বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাসটুকু শুনুন

প্রায় দুই বছর ধরে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া (UPenn)। গবেষণা করেছি। ল্যাবরেটরি থেকে বের হতে হতে প্রায়ই রাত। ৯টা-১০টা বাজত। কখনো কখনো ১১টা কিংবা ১২টা। বহুবার লক্ষ করেছি, এই গভীর রাতেও অনেকে বসে বসে কাজ করছেন। তাঁদের ঘড়িগুলো যেন বন্ধ হয়ে আছে। ঘড়ির কাঁটা তাঁদের সামান্যতম তাড়া দিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাত দুইটা পর্যন্ত কিছু বাস (শাটল) সার্ভিস দিয়ে রেখেছে। কেউ যদি গভীর রাতে বাসায় ফিরতে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে সে গাড়িগুলো তাকে বাসার দরজায় পৌঁছে দেয়। সার্ভিসটা যেহেতু রাত দুইটা পর্যন্ত, তার মানে কেউ না কেউ সে সময় পর্যন্তই কাজ করছে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার!

ভাবলাম, এই যে গভীর রাত পর্যন্ত রুমে রুমে আলো জ্বলছে, সেটার কারণেই এই দেশটা পৃথিবীর পরাশক্তি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। খেটে যাচ্ছেন প্রতিযোগিতা দিয়ে। একটা প্রতিযোগিতা যখন। সঠিকভাবে দাঁড় করানো যায়, তখন সেখান থেকে সেরাদের সেরা বেরিয়ে আসে। আর এই প্রতিযোগিতায় লেগে থাকার জন্য, সমাজ পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রেখেছে। রাষ্ট্র দিচ্ছে তরুণদের জন্য এক প্রাণবন্ত পরিবেশ। আর তরুণেরা দেশের জন্য দিচ্ছে মেধা ও শ্রম! কী ঐকতান!

আমরা প্রায়ই আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের অলস-অনাগ্রহী বলে দায়মুক্ত হয়ে যাই। আসলে কি ওরা অলস? একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছারপোকার কামড় খেয়ে হলে রাত কাটান। পাঁচ-ছয়জন শিক্ষার্থী ঠাসাঠাসি করে একটি রুমে থাকেন। ১৫-২০ টাকায় ৫-৭ বছর অখাদ্য খেয়ে পাকস্থলী পোড়ান। বাসের ডান্ডা ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলে ঝুলে ক্যাম্পাসে যান। ভিড়ের মধ্যে অন্যের ঘামের গন্ধ শুঁকে, ঘণ্টাখানেক দাঁড়িয়ে থেকেই ইউনিভার্সিটিতে যাতায়াত করতে হয়। পরীক্ষার আগের রাতেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পান না। টিউশনি করে মাস চালাতে হয়। কেউ কেউ সে টাকা দিয়ে পরিবারকেও দেখেন। একটা কম্পিউটার কেনার জন্য টাকাও অনেকের থাকে না। এত সংগ্রামের পরও তারা ইউনিভার্সিটিতে পড়তে আসেন। পড়ে যাচ্ছেন। বড় বড় স্বপ্ন দেখেন। আর যখনই ইউনিভার্সিটি থেকে বের হন, তখন তাদের হাতে শুধু একটি সনদ ধরিয়ে দেওয়া হয়। না কোনো গবেষণার অভিজ্ঞতা, না কোনো প্রফেশনাল জীবনের সঠিক প্রস্তুতি! উপরন্তু জীবন থেকে কেড়ে নেওয়া হয় কিছু সময়। আমরা এর নাম দিয়েছি সেশনজট। হারানো সময়ের সে হিসাব কোথাও লেখা থাকে না। সেশনজটের মতো ঘৃণ্য একটি বিষয় পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে নেই। হাজার হাজার ছেলেমেয়ের জীবন থেকে সময় কেড়ে নেওয়া রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর অভিশাপ। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন। উপাচার্য কখনো বলেন না, ডিয়ার স্টুডেন্ট, উই আর সরি ফর দ্যাট। ইউ উইল ট্রাই টু মেইক থিংকস বেটার!

অথচ এই ছেলেমেয়েগুলোর মা-বাবার ট্যাক্সের টাকা দেশে লুট হয়ে যায়। কী নির্মম! পৃথিবীর আর কয়টা দেশে এত যুদ্ধ করে ছেলেমেয়েরা পড়াশোনা করে? একবার আন্তর্জাতিক স্টুডেন্টদের এক আড্ডায় আমাদের শিক্ষাজীবনের সংগ্রামের কথা বলেছিলাম। তা শুনে দেখলাম ওদের কেউ কেউ চোখ মুছছে। দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা কত সংগ্রাম করেন, কত কষ্ট করেন, সেটা আমি গভীরভাবে জানি। কারণ একটা নিরেট গ্রাম থেকে পড়াশোনা করে আমাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন পাড়ি দিতে হয়েছে।

এরপরও কি বলবেন, এ দেশের ছেলেমেয়েরা অনাগ্রহী-অলস! তারা পড়তে চায় না। তারা গবেষণা করতে চায় না! তাদের কতটুকু দিই–সেটা কি কখনো আমরা ভাবি? তাদের সামান্য চাকরির লোভে, এক কাপ চায়ের লোভে, একটি সিটের লোভে নেতার গায়ের গামছা বানিয়ে রাখি। বড় ভাইদের দাস বানিয়ে রাখি! এমন ঘৃণ্যতম সিস্টেম কি কোথাও আছে? দুনিয়ার আর কোনো সমাজে কি মধ্যবিত্ত-নিম্নমধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েদের সঙ্গে রাষ্ট্র এমন প্রতারণা করে?

তারপরও এই ছেলেমেয়েগুলোর অটুট লক্ষ্য খুব বিস্মিত করে। রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ওরা স্বপ্নের সঙ্গে আপস করতে। চায় না। ওদের মধ্যে নিজেকে আলোকিত করার যে দৃঢ় প্রত্যয়, সেটাকে আমাদের সম্মান করা উচিত। আরও বহু গুণে জাগিয়ে তোলা উচিত। অথচ আমরা সেটা করছি না। আমরা বুঝতে চাই না, এই তরুণপ্রাণদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে একটি দেশ রাতারাতি এগিয়ে যায়। সারা দুনিয়ার উন্নত সমাজগুলো তা-ই করে।

যখন দেখি, ইউজিসির একজন চেয়ারম্যান রাজনৈতিক দলের গুণগান গেয়ে লেখার সময় পান অথচ দেশের হাজার হাজার তরুণ তরুণীর ভবিষ্যৎ নিয়ে বলেন না, লেখেন না, তখন খুব কষ্ট হয়। শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে যে এত মূল্যবান সময় কেড়ে নেওয়া হয়, সেটার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে কি দুবাক্য লিখেছেন? শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে সেশনজট নামক অভিশপ্ত বিষয়টি দূর করার জন্য কঠোর ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ কি নিয়েছেন? নোংরা, ধ্বংসাত্মক, দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতি বন্ধের কি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ কেউ নিয়েছেন? যে দেশ তার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েদের ভালো রাখার চেষ্টা করে, তাদের দুঃখ কান পেতে শোনে, সে দেশ। নীরোগ থাকে। সে দেশ রক্ষার জন্য বিদেশ থেকে সহস্র কোটি টাকার অস্ত্র কিনতে হয় না। প্রতিটি তরুণ প্রতিরক্ষার একেকা বারুদ হয়ে যায়!

সকল অধ্যায়
১.
একটি সাবমেরিন বনাম পাঁচ হাজার জানালা
২.
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাসটুকু শুনুন
৩.
চিত্ত যেথা ভয়যুক্ত, নিচু যেথা শির
৪.
একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়
৫.
কোটা নাকি মেধা? জন্ম নাকি কর্ম?
৬.
কর্মে হোক জন্ম জয়
৭.
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষ্পাপ প্রাণগুলো
৮.
দেশটা যেভাবে হেরে যায়
৯.
সজাগ হও, হে তারুণ্য!
১০.
সেশনজটে ক্ষয়ে যায় সমাজ
১১.
থেমে থেকো না
১২.
সম্ভাবনাকে জাগতে দিন
১৩.
উন্নত সমাজের মূলমন্ত্র
১৪.
লক্ষ্য হোক দক্ষতা অর্জন
১৫.
কোথায় ছুড়ছ তোমার সোনালি যৌবন?
১৬.
দয়া করে ওদের ঠকাবেন না
১৭.
বাংলাদেশ কি মেধাবীদের ফিরিয়ে নেবে?
১৮.
নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ
১৯.
সহজাত মেধা যেন ক্ষয়ে না যায়
২০.
মগজের ধ্বংসযজ্ঞ
২১.
দাঁড়াতে হলে শিখতে হয়
২২.
প্যারালাইজড মাইন্ড!
২৩.
সম্ভাবনা খুন হয়ে যায়
২৪.
অন্তরে বাহিরে দাসত্বের রজ্জু
২৫.
মেধাবীদের কত দিন দূরে রাখবে সমাজ?
২৬.
ব্রেইন ড্রেইন নাকি ব্রেইন গেইন?
২৭.
শিক্ষার আলোয় জাগুক স্বদেশ
২৮.
সম্ভাবনার দুয়ারে আছ দাঁড়িয়ে
২৯.
আলোকিত সমাজের মূলমন্ত্র
৩০.
দ্য রাইট পারসন
৩১.
নিজেকে আবিষ্কার করো
৩২.
সত্যিকারের নায়ক
৩৩.
যা আছে তা-ই দিয়ে করো সংগ্রাম
৩৪.
চুরি বিদ্যা ও বিদ্যা চুরি
৩৫.
অনন্য, অপ্রতিরোধ্য দক্ষিণ কোরিয়া
৩৬.
একটা বিপ্লব হচ্ছে নীরবে
৩৭.
জাগরণের কাল
৩৮.
একজন ভিসি ও দীর্ঘশ্বাস
৩৯.
কিশোর-কিশোরীর জ্ঞানানন্দ
৪০.
ভারত কেন পারছে?
৪১.
জাপান থেকে শেখো
৪২.
অধিকারবঞ্চিত হতভাগ্য শিক্ষার্থীরা
৪৩.
স্ট্যানফোর্ডের আকাশ
৪৪.
প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়
৪৫.
ডিজিটাল ইগনোরেন্স
৪৬.
প্রিয় অভিভাবকগণ, একটু শুনুন
৪৭.
মাত্র এক শ কোটি টাকা
৪৮.
ফড়িংয়ের চোখ তৈরি করো
৪৯.
ছোট দেশের বড় স্বপ্ন
৫০.
মনিরুল ইসলামেরা কেন ফিরতে পারেন না?
৫১.
ড্রাইভিং ফোর্স
৫২.
অন্তরালের নায়ক
৫৩.
উদ্ভাবনে আমরা কেন পিছিয়ে?
৫৪.
আত্মঘাতী নীতিমালা
৫৫.
এমন যদি হতো
৫৬.
চারিত্রিক সনদ
৫৭.
চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি
৫৮.
আত্মহনন কোরো না হে প্রাণ
৫৯.
আমাদের সম্ভাবনাময়ী মেয়েরা
৬০.
উপাচার্যদের উপাচার্য
৬১.
কেমন হয় একটা বিশ্ববিদ্যালয়?
৬২.
হৃত কৌতূহলী মগজ
৬৩.
জিনিয়াস মাইন্ড

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%