শাসনকার্য ও প্রশাসন
ঊনবিংশ অধ্যায়
পূর্ব ও পশ্চিম এই দুই অঞ্চলে উমাইয়া সাম্রাজ্য বিভক্ত ছিল। ইহার মধ্যে আল মাগরিবের গুরুত্ব ছিল অধিক এবং ইহার রাজধানী ছিল কায়রোওয়ানে। বারকাহ, ইফ্রিকিয়া, তাহিরাত, সিজিলমাসাহ, সিসিলি, সারদেনিয়া ও বেলিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ, ভূমধ্য – দ্বীপসমূহ, স্পেন ও দক্ষিণ-ফ্রান্স শাসিত হইত একজন আমীর অথবা ওয়ালী কর্তৃক।
টলেডোর গথিক সদর দপ্তর হইতে রাজধানী সেভিলে এবং শেষ পর্যন্ত কার্ডোভাতে স্থানান্তরিত হয়। সামরিক বেসামরিক প্রশাসন ন্যস্ত ছিল গভর্নরদের উপর। আমীলদের দায়িত্ব ছিল দেশের রাজস্ব আদায় করা। তিনি আমীর হইতে স্বাধীন ছিলেন। তিনি খলিফা কর্তৃক নিযুক্ত হইতেন। গভর্নরও খলিফা কর্তৃক নিযুক্ত হইতেন। খলিফা দুর্বল হইলে কোন কোন সময় ইফ্রিকিয়ার ভাইসরয়ও তাহাকে নিযুক্ত করিতেন। তিনি স্বাধীনভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করিতেন যদিও নামেমাত্র ইফ্রিকিয়ার ভাইসরয়ের নিকট দায়ী থাকতেন। তাহার চাকুরি দুই প্রভুর উপর নির্ভর করিত। খলিফা এবং ভাইসরয়ের এই দ্বৈত প্রভাবাধীনে তাহাকে দায়িত্ব পালন করিতে হইত। এই দ্বৈত প্রভাবের ফলে শাসন ব্যবস্থায় নানা বিঘ্নের সৃষ্টি হইত। খলিফা অথবা ভাইসরয়ের অনুমোদন পরবর্তী সময়ে আমীরগণ লাভ করিতেন। প্রাদেশিক কর্মকর্তাগণ যেমন সাহিবুল খারাজ, কাজি, কাতীব ও অন্যান্য কর্মচারীবৃন্দ আমীর অথবা খলিফা কর্তৃক নিযুক্ত হইতেন।
এই দ্বৈত শাসনের অবসান ঘটে ৭৫৬ খ্রীস্টাব্দে যখন প্রথম আবদুর রহমান কর্তৃক বাগদাদের খিলাফত হইতে স্পেনকে বিচ্ছিন্ন করিয়াছিলেন। ৯২৯ খ্রীঃ তৃতীয় আবদুর রহমান কর্তৃক খলিফা উপাধি ধারণের পূর্ব পর্যন্ত উমাইয়া শাসকগণ নিজদিগকে আমীর বলিয়া পরিচয় দিতেন। আমীর অথবা খলিফা নিজের নামে খোত্বা পাঠ করিতেন এবং মুদ্রা প্রচলন করিতেন। তাঁহার উপর রাষ্ট্রের পার্থিব ও আধ্যাত্মিক সর্বোচ্চ ক্ষমতা ন্যস্ত হয়। তিনি উত্তরাধিকারী সূত্রে সিংহাসন লাভ করিতেন, কোন কোন সময়ে অভিজাত সম্প্রদায়ও তাহাকে সিংহাসনে বসাইতেন। তিনি বিলাসিতা ও আঁকজমকপূর্ণ জীবন যাপন করিতেন এবং প্রশাসনিক কার্যকলাপের জন্য উজির ও সেনাপতির উপর নির্ভর করিতেন। বিচার বিভাগের জন্য যথাক্রমে কায়েদ ও কাজি নিয়োগ করিতেন। শক্তিশালী আমীর এবং খলিফা সরকারি ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেন। তিনি তাঁহার নিজের ও প্রজাদের অধিকারে হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করিতেন না। প্রজাদের কল্যাণার্থে তিনি শুধু কর্মচারীই নিয়োগ করিতেন না, উপরন্তু তিনি সেনাবাহিনী পরিদর্শন ও প্রদেশসমূহ ভ্ৰমণ করিতেন। অবসর মুহূর্তে তিনি কবি, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের সহিত আলোচনায় সময় কাটাইতেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের অফিসসমূহ সেতুর নিকটবর্তী আল কাজারের বাব পাল সুদ্দাতে অবস্থিত ছিল।
খলিফার অধীনে সরকারি দফতরসমূহ প্রধানতঃ তিনটি বিভাগে বিভক্ত ছিল। যেমন—অর্থবিভাগ, বিচার বিভাগ ও সামরিক বিভাগ। প্রত্যেকটি দফতর ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই সমস্ত বিভাগের পদগুলিতে সাধারণতঃ আরব ও বার্বারগণ চাকুরী লাভ করিত এবং নিম্নপদগুলিতে নবমুসলিম, খ্রীস্টান ও ইহুদীদিগকে নিয়োগ করা হইত। কার্ডোভার উমাইয়া প্রাসাদের চতুর্দিকে এই সমস্ত দফতরের প্রধান কার্যালয় গড়িয়া উঠিয়াছিল। যদিও উচ্চপদে নিয়োগ প্রাপ্তির জন্য বিশেষ ট্রেনিং ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল না তথাপিও অভিজ্ঞতার বিশেষ মূল্য দেওয়া হইত। উচ্চ শিক্ষিত ও অভিজ্ঞ কর্মচারীদের সব বিষয়ে কিছু অভিজ্ঞতা থাকিত ফলে তাহাদিগকে এক বিভাগ হইতে অন্য বিভাগে বদলী করা হইত। অথবা একই সাথে একাধিক দায়িত্ব পালন করিতে দেওয়া হইত। কোন কোন সময় বেসামরিক অফিসার সামরিক ও উচ্চ বিভাগের দায়িত্ব পালন করিতেন। মন্ত্রীপদ ও স্বাধীন আমীর অথবা খলিফা ছিলেন সরকারের প্রধান। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে তাহার উজিরগণই দেশের প্রশাসন কার্য পরিচালনা করিতেন। প্রথম আবদুর রহমান উজির ব্যতীত কিছু সংখ্যক (শোয়ান্স) ব্যক্তির অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ গ্রহণ করিতেন। একজন উজির বিশেষ বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত থাকিতেন। অর্থ, বিচার, বৈদেশিক বিষয় ও সামরিক এই চারটি প্রধান বিভাগ ছিলো উজির পদে পদোন্নতির জন্য। এক্ষেত্রে পূর্ব অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হইত না। পদোন্নতির ফলে তিনি অভিজাত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হইতেন এবং উচ্চ বেতন পাইতেন। কোন উজিরের উপর দুইটি বিভাগের দায়িত্ব অর্পিত হইলে তিনি জুল উজারাতাইন নামে পরিচিত হইতেন। উমাইয়াদের রাজত্বকালে ইবনে শুহায়েদ এবং নাসরী আমলে এবনুল খাতিব এই পদ অলংকৃত করেন। তিনি খলিফার প্রতিনিধি ছিলেন না। আবার প্রাচ্যের উজির পদবাচ্য আব্বাসীয়দের মত অধীনস্থ মুখ্যমন্ত্রীও ছিলেন না। উমাইয়া স্পেনের হাজীব নামে পরিচিত প্রধানমন্ত্রীর মাধ্যমে তিনি খলিফার নিকট আবেদন পেশ করিতেন।
আভিধানিক অর্থে হাজীব খলিফাদিগকে সাধারণ জনগণের দৃষ্টির বাহিরে রাখিতেন। মন্ত্রী পরিষদের প্রধান হিসাবে তিনি সরকারের সমস্ত ব্যাপারে খলিফার প্রতিনিধিত্ব করিতেন। রাজকীয় আদেশ জারী, দেশ শাসন এবং সামরিক অভিযান পরিচালনা করিতেন। রাজ পরিবারের সদস্য অথবা খুবই মর্যাদাসম্পন্ন সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে দক্ষ ব্যক্তিকে সাধারণতঃ এই সম্মানিত পদে নিয়োগ করা হইত।৬ দুর্বল রাজাদের শাসন আমলে হাজীবই প্রকৃত পক্ষে সম্পূর্ণ শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। তিনি মন্ত্রী গভর্নর ও বিচারকদিগকে নিয়োগ ও বরখাস্ত করিতেন। যদিও
তিনি নামমাত্র খালিফার অনুমোদন প্রার্থনা করিতেন। ক্রমান্বয়ে তিনি এতই শক্তির অধিকারী হন যে রাজা না হইয়াও ইচ্ছানুযায়ী কাজ করিতে পারিতেন। এই পদ এত গুরুত্বপূর্ণ হইয়া ওঠে যে একাদশ শতাব্দীর ক্ষুদ্র রাজাগণ নিজদিগকে হাজীব বলিয়া পরিচয় দিতে গর্ব অনুভব করিত।
