উমাইয়া খিলাফত
(৯২৯-১০৩১ খ্রীঃ)
নবম অধ্যায়
(৯১২-৯৬১ খ্রীঃ)
সিংহাসনে আরোহণঃ ৯১২ খ্রীস্টাব্দে ২২ বৎসর বয়সে তৃতীয় আবদুর রহমান তাঁহার পিতামহ আবদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হন। পিতা মুহাম্মদ ও পিতৃব্য মুজাফফরকে সিংহাসন হইতে বঞ্চিত করিয়া তিনি ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ওমর ইবনে হাফসুন ও অন্যান্য বিদ্রোহীদের সহিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী আবদুর রহমানের পিতা মুহাম্মদ কর্ডোভার কারাগারে বন্দীছিলেন এবং আবদুল্লাহর ভ্রাতা মুরিদ কর্তৃক বিষ প্রয়োগে নিহত হন। মুহাম্মদের পুত্র তৃতীয় আবদুর রহমান আমীর কর্তৃক উত্তরাধিকারী নিযুক্ত হওয়ায় সাধারণ জনগণ প্রশংসা করেন। রাজসভাসদ ও জনগণ নতুন শাসকের মহানুভবতা ও যোগ্যতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ ছিলেন। ফলে দেশের কোথায়ও বিরোধিতা দেখা যায় নাই।
আবদুর রহমান যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক গোলযোগে দেশ পরিপূর্ণ ছিল। লিওনের খ্রীস্টান ও তিউনিসিয়ার ফাতেমীয়গণ ছিল তাঁহার শক্তিশালী শত্রু। আবদুর রহমান তাহার গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও চরিত্রবলে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও বৈদেশিক বৈরিতাকে দমন করিয়া আল আন্দালুসকে সুখ্যাতির চরম শিখরে লইয়া যান। প্রথম আবদুর রহমান ও তাঁহার পুত্র আবদুল্লাহর অনুসৃত নীতির বৈপরীত্য সরকারকে দুর্বল করিয়া ফেলে। ক্ষমতালোভী গভর্নরগণ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং জনগণকে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন। দস্যুগণ পার্বত্য অঞ্চল হইতে আসিয়া দেশ লুণ্ঠন করিত। রাজক্ষমতা শুধু রাজধানীতেই কেন্দ্রীভূত হইয়া পড়ে। কৃষি উৎপাদন হ্রাস পায়, কলকারখানার উৎপাদন ব্যহত হয় এবং ব্যবসায় বাণিজ্যের অস্তিত্ব বিপন্ন হইয়া পড়ে। ২৯৭ হিঃ/ ৯০৯-১০ খ্রীস্টাব্দে জায়েনে ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। দুর্ভিক্ষ প্রপীড়িত জনগণ জীবন রক্ষার্থে উত্তর আফ্রিকায় পলাইয়া যায়। এই দুঃসময়ে তৃতীয় আবদুর রহমান দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি তাঁহার পিতামহের গৃহীত অস্থায়ী নীতিকে পরিত্যাগ করেন। তিনি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবলম্বন করেন। তাঁহার ক্ষমতাকে সুসংহত করিবার উদ্দেশ্যে বিদ্রোহীদের মূল উৎপাটন করেন। আরব অভিজাত শ্রেণীর ক্ষমতা ও প্রভাবকে খর্ব করেন এবং মুসলিম স্পেনের উত্তর ও দক্ষিণের সীমান্তকে সংরক্ষণ করেন।
তিনি তাহার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তিনি দৃঢ়তার সহিত ঘোষণা করেন যে শত্রুদের কর হইতে তাহাদের দুর্গ ও সুরক্ষিত স্থানসমূহ বেশী মূল্যবান। মনে হইয়াছিল, গোত্রীয় নেতাগণ তাহার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হইতে পারে। কিন্তু ইহা বাস্তবে সম্ভব হয় নাই। ক্রমে ক্রমে দেশের পরিবর্তন সাধিত হয়। আরব অভিজাত শ্রেণী সাইদ ইবনে জুদি কুরাইব ইবনে খালদুন ও ইব্রাহিম ইবনে হাজ্জাজ সহ তাহাদের বহু নেতাকে হারান। ইবনে হাফসুনের ন্যায় বহু বিদ্রোহী তাঁহার সময় জীবিত ছিল কিন্তু অতি বৃদ্ধ হইয়া পড়ায় তাহারা কোন প্রকার কার্যকরী বিরোধিতা করিতে পারেন নাই। জনগণ গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতায় অতিষ্ঠ হইয়া বিদ্রোহী নেতাদের সমর্থন দানে বিরত থাকে এবং শান্তির জন্য উদগ্রীব হইয়া ওঠে। আবদুর রহমান সেই আকাক্ষিত শান্তির কথা দৃঢ়তার সহিত ঘোষণা করেন। নতুন শাসক হৃত প্রদেশগুলিকে পুনরুদ্ধার করেন এবং চতুর্দিকে তাহার বিজয় কেতন উড়িতে থাকে। তৃতীয় আবদুর রহমান সৈনিকদের সহিত যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থাকিতেন ফলে সৈনিকদের মনবল বৃদ্ধি পাইত ও তাহারা সাহসিকতার সহিত যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করিত।
গৃহযুদ্ধ সেভিলের বানু হাজ্জাজের ক্ষমতাকে খর্ব করিয়া দিয়াছিল। আবদুর রহমান ও তাহার ভ্রাতা মুহাম্মদ সেভিল এবং কারমোনায় যথাক্রমে তাহাদের পিতা ইব্রাহিম ইবনে হাজ্জাজের স্থলাভিষিক্ত হন। ৯১৩ খ্রীস্টাব্দে আবদুর রহমানের মৃত্যুর পর তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুহাম্মদ সেভিল দখলের চেষ্টা করেন কিন্তু তাহার পিতৃব্যপুত্র আহম্মদ ইবনে মুসলিমাহ তদস্থলে নেতা নির্বাচিত হন।
মুহাম্মদ কর্ডোভায় পলাইয়া যান এবং আহম্মদ ইবনে মুসলিমাহর বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করেন। তিনি সেনা বিভাগে সেচ্ছাসেবক হিসাবে যোগদান করেন। সেভিল অববোধ করা হয়। নিঃসহায় আহম্মদ ইবনে মুসলিমাহ ওমর ইবনে হাফসুনের সহযোগিতায় গোয়াদালকুইভির নদীর দক্ষিণ তীরে রাজকীয় বাহিনীর মুকাবিলা করেন। এবং সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হন। অতঃপর আহম্মদ বিন মুসলিমাহ তৃতীয় আবদুর রহমানের প্রধান মন্ত্রী বদরের সহিত যোগাযোগ করিয়া ৯১৩ খ্রীস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে সম্মানজনক শর্তে আত্মসমর্পণ করেন। মুহাম্মদ হতাশ হইয়া কারমোনা পলায়ন করেন। আমীরের দূত কাসিম বিন ওয়ালিদ আত্মসমর্পণ করাইবার উদ্দেশ্যে তাহার পশ্চাদ্ধাবন করেন। ৯১৪ খ্রীস্টাব্দের এপ্রিল মাসে তৃতীয় আবদুর রহমান তাঁহাকে হাজীব কবির বা “শ্রেষ্ঠ উজিরে আজম” উপাধি দান করিয়া সম্মানিত করেন। এইরূপে কারমোনা তাহার অধিকারে আসে।
৯১৩ খ্রীস্টাব্দের শেষ পর্যায়ে সেভিলের আরব শাসক পরিবারের জায়গা দখল করে একজন বিশ্বস্ত গভর্নর। ইহাতে ইবনে হাফসুন বেশ দুর্বল হইয়া পড়ে। দক্ষিণ স্পেনের খ্রীস্টানগণ এবং অন্যান্য যাহারা। মুসলমান শাসনের বিরোধী ছিল ওমর ইবনে হাফসুন তাহাদের নিকট স্বাধিকার ও স্বাধীনতার বীরপুরুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দক্ষিণ স্পেনের অধিকাংশ নবমুসলিম ও
খ্রীস্টান অধিবাসী তাহার চতুম্পার্শ্বে সমবেত হয়। ইতিমধ্যে তৃতীয় আবদুর রহমান সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাহারা আমীরের শাসন পদ্ধতিকে সমর্থন করে। কারণ নতুন আমীর শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আগ্রহী ছিলেন। যাহা পূর্বেকার আমীরগণ যথা—প্রথম মুহাম্মদ, মুনজির ও আবদুল্লার শাসন আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই। দীর্ঘকালের গৃহযুদ্ধ ও অরাজকতায় জনগণ অতিষ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিল। তাহারা শান্তির জন্য ছিল উদগ্রীব। অপর দিকে ওমর স্পেনের গভর্নর নিযুক্ত হইবার জন্য আব্বাসীয়দের সঙ্গে যোগযোগ স্থাপন করেন কিন্তু তাহার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। ওমর ইবনে হাফসুন নিজে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য ফাতেমীয় খলিফা ওবায়দুল্লাহ আল শিয়াইর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করিয়া নেন। কিন্তু তাহাতে সমস্যার সমাধান হয়না। রেজিত্তর পর্বত্য অঞ্চল হইতে সৈন্য সংগ্রহের সংখ্যা কম হওয়ায় ওমর ইবনে হাফসুন বার্বার অর্থলোভীদের তাঁহার সেনা বিভাগে বেতনভূক সৈন্য হিসাবে ভর্তি করেন। বার্বারগণ ছিল খুবই লোভী ও ভীরু। যদিও এই বিরোধ জাতীয় চরিত্র হারাইয়া ফেলে এবং ধর্মীয় রূপ ধারণ করে। ইবনে ইজারীর মতে, ওমর তাহার শক্তিশালী মিত্র ইবনে মাস্তানাহ ৮৯৯ খ্রীস্টাব্দে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। এ সম্পর্কে পূর্বে আংশিক আলোচনা করা হইয়াছে। খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণের পর তিনি বহু গীর্জা নির্মাণ করেন। নব মুসলিমদের তুলনায় ধর্মত্যাগের পর ওমর ইবনে হাফসুন স্যামুয়েল নাম গ্রহণ করেন। ফলে তাহার সমর্থকদের মধ্যে জাতিগত বিরোধ মাথাচাড়া দিয়া ওঠে। ভূমিদাস (সাফ) ও দাসদের বংশধরগণ গথিক শাসকদের দুর্ব্যবহারের কথা স্মরণ করিয়া পুনরায় খ্রীস্টান ধর্মের প্রভাবকে সহজে গ্রহণ করিতে পারে নাই। কারণ তাহাদের সন্দেহ হয় যে মুসলমান শাসন আমলে তাহারা যে সমস্ত সুযোগ সুবিধা ভোগ করিত তাহা হইতে বঞ্চিত হইবে।
স্যামুয়েলের দাবী অগ্রাহ্য করিয়া তাহারা তাহার বিরুদ্ধে চলিয়া যায়। স্যামুয়েল এখন শুধু খ্রীস্টান সমর্থক ও আফ্রিকান বেতনভুক্ত সৈনিকদের উপর আস্থা স্থাপন করিল। খ্রীস্টান এবং মুসলমান একে অপরকে সন্দেহ ও অবজ্ঞার চোখে দেখিতে শুরু করে। স্যামুয়েলের খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণের এক বৎসর পূর্বে নব মুসলিমদের নেতা ইবনে আল শালিয়াহ জায়েন প্রদেশের শক্তিশালী দুর্গ কাজলোনা পুনরায় দখল করেন। ইবনে শালিয়াহ দুর্গরক্ষাকারী সমস্ত খ্রীস্টান সৈনিককে অস্ত্রের মুখে আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য করেন। স্যামুয়েলের কিছু সংখ্যক সমর্থক বিশেষ করিয়া নব মুসলিমগণ যাহারা যুদ্ধ বিগ্রহের দরুন এবং নেতাদের দ্বিধাদ্বন্দময় নীতির ফলে পরিশ্রান্ত ও বিরক্ত হইয়া উঠিয়াছিল তাহারা সুশাসক ও সহিষ্ণু তৃতীয় আবদুর রহমানের পক্ষ অবলম্বন করে। গোয়াদালকুইভিরের দক্ষিণ তীরে স্যামুয়েলের পরাজয়ের পর তৃতীয় আবদুর রহমান রেজিও আক্রমণ করেন। প্রতি পদক্ষেপে তিনি স্যামুয়েলের সমর্থকদের চরম বিরোধিতার সম্মুখীন হন। তাহারা সেনাবাহিনীর পশ্চাদভাগ ও অগ্রগামী সৈন্যের বেশ কিছু সংখ্যক সেনাকে নিহত ও কারারুদ্ধ করেন। তথাপি আমীর স্যামুয়েলের আশ্রয়স্থল টোলোক্সে পৌঁছেন। টোললাক্সে স্যামুয়েল রাজকীয় বাহিনীকে বাধা প্রদান করেন কিন্তু
তাহার পুত্র আবদুর রহমানের নিকট দুর্গ হস্তান্তর করেন। ইতিমধ্যে উত্তর আফ্রিকা হইতে তাহার জাহাজ রসদ লইয়া যাত্রা শুরু করে এবং পথিমধ্যে রাজকীয় রণতরী দ্বারা আক্রান্ত হয়। ৯১৭ খ্রীঃ স্যামুয়েল মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে ইজারী বলেন, “এই বৎসর ওমর ইবনে হাফসুন মারা যান। তিনি ছিলেন অবিশ্বাসীদের অবলম্বন, ধোকাবাজদের নেতা, গৃহযুদ্ধে ইন্ধন দাতা। ঘৃণা, বিদ্বেষ ও ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি কারীদের লালন কর্তা।”৭
ওমর ( স্যামুয়েল ) ছিলেন একজন সুযোগ্য ব্যক্তি এবং দক্ষ সৈনিক। তিনি বিশ। বৎসর ব্যাপী একে একে চারজন আমীরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তিনি ছিলেন একজন বীর, যদিও বিশ্বাসঘাতক ও আত্মকেন্দ্রিক। খৃস্টধর্ম গ্রহণই ছিল তাহার পতনের কারণ। যদি তিনি ইসলাম ধর্মে স্থির থাকিতেন তাহা হইলে খ্রীস্টানগণও তাহাকে কর্ডোভার শাসকের বিরুদ্ধে সাহায্য করিতেন এবং নব মুসলিমগণ তাহাকে পরিত্যাগ করিত না এবং তাহাকে দমনের জন্য আমীরের পক্ষ অবলম্বন করিত না এবং হয়তো তিনি রাজ্য প্রতিষ্ঠায় কৃতকার্য হইতেন। ফলে স্পেনের ইতিহাস হয়তো অন্য রকম ভাবে লিখিত হইতো।
স্যামুয়েলের চার পুত্র ছিল। জাফর, সুলায়মান, আবদুর রহমান এবং হাফ। জাফর স্যামুয়েলের স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি স্বাধীনতা রক্ষা করিতে ব্যর্থ হন। ৯১৯ খ্রীঃ তিনি তৃতীয় আবদুর রহমানকে বাৎসরিক কর দিতে সম্মত হন। তিনি পুনরায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়া তাহার ক্ষমতা পুনরুদ্ধার ও তাহার পিতার স্পেনীয় মুসলমান সমর্থকদের তাহার পিছনে সমবেত করিবার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই নীতি তাঁহার জন্য আত্মঘাতী বলিয়া প্রমাণিত হয়। তৃতীয় আবদুর রহমান ইতিমধ্যে স্পেনীয় মুসলমানদের আকাক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীরা দুরভিসন্ধির শিকারে পরিণত হইতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেন। অপরদিকে খ্রীস্টান সৈনিকগণ তাহাদের নেতার ভন্ডামী ও কপটতাপূর্ণ কার্যের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায় এবং ৯২০ খ্রীঃ বিদ্রোহী হইয়া তাহাকে হত্যা করে। সুলায়মান তাহার ভ্রাতা জাফরের স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি শান্তি রক্ষা করিতে ব্যর্থ হন এবং রাজকীয় বাহিনীর সহিত যুদ্ধ করিতে করিতে ৯২৭ খ্রীঃ ফেব্রুয়ারি মাসে মারা যান। তাঁহার ভ্রাতা হাফস তাঁহার স্থলাভিষিক্ত হন। বোবাস্ট্রো দুর্গ শেষবারের মত ৯২৭ খ্রীঃ জুন মাসে কর্ডোভান সৈন্য দ্বারা আক্রান্ত হয়। দীর্ঘ ছয় মাসের প্রতিরোধের পর হাফস আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হন। তাহাকে কারারুদ্ধ করা হয়। পরবর্তী কালে মুক্তি লাভ করিয়া সেনা বাহিনীর চাকুরী গ্রহণ করেন। এইরূপে তৃতীয় আবদুর রহমানের হস্তে শক্তিশালী দুর্গের পতন ঘটে যাহা একাধারে কর্ডোভার চার জন শাসকের আক্রমণকে প্রতিহত করিয়া প্রায় অর্ধ শতাব্দী ব্যাপী টিকিয়া ছিল।
৯২৩ খ্রীস্টাব্দের এপ্রিল মাসে তৃতীয় আবদুর রহমান স্বয়ং উত্তরের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনা করেন। সফলতা ও বিফলতায় সৈন্যদের সহিত তাহার অংশ গ্রহণ সৈন্যদিগকে অনুপ্রাণীত ও উৎসাহিত করে। তাহাদের নৈতিক বল বৃদ্ধি পায় এবং প্রথম আক্রমণে এচিজা দুর্গ অধিকৃত ও ধূলিসাৎ হয়। দ্বিতীয় অভিযানে জায়েন এবং এলভিরার সরবরাহ বন্ধ হইয়া যায়। জায়েন প্রদেশের অন্তর্গত মন্টেলিওনের শক্তিশালী দুর্গ অবরোধ করিলে ইহার নেতা স্যামুয়েলের অন্তরঙ্গ বন্ধু সাইদ ইবনে হুজায়েল আত্মসমর্পণ করেন। কাজলোমার নেতা ইবনে আল শালিয়াহ, মেন্তেসার নেতা ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম আত্মসমর্পণ করেন। পরে আবদুর রহমান এলভিরা প্রদেশের দিকে অগ্রসর হন এবং ফিনানাহ যাবার পথে কোনরূপ বাধার সম্মুখীন হননা, ফিনানাহ ওমর ইবনে হাফসুনের ভক্তদের দখলে ছিল। স্বল্প সময়ে উহার পতন ঘটে কিন্তু অচিরেই কঠিন বাধার সম্মুখীন হইতে হয়। জনসাধারণের জন্য পুরাপুরি ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়।
পরবর্তীকালে এলভিরা প্রদেশের বানু মুহাল্লাব গোত্রের বার্বারগণ আত্মসমর্পণ করে। জায়েন এবং এলভিরা প্রদেশের সীমান্তে অবস্থিত শক্তিশালী দুর্গ মন্টেরুবিও দখলে আসে এবং খ্রীস্টান দস্যুদের শক্তি খর্ব করা হয়। শক্তিশালী দুর্গসমূহের পতন ঘটে। দস্যু কবলিত সমস্ত এলাকা দখলে আসে এবং শান্তি স্থাপিত হয়। মন্টেরুবিওর পতনের পর পার্শ্ববর্তী এলাকার শহর ও দুর্গের নেতাগণ আবদুর রহমানের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করিয়া নেন। খ্রীস্টান দুর্গ জুভাইলস সহ অন্যান্য বহু গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ যেমন সালোব্রেনা, সানষ্টেভান, ডে গোরমাজ এবং বেনা ফোরাতা দখলে আসে। রাষ্ট্রের পরম শত্রুদের চরম শাস্তি বিধান করা হয় কিন্তু অন্যান্যদের মুক্তি প্রদান করা হয়। অভিজ্ঞ ও অনুগত সৈনিক কর্মকর্তাদের রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করা হয়।
দেশের দক্ষিণাংশে অধিকার প্রতিষ্ঠার পর আবদুর রহমান স্পেনের অন্যান্য অংশের প্রতি দৃষ্টি দেন। আহম্মদ বিন ইসহাকের নেতৃত্বে ৯২৮ খ্রীঃ রাজকীয় বাহিনী আলিকান্তের নেতা আরব শায়েখ আসলামীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। তাহাকে বন্দী হিসাবে তাহার পরিবারের সদস্যদের সহিত কর্ডোভাতে আনা হয়। মেরিদা সান্তাব্রেরীয়া এবং বেজাও একই বৎসর আত্মসমর্পণ করে। আল গারভ প্রদেশের অন্তর্গত অক্সোনোবার নবমুসলিম নেতা খালাফ ইবনে বকর পরে আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হন।
লোয়ার মার্চে বাদাজোজের শাসক ইবনে মারওয়ানের উত্তরাধিকারী কঠিন প্রতিরোধ গড়িয়া তোলেন এবং ৯৩০ খ্রীঃ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেন নাই। টলেডো যদিও দীর্ঘ দিন ধরিয়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করিয়া আসিতেছিল, কিন্তু দুর্ভিক্ষের কবলে পতিত হয়। কারণ খলিফার নেতৃত্বাধীনে রাজকীয় বাহিনী দুই বৎসর কাল ইহা অববোধ করিয়া রাখে। দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে খাদ্যশস্য
গুদামজাত করা হয় এবং টলেডোবাসীদিগকে রেশনে পানি সরবরাহ করা হয়। অপর দিকে দীর্ঘদিন অবরোধ করিয়া রাখিবার জন্য তৃতীয় আবদুর রহমান টলেডোর পার্শ্ববর্তী এলাকায় পাহাড়ের উপরে আল-ফাতাহ নামে একটি নতুন শহর গড়িয়া তোলেন। লিওনের রাজা অর্ডোন ও জিল্লিকীয়াহর খ্রীস্টান রাজা দ্বিতীয় রামিরো টলেডোর সাহায্যে আগাইয়া আসেন। কিন্তু ৩২০ হিঃ/ ৯৩২ খ্রীঃ পরাজিত হন। মিডল মার্চের বিদ্রোহীদের জন্য টলেডো ছিল শক্তিশালি ঘাটি। আপার মার্চের তুজুবিদগণ শুরুতে আনুগত্যের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সারাগোসার লর্ড ৯৩৭ খ্রীঃ লিওনের খ্রীস্টান শাসকের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। আবরোধ করা হইলে বাধ্য হইয়া সারাগোসা আত্মসমর্পণ করে। এইরূপে আরব, বার্বার ও স্পেনীয়গণ পরাজিত হইয়া স্বেচ্ছাচারী সরকারের নিকট আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য হয়। চাতুর্য, দয়াহীন কঠোরতা এবং অদম্য মনোবল সুদৃঢ় প্রত্যয় ও ঐকান্তিক নিষ্ঠার কারণে খলিফা মুসলিম স্পেনে সার্বিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করিতে সক্ষম হন এবং তাঁহার বহুশত্রু কর্তৃক তিনি প্রশংসিত ও সম্মানিত হন।
অভ্যন্তরীণ শান্তি প্রতিষ্ঠার পর তৃতীয় আবদুর রহমান শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। দুইটি উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করিয়া তাহার পররাষ্ট্রনীতি গৃহীত হয়। দেশের উত্তরাংশের খ্রীস্টান নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও সেখানে তাহার সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা। দ্বিতীয়ত উত্তর আফ্রিকা ও ভূমধ্যসাগরে ফাতেমীয়দের প্রভাব ও প্রতিপত্তির বিরোধীতা করা।
প্রথম আলফন্সের সময় হইতে খ্রীস্টান যুবরাজগণ স্পেনের মুসলিম অধ্যুসিত এলাকায় বিশেষ অগ্রসর হইতে পারে নাই। আবদুল্লাহর শাসন আমলে কতিপয় বিদ্রোহের দরুন দেশ দুর্বল হইয়া পড়ে। কিন্তু দেশের উত্তরাংশে অবস্থিত খ্রীস্টান নেতাগণ এই সুযোগ গ্রহণ করা হইতে বিরত থাকেন। উপরোন্তু তাঁহারা মুসলমানদের সম্মুখে বাধা স্বরূপ সীমান্তে অবস্থিত কয়েকটি দুর্গ অধিকার করিতে সমর্থ হন। খলিফা শুধু অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহই দমন করেন নাই বরং বাহিরের শত্রুকেও মুকাবিলা করেন। দেশের উত্তরাংশে খ্রীস্টানগণ যথা—বাস্ক, আরাগণ ও ক্যাস্টিলিয়ানগণ অপরাজিত থাকিয়া যায়। তাহারা ছিল ধর্মোন্মত্ত অসহিষ্ণু এবং মুসলিম স্পেনের সভ্যতার ধ্বংস সাধনকারী। ৯১৪ খ্রীঃ লিওনের অধিবাসীগণ অর্ডোনোর নেতৃত্বাধীনে মেরিদা প্রদেশের ক্ষতি সাধন করে। তাহারা ছিল মুসলমানদের চিরশত্রু। যখনই তাহারা কোন মুসলিম শহরকে দখল করিত তখনই শহরের অধিবাসীদের হত্যা করিত। তাহারা আলাঞ্জের অধিবাসীদের উপর চরম অত্যাচার করে এবং তালাভেরার শহরতলীকে ভস্মীভূত করে। কিন্তু সেই সময়কার খ্রীস্টান শাসকগণ তাহাদের পূর্ববর্তীদের তুলনায় দুর্বল ছিল। কারণ কারোলিঞ্জিয়ান সাম্রাজ্যের পতনের পর তাহারা স্পেনের বাহির হইতে কোন প্রকার সামরিক সাহায্য হইতে বঞ্চিত হয়। গৃহে শান্তি প্রতিষ্ঠার পর আবদুর রহমান দেশের উত্তরাংশে বসবাসকারী মুসলিম
প্রজাদের রক্ষার্থে খ্রীস্টানদের কঠোর শাস্তি বিধানের জন্য আবি আবদাহর পুত্র আহাম্মদকে ৯১৬ এবং পুনরায় ৯১৭ খ্রীঃ প্রেরণ করেন। দ্বিতীয়বার যখন আহাম্মদ কাস্ট্রো মারোসের শক্তিশালী দুর্গকে প্রচণ্ডভাবে আক্রমণের প্রস্তুতি লইতেছিলেন সেই সময় লিওনের দ্বিতীয় অর্ডোনো তাঁহার সাহায্যে অগ্রসর হন। আহাম্মদের আধা বার্বার ও আধা স্পেনীয় সেনাবাহিনী লিওনীদের প্রচণ্ড আক্রমণ প্রতিহত করিতে ব্যর্থ হয়। মুসলিম সেনাপতি নিহত হন এবং সৈন্যগণ বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে।৯১৮ খ্রীস্টাব্দে তাঁহার মিত্র নাভাররের সাঞ্চোর সহযোগিতায় অর্ডোননা তুলো, নাজেরা, ও ভালতিয়েরার ধ্বংস সাধন করেন।
৯১৮ খ্রীঃ জুলাই মাসে হাজীব বদর রাজকীয় বাহিনীর সেনাপতিত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনি মুটোনিয়ায় লিওন বাসীদিগকে পরপর দুইবার পরাজিত করেন। ৯২৩ খ্রীস্টাব্দে জুন মাসে আবদুর রহমান স্বয়ং সৈন্য পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় অর্ডোনো ওসমা অবরোধ করেন এবং কাস্ত্রো মরোসের আলকুবিলা ও কলুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ দুর্গসমূহের ধ্বংস সাধন করেন। আবদুর রহমানের শত্রুগণ তাহার আগমনে বাধা দানে সাহস না পাইয়া এই স্থান হইতে অন্যস্থানে পলাইয়া যান। আবদুর রহমান সামান্য কিছু সৈন্যকে টলেডোর গভর্নর মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ ললাপের নেতৃত্বে লিওন বাসীদের অগ্রগমনে বাধা প্রদানের জন্য রাখিয়া নাভারের দিকে অগ্রসর হন। এবরো পৌছা পর্যন্ত মুসলিম সেনাবাহিনী পথিমধ্যে কোন প্রকার বাধার সম্মুখীন হয় না।
নাভারীয়গণ আবদুর রহমানের অগ্রগামী সেনাদলের ক্ষতিসাধন করে এবং তৎপর তাহার মূল সেনাবাহিনীকে বিচ্ছিন্ন করিবার উদ্দেশ্যে সংকীর্ণ গিরিসংকটের মধ্যে অবস্থান লইয়া অপেক্ষা করিতে থাকে। কিন্তু মুসলিম সেনাবাহিনী নাভারের রাজা সাঞ্চো এবং তাঁহার মিত্র অর্ডোনোর সম্মিলিত সেনা বাহিনীকে ভালদে জুনকেরাসের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে এবং তাহাদের কিছু সুরক্ষিত স্থানের ধ্বংস সাধন করে। সালামানকার বিশপ দুলচিদাস এবং তুইয়ের হারমুজিয়াস মুসলমানদের হস্তে বন্দী হন। পর্বত হইতে অবতরণ করিয়া খ্রীস্টানগণ মুয়েস ও সালিমাস ডেওয়োর মধ্যবর্তী স্থলে জুনকেয়াসের সমতল ভূমিতে যুদ্ধকে স্বাগত জানায়। তাহাদের এই কৌশলগত ভুলের দরুন শশাচনীয় পরাজয় বরণ করিতে হয়। আমীর তিন মাস পরে সেপ্টেম্বর মাসে ৯২০ খ্রীস্টাব্দে বিজয়ীর বেশে রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু খ্রীস্টানগণ তাহাদের বিজয় সম্বন্ধে আশাবাদী ছিল। অর্ডোনো ও সাঞ্চো পুনরায় মুসলিম সীমান্ত প্রদেশসমূহ আক্রমণ করে। তাহারা ৯২৩ খ্রীঃ নাজেরা ও ভিগুয়েরা দখল করে বহুসংখ্যক লোককে হত্যা করে। নারী ও শিশুদের বন্দী হিসাবে লইয়া যায়। ৯২৩ খ্রস্টাব্দে জুলাই মাসে আবদুর রহমান তাহাদের আক্রমণ প্রতিহত করেন। বাঙ্ক ও লিওনিজদের কঠোর শাস্তি প্রদান করা হয়। আবদুর রহমান নাভারের
রাজধানী সুদূর পাম্পলোনা পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং ইহার বহু দুর্গ ধ্বংস করেন। ইতিমধ্যে ৯২৪ খ্রীস্টাব্দে অর্ডোনো মৃত্যু বরণ করেন। তাহার পুত্রগণ একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয় পিতার সিংহাসন দখলের জন্যে। সাঞ্চো এখন তাহার ভগ্নোদ্যোম সেনা লইয়া একাকী কর্ডোভার সেনাদের মুকাবিলা করিতে থাকেন। নাভারেগণ মুসলিম অগ্রাভিযানকে প্রতিহত করিবার জন্য পথিমধ্যে বহুস্থানে বাধা দিতে চেষ্টা করেন কিন্তু প্রতিবারই পরাজিত হন এবং তাহাদের রাজা সাঞ্চো অপমানিত ও লাঞ্ছিত হন। নাভারে রাজ্যের পতনের পর আবদুর রহমান “আমীরুল মোমেনীন” ও “আলনাসির লিদিনিল্লাহ” উপাধি (৩১৬ হিঃ ২৩ শে জিলকদ শুক্রবার/ ১২ জানুয়ারী ৯২৯ খ্রীস্টাব্দ) ধারণ করেন।
দ্বিতীয় অর্ডোনো ৯২৪ খ্রীস্টাব্দে মারা যান। তৎপর তাঁহার ভ্রাতাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। চতুর্থ আলফন্সে তাঁহার ভ্রাতা সাঞ্চোকে পরাজিত করিয়া লিওন অধিকার করেন এবং সাঞ্চো গ্যালেসিয়া অধিকারে রাখিতে সমর্থ হন। ৯৩১ খ্রীস্টাব্দে চতুর্থ আলফন্সে তাহার ভাতা দ্বিতীয় রামিরোর পক্ষে সিংহাসন ত্যাগ করেন। রামিরো স্বজাতীয়দের পরাজিত করিয়া ৯৩২ খ্রীঃ মুসলিম সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন। খলিফা আবদুর রহমান তাহাকে বিতাড়িত করেন এবং ক্যাস্টিলের রাজধানী বোরগোসের ধ্বংস সাধন করেন এবং আলভা ও গ্যালেসিয়ার মধ্য দিয়া দ্রুত অগ্রসর হন। কিন্তু দেশের উত্তরাংশে অনতিবিলম্বে গোলযোগ ও অশান্তি দেখা দেয় এবং খলিফার বিরুদ্ধে শক্তিশালী দুর্দমনীয় দল গঠিত হয়। ৯৩৪ খ্রীস্টাব্দে সারাগোসার তুজুবিদ গভর্নর মুহাম্মদ বিন হাশিম খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা এবং রামিরোর অধীনে চাকুরী করিবার অভিপ্রায় জ্ঞাপন করেন। মুহাম্মদ ও রামিরো তৎপর নাভাররের নাবালেগ শাসক গার্সিয়ার সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হন। দেশের সমস্ত উত্তরাংশ এইরূপে খলিফার বিরুদ্ধে দণ্ডায়মান হয়। খলিফা দৃঢ়তার সহিত ইহা মোকাবিলা করেন। তিনি বানু হাশিম ও খ্রীস্টানদিগকে কালাইউদে ৯৩৭ খ্রীস্টাব্দে পরাজিত করিবার পর প্রায় তিরশটি দুর্গ অধিকার করেন এবং নাভাররে ও সারাগোসায় প্রতিরোধকারীদের আত্মসমর্পণ করিতে বাধ্য করেন। সারাগোসার গভর্নর ও ক্ষমতাশালী অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত মুহাম্মদ ইবনে হাশিমকে ক্ষমা প্রদর্শন করিয়া পূর্ব পদে বহাল রাখেন। গার্সিয়ার অভিভাবক ও সাঞ্চোর বিধবা পত্নী তুতাহ (থিওদা) একের পর এক পরাজয় বরণ করিয়া শান্তিচুক্তি সম্পাদনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেন ও নাভাররের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে খলিফাকে স্বীকার করিয়া নেন। এইরূপে লিওন ও ফ্রান্সের তাবেদার রাজ্য ক্যাটালোনিয়ার কিছু অংশ ব্যতীত সমস্ত স্পেন খলিফার নিকট আত্মসমর্পণ করে।
৩২৭ হিঃ/ ৯৩৮-৯ খ্রঃ গ্যালেসিয়ান, লিওনিজ, ও বাস্কগণ পুনরায় বিদ্রোহ ঘোষণা করে। খলিফার নেতৃত্বে তাহাদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। একলক্ষ সৈন্য লইয়া গঠিত এই বাহিনীতে সাকালিবাহ নামে পরিচিত স্লাভগণ
অন্তর্ভুক্ত ছিল ও আরবদের সহিত সাকালিয়ানদের সম্পর্ক পরে বিস্তারিত রূপে আলোচিত হইবে। আরবগণ একজন স্লাভ জেনারেল নাজদাহ (নাজহা) এর অধীনে যুদ্ধ করিতে অপমান বোধ করে। বংশ গৌরবে গর্বিত আরবগণ স্লাভ জেনারেলের নেতৃত্বে জয়ের পরিবর্তে পরাজয়কে গৌরবের বলিয়া মনে করিত। খলিফা লিওনের দিকে অগ্রসর হন এবং রাজকীয় বাহিনী আধুনিক ভাল্লাডালকের দক্ষিণে অবস্থিত সিমানকাসে কয়েকদিন যুদ্ধের পর পলায়ন করিতে শুরু করে এবং জামোরার চতুর্দিকে অবস্থানরত মুসলিম সেনার পশ্চাদভাগে রামিরো কর্তৃক খননকৃত খন্দকে পতিত হইয়া তাহাদের অনেকেই প্রাণ হারায়। দুর্গ অবরুদ্ধ হয়। এই দুর্গকে রক্ষার জন্য ইহার চারিদিকে প্রাচীর নির্মাণ ও গভীর পরীখা খনন করা হয়। পরীখা পর্যন্ত পৌছাইবার পূর্বে মুসলিম বাহিনীকে গ্যালেসীয় ও বাস্কদের সম্মিলিত বাহিনীর সহিত যুদ্ধে লিপ্ত হইতে হয়। এখানেই আরবগণ স্লাভদিগকে পরিত্যাগ করিয়া প্রত্যাবর্তনের পথে সর্বশান্ত ও ধ্বংস হইয়া যায়। লিওনিজরা তাহাদের পশ্চাদ্ধাবন করে। ফলে অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী বিশৃঙ্খলভাবে পলায়ন করিতে শুরু করে। পরিত্যক্ত স্লাভগণ পরিখার অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ করিয়া সাহসিকতার সহিত মুশলধারে বর্ষিত তীর ও বর্শার মধ্যে যুদ্ধ করে এবং পরিখা অতিক্রম করিয়া খ্রীস্টানদের উপর ঝাঁপাইয়া পড়ে, তাহাদের অনেককে হত্যা করে। এই যুদ্ধ সংঘটিত হয় তুরমেস নদীর তীরে সালামানকার দক্ষিণে অবস্থিত আল খন্দক (Sp. Alhandega Engl. The Ditch) নামক গ্রামের নিকট।
স্লাভগণ সাহসিকতার সহিত যুদ্ধ করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পরাজিত হয়। ঊনপঞ্চাশ জন সঙ্গীসহ খলিফা আত্মরক্ষা করিতে সক্ষম হন। তৃতীয় আবদুর রহমান ইহাতে চরম আঘাত পান। রামিরো সালামানকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় খ্রীস্টানদিগকে পুনর্বাসিত করেন এবং ক্যাস্ট্রিলীয় বিদ্রোহীদের দমন করিতে আত্মনিয়োগ করেন। এইরূপে লিওন ও আরিয়ার রাজা (৯৩২-৯৫০) দ্বিতীয় রামিরো কর্তৃক মুসলিম সেনাবাহিনী দেশের উত্তরাংশে অগ্রসর হইতে বাধা প্রাপ্ত হয়। গৃহযুদ্ধের জন্য খ্রীস্টানগণ এই বিজয়ের ফল ভোগ করতে পারেনা। যদিও তাহারা খলিফাকে ত্যক্ত-বিরুক্ত করিয়া চলিয়াছিল। বাদাজোজের গভর্নর আহম্মদ ইবনে ইয়ালা ৯৪০ খ্রীঃ লিওনিজদের অগ্রগমনে বাধা দান করেন। গ্যালেসিয়ান ও বাস্কদের শায়েস্তা করিবার জন্য খলিফা অপর একদল সেনা প্রেরণ করেন। ৯৪৪ ও ৯৪৭ খ্রীস্টাব্দে রাজকীয় বাহিনী ক্যাস্টিলিয়ান অঞ্চলে লুণ্ঠনের জন্য সহসা আক্রমণ করেন। ৯৫০ খ্রীস্টাব্দে দ্বিতীয় রামিরোর মৃত্যুর পর তৃতীয় আবদুর রহমান দেশের উত্তরাঞ্চলে তাহার প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করেন। লিওনের রাজা নাভাররের রানী ক্যাস্টাইল ও বার্সিলোনার কাউন্টগণ তাঁহার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন। তাহারা বাৎসরিক কর দিতে সম্মত হন এবং মুসলিম সীমান্তে অবস্থিত তাহাদের শক্তিশালী দুর্গ পরিত্যাগ ও হস্তান্তর করেন। ক্যাষ্টিলের সহিত সংযোগ স্থাপনের উদ্দেশ্যে ডুয়েরো নদীর তীরে (Madinatal-Salim the city of Protection) মেদিনাত আল সালিম রাজধানী করিয়া খলিফা অপর আর একটি সীমান্ত প্রদেশ গঠন করেন। এখন হইতে ক্যাস্টাইলের বিরুদ্ধে দুর্গপ্রাচীর নির্মাণের দায়িত্ব বর্তায় মুসলমানদের উপর।
দ্বিতীয় রামিরোর পুত্র ও উত্তরাধিকারী তৃতীয় অর্ডোনোর ৯৫৫ খ্রীস্টাব্দে শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পূর্ব পর্যন্ত খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে অভিযান চলে। খ্রীস্টানদের পক্ষে সুবিধাজনক শর্তে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। ফাতেমীয়দের সহিত যুদ্ধের জন্য তৃতীয় আবদুর রহমান দেশের উত্তরাংশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। আটলান্টিকের তীরে অবস্থিত লেরিদা হইতে এবরো নদীর উৎপত্তি স্থল পর্যন্ত প্রলম্বিত মুসলিম সীমান্তে তাহার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়
৯৫৫ খ্রীস্টাব্দের আগস্ট মাসে তৃতীয় অর্ডোনোর মৃত্যুর পর তাহার উত্তরাধিকারী স্থলাকায় সাঞ্চো তাহার ভ্রাতা কর্তৃক সম্পদিত চুক্তিসমূহ মানিতে অস্বীকার করেন। ৯৫৪ খ্রঃ টলেডোতে নিযুক্ত গভর্নর আহম্মদ ইবনে ইয়ালা ৯৫৭ খ্রীঃ লিওনিজদের চরমভাবে পরাজিত করেন। লিওনগণ ক্যাস্টিল অধিপতি ফারনান গঞ্জালেজের সহযোগিতায় পরাজিত সাঞ্চোকে অনতিবিলম্বে বিতাড়িত করে এবং সাঞ্চোর পিতৃব্য পুত্র চতুর্থ অর্ডোনোকে তাহার স্থলে নেতা নির্বাচিত করেন। নাভাররের বৃদ্ধা রাণীর প্রতিনিধির সহিত সাঞ্চো পাম্পলোনায় আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী পিতৃব্য পুত্র চতুর্থ অর্ডোনোর বিরুদ্ধে আবদুর রহমানের সাহায্য প্রার্থনা করেন। আলোচনা চলাকালীনই খলিফা তাহার ইহুদী চিকিৎসক হাসডাই এবনে শাপরুটকে সাঞ্চোর অতিরিক্ত স্থূলতার চিকিৎসার জন্য নিয়োগ করেন। ধন্যবাদ হাসডাইর কুটনীতির। হাসডাই ছিলেন কর্ডোভার আমদানী রফতানী শুল্ক বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল সাঞ্চো ও তাহার পিতামহী তুতাহ স্বয়ং কর্ডোভা আগমন করেন এবং রাজকীয় সামরিক সাহায্যের বিনময়ে দশটি দুর্গ হস্তান্তরের অঙ্গীকার করেন। রাজকীয় বাহিনী সাঞ্চোর পক্ষে ৯৫৯ খ্রীঃ জামোরা ও পরবর্তী বৎসর অভিয়েডডা দখল করেন। চতুর্থ অর্ডোনো বোরগোসে পলায়ন করেন ও ফার্ডিনান্ড ফারনান গঞ্জালেজ বন্দী হন।
৯৬০ খ্রীস্টাব্দের দিকে সাঞ্চো পুনরায় লিওন গ্যালেসিয়া ও নাভাররেতে আধিপত্য বিস্তার করেন সত্য কিন্তু খলিফার আধিপত্য স্বীকার করিয়া নেন। উমাইয়া শাসনের ধ্বংস সাধন ও মুসলিম সভ্যতার মূল উৎপাটনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত খ্রীস্টান আক্রমণকে প্রতিহত করা হয়। আবদুল্লাহর সময়কার ক্ষুদ্র কর্ডোভা রাজ্য বৃহৎ মুসলিম সাম্রাজ্যের রূপ পরিগ্রহ করে। ইহা তারাগোনা হইতে আটলান্টিকের উপকূল ও এবরোর পাদদেশ হইতে জিব্রাল্টার প্রণালী পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। ৯৬০ খ্রীস্টাব্দে লিওন উমাইয়া আধিপত্য স্বীকার করিয়া লইবার ফলে স্পেনের উত্তর-পশ্চিম অংশ ইহার সাম্রাজ্যভুক্ত হয়। এক কথায় মুসলিম সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণ শেষ সীমায় পৌছে ও আইবেরিয় উপদ্বীপের বিজয় অভিযান সমাপ্ত হয়। এইরূপে সাম্রাজ্য বিস্তারের কার্য দশম শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত চলে। মুসলমানদের বিশেষ করিয়া আরবদের জন্য ঠান্ডা আবহাওয়া ও ক্ষুদ্র শহর উপযোগী ছিল না। স্পেনের জীবন ছিল কঠিন এবং স্থানীয় জনসাধারণ ছিল শত্রুভাবাপন্ন। ফলে আরবদের পক্ষে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করা সম্ভব হয় নাই।
দেশের উত্তর অঞ্চলে যখন অভিযান চলিতেছিল সেই সময় তৃতীয় আবদুর রহমানকে উত্তর আফ্রিকার ফাতেমীয়দের মোকাবেলা করিতে হয়। ফাতেমীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ফলে স্পেন বিপদের সম্মুখীন হয়। মরক্কোর ফাতেমীগণ ইদ্রিসীয়দের সহিত যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। যাহার ফলে আবদুর রহমান উত্তর আফ্রিকার ঘটনায় হস্তক্ষেপের বিরাট সুযোগ পান। ফাতেমীয়দের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করিবার উদ্দেশ্যে ও মৌরিতানিয়াতে তাহাদের সাম্রাজ্য বিস্তারে বাঁধা প্রদানের জন্য তিনি দক্ষিণ উপকূলে দুর্গ নির্মাণ করেন এবং শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়িয়া তোলেন এবং পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহকে বিদ্রোহে ইন্ধন যোগায়। ফাতেমীয় সামাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ওবায়দুল্লাহ আল মাহদী ওমর ইবনে হাফসুনের সহিত মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। তিনি গোপনে সংবাদ সংগ্রহের জন্য স্পেনে গুপ্তচর প্রেরণ করেন। ইসমাইলী (শিয়া সম্প্রদায়ের এক শাখা) যাহারা ধর্ম প্রচারকের ছদ্মবেশে কাজ করিত ও মুক্তচিন্তার অধিকারীদের লইয়া ফাতেমীয় সমর্থক দল গড়িয়া তোলে। সেভিলের বানু ইসহাক গোত্রের নেতা আহমদ ফাতেমীদের সমর্থনে স্পেনের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তাহাকে ইসমাইলী-শিয়া হিসাবে অপমানিত, লাঞ্চিত ও প্রাণদণ্ড প্রদান করা হয়।১১ মাহদীকে উত্তর আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তার করিতে দিলে স্পেনে তিনি বিপদাপন্ন হইবেন ভাবিয়া আবদুর রহমান সতকর্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ৩১৯ হিঃ/ ৯৩১ খ্রীঃ সিউটা আধিকার করিয়া সেখানে প্রতিরক্ষা বাহিনী নিয়োগ করেন এবং আহম্মদ বিন মোহাম্মদ বিন ইলিয়াস ও ইউনুস বিন সাইদ নামে দুইজন সেনাপতির
অধীনে জিব্রাল্টায় নৌবাহিনী মোতায়েন করেন। ইফরিনের বার্বার উপজাতীয় খারিজী নেতা আল ইয়াজিদ সুন্নীদিগকে একত্রিত করিয়া কায়রোওয়ান অধিকার করেন। এবং আবদুর রহমানের প্রধান্য স্বীকার করেন। আবদুর রহমান তাহার অনুগত প্রজাদের সাহায্যে উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা অধিকার করেন। আলজিরিয়া এবং ওরয়ানের বাবারগণ তাহার আধিপত্য স্বীকার করিয়া নেয়। নুকুরের ক্ষুদ্র আরব শাসকসহ স্থানীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যসমূহ যাহারা ফাতেমীদের আক্রমণ হইতে আত্মরক্ষা করিতেছিল, তাহাদিগকে তাহার সমর্থনে সমবেত করিতে সক্ষম হন। মাগরাওয়ার সাহায্যে উমাইয়া খলিফা তাহিরাত (তাবহারাত) ব্যতীত মৌরিতানিয়ার সমগ্র ভূখণ্ড অধিকার করেন। পরে তৃতীয় আবদুর রহমান উত্তর স্পেনের খ্রীস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত থাকাকালে ৯৫২ খ্রীঃ চতুর্থ ফাতেমী শাসক আল মুইজ সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং স্পেনীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদিগকে উত্তর আফ্রিকা হইতে বিতাড়িত করেন।
তিনি আলেকজান্দ্রিয়া যাইবার পথে আবদুর রহমানের বাণিজ্যপোত, মাহদীয়ায় গমনকারী একটি সিসিলিয় বাণিজ্যজাহাজের গতিরোধ করে। জাহাজটি স্পেন আক্রমণের পরিকল্পনা ও সিসিলির গভর্নরের একটি বার্তা লইয়া মুইজের নিকট যাইতেছিল। মুইজ সিসিলির গভর্নরকে আন্দালুসীয়ার উপকূলভাগ আক্রমণ করিবার আদেশ করেন। এবং গভর্নর আদেশ পালন করেন। তিনি আলমেরিয়া বিধ্বস্ত করিয়া কিছু সংখ্যক বন্দী লইয়া সিসিলি প্রত্যাবর্তন করেন। বহু জাহাজ তাহার হস্তগত হয়। তন্মধ্যে সিসিলিয় জাহাজ অবরোধকারী জাহাজটিও ছিল। জাহাজটি আলেকজান্দ্রিয়া হইতে গায়িকা ও পণ্যদ্রব্য লইয়া প্রত্যাবর্তন করিতেছিল। আবদুর রহমান তাহার প্রতিনিধি এডমিরাল গালিবকে উত্তর আফ্রিকার উপকূল ভাগে লুণ্ঠন ও ধ্বংসাত্মক কার্য পরিচালনার জন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু এই অভিযান বিশেষ সফল হয় না। সত্তরটি জাহাজের বিরাট এক নৌবহর আহমদ বিন ইয়ালা নামে জনৈক সাহিব আল সুরতার। (পুলিশ প্রধান) নেতৃত্বাধীনে অপর এক অভিযানে প্রেরিত হয়। এই অভিযানে উত্তর আফ্রিকার উপকূলের অন্তর্গত কালাব্রিয়ার নিকট অবস্থিত মারছা আল-খারাজ-এ অগ্নি সংযোগ এবং সুসা ও তাবারকাহ পল্লীসমূহের ধ্বংস সাধন করা হয়। ৯৫৯ খ্রীঃ ফাতেমী সেনাপতি জাওহারের আক্রমণের পর আফ্রিকায় তৃতীয় আবদুর রহমানের অধিকারে শুধু তাঞ্জিয়ার ও সিউটা অবশিষ্ট থাকে।
মৃত্যুঃ ৪৯ বৎসরের দীর্ঘ রাজত্বের পর তৃতীয় আবদুর রহমান ২রা রমজান ৩৫০ হিঃ/১৫ই অক্টোবর ৯৬১ খ্রীস্টাব্দে একাত্তর বৎসর বয়সে পরলোক গমন করেন।
তৃতীয় আবদুর রহমানের দীর্ঘ রাজত্বকাল মুসলিম স্পেনের ইতিহাসে এক গৌরবময় অধ্যায়। স্পেনের উমাইয়া শাসকের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। তিনি যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন সেই সময় দেশব্যাপী বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ বিরাজমান ছিল। একাধারে গৃহযুদ্ধ ও দলীয় কোন্দলের ফলে স্পেনে দস্যুদের উপদ্রব বৃদ্ধি পায় এবং সাত বৎসর পর্যন্ত যাত্রীগণ কর্ডোভা হইতে সারাগোসা ও অন্যান্য দূরবর্তী শহরসমূহে নিরাপদে যাতায়াত করিতে পারিত না। তিনি ছিলেন বিরাট প্রতিভার অধিকারী। বিদ্রোহী এবং আইন অমান্যকরী ব্যক্তিদের দমনের পন্থা তিনি ভালভাবে জানিতেন। তিনি স্পেনকে অভ্যন্তরীণ বিশৃংখলা ও গোলযোগ এবং বৈদেশিক আক্রমণ হইতে রক্ষা করেন। আঠারো বৎসরের সামরিক অভিযানের পর সমগ্র স্পেনে তাহার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি দেশের ভাগ্য উন্নয়ন ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। টলেডো, আরাগোন, একষ্ট্রেমাদুরা এবং বোবাষ্ট্রোর আন্তর্গত নব মুসলিমদের ভূসম্পত্তি হ্রাস করা হয়। আরব ও বার্বার অভিজাত সম্প্রদায়ের ক্ষমতা খর্ব করা হয় এবং দেশ ও নগরসমূহে সুদক্ষ প্রশাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন। চুক্তির শর্তসমূহ নিষ্ঠার সহিত পালন করা হয়। জনৈক অভিজাত খ্রীস্টানের উপপত্নী তৃতীয় আবদুর রহমানের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। তিনি তাঁহার খ্রীস্টান প্রভুর দাসত্ব
১৫১ হইতে মুক্তির জন্য কাজির নিকট প্রার্থনা করেন এই বলিয়া যে তিনি দাসত্ব হইতে মুক্তিপ্রাপ্ত একজন মুসলিম নারী। প্রধান মন্ত্রী বদরের নিকট হইতে সংবাদ অবহিত হইয়া তিনি কাজিকে উক্ত নারীর অনুরোধ রক্ষা করিতে নিষেধ করেন। কেননা ইহার ফলে উমাইয়া সরকার ও খ্রীস্টানদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করা হইবে।
বার্বার খ্রীস্টান এবং স্লাভদের সমন্বয়ে গঠিত ১৩,৭৫০ জন নিয়মিত সৈন্য বাহিনীকে আবদুর রহমান ভরণপোষণ করিতেন। শৃঙ্খলা ও কঠোর নিয়মানুবর্তিতায় তাহার এই বিরাট সৈন্যবাহিনী সম্ভবত সমসাময়িক কালের সর্বোত্তম ছিল। এই বাহিনী তাহাকে দেশের উত্তরাংশে অবস্থিত খ্রীস্টান শক্তিকে দমন ও পরাজিত করিতে প্রচুর সাহায্য করে। তাহার শক্তিশালী নৌবাহিনী পশ্চিম ভূমধ্যসাগরে ফাতমীদের প্রধান্য খর্ব করিতে সমর্থ হয়।
সাধারণত অভিজাত আরব গোত্র হইতে সচিবদিগকে নিয়োগ করা হইত। তাহারা কখনও রাজ পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। খলিফা প্রশাসন ব্যবস্থার ভারসাম্য রক্ষার্থে স্লাভ ও মুক্তব্যক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। বদর ইবনে আহম্মদ, আবদুল্লাহর জনৈক মুক্তদাস ৯২১ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত তৃতীয় আবদুর রহমানের দক্ষিণ হস্ত ছিলেন। আহম্মদ ইবনে শুহায়িদকে যু-আল-উজারাতাইনের পদ ও বেতনে সম্মানিত করা হয়। খলিফা আহম্মদ ইবনে শুহায়িদ ও অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের নিকট হইতে মূল্যবান উপঢৌকন লাভ করেন। তৃতীয় আবদুর রহমান পূর্ববর্তী শাসকদের নির্ধারিত সমস্ত বেআইনী কর মওকুফ করেন। ইহার ফলে কর ব্যবস্থায় নিয়মানুবর্তিতা আসে ও রাজ্যের অর্থনীতিতে সুফল দেখা দেয়। তাহার রাজত্বকালে রাজস্বের এ তৃতীয়াংশ ব্যয় হইত সরকারি দালান কোঠা নির্মাণে যাহা রাজ্যের সর্বত্র নির্মিত হইত।১২ ৩১৬ হিঃ/ ৯২৮ খ্রীঃ আবদুর রহমান বিন সাঈদ বিন জুদাইর, আহম্মদ বিন মুসা বিন জুদাইর, আহম্মদ বিন আবদুল ওয়াহাব, খালিদ বিন উমাইয়া বিন শুহায়েদ, ইশা বিন ফুতাইস নামে পাঁচ ব্যক্তিকে অপসারণ করিয়া মুহম্মদ বিন জাওহার, আহম্মদ বিন ইশা বিন আবি আবদাহ, আবদুর রহমান বিন আবদুল্লাহ আল গাজ্জালী ও আহম্মদ বিন মুহাম্মদ বিন আবি কামুসকে নিয়োগ করেন।১৩ সেনাবাহিনী ও পণ্য সামগ্রীর দ্রুত গমনাগমন এবং সহজ যোগাযোগের জন্য আবদুর রহমান শুধু পুরাতন রাস্তাগুলিকে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাই করেন না বরং দেশের সর্বত্র নতুন নতুন রাস্তাও নির্মাণ করেন। ভ্রমণকারী ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার জন্য মহাসড়কের জায়গায় জায়গায় ফাঁড়িতে পাহারাদার নিযুক্ত করেন। সুদক্ষ পুলিশ ব্যবস্থার দরুন পথিক ও ব্যবসায়ীগণ তাহাদের মূল্যবান দ্রব্যসামগ্রী লইয়া বিপদ সংকুল যাত্রাপথে নিরাপদে যাতায়াত করিতে পারিত। দ্রুত খবরাখবর প্রেরণের ব্যবস্থা ছিল। অশ্বারোহী সংবাদ বাহককে বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন করা হয়। শক্রর গতিবিধি সম্পর্কে সরকারকে
অবহিত করিবার উদ্দেশ্যে এবং শহর বন্দরকে পাহারা দেওয়ার জন্য উপকূল বরাবর ও পাহাড়ের উপরে রক্ষীস্তম্ভ (Watch tower) নির্মিত হয়।
সরকারীগৃহ নির্মাণ ও মেরামতে প্রচুর টাকা ব্যয় হইত। দেশের সর্বত্র পয়ঃপ্রণালী, সেতু ও দুর্গ নির্মিত হয়।১৪ সর্বসাধারণের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল, পথিকের জন্য বিশ্রামাগার ও এতিমদের জন্য এতিমখানা নির্মিত হয়। এইরূপে স্পেন পশ্চিম ইউরোপে সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। আবদুর রহমানের বিভিন্ন অবদান ও কৃতিত্বকে নিম্নবর্ণিত শিরোনামে আলোচনা করা যাইতে পারে।
সুন্নী মতে রাষ্ট্রের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রধান—যাহার অধীনে পবিত্র মক্কা, মদীনা ও বায়তুল মুকাদ্দাস থাকে তাহাকে খলিফা বলা হয়। মক্কা, মদীনা ও বায়তুল মুকাদ্দাস নগরী বাগদাদের আব্বাসী খলিফার অধিকারে ছিল। আবদুর রহমানের পূর্ব-পুরুষ কর্ডোভার শাসকদের এই তিন নগরীর উপর কখনও আধিপত্য ছিল না। খিলাফতের জন্য তিনটি বিষয় প্রয়োজন। খলিফার নামে খোতবা পাঠ, স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন এবং আমীরুল মোমেনীন উপাধি ধারণ। প্রথম আব্দুর রহমান নিজেকে স্বাধীন বলিয়া ঘোষণা করেন ও স্বীয় নামে খোতবা প্রচলন করেন। তিনি নিজেকে পুরাপুরিভাবে মুসলিম স্পেনের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রধান হিসাবে প্রচার ও প্রতিষ্ঠা করিলে বহুবিধ সমস্যার সম্মুখীন হইতেন। কারণ জনগণ তাহার ধর্মীয় নেতৃত্ব স্বীকার করিতেন না। ফলে তাঁহাকে অতি সহজে ইতিহাসের পাতা ইহতে চিরতরে বিদায় গ্রহণ করিতে হইত। তাঁহার পরবর্তী শাসকগণও খলিফা উপাধি গ্রহণ হইতে বিরত থাকেন।
দশম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খলিফাগণ তাঁহাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাই শুধু হারান বরং ধর্মীয় ও নৈতিক সমর্থনও তাঁহাদের হ্রাস পায়। ইহাতে জনগণের নিকট আব্বাসীয় খলিফাদের গুরুত্ব কমিতে শুরু করে। ফলে একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। এই সুযোগে মাহদীয়ার ফাতেমী শাসক ৯০৯ খ্রীঃ নিজেকে খলিফা বলিয়া ঘোষণা করেন। আব্বাসীয় খালিফাদের রাজনৈতিক অনৈক্য জনগণের উপর গভীর মানসিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। প্রথম যুগের মুসলমানদের ধারণা ছিল যাহার অধীনে মক্কা, মদীনা ও বায়তুল মুকাদ্দাস থাকিবে তিনিই হইবেন খলিফা। পরবর্তীকালে এই ধারণার পরিবর্তন হয়। সেই সময়ের জনসাধারণ একজন খলিফার মধ্যে যে সমস্ত গুণের প্রত্যাশা করিত তৃতীয় আবদুর রহমান সেই সমস্ত প্রয়োজনীয় গুণের অধিকারী ছিলেন। আমীর হিসাবে ১৭ বৎসর রাষ্ট্র পরিচালনার পর স্পেনে তাহার ক্ষমতা সুসংহত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করিয়া ৩১৬ হিঃ/ ৯২৯ খ্রীঃ তিনি নিজেকে খলিফা বলিয়া ঘোষণা করেন। তিনি “আমীরুল মোমেনীন” ও “আল-নাসির লিদিন আল্লাহ” খেতাব ধারণ করেন।১৫ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ফাতেমী ও বাইজান্টাইন শাসকদের সহিত প্রতিযোগিতার উদ্দেশ্যে তৃতীয় আবদুর রহমান স্বর্ণমুদ্রার প্রচলন করেন। তিনি শুধু আব্বাসীয়দের বিরুদ্ধেই নয়
বরং প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতেমীদের বিরুদ্ধেও খলিফার ক্ষমতা প্রয়োগ করেন এবং ইহার পক্ষে ফাতেমী বিরোধী বার্বার নেতাদিগকে ধর্মীয় যুক্তি প্রদর্শন করিয়া তাহার সার্বভৌমত্ব প্রমাণ করিতে চেষ্টা করেন।
খলিফা দেশের অভ্যন্তরে শান্তি শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিদেশেও তিনি একাধারে শ্রদ্ধা অর্জন ও ভীতির সঞ্চার করেন। প্রথম মুহাম্মদের শাসনকাল পর্যন্ত দুর্যোগময় ও বিশৃঙ্খল পরিবেশে বিদেশের সহিত রাষ্ট্রদূত বিনিময় সম্ভব হয় না। নাসিরের শাসনকালে সাম্রাজ্যের গৌরব বৃদ্ধির সাথে সাথে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ ও দূর-দূরান্তের দেশ হইতেও রাষ্ট্রদূতগণকে সাদরে গ্রহণ করা হয়। কনস্টান্টিনোপলের সম্রাট এবং জার্মানী ও ফ্রান্সের রাজাগণ তাঁহার সহিত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন ও রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করেন।১৬ ৩৩৬ হিঃ/ ৯৪৭-৮ খ্রীস্টাব্দে গ্রীক সম্রাট কনস্টান্টাইন কর্তৃক প্রেরিত রাষ্ট্রদূতকে তৃতীয় আবদুর রহমান আল-জাহরা প্রাসাদের বিরাট কক্ষে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন।১৭ বিপুল আড়ম্বর ও জাকজমক প্রদর্শিত হয়। রাস্তায় বহুমূল্য কার্পেট বিছান হয়। পথের দুই পার্শ্বে রাজদেহরক্ষী বাহিনী সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান থাকে। অভ্যর্থনা সভার জাঁকজমক এত মনোরম ছিল যে, সাহিব আল আমালী আবু আলী আল কালীর মত সুরুচির অধিকারী উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির মধ্যে এমন এক অব্যক্ত ভাবের সৃষ্টি হয় যে তিনি তাঁহার গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় ভাষণ অসমাপ্ত রাখিতে বাধ্য হন। মুনজির ইবনে সাইদ উক্ত অভ্যর্থনা সভায় হৃদয়গ্রাহী এক উপস্থিত বক্তৃতা দিয়া কর্ডোভার কাজির পদ লাভ করেন।
বাইজান্টাইন দূতের বিনিময়ে তৃতীয় আবদুর রহমান হিশাম বিন ফুলাইব গাছিক্ককে কনস্টান্টিনোপলে দূত হিসাবে প্রেরণ করেন। দুই বৎসরের দৌত্যকর্ম শেষে হিশাম কনস্টান্টিনোপল হইতে অপর একজন দূতকে সঙ্গে লইয়া দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। জার্মানীর মহান অটো খলিফার সহিত কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তাঁহার দূত মেজের নিকটবর্তী গোর্জের চার্চের সন্ন্যাসী জনৈক জহনকে তোরতোসার মুসলিম গভর্নর অতি সম্মানের সহিত কর্ডোভায় আনেন এবং রাজকোষ হইতে তাঁহার ভ্রমণের সমস্ত ব্যয় বহন করেন। অতি আঁকজমকের সহিত তাহাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করা হয়। জার্মান ঐতিহাসিক লুইতপ্ৰাণ্ডের মতে, এই রাষ্ট্রদূত প্রেরণের পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্স, ইটালী বিশেষ করিয়া ফ্রাকজিনেট প্রভৃতি মুসলিম উপনিবেশসমূহ যাহাদের উপর তৃতীয় আবদুর রহমানের বিরাট প্রভাব ছিল তাহাদের অত্যাচার ও আক্রমণকে প্রতিহত করা। পীরেনীজ পর্বতের অপর পারে অবস্থিত ফ্রাঙ্করাজ প্রভেন্সের উক হুগো। (Ukoh-Hugo) এবং পূর্ব ফ্রান্সের রাজা কালদোহ (Charles the simple) ৯৪৭ খ্রীস্টাব্দের পরবর্তীকালে তৃতীয় আবদুর রহমানের দরবারে তাহাদের রাষ্ট্রদূত প্রেরণ করেন। শত্রুভাবাপন্ন ফাতেমীদের বিরুদ্ধে ইটালীর রাজার সহিত তাহার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়িয়া ওঠে। উত্তর-পূর্ব ইউরোপের মাকালিক দেশগুলি এবং উত্তর স্পেনের
খ্রীস্টান ও রোমের জনগণের সহিতও সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হয়। খলিফার রাষ্ট্রদূত রেছেমুণ্ড (Recemundus) যিনি ল্যাটিন ও আরবী উভয় ভাষায় পারদর্শী ছিলেন, তিনি জার্মানের মহান অটোর দরবারে রাবি ইবনে জাইদ নামে পরিচিত ছিলেন। তিনি লুইতপ্ৰান্ডকে (Liudprand) তাহার ইতিহাস রচনায় সাহায্য করেন। খলিফার প্রাসাদ চিকিৎসক হাসদাই ইবনে শাপরুত জার্মান ও বাইজান্টাইন রাষ্ট্রদূতদ্বয়ের পরিচর্যায় নিয়োগ করা হয়। নাভাররের রাণী তোতা ও লিওনের রাজা ৪র্থ অর্ডোনোর নিকট তাহাকে দূত হিসাবে প্রেরণ করা হয়।
উৎপাদিত শস্যের অংশদানের ভিত্তিতে চাষাবাদ করিবার ব্যবস্থা চালু ছিল। উর্বরা জমির কৃষকদিগকে বলা হইত হাভার্স (Halvers)। কারণ তাহারা উৎপাদিত শস্যের অর্ধেক অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিত। ইবনে বাশকুওয়ালের বর্ণনা অনুসারে, তৃতীয় আবদুর রহমান তাহার নিজস্ব ব্যবহারের জন্য সরকারী সম্পত্তির আয় হইতে বৎসরে ৭৫০,০০০ হাজার দিনার গ্রহণ করিতেন।১৮ দ্রব্যসামগ্রীর স্বল্প মূল্য ও ভিক্ষাবৃত্তির অনুপস্থিতি জনসাধারণের সুখ-সমৃদ্ধি ও স্বচ্ছলতার পরিচয় বহন করে। ইবনে হাওকাল বলেন, ফলমূল এত সস্তায় বিক্রয় হইত যে প্রায় বিনা মূল্যে পাওয়া যাইতো বলা যাইতে পারে। তাহার শাসন আমলে আন্দালুসিয়ায় এক নতুন সভ্যতার উন্মেষ ঘটে। মধ্যযুগীয় ইউরোপ ইহাকে শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করিত। উন্নতমানের কৃষি শস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ও উদ্যান পরিচর্যায় নতুন নতুন কলা-কৌশল প্রবর্তন করা হয়। তাঁহার সময়ে স্পেন অতি উচ্চ প্রযুক্তির চাষাবাদ ও সমৃদ্ধ উৎপাদনশীল উদ্যান সামগ্রীর নজির স্থাপন করে। উদ্ভিদ ও জীবজন্তু সংগ্রহের জন্য পাশ্চাত্যের সর্বত্র প্রতিনিধি প্রেরিত হইত। চিড়িয়াখানা ও উদ্ভিদ-উদ্যানের জন্য স্পেন দশম খ্রীস্টাব্দে খ্যাতি অর্জন করে এবং উভয় বিষয়ের উপর অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়। উদ্ভিদবিদ্যার নৈপুণ্য ও কলা-কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে প্রাচ্যের বহু উদ্ভিদকে নিষ্ফল করিয়া (Neutralise) কমলালেবু, ধান, আখ ও তুলাকে অন্য জাতীয় ফল ও শস্যের সহিত শঙ্করীকরণ করা হয়।
কর্ডোভার শহরতলী ও মুরসিয়া উদ্ভিদ ও গাছপালার জন্য প্রবাদে পরিণত হয়। অসমতল ভূমি ও পাহাড়কে কৃষিকার্যের জন্য উপযুক্ত করা হয়। কৃষিকর্মের জন্য আস্ত পাথরের মধ্য দিয়া নালা কাটিয়া পানি সেচের ব্যবস্থা করা হয়। আরবদের প্রকৌশল বিদ্যার নৈপুণ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। উদ্ভিদ সংরক্ষণের প্রচেষ্টাও পুরাদমে চলে। খাদ্য-সামগ্রীর প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য থাকার ফলে মুসলিম স্পেনের জনসংখ্যা ৩০,০০০,০০০ লক্ষ ২০ বৃদ্ধি পায়। শুধু কর্ডোভার জনসংখ্যা ছিল দশ লক্ষ। গোয়াদালকুইভির নদীর তীরে ১২,০০০ গ্রাম ও বিভিন্ন প্রকার শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়িয়া ওঠে। আরব, বার্বার ও মুয়াল্লাদদের সমন্বয়ে গঠিত মুসলমানদের সংখ্যা ছিল অধিক। খ্রীস্টান ও ইহুদী জিম্মীগণ কর্ডোভার জনসংখ্যার এক বিশেষ অংশ ছিল। শহরসমূহের
উন্নতি বিধানের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হয়। নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদত্ত হয়। নগর জীবনকে অনুপ্রাণিত ও পৌর জীবনের প্রতি নতুন আকর্ষণ সৃষ্টি করা হয়। হাট বাজারের রক্ষণাবেক্ষণ এবং শহরসমূহের আইন শৃঙ্খলা যথাযথভাবে রক্ষা করিবার জন্য মোহতাসিবদের নিয়োগ করা হয়। শহরের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী বণিক শিল্পী ও কারিগরদের জন্য পৃথক পৃথক সংঘ ছিল। ভ্রাম্যমান বণিক ও তাহাদের দ্রব্যসামগ্রী রাখিবার জন্য উপযুক্ত সরাইখানা নির্মিত হয়। সাহিত্য শিল্প ও বৈজ্ঞানিক অবদানের জন্য দরিদ্র লেখক, শিল্পী ও বৈজ্ঞানিকদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা দেওয়া হইত।
কৃষির সহিত সমানতালে শিল্প কারখানারও উন্নতি বিধান করা হয়। কর্ডোভা, সেভিল ও অন্যান্য শহরে বিশেষ ধরনের সিল্ক, সুতী ও পশমী কাপড় তৈয়ারির মিল এবং চামড়া ও বিভিন্ন প্রকারের ধাতুর কারখানা গড়িয়া ওঠে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং স্পেন সমৃদ্ধশালী হইয়া ওঠে। কর্ডোভা ছিল শিল্পকারখানা ও বাণিজ্য নগরী। ইহার প্রধান প্রধান রাস্তার উভয় পার্শ্বে চামড়া, কাগজ, সুগন্ধি, জিন ও জুতার কারখানা গড়িয়া ওঠে। ভ্যালেন্সিয়া ও এলভিরা হইতে সিল্ক সামগ্রী এবং কুয়েনকা হইতে কার্পেট, টলেডো হইতে অস্ত্রশস্ত্র, কালাতাইউদ হইতে মৃৎপাত্র, সারাগোসা হইতে পশু চর্ম, নকশী কাপড় ও পুস্তক কর্ডোভায় আমদানী করা হইত। কর্ডোভায় প্রতি বৎসর ৬০,০০০ পুস্তক প্রকাশিত হইত। দুষ্প্রাপ্য ও সৌখিন পুস্তকসমূহ পুস্তকের বাজারে মাঝে মধ্যে নিলামে বিক্রয় হইত। আল মেরিয়ার নিকটবর্তী পেচিনা বন্দর মারফত বিদেশী বিলাস সামগ্রী স্পেনে আসিত। একটি প্রদেশের তিন হাজার গ্রাম গুটি পোকার লালন পালনে নিয়োজিত ছিল। শুধু কর্ডোভাতে ১৩,০০০ তন্তুবায় ছিল।
যদিও পরবর্তীকালে আল মেরিয়া ও সেভিল কাপড় প্রস্তুতের ক্ষেত্রে কর্ডোভাকে অতিক্রম করে।২২ খলিফার দরবারে ইবনে শুহাইদের উপঢৌকন হিসাবে জাহরা ও অন্যান্য জায়গার প্রস্তুতকৃত বস্ত্ৰসমূহও অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্পেনে প্রস্তুত দিবাজ নামীয় সিল্কের কাপড় রং ও সৌন্দর্যে বিশ্ববিখ্যাত ছিল। স্পেনে তৈয়ারী সিল্কের জিন পৃথিবীর অন্যত্র তৈয়ারী জিন হইতে উত্তম ছিল। স্পেনের রাজ পরিবারের ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত সিল্কের কাপড় আব্বাসী ও ফাতেমী শাসকদের জন্য তৈয়ারী ইরাক ও মিশরের সিল্কের কাপড় হইতে উন্নত মানের ছিল।২৩ মুসলিম স্পেনে উন্নতমানের বরসাতিও প্রস্তুত হইত। কাপড় ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য দ্রব্য অতি সস্তা দামে তৈয়ারী ও বিক্রয় হইত। স্পেনের ধাতু শিল্পীগণ তরবারী, বর্ম, প্রদীপ ও লৌহের দরজা প্রস্তুতের ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে বিখ্যাত ছিল। চামড়াজাত দ্রব্য সামগ্রীও বিশ্বব্যাপী খ্যাতি অর্জন করে। অদ্যাবধি কর্ডোভার চামড়া ইউরোপের বাজারে আন্দালুসিয়ার রাজধানীর নাম অক্ষুন্ন রাখিয়াছে। উন্নতমানের কার্পেট ও নকশী করা কাপড়ের সমাদর ছিল পৃথিবীর সর্বত্র। সোনা, রূপা, পারা ও লোহার প্রচুর খনি ছিল মুসলিম স্পেনে। মার্বেল ও অন্যান্য প্রস্তরখনিও ছিল।
সেখানে। ডেনিয়া ও মাজুরকা মৃৎপাত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল। শিল্পকারখানায় উৎপাদিত দ্রব্যসামগ্রী দেশের জনগণের চাহিদা মিটাইয়া উদ্বৃত্ত থাকিত। উহা বিশেষ করিয়া প্রসাধনী ও বিলাস-সামগ্রী বিদেশে রফতানি হইত।
দামেস্ক এবং বাগদাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বেশির ভাগ উট বাহিত ছিল। কিন্তু কর্ডোভার ব্যবসা-বাণিজ্য চলিত বাণিজ্যিক জাহাজের মাধ্যমে। ফ্রান্স ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশসমূহের সহিত সড়ক পথে এবং ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ ও উপকূলসমূহে, তিউনিসিয়া, মিশর ও অন্যান্য প্রাচ্যদেশীয় দেশসমূহের সহিত ব্যবসা-বাণিজ্য চলিত সমুদ্রপথে। স্পেনের সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের দিনে ইহার বাণিজ্য জাহাজের সংখ্যা ছিল এক হাজারের বেশি। পণ্যসামগ্রী ক্রয়-বিক্রয়ে দূরদেশে স্থায়ী বাণিজ্য প্রতিনিধি প্রেরিত হইত। স্পেন ব্যবসায় বাণিজ্যে এত উন্নত ছিল যে,২৪ আমদানি ও রফতানি শুল্ক জাতীয় আয়ের বিরাট অংশের যোগান দিত।
বিভিন্ন জাতির অবিমিশ্র ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরব সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে প্রচার এবং প্রসারে সাহায্য করে। সভ্যজগতের বহু স্থান হইতে রাষ্ট্রদূত আগমন করেন কর্ডোভার সহিত বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপনের উদ্দেশ্যে। বৈদেশিক বাণিজ্য মারফত স্পেন বাইজান্টাইন ও পাশ্চাত্যের মুসলমানদিগকে অতি নিকটে আনয়ন করে। দেশের উত্তরাংশকে কৃষি, বিজ্ঞান ও চিকিৎসা শাস্ত্রে উন্নয়ন সাধন করিবার পর দক্ষিণাংশের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করা হয়। সেখানে কৃষি-নির্ভর খ্রীস্টান এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভর মুসলমানদের মধ্যে বিরাট উত্তেজনা বিরাজমান ছিল।
কৃষি, শিল্পকারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতি সাধনের সাথে সাথে বাৎসরিক জাতীয় আয় ৬২৪,০০০ হাজার দিনারে উন্নীত হয়। ইহা প্রথম আবদুর রহমানের সময় হইতে আট গুণ বেশি। জাতীয় আয় বৃদ্ধির ফলে জনসাধারণের জীবনের মানও বৃদ্ধি পায়। ইবনে হাওকাল বলেন যে, বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতীত জনগণ পায়ে হাঁটিয়া ভ্রমণের পরিবর্তে খচ্চর ও অশ্বে আরোহণ করিয়া ভ্রমণ করিত। ইহাতে মুসলিম স্পেনের জনসাধারণের বিশেষ করিয়া কর্ডোভার অধিবাসীদের সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।২৫ তৃতীয় আবদুর রহমানের রাজত্বকালের শেষে (৩৪০হিঃ/ ৯৫১ খ্রীঃ) রাজকোষে দুই কোটি দিনার গচ্ছিত ছিল।
তৃতীয় আবদুর রহমান সাহিত্য চর্চা ও বিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করিতেন। তিনি রাজকোষের এক তৃতীয়াংশ প্রতি বৎসর শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নতি সাধনের জন্য ব্যয় করিতেন। স্পেনের সভ্যতায় খলিফার বিরাট অবদান চির স্মরণীয়। তাহার সময়ে দার্শনিক ইবনে মাসাররাহ (মৃঃ ৯৩১ খ্রীঃ), ঐতিহাসিক ইবনুল আহমার (মৃঃ ৯৬৯ খ্রীঃ), চিকিৎসক আরিব বিন সাইদ এবং ইয়াহিয়া বিন ইসহাকের ন্যায় পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গের আবির্ভাব ঘটে। তৃতীয় আবদুর রহমানের রাজত্বকালে ইহুদীগণ সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখেন। বিখ্যাত কূটনীতিবিদ ও চিকিৎসক হাসদাই ইবনে
শাপরুত (৯৪৫-৭০ খ্রীঃ), তৃতীয় আবদুর রহমানের কোষাধ্যক্ষ ও অর্থমন্ত্রী হিসাবে কাজ করেন। উদ্ভিদ বিদ্যার উপর লিখিত চিত্রসম্বলিত বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডিওস করিডেস’ (Dioscorides) ইবনে শাপরুতের সহযোগিতায় গ্রীকপণ্ডিত নিকলাস আরবিতে অনুবাদ করেন।২৬ গ্রন্থটি মুসলিম স্পেনে গ্রীক বিজ্ঞানের গবেষণার ক্ষেত্রে মূল গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। কর্ডোভার ইহুদী চিকিৎসকগণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রাসাদ চিকিৎসক হিসাবে চাকুরী করিতেন। ইয়াহিয়া বিন ইসহাক তাহার সময়ে একজন চিকিৎসক ছিলেন। বিখ্যাত পণ্ডিতদিগকে খলিফা প্রচুর উপঢৌকন ও পারিতোষিক দিতেন। ভ্রাম্যমান পণ্ডিতদিগকে সাদরে গ্রহণ, হৃদ্যতাপূর্ণ আতিথ্য ও আর্থিক সাহায্য প্রদান করিতেন। দূরদেশ হইতে পণ্ডিত ব্যক্তিগণ আন্দালুসিয়ার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরিতে আসিয়া ভীড় করিতেন। ফাতেমী ভূগোলবিদ ইবনে হাওকাল কর্ডোভা সফর করেন এবং ইহুদী পণ্ডিত নিকলাস ও হাসদাই তাহার দরবারে শোভা বর্ধন করেন। কর্ডোভার ইবনে মাসাররাহ (৮৮৩-৯৩১ খ্রীঃ) যাহাকে নাস্তিকতার অভিযোগে দেশ হইতে বহিষ্কার করা হয়, তাহার শাসন আমলে আরাবীয়া হইতে প্রত্যাবর্তন করেন এবং নিজ দার্শনিক মতবাদ প্রচার করিতে শুরু করেন। তিনি গ্রীক দর্শনের দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত ছিলেন ফলে মালেকীদের কঠোর বিরোধিতার সম্মুখীন হন। ইবনে মাসাররাহ কর্ডোভার পার্শ্ববর্তী সিয়েরার এক আশ্রমে গমন করেন।২৭ সেখানে তিনি কিছু সংখ্যক শিষ্য সংগ্রহ করিয়া আন্দালুসীয় অতীন্দ্রিয়বাদের আদর্শ প্রচার করেন।
মিশর ইরাক ও ভারতবর্ষে দীর্ঘ ভ্রমণের পর ইবনুল আহমার রাজকীয় লাইব্রেরিতে যোগদান করেন এবং তৃতীয় আবদুর রহমানের ঐতিহাসিক জীবন চরিত’ রচনা করেন।২৮ কিতাবুল আওতাকুস-সানাত’-এর রচয়িতা খ্যাতনামা লেখক আবুল হাসান আরিব বিন সাইদ তৃতীয় আবদুর রহমান ও তাঁহার পুত্র দ্বিতীয় হাকামের শাসন আমলে আত্মপ্রকাশ করেন ও অন্যান্য আরও কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেন। তাহারা তাবারী কর্তৃক লিখিত বিখ্যাত কালানুক্রমিক ইতিহাস গ্রন্থের (২৯১-৩২০ হিঃ/৯০৪-৯৩২ খ্রঃ) সহিত উত্তর আফ্রিকা ও স্পেনের ইতিহাস সংযোজন করিয়া ইহার কলেবর বৃদ্ধি করেন। এই গ্রন্থের কিছু অংশ এখনও বিদ্যমান, উহাতে তৃতীয় আবদুর রহমানের রাজপ্রাসাদ ও সাম্রাজ্য সম্পর্কে আলোচনা রহিয়াছে। তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপরেও গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। উহার একটি কপি মাদ্রিদের এস্কোরিয়াল লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে। ইফতিতাহুল আন্দালুস’ গ্রন্থের রচয়িতা ও বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনুল কুতিয়াহ তাঁহার সময়েই সুখ্যাতি অর্জন করেন। এই গ্রন্থে আবদুর রহমানের শাসনের প্রথম অংশে মুসলিম স্পেনের ইতিহাস বিবৃত হইয়াছে। আহমদ আল-রাজী (মৃঃ ৯৫৩ খ্রীঃ) নামে জনৈক বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্পেনের একখানা ইতিহাস রচনা করেন। করোনিকা ডেল মোয়রা রাসিস (Cronica del Moro Rasis) নামের এই ইতিহাসখানা স্পেনের
দলিল হিসাবে পরিচিত ও পরিগণিত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা ভিত্তিক শিক্ষা ৯৫০ খ্রীঃ স্পেনে প্রচলন করা হয়। গণিতবিদ আবু গালিব হাব্বাব ? ইবনে উবদা এবং মাসলামাহ আল মাজরিতির শিক্ষক জ্যামিতি বিশারদ আবু আইউব ছিলেন তাঁহার সময়ের দুই বিখ্যাত পণ্ডিত। তৃতীয় আবদুর রহমানের ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে স্পেনে পাশ্চাত্য প্রভাব বিস্তার লাভ করে। তিউনিসিয়ায় ফাতেমী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর কায়রোওয়ানের শীর্ষস্থানীয় পণ্ডিতগণ আন্দালুসিয়ায় বসবাস করিতে যান। বাগদাদের বিখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ আবু আবদুল কাবকে ৯৪১ খ্রীস্টাব্দে স্পেনে আগমনের আমন্ত্রণ জানান হয়।
দ্বিতীয় আবদুর রহমান সর্বপ্রথম মুসলিম স্পেনে গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষায় পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং তাঁহার সময় ইহার ব্যাপক প্রসার ঘটে। আরবিতে বহু গ্রীক গ্রন্থ অনূদিত হয় ও গ্রীক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উপর বিভিন্ন বিষয়ের বহু মূলগ্রন্থ আরবিতে রচিত হয়। খলিফা ও তাঁহার পুত্রের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে বহু গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল। তৃতীয় আবদুর রহমান দ্বিতীয় আবদুর রহমানের লাইব্রেরির গ্রন্থ সংখ্যার সহিত আরও গ্রন্থ যোগ করিয়া ইহার সংখ্যা বৃদ্ধি করেন। সাম্রাজ্যের সর্বত্র বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও বড় বড় শহরে এতিমখানা স্থাপন করেন। একমাত্র কর্ডোভার এতিমখানাতেই এতিমের সংখ্যা ছিল ৫০০ শত। জিরিয়াবের শিষ্য জনৈক মুতা, গান ও বাদ্য দ্বারা খলিফার দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে সমর্থ হয়। ইবনে আবদ রাবিহী (৮৬০-৯৪০খ্রীঃ) খলিফার জনৈক রাজকবি তাহার সংগীত শ্রবণে বিমুগ্ধ ও বিমোহিত হইয়া তাহার অতীত জীবনের কুকর্মের জন্য অনুতপ্ত হইয়া নিজেকে সংশোধন করেন। তিনি উরজুজা নামে প্রশংসামূলক কবিতার মাধ্যমে তৃতীয় আবদুর রহমানের সাহসিকতাপূর্ণ সামরিক কার্যাবলীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। স্পেনীয় সাহিত্যে ইহা এক অতীব দুর্লভ ও বিরল সংযোজন। তাহার রচনার উপকরণ পাশ্চাত্য হইতে সংগৃহীত হয়। তিনি ইবনে কুতাইবার রীতি অনুসরণে তাঁহার সাহিত্য ভাণ্ডার ইকদুল ফরিদ’ (অনুপম সোনার হার) প্রাচ্যে-পাশ্চাত্যে তাহার খ্যাতি ও সুনাম অর্জনে সহায়তা করে। তাঁহার সমকালীন কবিদের মধ্যে ইবনে হানী (মৃঃ ৯৭৩) সর্বাপেক্ষা সুশিক্ষিত ও সুরুচির অধিকারী ছিলেন। তাহাকে “পাশ্চাত্যের মুতানাব্বী” বলা হইত। প্রচলিত ধর্মীয় মতবাদের বিরোধী বলিয়া ২৭ বৎসর বয়সে তাঁহাকে স্পেন হইতে বহিষ্কার করা হয়। তিনি ফাতেমীদের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং মুইজ্জের বীরত্ব গাথা রচনা করেন। তৃতীয় আবদুর রহমানের রাজত্বকালে মুকাদ্দাম ইবনে মুয়াফা অথবা মুহাম্মদ ইবনে মাহমুদ দশম হিজরীর প্রথম দিকে কর্ডোভার নিকটবর্তী কাবরাতে বসবাস করিতেন। মুয়াশশাহ নামে কবিতা রচনার নতুন রীতি তাঁহার সময়েই আবিষ্কৃত হয়। স্পেনের কিছু সংখ্যক গদ্য লেখক প্রাচ্যের ছন্দবদ্ধ লেখার রীতিকে তাহাদের রচনায় গ্রহণ করিয়া সাহিত্যে এক নতুন লেখন-রীতির প্রবর্তন করেন। ইহা ব্যক্তিগত চিঠিপত্র ও অফিসের কাজকর্মেও ব্যবহার হইত।
সরকারি ইমারত ব্যতীত সুন্দর ও মনোহর অট্টালিকা নির্মাণে খলিফার ছিল অসীম আগ্রহ। পুরাতন রাজপ্রাসাদের সংস্কার সাধন ও সেগুলো সুসজ্জিত করেন। বহু প্রশংসিত আলজাহরা প্রাসাদ ৯৩৬ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর মাসে সিয়েররা মরেনার নাব্য অঞ্চলে কর্ডোভার তিন মাইল পশ্চিমে জাবালুল উরুসে খলিফার প্রিয়তমা উপপত্নী সুন্দরী শ্রেষ্ঠা আলজাহরার স্মরণে নির্মিত হয়। ইহার প্রধান অংশ নির্মাণে পনেরো বৎসর সময় লাগে। অবশিষ্ট অংশের নির্মাণ কাজ সমাধা করিতে আরও পঁচিশ বৎসর সময় লাগে। ২৮০ একর (১৬৬০ X ৮১৫ গজ) জায়গা ব্যাপী এই নগরী গড়িয়া ওঠে। ৫০০০ দরজার এক সুবৃহত প্রাচীর দ্বারা ইহাকে পরিবেষ্টিত করা হইয়াছিল। ৩২৫ হিঃ/৯৩৬ খ্রীস্টাব্দে তৃতীয় আবদুর রহমান কর্তৃক ইহার নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং দ্বিতীয় আলহাকাম কর্তৃক ৩৬৫হিঃ/৯৭৫ খ্রীঃ সমাপ্ত হয়। ইহার নির্মাণ কাজে ১০,০০০ শ্রমিক, ১৮০০ ভারবাহী জানোয়ার প্রতিদিন ব্যবহৃত হইত।
গড়ে প্রতি বৎসর ইহার নির্মাণ কাজে ব্যয় হইত ২,০০,০০০ লক্ষ দীনার।৩০ ক্রম স্তরে নির্মিত তিনটি নিম্নগামীনাক ছাদে নগরীকে বিভক্ত করা হয়। উপরের ছাদে একটি হেরেম, একটি অন্দর মহল এবং একটি দুর্গ ছিল। আলহামরা জামে মসজিদ ও অভ্যর্থনা কক্ষও এই ছাদে অবস্থিত ছিল। এখান হইতে গোয়াদালকুইভিরের মনোরম দৃশ্য অবলোকন করা যাইত। দাস-দাসীদের বসবাসের গৃহ ছিল নিম্ন ছাদে। মধ্য ছাদ নির্দিষ্ট ছিল বাগান, ছায়াঘেরা কুঞ্জবন এবং জলকেলীর কৃত্রিম জলাশয়ের জন্য। মসজিদের জাঁকজমকপূর্ণ নির্মাণ কার্য ২২শে জানুয়ারি ৯৪১ খ্রীঃ/৩২৯হিঃ শুক্রবারে পাঁচ বৎসরে সম্পূর্ণ হয়। কাজি আবু আবদুল্লাহ বিন আবি ইসার ইমামতিতে জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জুমার নামাজে তৃতীয় আবদুর রহমানও অংশ গ্রহণ করেন। সুন্দররূপে নির্মিত এই মসজিদের অভ্যন্তরে লোক বসিবার পাঁচটি সারি ছিল। প্রাসাদ প্রাঙ্গণ কমলা রংয়ের মার্বেল পাথর দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল।
আল জাহরা প্রাসাদে ৭৫০টি প্রবেশ পথ এবং ৪৩১৬টি থাম্বা ছিল। এই প্রাসাদে ব্যবহারের জন্য মূল্যবান পাথর খণ্ড, বিভিন্ন প্রকার নির্মাণ সামগ্রী এবং সুশোভিত ও সুসজ্জিত করিবার বস্তুসমূহ সংগৃহীত হইয়াছিল বাইজান্টিয়াম, কার্থেজ, ইউটিকা, নারবোন ও তারাগোনা প্রভৃতি দূরবর্তী স্থানসমূহ হইতে। মার্বেল থামের ১৪০টি কনস্টান্টিনোপল ও আফ্রিকার শহরসমূহ হইতে, ১৯টি ফ্রাঙ্কিশ সাম্রাজ্য হইতে, কিছু রোম এবং অবশিষ্টগুলি স্পেনীয় প্রস্তরখনিসমূহ হইতে সংগৃহীত হইয়াছিল। তারাগোনা, ও আলমেরিয়া হইতে সাদা মার্বেল এবং রাইউহ হইতে ডোরাকাটা মার্বেল সংগৃহীত হয়। কারিগরী নৈপুণ্যের জীবন্ত নিদর্শন চমকার আকৃতির দুইটি ঝর্ণা সালোন ডে লস কালিফাস ও পাটিও ডে আলমুনিসে স্থাপিত হয়। মানব-মূর্তি খোদিত ব্রোঞ্জ নির্মিত
সুবৃহৎ ঝর্ণাটি আনিত হয় কনস্টান্টিনোপল হইতে। সবুজ মার্বেলে প্রস্তুত ছোট ঝর্ণাটি আনা হয় সিরিয়া হইতে। ছোট স্নানাগারটি বহুমূল্যবান রত্ন ও মণিমুক্তা খচিত, বাবটি স্বর্ণমূর্তি পরিবেষ্টিত ছিল। উহার উপর চিত্রিত ছিল সিংহ, হরিণ, কুমীর, ঈগল, ড্রাগন, ঘুঘু, বাজপাখি, পাতিহংসী, মুরগী, চিল, শকুনি ও মুরগীর বাচ্চা—যাহাদের মুখ হইত অনবরত পানি নির্গত হইতে থাকিত। গ্রীক ভাস্কর্য ও রঙিন পাথরের বিচিত্র কারুকার্য প্রাসাদ সজ্জায় ব্যবহৃত হয়। উমাইয়া রাজপ্রাসাদ বিশেষ করিয়া জাহরার প্রতিকৃতিও অঙ্কিত চিত্র দ্বারা সুসজ্জিত ও সুশোভিত করা হয়। প্রাসাদের প্রবেশ পথে রানী জাহরার প্রতিমূর্তি স্থাপিত হয়। প্রাসাদের দরবারকক্ষ ছিল মুক্তা ও রুবী খচিত মার্বেল থামের উপর নির্মিত গোলাকার গম্বুজের মধ্যস্থলে। হল কক্ষের মধ্যস্থলে ছিল পারা নির্মিত মার্বেলের চৌবাচ্চা। উহার উভয় পার্শ্বে আটটি করিয়া দরজা ছিল। রৌদ্রকরোজ্জ্বলে চৌবাচ্চাটি যন্ত্রের ন্যায় ঘুরিতে থাকিত। ইহার ফলে এক অপরূপ দৃশ্যের সৃষ্টি হইত।
শহরের পায়খানাসমূহে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। সেই যুগে এইরূপ ব্যবস্থা পৃথিবীর অন্যত্র ছিল অকল্পনীয়। দুইটি স্নানাগারের একটি রাজপরিবার ও অন্যটি জনসাধারণের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। কৃত্রিম হ্রদ ও জলাশয় সর্বদা পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন পানি দ্বারা পরিপূর্ণ থাকিত। বাগানের মধ্য দিয়া প্রবাহিত ছিল বহুনদী ও জলধারা। রাজপ্রাসাদের মৎস্যাধারে প্রত্যহ ১২,০০০ পাউরুটি এবং ১১৫টি বুশেল কাল বীজ সরবরাহ করা হইত। প্রাসাদটি দৈর্ঘ্যে ছিল এক মাইল ও প্রস্থে ছিল আধা মাইল। ইহারই মধ্যে পুরা সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক দফতরসমূহ বিদ্যমান ছিল। মার্বেল পাথরে নির্মিত ছাদ, গোলাকৃতি সভাকক্ষ, অপরূপ সুসজ্জিত স্বর্ণহল, অতুলনীয় মসজিদ নকশা, রঙ বেরঙের ফুলে সুশোভিত উদ্যান নবনির্মিত জাহরা শহরের শ্রীবৃদ্ধি করিয়াছিল। ক্রীতদাসীদের রূপের আকর্ষণ-স্মৃতিবিজড়িত জাহরা প্রাসাদের ভিত্তি প্রস্তর ব্যতীত কালের করাল গ্রাস হইতে কিছুই রক্ষা পায় নাই।
কর্ডোভা নগরী পাঁচটি বৃহৎ জেলায় বিভক্ত ছিল। ইহার প্রত্যেকটি প্রাচীর দ্বারা পৃথক করা হয়। একুশটি শহরতলীর প্রত্যেকটিতে ছিল একটি করিয়া মসজিদ, বাজার ও স্নানাগার। শহরটি গোয়াদালকুইভির তীর বরাবর উত্তর-দক্ষিণে প্রশস্ত ও পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা ছিল। খলিফার রাজপ্রাসাদের দুই বর্গ মাইল সহ ৫১ বর্গমাইল জায়গা লইয়া শহরটি গড়িয়া উঠিয়াছিল। সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত আলকাজাবা দুর্গ অবস্থিত ছিল শহরের মধ্যস্থলে। কোন কোন শহরতলীর বিশেষ আকর্ষণ ছিল উহার বিস্ময় সৃষ্টিকারী বাগান, মনোমুগ্ধকর মসজিদ, সুগন্ধিযুক্ত তুলসী গাছ বিক্রেতার দোকান এবং রুটি বিক্রেতাদের বাজার। সিয়েররা ডে কর্ডোবা হইতে খালের মাধ্যমে রাজপ্রাসাদে পানি আনয়ন করিয়া সেখান হইতে শীশার পাইপের মাধ্যমে শহরতলীসমূহে, উদ্যানে, বৃহৎ জলাশয়ে ও চৌবাচ্চায় পানি সরবরাহ করা হইত।
কর্ডোভাতে বসবাসকারী নাগরিকদের মধ্যে ছিল প্রাচ্যের অধিবাসী, স্পেনীয় যোদ্ধাগণ, ব্যবসায়ী, শিক্ষিত শ্রেণী, ক্রীতদাস, ইহুদী, মুজারাব ও বৈদেশিক দূতাবাসের প্রতিনিধি বৃন্দ। শপথ গ্রহণ ও বৈদেশিক দূতদের পরিচয় পত্র প্রদানের অনুষ্ঠানসমূহ আলকাজার প্রাসাদে অনুষ্ঠিত হইত। তৃতীয় আবদুর রহমান নিজে বিদেশীদিগকে জাহারা প্রাসাদে অভ্যর্থনা জানাইতেন। জার্মানীর প্রথম অটোর জনৈক রাষ্ট্রদূত জিয়ান ডে গোরজে তৃতীয় আবদুর রহমানের নিকট নিজের পরিচয় দানকালে কর্ডোভার সৌন্দর্যে বিস্ময় প্রকাশ করেন। স্যাকসনীর অদূরে শান্ত সমাহিত পরিবেশে অবস্থিত কর্ডোভার সৌন্দর্যে বিমুগ্ধ হইয়া গ্যাভার শেইমের সন্ন্যাসী হরৎসভিথা অভিমত প্রকাশ করিয়াছিলেন যে, “কর্ডোভা পথিবীর অলঙ্কার।”৩৩ কর্ডোভা নগরী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সঙ্গমস্থলে দাঁড়াইয়া সভ্যতার মশাল বুকে ধারণ করিয়া রহিয়াছে। কর্ডোভা মসজিদের কমলা আকৃতির দরবার কক্ষের উত্তর দিকে এক সুদৃশ্য মিনার নির্মিত হয়। ২৭ ফুট বর্গাকৃতির ও ১০৮ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট এই মিনারটি উত্তর আফ্রিকা হইতে সংগৃহীত মসৃণ পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হয়।
বর্গাকৃতির সুউচ্চ মিনারটি সিরিয়ার ধ্বংসপ্রাপ্ত মিনারের ন্যায় আড়াআড়ি স্তর বিন্যস্ত ভাবে নির্মিত হয়। ইহা স্থাপত্য শিল্পের সর্বোৎকৃষ্ট নিদর্শন। মসজিদের ফাসাদটি উত্তর পার্শ্ব বরাবর পুনর্নির্মাণ করা হয়। স্পেনের মূল-স্থাপত্যশিল্প প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে গড়িয়া ওঠে। মাল-মসলা ও নির্মাণ পদ্ধতিতে স্থানীয় এবং সাজ-সজ্জায় সিরীয় প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মসজিদের বেশির ভাগ নির্মাণকার্য সমাধা হয় স্লাভ ইঞ্জিনিয়ার আবু জাফর আল-আস কালাবীর তত্ত্বাবধানে। খলিফা মসজিদের মিনার নির্মাণে এবং মসজিদের কারুকার্যে ২৬,৫৩০ দিনার ব্যয় করেন। তাহার শাসনকালে মসজিদে ১০,০০০ বাতি প্রজ্বলিত হইত এবং ৩০০ জন লোক ইহার পরিচর্যায় নিযুক্ত ছিল।
উপজাতীয়দের লইয়া গঠিত সামরিক সংগঠনকে জুন্দ বলা হইত। এই বাহিনী গঠনে নানা প্রকারের ভুলত্রুটি ছিল। প্রথমত ইহাতে শৃঙ্খলার দারুণ অভাব ছিল। দ্বিতীয়ত রাষ্ট্রের তরফ হইতে উপজাতীয় প্রধানদের প্রতি অতিরিক্ত আনুকূল্য প্রদর্শন করা হইত। এই সমস্ত কারণে প্রথম হইতেই স্পেনের আমীরদের দেহরক্ষী হিসাবে স্লাভদিগকে নিয়মিত সৈন্যরূপে নিযুক্ত করা হয়। মাঝে মাঝে তাহাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হইলেও জুন্দ হইতে উহাদের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য।৩৪ এই নগণ্য সংখ্যক সেনা দ্বারা আরব গোত্রগুলিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং দেশের মধ্যে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা খুবই কঠিন ছিল। প্রাচীন আরব আভিজাত্যকে সম্পূর্ণরূপে বিলোপ করাই ছিল তৃতীয় আবদুর রহমানের উদ্দেশ্য। কারণ তাহাদের গোত্রীয় চরিত্র দেশের অভ্যন্তরে শান্তি শৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটায়। আরব আভিজাত্যের জায়গা দখল করে নগণ্য সংখ্যক মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এই
মধ্যবিত্ত শ্রেণী ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানা স্থাপন করিয়া সীমাহীন সম্পদের মালিক হয়। জায়গীরদার অভিজাত শ্রেণীর হস্তেও সম্পদ পুঞ্জীভূত হইয়া পড়ে। তিনি ব্যক্তি বিশেষকে যোগ্যতা ও ক্ষমতা অনুপাতে জমিদারী প্রদান করেন এবং তাহাদিগকে নিজস্ব এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে ও জরুরী পরিস্থিতিতে সরকারকে সেনা সরবরাহের শর্তে সীমিত সংখ্যক সেনাবাহিনী রাখিবার অনুমতি দান করেন। আব্বাসীদের ন্যায় খলিফা নিয়মিত বেতনভুক বিদেশী সৈন্য নিয়োগ করেন। আরবদের স্থলে খ্রীস্টান স্লাভ ও বার্বারগণ প্রশাসনিক কার্যে নিযুক্ত হয়। যে সমস্ত বিদেশী সেনাবিভাগে অথবা খলিফার হেরেমে চাকুরী করিত, তাহারা সাকালিবাহ (স্লাভ)৩৫ নামে পরিচিত ছিল। ইহারা অধিকাংশই ছিল উত্তর-পূর্ব ইউরোপের অধিবাসী। স্লাভগণ বাল্যকালে উত্তর-পূর্ব ইউরোপের উপজাতীদের হাতে বন্দী ছিল অথবা ক্রীতদাস হিসাবে ভেরদুন, মারসেলেস ও পেসিনাদের (আলমেরিয়া) মারফতে কর্ডোভায় আনীত হয়। আরব অভিজাত শ্রেণী ও উপজাতিদের সমন্বয়ে গড়িয়া ওঠা সমাজ ব্যবস্থা ভাঙ্গিয়া পড়ে।
স্পেনীয় সাকালিবাহদের মধ্যে বিদেশ হইতে সংগৃহীত ১২,০০০ হাজার দেহরক্ষীর অবস্থা ছিল প্রাচ্যের তুর্কীদের ন্যায়। ১২,০০০ হাজার দেহরক্ষীর মধ্যে প্রায় ৮,০০০ হাজার ছিল অশ্বারোহী। তাহারা উত্তম সিল্কের জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পরিধান করিত। জার্মান রাষ্ট্রদূত জিয়ান ডে গোরজের আগমন উপলক্ষে অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে খচ্চর ও অশ্ব সমন্বয়ে অশ্বারোহী সৈন্যদল গঠিত হয়। অশ্বের জন্যে ব্যবহৃত হইয়াছিল খাটি স্বর্ণের কটিবন্ধ। খলিফার অধীনে ১,৫০,০০০ নিয়মিত ও অসংখ্য অনিয়মিত সৈন্য ছিল। বহু সাধারণ সৈন্য সেনাবিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে উন্নীত হয়। তাহাদের অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্য গড়িয়া তোলেন। অনেকে পাণ্ডিত্যপূর্ণ কার্যের জন্য খ্যাতি অর্জন করেন। সেনাবিভাগে চাকুরী গ্রহণের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল বৈষয়িক, ধর্মীয় নহে। সাকালিবাহ পদ্ধতি সম্পর্কে পরে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা হইবে।
আরব, স্পেনীয় এবং বার্বারদের পৃথক পৃথক জাতীয় পরিচয়ের বিলুপ্তি সাধনের পর রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আরব অভিজাত শ্রেণী তাহাদের প্রভাব প্রতিপত্তি হইতে বঞ্চিত হয়। ফলে তাহাদের দ্বারা অত্যাচারিত স্পেনীয়রা খুশি হয়। আরব অভিজাতদের অপমানজনক ব্যবহার ও অত্যাচার হইতে মুক্ত হইয়া এক জাতিতে পরিণত হওয়া ব্যতীত স্পেনীয়দের আত্মতৃপ্তির অন্য কোন কারণ ছিলনা। তৃতীয় আবদুর রহমান বহুজাতির সংমিশ্রণে প্রকৃতপক্ষে এক বৃহৎ স্পেনীয় জাতি গড়িয়া তোলেন। এইভাবে পুরাতন গোত্রীয় পার্থক্য দূরীভূত হয় ও ব্যক্তিযোগ্যতার গুরুত্ব দেওয়া হয়। তাঁহার শাসনকালে সকল জাতির সমান অধিকারের নীতি অনুসৃত হয়। যাহার কুফল পরবর্তীকালে দেখা দেয়। এডউইন হোলের মতে, “খলিফা যে জনগণকে শাসন করিতেন তাহারা মিশ্র জাতীয়তা সম্পর্কে অবহিত ছিল না। তিনি যখন সিংহাসনে
আরোহণ করেন সে সময়ই দেশের মধ্যে আন্দালুসীয় অনুভূতির বহু চিহ্ন বিদ্যমান ছিল কিন্তু তাহা আন্দালুসীয় জাতীয়তার পর্যায়ে পৌঁছিতে পারে নাই। তাঁহার দীর্ঘদিনের সফল শাসনে ইহার উন্নতি সাধিত হয়। জাতি-বর্ণ ও গোত্রের তীব্র মতপার্থক্য ঘৃণা ও বিদ্বেষ সম্মিলিত জাতীয় অনুভূতি সৃষ্টির পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে।”৩৬ খলিফার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই উদার। ফলে তিনি এক সময় কর্ডোভার প্রধান কাজির পদ জনৈক নব মুসলিমকে দিতে মনস্থ করেন। তাহার মাতা-পিতা তখন পর্যন্ত খ্রীস্টান ছিল। এই সিদ্ধান্ত হইতে খলিফাকে নিবৃত্ত করিতে ধর্মীয় নেতাদের বেশ বেগ পাইতে হয়। আলহানডেগার (আলখন্দক) যুদ্ধে জামোরানসদের বিরুদ্ধে ৩২৭ হিঃ / ৯৩৮-৩৯ খ্রীঃ নাজদাহ নামে জনৈক নব মুসলিমকে সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। তাঁহারই পৃষ্ঠপোষকতা ও অনুপ্রেরণায় খ্রীস্টান এবং ইহুদীগণ সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অংশ গ্রহণ করে।
তাহার চরিত্রের মাহাত্ম্য প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সফলতা আনয়ন করে। আধুনিক ঐতিহাসিকগণও তাঁহার প্রশাসনিক সাফল্যের প্রশংসা করেন এবং বলেন, ইতিহাসের ছাত্রদের নিকট তাহার কৃতিত্বপূর্ণ প্রশাসন এক আশ্চর্যের বস্তু। দৃঢ়চেতা সাহসী ও পরিশ্রমী খলিফা নিজেকে যুগোপযোগী বলিয়া প্রমাণিত করেন। আল মাক্কারী বলেন, “তিনি ছিলেন ধীরস্থির ও সুশিক্ষিত শাসক। তাঁহার পূর্বে আর কোন শাসক এই সমস্ত গুণের অধিকারী ছিলেন না। তাঁহার বিনম্র স্বভাব, উদারতা ও সুশাসনের প্রতি ভালবাসা সমগ্র দেশে প্রবাদে পরিণত হয়।”৩৭ প্রত্যেক ধর্মের প্রতিনিধিকে লইয়া তিনি একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেন। পরধর্ম সহিষ্ণুতার জন্য তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেন। রাষ্ট্রের প্রতি অনুগত দেশপ্রেমিক লোকদিগকে তিনি জাতিধর্ম নির্বিশেষে সরকারি পদ ও মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করিতেন। মন্ত্রী, সরকারি কর্মচারী ও প্রজাদের সহিত সরাসরি যোগাযোগ রক্ষার্থে তিনি হাজীবের পদের বিলোপ সাধন করেন। বলা হয় তিনি তাঁহার শাসনের শেষ পর্যায়ে স্বেচ্ছাচারী হইয়া ওঠেন। তাঁহার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হইতে কোন কিছুই আড়াল করে রাখা সম্ভব ছিল না। ভারতবর্ষের শের শাহের ন্যায় তিনি নিজে রাজ্যের দৈনন্দিন কাজকাম দেখাশোনা করিতেন। তিনি আধুনিক কালের সম্রাটদের দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন। আইনসিদ্ধ করের হ্রাস এবং বে-আইনী করের বিলোপ সাধন করিয়া তিনি প্রজাকুলের হৃদয় জয় করিতে সমর্থ হন। তিনি ছিলেন ধৈর্যশীল। বহুকষ্টে রাষ্ট্রের উচ্চ বিচারকের পদে নব মুসলিমকে নিয়োগ করা হইতে তিনি বিরত থাকেন। তিনি গীর্জা নির্মাণের এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে জনগণকে আহবানের জন্য ঘন্টা বাজাইবার অনুমতি দান করেন। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমঅধিকারের বিধান করেন। তিনি তাঁহার পরামর্শ পরিষদে সকল ধর্মের মানুষকে অংশ গ্রহণের আহবান জানাইতেন। খলিফা সাধারণ জনগণের জীবনের মান উন্নয়ন করেন। রাজ্যের বর্ধিত কর জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়নমূলক কাজে এবং সুদৃশ্য। সরকারি ভবন নির্মাণে ব্যয় করেন। সুবিচারের প্রতি নিষ্ঠা ও জ্ঞানী গুণীজনের প্রতি
সম্মান প্রদর্শনের জন্য তাঁহার শাসনকাল ইতিহাসের রূপকথায় পরিণত হইয়াছে। কাজি মুনজির বিন সাইদ আল-বালুতি (৮৭৮-৯৬৫ খ্রীঃ) তাঁহার সময়ের সর্বাপেক্ষা শিক্ষিত ধর্মবেত্তা ছিলেন। ইকদুল ফরিদির’ লেখক আহমদ ইবনে আবদ আল রাবিহী ও আবুল কাসেম খালাফ ইবনে আব্বাস আল জাহরাবী রাজপ্রাসাদ ও কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ের শোভা বর্ধন করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয় খলিফা নিজে প্রতিষ্ঠা করেন। ইহা পাশ্চাত্য জগতের শিক্ষার্থীদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়।
তথ্য নির্দেশ
রাফায়েল আলতামিরা, দ্যা ওয়েস্টার্ন খেলাফত ইন দ্যা কেমব্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ৩য় খণ্ড, কেমব্রীজ, ১৯২২, পৃঃ ৪২০। নিহত ডিসেম্বর ৮৯৭ খ্রঃ; ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৩৬৯। সেভিল ও কারমোনার নেতা, তাঁহার দুই পুত্র আবদুর রহমান ও মুহম্মদকে রেখে তিনি ২৯৮ হিঃ/ ৯১০-১১ খ্রীঃ মৃত্যুবরণ করেন; লেভি প্রভেঙ্কাল, হিস্টোরিয়া, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৬৮। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৩৮৬।
আল-বেয়ানুল আল-মাগরিব, হোল কর্তৃক উদ্ধৃত, আন্দালুস, পৃঃ ১৬৪। ৬। এস.এম. ইমামউদ্দিন, ফারমিং এ্যান্ড স্টোরিং ইন মুসলিম স্পেন আন্ডার দ্যা উমাইয়াদ’ (ইসলা মিক কালচার, হায়দারাবাদ, (ইন্ডিয়া) ১৯৫৯, পৃঃ ২২৮-২৩১ দেখুন।
কেমব্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ৩য় খণ্ড, ১৯২২, পৃঃ ৪২১। ঐ, পৃঃ ৪২১.
ঐ, পৃঃ ৪২১-২২। ১০। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪২৭ ও ৪২৯। ১১। গায়ানগোস, ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৪৬। ১২। এস, এম, ইমামউদ্দিন, সাম অ্যাসপেক্টস অব দ্যা সোশিও ইকনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব
মুসলিম স্পেন, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ৫৪। ১৩। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪৪৫। ১৪। ইবনে ইজারী, বাইয়ান, পৃঃ ২১২/৩২৭; লেভি প্রভেঙ্কাল, লা ইস্পনা, পৃঃ ৪৫-৪৭, ও লাজাসিওন,
পৃঃ ৩৩-৩৪। ১৫। এইচ. কে, শেরওয়ানী, মুসলিম কলোনিস, পৃঃ ১৫৫-৫৭। ১৬। হোল, আন্দালুস, পৃঃ ৯১। ১৭। ঐ, পৃঃ ৭০। ১৮। ক্রেমার, ইবনে হাওকল, পৃঃ ১১৪। ১৯। ম্যাককেব, পৃঃ ৬৩। ২০। লেভি প্রভেঞ্চাল, লা-ইস্পনা, পৃঃ ২৩২। ২১। ম্যাককেব, পৃঃ ৬৩; কেন্দ্রীজ মেডিয়াভ্যাল হিস্ট্রি, ৩য় খণ্ড, পৃঃ ৪৩২। ২২। ক্রেমার, ইবনে হাওকল, পৃঃ ১১৬। ২৩। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪৪৬-রাজা খুজারশের নিকট কাসদাইয়ের পত্র। কারমলি কর্তৃক দাস খুজারস্ এন জি, সোসাইটি, পৃঃ ৩৭ ও টীকা-১।
২৪। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪৪৫; ক্রেমারস্ পৃঃ ১১৪। ২৫। কর্দোভার বিখ্যাত চিকিৎসক আবু আব্দুল্লাহ আল-আসকালাবীর মতো গ্রীক ভাষাবিদ স্পেনে দুর্লভ ছিল। ২৬। এম, আসিব-পালা শিওস, ওবরাস ইসকোজিডাস (ইবনে মাসারাহ ওয়াই ও এসকুয়েলা) ১ম খণ্ড, মাদ্রিদ ১৯৪৬, পৃঃ ১-২১৬। ২৭। এস, এম. ইমামউদ্দিন, সাম অ্যাসপেক্টস অব দ্যা সোশিও-ইকনোমিক এ্যান্ড কালচারাল হিস্ট্রি অব মুসলিম স্পেন, লেডেন, ১৯৬৫, পৃঃ ১৮৬। ২৮। গায়ানগোস, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৩৪, আজহার, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৬৯; ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪৪৬। ২৯। ইবনে ইজারী, ২য় খণ্ড, পৃঃ ২৪৬। ৩০। উপপত্নী ও স্নাত নারীদের প্রতি তাহাদের প্রভুদের হৃদয়ের আকর্ষণ সম্পর্কিত কুফী অক্ষরে লিখিত কিছু সমাধিস্তম্ভ কর্দোভায় আবিষ্কৃত হইয়াছে। ৩১। ১০১৩ খ্রীঃ ইহা ধ্বংসভূপে পরিণত হয়। বর্তমানে স্পেনিশ সরকারের অধীন ইহা পুনরুদ্ধার প্রাপ্ত হইতেছে। ৩২। গুরুনে বাউম, মেডিয়াভ্যাল ইসলাম, পৃঃ ৫৭। ৩৩। রোমান স্লাভদের ন্যায় উমাইয়া স্লাভ ও খোজাগণ স্পেনে বিশেষ পদ লাভ করে এবং সরকারের উপর প্রভাব বিস্তার করে। তাহারা সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিল। সেনাবাহিনী হেরেম ও কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত স্নাতদের উপর আমীর ও খলিফা একান্তভাবে নির্ভরশীল হইয়া পড়েন। স্নাতগণ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থাকিয়া দেশের প্রশাসনিক ক্ষেত্রে শাসকদের প্রচুর সাহায্য করিত। ৩৪। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪৩০। ৩৫। আন্দালুস, পৃঃ ৪৭। ৩৬। ডজি, স্পেনিশ ইসলাম, পৃঃ ৪৪৭। ৩৭। মাকারী, (গায়ানগোস) ২য় খণ্ড, পৃঃ ১৪৭।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন