অষ্টম অধ্যায় : মুনজির ও আবদুল্লাহ

মুনজির ও আবদুল্লাহ
অষ্টম অধ্যায়

প্রথম মুনজির

(৮৮৬-৮৮৮ খ্রীঃ)

সিংহাসনে আরোহণ : প্রথম মুনজির তাহার পিতা মুহম্মদের মৃত্যুর পর ২৭৩ হিঃ/৮৮৬ খ্রীঃ কর্ডোভার সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি পিতার রাজত্বকালে বিভিন্ন যুদ্ধ পরিচালনায় বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিরাট সাম্রাজ্য শাসন করার যোগ্যতা তাঁহার ছিল না।

স্পেনের জনগণের অধিকাংশ ছিল আমীরের অবাধ্য। তাহারা আমীরের বিরুদ্ধে সর্বদা বিদ্রোহ করিতে তৎপর ছিল। কিছু স্বাধীন রাষ্ট্রও গঠিত হইয়াছিল। ফ্রাঙ্কগণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করিয়াছিল গথিক মার্চে। লিওনের বৃহত্তর অঞ্চল আরাগণ ও ক্যাটালোনিয়া ছিল খ্রস্টানদের হাতে। উত্তরাঞ্চলের দুর্গগুলি ছিল আমীরের শত্রুদের প্রভাবাধীন। স্পেনের দক্ষিণে ইবনে হাফসুন ছিল অপরাজিত এবং দেশের বৃহৎ অঞ্চল ছিল তাঁহার অধিকারে। আল মুনজির সর্বপ্রথম ওমর ইবনে হাফসুনের মিত্র ও সহযোগী আর্কিডোনার নেতা আইন নামক জনৈক নব-মুসলিম বিদ্রোহীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। যুদ্ধে আইশুন ধৃত হইয়া নিহত হন। অতঃপর সিয়েররা ডে-পিরিয়েগোর বানু মাতরুহকে শায়েস্তা করিয়া ওমর ইবনে হাফসুনের সুরক্ষিত এলাকা বোবাষ্ট্রো দুর্গ অবরোধের জন্য তিনি অগ্রসর হন। নিজেকে সম্পূর্ণরূপে অবরোধ অবস্থায় দেখিয়া ওমর ইবনে হাফসুন কর দান, আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের ভান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে ওমর পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়া বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দেন। রাজকীয় সেনাবাহিনী রাজধানীতে প্রত্যাবর্তনকালে ওমর তাহাদের গতিরোধ করিয়া বহু সৈন্যকে হত্যা করেন। মুনজির প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য পুনরায় যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ হন এবং বোেবাষ্ট্রো দুর্গ অবরোধ করেন। কিন্তু তাঁহার ভ্রাতা আবদুল্লাহর প্ররোচনায় তাহার চিকিৎসক বিষ প্রয়োগে ৮৮৮ খ্রীঃ তাহাকে হত্যা করে। মুনজির মাত্র দুই বৎসর সাফল্যের সহিত রাজত্ব করেন।

দ্বিতীয় আবদুল্লাহ

(৮৮৮-৯১২ খ্রীঃ)

সিংহাসনে আরোহণঃ আল মুনজিরের কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তাঁহার মৃত্যুর পর তাঁহার বিশ্বাসঘাতক ভ্রাতা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ ইতিহাসের এক দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে স্পেনের সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁহাকে স্পেনের আদি অধিবাসীগণই শুধু বিরোধিতা করে নাই আরব অভিজাত সম্প্রদায়ও গোলযোগের সুযোগ নেন। তাহারা অনেকেই স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সারাদেশে বিপ্লব ও বিদ্রোহ দেখা দেয়। সেভিল ও এলভিরায় নব-মুসলিম ও আরবদের মধ্যে দাঙ্গা হাঙ্গামা বাধে। ইয়ামানী ও মুজারীগণ পুরাতন গোত্রীয় কলহে লিপ্ত হয়।

হেজাজ ও সিরিয়ার অধিবাসীগণ একে অপরের ঘোরতর শত্রু ছিল। আরব, নব মুসলিম, খ্রীস্টান ও বার্বারগণ স্পেনে বাস করিত। এই সমস্ত পরস্পর বিরোধী দলগুলি সর্বদা কর্ডোভার আমীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করিত। ইহাদের নিয়ন্ত্রণে রাখিবার জন্য একজন দৃঢ়চেতা আমীরের প্রয়োজন ছিল। আব্দুল্লাহর ন্যায় দুর্বল ও ভীরু শাসক ইহা নিয়ন্ত্রণ করিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হন।

এলভিরায় স্পেনীয়দের অভুথান

স্পেন শিল্প ও বাণিজ্যে প্রভূত উন্নতি লাভ করে এবং সেখানে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব হয়। বিশেষ করিয়া এলভিরা ও সেভিলের নব মুসলিমদিগকে আরব অভিজাতবর্গ প্রভাবিত করে এবং তাহাদের সম্পদ ও ঐশ্বর্য তাহাদিগকে বিদ্বেষ-ভাবাপন্ন করিয়া তোলে। বহু আরব নেতাও আমীরের আনুগত্য প্রকাশে অস্বীকৃতি জানায়। আরব ব্যতীত বার্বার, নব মুসলিম, খ্রীস্টান এবং ইহুদীগণও আমীরের প্রতি বৈরীভাবাপন্ন ছিল। এই সমস্ত বিপরীত মুখী শক্তিকে কার্যকরীভাবে শাসন করা খুবই কঠিন ছিল। এক বা একাধিক দল একত্রিত হইয়া বিদ্রোহ ঘোষণা করিত। আব্দুল্লাহর শাসনের প্রথম দিকে আমীর ও আরবীয়দের বিরোধের সুযোগ লইয়া আরব অভিজাত সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে স্পেনীয়গণ বিদ্রোহী হইয়া ওঠে ও তাহাদিগকে এলভিরা হইতে বিতাড়িত করে।

আরবগণ ইয়াহিয়া ইবনে সুকালাহর নেতৃত্বে গ্রানাডার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত গোয়ার দাহোরোনার নিকটবর্তী মন্টেজিকারে সমবেত হয়। কিন্তু স্পেনীয়দের হস্তে তাহাদের নেতা ইয়াহিয়া নিহত হন। ইয়ামানী ও মুজারী মতবিরোধ থাকা সত্ত্বেও উত্তর গ্রানাডার অন্তর্গত মারাকেনার কাইসী গোত্রের সাওয়ারকে নতুন নেতা নির্বাচন করে। সাওয়ারের কনিষ্ঠ পুত্র স্পেনীয়দের হামলা হইতে মন্টেসাকরোকে রক্ষা করিতে গিয়া নিহত হন। কিন্তু সাওয়ার অতি মন্টেসাকরোকে পুনরুদ্ধার করেন। তিনি ৬,০০০ হাজার নব মুসলিম সেনার সমন্বয়ে গঠিত শহর রক্ষীদলকে অস্ত্রসজ্জিত করেন। এলভিরার গভর্নর জাদের নেতৃত্বে রাজকীয় বাহিনীর সহযোগিতায় স্পেনীয়গণ সাহসিকতার সহিত যুদ্ধ করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। রেজিও, জায়েন এবং কালাতারাভার আরবগণের সহিত সাওয়ার চুক্তিবদ্ধ হন এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গগুলি পুনর্নির্মাণ করেন।

শত্রুদের ঐক্যবদ্ধ দেখিতে পাইয়া স্পেনীয়গণ আবদুল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করে। তাহারা এলভিরার সরকারে সাওয়ারের অংশীদারিত্ব স্বীকার করিয়া তাহাদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করে। এইভাবে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু সাওয়ার, ওমর ইবনে হাফসুনের সহিত মিলিত হওয়ায় স্পেনীয়গণ পুনরায় অস্ত্র ধারণ করে। সাওয়ার পরাজিত হন এবং পরিত্যক্ত দুর্গ আল হামাহতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। রেজিও এবং জায়েন হইতে সেখানে সাহায্যকারী সৈন্য আগমন করে। ২,০০০ হাজার স্পেনীয় সৈন্য তাঁহাকে আক্রমণ করিতে অগ্রসর হয় কিন্তু তাহাদের আক্রমণ প্রতিহত করা হয় এবং বার হাজার সৈন্য

নিহত হয়। পরাজিত স্পেনীয়গণ ওমর ইবনে হাফসুনের পতাকাতলে সমবেত হয়। তিনি এলভিরাতে রক্ষী বাহিনী পুনর্গঠিত করেন এবং সাওয়ারকে আক্রমণ করিয়া শোচনীয় রূপে পরাজিত হইয়া বোবাষ্ট্ৰোতে প্রত্যাবর্তন করিতে বাধ্য হন। তিনি সাহসী আরব কবি সাইদ ইবনে জুদিকে বন্দী করিয়া লইয়া আসেন। হাফস ইবনে আল মাররাকে এলভিরার প্রতিনিধি হিসাবে রাখিয়া আসেন। এলভিরার অধিবাসীগণ আত্মগোপন করিয়া থাকিয়া আকস্মিকভাবে সাওয়ারকে হত্যা করে। ওমর কর্তৃক মুক্তি প্রাপ্ত সাইদ ইবনে জুদিকে আরবরা তাহাদের নেতা নির্বাচিত করে। ওমর তাহার পূর্বের বন্দীকে দেখিয়া ভীত হইয়া ওঠেন এবং প্রথম যুদ্ধেই ক্ষণকালের মধ্যে পরাজয় বরণ করেন। কিন্তু আরবগণ স্পেনীয়দের উপর আরও সফলতা লাভ করিতে ব্যর্থ হন।

যুবরাজ মুতাররিফ ৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে এলভিরা আক্রমণ করেন। যুবরাজ দেখিতে পাইলেন এলভিরা প্রদেশের আরবগণ সাইদ ইবনে জুদি ও আল হামা (Noalejo) মুহাম্মদ ইবনে আযহ আল হামাদানীর নেতৃত্বে দুই দলে বিভক্ত। আল হামা ইবনে আযার সহযোগিতায় আরব নেতা আবু ওমর ওসমান ৮৯৭ খ্রীঃ ডিসেম্বর মাসে সাইদ ইবনে জুদিকে হত্যা করে। সাইদ ও ইবনে আযার সমর্থকগণ কর্ডোভার শাসকের নিকট আত্মসমর্পণ করে কিন্তু আত্মকলহে লিপ্ত থাকার ফলে আরবরা দুর্বল হইয়া পড়ে। অন্যদের নিকট আমীর কর দাবী করেন। তাহাদের শহর ও দুর্গগুলি তিনি অধিকার করেন না কারণ তাহাদের জীবিকা নির্বাহের সম্পদ ছিল খুবই সামান্য।

