প্রথম হিশাম
(৭৮৮-৭৯৬ খ্রীঃ)
চতুর্থ অধ্যায়
সিরীয় স্ত্রীর গর্ভে প্রথম আবদুর রহমানের দুই পুত্র সুলায়মান ও আবদুল্লাহ এবং হুলাল নামে তাঁহার স্পেনীয় দাসীর গর্ভে হিশাম নামে একপুত্র জন্মগ্রহণ করে। তিনি কনিষ্ঠ পুত্র হিশামকে তাহার উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। আবদুর রহমান তাহাকে ন্যায়বান ও ধর্মপ্রাণ বলিয়া মনে করিতেন। হিশামের ন্যায়নীতি ও ধর্মপ্রীতি এবং সুযোগ্য শাসকের সম্ভাবনাময় প্রতিভায় মুগ্ধ হইয়া আবদুর রহমান তাহাকে উত্তরাধিকারী মনোনীত করেন। পিতার মৃত্যুর অব্যবহিত পর মেরিদার গভর্নর হিশাম নিজেকে স্পেনের আমীর বলিয়া ঘোষণা করেন। সিংহাসনে আরোহণকালে তাহার বয়স ছিল ৩২ বৎসর। তাহার শাসন আমল ছিল একাধিক বিদ্রোহের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই বিদ্রোহগুলি তিনি দক্ষতার সহিত দমন করেন। তাহার অসুবিধাগুলি আমাদিগকে ভারতের মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক হুমায়ূনের কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। আবদুর রহমান আইবেরিয়ান উপদ্বীপ বিজয় করিয়াছিলেন সত্য, কিন্তু সেখানকার মুসলমানদের দলাদলি ও বিভেদকে দূরীভূত করিতে সময় পান নাই। খ্রীস্টান ও মুসলমানদের মধ্যেকার কলহ দূর করা ছাড়াও হিশামকে অন্যান্য আরও জটিল ও কঠিন সমস্যার মোকাবেলা করিতে হয়। হুমায়ূনের ভাইদের ন্যায় হিশামের ভ্রাতাগণ শুধু রাজদ্রোহীই ছিলনা বরং বিদ্রোহমূলক কার্যে সদা লিপ্ত ছিল।
হিশামকে সিংহাসন চ্যুত করিবার পথ ও পন্থা নির্ধারণের জন্য ১৭৩ হিঃ/ ৭৮৯-৯০ খ্রীস্টাব্দে সুলায়মান ও আবদুল্লাহ টলেডোতে মিলিত হন। তাহারা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং টলেডোতে সৈন্য সমাবেশ করেন। আমীর তাহাদিগকে শান্ত করিতে চেষ্টা করেন কিন্তু ইহাতে কোন ফল হয় নাই। শেষ পর্যন্ত তিনি বিশ সহস্র সৈন্য লইয়া সুলায়মানের বিরুদ্ধে অগ্রসর হন। সুলায়মানের পক্ষে যুদ্ধে যোগদান করে পনেরো সহস্র সৈন্য। দুই সেনাদল ৭৯০ খ্রীস্টাব্দে বুলক বা বুলতে সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে সুলায়মানের সেনাবাহিনী পরাজিত হয়। আমীর টলেডোর দিকে অগ্রসর হন। কিন্তু যুবরাজ আবদুল্লার নিকট পরাজিত হন। সৈন্যের সংখ্যাল্পতা ও সুলায়মানের পরাজয় তাহাকে আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য করে। টলেডোর আশে-পাশের জায়গা আবদুল্লাহকে জায়গীর প্রদান করা হয়। ভাইয়ের সহিত যুদ্ধে চরম শক্তি পরীক্ষার জন্য তিনি মুরসিয়াতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। কিন্তু হিশামের পুত্র মুয়াবিয়া ১৭৪ হিজরী/ ৭৬০-৬১ খ্রীস্টাব্দে লোরকাতে প্রচণ্ড যুদ্ধে চাচা সুলায়মানকে পরাজিত করেন। সুলায়মান তাহার পূর্ব কার্যকলাপের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন।
আমীর তাহাকে ক্ষমা প্রদর্শন করেন এবং টলেডোর নিকট তাহার ৬০,০০০ হাজার দীনার মূল্যের জায়গীর আমীরকে হস্তান্তর করিয়া পশ্চিম আফ্রিকার তাঞ্জিয়ারে যাইবার জন্য আদেশ দেন। সুলায়মানের সহিত আবদুল্লাহ নিজেও তাঞ্জিয়ারে যাত্রা করেন। ১৭৬ হিঃ/৭৯২ খ্রীস্টাব্দে হিশামের পুত্র হাকাম টলেডোর গভর্নর নিযুক্ত হন।
হিশাম যখন ভাইদের বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত সেই সময় দেশের পূর্বাংশে ইয়ামানীরা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিতেছিল। সাইদ বিন হুসায়েন বিন ইয়াহিয়া আল আনসারীর নেতৃত্বে তাহারা ১৭২ হিঃ / ৭৮৮ খ্রীস্টাব্দে তরতোসাতে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে এবং উমাইয়া ট্যাক্স আদায়কারী ইউসুফ কাইসীকে বিতাড়িত করে। প্রাচীন ভিজিগথ পরিবারের অন্তর্গত বানু কাসী গোত্রের জনৈক নব মুসলিম নেতা মুসা বিন ফরতুনিওর (Fortunio) নেতৃত্বে মুদারীগণ একত্রিত হইয়া কর্ডোভার উমাইয়া শাসনের পক্ষ অবলম্বন করে এবং ইয়ামানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করে। সাইদ পরাজিত ও নিহত হন। তরতোসা মুসার অধীনে আসে।
হুসাইন বিন ইয়াহিয়া আল আনসারীর ভক্ত ও অনুচর মাওলা হাজারের পতাকাতলে একত্রিত হয়। ইতিমধ্যে সুলায়মান বিন ইয়াকজানের পুত্র মাতরুহ বার্সিলোনায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। বিদ্রোহীদের হস্তে মুসা পরাজিত হন। বিদ্রোহীরা তরতোসা, সারাগোসা বার্সিলোনা হুয়েস্কা ও তারাগোনা দখল করে। স্পেনে উমাইয়া সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হইয়া পড়ে। হিশাম এই বিদ্রোহকে দৃঢ়তার সহিত দমন করেন। ১৭৫ হিজরী ৭৯১ খ্রীস্টাব্দে তিনি ভ্যালেন্সিয়ার (Valencia) গভর্নর আবু ওসমান ওবায়দুল্লাহ বিন ওসমানকে বিরাট সৈন্য বাহিনীসহ বিদ্রোহীদের দমন করিবার জন্য প্রেরণ করেন। সারাগোসা অবরুদ্ধ হয়। মাতরুহ তাহার নিজের লোকের হস্তে নিহত হন। বিদ্রোহীরা পরাজিত ও বিক্ষিপ্ত হইয়া পড়ে। মুসা বিন ফরতুনিও সারাগোসার গভর্নর নিযুক্ত হন।
হিশাম অভ্যন্তরীণ শান্তি স্থাপনের পর মুসলমানদের জন্য স্থায়ী অশান্তির কারণ দেশের উত্তরে বসবাসকারী খ্রীস্টান নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রবৃত্ত হন। ফ্রাঙ্করা সব সময় আক্রমণকে উৎসাহিত করিত। ১৭৬ হিঃ/৭৯২ খ্রীস্টাব্দে হিশাম ফ্রাঙ্কের দক্ষিণ প্রদেশসমূহে অভিযান চালাইবার জন্য আবু ওসমানের নেতৃত্বে সেনাদল প্রেরণ করেন। এই প্রদেশ সমূহের গভর্নর ছিল মুসলমানদের জাতশত্রু। দুই দলে বিভক্ত হইয়া সেনাদল অগ্রসর হয়। একদলের নেতৃত্ব প্রদান করেন আবদুল মালিক বিন আবদুল ওয়াহিদ। তিনি ৭৯২ খ্রীস্টাব্দে ছেরডাগ্নে (cerdagne) দখল করেন। এবং নারবোনের সন্নিকটে ফ্রাঙ্কদের পরাজিত করেন। সেপ্টিমানিয়ায় বসবাসকারী (দক্ষিণ ফ্রান্সের) মুসলমানদের রাজধানী নারবোনের পতনের ৩২ বৎসর পর মুসলমানরা পুনরায় ইহা দখল করেন। পর্বত শ্ৰেণীময় নয়নাভিরাম বিখ্যাত