খুত্তাহ একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রশাসনিক যন্ত্র। ইহা সর্বপ্রকারের সরকারি কার্যক্রম দেখাশুনা ও আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করিত। ইহার প্রধান ছিলেন খেদমাতুল খলিফার দায়িত্বে নিযুক্ত প্রধান সচিব। তিনি ছিলেন উজিরের সম মর্যাদাসম্পন্ন এবং উজিরের সমান বেতন পাইতেন। কাতিবুর রাসাইল (সাহিব) ও কাতিবুল যাম্মাম (সহিবুল আশগাল আল খারাজিয়া)। এই দুই বিভাগে সচিবালয় বিভক্ত ছিল। প্রথমটির উপর ন্যস্ত ছিল রাজকীয় চিঠি-পত্রের আদান প্রদানের দায়িত্ব। সরকারি অর্থবিভাগের দায়িত্ব অর্পিত ছিল দ্বিতীয়টির উপর। যোগাযোেগ দফতরের দায়িত্বে নিযুক্ত কাতিবুল রাসাইল উপদেষ্টা পরিষদের নীতি নির্ধারণী বৈঠকেও যযাগদান করিতেন। দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে যোগযোগ মন্ত্রাণালয়ের দায়িত্ব ও গুরুত্ব বৃদ্ধি পাইবার ফলে ইহার অধীনে কিছু শাখা অফিস প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকারের সমস্ত যোগাযোগ সম্পৰ্কীয় বিষয়ের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন জহওয়ার ইবনে আবি আবদাহ।
সাহিব আল-রাসাইল ডাক বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মচারী, সাহিব আল-বারিদ (ডাক বিভাগ ভারপ্রাপ্ত)-এর সহিত যোগাযোগ রক্ষা করিতেন। ডাক বিভাগের দায়িত্ব ব্যতীত সাহিব আল বারিদ রাজকর্মচারীদের গতিবিধি এবং দলপতি ও অফিসারদের রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা সম্বন্ধে রাজাকে খবর সরবরাহ করিতেন। রাস্তার পার্শ্বে পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠিত ছিল। ডাক বিভাগ যদিও শুধু সরকারি কাজের জন্য নির্দিষ্ট ছিল তবুও ইহা জনসাধারণের ব্যক্তিগত চিঠি পত্র ও উপঢৌকনসমূহও বিলি করিত। জরুরী বিলির জন্য সংবাদবাহক হিসাবে পায়রা ব্যবহৃত হইত এবং বিপদ সংকেত হিসাবে পর্বত চূড়ায় অগ্নি প্রজ্বলিত করা হইত।
সাহিব আল-আশাগাল ছিলেন অর্থ বিভাগের প্রধান। কর নির্ধারণ ও কর আদায় এবং আদায়কৃত রাজস্ব ব্যবহারের দায়িত্ব তাহার উপর ন্যস্ত ছিল। কার্যতঃ তিনি ছিলেন উজিরের চেয়ে শক্তিশালী। পরিদর্শক ও কর আদায়কারীদের মাধ্যমে তিনি কার্য পরিচালনা করিতেন। গ্রানাডার নাসিরীদ শাসন আমলে তাহার দায়িত্ব পালন করিতেন উকিল।
আমীর অথবা খলিফা ছিলেন সর্বোচ্চ বিচারক। তিনি বিশেষ মামলাও শ্রবণ করিতেন। সাধারণ বিচার প্রশাসন পরিচালিত হইতো কার্ডোভার প্রধান কাজির নিয়ন্ত্রণাধীন শহরকাজি এবং ছোট শহরের বিচারক হাকিমগণের মাধ্যমে প্রধান
বিচারপতিকে কাজি উল কুযযাত বলা হইত। উজির-উল-কাজি অথবা কাজিউল জুন্দ (সেনাদলের বিচারক) সামরিক জেলার (কুরাহ) কার্যালয়ের প্রধান ছিলেন। এবং অষ্টম খ্রীস্টাব্দের প্রথম দিকে স্পেনে বসতি স্থাপনকারী সিরীয় ও আরব উপজাতীদের বিরোধ নিষ্পত্তি করিতেন। কাজিউল জুন্দ অমুসলিমদের মধ্য হইতে নির্বাচিত হইতেন এবং তিনি কাজিউল জামা নামে অবহিত হইতেন। প্রধান কাজি রাজ্যের সম্মানিত ব্যক্তিদের অন্যতম ছিলেন। সরকারি অনুষ্ঠানাদিতে তিনি উজিরদের সহিত আসন গ্রহণ করিতেন বিচারকদের লইয়া গঠিত উপদেষ্টা পরিষদ মজলিসে শুরা অথবা আসাব আল-রায় জটিল বিষয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় তাহাকে পরামর্শ দান করিতেন। তিনি ছিলেন সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী। তিনি শাসককে তাহার সম্মুখে উপস্থিত হইবার সমন জারি করিতে পরিতেন। প্রধান সেনাপতি এবনে বশির (মৃঃ ৮২৩ খ্রীঃ) আমীরের বিরুদ্ধে রায় দিতে এবং বাদীর ক্ষতিপূরণ করিবার আদেশ করিতে দ্বিধাবোধ করেন নাই। অন্য এক সময় তিনি আমীরের দস্তখতকৃত সাক্ষ্য গ্রহণ করিতে অস্বীকার করেন ফলে আমীরকে সাক্ষ্য প্রদানের জন্য প্রধান বিচারপতির সম্মুখে উপস্থিত হইতে হয়।১১ দশম শতাব্দীতে প্রধান ইমাম ও প্রধান কাজি পৃথক দুই ব্যক্তি হইতেন। কাজির অধিকারে থাকিত বায়তুল মাল আল-মুসলিমীন। ইহার অর্থ সম্পদ গচ্ছিত থাকিত কর্ডোভা মসজিদের১২ মাকসুরায়১৩। এতিম ও পাগলদের স্বার্থ এবং ওয়াকফ সম্পত্তির দেখা শুনার দায়িত্ব তাহার উপর ন্যস্ত ছিল। প্রদেশ ও জেলাসমূহে নিযুক্ত কাজিগণ প্রধান কাজির প্রতিনিধি হিসাবে তাঁহার সমস্ত দায়িত্ব পালন করিতেন। সামরিক বিচারালয়ে প্রধান বিচারপতি ছিলেন কাজিউল আসাকির।
কর্ডোভার পরবর্তী বিচার বিভাগের প্রধান কাজি ছিলেন সাহিব আল মাজিম, সাহিব আল রাদ, সাহিব আল শুরাতাহ, সাহিব আল শুক, অথবা মুহতাশিব এবং সাহিব আল মাওয়ারীথ (উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিষয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত কর্মচারী)। সাহিব আল মুজালিম নামে অপর একজন বিচারক কার্ডোভায় নিযুক্ত ছিলেন। বিশ্বাস ভঙ্গ, বিশৃংখলা সৃষ্টি এবং সরকারি কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অপরাধজনক মামলা শুনানীর জন্য আমীরগণ তাহাকে নিয়োগ করিতেন। বিচারকদের বিরুদ্ধে অভিযোগের শুনানী গ্রহণ করিতেন সাহিব আল রাদ। সাহিব আল রাদ ও সাহিব আল মুজালিম নামে কোন কোন সময় একই ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করিতেন।
নিজস্ব আইন মোতাবেক বিচারকার্য পরিচালনার জন্য অমুসলিমদের পৃথক বিচারক ছিলো। কিন্তু মুসলিম ও অমুসলিমদের বিরুদ্ধে সম্পর্কিত মামলার বিচার করিত মুসলিম বিচারক। জরিমানা, বেত্রাঘাত ও অঙ্গচ্ছেদন ছিল সাধারণ শাস্তি। ধর্মদ্রোহীতা ও ধর্ম ত্যাগের জন্য মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হইত। সাহিব আল শুরতাহ নামক শহর মেজিস্ট্রেট ছিলেন
কাজির অধীন। জনগণ তাঁহাকে সাহিব আল লাইল ও সাহিব আল মদিনা (নৈশ প্রহরী ও শহর প্রধান) বলিত। কিন্তু দশম শতাব্দীতে এই দায়িত্ব পৃথক পৃথক দুই ব্যক্তির উপর ন্যস্ত হয়। কোন কোন সময়ে কাজি ও সাহিবুল শুরতার দায়িত্ব একই ব্যক্তি পালন করিতেন। সাহিব আল শুরতার কার্যকলাপ প্রাসাদের ভিতরও ছিল। তাহার উপর ন্যস্ত ছিল শহর ও নগরের আইন শৃঙ্খলার দায়িত্ব। তিনি জনস্বার্থ বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত অপরাধীদিগকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া শাস্তি বিধান করিতেন। পুলিশ প্রধান সরাসরি গভর্নরের অধীনে ছিলেন। প্রাদেশিক শহরের পুলিশ প্রধানকে সাহিবুল আহদাথ বলা হইত। তাহার মর্যাদা নিয়মিত সেনা ও পুলিশের মাঝা মাঝি ছিল। শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা ও অন্যান্য অপরাধ দমনের দায়িত্ব ছিল তাহার উপর।
কাজিদের শ্রেণীভুক্ত মুহতাসিব নামে পরিচিত বিশেষ কর্মকর্তার অধীনে ছিল পৌর পুলিশ বাহিনী। সাহিব আল শুক অথবা ওয়ালি আল শুক নামে প্রথম যুগের মার্কেট অফিসার দশম শতাব্দীর শেষে মুহতাসিব ও উল্লাত আহকামুল হিসবাহ নামে পরিচিতি লাভ করে। মুহতাসিব ছিলেন রাজার তত্ত্বাবধায়ক১৪ ও সরকারি পরিদর্শক। বাজারসমূহ পরিদর্শন কালে মাপ ও ওজন পরীক্ষার সময় তিনি প্রকাশ্যে প্রতারক ও চোরদিগকে বেত্রাঘাত এবং শাস্তি প্রদান করিতেন। জুয়া ও যৌন অপরাধ এবং রুচিহীন পোশাকেরও তিনি বিচার করিতেন। বিশেষ ক্ষেত্রে হস্ত কর্তন ও মৃত্যুদণ্ডের ন্যায় কঠোর শাস্তি প্রদানের ক্ষমতা তাহার ছিল।১৫ বিভিন্ন জাতি ধর্ম ও গোত্রের লোকদের দ্বারা অধ্যুসিত শহর কয়েকটি মহল্লায় বিভক্ত ছিল। প্রতিরক্ষার জন্য ইহার চতুর্দিক প্রাচীর দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল। প্রত্যেকটি মহল্লা বা পাড়াকে আবার কতিপয় সহপ্রাচীর দ্বারা পৃথক করা হইত। আল-দারাবুন নামে নৈশপ্রহরী রাত্রিকালে পাহাড়া দিত। এশার নামাজের পর ও দুর্ঘটনার সময় তাহারা নগরী ও মহল্লার ফটক বন্ধ করিয়া দিত। ইহাতে সম্ভাব্য যেকোন প্রকারের দুর্ঘটনা রোধ করা যাইত। অস্ত্রে সুসজ্জিত দারোয়ানের সহিত পাহারায় কুকুর ও লণ্ঠন ব্যবহৃত হইত। নগরীর সীমান্তে পাহারা দেওয়ার জন্য বিশেষ বিশেষ জায়গায় আতালেয়াস নামে প্রহরীস্তম্ভ নির্মিত হইয়াছিল। জলদস্যুদের বিরুদ্ধে পাহারায় নিয়োজিত ছিল উপকূলীয় প্রহরীদল। পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য রাজপথের মাঝে মাঝে ফাঁড়ি ও চকিদারের ব্যবস্থা ছিল।
প্রশাসনিক সুবিধার জন্য সারা দেশকে পাঁচটি প্রধান প্রদেশে বিভক্ত করা হয়। যথাঃ ১। দক্ষিণাঞ্চলে ভূমধ্যসাগর ও গুয়াদিয়ানা নদীর মধ্যবর্তী স্থলে অবস্থিত আন্দালুসিয়া প্রদেশ; ২। পশ্চিমে লুসিতানিয়া, উত্তরে ডুরো নদী এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত মধ্যস্পেন; ৩। গ্যালেসিয়া ও লুসিতানিয়া (আধুনিক পর্তুগাল); ৪। ইবরো নদীর উভয় পার্শ্বস্থ এলাকা; ৫। সেপ্টিমানিয়া দক্ষিণফ্রান্স।
দেশের উন্নতির সাথে সাথে প্রশাসনিক সুবিধার্থে প্রদেশগুলির আয়তন কমিতে থাকে এবং প্রত্যেকটি বিখ্যাত শহর ও উহার পার্শ্ববর্তী এলাকা লইয়া এক একটি প্রদেশ গড়িয়া উঠে। দশম শতাব্দীতে এই প্রদেশগুলি লোয়ার, মিডল ও আপার এই তিনটি মার্চের (মাগারাস) সীমান্ত ঘাটিতে পরিণত হয়। খলিফা-শাসন আমলে সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ স্থলে সারাগোসা ও টলেডো নামক দুইটি শহর অবস্থিত ছিল। ওয়ালী নামক সামরিক ও বেসামরিক গভর্নরের শাসনাধীনে ছিল ইহার প্রত্যেকটি প্রদেশ। আমীর ও খলিফার প্রয়োজনের সময় কর্ডোভাতে সামরিক সাহায্য প্রেরণ করা ছিল তাহার দায়িত্বসমূহের অন্যতম। স্বাধীন আমীরদের রাজত্বকালে প্রদেশগুলি ছিল বৃহৎ। ফলে তিনি প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শহরে গভর্নর এবং সীমান্তে সেনা প্রধান নিয়োগ করিতেন। ওয়ালীর অধীনে ছয়জন মন্ত্রী ছিলেন। তাহারা জনগণের মধ্যে বিরাজমান বিরোধসমূহের নিষ্পত্তির জন্য সারাদেশে ভ্রমণ করিতেন। কর্মে অবহেলায় দোষী কায়িদ এবং নগর প্রশাসকদের তিনি অপসারণ করিতেন। আরব বার্বার ও নবমুসলিম পরিবারের স্থানীয় অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্য হইতে নিযুক্ত কায়িদ (সেনাপ্রধান) সাধারণতঃ গভর্নর হইতেন। তিনি কোন কোন সময় প্রদেশ হইতে সংগৃহীত রাজস্বের নির্দিষ্ট অংশ কর্ডোভার কেন্দ্রীয় শাসককে প্রদান করিতেন।১৬। প্রাদেশিক গভর্নরদের মধ্য হইতে অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন গভর্নর ও সামরিক প্রধানকে সীমান্ত প্রদেশের গভর্নর হিসাবে নিয়োগ করা হইত। তিনি তুজিবী, বানু হুদ, বানু রাজিন অথবা বানু জুনন গোত্রের লোক হইতেন। উমাইয়াদের অধঃপতনের যুগে সর্বপ্রথম সীমান্ত প্রদেশের গভর্নরগণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
করের প্রধান উৎস ছিল ভূমিরাজস্ব, যাকাত, জিজিয়া, আমদানী রফতানী শুল্ক, বাজারটোল, খনি কর ও গনিমত। হাওকলের বর্ণনা অনুসারে, তৃতীয় আবদুর রহমানের রাজত্বকালে রাজস্বের মূল উৎস ছিল ভূমিরাজস্ব (জিবয়াহ) খারাজ (খ্রীস্টান প্রজাদের প্রদত্ত কর) যাকাত, নতুন মুদ্রা চালু, আমদানী রফতানী শুল্ক ও বাজারটোল১৭। এই সমস্ত কর আদায়ের জন্য খুত্তাতুল আশগাল নামে একটি প্রতিষ্ঠান কর্ডোভাতে প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোককে সাধারণতঃ মাখজান নামে পরিচিত রাজ বিভাগের প্রধান (খাজিন) নিয়োগ করা হইত।১৮ প্রথম হাকাম তাঁহার রাজ্যের রাজস্ব আদায়ের ভার অর্পণ করেন তিওদোলফোর পুত্র খ্রীস্টান রাবীর উপর।১৯ আমদানী রফতানী বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন খুব সম্ভব ইহুদী চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ হাসদাই ইবনে শাপরুত২০। জুলুম ও অত্যাচারের মাধ্যমে মাকুস নামে অন্যায় কর আদায়ের জন্য এগারো শতাব্দীর লেখক ইহুদীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করেন। অর্থ দফতরের নিম্নতম শাখাগুলি গ্রামে অবস্থিত ছিল। আমীর নামে পরিচিত আঞ্চলিক প্রধান ইহার দায়িত্ব পালন করিতেন। শস্য-সংগ্রহের সময় আশশার নামক
কর্মচারী সরেজমিনে যাইয়া উৎপাদিত শস্যের মূল্য নির্ধারণ করিতেন।২২ মুতাকাব্বীল তাহার অধীনস্থ রাজস্ব এলাকার বাজারটোল ও অন্যান্য কর আদায়ে নিযুক্ত ছিলেন। এই সমস্ত কর্মচারীদের প্রতারণা ও অতিরিক্ত কর আদায়ের বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টি রাখা হইত।২৩
একটি হিসাব বহি সংরক্ষিত হইত। ইউসুফ আল ফিহরীর সময় আদম শুমারী প্রবর্তীত হয়। প্রথম মুহাম্মদের সময় বিশপ হোস্টেজেসিস কর ও জিজিয়া প্রদানকারীদের একটি বর্ণনামূলক পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করা হয়। কর সঠিকরূপে সংগৃহীত হইয়াছে কিনা দেখার জন্য বাৎসরিক তদারকের ব্যবস্থা ছিল।২৪ জমির প্রকার ভেদে উৎপাদিত শস্যের এক ষষ্ঠাংশ হইতে এক তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কর নির্ধারিত ছিল। উমাইয়া আমীরদের রাজত্বকালে গৃহপালিত পশুর জাকাত হিসেবে পশুর পরিবর্তে নগদ টাকা লইবার প্রথা চালু হয়। প্রথম হাকামের সময় সংগৃহীত ভূমি রাজস্বের পরিমাণ ছিল ৪,৭০০ মুদ গম ও ৭,৭৪৭ মুদ যব।২৫ আলী বিন হামুদ (১০০৯-১০১৮) জায়েনের প্রজাদিগকে দ্রব্যসামগ্রীর পরিবর্তে এক মুদ গমের স্থলে ছয় দিনার এবং এক মুদ যবের জন্য ৩ দীনার নগদ টাকায় জমির খাজনা প্রদানের আদেশ জারি করেন। মুসলমানগণ তাহাদের উপার্জিত সম্পদের শতকরা আড়াই শতাংশ যাকাত হিসাবে প্রদান করিতেন। অমুসলিম পরিবারের উপার্জনক্ষম যুবক কর্তৃক মাসিক কিস্তিতে বাৎসরিক ১২ দিরহাম হইতে ৪৮ দিরহাম (১ পাঃ ৫শিঃ হইতে ৫ পাঃ জিজিয়া (ব্যক্তিগত কর) প্রদত্ত হইত।২৬
