জাপান থেকে শেখো

করেচিকা আনামি ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের জেনারেল। জাদরেল লোক। উগ্র জাতীয়তাবাদের তীব্র বিষে আক্রান্ত ছিলেন। হিরোশিমায় বোমা নিক্ষেপের পরও আনামি বলেছিলেন, আমি নিশ্চিত, আমেরিকার কাছে শুধু একটি বোমই আছে। হিরোশিমায় আঘাতের পর হার মানলে হয়তো নাগাসাকি ধ্বংস হতো না।

১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট। জেনারেল করেচিকা আনামি আত্মহত্যা করলেন। চিরকুটে লিখে গেলেন, আমার আত্মহননের মধ্য দিয়ে এই সাম্রাজ্যের কাছে ক্ষমা চেয়ে গেলাম। তার মৃতদেহের পাশে পড়ে ছিল অসংখ্য জাপানির মৃতদেহ। ধ্বংস হয়ে যাওয়া দুটি শহর–হিরোশিমা ও নাগাসাকি। মানবসভ্যতার ইতিহাসে জাপান ছাড়া কোন দেশ এত স্বল্প সময়ে, এত ক্ষতির। শিকার হয়নি।

জাপান ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করল। শত্রু-শত্রু খেলা বন্ধ করল। শত্রুর কাছ থেকেও শেখার জন্য এতটুকু কুণ্ঠাবোধ করল না। বিশ্বযুদ্ধের পর গবেষণায় আরও বেশি মনোযোগ দিল জাপান। যে দেশটি তাদের দুটি শহর ধ্বংস করেছিল, সে দেশটি থেকে আরও বেশি জ্ঞান-বিজ্ঞান নিতে শুরু করল। এত বড় একটা যুদ্ধের পরও জাপান থেকে প্রচুর মেধাবী ছেলে-মেয়ে আমেরিকায় আসতে লাগল। এখনো আসে। জাপানের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষায় বিলেত গমন বলতে আমেরিকাকেই বোঝে।

এর ফলাফলটা কী হয়েছে? গত চার দশকে ওরা বিজ্ঞানে নোবেল নিয়েছে প্রায় কুড়িটি। তবে বিষয়টা শুধু নোবেল দিস সীমাবদ্ধ নয়। মৌলিক আবিষ্কার-উদ্ভাবনে একটা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। কত দূর চলে যেতে পারে, সেটার অদ্বিতীয় উদাহরণ জাপান। গবেষণার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ফলাফলের কারণে সে দেশের। মানুষের গড় আয়ু এখন সবচেয়ে বেশি। ৮০-৯০ বছর বয়সের মানুষ ওদের রাস্তায় হরহামেশা ঘুরে বেড়ান। তাঁরা ভালো খান, ভালোভাবে বাঁচেন। বেঁচে থাকে জীবনানন্দ নিয়ে! শিক্ষা ও গবেষণা দিয়ে তারা অসম্ভব স্বাবলম্বী জাতি আজ। গড় আয় ও আয়ু বেশি। বেকারত্ব কমিয়েছে। দুর্নীতি কম। অপরাধ কম। জাপানের বহু কারাগার বন্ধ হয়ে গেছে।

জাপান হলো কতশত দ্বীপ-উপদ্বীপের একটি দেশ। সুনামি ভূমিকম্পপ্রবণ একটি দেশ। প্রকৃতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একটা ক্ষুদ্র জাতি কী করে এত উন্নত হয়, তার একমাত্র উদাহরণ জাপান। যারা হাত ও মাথা ব্যবহার করতে জানে, তাদের শুধু আকাশের দিকে হাত তুলে রাখতে হয় না।

প্রিয় বাংলাদেশ, জাপান থেকে শেখো।

(পুনশ্চ : আমাদের একজন সাবেক উপাচার্য একদিন ঘোষণা দিলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার আদান-প্রদানের হাজার বছরের সংস্কৃতিতে এত সংকীর্ণচেতা একটি ঘোষণা কোনো দেশের প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দিতে পারে, আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। তিনি বলতে পারতেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় পাকিস্তানের কোনো রাজনৈতিক বা সামরিক নেতৃত্বের উপস্থিতি নিষিদ্ধ। সেটা হতো অনেক যুক্তিযুক্ত।

যদি যুদ্ধের শত্রুতায় শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আদান-প্রদান বন্ধ থাকত, তাহলে চীন-জাপান সেটা করত বহু আগে। জাপান-আমেরিকা সেটা করত। ব্রিটিশদের সঙ্গে ভারত করত। ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সব শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকত! দুনিয়ায় অস্ত্র যেখানে শত্রুতা তৈরি করেছে, জ্ঞান সেখানে। বন্ধুত্বের জানালা খুলে দিয়েছে। আমাদের চোখ থাকলে দেখতে অসুবিধা হতো না।)

সকল অধ্যায়
১.
একটি সাবমেরিন বনাম পাঁচ হাজার জানালা
২.
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাসটুকু শুনুন
৩.
চিত্ত যেথা ভয়যুক্ত, নিচু যেথা শির
৪.
একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়
৫.
কোটা নাকি মেধা? জন্ম নাকি কর্ম?
৬.
কর্মে হোক জন্ম জয়
৭.
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষ্পাপ প্রাণগুলো
৮.
দেশটা যেভাবে হেরে যায়
৯.
সজাগ হও, হে তারুণ্য!
১০.
সেশনজটে ক্ষয়ে যায় সমাজ
১১.
থেমে থেকো না
১২.
সম্ভাবনাকে জাগতে দিন
১৩.
উন্নত সমাজের মূলমন্ত্র
১৪.
লক্ষ্য হোক দক্ষতা অর্জন
১৫.
কোথায় ছুড়ছ তোমার সোনালি যৌবন?
১৬.
দয়া করে ওদের ঠকাবেন না
১৭.
বাংলাদেশ কি মেধাবীদের ফিরিয়ে নেবে?
১৮.
নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ
১৯.
সহজাত মেধা যেন ক্ষয়ে না যায়
২০.
মগজের ধ্বংসযজ্ঞ
২১.
দাঁড়াতে হলে শিখতে হয়
২২.
প্যারালাইজড মাইন্ড!
২৩.
সম্ভাবনা খুন হয়ে যায়
২৪.
অন্তরে বাহিরে দাসত্বের রজ্জু
২৫.
মেধাবীদের কত দিন দূরে রাখবে সমাজ?
২৬.
ব্রেইন ড্রেইন নাকি ব্রেইন গেইন?
২৭.
শিক্ষার আলোয় জাগুক স্বদেশ
২৮.
সম্ভাবনার দুয়ারে আছ দাঁড়িয়ে
২৯.
আলোকিত সমাজের মূলমন্ত্র
৩০.
দ্য রাইট পারসন
৩১.
নিজেকে আবিষ্কার করো
৩২.
সত্যিকারের নায়ক
৩৩.
যা আছে তা-ই দিয়ে করো সংগ্রাম
৩৪.
চুরি বিদ্যা ও বিদ্যা চুরি
৩৫.
অনন্য, অপ্রতিরোধ্য দক্ষিণ কোরিয়া
৩৬.
একটা বিপ্লব হচ্ছে নীরবে
৩৭.
জাগরণের কাল
৩৮.
একজন ভিসি ও দীর্ঘশ্বাস
৩৯.
কিশোর-কিশোরীর জ্ঞানানন্দ
৪০.
ভারত কেন পারছে?
৪১.
জাপান থেকে শেখো
৪২.
অধিকারবঞ্চিত হতভাগ্য শিক্ষার্থীরা
৪৩.
স্ট্যানফোর্ডের আকাশ
৪৪.
প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়
৪৫.
ডিজিটাল ইগনোরেন্স
৪৬.
প্রিয় অভিভাবকগণ, একটু শুনুন
৪৭.
মাত্র এক শ কোটি টাকা
৪৮.
ফড়িংয়ের চোখ তৈরি করো
৪৯.
ছোট দেশের বড় স্বপ্ন
৫০.
মনিরুল ইসলামেরা কেন ফিরতে পারেন না?
৫১.
ড্রাইভিং ফোর্স
৫২.
অন্তরালের নায়ক
৫৩.
উদ্ভাবনে আমরা কেন পিছিয়ে?
৫৪.
আত্মঘাতী নীতিমালা
৫৫.
এমন যদি হতো
৫৬.
চারিত্রিক সনদ
৫৭.
চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি
৫৮.
আত্মহনন কোরো না হে প্রাণ
৫৯.
আমাদের সম্ভাবনাময়ী মেয়েরা
৬০.
উপাচার্যদের উপাচার্য
৬১.
কেমন হয় একটা বিশ্ববিদ্যালয়?
৬২.
হৃত কৌতূহলী মগজ
৬৩.
জিনিয়াস মাইন্ড

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%