রাজধানী জিরোনাও মুসলমানরা অধিকার করিয়া নেন। মুসলমানদের প্রতিহত করিবার মত শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল না খ্রস্টানদের। একদিকে জার্মানীতে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল চালেমাগ্নে অপরদিকে তাহার পুত্র লুইস আকিটেনের রাজা ইটালীতে ছিলেন যুদ্ধে ব্যস্ত। তুলসের ডিউক উইলিয়ামের নেতৃত্বাধীনে কৃষকরা মুসলমানদের অগ্রাভিযানে বাধা প্রদান করে। অরবিনা নদীর তীরে ভিলেডায়িগ্নে নামক জায়গায় যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে তুলুসের ডিউক পরাজিত হন এবং সেপ্টিমানিয়াসহ বহু শহর মুসলমানদের অধিকারে অসে। আবদুল করিম বিন আবদুল ওয়াহিদের নেতৃত্বে চল্লিশ হাজার সৈন্যের অপর দল আস্তুরিয়া ও গ্যালেসিয়া আক্রমণ করে। আরিয়ার রাজা প্রথম বারমুডো ও তাহার ভাইপো দ্বিতীয় আলফন্সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে আরিয়া ও গ্যালেসিয়ার সেনা বাহিনী পরিচালনা করেন। একাধিক যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে বহুসংখ্যক খ্রীস্টান মৃত্যুবরণ করে। প্রথম বারমুডো ইউসুফ বিন বখতের নিকট এবং আলফন্সে আবদুল করিমের নিকট পরাজিত হয়। মুসলমানদের যুদ্ধ জয়ের সংবাদ যখন কর্ডোভায় পৌঁছে তখন রাজধানীর জনগণ আনন্দে উল্লসিত হইয়া উঠে। মুসলমানদের ফিরিবার পথে খ্রীস্টানরা তাহাদের আক্রমণ করে। এই আক্রমণে মুসলমানদের পরাজয় হয় এবং কতিপয় মুসলিম সেনাপতি নিহত হন। মুসলমানদিগকে পশ্চাদপসারণ করিতে হয়। ফলে দেশের উত্তরাংশে একটি খ্রীস্টান রাষ্ট্র জন্মলাভ করে। এই রাষ্ট্রটি স্পেনে মুসলিম শাসন আমলে বরাবর অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিয়াছে। উত্তরাংশে প্রতিষ্ঠিত এই রাষ্ট্রটির বিস্তারিত আলোচনা পরে করা হইবে।
হিশাম ছিলেন ধর্মভীরু। তাহার পিতার ন্যায় তিনিও ফুকাহাদের (ধর্মগুরু) দ্বারা প্রভাবান্বিত হইয়াছিলেন। বাল্যকাল হইতে হিশামের মধ্যে এক প্রকার মানবিক দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। তাহার সম্বন্ধে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, তাহার শাসনকালের স্থায়ীত্ব হবে আট বৎসর। এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়। আমীর এই ভবিষ্যদ্বাণীর দ্বারা বিরাট ভাবে প্রভাবিত হইয়াছিলেন। সাম্রাজ্যকে সম্প্রসারিত ও সুসংহত করিবার পরিবর্তে তিনি তাহার কর্মপ্রেরণা ও কর্মক্ষমতাকে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের নিরাপত্তায় নিয়োগ করেন। ইহকালের পরিবর্তে পরকালের মঙ্গলে তিনি গুরুত্ব প্রদান করেন। উমাইয়া শাসকদের মধ্যে তাহাকে দ্বিতীয় ওমর ইবনে আবদুল আজিজের সঙ্গে তুলনা করা যায়। তিনি ছিলেন চার মুজাহাবের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ইমাম মালিক ইবনে আনাসের ভক্ত ও শিষ্য। ইমাম মালিকের জন্ম হয় ৭১৫ খ্রীস্টাব্দে মদীনায়। আলীর শিক্ষার দাবীদার মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর প্রতি সমর্থনের দরুন আব্বাসীয় খলিফা জাফর আল মনসুর তাহাকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা করিতেন। হিশাম তাহাকে স্পেনে আগমন ও বসতি স্থাপনের অনুরোধ জ্ঞাপন করেন। আব্বাসী অত্যাচার সত্ত্বেও ইমাম এই প্রস্তাবে রাজী হইলেন না। মদীনাতে ইমাম মালিকের সহচর্যে যাইয়া ধর্মতত্ত্বে গভীর জ্ঞান লাভ করার পর ইমামের মতবাদকে স্পেনে প্রচার করিবার জন্য
হিশাম ছাত্রদিগকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করিতেন। স্পেনে ইমামের শিষ্যদের মধ্যে ইয়াহিয়া বিন ইয়াহিয়া ও ইসা বিন দিনারের নাম উল্লেখযোগ্য। বিশেষ করিয়া ইমাম মালিক নিজে ইয়াহিয়া বিন ইয়াহিয়াকে “স্পেনের জ্ঞানী লোক” বলিয়া অভিহিত করেন। ইমাম তাঁহার স্পেনের শিষ্যদের মাধ্যমে হিশামের ধর্মানুরাগ ও সৎ চরিত্রের খবর অবগত হইয়া ঘোষণা করেন যে একমাত্র হিশামই সিংহাসনের উপযুক্ত।
হিশাম তাহার সাম্রাজ্যে মালিকী মতবাদ প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। রাষ্ট্রীয় কার্যে মালিকী মতবাদ অনুসরণ করা হইত। ইহার পূর্বে এখানে আল আজায়ী সুন্নী মুজাহাবের মতবাদ প্রচলিত ছিল।
ইমাম মালিক বিন আনাস কর্তৃক প্রচারিত মতবাদ আজায়ী প্রচারিত মতবাদ হইতে কিছুটা উন্নত ও ভিন্নতর ছিল। হিশাম বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারী পদে অগ্রাধিকার প্রদান করিতেন ইমাম মালিকের শিষ্যদের। আবু আবদুল্লাহ জাইয়াদ ইবনে আবদুর রহমান ইবনে জাইয়াদ আল-লাখমী, শাবাতুন নামে অধিক পরিচিত (মৃঃ ২০৪ হিঃ/৮১৯ খ্রীঃ) এবং বার্বার ফিকাহবিদ ইয়াহিয়া বিন ইয়াহিয়া আল লাইসী মদীনা হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া ইমাম মালিকের মতবাদকে তাহাদের লেখনী ও বক্তৃতার মাধ্যমে প্রচার করেন। মুসলিম আইনের গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য সর্বপ্রথম গ্রন্থ কিতাব আল মুয়াত্তা প্রণয়ন করেন ইমাম মালিক। এই গ্রন্থের অনুলিপি স্পেনে প্রচারিত হয় ব্যাপকভাবে। মালিকী মতবাদে বিশ্বাসী ধর্ম বেত্তাগণ শুধু উচ্চ রাজপদেই আসীন ছিলেন
তাহারা আমীরের সামান্যতম ইসলামী আদর্শ বিরোধী ব্যবহারের দরুন ভৎর্সনা। করিতেন। ফলে আমীরকে ক্ষমা প্রার্থনা করিতে হইত। ক্ষমতালোভী ও বৈষয়িক যশ ও খ্যাতির প্রতি আকৃষ্ট ব্যক্তিদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হইয়া হিশাম ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিতেন। তাহাদের আচরণ হইতে ইহা পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা যায় যে তাহাদের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মের ছদ্মবেশে রাজনীতি করা। আমীর যদিও খ্রীস্টানদের প্রতি অসহিষ্ণু ছিলেন না কিন্তু ের উপর ধর্মবেত্তাদের প্রভাবের দরুন খ্রীস্টানদিগকে তিনি দূরে রাখিতেন। স্বাভাবিক সহনশীলতা প্রদর্শন করিলে হয়তো খ্রীস্টানরা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিত—যেমন হইয়াছিল পূর্ববর্তী শাসকদের আমলে। হিশামের মৃত্যু : হিশাম প্রায় আট বৎসর কাল স্পেন শাসন করেন। ৭৯৬ খ্রীস্টাব্দে চল্লিশ বৎসর বয়সে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তাঁহার পুত্র আল হাকামের প্রতি অনুগত্যের শপথ গ্রহণের জন্য বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নর ও রাজধানীর শিক্ষিত সুধীব্যক্তিদিগকে তাঁহার সম্মুখে উপস্থিত হইবার জন্য ডাকিয়া পাঠান।
প্রথম আবদুর রহমান স্পেনে উমাইয়া সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন। কিন্তু ইহাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করিবার দায়িত্ব অর্পিত হয় তাহার উত্তরাধিকারদের ওপর। হিশামের শাসনকাল যদিও বিরাট কোন সামরিক অভিযান অথবা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক উন্নতি সাধনের জন্য উল্লেখযোগ্য ছিল না, তথাপিও তিনি এই নতুন
প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রকে (Weathering the storm) বিপদের হাত হইতে রক্ষা করিতে সমর্থ হন। তিনি প্রথম বারমুডা ও দ্বিতীয় আলফন্সের নেতৃত্বে আরিয়াদের প্রচণ্ড আক্রমণকে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করেন। তিনি দক্ষিণ ফ্রান্সে অভিযান প্রেরণ করেন এবং তাহাকে গতিচ্যুত করার জন্য সচেষ্ট বিদ্রোহী নেতাদের প্রচেষ্টাকে তিনি বার বার ব্যর্থ করিয়া দেন। বিদ্রোহীরা সংখ্যায় ছিল অধিক। ফলে তাহাকে এই সমস্ত বিদ্রোহীদের দমন করিবার কাজে অধিকাংশ সময় ব্যস্ত থাকিতে হয়। তিনি তাহার তিন পুত্ৰ উমায়াদ আল মালিক, মুয়াবিয়া এবং হাকামের সহযোগিতায় এই সমস্ত বিদ্রোহীদের দমন করিতে সমর্থ হন। আবদুল মালিক এবং আবদুল করিম নামে আবদুল ওয়াহিদ মুগিছের দুই প্রৌ-পুত্র এই বিদ্রোহ দমনে তাহাকে সাহায্য করেন। তিনি তাহার শাসনের শেষ দিকে যে শান্তিপূর্ণ স্বল্প সময় পান তাহা রাষ্ট্রের প্রশাসন যন্ত্র এবং সামাজিক জীবনের উন্নয়ন ও কল্যাণ সাধনে নিয়োজিত করেন। তিনি তাহার পিতার উজির ও প্রশাসনিক কর্মচারীদের নিজ নিজ পদে বহাল রাখেন কিন্তু দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে অপ্রয়োজনীয় আইন পরিবর্তন করেন। মাক্কারী বলেন, “দুর্নীতি পরায়ণ ও অসৎকর্মচারীদের তিনি বরখাস্ত করেন এবং কখনও তাহাদিগকে পুনর্নিয়োগ করেন নাই।” তিনি বেআইনী কর আদায় নিষিদ্ধ করেন এবং যাকাত ও ছাদকা আদায়ের আদেশ দেন। সুশিক্ষিত ব্যক্তিদের তিনি বিচারক নিযুক্ত করেন। কর্ডোভার প্রধান বিচারপতি মুসাব বিন ইমরান তাহার বিচার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা এবং হিশামের সেক্রেটারী মুহাম্মদ বিন বশির আল মাদিরী তাহার ধর্মপরায়ণতা, অভিজ্ঞতা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গভীর জ্ঞানের জন্য সুপরিচিত ছিলেন। হিশামের অনুসৃত নীতির ফলে দেশের ব্যবসা বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি সাধিত হয়। আমীর রাজপথ নির্মাণ এবং গোয়াদালকুইভির নদীর উপর ব্রীজ নির্মাণ করেন। তিনি একটি সুন্দর ঝর্ণা প্রস্তুত করেন যাহা রাজধানীর শ্রীবৃদ্ধি করে। হিশাম নতুন নতুন প্রাসাদ নির্মাণ ও পুরাতন সরকারী অট্টালিকাসমূহের মেরামতে বিশেষভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। কর্ডোভার জামে মসজিদ নির্মাণের কার্য সমাপ্ত করেন—যাহা তাহার পিতা নির্মাণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। ইহা দৈর্ঘ্যে ছিল ৬০০ ফুট এবং প্রস্থে ছিল ২৫০ ফুট। ইহা তৈয়ার করিতে ব্যয় হইয়াছিল এক লক্ষ ষাট হাজার দিনার। এই মসজিদ তৈয়ারীর এগার শত বৎসর পরেও ইহার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ এতটুকুও ক্ষুন্ন হয় নাই। ইহা ব্যতীত তিনি আরও অনেক মসজিদ নির্মাণ করেন।
দামেস্কের ওমর বিন আবদুল আজিজের ন্যায় তিনিও তাহার সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশে গুপ্তচর প্রেরণ করিয়া তাহার প্রজাদের অবস্থা এবং সরকারী কর্মচারী ও গভর্নরদের যোগ্যতা সম্বন্ধে নির্ভরযোগ্য খবর সংগ্রহ করিতেন এবং নিশ্চিত হইতেন ! তাহাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতেন অথবা তাহাদিগকে চাকুরী হইতে বরখাস্ত করিতেন।
জনসাধারণের অবস্থা অবগত হইবার জন্য তিনি নিজে রাত্রিতে ছদ্ম বেশে কর্ডোভার রাজপথে ভ্রমণে বাহির হইতেন। জনসাধারণের অসুবিধার অভিযোগসমূহ বিচারালয়ে নিষ্পত্তি করা হইত। তিনি রোগীদের পরিচর্যা ও রোগমুক্তির জন্য প্রার্থনা করিতেন। জনগণের মধ্যে তাহার বিদ্যানুরাগ ও জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির জন্য তিনি জনগণের জানাজার নামাজে ইমামতি করিতেন এবং শবযাত্রা ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ গ্রহণ করিতেন। আমীরের অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হইয়া মুসায়াব প্রধান বিচারকের পদ গ্রহণ করিতে সম্মত হন। তিনি পূর্বের শাসন আমলে এই পদ গ্রহণে অসম্মতি জ্ঞাপন করিয়াছিলেন। খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ অনুসরণের জন্য পরামর্শ পরিষদ সৃষ্টি করেন এবং প্রত্যেক কাজে তাহাদের পরামর্শ গ্রহণ করিতেন। তাঁহার প্রভাবে ও আগ্রহে সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রেও নব তৎপরতা ও উদ্যোম দেখা দেয়। আরবী শিক্ষাদানের জন্য তিনি স্কুল এবং কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রীয় ভাষা ছিল আরবী। স্পেনে মালিকী মতবাদ প্রচারের জন্য তিনি ধর্মীয় শিক্ষাকে উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করিতেন। মালিকী মতবাদ প্রচলনের পূর্বে স্পেনে সিরীয় আওজায়ীর ব্যবহারতত্ত্ব বা আইন বিজ্ঞান প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে স্পেনের বিদ্যালয়সমূহে মালিকী মতবাদ অনুসারে আইন শিক্ষাদানের জন্য পাঠ্যতালিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রথম আবদুর রহমান সংগীতকে উৎসাহিত করিতেন। কিন্তু হিশাম ইহাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তিনি ছিলেন আরবী কবিতার ভক্ত এবং নিজে ছিলেন একজন কবি। তাহার দরবারের বিখ্যাত কবি ছিলেন আমর ইবনে আলী গাফফার। পণ্ডিত ব্যক্তিদের মধ্যে যাহাদের তিনি পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন তাহারা হইলেন ইসা বিন দিনার, আবদুল মালিক বিন হাবিব, ইয়াহিয়া বিন হিয়াহিয়া, সাইদ বিন হাসান এবং ইবনে আবু হিন্দ।
