একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়

একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়

ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়ায় (UPenn) আমার। ল্যাবরেটরি সপ্তাহের সাত দিনই খোলা থাকত। পিএইচডি, পোস্টডক গবেষকদের কাছে চাবি থাকে। যার যখন ইচ্ছা তখনই গিয়ে কাজ শুরু করে দেন। দুনিয়ায় একেকজন মানুষ একেক সময় প্রডাক্টিভ। কেউ ভোরবেলায় পড়ে। কেউ পড়ে ভরদুপুরে। কেউ আবার মাঝরাত ছাড়া পড়তে পারে না। গবেষণার বিষয়টাও এমন। তাই দিন-রাত সবসময় সেখানে প্রবেশাধিকার থাকতে হয়। আমার ল্যাবে কয়েকজন কাজপাগল তরুণ ছিলেন। তারা কখন ঘুমাতেন আমি জানি না। ক্লান্তি ওঁদের স্পর্শ করে না। একটা ছেলে রীতিমতো ল্যাবরেটরিকে ঘর বানিয়েছেন। কাজ ছাড়া, তার কোনো কাজ নেই। তিনি ছিলেন পোস্টডক গবেষক। আমেরিকান ছেলে। বয়স ২৮। যথারীতি তার ৩৫-এর ওপর বৈজ্ঞানিক আর্টিকেল (Scientific Article) আছে।

একজন পিএইচডি স্টুডেন্ট আছেন, যিনি লাঞ্চের পর ল্যাবে আসেন। এই ছেলেটা কাজ করবেন রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্ত। কখনো কখনো সে ল্যাবের করিডোরে ঘুমান। সকালে গিয়ে আমরা তাকে ডেকে দিই। আমার প্রফেসর তাঁকে অসম্ভব পছন্দ করেন। কারণ ছেলেটা তুখোড় ছাত্র। তাঁর জীবনের প্রথম পাবলিকেশন করেছেন তিনি সায়েন্স (Science) জার্নালে। এসব মেধাবী ও কর্মপাগল মানুষদের সান্নিধ্যে থাকা অত্যন্ত জরুরি। এদের সান্নিধ্যে থাকলে আপনার ভেতর ঘুমিয়ে থাকা স্বপ্নগুলো জেগে যাবে। স্বপ্নরা তাড়া দেবে। এমন মানুষদের সঙ্গে থেকে নিজের ভেতরের সম্ভাবনাকে বের করা যায়।

যা-ই হোক, আমেরিকার অন্য ল্যাবগুলোও এমনই। দিন-রাত খোলা থাকে। ইউরোপেও তা-ই। যদিও সেখানে কাজের সংস্কৃতি কিছুটা ভিন্ন। স্টকহোমে থাকাকালীন যখন-তখন ল্যাবে গিয়ে কাজ করতে পারতাম। ক্যাম্পাস ছিল অভয়ারণ্য। চীন-জাপানেও দিন-রাত কাজ হচ্ছে। এই দেশগুলো কাজের পরিবেশ তৈরি করে

তরুণদের ব্যস্ত রাখে। সেসব তরুণদের মধ্য থেকে কর্মপাগল। (Workaholic) মানুষ তৈরি করা হয়। আর সেসব মানুষ সমাজকে বদলে দেয়। সমাজের তরুণেরা যখন উদ্ভাবন-সৃষ্টির নেশায় দিন-রাত কাজ করেন, সেটা আশীর্বাদ হয়ে আসে। যে। সমাজের তরুণেরা যত কম বয়সে সৃষ্টির নেশায় বুঁদ হয়ে থাকেন, সে সমাজ ততই শক্তিশালী হয়।

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে হয়ে থাকে। চামচিকারা কিচকিচ করে। আমারা ভূতের ভয়ে ছাত্র-শিক্ষক মিলে বাড়িতে গিয়ে বসে থাকি। ভূতের আছর থেকে বেঁচে গিয়ে আমরা দেশ নিয়ে বড় বড় স্বপ্ন দেখি। কিন্তু আমরা কি কখনো গভীরভাবে ভাবি যে একটা দেশকে দাঁড় করাতে হলে কী দরকার! যেদিন বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াবে সেদিন কি ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা চীন-জাপান বসে থাকবে? যেদিন আমরা মহাকাশে যান পাঠাব, সেদিন এসব দেশ মহাকাশ দখল। করে বসে থাকবে। যেদিন আমরা একটা ড্রাগ বানাব, সেদিন এরা ডিএনএর গঠন পরিবর্তন করে জন্মনিয়ন্ত্রণ করবে, যেন মানুষ নীরোগ হয় (কথাটা গল্পের মতো শোনালেও, বাস্তবেই গবেষকেরা এগুলো নিয়ে কাজ করছেন)।

আমাদের বিদ্যালয়গুলো বছরের এক-তৃতীয়াংশ সময় বন্ধ থাকে। প্রচুর সরকারি ছুটি থাকে। সঙ্গে হরতাল, মারামারি ধরাধরি, ধর্মঘট, অবরোধ, আন্দোলন, ভিসি হটানোর জন্য ক্লাস। বণ। তার সঙ্গে নগরডুবি, যানজট। বেশির ভাগ ইউনিভার্সিটিতে নেই আধুনিক ল্যাব। আছেন গবেষণার অভিজ্ঞাতাহীন শিক্ষক! আছে শিক্ষকের অপ্রতুলতা। তাহলে মেধবী ও কর্মপাগল মানুষ তৈরি হবে কী করে? তদুপরি আছে শিক্ষার্থীদের আর্থিক টানাপোড়েন। দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছেলেমেয়েগুলো টিউশনি করে জীবনের সর্বোৎকৃষ্ট সময় নষ্ট করেন। টাকার জন্য এই কাজটা তারা নিরুপায় হয়ে করেন। দুই টাকার জন্য জীবনের দশ টাকার সময় নষ্ট করতে হয়। তাদের। এই সময়টুকু কি রাষ্ট্র কাজে লাগাতে পারত না?

একবার ভাবুন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কতগুলো। ল্যাবরেটরি তৈরি করা হয়েছে। মেধাবী ও যোগ্য গবেষকদের সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ল্যাবগুলো দিন-রাত খোলা। সেগুলোতে কাজ করছেন কুড়ি থেকে ত্রিশ বছরের তরুণ ছেলেমেয়েরা। সরকার তাদেরকে গবেষণাকর্মের বিনিময়ে আর্থিক সাপোর্ট দিচ্ছে। টিউশনি করে তাদের আর সময় নষ্ট করতে হচ্ছে না। ল্যাবগুলোর সঙ্গে আছে ক্যাফেটেরিয়া। মানসম্পন্ন খাবার আছে সেখানে। ওঁরা সেখানে খাবেন। কাজ করে ক্লান্ত হয়ে আড্ডা দেবেন। পার্টি করবেন। ঘুম পেলে। সেখানেই ঘুমিয়ে নেবেন। তারপর আবার হাসতে হাসতে, গাইতে গাইতে কাজ করতে থাকবেন–আমাদের দেশের জন্য এগুলো স্বপ্নের মতো শোনালেও এমন পরিবেশেই সারা দুনিয়ার ছেলেমেয়েরা কাজ করছেন। দেশ তাঁর তরুণদের জন্য গবেষণার পরিবেশ তৈরি করে দিচ্ছে। তরুণেরা দেশের জন্য দিচ্ছেন সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম। আমরা যদি এমন পরিবেশ তৈরি করে দিই তাহলে দেশকে নিয়ে আর ভাবতে হবে না। দেশ দাঁড়াবে তার আপন গতিতে, স্বমহিমায়।

সকল অধ্যায়
১.
একটি সাবমেরিন বনাম পাঁচ হাজার জানালা
২.
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘশ্বাসটুকু শুনুন
৩.
চিত্ত যেথা ভয়যুক্ত, নিচু যেথা শির
৪.
একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়
৫.
কোটা নাকি মেধা? জন্ম নাকি কর্ম?
৬.
কর্মে হোক জন্ম জয়
৭.
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিষ্পাপ প্রাণগুলো
৮.
দেশটা যেভাবে হেরে যায়
৯.
সজাগ হও, হে তারুণ্য!
১০.
সেশনজটে ক্ষয়ে যায় সমাজ
১১.
থেমে থেকো না
১২.
সম্ভাবনাকে জাগতে দিন
১৩.
উন্নত সমাজের মূলমন্ত্র
১৪.
লক্ষ্য হোক দক্ষতা অর্জন
১৫.
কোথায় ছুড়ছ তোমার সোনালি যৌবন?
১৬.
দয়া করে ওদের ঠকাবেন না
১৭.
বাংলাদেশ কি মেধাবীদের ফিরিয়ে নেবে?
১৮.
নেতায় নেতাচ্ছন্ন এক দেশ
১৯.
সহজাত মেধা যেন ক্ষয়ে না যায়
২০.
মগজের ধ্বংসযজ্ঞ
২১.
দাঁড়াতে হলে শিখতে হয়
২২.
প্যারালাইজড মাইন্ড!
২৩.
সম্ভাবনা খুন হয়ে যায়
২৪.
অন্তরে বাহিরে দাসত্বের রজ্জু
২৫.
মেধাবীদের কত দিন দূরে রাখবে সমাজ?
২৬.
ব্রেইন ড্রেইন নাকি ব্রেইন গেইন?
২৭.
শিক্ষার আলোয় জাগুক স্বদেশ
২৮.
সম্ভাবনার দুয়ারে আছ দাঁড়িয়ে
২৯.
আলোকিত সমাজের মূলমন্ত্র
৩০.
দ্য রাইট পারসন
৩১.
নিজেকে আবিষ্কার করো
৩২.
সত্যিকারের নায়ক
৩৩.
যা আছে তা-ই দিয়ে করো সংগ্রাম
৩৪.
চুরি বিদ্যা ও বিদ্যা চুরি
৩৫.
অনন্য, অপ্রতিরোধ্য দক্ষিণ কোরিয়া
৩৬.
একটা বিপ্লব হচ্ছে নীরবে
৩৭.
জাগরণের কাল
৩৮.
একজন ভিসি ও দীর্ঘশ্বাস
৩৯.
কিশোর-কিশোরীর জ্ঞানানন্দ
৪০.
ভারত কেন পারছে?
৪১.
জাপান থেকে শেখো
৪২.
অধিকারবঞ্চিত হতভাগ্য শিক্ষার্থীরা
৪৩.
স্ট্যানফোর্ডের আকাশ
৪৪.
প্রস্তুতির শ্রেষ্ঠ সময়
৪৫.
ডিজিটাল ইগনোরেন্স
৪৬.
প্রিয় অভিভাবকগণ, একটু শুনুন
৪৭.
মাত্র এক শ কোটি টাকা
৪৮.
ফড়িংয়ের চোখ তৈরি করো
৪৯.
ছোট দেশের বড় স্বপ্ন
৫০.
মনিরুল ইসলামেরা কেন ফিরতে পারেন না?
৫১.
ড্রাইভিং ফোর্স
৫২.
অন্তরালের নায়ক
৫৩.
উদ্ভাবনে আমরা কেন পিছিয়ে?
৫৪.
আত্মঘাতী নীতিমালা
৫৫.
এমন যদি হতো
৫৬.
চারিত্রিক সনদ
৫৭.
চাপিয়ে দেওয়ার সংস্কৃতি
৫৮.
আত্মহনন কোরো না হে প্রাণ
৫৯.
আমাদের সম্ভাবনাময়ী মেয়েরা
৬০.
উপাচার্যদের উপাচার্য
৬১.
কেমন হয় একটা বিশ্ববিদ্যালয়?
৬২.
হৃত কৌতূহলী মগজ
৬৩.
জিনিয়াস মাইন্ড

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%