সেভিলে আরবদের অভ্যুত্থান

সেভিল উমাইয়া রাজধানীর অতি নিকটে অবস্থিত। সেভিলে বসবাসকারী দুই আরব পরিবার ও মুয়াল্লাদদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। প্রথমোক্ত ব্যক্তিগণের সর্ববিষয়ে প্রাধান্য ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে এই দুই আরব পরিবারের মধ্যে শক্রতা দেখা দেয়। উভয় পরিবারের মধ্যে যাহাকে আবদুল্লাহ স্বীকৃতি প্রদান করেন, সেই পরিবার সেভিলে আধা স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করেন। সেভিল শহর ও ইহার জেলাগুলি যথাক্রমে একটি স্পেনীয় দল বানু আনজেলিননা এবং বিদ্রোহী আরব পরিবারসমূহ যেমন বানু হাজ্জাজ ও বানু খালদুনের দখলে থাকে। ইয়েমানী লক্ষ্মী গোত্রের অন্তর্ভুক্ত উমার চারিপুত্র সেভিল ও নিয়েবলার মধ্যবর্তী জিলা সেনেদের জায়গীর ভোগ দখলকারী উইতিজার প্রৌপুত্রী সারাহর বংশধরেরা ছিল। বানু হাজ্জাজ ও বানু খালদুন ইয়ামানের হাজরামাওত গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাহাদের জমিদারী ছিল অক্সারাফে। বানু হাজ্জাজ ও বানু খালদুনরা ছিল কৃষিজীবী ও ব্যবসায়ী। দেশের অভ্যন্তরে ছিল তাহাদের দুর্গ এবং রাজধানীতে ছিল বিরাট বিরাট অট্টালিকা। আবদুল্লাহর শাসনের প্রথম দিকে বানু খালদুনের নেতা ছিল বিখ্যাত সৈনিক কুরাইব। উমাইয়া সাম্রাজ্যের জাত শত্রু কুরাইব ইব্রাহিম ইবনে হাজ্জাজের অধীন বানু হাজ্জাজ, নিয়েবলা ও সিদনার ইয়ামানী নেতা এবং কারমোনার বার্বার নেতাদের লইয়া

আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে দল গঠন করেন। তিনি আমীরের কম প্রভাবাধীন সেভিলের অধিবাসী অধ্যুসিত এলাকাসমূহ লুণ্ঠনের জন্য মেরিদা এবং মেদেলিনের নব মুসলিম বার্বারদের উৎসাহিত করেন। তাহারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেন ও তালিয়াতা দখল করেন। সেভিলের গভর্নর ৮৯১ খ্রীস্টাব্দে মেরিদার বার্বারদের দমন করিবার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হন। বার্বার ও তাহার মধ্যেকার পূর্ব ষড়যন্ত্র মোতাবেক কুরাইব গভর্নরকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য তাহার সহিত যোগদান করেন। গভর্নর পরাজিত হন এবং মেরিদার বার্বারগণ প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সামগ্রী লইয়া তালিয়াতায় প্রত্যাবর্তন করে। ইবনে মারোয়ান নামে বাদাজোজের জনৈক নব মুসলিমও কিছু অঞ্চল লুণ্ঠন করে।

অকর্মণ্য ও অযোগ্য গভর্নরকে অপসারণ করা হয়। কিন্তু তাহার স্থলাভিষিক্ত উমাইয়া বিন আল গাফির আল-খালিদ সাহসী ও যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদিগকে দমন করিতে ব্যর্থ হন। তিনি মুহম্মদ ইবনে গালিব নামক জনৈক নব মুসলিমকে এই শর্তে সেভিল ও এচিজার সীমান্তে অবস্থিত সিয়েতে টররেস নামক পল্লীর নিকট দুর্গ নির্মাণের ক্ষমতা প্রদান করেন যে, সে সন্ত্রাসবাদীদের দমনে রাখিবে। দীর্ঘদিনের আকাক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইলেও ইহা খুবই ক্ষণস্থায়ী ছিল। এক রাত্রে বানু খালদুন গোত্রের জনৈক ব্যক্তি ইবনে গালিব কর্তৃক নিহত হয়। বানু খালদুন আমীরের নিকট তাহার বিরুদ্ধে নালিশ করে। যুবরাজ মুহম্মদ বিচার করিতে বিলম্ব করেন। ইতিমধ্যে সেনেদের লাখমী গোত্রের কুরাইব, অক্সারাফের হাজরামী ও সেভিলের বানু হাজ্জাজ গোত্রের লোকেরা আবদুল্লাহর অধীনে একত্রিত হন। অতঃপর তাহারা কোরিয়া ও কারমোনার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করিয়া অধিকার করেন। সেভিলের গভর্নর উমাইয়াহ যিনি বাধা প্রদানের প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছিলেন, অবশেষে পলাইয়া যান।

আরবদের খুশি ও সান্ত্বনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আমীর তাহার প্রতিনিধি এলভিরার গভর্নর জাদ যাহাকে সাওয়ার পরবর্তীকালে মুক্তি দান করিয়াছিলেন ইবনে গালিবের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। ইহা জানিতে পারিয়া গালিব তাহার ভ্রাতা উমাইয়াহ যুবরাজ মুহম্মাদকে উদ্ধার করিবার উদ্দেশ্যে রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করেন। জনতা আক্রান্ত, নিহত ও ছত্রভঙ্গ হইয়া যায়। ইবনে হাফসুন যাহার সহিত আমীর ও গালিবের সন্ধি ছিল, সে গালিবের হত্যাকারী জাদের মস্তক দাবি করেন। রাজদরবারে নিজের নিরাপত্তা সম্বন্ধে সন্ধিগ্ধ হইয়া জাদ তাহার দুই ভ্রাতা হাশিম এবং আবদুল গাফির সহিত পলায়ন করেন। কিন্তু সিয়েতে ফিলা দুর্গের সন্নিকটে গালিবের ভ্রাতাদের হস্তে নিহত হন। উমাইয়াহ তাহার ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ হিসাবে বানু খালদুন ও বানু হাজ্জাজ গোত্রদ্বয়কে স্পেনীয়দিগকে সম্পূর্ণ রূপে নির্মূল করিতে আদেশ দান করেন। ২০,০০০ হাজার লোক নিহত হয় এবং পলাইবার সময় বহুসংখ্যক লোক নদীতে ডুবিয়া মারা যায়।

সেভিলে স্পেনীয়দের নির্মূল করিবার পর বানু খালদুন ও বানু হাজ্জাজ গোত্রদ্বয় প্রদেশের ভাগ্যবিধাতারূপে আবির্ভূত হন। নিঃসহায় ও নিরুপায় আমীরের প্রতিনিধি গভর্নর উমাইয়াহ তাহার দল ও কুরাইবের মধ্যে বিরোধ ও বিবাদের বীজ বপন করিতে চেষ্টা করিয়াও ব্যর্থ হন। ইয়ামানীদের নির্মূল করিবার পরও আমীরের আধিপত্য পুনঃস্থাপিত হয় না। তিনি বিদ্রোহী ইয়ামানী নেতাকে গ্রেফতার করেন। কিন্তু নিজে আরব নেতাদের দ্বারা আক্রান্ত ও নিহত হন। তাহারা পরে আমীরকে পত্র দ্বারা জানায় যে গভর্নর বিদ্রোহ করিতে প্রস্তুতি লইয়াছিল, এইজন্য তাহাকে হত্যা করা হইয়াছে।

নিঃসহায় আমীর সমস্ত বিষয় অবগত হওয়া সত্ত্বেও প্রতিকার করিতে পারেন না। তিনি তাহার চাচা হাশিমসহ অপর একজন গভর্নরকে প্রেরণ করেন। তিনিও ইয়ামানী শক্তি খর্ব করিতে ব্যর্থ হন। হিশামের পুত্র মুতাররিফ কুরাইবের চাচাত ভাই মাহদী কর্তৃক নিহত হন। মাহদী এবং বানু খালদুনকে শায়েস্তা করিবার উদ্দেশ্যে গভর্নর আরও সৈন্য চাহিয়া আমীরের নিকট পত্র লেখেন, বানু খালদুনরা চিঠি আটক করিয়া গভর্নরকে কারারুদ্ধ করেন। ৮৯১ খ্রীস্টাব্দে সেভিলের অবস্থা ছিল এইরূপ। সেভিলে আরবগণ ও দেশের অন্যান্য স্থানে আফ্রিকান এবং স্পেনীয় নেতাগণ ছিল শক্তিশালী। জায়েন ও এলভিরার দুর্গগুলি ছিল বার্বারদের অধিকারে। আত্মোনোবা (Algarve) প্রদেশের সান্তামারিয়া, সেলভিস, বেজা, মেরটোলা এবং প্রিয়েগোর পার্বত্য অঞ্চলসমূহে নব মুসলিমদের একাধিপত্য ছিল।

আব্দুল্লাহর পুত্র যুবরাজ মুতাররিফ ৮৯৫ খ্রীস্টাব্দে সেভিল আক্রমণ করেন। মুতাররিফের আক্রমণ কুরাইব সফলতার সহিত প্রতিহত করেন। কুরাইব এবং ইব্রাহিম ইবনে হাজ্জাজ দুই নেতা সেভিলকে নিজেদের মধ্যে সমান ভাগে ভাগ করিয়া নেন। কিন্তু শিঘ্রই তাহাদের পতন ঘটে এবং ৮৯৯ খ্রীস্টাব্দে কুরাইব নিহত হন। ইব্রাহিম বিন হাজ্জাজ আমীরের নিকট এই শর্তে আত্মসমর্পণ করেন যে কাসিমের সহিত তাহাকে সেভিলের গভর্নর নিযুক্ত করা হইবে। কয়েক মাস পরে কাসিমকে অপসারণ করা হয়। তারপর সে ওমর ইবনে হাফসুনের সহিত ৯০০ খ্রীস্টাব্দে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হয়। ইব্রাহিম কঠোর হস্তে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। হাস্যরসিক কবি ও গায়িকা কমরসহ কবি ও লেখকগণ তাহাকে পরিবেষ্টন করিয়া থাকিত। রাজকবি ইবনে আবদু রাব্বিহি কর্ডোভার কবিগণ তাহার রাজসভায় জমায়েত হয়। আরব, নবমুসলিম এবং বার্বার নেতাগণ সরকারের বিরোধিতা করে। মেন্তেসা, মেদিনা, সিদনা,লোরকা এবং সারাগোসা আরব নেতাদের অধীনে ছিল। আলগাভ, বেজা, জায়েন, মুরসিয়া এবং অপর কিছু অংশ বার্বার ও নব মুসলিমদের দখলে ছিল। কর্ডোভার আমীরের অনুগত ব্যক্তিবর্গ ও অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান প্রভাবই আবদুল্লাহর ক্ষমতাকে বিশেষভাবে ক্ষুন্ন করে। আবদুর রহমান ইবনে মারোয়ান আল জিল্লিকী নামক জনৈক নবমুসলিম নেতা