ছোট এবং বড় শহরে ও বন্দরে শুল্কভবন, ব্যবসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক ইদ্রিস বলেন, লোরকা এবং হিমারীতে রিহাদরাহ শুল্ক ভবনের কথা উল্লেখ করিয়াছেন।২৭ অস্ত্রযুদ্ধে ব্যবহৃত অশ্ব, পুস্তক, বিবাহের অলঙ্কারাদি আমদানী কর হইতে মুক্ত ছিল। ব্যক্তিগত ব্যবহার দ্রব্যসামগ্রীও এই কর বহির্ভূত ছিল।২৮ স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহের পর সঞ্চিত থাকা খাজাঞ্চী খানাতে জমাকৃত শুল্ক প্রাদেশিক বায়তুল মালে এবং২৯ সেখান হইতে কেন্দ্রীয় রাজধানী কর্ডোভাতে প্রেরিত হইত। কর্ডোভার কেন্দ্রীয় খাজাঞ্চীখানা সারাদেশের খাজাঞ্চী খানাগুলি নিয়ন্ত্রণ করিত এবং সেগুলির ঘাটতি পূরণ করিত।৩১ খাস জমি (মুস্তাখলাস) হইতে সংগৃহীত ভূমিরাজস্ব সরাসরি রাজকীয় খাজাঞ্চীখানায় (বায়তুলমাল আল খাস) প্রেরিত হইত রাজার নিজস্ব ব্যয়ের জন্য। প্রদেশসমূহে রাজকীয় সম্পত্তির প্রশাসনিক প্রধান ছিলেন সহিব আল দিয়া।৩২ তৃতীয় আবদুর রহমানের রাজত্বকালে শুধু হাট-বাজার ও ভূমিরাজস্ব হইতে ৭,৬৫,০০০ দীনার আয় হইত৩৩। কোন কোন শাসক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কর প্রদানকারী প্রজাদের প্রতি যথাযথ সাহায্য ও সহানুভূতি প্রকাশ করিতেন। তৃতীয় আবদুর রহমান সিংহাসনে আরোহণের পর বেআইনী কর সমূহের বিলোপ সাধন করেন। দ্বিতীয় হাকাম ৯৭৫ খ্রীঃ সামরিক ও বিশেষ করের এক ষষ্ঠাংশ হ্রাস করেন এবং এক বৎসর পর
দ্বিতীয় হিশাম কর্ডোভাতে৩৪ জলপাইয়ের তৈলের উপর আরোপিত করের বিলোপ সাধন করেন। দুর্বল ও ক্ষুদ্র প্রশাসকগণ মসজিদের ওয়াকফ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন। ইবনে হাজম (খ্রীঃ ১০৬৪) তাঁহার সময়ের ক্ষুদ্র শাসকগণ কর্তৃক আন্দালুসীয়দের উপর অতিরিক্ত ও বেআইনী কর আরোপের বিরুদ্ধে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।৩৫
রাজস্বের মোটা অংক সাম্রাজ্যের উন্নয়নে জনকল্যাণ ও সাহায্য খাতে ব্যয় হইত। দ্বিতীয় আবদুর রহমান তাঁহার সাম্রাজ্যের রাজস্বের সিংহভাগ প্রাসাদ, মসজিদ ও সেতু নির্মাণে ব্যয় করেন। তৃতীয় আবদুর রহমান রাজস্বের এক তৃতীয়াংশ ব্যয় করেন তাহার সাম্রাজ্যের সর্বত্র জনগণের ব্যবহারের জন্য সরকারি দালান কোঠা নির্মাণে৩৬। দ্বিতীয় হাকাম মসজিদ, এতিমখানা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। তিনি জনগণের কল্যাণের জন্য হাম্মাম, সরাইখানা, বাজার, ঝর্ণা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং কেন্দ্রীয় রাজধানীসহ অপরাপর বৃহৎ শহরকে সুসজ্জিত ও সুশোভিত করিয়া গড়িয়া তুলিবার উদ্দেশ্যে উদার হস্তে ব্যয় করেন।৩৭
দুর্ভিক্ষের সময় আংশিক কর বৃদ্ধি ঘোষিত হইত। শস্যের হানি হইলে কৃষকগণ জমিদারের নিকট হইতে উপযুক্ত ভাতা ও ক্ষতিপূরণ লাভ করিত।৩৮ দুর্ভিক্ষ কবলিত জনগণের মধ্যে সরকারি খাদ্য গুদাম হইতে শস্য বিতরণ ও মুক্ত হস্তে সাহায্য করা হইত। ৯১৪ খ্রীস্টাব্দে দেশে মারাত্মক দুটি দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে তৃতীয় আবদুর রহমান তাহার প্রধান মন্ত্রী বদর বিন আহমদকে বিশেষ ব্যবস্থা অবলম্বনের নির্দেশ দান করেন।৩৯ আদেশ অনুযায়ী প্রধান হিসবাহ কর্মচারীদের তত্ত্বাবধানে সাহায্যের পরিমাণ বৃদ্ধি করেন। (৯৮৮-৯খ্রীঃ)। দুর্ভিক্ষে মনসুরের রাজকীয় খাদ্য গুদামে চার বৎসরে যে ২,০০০,০০ মুদগম সংগ্রহ হইয়াছিল তাহা সাহায্য কার্যক্রমে সম্পূর্ণ নিঃশেষিত হইয়া যায়।৪০
মোটামুটি চার শ্রেণীর লোক লইয়া সেনাবাহিনী গঠিত হইত। বেতন ভোগী স্থায়ী সৈন্য, ইহাদের সদর দফতর ছিল কর্ডোভা। সামরিক জায়গীরদারী ভোগ দখলকারীগণ কর্তৃক গঠিত অনিয়মিত সৈন্য (বালদিস), স্পেন বিজয়ী মুসার সহিত আগমনকারী আরবদের বংশধরগণ, শেষোক্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভিযান পরিচালনাকালে সংগৃহীত সেচ্ছাসেবক বাহিনী (হাশিদ) অন্তর্ভুক্ত হইতো।
স্পেনে মুসলমানদের রাজত্বের প্রথম দিকে নগদ বেতনের স্থলে সৈন্যদিগকে জায়গীর প্রদান করা হয় এবং সিরীয় নিয়মিত বাহিনীকে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুনর্বাসিত করা হয়। বালজ ইবনে বিশরের নেতৃত্বে প্রায় ৭০০০ সিরীয় সৈন্য স্পেনের গভর্নর আবুল খাত্তার (৭৪৩-৫ খ্রীঃ) স্পেনে বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন।৪২ সামরিক কার্যের স্বীকৃতি হিসাবে তাহাদিগকে জায়গীর (ইকতা) প্রদত্ত হয়। প্রতিটি গোত্র
সামরিক বিভাগের এক একটি ইউনিট হিসাবে পরিগণিত হইত। বিশেষ গোত্র ও মুসলিমদের মধ্য হইতে সেনাপতি নিযুক্ত করায় কোন সময় সামরিক বাহিনীতে বিশৃঙ্খলা ও বিরোধ দেখা দিত। এইরূপ বিরোধ এবং বিশৃঙ্খলার দরুনই তৃতীয় আবদুর রহমানের রাজত্বকালে আল হান্ডেগার (আল খন্দক) যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজয় বরণ করিতে হয়। উমাইয়া আমীর ও খলিফাদের অধিক পরিমাণে বিদেশী বেতন ভোগী সৈন্যদের উপর নির্ভরশীল হইবার ফলে সেনাবিভাগে বহু পরিবর্তন সাধিত হয়। প্রথম আবদুর রহমান কর্তৃক বেতন ভোগী অধিকাংশ বার্বার সৈন্যের সমম্বয়ে ৪০,০০০ হাজার সৈন্যের বিরাট বাহিনী গঠিত হইয়াছিল। উহা মনসুরের হস্তে পরিপূর্ণতা লাভ করে। প্রথম হাকাম অস্ত্রাগার নির্মাণ, নতুন অস্ত্রের উদ্ভাবন, বেতন ভোগী (হশাম) নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং রাজ প্রাসাদের ফটকে পাহারাদারের প্রচলন করেন। তাঁহারা ছিল মামলুকদের সমন্বয়ে গঠিত ৫০,০০০ সৈন্যের নিয়মিত বাহিনী। বার্বার খ্রীস্টান ও নিগ্রোদের সমন্বয়ে গঠিত রক্ষীবাহিনী ছিল আলহারাস নামে পরিচিত। ঘোড়ার আস্তাবলসহ তাহাদের বিরাট দুইটি সেনানিবাস ছিল। আরীফ নামে পরিচিত বিশ জন সামরিক কর্মচারীর অধীনে ১০০ জন করিয়া মোট দুই হাজার অশ্বারোহী সেনা সব সময় গোয়াদালকুইভির নদীর তীরে পাহারায় নিয়োজিত থাকিত।৪৫ গ্যালেসিয়া অভিযান পরিচালনার উদ্দেশ্যে মুহাম্মদ বিন দ্বিতীয় আবদুর রহমান কর্ডোভার অধিবাসীদের জন্য সামরিক বিভাগের চাকুরী জরুরী বলিয়া ঘোষণা করেন। তৃতীয় আবদুর রহমান নিয়মিত সৈন্যের সংখ্যা ১,৫০,০০০ উন্নীত করেন। তাহার সেনা বাহিনীতে অসংখ্য অনিয়মিত সৈন্য ছিল। তাঁহার ১২,০০০ দেহরক্ষীর মধ্যে ৮০০০ ছিল সুদক্ষ অশ্বারোহী সৈন্য।
প্রাচ্যের তুর্কীদের অনুকরণে স্পেনে সাকালিবাহ (স্লাভ) বহুজাতি ও সম্প্রদায় বিশেষ করিয়া স্লাভের মধ্যে হইতে ক্রীতদাসদের লইয়া, ক্রীতদাস-বাহিনী গঠিত হয়। এই সমস্ত ক্রীতদাসগণকে সাধারণত স্লাভ দেশসমূহ ও ইউরোপের অন্যান্য অংশ হইতে জলদস্যু ও ভেরদুনের ইহুদী ক্রীতদাস ব্যবসায়ীগণ আনয়ন করিত। বাগদাদের মামলুকদের ন্যায় কর্ডোভার স্লাভগণ বহু গুরুত্বপূর্ণ পদ অধিকার করে। আরব গোত্রসমূহের সামরিক প্রাধান্য খর্ব করিবার উদ্দেশ্যে তৃতীয় আবদুর রহমান স্থায়ী সামরিক বাহিনী গঠন করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি আরব সেনা অপেক্ষা স্লাভদিগকে বেশী বিশ্বাসী বলিয়া মনে করিতেন। দ্বিতীয় হাকাম ক্রমে ক্রমে বিদেশী সেনাবাহিনী ভাঙ্গিয়া দেন এবং তদস্থলে দেশী সৈন্য ভর্তি করেন। গালিবের নেতৃত্বাধীনে এই মিলিশিয়া বাহিনীর অধঃপতন ঘটে। ক্ষমতা অধিকার ও গালিবকে মোকাবিলা করিবার উদ্দেশ্যে দেশী সৈন্য ও অবিশ্বাসী আরব অফিসারদের অপসারণ এবং অধিক সংখ্যায় বাবার ও খ্রীস্টান বেতনভোগী সৈনিককে সেনাবাহিনীতে ভর্তি করেন। বার্বার
সৈন্য ছিল দুই শ্রেণীর। প্রথম শ্রেণীভুক্ত ছিল মুরতাজিকা নামে নিয়মিত সৈন্য৪৬। মুত্তাবিয়া নামে পরিচিত স্বেচ্ছাসেবক দল ছিল দ্বিতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। প্রথম দলের গনিমতের মালের অংশ থাকিত। দ্বিতীয় দল বিজয়ের পর উপহার ও এক কালীন অর্থলাভ করিত। বড় পতাকাসহ ৫,০০০ সৈন্য লইয়া গঠিত সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব যিনি প্রদান করিতেন তাহাকে আমির বলা হইত। তাহার পতাকার নাম ছিল রায়াহ। ইহা পাঁচটি সমান দলে (contingent) বিভক্ত ছিল। প্রতিটি ১০০০ সৈন্য বিশিষ্ট দলের নেতৃত্ব প্রদান করিতেন কায়িদ নামে পরিচিত সেনাপতি। তাহার পতাকার নাম ছিল আলাম। প্রতিটি সেনাদল (Contingent) আবার পাঁচদলে বিভক্ত হইত। প্রতিদলে ২০০ জন সৈন্য থাকিত। লিওয়া পতাকাসহ প্রতিটি দলের নেতৃত্ব দান করিতেন নাকিব নামে সেনাপতি। পুনরায় প্রতিটি দল পাঁচ ভাগে বিভক্ত হইত। প্রতি দলে ৪০ জন সৈন্য থাকিত। বাদক সেনাদলসহ আরিফ এই চল্লিশ জন সৈন্য বিশিষ্ট সেনাদলের নেতৃত্ব দান করিতেন। সর্বশেষে প্রতিদল পাঁচ ভাগে বিভক্ত হইত। স্কোয়াড নামে পরিচিত ক্ষুদ্র সৈন্যদল ৮ জন করিয়া সৈন্য লইয়া গঠিত হইত। বর্শার মাথায় ত্রিকোণ বিশিষ্ট পতাকা (ওকদাহ) লইয়া ইহার নেতৃত্ব দান করিতেন নাজির।৭ সেনাবাহিনী পরিদর্শনের জন্য হাজীব আল-মনসুর সাহিব আল-আরদ নামে অফিসার নিয়োগ করেন। নতুন দেশ বিজয় অথবা কর আদায়ের উদ্দেশ্যে সাধারণত গ্রীষ্মকালে (সাইফা) অভিযান পরিচালিত হইত। কদাচিত এই ধরনের অভিযান শীতকালে (শীতাইয়াহ) পরিচালিত হইত। হিজরী ষষ্ঠ শতাব্দীর বিখ্যাত পণ্ডিত তারতুশি মুসলমান ও খ্রীস্টানদের মধ্যে সংগঠিত যুদ্ধের এইরূপে বর্ণনা করেন : ঢালী লম্বা বর্শা ও ধারালো বল্লমে সজ্জিত মুসলিম পদাতিক বাহিনী প্রথম সারিতে থাকিত। তাহারা বর্শাকে ঘারের উপর তেড়চা ভাবে ধারণ করিত। ইহার নিচের অংশ মাটিতে এবং অগ্রভাগ শত্রুর দিকে থাকিত। সম্মুখে ঢাল উচু করিয়া ধরিয়া বাম হাঁটু মাটিতে স্থাপন করিত। দ্বিতীয় সারিতে থাকিত তীর ধনুকে সজ্জিত বর্মবিদ্ধকারী তীরন্দাজ বাহিনী। তাহাদের পিছনে তৃতীয় সারিতে থাকিত অশ্বারোহী বাহিনী। যুদ্ধ আরম্ভ হইলে শত্রু সৈন্য যতক্ষণ পাল্লার মধ্যে না আসিত ততক্ষণ প্রথম সারিতে হাটু গাড়িয়া অবস্থান লওয়া একটি সৈন্যও তাহাদের অবস্থান ত্যাগ করিত না। শত্রু সৈন্য পাল্লার মধ্যে আসিবার পর তীরন্দাজ বাহিনী তীর নিক্ষেপ করিতে শুরু করিত এবং পদাতিক বাহিনী বর্শা নিক্ষেপ করিয়া শত্রু সেনাকে বর্শার অগ্রভাগে গাথিতে শুরু করিত। পদাতিক ও তীরন্দাজ বাহিনী অতঃপর ডাইনে এবং বামে অগ্রসর হইলে অশ্বারোহী বাহিনীর মাঝখানে অবস্থান লইয়া শত্রু সেনাদের সম্মুখে অগ্রসর হইতে শুরু করিত। এবং আল্লাহর ইচ্ছা হইলে বিজয় লাভ করিত।
সৈন্যদের বেতন দেওয়ার জন্য নিযুক্ত সামরিক দিওয়ান ছিল। উমাইয়া শাসনের শেষ দিকে সহায়ক অতিরিক্ত সৈন্যদের বেতন পরিশোধের জন্য মালাহিক আল
দেওয়ান নিয়োগ করা হয়।৫০ বিরতিহীনভাবে সিরীয় জুন্দ সেনাবাহিনীতে তিন মাস চাকুরী করিলে ২০০ দীনার দেওয়া হইত, অপরদিকে আরব বালাদীগণ ছয় মাস চাকুরী করিলে পাইত ১০০ দীনার। সিরীয় জুগণ কর হইতে অব্যাহতি লাভ করিত। কিন্তু বালাদীদিগকে অপর প্রজাদের ন্যায় কর প্রদান করিতে হইত। সিরীয় ও আরবদের তৃতীয় অপর একটি দল ছিল। আরব বলাদীগণ ব্যতীত নিয়মিত সৈনিকগণ প্রতিটি অভিযান শেষে প্রত্যেকে ৫ হইতে ৪০ দীনার পর্যন্ত অতিরিক্ত বেতন লাভ করিত।৫১ নবম শতাব্দী পর্যন্ত নগদ বেতন ও জায়গীর প্রথা চালু ছিল। দশম শতাব্দীতে জায়গীর প্রথা সম্পূর্ণ রূপে বিলুপ্ত হয় এবং সৈনিকদের নগদ বেতন দেওয়ার ফলে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।৫২।
প্রথম দিকে উমাইয়া আমীরগণ নৌবাহিনীর উন্নতি সাধনে তেমন। গুরুত্ব প্রদান করেন নাই। পীরেনীজের অপর পারে সাম্রাজ্য বিস্তারে ব্যর্থ হইবার মূলে ইহা ছিল অন্যতম কারণ। নরম্যানগণ উপকূলীয় শহরসমূহ ও সেভিল লণ্ঠন করিলে লুইস (দ্বিতীয় আব্দুল কারীল) দ্বিতীয় আবদুর রহমান উপকূলীয় শহরগুলি সুরক্ষিত করেন ও উপকূলীয় প্রহরীর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তিনি আন্দালুসীয় উপকূলের দিকে দিকনির্ণয়ের উদ্দেশ্যে নির্মিত ধ্বংসপ্রাপ্ত মিনার মেরামতের ব্যবস্থা করেন।৫৩ সিউটা ও জিব্রাল্টার প্রতিরক্ষার জন্য তৃতীয় আবদুর রহমান ৯৩১ খ্রীস্টাব্দে আফ্রিকার উপকূলে আহমদ বিন মুহাম্মদ বিন ইলিয়াস এবং ইউনুস বিন সাঈদ নামে৫৪ দুই জন কায়েদের অধীনে সৈন্য ও নাবিকসহ যুদ্ধ জাহাজ মোতায়েন করেন।৫৫ প্রায় পঁচিশ বৎসর পরে খলিফা সাহিব আল শুরতাহ আহম্মদ বিন ইয়ালার নেতৃত্বে অপর একটি রণতরী প্রেরণ করেন। পেসিনা অথবা আলমেরিয়াতে নৌঘাটি ভূমধ্যসাগরের শক্তিশালী নৌবাহিনীতে পরিণত হয়। তৃতীয় আবদুর রহমানের নৌবাহিনী পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে ফাতিমীয় নৌবাহিনীর উপর প্রাধান্য বিস্তার করে এবং ৯৫৩ খ্রীঃ মাহদীয়া গমনকারী সিসিলীয় জাহাজের ক্ষতি সাধন করে। তৃতীয় আবদুর রহমান ও দ্বিতীয় হাকামের (কাসেদুল বহরের) নৌবাহিনী প্রধান ছিলেন আবদুল্লা বিন রিয়াহিন। তোরতোসা, দেনিয়া, আলিকান্তে, আলমেরিয়া, ভেরা, আলজেসিরাস, ইভিজা, সাল্টেস, সিলভেস ও সান্তামারিয়াতে জাহাজ নির্মাণ ও মেরামতের কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়। গোয়াদালকুইভির নদীর তীরবর্তী এলাকায় জাহাজ প্রস্তুত ও মেরামতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারখানাসমূহ অবস্থিত ছিল। এই জাহাজ নির্মাণের কারখানা মারসা ও দারুস সানা নামে পরিচিতি ছিল। শব্দটি স্পেনীয় আতারাজানা এবং ইংরেজি আরসেনাল ও অপরাপর ইউরোপীয় ভাষায় রূপান্তরিত হইয়াছে।
স্পেনের আবুল সালাত উমাইয়া বিন আবদুল আজিজ ১১১৬-১৭ খ্রীস্টাব্দে মিশর পরিদর্শনে গমন করেন এবং একটি ডুবো জাহাজকে উদ্ধারের চেষ্টা চালান। জাহাজটি পানির উপর উঠাইবার পর তীব্র স্রোতে সিল্কের রশি ছিড়িয়া পুনরায় ডুবিয়া যায়।
সাধারণত আন্দালুসিয়া হইতে সিরিয়া পৌছিতে একটি জাহাজের ৩৬ দিন সময় লাগিত। আন্দালুসিয়ার বিখ্যাত নাবিক ইবনে জুবায়ের ১১৮২-৩ খ্রীস্টাব্দে জেনিও জাহাজ যোগে আন্দালুসিয়া হইতে ২০ দিনে আলেকজান্দ্রিয়াতে গমন করেন।
রুসা ও আসহাবুল আরজুদ নামে উচ্চ ও নিম্ন পদস্থ দুই শ্রেণীর নাবিক নৌবিভাগে নিযুক্ত ছিল। প্রতিটি যুদ্ধ জাহাজ একজন কয়েদের (ক্যাপ্টেন) অধীনে পরিচালিত হইত। তিনি সাজসরঞ্জাম তত্ত্বাবধান, নাবিকদের প্রশিক্ষণ এবং জাহাজে লোক নিয়োগ করিতেন। দ্বিতীয় অফিসার রাইস জাহাজ চালনার দায়িত্ব পালন করিতেন। নাখুদা (অধিনায়ক), রুহবান বা রাহবান (কাপ্তান), দিদবান (অনুসন্ধানকারী) সমন্বয়ে নাবিকদল গঠিত হইত।
আটলান্টিক মহাসাগরে দিগন্তবিস্তারী অথৈ ও বিক্ষুব্ধ জলরাশিকে মুসলিম নাবিকগণ প্রথম দিকে ভয় করিত। গ্যালেসিয়া আক্রমণের উদ্দেশ্যে ৮৭৯ খ্রীঃ আবদুল হামিদ ইবনে মুগিথের নেতৃত্বে একটি নৌবাহিনী গোয়াদালকুইভির নদীর মোহনার উপকূল হইতে যাত্রা করে এবং আটলান্টিক মহাসাগরে পৌছিবার পর ঘূর্ণি ঝড়ে পতিত হইয়া সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়। প্রায় একশত আঠারো বৎসর পর কাসর আবী-দানিশ বেশ কিছুসংখ্যক জাহাজ একত্রে সন্নিবেশিত করিয়া গ্যালেসিয়ার বিরুদ্ধে সাফল্যজনক অভিযান পরিচালনা করে।৫৯ দশম শতাব্দীতে লিসবনের মুসলিম নাবিকগণ সমুদ্রসীমা বৃদ্ধি ও অপর উপকূল আবিষ্কারে গমন করিতে শুরু করে। আটজন নাবিকের একটি দল এই সফল অভিযান পরিচালনা করে। প্রায় আড়াইশত বৎসর পর ইবনে ফাতিমা নামে অপর একজন স্প্যানিশ নাবিক আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূল পরিভ্রমণ করেন এবং আফ্রিকার আভ্যন্তরীণ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। আটলান্টিক মহাসাগরে মুসলমানদের এই সমস্ত দুঃসাহসিকতাপূর্ণ অভিযান সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ করে যে, আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল স্পেনীয় মুসলিম নাবিকদের নিকট পরিচিত ছিল। ইহা হইতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, সম্ভবতঃ এই পথে মুসলমান নাবিকগণ আফ্রিকার দক্ষিণ ও পূর্ব উপকূলে গমন করিয়াছিল এবং ভাস্কো-দা-গামার পূর্বেই ভারত মহাসাগরে পাড়ি জমাইবার সমুদ্রপথ তাহাদের জানা ছিল। আরব ও পর্তুগীজ প্রথা অনুসারে ভূমধ্যসাগরীয় মুসলিম নাবিকগণ তাহাদের পরিচিত সমুদ্র পথের মানচিত্র ভাস্কো-দা-গামাকে প্রদান করিয়া ভারত মহাসাগরে গমনের পথ নির্দেশ করেন। মুসলমানদের নতুন দেশ ও নতুন জলপথ আবিষ্কারের অনুপ্রেরণার ফলশ্রুতিতে পর্তুগীজগণ ভারত বর্ষে আগমন ও আমেরিকা আবিষ্কার করিতে সক্ষম হয়।৬০
মুসলিম, খ্রীস্টান ও ইহুদী, ধর্মীয় দিক হইতে তিন শ্রেণীতে স্পেনীয় সমাজ বিভক্ত ছিল এবং সামাজিক দিক হইতে অভিজাত সম্প্রদায় মধ্য ও নিম্ন এই তিন শ্রেণীভুক্ত ছিল স্পেনের মানবগোষ্ঠী। অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত
ছিলেন খলিফা, আমীর ও সর্দারগণ। মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে ছিল ক্ষুদ্র জমিদারগণ, ব্যবসায়ী ও শিল্পী এবং তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত ছিল কৃষিজীবী, শিল্পপতি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শ্রমিক ও ক্রীতদাসগণ। খয়রাত, উপঢৌকন ও দানশীলতা প্রভৃতি সৎগুণের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আমীর ও খলিফাগণ সাধারণ জনগণের স্নেহ, ভালবাসা ও হৃদয় জয় করিতে ব্যর্থ হন। স্বাধীনতাপ্রিয় আরব, বার্বার ও উলামায়েগণ জোরপূর্বক প্রজাদের আনুগত্য আদায়ের নীতির বিরোধীতা করে। ধর্মনিরপেক্ষ শিল্পকলার পুস্তক ও চিত্রসমূহ সংগ্রহের জন্যও আলেম এবং তাহাদের সমর্থকগণ খলিফা এবং আমীরের বিরোধীতা করেন।
কর্ডোভা এবং সেভিলে ইবনে জাহওয়ার ও বানু আব্বাস কর্তৃক যথাক্রমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সত্ত্বেও তাহারা স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করেন। উজিরগণ সাম্রাজ্যের প্রশাসনকার্য পরিচালনা করেন এবং জোরপূর্বক প্রজাদের নিকট হইতে কর আদায় করেন। রাজনৈতিক কারণে খলিফা ও আমীরগণ ধর্মীয় কর্তব্য পালন করিতেন। ইহার ফলে ধর্মবিশ্বাসী মুসলমানগণ তাহাদিগকে ধার্মীক বলিয়া ধারণা করিত। ইহুদী ও খ্রীস্টানদিগকে উচ্চপদে নিয়োেগ, দর্শনের পৃষ্ঠপোষকতা, বাদ্য ও নৃত্য সম্পর্কে পরীক্ষা নিরীক্ষা পরিচালনা, মানুষের দেহে অস্ত্রোপচার, ধর্ম-নিরপেক্ষ পুস্তক এবং অন্য ধর্মের গ্রন্থের প্রতি উৎসাহ, মদ্যপান, উপপত্নী গ্রহণ ইত্যাদি কারণে জনগণ ক্ষিপ্ত হইয়া ওঠে। মদ ও নারীর প্রতি আসক্তির দরুন যোগ্য ও সুশাসকগণও নারীদের দাবার ঘুটিতে পরিণত হন। দ্বিতীয় আবদুর রহমান মালকাতারুব, তৃতীয় আবদুর রহমান জাহারা, দ্বিতীয় হাকাম সুলতানা সুরহ এবং সেভিলের মুতামিদ ইতিমাদ রুমাইকিয়াহ কর্তৃক পরিচালিত হইতেন। ইহার ফলে জনগণের মধ্যে তাহাদের সম্পর্কে ঘৃণা ও অবজ্ঞার সৃষ্টি হয়। খাজাঞ্চীখানা, বৈদেশিক দফতর, দেশরক্ষা ও সমর বিভাগ, স্বরাষ্ট্র প্রভৃতির জন্য পৃথক পৃথক কাতিব (উজির) নিযুক্ত হইতেন। তদুপপারি উহাদের সকলের উপরে একজন হাজীব ছিলেন। তিনি রাজ্যের সমস্ত বিষয় দেখাশোনা করিতেন। খলিফা, কাতিব এবং প্রজাদের মধ্যে তিনি যোগসূত্র বা মধ্যবিন্দু হিসাবে কাজ করিতেন।৬১
মাহতাসিরের অফিস অবস্থিত ছিল মসজিদের ফটকে। তিনি অব্যবহৃত জিনিষপত্র ও ঔষধ ক্রয়-বিক্রয় পরীক্ষা করিতেন। তাহার জরিমানা ও বেত্রাঘাতের বিরুদ্ধে কোন আপীল চলিত না। কাজির অফিসও সাধারণত মসজিদের দরজাতেই থাকিত। ধর্মীয় অধিকার ও দায়িত্বসমূহের বিচারের ক্ষমতা তাহার উপর অর্পিত ছিল। তিনি কোরআনএর আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনে প্রয়োগ এবং ধর্মীয় অনুশাসনসমূহ কার্যকরী করিতেন। প্রাদেশিক শহরে নিযুক্ত কাজিগণ জামা নামে পরিচিত কাজিউল কুজ্জাতের
অধীনে ছিলেন। ছোট ছোট শহরে নিযুক্ত কাজিগণকে মুসাদ্দাদ৬২ বলা হইত। দেশে কোন নতুন আইন কানুন জারির পূর্বে উহা পরীক্ষামূলক ভাবে রাজধানী ও সীমান্ত শহরসমূহে প্রবর্তন করা হইত।
প্রহরীদের জন্য রাস্তার পার্শ্বে গৃহ ও উপকূলীয় অঞ্চলে প্রহরীস্তম্ভ নির্মিত হয়। গভর্নরদের বাসস্থানে ও অফিসসমূহে রিপোর্ট করিবার জন্য সীমান্তে গোয়েন্দা নিয়োগ করা হয়। কৃষিদ্রব্য, খনিজ সম্পদ, ব্যবসা সামগ্রী এবং জনগণ ও তাহাদের বিষয় সম্পত্তি রক্ষা করিবার উদ্দেশ্যেও সরকারকে লোক নিয়োগ করিতে হইত। সাহিবুল বারিদ সরকারি কর্মচারীদের কার্যকলাপ ও সর্দারের রাষ্ট্রবিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে খলিফাকে অবহিত করিতেন।
মুসলিম অভিজাত সম্প্রদায় সম্পদের প্রাচুর্যে রোমান ও গথদের ন্যায় দুর্নীতি-পরায়ণ ও আরামপ্রিয় হইয়া ওঠে। ধর্মকর্মপালন করিলেও ধর্মের প্রতি তাহাদের আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ ছিলনা। তাহারা অধিক মাত্রায় ধর্মনিরপেক্ষ কাজকর্মে ও দার্শনিক আলাপ আলোনায় অংশ গ্রহণ করেন। অধিক সংখ্যায় ক্রীতদাস ও উপপত্নী গ্রহণ ও তাহাদের ভরণ পোষণে প্রচুর অর্থ ব্যয়ে গর্ব অনুভব করিতেন। সাধারণত একজন সুন্দর ক্রীতদাস ও সুন্দরী ক্রীতদাসী ৪০০০ দীনারে ক্রয় বিক্রয় হইত। ঈদ এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে তাহাদের বিশৃংখলা, আঁকজমক ও আড়ম্বরে ঈর্ষান্বিত জনগণ সুযোগমত তাহাদের বিলাসিতাপূর্ণ প্রাসাদ ও হাম্মামসমূহ লুণ্ঠন করিত। মাক্কারী৬৩ কর্তক উদ্ধৃত ইবনে হাইয়ানের বর্ণনায় আন্দালুসীয়দের অধার্মিক কার্যকলাপ, কর্মবিমুখতা, অশালীন আচার-আচরণ, এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীনতার এক পরিপূর্ণ চিত্র অঙ্কিত হইয়াছে। খ্রীস্টানগণ তাহাদের বাসস্থানে পৃথকভাবে বসবাস করিত কিন্তু সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একে অপরের সহযোগিতা করিত। গীর্জার অনুশাসন মোতাবেক পৃথক স্কুলে তাহাদের শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা থাকিলেও উহারা মুসলমানদের মাদ্রাসায়ও লেখাপড়া করিত। তাহারা কদাচিৎ গোসল করিত এবং চিকিৎসা উপলক্ষে চিকিৎসকের নিকট গমন করিত। তাহারা চিকিৎসা সম্পর্কে খুবই উদাসীন ছিল। শিক্ষা সংস্কৃতি চিকিৎসা জ্যোতির্বিদ্যা ও অন্যান্য বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইহুদীগণ ছিল মুসলমানদের পূর্বসূরী। ইহুদীদের নিকট হইতে মুসলমানগণ বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা লাভ করিবার ফলে ইহুদীগণ জিজিয়া কর প্রদান হইতে নিষ্কৃতি লাভ করে। মুসলিম শাসনের প্রতি অনুগত হওয়া সত্ত্বেও রাজা মন্ত্রী ও অন্যান্য কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত তাহাদের নিজস্ব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ছিল। তাহারা বহুগুণের অধিকারী হইয়াও সুদখোর বলিয়া ঘৃণিত ছিল। একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও তাহারা মূর্তি পূজা করিত। ইহুদীগণ পৃথক বাসস্থানে বসবাস করিত এবং পুত্র কন্যাদিগকে অন্যদের সহিত মিলামিশা করিতে
দিতনা। ইহুদী সম্প্রদায়ের বাহিরে বিবাহশাদী সমর্থন করিত না। তাহারা ছেলে মেয়েদিগকে মুসলমানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করিত। মুসলমানগণ সমবায় পদ্ধতির ব্যবসা-বাণিজ্যের নিয়ম কানুন ইহুদীদের নিকট হইতে গ্রহণ করে। ইহুদীদের নিকট হইতে আরও অনেক বিষয়ে মুসলমানগণ শিক্ষালাভ করে। খুবই আঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রমজান মাস পালিত হইত। সরকারি অফিস আদালত বন্ধ থাকিত। রমজান মাসের রাত্রিকালে আলোয় আলোকিত রাজধানী ও বড় বড় শহরগুলি খুবই উজ্জ্বল ও জৌলুসপূর্ণ দেখাইত। হাম্মামখানায় পান্থনিবাসে (সরাই) নগর-উদ্যান ও বাগানসমূহে লোকের ভীড় জমিত। ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের জন্য সারারাত্র মসজিদের দরজা খোলা থাকিত। রজমান মাস ব্যতীত রাত্রিবেলা গৃহের বাহিরে গমন সমাজের নিকট ছিল ঘৃণা ও অবজ্ঞার বস্তু। গৃহাভ্যন্তরের বারান্দায় ও অন্দরে নাচগান, গল্পের আসর ও জাদু খেলার মাধ্যমে তাহারা অবসর বিনোদন করিত। জাদুকর, গায়ক ও গণকারগণ দৈবজ্ঞ) নগর এবং নগর-উদ্যানে ঢোল বাজাইয়া জনসাধারণকে সমবেত করিত। প্রহরীপুলিশ নগরের রাস্তা ও উদ্যানে পাহারা (টহল) দিত। আনন্দ উৎসব ও বনভোজনের জন্য গোয়াদালকুইভির ও অন্যান্য নদীতে নৌকা পাওয়া যাইত। পণ্ডিত ব্যক্তিগণ আনন্দ উৎসবে সময়ের অপচয় না করিয়া পাঠাগারে লেখাপড়া করিত এবং কোন সমস্যা দেখা দিলে একে অপরের সহিত আলোচনা দ্বারা উহার সমাধান করিত। জ্যোতির্বিদগণ মানমন্দিরে গ্রহ ও তারার গতিবিধি লক্ষ্য করিবার কাজে ব্যাপৃত থাকিত। ব্যবসায়ী ও পর্যটকগণ সরাইখানাতে নৃত্য দর্শন, তাস ও দাবা খেলার মাধ্যমে তাহাদের অবসর সময় অতিবাহিত করিত। চাকর চাকরানীদের ডাকিবার সময় হাততালি দেওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। স্পেনীয় মুসলমানগণ গোসল ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি ভীষণ যত্নবান ছিল। সর্বত্র সাবান প্রস্তুতের কারখানা ছিল। খাদ্য গ্রহণ না করিয়াও তাহারা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য শেষ কপর্দকটুকু ব্যয় করিতে প্রস্তুত ছিল। হাম্মাম শুধু গোসল অজুর জন্যই ব্যবহৃত হইত না—গল্প, সংগীতশ্রবণ এবং প্রাতঃরাশেরও ব্যবস্থা ছিল সেখানে। হাম্মামের পার্শ্বে জ্বলন্তচন্দন কাঠ এবং কার্পেট সজ্জিত কক্ষ ছিল। সেখানে গোসল শেষে বিশ্রাম গ্রহণ করা হইত। প্রচুর পরিমাণে সুগন্ধি ব্যবহৃত হইত। বাড়ীর অঙ্গন ও অট্টালিকার পার্শ্ব ফুলের বাগান দ্বারা সুসজ্জিত থাকিত।
মুসলমানগণ পাতলা সুতিবস্ত্র পরিধান করিত এবং উহা ঘন ঘন পরিবর্তন করিত। প্রাচ্য রীতিতে তাহারা পোশাক পরিধান করিত। তাহারা উমাইয়াদের সাদা ঢোলা পোশাক পরিধান করিত এবং মাথায় লাল টুপি ব্যবহার করিত। স্পেনে মুসলিম শাসনের শেষ দিকে ইহুদীগণ হলুদটুপী ব্যবহার করিত। পাগড়ী শুধু পণ্ডিত ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। কোরআন-এর আয়াত খঁচিত আঙটি মুসলমানদের হস্তে শোভা
পাইত। চিঠিপত্র ও অন্যান্য লিখিত কাগজ পত্রে প্রত্যেকের নিজস্ব সিল ব্যবহৃত হইত। রাজকীয় সীলমোহর গোলাকার অথবা বহু কোণবিশিষ্ট হইত, উচ্চ পদস্থ কর্মচারীদের চৌকোণা এবং কোষাধ্যক্ষের জন্য ডিম্বাকৃতির সীল থাকিত। অন্যান্য দেশের নারীদের তুলনায় স্পেনের মুসলিম নারীসম্প্রদায় অধিক স্বাধীনতা ভোগ করিত। তাহাদের উচ্চ শিক্ষা লাভের সুযোগ সুবিধা ছিল প্রচুর। শিক্ষামূলক আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসমূহে তাহারা অংশ গ্রহণ করিত। দার্শনিক, কবি ও সাহিত্যিকদের মধ্যে অনেক নারীও ছিল। নারীদের অনেকে সরকারি উচ্চ পদে বহাল ছিল। সাধারণত অভিজাত সম্প্রদায়ের নারীদের অফিস আদালত ও বাহিরে গমনের অনুমতি ছিল না। নারীসম্প্রদায় বহু মূল্যবান অলঙ্কার ও পোশাক ব্যবহার করিত। তাহারা পাতলা নীল, সবুজ ও হলুদ শার্ট এবং ঢোলা পায়জামা পরিধান করিত। আলোয়ান দ্বারা দেহ আচ্ছাদন করিত। তাহারা জুতা ও স্যান্ডেল ব্যবহার করিত। সমাজে একাধিক বিবাহ ও বিধবা বিবাহ প্রচলিত ছিল। নারীগণ স্বামীর সম্পত্তির অংশ পাইত। নারীদের বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার ছিল। অতি সহজে নারীগণ তালাক লইতে পারিত।
অন্যান্য দেশের তুলনায় স্পেনের ক্রীতদাসগণ অধিক সুখে শান্তিতে ছিল। তাহারা তাহাদের প্রভুদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে সাহায্য করিত এবং প্রভুদের পক্ষ হইতে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করিত। তাহারা গর্বের সহিত প্রভুদের নামকে নিজেদের উপনাম হিসাবে ব্যবহার করিত। যেমন—আবদুর রহমান আল নাসির হইতে নাসিরী, আল হাকাম, আল মুস্তানসির হইতে মুস্তানসিরী ও আবু আমীর হাজীব আল-মনসুর হইতে আমীরী।
তথ্য নির্দেশ
ইবনে ইজারী, আল-বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২০৫, ২১১, ২১৩; লেডি প্রডেঙ্কাল, এল, ইশানা, পৃঃ
৬২। ২। গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৯১।
ইবনে ইজারী, আল-বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৯৫।
গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৫০; রিউভেন লেভী, সোশিওলজি অব ইসলাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৬। ৫। লেভি প্রডেঙ্কাল, এল, ইস্পনা, পৃঃ ৬৪, ৬৬; ইবনুল আব্বারী, হুল্লা, পৃঃ ১৩৭।
লেভি প্রভেঙ্কাল, ঐ, পৃঃ ৬৪।
গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৯২। ৮। ইবনে ইজারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৩৬। ৯। আল-মার্কারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৯২। ১০। লেভি প্রভেঙ্কাল, ঐ, পৃঃ ৮১। ১১। আল-মাক্কারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১০৯-১১২।
১২। ইবনে ইজারী, আল-বেয়ান, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৯৮। ১৩। লেভি প্রভেঙ্কাল, ঐ, পৃঃ ৯৫। ১৪। ইবনে বাশকোয়াল, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৬২; ইবনে ফারাজী ১ম খণ্ড, পৃঃ ৪৬। ১৫। রিবেরা, আল সুকজানী, পৃঃ ১৭৮-৭৯ অনুবাদ, পৃঃ ২২০। ১৬। ইবনে ইজারী, আল-বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৫৩। ১৭। ক্রেমার্স, ইবনে হাওকাল, পৃঃ ১০৮। ১৮। লেভি প্রভেঙ্কাল, হিস্ট্রোয়ার, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩০। ১৯। ঐ, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১৬২, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩২। ২০। ঐ, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৬৯, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩২। ২১। আল-আন্দালুস, ২য় খণ্ড, ১৯৩৪, পৃঃ ৩৫, অনুবাদ ৮৮। ২২। লেভি প্রভেঙ্কাল, হিস্ট্রোয়ার, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩৯। ২৩। গমেজ এমিলিও গার্সিয়া, এল ট্রাটেডো ডি ইবন আব্দুল, পৃঃ ১০৪-৮। ২৪। লোপেজ, কন্ট্রিবিউশনস, পৃঃ ৯৬, ১০৪। ২৫। গায়ানগোস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২১৩। ২৬। ইবনে বাস্সাম, দাখিরা, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১০০। ২৭। আল-ইদ্রিসী, পৃঃ ১৯৬ অনুবাদ ২৩৯, পৃঃ ১৬২। ২৮। লোপেজ, কন্ট্রিবিউশনস, পৃঃ ৯১। ২৯। এল ট্রাটেডডা ডি ইবন আঙ্গুন, পৃঃ ১০৫। ৩০। আকবর মাজমুয়া, পৃঃ ২২। ৩১। ইসলামিক কালচার, ১৯৬০, পৃঃ ২২-২৭। ৩২। ইবনে ইজারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২১৩, ২২১, অনুবাদ ৩২৯, ৩৪০। ৩৩। ঐ পৃঃ ২৪৭; আজর, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৭। . ৩৪। গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৩৪, ইবনে ইজারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৭৬; ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ
৩৮৬, ৪৬৬, ৫১৪। ৩৫। লোপেজ, পৃঃ ১১০-১১; আল-আন্দালুস, ২য় খণ্ড, ১৯৩৪, পৃঃ ৩৬-৩৭, অনুবাদ ৪২-৪৩। ৩৬। গায়ানগোস, ২য়খণ্ড, পৃঃ ১২৪, ১৪৬। ৩৭। ঐ, পৃঃ ১৭২। ৩৮। লেভি প্রভেঙ্কাল, হিস্টোয়ার, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ২৬৯-৭০। ৩৯। ইবনে ইজারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৭৩। ৪০। ইবনে আল-খতিব, আমল আল-আলম, পৃঃ ১১৫। ৪১। এস, এম, ইমামউদ্দিন, সোশিও ইকনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন, লেডেন,
১৯৬৫, পৃঃ ৬০-৬৫। ৪২। ইবনে ইজারী, আল বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৩-৩৪, ৪৮-৪৯। ৪৩। ইবনে ইজারী, ঐ, পৃঃ ৮১; নোয়াইরী, পৃঃ ১৯৫। ৪৪। আখবার মাজমুয়া, পৃঃ ১২৯-৩০। ৪৫। ইবনে ইজারী, আল-বেয়ান, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৩৯। ৪৬। লেভি প্রভেঙ্কাল, লা ইশানা, পৃঃ ১৪১। ৪৭। লেভি, প্রভেঙ্কল, ঐ, পৃঃ ১৪২।
৪৮। আলারকোন, ল্যাম্পরা ডি লস প্রিন্সিপালস, ২য় খণ্ড, মাদ্রিদ, ১৯৩১, পৃঃ ৩৩২-৩৩; আর লেভি,
সোশিওলোজি অব ইসলাম, ২য় খণ্ড, পৃঃ ৩৪০। ৪৯। লেভি প্রভেঙ্কাল, লা ইস্পনা, পৃঃ ১২৯। ৫০। ঐ, পৃঃ ১৩২-৩৩। ৫১। ক্যামব্রীজ, মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৪৩১। ৫২। লেভি প্রভেঙ্কাল, লা ইস্পনা, পৃঃ ১৩৫-৩৬। ৫৩। দ্যা তারিখ-ই ফাত্ আন্দালুস, পৃঃ ৬৭। ৫৪। ইবনে ইজারী, আল-বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২২০; অনুবাদ ৩৪০। ৫৫। ঐ, পৃঃ ২৩৮, অনুবাদ ৩৬৮-৬৯। ৫৬। সুলায়মান নাদভী, আরবন কি জাহাজরানী, পৃঃ ১৬৯। ৫৭। গীব রিহলাত ইবনে যুবায়ের, পৃঃ ৩৫-৩৮। ৫৮। ইবনে ইজারী, আল-বেয়ান, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১০৬-৭, নুয়াইরী, পৃঃ ৫৬; অনুবাদ ৪৮-৪৯। ৫৯। গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৯৪। ৬০। এস, এম, ইমামউদ্দিন, সাম অ্যাসপেক্টস, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ৭০-৭১। ৬১। ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, পৃঃ ২০৮ (উর্দু) ৬২। আল-মাকারী, ১ম খণ্ড, পৃঃ ১০৩। ৬৩। মাক্কারী, পৃঃ ৫৬৪ (উর্দু)।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন