নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ

নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ

ইউপেনে আমার কেমেস্ট্রি ল্যাবে ঢুকতেই চোখে পড়ে সাতজন। ব্যক্তির বড় ছবি। তাঁদের কেউ যোদ্ধা নন। তাদের কেউই আমেরিকার স্বাধীনতার স্থপতি নন। কেউই রাজনৈতিক নেতা নন। কোনো জীবিত কিংবা মৃত প্রেসিডেন্ট নন। তারা বিজ্ঞানের বীর। রসায়নের বীর। তাঁরা জগৎ বদলে দেওয়া মানুষ। ল্যাবরেটরির বাইরে আছে বিজ্ঞানীদের কয়েকটি বড় ভাস্কর্য। পুরো ক্যাম্পাসের কোথাও কোনো নেতা-নেত্রীর একটি পোস্টার, ব্যানার কিংবা ছবিও দেখা যায় না।

আমার সুপারভাইজার প্রফেসর গ্যারি মোলান্ডার হলেন বিভাগের চেয়ারম্যান। তার রুমে কোনো নেতার ছবি দেখি না। অথচ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওয়াশিংটন, লিংকন, এফ কেনেডি এসব মানুষের কথা সারা দুনিয়ার পাঠ্যবইয়ে পড়ানো হয়। কিন্তু এঁদের ছবি আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়েই টাঙিয়ে রাখা হয় না। তাদের ছবি বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরিতে থাকে না। একদিন আমার সুপারভাইজারকে বললাম, তোমরা তাদের ছবি ঝুলাও না কেন? fola 161136019, Keep the right things in right place. Dont messed up! যাকে যেখানে শোভা পায়, সেখানেই রাখো!

স্টকহোম শহরের সবচেয়ে উঁচু যে ভাস্কর্যটি, সেটি কোনো রাজার নয়। কোনো নেতার নয়। সেটি হলো ক্যারোলাস লিনিয়াসের। লিনিয়াসকে বলা হয় সুইডিশ বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী। লিনিয়াসের ছবি সে দেশের মুদ্রায় ছাপা ছিল। লিনিয়াসের নামে আছে বিশ্ববিদ্যালয়। বার্জেলিয়াস ছিলেন সুইডেনের বিখ্যাত কেমিস্ট। সে দেশের বিভিন্ন শহরে তার স্ট্যাচু করে রাখা হয়েছে। স্টকহোমে আছে বার্জেলিয়াস পার্ক। আর তার জন্মদিনকে পালন করা হয় বার্জেলিয়াস ডে হিসেবে। কোপেনহেগেন এয়ারপোর্টে নামলেই শহর সম্পর্কে যে বুকলেট দেওয়া হয়, সেখানে তুলে ধরা হয় নিলস বোরের কথা। বোর ছিলেন ডেনমার্কের সায়েন্টিফিক হিরো। সে দেশের মুদ্রায় ছাপা ছিল তার ছবি। একই সংস্কৃতি দেখা যায় ইউরোপ-আমেরিকার অন্য দেশগুলোতে।

সশরীরে উপস্থিত থেকে, নোবেল প্রাইজ অনুষ্ঠান দেখার এক বিরল সুযোগ হয়েছিল আমার। দেখলাম, নোবেল বিজয়ীরা সবার শেষে হলে ঢুকলেন। এটাই নিয়ম। কারণ, তারা যখন হলে ঢোকেন, তখন সবাই দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। এমনকি দাঁড়াতে হয় রাজা (Swedish King) ও রাজপরিবারকে। যদি রাজা সবার শেষে হলে ঢুকতেন, তাহলে নোবেল বিজয়ীদের দাঁড়াতে হতো। কিন্তু সেটা তো হতে পারে না। যারা জগতের রাজা, তারা একটি রাজ্যের রাজার সম্মানে দাঁড়াতে পারেন না। সে জন্যই শেষোক্ত নিয়মটি করা হয়নি। নোবেল বিজয়ীদের জন্যই রাজাকে দাঁড়াতে হবে

বিজ্ঞানের জন্য আমেরিকার এক খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের নাম। ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্স (NAS)। সংগঠনটির প্রধান। কার্যালয় হলো(ওয়াশিংটনে। সম্প্রতি সে কার্যালয় দেখতে যাই। কার্যালয়ের আঙিনায় একজন বিজ্ঞানীর সুবিশাল এক ভাস্কর্য। বানিয়ে রাখা হয়েছে। সে বিজ্ঞানীর নাম আলবার্ট আইনস্টাইন। অথচ আইনস্টাইন আমেরিকায় জন্মাননি। আমেরিকায় বেড়েও ওঠেননি।

দেশে যখন ডিপার্টমেন্টের অফিসে যেতাম, দেখতাম সেখানে ঝুলছে জীবিত ও মৃত নেতা-নেত্রীদের ছবি। ডিপার্টমেন্টে কোনো বিজ্ঞানীর ছবি দেখতে পাইনি কোনো দিন। বিজ্ঞান অনুষদ বা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে কোনো বিজ্ঞানী বা দার্শনিকের একটি ভাস্কর্য চোখে পড়েনি। বিজ্ঞান অনুষদে থাকতে পারত আইনস্টাইনের ভাস্কর্য কিংবা দেশের খ্যাতনামা বিজ্ঞানীদের ছবি। থাকতে পারত হাইজেনবার্গ, বোর, ফাইনম্যানদের নামে কম কিংবা লেকচার হল। কিন্তু ছিল শুধু নেতাদের ছবি। ইউনিভার্সিটিজুড়ে শুধু পোস্টার, চিকা, নির্বাচনের স্লোগান, নেতা নেত্রীর ছবি!

নেতাদের ছবি টিভিতে দেখতাম। টাকায় দেখতাম। হাটে মাঠে-ঘাটে দেখতাম। পোস্টারে দেখতাম। রাস্তায় দেখতাম। বাসে-ট্রেনে-লঞ্চে দেখতাম। রিকশার নিতম্বের শিল্পকর্মে দেখতাম। পল্টনের মাঠে দেখতাম। মানুষের গালে দেখতাম। ক্লাসের টেবিলে দেখতাম। বাসের ছাদে দেখতাম। হোটেলের দেয়ালে দেখতাম। ট্রাকের গায়ে দেখতাম। সমগ্র বাংলাদেশ পাঁচ টন লেখাটা ঢেকে থাকত নেতাদের ছবি দিয়ে। তারপরও যথেষ্ট নয়। স্কুল-কলেজ এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোঠায় কোঠায় তাদের ছবি থাকতে হবে। কী অদ্ভুত! নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ! পৃথিবীর কোনো সভ্য শিক্ষিত দেশের জ্ঞানালয়ে কী নেতা নেত্রীদের ছবি ঝুলিয়ে একাকার করে রাখা হয়?

যে জাতি যেটির মূল্যায়ন করে, সে জাতি সেটিই পায়। আমরা দেশভর্তি নেতা পেয়েছি। পশ্চিমের দেশগুলো পেয়েছে। পৃথিবী বদলে দেওয়া মানুষ।

সকল অধ্যায়
১.
একটি সাবমেরিন বনাম পাঁচ হাজার জানালা
২.
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাসটুকু শুনুন
৩.
চিত্ত যেথা ভয়যুক্ত, নিচু যেথা শির
৪.
একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়
৫.
কোটা নাকি মেধা? জন্ম নাকি কর্ম?
৬.
কর্মে হোক জন্ম জয়
৭.
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষ্পাপ প্রাণগুলো
৮.
দেশটা যেভাবে হেরে যায়
৯.
সজাগ হও, হে তারুণ্য!
১০.
সেশনজটে ক্ষয়ে যায় সমাজ
১১.
থেমে থেকো না
১২.
সম্ভাবনাকে জাগতে দিন
১৩.
উন্নত সমাজের মূলমন্ত্র
১৪.
লক্ষ্য হোক দক্ষতা অর্জন
১৫.
কোথায় ছুড়ছ তোমার সোনালি যৌবন?
১৬.
দয়া করে ওদের ঠকাবেন না
১৭.
বাংলাদেশ কি মেধাবীদের ফিরিয়ে নেবে?
১৮.
নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ
১৯.
সহজাত মেধা যেন ক্ষয়ে না যায়
২০.
মগজের ধ্বংসযজ্ঞ
২১.
দাঁড়াতে হলে শিখতে হয়
২২.
প্যারালাইজড মাইন্ড!
২৩.
সম্ভাবনা খুন হয়ে যায়
২৪.
অন্তরে বাহিরে দাসত্বের রজ্জু
২৫.
মেধাবীদের কত দিন দূরে রাখবে সমাজ?
২৬.
ব্রেইন ড্রেইন নাকি ব্রেইন গেইন?
২৭.
শিক্ষার আলোয় জাগুক স্বদেশ
২৮.
সম্ভাবনার দুয়ারে আছ দাঁড়িয়ে
২৯.
আলোকিত সমাজের মূলমন্ত্র
৩০.
দ্য রাইট পারসন
৩১.
নিজেকে আবিষ্কার করো
৩২.
সত্যিকারের নায়ক
৩৩.
যা আছে তা-ই দিয়ে করো সংগ্রাম
৩৪.
চুরি বিদ্যা ও বিদ্যা চুরি
৩৫.
অনন্য, অপ্রতিরোধ্য দক্ষিণ কোরিয়া
৩৬.
একটা বিপ্লব হচ্ছে নীরবে
৩৭.
জাগরণের কাল
৩৮.
একজন ভিসি ও দীর্ঘশ্বাস
৩৯.
কিশোর-কিশোরীর জ্ঞানানন্দ
৪০.
ভারত কেন পারছে?
৪১.
জাপান থেকে শেখো
৪২.
অধিকারবঞ্চিত হতভাগ্য শিক্ষার্থীরা
৪৩.
স্ট্যানফোর্ডের আকাশ
৪৪.
প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়
৪৫.
ডিজিটাল ইগনোরেন্স
৪৬.
প্রিয় অভিভাবকগণ, একটু শুনুন
৪৭.
মাত্র এক শ কোটি টাকা
৪৮.
ফড়িংয়ের চোখ তৈরি করো
৪৯.
ছোট দেশের বড় স্বপ্ন
৫০.
মনিরুল ইসলামেরা কেন ফিরতে পারেন না?
৫১.
ড্রাইভিং ফোর্স
৫২.
অন্তরালের নায়ক
৫৩.
উদ্ভাবনে আমরা কেন পিছিয়ে?
৫৪.
আত্মঘাতী নীতিমালা
৫৫.
এমন যদি হতো
৫৬.
চারিত্রিক সনদ
৫৭.
চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি
৫৮.
আত্মহনন কোরো না হে প্রাণ
৫৯.
আমাদের সম্ভাবনাময়ী মেয়েরা
৬০.
উপাচার্যদের উপাচার্য
৬১.
কেমন হয় একটা বিশ্ববিদ্যালয়?
৬২.
হৃত কৌতূহলী মগজ
৬৩.
জিনিয়াস মাইন্ড

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%