গ্যালেসিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে লিওনের তৃতীয় আল ফন্সের সাহায্যে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বিস্তীর্ণ এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন। ৯০১ খ্রীস্টাব্দে জনৈক ব্যক্তি অসন্তুষ্ট বার্বারদের সমর্থনে নিজেকে মাহদী ও ঐশ্বরিক শক্তি প্রাপ্ত ইমাম বলিয়া দাবি করেন। তিনি তাহাদিগকে জামোরর বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দান করেন। কিন্তু লিওনের শাসনকর্তা কর্তৃক পরাজিত হন ফলে এই আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। মুসলমানদের স্পেন বিজয়ের পূর্বে খ্রীস্টান নেতাগণ আরিয়াসের জঙ্গলাকীর্ণ অঞ্চলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করিত। তাহাদের কেহ কেহ কর্ডোভার আমীরকে স্বেচ্ছায় কর প্রদান করিত।

ওমর ইবনে হাফসুনের সহিত যুদ্ধ

উপরে উল্লিখিত বিদ্রোহসমূহের মধ্যে ওমর ইবনে হাফসুনের বিদ্রোহ ছিল মারাত্মক। তিনি রাজ্যের বিশৃঙ্খল অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করিয়া সর্বত্র তাহার আধিপত্য বিস্তার করিতে চেষ্টা করেন। আবদুল্লাহ ৮৮৯ খ্রীস্টাব্দে তাহার বিরুদ্ধে চল্লিশ দিনের এক অভিযান চালাইয়া মাত্র কয়েকটি গ্রাম উদ্ধার করিয়া বহু কষ্টে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন। আমীর পুনরায় ওমরের বিরুদ্ধে সৈন্য বাহিনী লইয়া অগ্রসর হন এবং এই শর্তে চুক্তি সম্পাদিত হয় যে, আমীরের প্রতিনিধি হিসাবে সে তাহার দখলীকৃত এলাকা শাসন করিতে থাকিবে। কিন্তু ওমরের সমর্থকগণ যাহারা ছিল দস্যু প্রকৃতির তাহারা এই শান্তি চুক্তিকে অপছন্দ করে এবং আবদুল্লাহর বিশেষ অনুগত আলজেসিরার বার্বার নেতা আবু হারবকে আক্রমণ করে ও দুর্গগুলি দখল করিয়া নেয়। আবদুল্লাহ কঠিন চাপে পড়িয়া আরব নেতাদের দমনের জন্য ওমরের সাহায্য প্রার্থনা করেন। ইব্রাহিমের নেতৃত্বে ওমর রাজকীয় বাহিনীতে যোগদান করেন। তাঁহার এই যোগদানের পিছনে ছিল অন্য উদ্দেশ্য। তিনি জায়েনের ইবনে মুসতানাহর সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হইয়া নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেন এবং শেষ পর্যন্ত ইব্রাহিম ইবনে খামীর ও অন্যান্য রাজ কর্মচারীদের কারারুদ্ধ করেন।

কর্ডোভার খ্রীস্টানদের সমর্থনে ওমর দেশের উত্তরাংশে প্রভাব বিস্তার করেন এবং রাজধানী পর্যন্ত অগ্রসর হন। অকস্মাৎ আক্রমণ করিয়া লুণ্ঠনের সময় কাউন্ট সারভাত্তো নিহত হন এবং ওমর, এচিজা এবং পোলে দখল করিয়া নেন। এই এলাকার আরবদের বিরুদ্ধে যে সমস্ত স্পেনীয় জনগণ হাফসুনের পক্ষ নেয় তাহারা পরবর্তীকালে হাফসুনের বিপক্ষে গমন করে।

আরবদের মধ্যেও তাহার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য ৮৯০ খ্রীস্টাব্দে বোবাষ্ট্রোতে তাহার ক্ষমতা লাভের দশ বৎসর পর উত্তর আফ্রিকার আব্বাসীয় গভর্নর ইবনে আগলাবের মাধ্যমে আব্বাসীয় খলিফা মুতাদিদ বিল্লাহর তরফ হইতে অভিষেক প্রার্থনা করেন। দীর্ঘকালব্যাপী তাহার বিদ্রোহ স্পেনে উমাইয়া শাসনের দুর্বলতার পরিষ্কার প্রমাণ দেয়।

পোলের যুদ্ধ

আবদুল্লাহর আর্থিক অবস্থা খুবই সঙ্গীন হইয়া ওঠে। রাজকোষ শূন্য হইয়া পড়ে ফলে সেনাদের বেতন দেওয়া সম্ভব হয় না। দেশকে পুনরায় একত্রিকরণে আমীরের নীতি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। সুবিধাজনক শর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উদ্ধত ওমর প্রত্যাখান করেন। অনন্যোপায় আমীর সাহস সঞ্চার করিয়া শক্তিশালী শত্রুকে আক্রমণ করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাঁহার সেনাপতি আবদুল মালিক বিন উমাইয়াহ ৪,০০০ হাজার নিয়মিত সৈন্য এবং ১০,০০০ হাজার নতুন সংগৃহীত সৈন্যকে লইয়া পোলের দিকে অগ্রসর হন। ওমর ৩০,০০০ হাজার সুদক্ষ সৈন্যের এক বাহিনী লইয়া দুর্গ হইতে দেড় ক্রোশ দূরে নদীর তীরে শিবির স্থাপন করেন।

১২ই মুহররম শুক্রবার ২৭৮ হিঃ/১৬ এপ্রিল ৮৯১ খ্রীস্টাব্দে যুদ্ধ শুরু হয়। উমাইয়াহ সাম্রাজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও আবদুল্লাহ নিজে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন নাই। আমীরের সেনাবাহিনী পূর্ণ শক্তি ও সাহসিকতার সহিত যুদ্ধ করে। অপরদিকে প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াও ওমর পরাজিত হন। কিছু সংখ্যক সৈন্য লইয়া ওমর পোলে দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আরবদের পশ্চাদ্ধাবনের তীব্রতায় বাকি অংশ এচিজার দিকে পলাইয়া যায়। বিপদের পূর্বলক্ষণ দেখিয়া ইবনে হাফসুন ও ইবনে মস্তানাহ পোলে এবং আর্কিডোনা দুর্গ ত্যাগ করিয়া বার্বারদের পশ্চাৎ অপসারণ করেন। আবদুল্লাহ প্রচুর যুদ্ধ সামগ্রী ও ধন সম্পদসহ পোলে দুর্গ অধিকার এবং এচিজা অবরোধ করিলে অতিসহজে উহার পতন ঘটে। অতঃপর তিনি বোবাষ্ট্ৰো অভিমুখে যাত্রা করেন। বোবাষ্ট্ৰো অবরোধ করা হয়। কিন্তু অপরাজিত থাকে। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত সেনাবাহিনী আর্কিডোনা ও এলভিরার মধ্য দিয়া কর্ডোভা প্রত্যাবর্তন কালে জায়েনে আত্মসমর্পণ করে। এইরূপে দেশের দক্ষিণাংশে সাময়িকভাবে আমীরের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরবর্তী ঘটনাসমূহ

ইতিমধ্যে ওমর তাহার সুনাম ও প্রতিপত্তি বহুগুণে হারাইয়া ফেলেন। উত্তর আফ্রিকায় ইবনে আগলাব তাহার দূতগণকে উদাসীনতা ও অবহেলার সহিত গ্রহণ করেন। তিনি আব্বাসী খলিফার নিকট হইতে গভর্নর হিসাবে কোন নিয়োগপত্র না পাওয়ায় ইবনে হাফসুন আমীরের সহিত সন্ধি স্থাপন করেন ও তাঁহার পালক পুত্রকে জামিন হিসাবে রাখেন। আমীর আবদুল্লাহ তাহার নিজ পুত্রকে জামিন হিসাবে চাহিলে তিনি দিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। ফলে যুদ্ধ শুরু হয়। ওমর নতুন সৈন্য সংগ্রহ করেন এবং ৮৯২ খ্রীস্টাব্দ শেষ হওয়ার পূর্বেই তিনি তাহার হারান এলাকা পোলে, এচিজা, আর্কিডোনা ও এলভিরা পুনরুদ্ধার করেন এবং এলভিরা বিজয়ী আরব নেতা সাইদ ইবনে জুদির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করেন। পরে তিনি জায়েন অধিকার করেন। ক্ষমতা ও সাফল্যগর্বে গর্বিত ওমর আব্বাসীয় খলিফার নিকট হইতে স্বীকৃতি না পাইয়া ৮৯৯ খ্রীস্টাব্দে সপরিবারে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। ইহা ছিল পট পরিবর্তনের সূচনা ও তাহার ভাগ্য বিরম্বনার শুরু। হোলের মতে, “তাহার উদ্দেশ্য ছিল অস্পষ্ট।

এইরূপ করায় তিনি লাভবান হন নাই।”৬ তাহার ধর্মত্যাগের সাথে সাথে তাহার যোগ্য কর্মচারী আনাতোলের পুত্র ইয়াহিয়া তাহাকে ত্যাগ করেন এবং তাহার একজন শক্তিশালী মিত্র কানিয়াতের (বর্তমান কানিয়াত পরিয়ান) বার্বার নেতা আও সাজা বিন আল খালিত আবদুল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করেন। গৃহযুদ্ধ অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলতায় জর্জরিত জনগণ শান্তির আশায় দলে দলে আবদুল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে। ওমরকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনয়ন করা আমীরের পক্ষে অসম্ভব হইয়া ওঠে কারণ সে তাহার হারান গৌরব পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে আরবদের আস্থা অর্জনের জন্য ইব্রাহিম ইবনে হাজ্জাজের সহিত মিলিত হয়।

আমীর ৯০১ খ্রীস্টাব্দে ওমরের সহিত শান্তি চুক্তি স্থাপন করেন। ওমর পিরিয়োগের নেতা ইবনে মাস্তানাহ ও তাহার খাঞ্জাঞ্চি খালাফসহ চার ব্যক্তিকে আমীরের দরবারে জামিন হিসাবে প্রেরণ করেন। এক বৎসর পূর্বে তিউনিয়ার ক্ষমতায় আগমনকারী ফাতেমীয়দের সহিত ওমর ৯১০ খ্রীস্টাব্দে মৈত্রী সম্পর্ক গড়িয়া তোলেন। পুত্র আবদুর রহমানকে কর্ডোভায় জামিন হিসাবে রাখা সত্ত্বেও ওমর ইবনে হাফসুন সারাগোসার বানুকাসি ও লিওনের রাজার সহিত ইবনে হাজ্জাজ মিলিত হন। ইবনে হাফসুনকে শত্রু শিবির হইতে বিচ্ছিন্ন করিবার উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহ তাহার পুত্রকে জামিন হিসাবে গ্রহণ

করার সিদ্ধান্ত লইয়া হাজ্জাজের অন্তর জয় ও আনুগত্য লাভ করিতে সমর্থ হন। নবম শতাব্দীতে স্পেনের খ্রীস্টান ও মুসলমানদের ক্ষমতা দখলের প্রতিযোগিতা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ধরনের। খ্রীস্টান কেন্দ্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে মুসলমান নেতাদিগকে ব্যবহার করিতেন। অপর দিকে মুসলমানগণ লিওন ও আস্তুরিয়ার অধিবাসীদের সম্মেলনে গঠিত তৃতীয় আলফন্সের (৮৬৬-৯১০) অধীনে বিস্তীর্ণ সাম্রাজ্যে শ্রেণীসংগ্রামে ব্যস্ত ছিলেন।

আমীর আবদুল্লাহর মৃত্যু ও আত্মসমর্পণ না করা ও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কুফল সম্পর্কে জনগণ আবদুল্লাহর শাসনের শেষের দিকে অবগত হন। পঁচিশ বৎসরের বিশৃঙ্খল ও ব্যর্থ শাসনের পর ১ম রবিউল আওয়াল ৩০০হিঃ/১৫ই অক্টোবর ৯১২ খ্রীস্টাব্দে ৬৮ বৎসর বয়সে এই দুর্বল ও ভীরু আমীরের মৃত্যু হয়। দেশের পশ্চিম ও দক্ষিণে বিদ্রোহ ভাবাপন্ন এলাকায় অতি কষ্টে আমীরের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হইতে শুরু করে। আমীর তাহার প্রধান মন্ত্রী বদরের সহযোগিতায় স্পেনে শান্তি স্থাপনের পথ প্রস্তুত করিয়া যান। আবদুর রহমান তাহার দীর্ঘ ও কৃতিত্বপূর্ণ শাসনের প্রথম অংশেই ইহার পরিপূর্ণতা দান করেন। রাজনৈতিক ভাটা সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে গতি স্তিমিত হয় নাই। আবদুল্লাহর শাসনের শেষ পর্যায়ে ইবনে কুতাইবাহর (খ্রীঃ ৮৮৯) সাহিত্যকর্ম ও গ্রন্থাবলী স্পেনে আসে।

স্বাধীন আমীরদের শাসন আমলের পর্যালোচনা

আরব, বার্বার নবমুসলিম এবং খ্রস্টানগণ পৃথকভাবে এবং কখনও কখনও সম্মিলিতভাবে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ

করে। আবদুল্লাহ পর্যন্ত সত্তর বৎসরের আরব শাসনের বিরুদ্ধে তাহারা এই দীর্ঘ সংগ্রামে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হইয়া পড়েন। তাহারা প্রত্যেকে নিজেদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা গড়িয়া তুলিতে সচেষ্ট হন কিন্তু কৃতকার্য হইতে পারেন নাই। প্রথম আবদুর রহমান রাজ্য স্থাপন করিয়াছিলেন কিন্তু প্রজাকুলের হৃদয় জয় করিবার সময় পান নাই। যদিও আরব ও বার্বারগণ দেশ জয় করিয়াছিলেন কিন্তু তাহারা ছিল নবমুসলিম ও খ্রীস্টান প্রজাদের তুলনায় সংখ্যায় কম। আরবদের বংশ গৌরব ও স্বেচ্ছাচারিতা দেশের অবশিষ্ট জনগণকে ক্ষিপ্ত করিয়া তোলে। প্রথম আবদুর রহমান ও হিশাম তাহাদের উদারতা ও মহত্ত্বের মাধ্যমে জনগণের নিকট ইসলামী সংস্কৃতিকে দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করিতে চেষ্টা করেন কিন্তু প্রথম হাকাম তাহার বিলাসিতাপূর্ণ জীবন যাপন ও ক্ষমতার অপব্যবহার দ্বারা নবমুসলিমদিগকে তাহার নিকট হইতে দূরে রাখেন। ইহার ফলে কর্ডোভায় আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়া ওঠে এবং টলেডোতে বিদ্রোহ দেখা দেয়।

ধর্মীয় আন্দোলন দমন করা হয় বটে কিন্তু সংখ্যাগুরু খ্রীস্টানদের কিছু অংশ মুসলিম শাসন স্বীকার করিতে অস্বীকৃতি জানায়। সরকারী প্রশাসনে আশানুরূপ কর্তৃত্ব না পাওয়ায় এবং আরবদের তরফ হইতে যথাযোগ্য মর্যাদা না পাওয়ায় বার্বার ও নব মুসলিমগণ বিদ্রোহে যোগদান করে।

যতদিন পর্যন্ত শক্ত হাতে শাসন পরিচালনা করা হইত—-আরব, বার্বার, নব মুসলিম এবং খ্রীস্টানগণ অনুগত থাকিত কিন্তু যখনই তাহারা সুযোগ পাইত বিশেষ করিয়া দুর্বল আমীরদের সময়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করিত। ইহারই ফলশ্রুতি হিসাবে আমরা দেখিতে পাই তাহারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছে। খ্রীস্টানগণ দেশের উত্তরাংশে স্বাধীন রাষ্ট্র এবং বার্বারগণ আধা স্বাধীন ও অন্যান্য মুসলিম সম্প্রদায় স্পেনের বিভিন্নাংশে এবং সর্বশেষে ওমর ইবনে হাফসুন ও অন্যান্য নেতাগণ দেশের দক্ষিণাংশে কর্ডোভা নগরীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে। আরব সমর্থন হারাইবার পর আমীর তাহার সিংহাসন রক্ষার্থে বাহির হইতে বেতনভুক্ত সৈন্য সংগ্রহ করেন। আরবদের দাবী অগ্রাহ্য করিয়া প্রথম হাকাম নিগ্রো সেনা নিয়োগ করেন। আবদুর রহমান বার্বার ও নবমুসলিম বেতনভুক সেনা সংগ্রহ করেন। এইরূপে আরব শাসক ও অনারব প্রজাকুলের মধ্যে বিরাট ব্যবধানের সৃষ্টি হয়। ফলে সিংহাসনের অস্তিত্ব বিপন্ন হইয়া ওঠে।

এই সময় আরব এবং ইসলামী সংস্কৃতি স্বকীয়তা হারাইয়া ফেলে এবং তদস্থলে বহুজাতীয় সংমিশ্রণে স্পেনীয় মুসলিম সংস্কৃতি গড়িয়া ওঠে। গোত্রীয়, জাতিগত এবং ধর্মীয় বিরোধের কুফল থাকা সত্ত্বেও একটা ভাল ফল দেখিতে পাওয়া যায়। বহু যুগের কূপমণ্ডকতা হইতে মুসলমানগণ স্পেনীয়দিগকে মুক্ত করেন। তাহারা বুদ্ধিমান দৃঢ়চেতা সাহসী কর্মঠ জাতিতে পরিণত হয় এবং একমাত্র কর্ডোভার শাসকের নেতৃত্বে তাহাদের হারানো ক্ষমতা ও গৌরব পুনরুদ্ধার করিতে সমর্থ হয়।

তথ্য নির্দেশ

১। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৩৬৯ দেখুন। ২। ই. জি. গোমেজ, হিস্টোরিয়া ডি ইস্পনা, পৃঃ ২৩২।

৪। হুবার্ট, এ্যারাবিক লিটারেচার, পৃঃ ২১৫; ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৩৬৪।

ওয়াট, পৃঃ ৪৪। ৬। আন্দালুস, স্পেন আন্ডার দ্যা মুসলিম, পৃঃ ১৬৩।

গমেজ, হিস্টোরিয়া, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ২৩৮ দেখুন। ৮। ইবনুল ফারাজী, নং ১৯৯; আর গুয়েস্ট, দ্যা গভর্নরস্ এ্যান্ড জাজেস অব ইজিপ্ট, পৃঃ ৫৪৮

সকল অধ্যায়
১.
উপক্রমণিকা (মুসলিম স্পেনের রাজনৈতিক ইতিহাস)
২.
প্রথম অধ্যায় : মুসলমানদের স্পেন বিজয়
৩.
দ্বিতীয় অধ্যায় : দামেস্ক-খেলাফতের অধীন উমাইয়া আমীরদের শাসন
৪.
তৃতীয় অধ্যায় : স্বাধীন উমাইয়া আমীরদের রাজত্ব
৫.
চতুর্থ অধ্যায় : প্রথম হিশাম
৬.
পঞ্চম অধ্যায় : প্রথম হাকাম
৭.
ষষ্ঠ অধ্যায় : দ্বিতীয় আবদুর রহমান
৮.
সপ্তম অধ্যায় : প্রথম মুহাম্মদ
৯.
অষ্টম অধ্যায় : মুনজির ও আবদুল্লাহ
১০.
নবম অধ্যায় : উমাইয়া খিলাফত
১১.
দশম অধ্যায় : দ্বিতীয় হাকাম
১২.
একাদশ অধ্যায় : হাজীব আল-মনসুর
১৩.
দ্বাদশ অধ্যায় : স্পেনে উমাইয়া খিলাফতের পতন
১৪.
ত্রয়োদশ অধ্যায় : স্পেনের উত্তরাঞ্চলে খ্রীস্টান রাষ্ট্রসমূহের অভ্যুদয়
১৫.
চতুর্দশ অধ্যায় : প্রথম পর্যায় ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ
১৬.
পঞ্চদশ অধ্যায় : দ্বিতীয় পর্যায় – উত্তর আফ্রিকার শাসন
১৭.
ষষ্ঠদশ অধ্যায় : তৃতীয় পর্যায়ঃ নাসরী রাজবংশ
১৮.
সপ্তদশ অধ্যায় : মরিস্ক জাতি
১৯.
অষ্টাদশ অধ্যায় : স্পেনে মুসলিম শাসনের পতনের কারণসমূহ
২০.
উনবিংশ অধ্যায় : শাসনকার্য ও প্রশাসন
২১.
পরিশিষ্ট-ক : ইক্রিতিশে কর্ডোভান মুসলমানদের শাসন
২২.
পরিশিষ্ট-খ : স্পেনে মুসলিম শাসকদের বংশানুক্রমিক তালিকা
২৩.
পরিশিষ্ট-গ : উত্তর-স্পেনে খ্রিষ্টান শাসকদের কালানুক্রমিক তালিকা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%