধক্ষেত্রে সমাবেশ করিয়া রডারিক মারাত্মক ভুল করেন। তিনি মুসলিম সেনা বাহিনীর সম্ভাব্য অগ্রাভিযানকে প্রতিহত করিবার উদ্দেশ্যে

সংরক্ষিত সেনাসহ সমস্ত সেনাবাহিনীকে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে এমন বিরাট সাফল্যের কথা তারিক কখনও চিন্তা করিতে পারেন নাই। তিনি মুসাকে স্পেন অভিযানের ফলাফল বিস্তারিতভাবে অবহিত করেন। উত্তরে মুসা তাঁহার অগ্রাভিযান স্থগিত রাখিতে বলেন। কিন্তু বিচক্ষণ সমরবিদ তারিক ভিজিগথদের পুনরায় সংঘবদ্ধ হইবার সুযোগ না দিয়া অনতিবিলম্বে আক্রমণ করিবার প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তিনি গনিমতের মাল লইয়া আফ্রিকায় না ফিরিয়া রডারিকের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অবাক করিয়া শহরের পর শহর দখল করিয়া চলিলেন।

অবশিষ্ট এলাকাসমূহ বিজয়

এই পরাজয় খ্রীস্টানদের মধ্যে বিরাট প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। তাহারা পুনরায় স্থানীয়ভাবে অথবা আঞ্চলিকভিত্তিতে যুদ্ধ ব্যতীত বিশাল যুদ্ধক্ষেত্রে মুসলমানদের মোকাবিলা করিতে সাহস পায় নাই। দেশের বিপর্যস্ত সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতার দরুন সমগ্র স্পেন অনায়াসে মুসলমানদের করতলগত হয়। রডারিকের পরাজয়ের পর খ্রীস্টানগণ জান-মালে প্রভূত ক্ষতিগ্রস্ত হইয়া দেশ হইতে পলায়ন করে। ভূমিদাস (সাফ) ও ইহুদীগণ মুসলমানদের বিরোধীতা না করিয়া সাদরে গ্রহণ করে। কিন্তু অভিজাত শ্রেণী ও স্বাধীন সামন্ত সর্দারগণ বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলমানদের বাধা প্রদান করে। একটি ক্ষুদ্র দলের আক্রমণে এলভিরা ও আর্কিডোনার পতন ঘটে। তারিকের প্রধান বাহিনী অতি দ্রুত গতিতে এচিজার মধ্য দিয়া গথ রাজধানী টলেডো অভিমুখে অগ্রসর হয়। পলায়নপর গথগণ তাহাদের আশ্রয়স্থল হইতে মুসলিম বাহিনীকে এচিজাতে বাধা প্রদান করিতে পারি কিন্তু সম্মানজনক শর্তে তাহারা আত্মসমর্পণ করে।

মুগিম নামক জনৈক সেনানায়কের অধীনে সাতশত অশ্বারোহীর একটি ক্ষুদ্রদল কর্ডোভা নগরী অবরোধ করে। দুই মাস অবরোধের পর এক রাখাল বালকের সাহায্যে মুসলিম বাহিনী কর্ডোভা শহরে প্রবেশ করিতে সফলকাম হয়। নগর প্রাচীরের একটি সুরঙ্গ পথের সন্ধান দিয়াছিল মুসলিম বাহিনীকে এই রাখাল বালক। এই পথেই মুসলিম বাহিনী নগরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। শহর প্রশাসকের নেতৃত্বে গীর্জায় আশ্রয় গ্রহণকারী খ্রীস্টান ব্যতীত অবশিষ্ট নাগরিকগণ মুসলিম বাহিনীর নিকট সানন্দে আত্মসমর্পণ করে। সেনাপতি মুগিথ গীর্জায় পানি সরবরাহ বন্ধ করিয়া দেন।

তিনি গীর্জায় আশ্রয় গ্রহণকারী খ্রীস্টানদিগকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ অথবা জিজিয়া প্রদানে সম্মত হইতে বলেন। খ্রীস্টানগণ উভয় প্রস্তাব প্রত্যাখান করে। ৯৩ হিজরীর মহররম মাসে (অক্টোবর-নভেম্বর ৭১১ খ্রীঃ) গীর্জায় অগ্নি সংযোগের পর তাহারা আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হয়। মালাগা, অরিহুয়েলা আলজেরিয়ার রাজধানী এবং এলভিরা বিজয়ের পর মুসলিম সেনাবাহিনী পূর্বস্পেনে (লভান্তে) গমন করে এবং রডারিকের পক্ষে থিওডোমির শাসনাধীন সম্পূর্ণ পূর্বস্পেন, ভ্যালেন্সিয়া ও আলমেরিয়ার মধ্যবর্তী এলাকা অতি মুসলিমের অধীনে আসে। মুরসিয়ার গিরিসঙ্কটে থিওডোমির অল্পসময়ের জন্য মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।

মুরসিয়ার পতনের পর থিওডোমিরের সেনাবাহিনী সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়। অবশেষে তিনি পূর্বাঞ্চলের রাজধানী অরিহুয়েলাতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। পরাজিত থিওডোমির শঠতার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া নগরীর উপকণ্ঠে পুরুষ সৈন্যের বেশে অসহায় নারী ও শিশুদের সন্নিবেশ করেন। মুসলিম বাহিনী লক্ষ্য করেন যে, নগরটি অসংখ্য সৈন্য দ্বারা পরিবেষ্টিত। থিওডোমির ছদ্ম বেশে নিজেই দূত হিসাবে মুসলিম সেনাপতির নিকট প্রস্তাব পেশ করেন যে নগরবাসীর জানমাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তার আশ্বাস দিলে তাহারা আত্মসমর্পণ করিতে পারে। মুসলিম সেনাপতি রক্তপাতের পরিবর্তে এই প্রস্তাব গ্রহণ করিয়া শান্তিচুক্তি সম্পাদন করেন। সেনাপতি নগর-অভ্যন্তরে প্রবেশ করিয়া থিওডোমির ও তাহার দুই চারিজন ভক্ত ব্যতীত আর কোন সৈন্য না দেখিতে পাইয়া বিস্ময়ে হতবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “আপনার সেনাবাহিনী কোথায়?” উত্তরে থিওডোমির সম্পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করেন। থিওডোমিরের কৌশলে বিমুগ্ধ হইয়া সেনাপতি তাহাকে মুরসিয়া প্রদেশের গভর্নর নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে থিওডোমিরের নামানুসারে মুরসিয়া প্রদেশ তুদমির নামে পরিচিত হয়।

রাজধানী টলেডোর পতন

মুরসিয়া ও অরিহুয়েলা বিজয়ের পর সেনাপতি তারিক গথরাজধানী টলেডো অভিমুখে অগ্রসর হন। মুসলিম বাহিনীর দুর্বার অগ্রাভিযানে ভীত সন্ত্রস্ত রাজন্যবর্গ, অভিজাত শ্রেণী ও যাজকগণ রাজধানী পরিত্যাগ করিয়া আরিয়ার পার্বত্য অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। সাধারণ জনগণ ও ইহুদী সম্প্রদায় উফুল্লচিত্তে খ্রস্টান ও অভিজাত শ্রেণী কর্তৃক পরিত্যক্ত শহর ও নগরের শাসনভার মুসলমানদের হস্তে সমর্পণ করে। ইহুদীদের অসহযোগিতার ফলেই খ্রীস্টানগণ শহরসমূহ পরিত্যাগ করিতে বাধ্য হয়। উইতিজার পুত্রগণ ও কাউন্ট জুলিয়ান রাজধানীতে ছিলেন। মনে হয় তারিকের নিকট নগর সমর্পণের উদ্দেশ্যেই তাহারা অপেক্ষা করিতেছিলেন। তারিক বিনা বাধায় নগরে প্রবেশ করেন। নগরবাসীদের সহিত তিনি অত্যন্ত ভাল ব্যবহার করেন। রাজধানী বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী প্রচুর পরিমাণে গানিমত লাভ করেন। জন্ম তারিখ, নাম, অভিষেক ও মৃত্যুর তারিখ উত্তীর্ণ করা স্বর্ণের চব্বিশটি রাজমুকুট এই গানিমতের মধ্যে ছিল। এগুলি গীর্জার গুপ্তস্থান হইতে উদ্ধার করা হয়।”১১

তারিক বিজিত অঞ্চলে সুধু শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেন। উইতিজার পুত্র আচিলাকে মুসলিম শাসনের প্রতি আনুগত্যের স্বীকৃতি স্বরূপ ৩,০০০ হাজার কৃষিখামার সমন্বয়ে গঠিত তাহার পূর্ব জমিদারী প্রত্যার্পণ করা হয়। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে ভিজিগথদের হস্তে সীমাহীন সম্পত্তি কেন্দ্রীভূত হইয়াছিল। বিশপ অপ্পাসকে টলেডোর গভর্নর নিয়োগ করেন। কাউন্ট জুলিয়ান তাহার কাজের প্রতিদান হিসাবে সিউটা প্রদেশের শাসনভার লাভ করেন। তাঁহার পরবর্তী খ্রীস্টান বংশধরগণও প্রদেশ শাসন করেন। মধ্য ও পূর্বাঞ্চলসহ অর্ধেক স্পেন ৭১১ খ্রীস্টাব্দের গ্রীষ্মকালের মধ্যে তারিকের করতলগত হয়। এই ভাবে খলিফা আল-ওয়ালিদের রাজ্যসীমা সুদূর ইউরোপের ভূখণ্ড

পর্যন্ত প্রসার লাভ করে। তারিক তাহার কৃতিত্বপূর্ণ সামরিক বিজয়ের জন্য স্মরণীয়। কিন্তু অভিযানের পর অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে মুসাকে ক্ষুব্ধ করিয়া রাজনৈতিক দিক হইতে তিনি মারাত্মক ভুল করেন। গথিক শাসককে পরাজিত করিয়া তিনি সীমাহীন খ্যাতি অর্জন করেন। মুসলমান ও তাহাদের মিত্রগণ দেশের উত্তরাঞ্চলে পলাতক খ্রীস্টানদের পরিত্যক্ত শহরগুলিতে বসতি স্থাপন করেন। মুসলমানদের নেতৃত্বে বিজিত শহর ও জেলাগুলিতে মুসলমান গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। মুসলমানদের সংখ্যা স্বল্পতার জন্য প্রত্যেক শহরে প্রতিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করা সম্ভব ছিল না। সুতরাং অনেক শহরের শাসনভার উপদেষ্টা পরিষদের উপর ন্যস্ত করিতে হয়।

মুসার আগমন

তারিকের স্পেন বিজয় তাহার উর্ধ্বতন ব্যক্তি ও পৃষ্ঠপোষক মুসার মনে ঈর্ষার সৃষ্টি করে। মুসা এতদিন আফ্রিকায় নীরবে ছিলেন। ৯৩ হিজরীতে রমজান মাসে/জুন ৭১২ খ্রঃ সেনাপতি তারিকের অসমাপ্ত অভিযানকে সমাপ্ত করিবার উদ্দেশ্যে এবং স্পেন বিজয়ের সুনাম ও বৈষয়িক অংশ লাভের আশায় আঠারো হাজার সৈন্য লইয়া আফ্রিকা হইতে মুসা বিন নুসাইর স্পেন অভিমুখে যাত্রা করেন এবং কঙ্করময় খিদরা দ্বীপে পদার্পণ করেন। আরব অভিজাত ইয়ামানের হাবিব বিন আবু আবদাহ ফিহরী১২ ইউসুফ আল ফিহরীর পূর্বপুরুষ, রসুলের সাহাবাদের বংশধর ও কিছু বার্বার সর্দার সমন্বয়ে গঠিত হয় তাহার সেনাবাহিনী। সংখ্যাগরিষ্ঠ বেদুইন সম্প্রদায়ের উপর কর্তৃত্ব করিতেন আরবগণ। আফ্রিকায় আগত কাউন্ট জুলিয়ানরা আরবদের সঙ্গে যোগ দেন। মুসা ইচ্ছাপূর্বক তারিকের অগ্রাভিযানের পথ পরিহার করিয়া উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হন। প্রথমেই তিনি মেদিনা সিদনীয়া১৩ ও কারমোনা দখল করেন। এই দুই শহর মুসলিম শাসনাধীনে ছিল না। কয়েক মাস অবরোধের পর মুসা সেভিল১৪ অধিকার করেন। ইহার পরই নিয়েবলা, (হুয়েলভা) ও বেজা বিজিত হয়। মুসা মেরিদাতে ভিজিগথদের এক শক্তিশালী সৈন্য দলের দুর্লঙ্ঘ্য প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। দীর্ঘ এক বৎসর অবরোধের পর মেরিদা শহর রক্ষায় নিয়োজিত সেনাদল ৯৪ হিঃ শাওয়াল মাসে/৩০শে জুন ৭১৩ খ্রীঃ আত্মসমর্পণ করে।

বিজয়ী বেশে মুসা টলেডোর নিকটবর্তী তারাভেরাতে প্রবেশ করেন। সেখানে তারিক তাঁহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন। সেই যুগের প্রথানুযায়ী দুই বিজয়ী বীর তাহাদের অসি বিনিময় করেন। দুঃখের বিষয় এই দুই খ্যাতনামা বীরের সাক্ষাৎ আনন্দঘন পরিবেশ সৃষ্টি করিতে ব্যর্থ হয়। ডজি ও হেলের মতে, “মুসা তারিককে তাঁহার আদেশ অমান্যের জন্য বেত্রাঘাত করেন।”১৫ প্রবল বিক্রমশালী বীর তারিক সামরিক শৃঙ্খলার প্রতি নজিরবিহীন শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিয়া নীরবে এই অপমান সহ্য করেন। সম্ভবতঃ হযরত ওমর ফারুক ও সেনাপতি খালেদ বিন ওয়ালিদের ঘটনা তাহার স্মরণে ছিল। পরবর্তী সময়ে মুসা ও তারিকের মধ্যে আন্তরিকতা ও বন্ধুত্ব গড়িয়া ওঠে। মুসার নামে ল্যাটিন ভাষায় মুদ্রিত স্বর্ণ মুদ্রা চালু হয়। উভয়ের সেনাবাহিনী একত্রিত

করিয়া দুই বিখ্যাত সেনাপতি পুনরায় বিজয় অভিযান শুরু করেন। মুসা ও তারিক আরাগোনা অভিমুখে অগ্রসর হন। তারিক সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তীদলের সেনাপতি ছিলেন। আরাগোনার গভর্নর কাউন্ট ফরচুন আত্মসমর্পণ করিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। সারাগোসা, বার্সিলোনা, আস্তুরিকা (আস্তোর গা) লিওন, লেগিও এবং ক্যান্টবেরিয়ার রাজধানী আমায়্যা শর্তাধীনে মুসার নিকট আত্মসমর্পণ করে। উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য শহরের একের পর এক পতন ঘটে। ফলে অনধিক দুই বৎসরের মধ্যে সম্পূর্ণ স্পেন মুসলমানদের করতলগত হয় এবং উত্তরে পীরেনীজ পর্বতমালা পর্যন্ত ইহার সীমানা সম্প্রসারিত হয়। বার্সিলোনা, পাম্পোেনা, লেরিদা, হুয়েস্কা, জেরোনা এবং তরতোসা কর প্রদানে সম্মত হইয়া স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। উত্তর-পশ্চিম স্পেনের অবশিষ্ট অংশ বিজয়ের অপেক্ষায় না থাকিয়া মুসা পীরেনীজ পর্বতমালা অতিক্রম করিয়া গথিক শাসিত এলাকা লাংগোয়েডক-এর একাংশ অধিকার করেন। নারবোন, এভিগনন (আভেন্নিস) ও লুজুনের (লায়ন)১৬ পতন ঘটে। ফ্রান্সের কারোলিনজিয়ান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হেরিষ্টিলের পেপিন—আরবগণ যাহাকে কারলাহ বলিতেন। শেষোক্ত দুইটি শহর পুনরায় দখল করিয়া নারবোন অবরোধ করেন। কিন্তু ইহা অধিকার করা তাহার পক্ষে সম্ভব হয় না। ফ্রান্সের অন্তর্গত প্রদেশে ওয়ালিদের সমর্থন না থাকায় মুসলিম সেনাবাহিনী রোন (রুদাননা) নদী অতিক্রম করে না। রোন নদীর তীরে মুসলমানগণ আরবী ভাষায় উত্তীর্ণ লিপি দেখিতে পায়। ইহা ফ্রান্সের শাসক পেপিন অথবা খলিফা ওয়ালিদের দূত মুগিস স্থাপন করিয়াছিলেন। ইহাতে লিখিত ছিল “ক্ষান্ত হও আর অধিক অগ্রসর হইও না, ইসমাইলের সন্তানগণ প্রত্যাবর্তন কর”।১৭ এই শিলালিপি দেখিয়া মুসলিম সেনাবাহিনী নিরুৎসাহিত হয়। মুসলিম বিজয় জোয়ারে ওয়ালিদ আনন্দিত ছিলেন সত্য কিন্তু দূরদেশে সেনাদের দুঃখ কষ্টের বর্ণনায় মর্মাহত হন। নারবোনে অবস্থানরত মুসলমানদের দুঃখ-কষ্টের সংবাদ ওয়ালিদের নিকট পৌঁছে। সম্পূর্ণ দক্ষিণ ইউরোপ জয় করিয়া স্পেনকে সিরিয়ার সহিত সংযুক্ত করিবার জন্য মুসার পরিকল্পনা ওয়ালিদ প্রত্যাখান করেন। ফলে মুসা ফ্রান্স অভিমুখে অভিযান পরিচালনা হইতে বিরত থাকেন। ইহাতে দক্ষিণ ইউরোপের অবশিষ্টাংশ জয় করিয়া ইউরোপ ও এশিয়া মাইনরের মধ্য দিয়া তাঁহার সিরিয়াতে প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা ব্যর্থ হইয়া যায়। দামেস্কের অদূরদৃষ্টিমূলক বৈদেশিক নীতির ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তৃতির একটি সুবর্ণ সুযোগ নষ্ট হয়। অতঃপর মুসা স্পেনের পর্বতসঙ্কুল এলাকার প্রতি মনোনিবেশ করেন। সেখানে কিছু সংখ্যক পলাতক খ্রীস্টান আশ্রয় গ্রহণ করিয়া সমরসজ্জায় লিপ্ত ছিল। তিনি গ্যালিসিয়ায় প্রবেশ করিয়া লুগো দুর্গ ও অন্যান্য এলাকা অধিকার করেন এবং শত্রুকে আরিয়াসের কঙ্করময় সঙ্কীর্ণ গিরিসঙ্কটে বিতাড়িত করেন। মুসলমান সেনাপতিদের অপ্রতিরোধ্য গতি ও সাহস দেখিয়া খ্রীস্টান গেরিলা বাহিনী একের পর এক আত্মসমর্পণ করে। ত্রিশজন পুরুষ ও দশজন নারীসহ পিলাইও

আরিয়াসের কঙ্করময় গিরিসঙ্কটে কোভাডোংগাতে আত্মগোপন করিয়া রক্ষা পান। পিলাইও অপরাজিত থাকে এবং আরিয়া অনধিকৃত থাকে। এই অপরাজিত সর্দার ও অজেয় গিরিসঙ্কটই পরবর্তীকালে স্পেন হইতে মুসলিম শাসনের অবসান ও সেখান হইতে মুসলমানদের বিতাড়িত হইবার মূল কারণ হিসাবে কাজ করে।

ভিজিগথীয় শাসন আমলে দেশের রাজনৈতিক ঐক্যে ফাটল ধরে। মুসলিম শাসনকালে উহা পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্পেন ত্যাগের পূর্বে মুসা সদ্য বিজিত রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। তাঁহার পুত্র আবদুল আজিজ উত্তর-আফ্রিকার ভাইসরয়ের অধীনে স্পেনের গভর্নর পদে নিযুক্ত হন। রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয় সেভিলে। অপর পুত্র বীর যোদ্ধা আব্দুল্লাহকে ইফ্রিকিয়ার দায়িত্বভার অর্পণ করেন। কনিষ্ঠপুত্র আবদুল মালিক মরক্কোর শাসনভার গ্রহণ করেন। তাঞ্জিয়ারকে সদর দফতর করিয়া আবদুস সালেহ উপকূল রক্ষা ও নৌবাহিনীর দায়িত্ব পালন করেন। এইরূপে নববিজিত সাম্রাজ্যের শাসনভার যোগ্য হস্তে ন্যস্ত করিয়া তিনি স্পেন পরিত্যাগ করেন।

সহজে স্পেন বিজয়ের কারণসমূহ

মুসলিম সেনাবাহিনী শক্তি ও শান্তি উভয় নীতি অনুসরণ করিয়া গথিক সাম্রাজ্য অধিকার করে। স্পেনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুরাবস্থা মুসলিম অভিযানকে সাফল্য মণ্ডিত করিতে সাহায্য করে। খ্রীস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম দিকে আগমনকারী ভিজিগথ শাসকশ্রেণী ও স্পেনীয় রোমানদের মধ্যে বিদ্বেষ ও বিভেদ তখনও বিদ্যমান। পূর্ববর্তী সুয়েভী ও ভ্যাণ্ডালদের বিরুদ্ধেও ভিজিগথদের যুদ্ধ করিতে হয়। আত্মকলহে অতিষ্ঠ, যুদ্ধ ও বিবাদ-বিসম্বাদে জর্জরিত স্পেনের সাধারণ জনগণ মুসলমানদিগকে তাহাদের ত্রাণকর্তা ও হিতাকাক্ষী হিসাবে বিবেচনা করে। এই জন্য তাহারা মুসলিম আক্রমণ ও অভিযানকে সর্বতোভাবে সাহায্য করে ও অভিনন্দন জানায়। ফলে মুসলিম সেনাবাহিনী স্বল্প সময়ের ব্যবধানে উপদ্বীপকে সম্পূর্ণভাবে অধিকার করিতে সক্ষম হয়। ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী আরব সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করিবার ক্ষমতা স্পেনীয়দের ছিল না। বার্বারগণ দ্বারা গঠিত অগ্রবর্তী সেনাদল কঠোর পরিশ্রম ও সাহসিকতায় আরবদের তুলনায় কোন দিক হইতেই নিম্নমানের ছিল

ইবনে হাইয়ানের মতে, “স্পেন বিজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল মুসা বিন নুসাইরকে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর নিযুক্ত করা।”

স্পেনে মুসা বিন নুসাইর অভিযান ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। জুলিয়ান ও অন্যান্যদের দ্বারা আমন্ত্রণ এই অভিযানের পটভূমি হিসাবে কাজ করে। কুতাইবা ও মুহম্মদ বিন কাসিমের ন্যায় মুসাও হাজ্জাজ বিন ইউসুফের সহিত দেশ বিজয়ের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হইয়া পাশ্চাত্যের দিকে অগ্রসর হন। সফল কূটনীতিবিদ হিসাবে তিনি রক্ত পিপাসু বার্বারদিগকে অধিকাংশ সময় যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যস্ত রাখিতেন যাহাতে তাহারা আরবদের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে আসিবার সুযোগ লাভ করে। বার্বারগণ আরবদের আত্মম্ভরিতা

ও প্রগলভতাকে ঘৃণা করিত। তিনি ভ্রাতৃসুলভ ব্যবহার দ্বারা বার্বারদের হৃদয় জয় করিতে সক্ষম হন। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ইসলামের সাম্যের বাণী প্রচার করিয়া তাহাদিগকে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য জেহাদ করিতে উদ্বুদ্ধ করেন। সেনাবাহিনীতে রণনিপুণ বহু বার্বারকে তিনি যথাযোগ্য পদমর্যাদা দান করেন। ইহাদের মধ্যে তারিক বিন জিয়াদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্পেনে অভিযান পরিচালনাকারীদের মধ্যে অধিকাংশ ছিল বার্বার। দুর্ধর্ষ বার্বারদের অসম সাহসিকতা ও রণনৈপুণ্য স্পেন বিজয়ের মূলে বিশেষ অবদান রাখিয়াছে। দক্ষিণাঞ্চলের মরুভূমিতে রাজ্য বিস্তারে অসুবিধার জন্য উত্তরদিকে সম্পদশালী স্পেনের প্রতি মুসার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। একদিকে ভিজিগথদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দুর্বলতা এবং অন্যদিকে আরব ও বার্বারদের গোত্রীয় সংহতি (আসাবিয়াহ) ও ইসলামী আদর্শ তারিক ও মুসার স্পেন বিজয়ের পথ সুগম করে। মুসা উত্তর আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকা এবং স্পেন দখল করিবার আশা পোষণ করেন। গোয়াদালেতে ১২,০০০ হাজার সৈন্য লইয়া যুদ্ধ জয়ের পর তারিক টলেডোর দিকে অগ্রসর হন। হিসপানীয় ও ভিজিগথদের মধ্যে মতবিরোধের ফলে তাহারা তারিককে বাধা প্রদান করিতে ব্যর্থ হয়। এই ব্যর্থতার ফলে মুসা উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা লাভ করেন। খ্রীস্টান শাসক ও সেনাপতিগণ আরামপ্রিয়তা ও কর্মবিমুখতার জন্য সেনাবাহিনীর উপর নির্ভরশীল হইয়া পড়ে। অপরদিকে সৈন্যগণ আক্রমণ প্রতিহত করিয়া সামনের দিকে অগ্রসর হইবার পরিবর্তে আত্মরক্ষা করিতে ব্যস্ত হইয়া ওঠে। মুসলিম বাহিনী গোত্রীয় চরিত্র ও ইসলামী আদর্শের অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ ছিল। মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকগণ গানিমত লাভ ব্যতীত, ধর্মীয় অনুপ্রেরণা যেমন—মরিলে শহীদ ও বাঁচিলে গাজী এই আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ হইয়া প্রাণপণ যুদ্ধ করে। মুসলিম সেনাগণ খ্রীস্টানদের তুলনায় দৈহিক শক্তি ও রণ-নৈপুণ্যে উন্নত ছিল। ভূমিদাস ও ক্রীতদাসদের সমন্বয়ে গঠিত খ্রীস্টান বাহিনী যুদ্ধ জয়ে তাহাদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন সাধিত হইবে না এই কথা স্মরণে রাখিয়া যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করিত। ফলে যুদ্ধের ময়দানে অগ্রসর না হইয়া পশ্চাদপসারণ করিত। মুসলিম বাহিনী স্পেনে অবতরণ করিবার পর নৌবহরকে জ্বালাইয়া দেয় এবং পশ্চাদপসারণের পথকে রুদ্ধ করে।

মাক্কারীর মতে, স্পেনীদের পরাজয়ের মূল কারণ ছিল ইল্লিয়ানের (বুলিয়ান) অসন্তুষ্টি। ইল্লিয়ান টলেডোর গথিক শাসক উইতিজার প্রতিনিধি হিসাবে সিউটা হইতে উত্তর আফ্রিকার একাংশ শাসন করিতেছিলেন।১৮ অবৈধভাবে উইতিজাকে অপসারণ করিয়া টলেডোর সিংহাসন অধিকার করায় তিনি রডারিকের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিলেন। ফলে তিনি মুসলিম আক্রমণকে প্রতিহত করা তো দূরের কথা বরং মুসাকে আন্দালুস আক্রমণের জন্য আমন্ত্রণ জানান।

স্পেন বিজয়ের অন্যান্য কারণসমূহের মধ্যে উত্তর আফ্রিকায় আশ্রয় গ্রহণকারী ইহুদী ও ক্রীতদাসদের অসন্তোষকেও গণ্য করা যাইতে পারে। ইহুদী, ভূমিদাস ও ক্রীতদাসগণ গথিক শাসনের নির্মম নির্যাতন হইতে অব্যাহতি পাইবার আশায় নবাগত মুসলমানদের সাদরে গ্রহণ করে। গথিক সরকারের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের কথা পূর্বে আলোচিত হইয়াছে; ইহাও মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের অন্যতম কারণ ছিল। ভৌগোলিক কারণসমূহও মুসলমানদের অগ্রাভিযানে সহায়ক হয়। উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের মধ্যে ব্যবধান ছিল মাত্র ১৪ মাইল প্রশস্ত জিব্রাল্টার প্রণালী। তাই পূর্ব হইতেই স্পেন ও উত্তর আফ্রিকার মধ্যে ব্যবসা বাণিজ্য চালু ছিল। উভয় দেশের মধ্যে যাতায়াত ও তথ্যাদি আদান-প্রদানে তেমন কোন বাধা ছিল না। ফলে দক্ষিণে দিগন্ত প্রসারী সাহারা মরুভূমি এবং অপর দিকে আটলান্টিক মহাসাগরের অথৈ বারিধির প্রতি দৃষ্টিপাত

করিয়া জিব্রাল্টার প্রণালী অতিক্রম করিয়া ইউরোপে ক্ষমতা বিস্তার করা তাহাদের জন্য সহজ ছিল।

স্পেন বিজয়ের ফলাফল

স্পেন বিজয় সেখানকার জনগণের জীবনের প্রতিক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে। প্রথম দিকে ইহাকে মামুলী অভিযান বলিয়া বিবেচনা করা হইলেও মুসলমানদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা, মসজিদ নির্মাণ ও প্রাসাদ স্থাপনকে ভিজিগথগণ তাহাদের জন্য স্থায়ী পতন বলিয়া দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। কর দানে স্বীকৃত হওয়ায় ও নবাগত শাসকদের শাসনকে মানিয়া লইবার ফলে তাহারা অবহেলিত কৃষকদিগকে সামাজিক সুবিচার এবং সর্বপ্রকারে তাহাদের রক্ষা করিবার প্রতিশ্রুতি দান করে। খ্রীস্টান ও ইহুদীগণ তাহাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিপালনের অনুমতি লাভ করে। কোন কোন সময় সহনশীলতার এই আদর্শকে স্বৈরাচারী শাসকগণ যথাযথভাবে অনুসরণ করিতে ব্যর্থ হন। ডজি বলেন, “প্রথম দিকে মুসলমানদের শাসন ছিল মানবতা ও সহনশীলতার আদর্শে উদ্দীপ্ত, পরবর্তীকালে ইহা স্বেচ্ছাচারিতা ও অসহিষ্ণুতার রূপ পরিগ্রহ করে”।১৯ এই রূপে কর্ডোভার সান ভিসেন্টে গীর্জার অধিকার খ্রীস্টানগণ লাভ করেন এবং অন্যান্য গীর্জাকে ধূলিসাৎ করিয়া দেওয়া হয়। শহরাঞ্চলে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি হওয়ায় এবং চুক্তির প্রতি সম্মান প্রদর্শন না করিবার ফলে ৭৪৮ খ্রীস্টাব্দের মধ্যে অর্ধেক গীর্জাকে মসজিদে রূপান্তরিত করা হয়। ডজি বলেন “ইহা চুক্তির শর্তের অপব্যবহার ও সন্ধি ভঙ্গের পরিষ্কার প্রমাণ।”২০ পূর্বে বিধ্বস্ত গীর্জাগুলিকে পুনর্নির্মাণের অনুমতি প্রদানের শর্তে প্রথম আবদুর রহমান অর্ধেক গীর্জা ১০০,০০০ দিনারে ক্রয় করেন। হোল বলেন “খেলাফতের অবসানের পর গীর্জাগুলিকে পুনর্নির্মাণের অনুমতি প্রদান করা হয় এবং প্রার্থনায় সামিল হইবার জন্য ঘন্টাধ্বনির আওয়াজ শোনা যায়”।২২ প্রথম আবদুর রহমান যুক্তিসঙ্গত কারণ প্রদর্শন না করিয়াই তারিক ও উইতিজার পুত্রের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি ভঙ্গ করিয়া আচিলার ভ্রাতা আরদাবাস্তের (আরতাভাসদেস) জমিদারী বাজেয়াপ্ত করেন।

সহনশীলতার আদর্শ হইতে বিচ্যুৎ হইবার জন্য শাসকগণই প্রধানতঃ দায়ী ছিলেন। চুক্তির শর্ত ও ভাষ্য মুসলমানদের নিকট অতীব পবিত্র বলিয়া বিবেচিত হইত। সম্পত্তি ও জীবনের সামান্যতম ক্ষতি না করিয়া মুসলিম বাহিনী যুদ্ধের রীতিনীতিকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। এই উদার ব্যবহার খ্রীস্টানদের উপর বিরাট প্রভাব বিস্তার করে এবং স্পেনে মুসলমানদের বসতি স্থাপনের পক্ষে কাজ করে। লুইসভিয়ার ডোট বলেন, “স্পেনের যে ক্ষতি সাধিত হইয়াছিল বিজয়ী ও বিজিতের সম্মিলিত কার্যক্রমের ফলে কালক্রমে উহা ধীরে ধীরে দূরীভূত হইয়া যায়।”২৪ অপরদিকে হোল মত প্রকাশ করেন, “মুসলিম শাসন ছিল নমনীয় এবং করপ্রথা ছিল কম উৎপীড়ন মূলক।”২৫ স্পেনবাসীদের মধ্য হইতে কর আদায়কারী নিযুক্ত হইত। মুসলমানদের অত্যাচার সম্পর্কে কিছু সংখ্যক লেখকের বর্ণনা খুবই অতিরঞ্জিত। ইহা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, যুদ্ধের সময় যখন মুসলমানদের বাধা প্রদান করা হয় এবং গীর্জাগুলিকে দুর্গ হিসাবে ব্যবহার করা হয়, তখন স্পেনীয়দের উপর অত্যাচার অনিবার্য হইয়া পড়ে। যেমন মুগিম কর্ডোভাতে করিয়াছিলেন। সময় মত আত্মসমর্পণ করিলে তাহাদিগকে সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বাধীনতা, সম্পত্তি ভোগ দখলের অধিকার ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের সুযোগ প্রদত্ত হয়। তিনশত খ্রীস্টান ভূ-স্বামীকে তাহাদের জমিদারী ফিরাইয়া দেওয়া হয় এবং পূর্ব ক্ষমতা ও পদে পুনর্বহাল করা হয়। তাহাদিগকে রাজদরবারের আনুষ্ঠানিকতা হইতে রেহাই দেওয়া হয়। স্পেনীয়রা ইহাতে সীমাহীন কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। ইসলামী জীবন ব্যবস্থা চালু হওয়াতে জনগণ দাসপ্রথা হইতে অব্যাহতি লাভ করে এবং সাথে সাথে সামন্ত প্রথার নাগপাশ হইতে মুক্তি পায়। এশিয়ার সামন্ত প্রথা স্পেনে প্রচলিত হওয়ার ফলে ভূমিদাসগণ (সাফ) ভূমির সহিত চিরবন্ধনের গর্হিত নীতি হইতে মুক্তি লাভ করে। মুসলিম বিশ্বে দাসপ্রথা কোন চিরস্থায়ী ব্যবস্থা ছিল না। স্পেনীয়দের নিজস্ব সামাজিক ব্যবস্থা অনুসারে জীবন যাপনের অনুমতি প্রদান করা হয়। কিন্তু গীর্জার পরিচালক নিয়োগ ও ইহার উপদেষ্টা পরিষদ আমীর অথবা খলিফা আহ্বান করিতেন। বিজিত প্রজাদের কল্যাণে বিশপদের অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা হ্রাস করা হয়। মুসলিম শাসন কর্তার অনুমোদনে গীর্জাসমূহ রক্ষণাবেক্ষণ ও সেগুলিতে দর্শনার্থীদের সেবা যত্নের জন্য বিশপদের লইয়া একটি কমিটি গঠিত হয়। ডজির মতে, “চার্চের পরিচালনায় মুসলিম হস্তক্ষেপের ইহা একটি জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।”২৬ কিন্তু ডজি নিজে ও অন্যান্য ইউরোপীয় লেখকগণ মন্তব্য প্রকাশ করিয়াছেন যে, শাসক এবং শাসিতের স্বার্থ ইহার সহিত জড়িত ছিল। সেনা বিভাগের চাকুরী ছাড়াও অমুসলিম পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যদের বাৎসরিক আয়ের উপর ১২ হইতে ৪৮ দিরহাম২৬ জিজিয়া প্রদান করিতে হইত। হোলের মতে, “খ্রস্ট ধর্মাবলম্বীদের অবস্থা ক্রীতদাসদের তুলনায় উন্নত ছিল না। তবে ব্যক্তিগত কর২৭ প্রদানে তাহাদের স্বাধীনতা ছিল। স্পেনের প্রচলিত

শাসন ব্যবস্থা বহাল থাকে। স্থানীয় লোকদের মধ্য হইতে বিশেষ করিয়া সকল সম্প্রদায়ের ধর্মীয়প্রধান কর আদায়কারী নিযুক্ত হইতেন। মুসলমানদের নিকট আত্মসমর্পণকারীদের ভূসম্পত্তিকে বাজেয়াপ্ত করা হইতে সরকার বিরত থাকেন। যেমন—মেরিদা ও তুদমির প্রদেশের আলিকান্টে, অরিহুয়েলা, লোরকা, মুলা প্রভৃতি অঞ্চল ও গথিক রাজপুত্র শাসিত শহরসমূহের প্রজাদের উৎপাদনের এক দশমাংশ ভূমিরাজস্ব (খারাজ) প্রদান করিয়া তাহাদের সম্পত্তি ভোগ দখলের অধিকার লাভ করে।২৮ কিন্তু যে সমস্ত খ্রীস্টান মুসলিম সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করিয়া পরাজিত ও মৃত্যুবরণ অথবা পলায়ন করে, তাহাদের সম্পত্তি ও বিজিত শহরের চার্চসমূহের ধনরত্ন মুসলিম সেনাদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। বাজেয়াপ্তকৃত ভূমির চার পঞ্চমাংশ উপজাতীয় ভিত্তিতে সেনাদের মধ্যে বিতরিত হয় এবং অবশিষ্ট এক পঞ্চমাংশ (খুমস) ভূমি থাকে রাষ্ট্রের অধীনে। সরকারী সম্পত্তি সহজ শর্তে ভূমিদাসদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। মুসলিম সেনাদের ভূমিও ভূমিদাসদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। ভূমিরাজস্ব কম হইবার ফলে কৃষকগণ লাভবান হয়।

অধিক সংখ্যক লোকের মধ্যে ভূমি বণ্টন হইবার দরুন বৃহৎ জমিদারদের জুলুমের কবল হইতে দরিদ্র কৃষকগণ বাঁচিয়া যায় ও আর্থিক দিক হইতে স্বচ্ছল হইয়া ওঠে। গানিমতের অস্থাবর দ্রব্যসামগ্রী ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রয় করিয়া বিক্রয় মূল্য সেনাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ৭৫০ খ্রীস্টাব্দে বৃত্তিপ্রথা বাতিল হইবার ফলে এই বৃত্তি প্রাপ্ত অধিকাংশ মুসলমান ভবিষ্যতে জমিদারে পরিণত হয়। ভূমির সহিত জড়িত ভূমিদাসগণ সামাজিক নিরাপত্তা বোধ করে। তাহাদিগকে ভূমি হস্তান্তরের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ডজি বলেন, “ভিজিগথ ও রোমানদের শাসনকালে তাহারা এই ক্ষমতা কখনও ভোগ করিতে পারে নাই।”২৯ স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণকারী কৃষকগণ প্রথম দিকে উৎপাদনের এক দশমাংশ ও বাজেয়াপ্ত সম্পত্তির এক পঞ্চমাংশ ভূমি-রাজস্ব হিসাবে প্রদান করিত। ৭২৩ খ্রীস্টাব্দের পরবর্তীকালে সকলকেই উৎপাদনের এক পঞ্চমাংশ প্রদান করিতে হইত।৩০ ডজি বলেন, “নব্য মুসলিম জমিদারগণ তাহাদের উৎপাদিত শস্যের চার পঞ্চমাংশ পর্যন্ত ভূমি-রাজস্ব হিসাবে প্রদান করিত।”৩১ ডজির অভিমতকে জেরিনিমো লপেজ ও আয়ালা প্রভৃতি ঐতিহাসিকগণ বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করিয়াছেন। কিন্তু মধ্যযুগীয় সাহিত্যে এই অতিরিক্ত ভূমিরাজস্বের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। জমির প্রকারভেদে স্পেনে উ ৎপাদিত শস্যের এক ষষ্ঠাংশ হইতে অর্ধাংশ পর্যন্ত ভূমি-রাজস্ব হিসাবে প্রদান করিতে হইত।

কৃষকদের মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ও প্রাচ্যের শস্যাদি চাষাবাদ করায় এবং সেচ ব্যবস্থার প্রচলনের ফলে কৃষিক্ষেত্রে এক নব যুগের সূচনা হয়। প্রাচ্যের সহিত যোগাযোগ স্থাপন ও মুসলমানদের উন্নতমানের জীবন যাপনের দরুন এবং শাসকদের উদার নীতি গ্রহণের জন্য জনজীবনে, বাণিজ্যে ও শিল্পক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়।

মুসলমানদের আগমনে সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত হয়। কষকমালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতা অনেকাংশে হ্রাস পায়। ক্রীতদাসদের ভাগ্যের উন্নতি সাধিত হয় এবং তাহারা আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার লাভ করে। সুয়েভী, গথ, ভ্যান্ডাল, রোমান এবং ইহুদী নির্বিশেষে সকলের জন্যই সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা হয়। কঠোর ও নির্যাতনমূলক ভিজিগথিক আইন-কানুন বাতিল হওয়ায় ইহুদীগণ বিশেষভাবে উপকৃত হয় এবং মুসলমানদের মিত্র হিসাবে সরকারী চাকুরীর সুযোগ লাভ করে। কালক্রমে কর্ডোভা ইহুদীবাদের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। মুসলমানদের সমব্যবহার, সহিষ্ণুতা ও দানশীলতা জনগণের মন জয় করিতে সমর্থ হয়। গভর্নরদের (আমীর) পুনঃ পুনঃ পরিবর্তনে বহুবিধ অসুবিধা দেখা দেয়। প্রথম দিককার গোত্রীয় কোন্দল থাকা সত্ত্বেও মুসলমান শাসকগণ সরকারী প্রশাসন যন্ত্রকে পুনর্বিন্যাস ও জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে সফলতা লাভ করেন।৩৩ কালক্রমে মুসলিম-স্পেনও ইউরোপের শিক্ষা সংস্কৃতির জ্যোতিকেন্দ্র হিসাবে গড়িয়া ওঠে।

অভিযানের পর অভিযান পরিচালনার ফলে মুসলিম বিজয়ের সুদূর প্রসারী প্রতিক্রিয়া এবং মুসলমানদের সামাজিক প্রভাব অন্যান্য শহর অপেক্ষা কর্ডোভা, সেভিল ও গ্রানাডাতে বেশি মাত্রায় প্রকাশ পায়। আরবী সংস্কৃতির বাহন রূপে বহু শিলালিপি বিশেষ করিয়া আন্দালুসিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের স্মৃতিস্তম্ভ আজও বিদ্যমান। পুরাতন হিসপানো-রোমান ও মুসলিম সংস্কৃতিতে মূর ঐতিহ্যের প্রাধান্য পরিস্ফুট। মুসলমান শাসক এবং খ্রীস্টান গোত্রীয় প্রধানদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহ ছিল বটে তবে সেই সঙ্গে ছিল পরস্পরের মধ্যে ভাবের আদান প্রদান, মেলামেশা ও যুক্তির মাধ্যমে বিজিতদের অধিকারের নিশ্চয়তা।

তথ্য নির্দেশ

১। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড, আজম গড় (ইন্ডিয়া) ১৯৫০, পৃঃ ৬৮-৬৯; লেভি

প্রভেঙ্কাল, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৬৯৯। ২। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৬৩-৬৫। ৩। দ্রষ্টব্য : লেভি প্রভেঙ্কাল, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৬৯৯-৭০০; রিয়াসত

আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭১ ও টীকা-১। ৪। ইবনুল আছির, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪৪৪।

ইবনুল খাতিব, খেলাফত-ই-মুয়াহিদীন (উর্দু তর্জমা) পৃঃ ৮। মুয়াফির গোত্রের আব্দুল মালেক নামে জনৈক আরব তারিকের নেতৃত্বে কার্তিয়া অধিকার করেন। হাসিব আল-মনসুর অষ্টম অধঃস্তন বংশধর। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭৭; ই. জি, গমেজ, হিস্ট্রোরিয়া ডি ইস্পনা,

তমো, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৩। ৮। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩২; আমীর আলী, হিস্ট্রি অব দ্যা স্যারাসিস, পৃঃ ১০৯; রিয়াসত

আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৭৯-৮২।

৯। ই, জি, গমেজ, হিস্ট্রোরিয়া ডি ইস্পনা, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১৪ এবং মানচিত্র দ্রষ্টব্য। ১০। দ্রষ্টব্য : মাজমুয়া আখবার আন্দালুস, পৃঃ ৯। ১১। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, পৃঃ ৯৪. টীকা-১ দ্রষ্টব্য, এবং আল-মাক্কারী, ১ম খণ্ড, পৃঃ

৩১১; ইবনুল আছির, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪৪৬। ১২। খেলাফত-ই-মুয়াহিদীন, (উর্দু অনুবাদ) পৃঃ ৮। ১৩। ইবনে ইজারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৭-১৮। ১৪। সেভিল, স্পেনের একটি বৃহত্তম শহর ও জ্ঞানকেন্দ্র। রোমান এবং গথদের সময়ও ইহা অঁহাদের

রাজধানী ছিল। ইহার পূর্ব সৌন্দর্য এখনও বিদ্যমান। ১৫। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩৩; আন্দালুস, পৃঃ ২১। ১৬। ইবনুল আছির, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪৪৭; ইবনে খালদুন, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১১২: নাফলুল-তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ

১২৮; দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস পৃঃ ১১৫। ১৭। উইলিয়াম মর, খালিফাত, পৃঃ ৩৫৮ টীকা-৩; আল-মাকারী, নাফনুল-তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১২১। ১৮। গায়ানগোস, দ্যা মোহামেডান ডাইনেস্টিস ইন স্পেন, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৫১; ২৫৩, ও ২৫৫। ১৯। স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩৯। ২০। ঐ, পৃঃ ২৩৯। ২১। প্রায় পাউন্ড ৪৪০,০০০, দ্রষ্টব্যঃ ডজি, পৃঃ ২৩৯। ২২। আন্দালুস, পৃঃ ৩০, ৪৯। ২৩। দ্রষ্টব্যঃ ডজি, পৃঃ ২৩৯। ২৪। দ্রষ্টব্য : হিস্ট্রোরিয়া ডি লস আরবস ডি লস মুরস ডি ইস্পনা, বার্সেলোনা, ১৮৪৪, পৃঃ ২০৫। ২৫। আন্দালুস, স্পেন আন্ডার দ্যা মুসলিমস, লন্ডন, ১৯৫৮, পৃঃ ২১। ২৬। বর্তমানে ৪ দিরহাম সমান ১ পাউন্ড (১৯৬৯ খ্রীঃ) ২৭। আন্দালুস, পৃঃ ৪৮। ২৮। দ্রষ্টব্যঃ হোল, আন্দালুস, পৃঃ ৪৮। ২৯। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩৫। ৩০। লপেজ, কন্ট্রিবিউকিউঞ্জ ইম্পাসটুস এন লিওনী, ক্যান্টিন্না ডরে ল্যা ইডেড মেডিয়া, মাদ্রিদ,

১৮৯৮, পৃঃ ৯৩-৯৪। ৩১। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ২৩৫। ৩২। আল-ফিহরী, আল-সিফার আল-থানি মিনাল ওয়াথিককুলস, পৃঃ ১১৬, ১১৭ ক। ৩৩। দ্রষ্টব্যঃ রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, পৃঃ ২২১-২২৭।

সকল অধ্যায়
১.
উপক্রমণিকা (মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস)
২.
প্রথম অধ্যায় : মুসলমানদের স্পেন বিজয়
৩.
দ্বিতীয় অধ্যায় : দামেস্ক-খেলাফতের অধীন উমাইয়া আমীরদের শাসন
৪.
তৃতীয় অধ্যায় : স্বাধীন উমাইয়া আমীরদের রাজত্ব
৫.
চতুর্থ অধ্যায় : প্রথম হিশাম
৬.
পঞ্চম অধ্যায় : প্রথম হাকাম
৭.
ষষ্ঠ অধ্যায় : দ্বিতীয় আবদুর রহমান
৮.
সপ্তম অধ্যায় : প্রথম মুহাম্মদ
৯.
অষ্টম অধ্যায় : মুনজির ও আবদুল্লাহ
১০.
নবম অধ্যায় : উমাইয়া খিলাফত
১১.
দশম অধ্যায় : দ্বিতীয় হাকাম
১২.
একাদশ অধ্যায় : হাজীব আল-মনসুর
১৩.
দ্বাদশ অধ্যায় : স্পেনে উমাইয়া খিলাফতের পতন
১৪.
ত্রয়োদশ অধ্যায় : স্পেনের উত্তরাঞ্চলে খ্রীস্টান রাষ্ট্রসমূহের অভ্যুদয়
১৫.
চতুর্দশ অধ্যায় : প্রথম পর্যায় ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ
১৬.
পঞ্চদশ অধ্যায় : দ্বিতীয় পর্যায় – উত্তর আফ্রিকার শাসন
১৭.
ষষ্ঠদশ অধ্যায় : তৃতীয় পর্যায়ঃ নাসরী রাজবংশ
১৮.
সপ্তদশ অধ্যায় : মরিস্ক জাতি
১৯.
অষ্টাদশ অধ্যায় : স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনের কারণসমূহ
২০.
উনবিংশ অধ্যায় : শাসনকার্য ও প্রশাসন
২১.
পরিশিষ্ট-ক : ইক্রিতিশে কর্ডোভান মুসলমানদের শাসন
২২.
পরিশিষ্ট-খ : স্পেনে মুসলিম শাসকদের বংশানুক্রমিক তালিকা
২৩.
পরিশিষ্ট-গ : উত্তর-স্পেনে খ্রিষ্টান শাসকদের কালানুক্রমিক তালিকা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%