হিশাম তাহার পিতার ন্যায় নিজেকে আমীর বলিয়া দাবী করিতেন। যতদূর জানা যায় তিনি মুদ্রা ব্যবস্থার কোন পরিবর্তন সাধন করেন নাই। তিনি ছিলেন নিয়মানুবর্তী ও সুন্দর স্বভাবের অধিকারী। তিনি সাধারণ জীবন যাপন করিতেন। হিশাম ছিলেন একজন ধার্মিক বাদশাহ। রাজপরিবারের সাদা পোষাক তিনি পরিধান করিতেন। আইনবিদদের নিকট তিনি ছিলেন খুবই জনপ্রিয়। তিনি ছিলেন ন্যায়বান ও দয়ালু। দরিদ্রদের জন্য তাহার দ্বার ছিল অবারিত। তাহারা বিনা বাধায় হিশামের নিকট তাহাদের অভাব অভিযোগের বিষয় পেশ করিতে পারিত। যে সমস্ত গরীব লোক তাহার নিকট আসিতে পারিত না তিনি নিজে তাহাদের কুটিরে যাইয়া খোজ খবর লইতেন। তিনি ছিলেন দানশীল। ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ও দরিদ্রদের মধ্যে তিনি টাকা পয়সা বিতরণ করিতেন। তাহার চরিত্র ও ব্যবহারকে ওমর বিন আবদুল আজিজের সহিত যথার্থই তুলনা করা যাইতে পারে। জাইয়াদ বিন আবদুর রহমান লাখমীর নিকট তাহার ধর্মানুরাগের কথা শুনিয়া ইমাম মালিক বিন আনাস এতই মুগ্ধ হন যে তিনি হিশামের সহিত হজ্জব্রত পালনের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন।
তথ্য নির্দেশ
১। বর্তমানে বুলচের কোন অস্তিত্ব নাই।
ইবনুল আছির, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৮০, ৮৩, ৮৪; রিয়াসত আলী কর্তৃক উল্লেখিত পৃঃ ৩৪০-৪১ দেখুন। তিনি ছিলেন আওজায়ী নামে পরিচিত একজন সিরীয় ইমাম (মৃঃ ৭৭৪ খ্রঃ) সাসা বিন সালাম আল-শামী ছিলেন তাঁহার প্রধান শিষ্য (মৃঃ ৭৯৬ অথবা ৮০৭ খ্রীঃ) আল-শামী ছিলেন কর্দোভা মসজিদের প্রধান ইমাম ও মুফতি। তিনি মসজিদ প্রাঙ্গণে বৃক্ষরোপণ করিয়াছিলেন (ই. জি. গমেজ, হিস্টোরিয়া ডি ইস্পনা, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৯৮) আল-আওজায়ী ৭৫০ খ্রীঃ কিছুকাল পরে বৈরুতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। তিনি রাজনীতির বাহিরে থাকিয়াও আব্বাসীয়দের শাসনে মদদ যোগান।
নাফলুল-তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৫৮; মাজমুয়া আখবার, আন্দালুস, পৃঃ ১২১। ৫। ঐ, পৃঃ ১৫৮; রিয়াসত আলী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৫৩। ৬। রিয়াসত আলী, দ্যা তারিখ-ই-আন্দালুস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৫৩। ৭। মাজমুয়া, পৃঃ ১২০-১২১।
ইবনুল আছির, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ১০২; নাফলুল-তিব, পৃঃ ১৫৮। ৯। আল-আন্দালুস, পৃঃ ৪৩; নাফলুল তিব, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৫৪।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন