প্রথম অধ্যায়

প্রলয় কুমার নাথ

সাল - ২০০৮

স্থান - তুরস্কের ব্যাদেমলি কোয়ু গ্রাম

পাথরের তৈরি ছোট্ট একতলা বাড়িটার একটি ঘুপচি ঘরে জমে আছে চাপ চাপ রাতের অন্ধকার। রঙ চটা কাঠের ডাইনিং টেবিলটার এক কোণে বসে ছিল চোদ্দ বছরের ছোট্ট ছেলেটা। তার সামনে খোলা ছিল একটি আঁকার খাতা। হারিকেনের মিটিমিটি আলো এসে পড়ছিল সেই খাতার পাতায়। সেই আলোতে এক মনে সাদা পাতায় রঙ পেন্সিল ঘষে ঘষে ছেলেটা এঁকে চলেছিল এক নারীর ছবি। তার মায়ের ছবি, যাকে সে চার বছর আগে হারিয়েছে। খুব সুন্দর দেখতে ছিল তার মাকে, কিন্তু মায়ের অত সুন্দর মুখে কখনো হাসি দেখেনি ছেলেটা। জন্মের পর থেকেই মদ্যপ লম্পট বাবাকে দেখে ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকত ছেলেটা। বাবা যখন রোজ সন্ধ্যা বেলায় মদ গিলে এসে মাকে বেদম পেটাতো, মায়ের গায়ে সিগারেটের ছ্যাকা লাগিয়ে দিত, তখন নিজের ছোট্ট কচি দুটো হাত দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিত ছেলেটা। একদিন তার মা তার বাবার সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে তাকে নিয়ে পালিয়ে এলো এখানে, তার দিদার বাড়িতে। এরপর একবারের জন্যও তার বাবা এখানে আসেনি তাদের খোঁজ করতে। তাই এত বছর ধরে তারা এখানে, এই বাড়িতেই রয়েছে। তার বিধবা দিদা গাঁয়ের লোকেদের বাড়ি বাড়ি ধাইএর কাজ করে যে অর্থ উপার্জন করেন, তাতে তাদের তিনজনের সংসারটা কোন মতে চলে যেত। তারপর একদিন হঠাৎ করেই পেটে ব্যাথা আর রক্ত বমি হওয়া শুরু হল তার মায়ের। গাঁয়ের হাসপাতালটা অনেক দূরে, তবুও অনেক কষ্ট করে তার দিদিমা তার মাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন ডাক্তার দেখাতে। অগ্ন্যাশয়ে ক্যানসার ধরা পড়েছিল তার মায়ের। ছয় সাত মাসের মধ্যে সব শেষ! তারপর থেকে নাতিকে নিয়ে এই বাড়িতে একাই থাকেন তার দিদিমা।

এমন সময় একটি থালায় সামান্য একটি পাউরুটি এবং সব্জী দিয়ে চিকেনের পাতলা ঝোল নিয়ে সেখানে এলেন তার দিদিমা। থালাটি কাঠের টেবিলে ছেলেটির কাছে রেখে তার মাথায় হাত বুলিয়ে সস্নেহে তিনি বলে উঠলেন (তাদের মধ্যে কথাবার্তা তুর্কি ভাষায় হলেও পাঠকদের সুবিধার্থে তা বাংলায় দেওয়া হল),

—"নাও দাদুভাই, খাবার খেয়ে নাও…"

ছেলেটি আঁকার খাতা থেকে মুখ তুলে চাইল তার দিদিমার দিকে।

—"তুমি খেয়েছো তো দিদা?"

ছেলেটা জানে যে এখন এই গাঁয়ের লোক আর ধাইমাদের ওপর তেমন ভরসা রাখে না, কষ্টসাধ্য হলেও তারা চেষ্টা করে তাদের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীদের দূরের ওই হাসপাতালেই নিয়ে যেতে। তাই ধীরে ধীরে তার দিদিমার আয় তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। তাই হয়তো কোন কোন দিন তাকে খাইয়ে তার দিদিমাকে অনাহারেই কাটাতে হয়। তার কথা শুনে একটি মিষ্টি হাসি খেলে গেল তার দিদিমার বলিরেখা ভর্তি মুখে।

—"তোমার খাওয়া হলেই যে আমার খাওয়া হয়ে যায়, দাদুভাই!"

তার মানে আজকেও তাকে খাবার দিয়ে তার দিদার কাছে আর খাওয়ার মত কিছু নেই, বুঝতে পারল ছেলেটা। পরিবারের এই দৈন দশার কথা চিন্তা করে চোখ ছলছল করে উঠল ছেলেটার। সে তার দিদাকে হাত ধরে তার পাশেই বসালো। তারপর নিজের কচি হাতটা দিয়ে পাউরুটির একটি ছোট্ট টুকরো ছিঁড়ে সব্জীর ঝোলে ডুবিয়ে ধরল তার দিদার মুখের সামনে।

—"তুমি না খেলে আমি একটুও খাবো না কিন্তু বলে দিলাম…"

রুটির টুকরোটা মুখে নিয়ে নাতির প্রতি স্নেহে আর দারিদ্রের হতাশায় নাতিকে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠলেন তার দিদা।

—"কেঁদো না, দিদা", ঠিক মায়ের চোখের জল যেভাবে মুছিয়ে দিত ছেলেটা সেভাবেই তার দিদার গাল দুটোকেও নিজের কচি দুটি হাত দিয়ে ডলে সে খুশি মনে বলল, "চলো না দিদা, আমরা এই খাবারটা থেকেই একসাথে দুজনে খাই!"

ঠিক এমন সময় ওদের বাড়ির সদর দরজার বাইরে থেকে শোনা গেল কড়াঘাতের আওয়াজ। এছাড়া বাইরে থেকে বেশ বড় একটা জটলার আওয়াজও যেন শোনা যাচ্ছে। এত রাতে কে এলো তাদের বাড়িতে? তাহলে কি এই সময়ই গ্রামের কোন মেয়ের প্রসব বেদনা উঠল নাকি? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে অন্ধকারের মধ্যেই দেওয়াল হাতড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন সেই বয়স্ক মহিলা। দরজা খুলতেই তিনি দেখলেন গাঁয়ের বেশ কিছু মুরুব্বি গোছের পুরুষ মানুষ বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। সকলেই যেন অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে আছেন তার দিকে। এর মধ্যেই বেশ কিছু জনের হাতে আছে জ্বলন্ত মশাল যা এই রাতের অন্ধকারের মাঝে এক রহস্যময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে।

—"আরে বাবুরা, আপনারা এখানে? এত রাতে?", মহিলার গলায় বিস্ময়ের সুর।

প্রত্যুত্তরে সেই জটলার সামনে থাকা একজন ষন্ডা গোছের লোক এগিয়ে এলো মহিলার কাছে, তারপর এক ধাক্কায় সেই মহিলাকে ফেলে দিল ঘরের মেজের ওপর। নিচে পড়ে গিয়ে শরীরে আঘাত পেয়ে চিৎকার করে উঠলেন মহিলা।

—"শালী, হতভাগী, ডাইনি কোথাকার!", দাঁতে দাঁত ঘষে চিৎকার করে উঠল লোকটা, "কি ভেবেছিস রে শয়তানী, তুই এক এক করে এই গাঁয়ের সব বাচ্ছাদের খাবি?"

দিদার চিৎকার শুনে সেখানে ততক্ষনে ছুটে এসেছে তার নাতি। সে তার দিদাকে মেঝে থেকে আস্তে আস্তে উঠতে সাহায্য করল। মহিলা বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল,

—"কি বলছেন কি বাবু আপনি? আমি ডাইনি! আমি বাচ্চাদের খাই!"

—"হ্যাঁ ঠিক বলেছে ও…ঠিক বলেছে!", ভিড়ের বাকি জনতাও যেন সায় দিয়ে উঠল তাদের নেতার কথায়।

—"একদম ন্যাকা সাজার চেষ্টা করবি না বুড়ি, বুঝলি", আবার গর্জে উঠলো ষন্ডা চেহারার লোকটা, "তিন তিনটে বাচ্চা…পর পর তিন তিনটে সদ্যজাত বাচ্চা, যারা তোর হাতেই জন্মেছিল, তারা একে একে বমি আর পাতলা পায়খানা করে মারা গেল…আর তুই এখনো কিছুই যেন জানিস না, না?"

এতক্ষনে যেন এই ক্রোধোন্মত্ত জনতার আসল অভিসন্ধির কথা বুঝতে পারলেন ছেলেটির দিদা। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে হাত জোড় করে তিনি বললেন,

—"বাবু…আমার কথা বিশ্বাস করুন বাবু, আমি কিছু করিনি…আমি কিছুই জানিনা ওই বাচ্চাগুলোর সম্বন্ধে…আমি তো ওদের এবং ওদের মায়েদের হাতে অপশক্তি বিনাশকারী তাবিজ বেঁধেই দিয়েছিলাম…তারপরেও ওরা কিভাবে মারা গেল তা আমি নিজেই জানি না!…হয়তো কোন রোগে, কোন অসুখে মারা গিয়েছে ওরা!"

এবার মারমূখী জনতার ভিড় ছুটে এলো তার বাড়ির ভেতরে। তাদের দলনায়ক চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টান দিকে চেপে ধরল ওই মহিলাকে।

—"বদমায়েশ মেয়েছেলে কোথাকার, তুই কিছু জানিস না, না? তুই এই সব কিছু করেছিস…তুই কালো জাদু জানিস…তোর জন্যই মরেছে ওই বাচ্চাগুলো! কি ভেবেছিস তুই, তোকে রেহাই দেব আমরা?"

ছোট ছেলেটা ছুটে গেল লোকটার কাছে কিন্তু তার থেকে অনেক বেশি উচ্চতা ওই লোকটার। ছেলেটি লোকটার কোমর ঝাঁকিয়ে প্রতিবাদের সুরে বলে উঠল,

—"এই ছেড়ে দাও আমার দিদাকে…ছেড়ে দাও…আমার দিদা কিচ্ছু করেনি…কাউকে মারেনি আমার দিদা…"

—"চল হট শালা ছোটলোকের বাচ্চা!", এই বলে লোকটা এক লাথি কষিয়ে দিল ছেলেটির বুকে। তাল সামলাতে না পেরে সে ছিটকে পড়ল অদূরে।

—"অ্যাই তোমরা ধরে রাখো তো ওই বাচ্চাটাকে…আমি এই বুড়িকে দেখাচ্ছি মজা!", লোকটার এই কথা শোনা মাত্র বাকি সকলে ছেলেটাকে জাপটে ধরল।

ছটফট করতে করতে ছেলেটা দেখতে দেখতে পেল ষন্ডা চেহারার লোকটা তার জামার পকেট থেকে একটা বাঁকানো ছোরা বার করল। খোলসের ভেতর থেকে তার ফলকটি উন্মুক্ত হতেই সেটা ঝিলিক দিয়ে উঠল এই রাতের অন্ধকারেও।

—"না, মেরো না…ছেড়ে দাও আমার দিদাকে…ছেড়ে দাও!"

ছেলেটির নিষ্ফল চিৎকারের মাঝেই লোকটা হিহি করে হাসতে হাসতে এগিয়ে যেতে লাগল বয়স্ক মহিলাটির দিকে। তারপর তার সকল বাধা উপেক্ষা করে ছোরাটিকে সটান চালিয়ে দিল মহিলার বুকে। মেঝেতে পড়ে কালচে রক্তের সাগরে ভাসতে ভাসতে ছটফট করতে লাগল সেই মহিলার দেহ। তারপর কিছুক্ষনের মধ্যেই নিথর হয়ে পড়ে রইলেন তিনি। উল্লাসে ফেটে পড়ল নিষ্টুর জনতার দল। তাদের কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে ছেলেটা ছুটে গেল তার দিদিমার কাছে।

—"দিদাআআআ…"

দিদার নিথর দেহটা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে মাথা কুটতে লাগল ছোট্ট ছেলেটা। ততক্ষণে আরো বড় সর্বনাশ করে দিয়েছে কুসংস্কারী জনতার দল। ওদের বাড়িটার চারিধারে কেরোসিন ঢেলে মশালের আগুন লাগিয়ে দিয়েছে ওরা। গোটা বাড়িটায় দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছে আগুন। এতক্ষনে মনে সন্তুষ্টি এনে কেটে পড়েছে ক্ষুব্ধ জনতার ভিড়। চারিদিকে আগুনের তীব্র তাপে, কটু পোড়া গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসছিল ছেলেটার। সে ভয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে এদিক ওদিকে চেয়ে দেখছিল। এমন সময় হঠাৎ একবার চোখ খুলে তাকালেন তার দিদা…অতি কষ্টে বুক ভর্তি নিঃশ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করলেন তিনি।

—"দিদা…দিদা চল এখান থেকে…চল, আমি তোমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো!", যেন অন্ধকারের মধ্যে আশার আলো দেখতে পেল ছোট্ট ছেলেটা।

—"না, আমার আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই রে দাদুভাই", অতি কষ্টে বলে উঠলেন মহিলা, "তবে মরার আগে তোমাকে কিছু কথা না বলে যেতে পারলে যে আমার আত্মার শান্তি হবে না দাদুভাই…বলছি, শোন…"

মহিলাটি তার ঘরে খাটের নিচে থাকা কোন বস্তুর দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইঙ্গিত করে মৃত্যুর আগে শেষবারের মত এমন কিছু বলে চললেন তার নাতিকে, যে আতঙ্কে এবং উত্তেজনার এই তীব্র উষ্ণতার মাঝেও যেন একটা হিমেল স্রোত বয়ে চলল ছোট্ট ছেলেটার শিরদাঁড়া জুড়ে!

********

অধ্যায় ১ / ১২
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%