মানভঞ্জন

সৈকত মুখোপাধ্যায়

শুনলাম অমলকান্তিকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে—রেপ কেসে। শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। অমলকান্তি! সেই নম্র, লাজুক, গানপাগল, আমাদের অনার্স ক্লাসের ফার্স্ট বয় অমল! সে করেছে রেপ? হতেই পারে না। ও যে সুন্দরী মেয়েদের বাঘের মতন ভয় পায়।

আমাদের কলেজ যাওয়ার শর্টকাট রাস্তাটা 'স্মৃতিকণা বালিকা বিদ্যালয়'-এর সামনে দিয়ে গেছে। বালিকা বিদ্যালয়ের সব ছাত্রীই তো আর 'বালিকা' হয় না। সুখের কথা, উঁচু ক্লাসের অনেককে, এমনকী তরুণীও বলা চলে। তাই অমলকান্তি কিছুতেই ও পথে কলেজ যাবে না। একা একা সেই কাজিপাড়া দিয়ে ঘুরে যাবে। বলে ওই খিলখিল্লির মুল্লুকে গেলে ওর নাকি শরীর খুব দুর্বল লাগে।

কিন্তু, এই অমলকান্তিই আবার আত্রেয়ীর প্রেমে পাগল। এবং অমলের বাল্যবন্ধু হিসেবে আমি জানি—সে ভালোবাসায় কোনও খাদ নেই। শুধু, বেচারা আজ অবধি সেকথা আত্রেয়ীকে বলে উঠতে পারল না। ওই একই সমস্যা—আত্রেয়ীর সামনে গেলে তার পা কাঁপে, গলা শুকিয়ে যায়।

অমলের বোন ঊর্মির সহপাঠিনী আত্রেয়ী। ঊর্মি কতবার বলেছে, 'দাদামণি, আত্রেয়ী কিন্তু তোর জন্যে বলিপ্রদত্তা। দেখিস না, সপ্তাহে চারবার আমার কাছে বাংলার নোটস নিতে আসছে? যত নোটস নিচ্ছে ততই নম্বর কমছে।'

অমলটা এমন বোকা, নিজে না পারিস ঊর্মিকেই বল, 'আমারও অবস্থা তথৈবচ।' তাও পারে না।

কিন্তু বড় বিচ্ছিরি কাণ্ড হয়ে গেল এই দুদিন আগে। অমল বিকেলবেলা ছাদে পায়চারি করছিল। আত্রেয়ী এসেছিল ঊর্মির খোঁজে। কিন্তু ঊর্মি বাড়ি ছিল না। মরিয়া আত্রেয়ী সোজা ছাদে উঠে এসেছিল। সিঁড়ির দরজা থেকেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলেছিল, 'আমি আর টেনশন নিতে পারছি না। বলো না অমলদা, তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না।'

অমল একবার মাত্র ঘাড় ফিরিয়ে দেখেছিল—আত্রেয়ী সিঁড়ির দরজা আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তারপরেই সে বিনা বাক্যব্যয়ে, স্তম্ভিত আত্রেয়ীর চোখের সামনে দিয়ে রেন-ওয়াটার পাইপ বেয়ে রাস্তায় নেমে আসে, এবং 'দোষ কারো নয় গো মা, আমি স্বখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা' গাইতে গাইতে স্টেশনের দিকে হাঁটা লাগায়।

এ হেন অমলকান্তি রেপ কেসে জড়িয়ে পড়েছে শুনে আমি আধবেলা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। তারপর বিকেলের দিকে হাঁটতে হাঁটতে থানার দিকে গেলাম, ওর সঙ্গে দেখা করতে।

থানার বড়বাবু জটাদা। আমার জামাইবাবুর বন্ধু। আমাকে দেখেই বললেন, 'তোমার বন্ধুটি একটি জিনিস।'

আমি মাথা নীচু করে জিগ্যেস করলাম, 'কাকে করেছে?'

—কী করেছে?

—ওই ইয়ে?

—আরে ধুর, ওই বলদায় করবে বলাৎকার? রোগাপটকা ছেলে, একা একা ওসব পারে? বাড়ির লোকে বলছে 'অ্যাটেমপড রেপ'। আমার বিশ্বাস হয় না। রেপিস্টরা অত অনুশোচনায় ভোগে না। তোমার বন্ধু তো কেবলই কপাল চাপড়াচ্ছে।

আমি আবার জিগ্যেস করলাম, 'মেয়েটা কে?'

—আত্রেয়ী। ওর বোনের বন্ধু। শুনলাম তো ভালোই আলাপ ছিল। দ্যাখো না, মেয়েটা যদি চার্জ তুলে নেয়, তাহলে আমাকেও আর কেস দিতে হয় না।

জটাদার কথা শুনে সব কিছু আরও ঘুলিয়ে গেল। বললাম, 'তাহলে আগে অমলকান্তির সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে হত। কী হয়েছিল না জানলে তো...'

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, যাও না। লক-আপ থেকে বার করে দিচ্ছি। পিছনের বারান্দায় বসে পুছতাছ করো। দ্যাখো কিছু বার করতে পারো কি না।

বসলাম গিয়ে বারান্দায় রাখা একটা বেঞ্চের ওপর। অমলকান্তিও এল একটু পরেই ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল ওই ধর্ষিত হয়েছে। সারা গায়ে আঁচড়ের দাগ, নাকটা ফোলা, কপালে আলু। কিন্তু সব থেকে অবাক লাগল যা দেখে, তা হল, ওর দাঁতগুলো সবুজ, আর হাতপায়ের পাতা সাদা। জিগ্যেস করলাম, 'দাঁতে কী মেখেছিস রে?'

—মশা তাড়াবার ক্রিম।

—আর হাত-পায়ে?

—দাঁতের মাজন। মনের যা অবস্থা, কোনটা যে কীসের টিউব কেবলই গুলিয়ে যাচ্ছে!

—তোকে মারল কে এমন করে, পুলিশ?

—না:, আত্রেয়ী। মেয়েদের গায়ে যে এত জোর থাকে জানতাম না।

—একটু ধৈর্য ধরতে পারলি না? যে-জিনিস আপনিই পেতিস, তা কেন কেড়ে নিতে গেলি?

—তুই আমাকে এই কথা বললি, সুকু! জানিস না আমি প্লেটোর ভাবশিষ্য?

—চারদিকে যা খুল্লাম-খুল্লা চলছে রে অমল, প্লুটোর মতন প্লেটোও বামন হয়ে গেছেন। তোরও তো রক্ত-মাংসের শরীর। তবে আত্রেয়ী তো খুব সাত্বিক প্রকৃতির মেয়ে। ওকে তোর অমন করাটা...

সঙ্গে সঙ্গে অমল আমার হাত চেপে ধরে বলল, 'অমন বলিস না ভাই। জানিস তো, আমি বাধ্য হয়েই বৈরাগী। ফিমেল-ফোবিয়া আছে। বুকের মধ্যে প্রেমের তুফান, অথচ কাউকে কিছু বলতে পারি না। গলা শুকিয়ে যায়, হাত-পা ঠান্ডা। একজন হোমিওপ্যাথের শরণাপন্ন হলাম। তিনি বললেন, সেঁকো বিষ, মানে আর্সেনিকের লক্ষণ। খেয়ে দেখুন আর্সেনিক-থার্টি, চার ডোজ। কোথায় কী? উলটে সাইড এফেক্টেই বোধহয় ঘাড়ে একজিমা হয়ে গেল।'

একটা-দুটো তারা ফুটেছিল আকাশে। সেই দিকে তাকিয়ে অমলকান্তি বলে যেতে লাগল, 'জীবনে এই একবারই, বুঝলি সুকু, সাহস সঞ্চয় করে, না না, সাহস তো জুগিয়েছিল সেই চিটিংবাজ লোকটা—তারই দেওয়া আশার ছলনে ভুলি—একটা মেয়েকে আমার হৃদয় উন্মুক্ত করে দেখাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু, কী ফল লভিনু হায়। হায়-হায়-হায়-হায়-হায়!'

সেদিন রেন পাইপ বেয়ে নামতে নামতে একপলক আত্রেয়ীর মুখটা দেখতে পেয়েছিলাম। সেই ব্যথিত-বিস্ময় ভরা চোখ কিছুতেই ভুলতে পারছিলাম না। আত্মধিক্কারে ভরে উঠেছিল আমার মন—একটি কিশোরীর প্রেমের প্রথম মুকুল এইভাবে পায়ে দলে এলাম! অথচ অন্তর্যামী জানেন, আত্রেয়ীর সেই প্রশ্নের উত্তরে যদি সারা জীবন ধরে বলে যাই, হ্যাঁ, আত্রেয়ী হ্যাঁ, তোমাকে ভালোবাসি, তোমাকেই—তাহলেও আমার তৃপ্তি হয় না। তা হলে কেন পারি না বলতে? কেন মাথা অমন গুবলেট হয়ে যায়। উলটোপালটা কাজ করে বসি?

প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে বসে এইসব সাতপাঁচ ভাবতে-ভাবতে খেয়ালই করিনি কখন সন্ধে নেমে গেছে, হালকা হয়ে গেছে অফিসের ফিরতি যাত্রীদের ভিড়। খেয়ালই করিনি কখন সেই লোকটা আমার পাশে এসে বসেছে। হঠাৎ তারই প্রশ্নে আমার ঘোর ভাঙল—ভাইটি কি ব্যর্থ প্রেমিক?

রেগে-মেগে চুপ করে রইলাম। জবাব দিলাম না। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে লোকটি আবার প্রশ্ন করল, ভাইটি বুঝি ব্যর্থ প্রেমিক?

এই অবস্থায় যা বলা স্বাভাবিক, তাই-ই বললাম। কেমন করে বুঝলেন? আপনি কি অন্তর্যামী?

—তা তো বটেই। তবে তোমার মতন সরু অন্তরে ঘোরাফেরা করতে খুব কষ্ট হয়। আর তার দরকারই বা কী? যেভাবে খানদশেক ঝরা শিরীষ ফুল চিবিয়ে খেয়ে ফেললে, তাতেই বোঝা যাচ্ছে সমস্যা খুব গভীর। প্রথম প্রথম মথুরায় গিয়ে আমিও রাধিকার শোকে অমন কত কদমফুল অন্যমনস্কভাবে খেয়ে ফেলেছি। তাইতে ব্লাড-সুগার কমতে কমতে তেরোয় গিয়ে ঠেকেছিল। সবসময় মাথা ঘুরত।

ভালো করে ভদ্রলোকের মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম। শ্যামবর্ণ, কোঁকড়া চুল, টিকোলো নাক, ঠোটের কোণে দুষ্টু হাসি, আর চোখে হিরেকুচির ঝিলিক। শুধু হাতে আড়বাঁশিটির বদলে একটা ছোট অ্যাটাচি, আর পরনে পীতধড়ার বদলে সাদা ধুতি আর আকাশি খদ্দরের পাঞ্জাবি। এবার আমারই মাথাটা কেমন যেন ঘুরে গেল। ততক্ষণে প্ল্যাটফর্মের পূর্ব দিকে সোনার থালার মতন চাঁদ উঠেছে। শিরীষ ফুলের গন্ধে ভারী হয়ে আছে বাতাস। দূরে কোথায় যেন আরতি শুরু হল। দখিনা হাওয়ায় কাঁসর-ঘণ্টার শব্দ এক-একবার খুব কাছে এগিয়ে আসছে, আবার দূরে সরে যাচ্ছে। কোনও রকমে প্রশ্ন করলাম, আপনার নামটা, স্যার?

—আমার আবার একশো আটটা নাম। ছোটরা জিগ্যেস করলে বলি মধুসূদনদাদা, কিন্তু বুড়োরা আবার পতিতপাবনই পছন্দ করে। তোমার যা চরিত্র তাতে রমণীমোহন নামটাই তোমার পক্ষে মনে রাখা সহজ হবে। সংক্ষেপে মোহনদা বলে ডাকতে পারো।

পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে বললাম, কল্কি মহারাজের কি আসার পথে কোনও বাধা পড়ে গেল ঠাকুর, হঠাৎ করে আপনি আবার দ্বিতীয়বার চলে এলেন যে?

—আহা, কল্কি তো আসছেই। দু-পাঁচশো বছর দেরি আছে বোধহয়। ভাবলাম তার মধ্যে ব্যভিচারের স্রোত থেকে সনাতন প্রেমকে একটু পুন:প্রতিষ্ঠিত করে দিয়ে যাই। কেন, ক'দিন আগেই ছাতা নিয়ে ছোঁড়াছুঁড়িদের পার্কে ঢোকা নিষেধ করে দিয়েছে দেখিসনি? 'অভ্যুত্থানম অধর্মস্য' ঠেকানো কি মুখের কথা?

মুগ্ধ হয়ে মোহনদার মুখের দিকে তাকিয়েছিলাম। উনি অল্প একটু হেসে বললেন, ব্যক্তি দিয়েই সমাজ তৈরি হয়। তাই সমাজকে বদলাতে গেলে গুণান্বিত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে হয়, তাদের শ্রীবৃদ্ধি ঘটাতে হয়। যেমন কুরুক্ষেত্রে অর্জুন, কিংবা ধরো হালিশহরের হরিদাস মাল।

লজ্জিত হয়ে বললাম, দ্বিতীয়জনকে তো চিনতে পারলাম না প্রভু।

—হালিশহরের হরিদাস মাল পরম প্রেমিক। খাঁটি আধার। বছরখানেক আগে সে মনের দু:খে সন্ন্যাসী হতে যাচ্ছিল। রাতে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বললাম, তোমার কীসের দু:খ হরিদাস। এত বড় পৈতৃক পাটের ব্যবসা ফেলে সন্ন্যাসী হবে কেন?

হরিদাস বলল, প্রভু, আপনি তো সবই জানেন। যৌথ-পরিবারের ছোট মেয়ে নীপবীথির প্রেমে পড়েছি। মনে মনে তার নাম রেখেছি 'দুর্গেশনন্দিনী'। বাড়ি তো নয়, দুর্গ! চৌকাঠ পেরোলেই তিরিশজন মহিলা-পুরুষ রে-রে করে তেড়ে আসে।

বাড়ির বাইরে যে দেখা করব—সে আশাতেও চিটেগুড়। সারাক্ষণ নীপুর গায়ে সেঁটে থাকে তারা নামে একটি মেয়েছেলে। চেহারা আর মেজাজ দেখলে মনে হয় গতজন্মে সে বোধহয় রাবণের অশোককাননে সীতাকে পাহারা দেওয়ার ডিউটি পেয়েছিল। এ জন্মে স্বামী পরিত্যক্তা। এমন ভয়ংকর পুরুষ-বিদ্বেষিণী কখনও দেখিনি। হুলোবেড়াল দেখলেও চটি ছুড়ে মারে।

—ও হো হো, এ তো সত্যিই ভারি সমস্যা। আচ্ছা বাড়িতে অকাজের লোক কেউ আছে নাকি?

—একজনকে তো দরজা পেরোলেই দেখতে পাবেন—নীপবীথির জ্যাঠামশাই, রিটায়ার্ড অধ্যাপক। বাংলা ছড়ার ওপর পাশ্চাত্য প্রভাব নিয়ে বই লিখছেন। তাঁর চোখ এড়িয়ে ও বাড়িতে মাছিটি অবধি গলবার জো নেই। বাইরের লোক দেখলেই পথ আটকে ছড়া-র ব্যাখ্যা জিগ্যেস করেন। ভয়ের চোটে গয়লা অবধি ও বাড়িতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

—বললাম, হয়েছে, ওই জ্যাঠামশাই-ই তোমার গেটপাস। শুনে, হরিদাস ঘুমের মধ্যেই হাঁউমাউ করে উঠল, প্রভু, আমি কাঁচা পাটের ব্যবসা করি, বাংলায় বড় কাঁচা; আমাকে ওই পরীক্ষার মধ্যে ফেলবেন না।

যাই হোক, হরিদাসকে সম্ভাব্য প্রশ্ন-উত্তর সবই শিখিয়ে দিলাম। স্বপ্নাদ্য নোটবই মুখস্থ করে হরিদাস একদিন দুপুরবেলা নীপবীথির বাড়িতে ঢুকল। বৈঠকখানার তক্তাপোশ থেকে জ্যাঠামশাই হুঙ্কার ছাড়লেন—কে ওখানে?

—আজ্ঞে, আমি হরিদাস মাল। শুনলাম আপনি ছড়া নিয়ে গবেষণা করছেন, তাই একটু আলাপ করতে এলাম। আমি আবার কাউ... কেউ...মানে কৌম সনসকিতি খুব ভালোবাসি কিনা।

তার কথা শুনে জ্যাঠামশাই একবার খাবি খেলেন। বছর দুয়েক আগে, পাড়ার দুর্গাপুজোর স্মরণিকায় 'হাট্টিমাটিম-টিম হইতে বিবর্তনের ফসল-ই কি ট্যাঁশগোরু' নামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেই থেকে অনেকেই তাঁকে এড়িয়ে চলে। বহু দিন পরে যেচে একজন আলাপ করতে এসেছে। তিনি খুশি হলেও নি:সংশয় হতে পারছিলেন না।

হরিদাসকে বাজিয়ে দেখবার জন্যে বললেন, তাই বুঝি? ছড়া ভালোবাসো? বা বা! বড় খুশি হলাম। আচ্ছা বলো তো, এই ছড়াটার নিহিত অর্থ কী হতে পারে! আমি তো চার মাস ধরে চেষ্টা করেও পারছি না বার করতে।—ও পাড়েতে যেও না ভাই, ফটিং-টিঙের ভয় / ছয় মিনসে মাথা কাটা, পায়ে কথা কয়।

কোশ্চেন কমন এসে গেছে। অতএব হরিদাস বুক চিতিয়ে গড়-গড় করে বলে গেল : উদ্ধৃত পঙক্তি কয়টির অর্থ নির্ণয়ের সূত্র লুকিয়ে আছে বিশ্বকবি রচিত 'জীবনস্মৃতি' গ্রন্থে। সেখানে কবি বলেছেন যে—শৈশবে তিনি বিদ্যালয়ে না বুঝে সমস্বরে প্রার্থনাগীত গাইতেন—'কলোকি পুলোকি সিংগিল মেলালিং, মেলালিং, মেলালিং'। বড় হয়ে তিনি এর প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করেন—'ফুল অফ গ্লি, সিংগিং মেরিলি, মেরিলি, মেরিলি'।

—তেমনই আমাদের আলোচ্য পঙক্তির 'ফটিংটিং' আসলে ইংরেজি শব্দ 'ফ্রাস্ট্রেটিং'-এর রূপান্তর মাত্র।

এই ছড়াটিতে ফরাসি বিপ্লবের পরবর্তী 'সন্ত্রাসের রাজত্বের' ছায়া আছে। 'ছয় মিনসে মাথা কাটা' আসলে রোবসপীয়র, দাতোঁ এবং অন্য চার নেতার লৌকিক আইকন মাত্র—গিলেটিনে যাদের মুণ্ডচ্ছেদ হয়েছিল।

সেই ফ্রাস্ট্রেটিং, অর্থাৎ হতাশাব্যঞ্জক ফরাসি সমাজে পায়ে পায়ে ছড়িয়ে পড়ছিল সন্ত্রাস। অতএব, হে সুবোধ ভারতীয় প্রজাসমূহ, ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে, মানে ফ্রান্সে একদম যেও না।

তক্তপোশ থেকে প্রায় উড়ে এসে হরিদাসকে জড়িয়ে ধরলেন জ্যাঠামশাই। বললেন, এই মুহূর্তে তোমাকে আমার সেক্রেটারি হিসেবে নিযুক্ত করলাম। তা ছাড়া তুমি হবে আমার মহান গ্রন্থ 'বাংলা ছড়ায় পাশ্চাত্য প্রভাবের' কো-অথর। তোমার নামটা অবশ্য দেব না। কিন্তু তাতে কী? মাইনে পাবে মাসে...আচ্ছা সে কথাও পরে হবে'খন। তুমি কিন্তু দু-বেলা এসো বাবা হরিদাস।

তারপর আর কী, ছ'মাসের মাথায় জ্যাঠামশাইয়ের বইও পাবলিশ হল, নীপবীথিদের ছাদে প্যান্ডেলের বাঁশও পড়ল। যেও না একবার হালিশহরে। দেখবে, হরিদাস কেমন গঙ্গার তীরে নীপহরি-র সুন্দর মন্দির বানিয়ে দিয়েছে।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রমণীমোহন আপন মনেই বললেন, আত্রেয়ীকে অমন আঘাত দিলে কেন বলো তো? নিজেও তো জ্বলছ।

ভগবানের লীলা দেখার অভ্যেস ছিল না তো। তাই উনি অমন ঝপাং করে আত্রেয়ীর নামটা বলে দেওয়াতে আমি একেবারে থ হয়ে গেলাম। অবশ্য কাল সারা রাত মশার কামড় খেতে খেতে যখন পুরো ব্যাপারটা পর্যালোচনা করছি, তখন বুঝেছি, ও নাম জানা এমন কিছু কঠিন ছিল না। যে-কোনও ইডিয়েট প্রেমিকের মতোই, আমি নিজেই ইটের টুকরো দিয়ে রেল কোম্পানির সিমেন্টের বেঞ্চিটা 'আত্রেয়ী' নামে ভরিয়ে দিয়েছিলাম।

যাই হোক, তখন ওসব মাথায় ছিল না। রমণীমোহনের পায়ের কাছে প্ল্যাটফর্মের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে বললাম, হে কৃষ্ণ করুণাসিন্ধু দীনবন্ধু জগৎপতে! তুমি হরিদাসকে উদ্ধার করেছ, আর আমাকে করবে না? মূককে করবে না বাচাল, বলে দেবে না কেমন করে আত্রেয়ীর ক্ষমা পাব?

তিনি ভর্ৎসনার হাসি হেসে বললেন, আচ্ছা, আমার ব্যথিত প্রেমিক ভক্তের সংখ্যা কি কম? গতকাল অবধি ছিল দু-কোটি তিন হাজার সাতশো ঊনসত্তর জন। বলো তো, প্রত্যেককে আলাদা আলাদা করে দেখা দেওয়া কি সম্ভব? তাই আমি একটা বই লিখেছি।

এই বলে ভগবান অ্যাটাচি খুলে একটা হাফ-পঞ্জিকা আকারের বই বের করলেন।

বইটা কোলের ওপর রেখে বললেন—তুমি তো প্রাপ্তবয়স্ক, তোমাকে বলতে লজ্জা নেই, প্রণয় ইত্যাদির ব্যাপারে আমার নিজের আবাল্য অভিজ্ঞতার সারাৎসার এই গ্রন্থ। রমণী-হৃদয়ের জটিল এবং অবোধ্য পথে দিশেহারা হয়ে মরছে যে পথিক, তোমার মতন যে-ক্যাবলাকান্তরা জীবনের পরম লগন পায়ে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে—এই গ্রন্থ তাদের জন্য এক আশীর্বাদ-বিশেষ।

গীতায় যা-যা পড়েছ—সেসব যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে দাঁড়িয়ে আমার তাৎক্ষণিক বক্তৃতা। ওই সংকটময় পরিবেশে, এত গুরুজনের মধ্যে তো এসব কথা আলোচনা করতে পারিনি। তবে মনের ভেতরে একটা তাগিদ ছিলই, বুঝেছ।

তাই গত এক কল্প ধরে, নিভৃত নন্দনবনে বসে এই গ্রন্থটি রচনা করেছি। একটু-আধটু ভুল যা ছিল সেসব প্রেসে পাঠানোর আগে মদনদেব কারেকশন করে দিয়েছেন। ছাপাতে হয়েছে অবশ্য মর্তলোকেই। পটুয়াটোলায়। স্বর্গে তো আর ছাপাখানা নেই। অত্যন্ত বাজে ছেপেছে ব্যাটারা। ইস, শ্রীরাধার একটি অরিজিনাল পোর্ট্রেট দিয়েছিলাম, মলাটে ছাপাবার জন্য। সেটার কী হাল করেছে দেখো। মনে হচ্ছে বৃহন্নলা।

দেখলাম। সত্যিই মলাট দেখলে অতটা ভক্তি আসে না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রভু আবার শুরু করলেন—অবশ্য আমিও তো বেশি পয়সাকড়ি দিতে পারিনি। নরদেহ ধারণের এই একটা বড় অসুবিধে, পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হয়। না হলে লক্ষ্মী যার ঘরণী...।

যাক গে, যা বলছিলাম মন দিয়ে শোনো। স্রেফ বিষয়গৌরবেই এই বইয়ের জনপ্রিয়তা গীতাকে অনেক ছাড়িয়ে যাবে বলেই মনে হয়। কোটি-কোটি কপি বিক্রি হবে। কিন্তু আমার হাতে আর সময় নেই। জরুরি ডাক এসেছে। পাঁচদিন পরেই নরলীলা সাঙ্গ করব। বইটা ছাপিয়েছিলাম মাত্র দশ কপি। হরিদাস সমেত বাংলার ন'প্রান্তে ন'জনকে ন'টা কপি দিয়ে এসেছি। বাকি ছিল এই একটাই; তোমাকে দিয়ে গেলাম।

আগে নিজের সংকট থেকে এই বই ধরে উদ্ধার পাও, তারপরে সামান্য দক্ষিণার বিনিময়ে জনতার মধ্যে বিতরণ কোরো। তোমার অভাব থাকবে না। বাড়ি, গাড়ি, তারপর টিভি-তে পারিবারিক চ্যানেল—স-অ-অ-ব হবে।

আমি ফাঁকা প্ল্যাটফর্মের ওপর থেবড়ি কেটে বসে পড়লাম। নিজের সৌভাগ্যকে বিশ্বাস হচ্ছিল না। হাত বাড়িয়ে প্রভুর হাত থেকে বইটা নিলাম। ক্যাটক্যাটে লাল হরফে লেখা—'প্রেমের একান্ন সংকট ও তাহার সমাধান।' লেখকের নাম নেই দেখে বুকে একটু ধাক্কা লাগল। অন্তর্যামী ধরে ফেললেন। সেই ভুবন ভোলানো হাসি হেসে বললেন, তাহলে তো আবার ফ্রিতে অষ্টোত্তর শতনামের পুস্তিকা দিতে হত। বললাম না, পয়সার বড় টানাটানি যাচ্ছে। লোকে হরির লুঠ দেওয়ার সময় পাঁচ পয়সা, দশ পয়সাগুলো কোত্থেকে জোগাড় করে বলো তো?

হঠাৎ আমার সম্বিৎ ফিরল। তাড়াতাড়ি পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখলাম তিনশো টাকা আছে। রিস্টওয়াচটা খুলে সব একসঙ্গে তাঁর হাতে দিয়ে বললাম, ঠাকুর, যদিও ওই নরদেহের আয়ু মাত্র আর পাঁচদিন, তবু আপনার এই ছেঁড়া পাম-শু আমি আর দেখতে পারছি না। দয়া করে একজোড়া নতুন জুতো কিনে নেবেন।

মিষ্টি হাসিতে মুখ ভরিয়ে রমণীমোহন বললেন, পাগল ছেলে, আমি কি পয়সার অভাবে ছেঁড়া জুতো পরি রে? সেই যে বেয়াক্কেলে নিষাদ দুপায়ে তির মেরে দিয়েছিল—সেই থেকেই নতুন জুতো পরতে পারি না। ব্যথা লাগে।

বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন রমণীমোহন। রাত অনেক হয়ে গেছে। ততক্ষণে প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। যে দু-চারজন মাতাল, ভবঘুরে তাঁকে দেখল, তারা জানলই না যে তাদের মুক্তি ঘটে গেল।

আপ ট্রেনের সিগনাল হয়েছিল। আমাকে সঙ্গে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন, আর একটা বই আছে আমার কাছে—মা যশোদার লেখা—'আদর্শ শিশুপালন পদ্ধতি'। তবে ওটা এখনই তোমার কাজে লাগবে না। তুমি এখন বাড়ি ফিরে 'প্রেমের একান্ন সংকটের...' কুড়ি নম্বর চ্যাপটারটা ভালো করে পড়ে নাও—'মানভঞ্জন'। চিন্তা কোরো না। তোমার সিদ্ধি অনিবার্য।

ট্রেন ঢুকে গেছিল। ভগবান প্রায় ফাঁকা ভেন্ডার কামরায় উঠে পড়লেন।

একজন কনস্টেবল বারান্দার আলোটা জ্বেলে দিয়ে গেলেন। জটাদা ভেতর থেকে হাঁক ছাড়লেন, 'ও হে অমলকান্তি, আমার ডিউটি শেষ, বাড়ি যাব; তুমি এবার খাঁচায় ঢুকে পড়ো।'

অমল উঠে পড়তে যাচ্ছিল; হাত ধরে টেনে বসালাম। বললাম, 'আরে, সবটা বলে যা। লোকটা তো পাক্কা চিটিংবাজ। আর তুইও একটা আস্ত গাড়োল। কিন্তু তাতেই বা কী হল? ওই বইতে কি মানভঞ্জনের উপায় হিসেবে ধর্ষ...'

অমলকান্তি ভয়ংকর চেঁচিয়ে বলল, 'শাট-আপ। ফের যদি ওই শব্দ উচ্চারণ করেছ!'

—তাহলে বল, কী হয়েছিল।

অমলকান্তি দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল। তারপর অতিকষ্টে ফোঁপাতে-ফোঁপাতে যা বলল তা এইরকম—মানভঞ্জন চ্যাপটারে যা যা বলা ছিল, অর্থ বোঝার চেষ্টা না করেই তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছি। সেদিন স্টেশন থেকে বাড়ি ফিরে বইটা পড়তে শুরু করি। সারা রাত, পরদিন সারা দিন ধরে ষোলো আর সতেরো পাতা মুখস্থ করে ফেললাম। বিকেলবেলা গেলাম আত্রেয়ীদের বাড়ি। ওর মাকে বললাম ঊর্মি স্কুলে যাবে না—তাই জানাতে এসেছি। উনি বললেন যাও না, আত্রেয়ী ওপরের ঘরে বসে পড়ছে; বলে এসো।

—দোতলায় আর কেউ ছিল না। ঘরে ঢুকে দেখলাম আত্রেয়ী খাটের ওপর বসে প্র্যাকটিকাল খাতায় ব্যাঙের পৌষ্টিকতন্ত্র আঁকছে। আমাকে দেখেই মাথা নীচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে গেল। আমি ওর হাতটা ধরে ফেলে বললাম, আমাকে একটা সুযোগ দেবে না প্রিয়তমা?

আত্রেয়ী চমকে ঘুরে দাঁড়াল। তারপর এগিয়ে এল আমার দিকে। বলল, এ কি চেহারা হয়েছে তোমার! চোখগুলো লাল টকটক করছে, চুল আঁচড়াওনি, কাঁধে আবার একটা তোয়ালে। শ্মশান থেকে ফিরছ নাকি?

'প্রেমের একান্ন সংকট ও তার সমাধান'-এর ভূমিকাতেই ছিল যে-কোনও কথাকে নিজের উদ্দেশ্যসাধনে ব্যবহার করবার পরামর্শ। তাই পটাং করে আত্রেয়ীকে বললাম, 'তোমাকে বিদায় দিয়ে আমি তো নিজের জীবনকেই শ্মশান বানিয়েছি প্রাণ আমার। তাই তো আমার এই হরিশ্চন্দ্রের বেশ। তুমি কি আমার কাছে ফিরে আসবে না সোনা?'—এই বলে আত্রেয়ীর দুই কাঁধে হাত দিয়ে ওকে কাছে টেনে আনলাম। বুঝতে পারছিলাম, আমার এই নতুন ভূমিকায় ওর দু-চোখ ছানাবড়া হয়ে গেছে। তবুও দিব্যি তুলোর পুতুলের মতন আমার বুকের ওপর এসে পড়ল। কিন্তু তারপর...তারপর...তারপরেই সব গণ্ডগোল হয়ে গেল।—উদগত অশ্রুতে বন্ধ হয়ে গেলে অমলকান্তির গলা।

—কেন রে অমল? কী হল তারপর?

আমিও আর ধৈর্য রাখতে পারছিলাম না।

মুখে কিছু না বলে অমলকান্তি কাঁধের ঝোলা থেকে একটা বই বার করে আমায় দিল। যাকে বলে বটতলার বই, এক্কেবারে সেই জিনিস। দ্রুত সূচিপত্র দেখে আমি খুলে ফেললাম মানভঞ্জন অধ্যায়। থানার বারান্দার মিটমিটে আলোয় চোখ বুলিয়ে গেলাম ষোলোর পাতায়—'এই বলিয়া আপনার প্রেমাস্পদার দুই স্কন্ধে হস্তস্থাপনপূর্বক তাহাকে আপন বক্ষে টানিয়া লউন। আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে বলুন, সোনা আমার, ক্ষমা করো আমার শত অপরাধ।'

তাহলে? অমলকান্তি তো সব ঠিকঠাকই করছিল। বরং, আমার তো মনে হল, আরও ভালোই করছিল। গণ্ডগোলটা হল কোথায়? কী আছে এর পর?

ষোলো পাতা শেষ করে আমার চোখ চলে গেল সতেরো পাতার শুরুতে : 'অত:পর জানলা-দরোজা বন্ধ করিয়া দিবেন—যাহাতে বাতাস ঢুকিতে না পারে। আলতো হাতে সোনামণির জামাকাপড় খুলিয়া দিন। সেফটিপিন থাকিলে বিশেষ সাবধান। এবার একটি শুষ্ক কিন্তু কোমল তোয়ালিয়ার দ্বারা সোনামণির শরীরের নিম্নাংশ উত্তমরূপে মুছাইয়া দিন। চেঁচাইলে গ্রাহ্য করিবেন না।'

—ও অমল! আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, এ যে মা-যশোদার 'আদর্শ শিশুপালন পদ্ধতি'র পাতা। ফর্মা গণ্ডগোল হয়ে 'একান্ন সংকট'-এ ঢুকে পড়েছে। তুই কি তাহলে আত্রেয়ীর জামাকাপড়...?

দু-হাতে মুখ ঢেকে, মাথা ওপরে নীচে ঝাঁকিয়ে, অমলকান্তি বলল, 'ভেউ-ভেউ-ভেউ-ভেউ।'

অধ্যায় ১ / ১২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%