তৃতীয় পর্ব : মৃণাল নন্দী

বিশ্বরূপ মজুমদার

3

একটা চারকোণা টেবিল, তার তিন পাশে তিনটে চেয়ার। স্নেহা বসে আছে তার একটিতে। অন্য দুটিতে সঞ্জয় বোস ও প্রদীপ ঘোষ। থানার এই বদ্ধ ইন্টেরোগেশন রুমের মধ্যে যে আলোটা ঝুলছে টেবিলের ওপর, তার তীব্র আলো ও উত্তাপও যেন ঘরটার চার কোণার স্যাঁতসেঁতে শীতল অন্ধকার দূর করতে পারছে না। প্রদীপ প্রশ্ন করেছিল সঞ্জয়কে একবার, “আচ্ছা, এত উজ্জ্বল আলো দেওয়ার কী দরকার? গরমে অবস্থা খারাপ। তার চেয়ে হালকা একটা আলো থাকলেই তো হয়, বেশ ঝিম ধরানো শীতল একটা ভাব থাকলে কাজে মজা পাওয়া যাবে।”

শুনে কঠোরভাবে তাকিয়েছিল সঞ্জয়, “তার চেয়ে ডিপার্টমেন্টে একটা অ্যাপ্লিকেশন দিয়ে দাও ওখানে এসি লাগিয়ে দেওয়ার জন্য, সঙ্গে একটা ৫৫ ইঞ্চির এল ই ডি টিভি৷ ক্রিমিনাল আর পুলিশ মিলে একসঙ্গে নরক গুলজার করি আই পি এল দেখতে দেখতে।” ঢোঁক গিলেছিল প্রদীপ সঞ্জয়ের রুদ্রমূর্তি দেখে। “শোনো প্রদীপ, অপরাধীদের হৃদয় তোমার প্রেমিকাদের মতো বাটারের টুকরো নয়, যে প্রদীপ শিখাতেই গলে জল হয়ে যাবে। ওরা ভয়ানক ধূর্ত। ওদের ওই শক্ত সাইকোলজিক্যাল প্রোটেকশন গলানোর জন্য, সঙ্গে ইন্টেরোগেশন অফিসারদের মাথার মধ্যেও আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্য এরকম তীব্র ওমলেট ভাজা আলোই চাই, বুঝেছ?” প্রদীপ আর কিছু বলেনি, বলার আর কিছু ছিলও না।

তবে এখন তাদের সামনে কাঁদতে কাঁদতে ফুলে ওঠা কাজল টানা এলোমেলো চোখে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে স্যারের কথাটায় কিছু ফাঁকফোকর থাকলেও থাকতে পারে। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে সমানে চেষ্টা করেও মেয়েটার মুখ থেকে এটুকুই শুধু বের করা গেছে যে সে রেগুলার স্মোক করলেও, তার থেকে বড় কোনও কিছু নেশা করার কথা স্বপ্নেও কখনও ভাবেনি। আর তার অফিসে চামড়ার ব্যাগ থেকে জাল নোটের সঙ্গে আরেকটা প্যাকেটে যে সাদা গুঁড়োটা পাওয়া গেছিল একটা আঁকাবাঁকা হাতে লেখা চিঠির সঙ্গে, সেটার নাম সে শুনে থাকলেও সরাসরি কখনও চোখে দেখেনি। গুঁড়োটা যে হেরোইন তা দেখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সঞ্জয় বোস বলে দিয়েছিল নিজের দর্শনেন্দ্রিয় আর ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়।

সঙ্গে থাকা চিঠিতে গোটা গোটা বাংলায় অনভ্যস্ত হাতে টেলিগ্রামের মতো জরুরি বার্তা পাঠানোর ধাঁচে লেখা, ‘তোমার ইচ্ছেপূরণ এবারেও করতে পারলাম না। ওই জিনিস ভারতবর্ষে শুধু নয়, পৃথিবীতেও খুব কম জায়গায় পাওয়া যায়। এবারেও এটাতেই কাজ চালাও। আর জেনো, আমি কিন্তু চেষ্টার ত্রুটি রাখছি না।’

প্রদীপ যদিও এরকম একজন সুন্দরী মহিলাকে হঠাৎ করে বলা নেই কওয়া নেই, থানায় তুলে নিয়ে আসার পক্ষপাতী নয়, কিন্তু এই ব্যাপারটাতে সে আবার সঞ্জয় বোসকে খুব একটা দোষও দিতে পারছে না। একজন মহিলার সঙ্গে তদন্তের প্রয়োজনে দেখা করতে গিয়ে, যার দু’বছরের প্রেমিক ও হবু স্বামী সদ্য খুন হয়েছে, সেখানে যদি সেই মহিলারই ব্যাগে পাওয়া যায় সেই প্রেমিকের পাঠানো জাল নোটের বান্ডিল আর সঙ্গে হেরোইনের প্যাকেট সহ একটা চিঠি পরে আরও কোনও দুর্মূল্য নেশার সামগ্রী পাঠানোর অঙ্গীকার সহ, তাহলে সেই মহিলাকে সঙ্গে সঙ্গে থানায় নিয়ে না এলে এবং পরে তিনি পালিয়ে গেলে, পরবর্তীকালে কর্তৃপক্ষ তাদের দু’জনকে সুন্দরবন বা উত্তরবঙ্গের কোনও অরণ্যময় অঞ্চলে বাঘ বা হাতির সঙ্গে কানামাছি খেলার জন্য পাঠিয়ে দিলেও কিছু বলার থাকত না। তাই তারা নিরুপায় ছিল। তবে এখন মনে হচ্ছে মহিলা নির্দোষ। তাকে ফাঁসানো হয়েছে৷ তাছাড়া এরকম সুন্দর নিষ্পাপ চোখ যে নারীর, সে অপরাধী হতেই পারে না৷

তার চিন্তা বাধা পেল একটা মোবাইল রিং-এর শব্দে। সঞ্জয়ের ফোন এসেছে। সে ফোন দেখেই একটু মুখ বেঁকিয়ে বলল, “এ কী! ডি. আই. জি-র ফোন এখন!” উঠে দাঁড়িয়ে কল রিসিভ করল সঞ্জয়, “হ্যাঁ, স্যার, নমস্কার স্যার।”

ওদিক থেকে গুরুগম্ভীর কিন্তু উদ্বিগ্ন গলা ভেসে এল ডি. আই. জি. পরিমল মিত্রের, “সঞ্জয়, কী হচ্ছে এসব? তোমার এরিয়া তো একেবারে অপরাধীদের খাসতালুক হয়ে উঠেছে দেখছি। খুন, জাল নোট, ড্রাগ, কোনও কিছুই তো বাকি নেই দেখছি৷”

—“হ্যাঁ। মানে এরকম কিছু একটা ঘটছে। একটা র্যাকেট মনে হচ্ছে খুব অ্যাকটিভ হয়ে উঠেছে। কিন্তু আপনি এত কিছু জানলেন কীভাবে এত তাড়াতাড়ি? আমরা তো নিজেরাই সবে তদন্ত শুরু করেছি৷”

—“আরে হাওড়ার ওখানে একটা বাড়িতে হঠাৎ খবর পেয়ে রেইড করে প্রচুর জাল নোট পাওয়া যায়। বাড়ির মালিককে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছু নাম পাওয়া যায়, যার মধ্যে দু’জন তোমার অঞ্চলের। খোঁজ নিয়ে জানলাম তার মধ্যে একজন খুন হয়েছে, আরেকজনের নাম বিদ্যুৎ, তার কোনও খবর নেই। সব ডিটেলস তোমার কাছে কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে যাবে, খোঁজ লাগাও। আর এটাও খবর পেলাম যে একটা ড্রাগের চক্রও নাকি আছে এর মধ্যে। খুবই খারাপ অবস্থা হতে চলেছে কিন্তু আমাদের। টেক অ্যাকশন ইমিডিয়েটলি।”

—“হ্যাঁ স্যার, হ্যাঁ স্যার। চিন্তা করবেন না৷ আমরা একজনকে নিয়েও এসেছি এই কেসটাতেই, তাকেই ইন্টারোগেট করছি। আপনাকে আপডেট পাঠিয়ে দেব কিছু খবর পেলেই স্যার৷”

ওদিক থেকে ফোনটা কেটে যেতেই সঞ্জয় আবার ফিরে এল নিজের চেয়ারে৷ কিছুক্ষণ স্নেহার দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে বলল, “বিদ্যুৎকে চেনেন নাকি?”

শুনে প্রথমে তড়িতাহতের মতো চমকে উঠে তারপর কিছুক্ষণ হতভম্ভ হয়ে চেয়ে থেকে ধীরে ধীরে বলল স্নেহা, “হ্যাঁ, চিনি, মানে চিনতাম৷”

“কীভাবে?” স্থির ভাবে তাকিয়ে আছে সঞ্জয় এখনও। প্রদীপ জানে এই দৃষ্টিটা মানসিক চাপ দেওয়ার একটা কৌশল মাত্র। সঞ্জয় শুধু হয়তো বিদ্যুতের নামটা শুনেছে, কিন্তু এমনভাবে ও জাগলিং করবে সেই নামটা নিয়ে, যেন মনে হবে বিদ্যুতের ঠিকুজি-কুষ্ঠি সব জেনে বসে আছে, যদি অপরপক্ষ ভুল কিছু বলে, তাহলেই হাতেনাতে ধরা পড়ে যাবে। অপরাধী যদি ঘাঘু হয়, তাহলে এই জালে পা দেবে না। যদি সেই লোককে সে চেনেও, তবেও যেটুকু তথ্য ফাঁস না করলেই নয়, মানে না বললে পরে মিথ্যে বলা বা সত্যি চাপার অপরাধে সমস্যায় পড়তে পারে, সেটুকুই তারা বলবে। কিন্তু অপরাধীর স্নায়ু যদি পাথরের মতো শক্ত না হয়, বা অপরপক্ষের মানুষটি যদি অপরাধী না হয়, তাহলে এমন অনেক কিছুই গড়গড় করে বলে দেবে, যেগুলো বলার কোনও প্রয়োজন ছিল না তাদের। আর সেগুলো থেকেই পুলিশ হয়তো এমন কিছু তথ্য বা সূত্র পেয়ে যাবে, যেগুলো তাদের প্রয়োজন কেস সলভ করার জন্য।

আর এক্ষেত্রেও তা-ই হল। স্নেহা একটু জড়সড় হয়ে বসল, তারপর বলে উঠল, “মানে...আসলে...ও ছিল রাকেশের বন্ধু। রাকেশের সঙ্গে ও-ই আমাকে পরিচয় করে দিয়েছিল।” কথাগুলো বলার সময় সে সঞ্জয়ের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্য চোখ নামিয়ে নিল।

সঞ্জয় নিজের দৃষ্টিকে তীব্রতর করে বলে উঠল, “ও মানে? নাম ধরে বলুন।”

স্নেহা চমকে মুখ তুলল সঞ্জয়ের দিকে, তারপর কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আমতা আমতা স্বরে বলে উঠল, “না মানে, ইয়ে...বিদ্যুৎ ছিল আমার বয়ফ্রেন্ড।”

প্রদীপ একটু নড়েচড়ে বসল, গল্পের মোড় ঘুরছে। সঞ্জয়ের দৃষ্টি কিন্তু স্নেহার ওপর স্থিরনিবদ্ধ।

স্নেহা বলতে লাগল, “আসলে বিদ্যুতের সঙ্গে আমার ব্রেক আপ হয়ে যায়। যদিও ও আমায় খুব ভালোবাসত, কিন্তু নিজে কোনও কাজকর্ম বিশেষ করত না, করার চেষ্টাও ছিল না, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াত আর ছুটকো-ছাটকা কিছু করত। মাঝে মাঝেই বহুদিন ওর কোনও হদিস পাওয়া যেত না। ওর সঙ্গে রিলেশন ব্রেক করার পরই রাকেশের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা শুরু হয়৷ রাকেশই প্রপোজ করেছিল আমায়৷ তবে বিদ্যুতের এ নিয়ে বিশেষ হেলদোল ছিল বলে মনে হয় না। ও বেশ স্পোর্টিংলিই নিয়েছিল ব্যাপারটা। আমাদের সঙ্গে এরপরেও বেশ বন্ধুর মতোই মিশত। তারপর তো নিরুদ্দেশ হয়ে গেল হঠাৎ বছর দুয়েক আগে, আর তো কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি৷ বেশ রহস্যময় ছেলে ছিল।”

**********

আকাশে আজ কী দারুণ মেঘ জমেছে! মনে হচ্ছে প্রলয় ঘটবে৷ সুন্দরবনের এই প্রত্যন্ত অরণ্যভূমি যেন আজ কোনও গোপন আনন্দে আত্মহারা হয়ে হাওয়ায় দুলছে। যেমন আনন্দে দোদুল্যমান তারও হৃদয়, এই কঠিন সময়ের মাঝখানেও। সমস্ত কিছুই সে ছবির মতো সাজিয়ে রেখেছিল। ড্রাগ সাপ্লাই, সেটা শুরুর জন্য যে বিশাল পরিমাণ টাকা লাগে, তার জোগান দেওয়ার জন্য জাল নোটের কারবার, সেই জাল নোট বাজারে চালানোর জন্য একজন ব্যাঙ্ক কর্মীর সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ, আর একজন পুলিশের লোককে দলে টানা। প্রথমে সবকিছু একটা অঞ্চল দিয়ে শুরু করে তারপর ধীরে ধীরে জাল বিস্তৃত করার পরিকল্পনা ছিল তার। পরে ড্রাগের ব্যবসাকে একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পর জাল নোটের কারবার বন্ধ করে দেওয়ার ইচ্ছে ছিল, কারণ ওটা অনেক বেশি ঝুঁকির। ড্রাগের ব্যবসা তুলনায় অনেক নিরাপদ। আর এই ব্যবসাকে সফল করার জন্য সমস্ত ব্যবস্থাই সে করে ফেলেছে প্রায়৷ এমন একটা জিনিসকে মানুষের কাছে সে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা ভারতবর্ষে পাওয়া খুবই মুশকিল। কিন্তু সেই জিনিসের অভিজ্ঞতা! উফ, অকল্পনীয়। এখানে সাইকিডেলিক ড্রাগ বলতে বেশিরভাগ নেশাখোর মানুষ শুধু এল এস ডি-র মতো কিছু জিনিসের নাম শুনেছে বা সেসবের অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু এই জিনিস তারও অনেক ওপরে, অন্যান্য নেশার থেকে অনেক দ্রুত ও অনেক গভীর সাইকিডেলিক অভিজ্ঞতার সুযোগ পাওয়া যায় এতে। নিঃশ্বাস বা ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে নেওয়ার মাত্র পাঁচ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যে মানুষকে ঘুরিয়ে নিয়ে চলে আসবে এক অন্য জগৎ থেকে, করিয়ে দেবে মহাবিশ্বের মহাভ্রমণ। আর যদি কেউ ধীরগতিতে আমেজ নিয়ে উপভোগ করতে চায় সময় নিয়ে, তারজন্যও রয়েছে এর তরল পানীয় রূপ। এর নাম আয়াহুয়াস্কা, পেরুদেশের পরম প্রসাদ। ধীরে ধীরে প্রবল জনপ্রিয় হচ্ছে এটি দুনিয়া জুড়ে। ভারতেও ড্রাগ ডিলাররা অল্প অল্প করে খাতা খোলা শুরু করছে এর ওপর। তাই সেও মরিয়া হয়ে উঠেছে আর দেরি না করে এর বাজার ধরে ফেলতে। কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকা থেকে জিনিসটা আমদানি করে ব্যবসা করতে গেলে খরচ পড়বে অনেক বেশি, লাভ হবে খুব কম। সে জায়গায় কোনওভাবে এদেশেই যদি তৈরি করে নেওয়া যায় বস্তুটি, তাহলেই কেল্লাফতে। আর তার জন্য সে উপায়ও ঠিক করে ফেলেছে। আয়াহুয়াস্কা নামের পানীয়টি তৈরি হয় একাধিক গাছ ও গুল্ম থেকে, মিলিয়ে মিশিয়ে। কিন্তু সেগুলো অ্যামাজন অববাহিকার গাছ। ভারতের আবহাওয়ায় সঠিকভাবে এদের চাষ সম্ভব নয়। কিন্তু এই পানীয়ের মূল উপাদান হল ডি. এম. টি. নামের একটি বিশেষ রাসায়নিক, যা অন্য কিছু গাছেও পাওয়া যায়। এরকমই কিছু গাছ, ভারতের বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের আবহাওয়াতে জন্মানো সম্ভব হতে পারে। আর সেই ভাবনা থেকেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের চাষীদের সঙ্গে চুক্তি করে সে কিছু গাছ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গত কয়েক বছর ধরে। তার কিছু ব্যর্থ হয়, আর কিছু হয় সফল। কোনওটি সফল হয়েছে দক্ষিণ ভারতের আবহাওয়ায়, কোনওটি আবার গোয়াতে। আর তার শেষ উপাদানটির সাফল্যের খবর এসেছে বাড়ির কাছে, সুন্দরবন থেকে। তাই সে দক্ষিণ ভারত থেকে সটান চলে এসেছে এখানে। সরকারি ভাবে নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে থেকেই, এখানকার এক প্রত্যন্ত গ্রামে সে একটি ছোট্ট ফার্মহাউস বানিয়ে রেখেছে, অন্য নামে, মধু ব্যবসায়ীর পরিচয়ে। আজ সে সেই ফার্মহাউসেই সন্ধ্যা নামার অপেক্ষায়৷

সমস্ত উপাদান মিলিয়ে মিশিয়ে পানীয় সম্পূর্ণ তৈরি, সবই এদেশে তৈরি। আর সেটি এখন তার সামনেই রাখা আছে টেবিলের ওপর, মাটির একটি পাত্রে। প্রচুর পড়াশোনা করেছে সে এই নিয়ে। ঘন বাদামী রঙের তরলটি, যা দেখে গাঢ় চা বা কড়া কফি বলে ভুল হতে পারে সহজেই, কে বলবে তার মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের মস্তিষ্কের এক নিউরোট্রান্সমিটার-সেরোটোনিনের অনুরূপ এক কণা, ডি. এম. টি, পানীয়টি গ্রহণ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই যা মস্তিষ্কের মধ্যে ভরে গিয়ে এর কার্যক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। কেউ তা নিতে পারে, কেউ পারে না। যারা পারে, তারাই বুঝতে পারে এর ক্ষমতা। সমস্ত ইন্দ্রিয় যেন মিলেমিশে এক হয়ে নতুন এক অলৌকিক জগতের দরজা খুলে দেয় তাদের সামনে। মৃত্যুর মতো স্থির ও জীবনের মতো অস্থির সেই অভিজ্ঞতার সমাহারকে একত্রে অনুভব করতে বড় বড় যোগী মহাপুরুষদেরও যুগ যুগ লেগে যায় সাধনার মাধ্যমে। কিন্তু মুশকিল হল একবার হঠাৎ করে এই উচ্চমার্গে বিচরণের পর নেশা কেটে গিয়ে আবার যখন প্রাত্যহিক জীবনের রোজনামচায় ফিরতে হয় মানুষকে, তারা তখন আর নিতে পারে না। আবার বিনা পরিশ্রমে এই অপার্থিব অভিজ্ঞতা লাভের জন্য তারা যে কোনও মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকে। বারংবার৷ আর এটাই তো নেশার জিনিস নিয়ে ব্যবসার মজা।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে অরণ্যঘেরা এই গ্রামে। ঘরের দু’পাশে দুটি মোমবাতি জ্বলছে। ইলেক্ট্রিসিটি এখনও এসে পৌঁছয়নি এখানে। সৌরলন্ঠন ছিল, তবে তা আজ জ্বালাতে ইচ্ছে করছে না তার। সে হাতে তুলে নিল মহার্ঘ্য সেই পানীয়ের পাত্র৷ তারপর এক চুমুকে শেষ করে ফেলল সবটা। আসল লাতিন আমেরিকান মিশ্রণের থেকে একটু পাতলা, তিতকুটে ভাবটাও একটু যেন কম। এখন শুধু অপেক্ষা, দেখা যাক কাজ কেমন করে। বাইরে প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আর তার মাথায় শুরু হয়েছে চিন্তার স্রোত। সব তো ঠিকই এগোচ্ছিল, কিন্তু মাঝখানে হঠাৎ রাকেশ খুন হয়ে গিয়েই হল মুশকিলটা। কে করতে পারে এই খুন? কিছুতেই আন্দাজ করতে পারছে না। তার ওপর আবার স্নেহাকে এসময় জাল নোট আর ড্রাগ পাঠিয়েই বা কে ফাঁসাল। ওদিকে আবার হাওড়াতেও কোন ইনফর্মার কেস দিয়ে দিয়েছে। তবে সমস্যা কিছু হলেও সেগুলো সে সামলে উঠবে বলেই মনে হয়। মাসকয়েক আগে যাদেরকে একসঙ্গে এখানে ডেকে এনে একেবারে আসল সেই বিদেশি পানীয় সহযোগে সারা রাত ধরে রহস্যময় আয়াহুয়াস্কা সেরিমনি আয়োজন করে মুগ্ধ করে দিয়েছিল, এবং যারা সকলেই সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির অনুরোধ করেছে আবার, তারাই তাকে উদ্ধার করবে এই বিপদ থেকে, নিজেদের প্রয়োজনে। কম খরচ করেছে সে তাদের পিছনে? সরকারি অফিসার, হ্যাকার, ব্যাঙ্কের লোক, পুলিশ—এসব হাই প্রোফাইল লোকেদের পোষার খরচ যেমন প্রচুর, তেমনই এরা যে কোনও আইনি ও বেআইনি সমস্যার সমাধানও করে ফেলতে পারে অবলীলায়। আরেকটা চুমুক সে দিতে গেল মাটির গ্লাসে, আর অনুভব করল যে গ্লাসটা তো আগেই খালি হয়ে গেছে। কাজ কি তাহলে শুরু করে তাহলে শুরু করে দিয়েছে জিনিসটা তার ভেতরে? কীরকম যেন হালকা হালকা লাগছে তার। জানলার বাইরে অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ আলোর ঝলকানি আর তীব্র আওয়াজ৷ তার জন্মের সময়ও এরকমই ঝড়বৃষ্টি আর বিদ্যুৎ চমকের ঘনঘটা দেখা গিয়েছিল। তাই তো তার নাম দেওয়া হয়েছিল বিদ্যুৎ। তার স্পষ্ট মনে হল, জানলার বাইরে বজ্রপাতের আলোগুলো যেন একটা নির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকার নিচ্ছে, সেগুলো যেন অসংখ্য ছোট ছোট ভাগে ভাগ হয়ে আয়তাকার রূপ নিয়ে উড়তে উড়তে এসে ঢুকে পড়ছে জানলা দিয়ে। তারপর ঘিরে ধরছে তাকে সেই গোলাপি টুকরোগুলো। প্রত্যেকটার গায়েই দু’ হাজার সংখ্যাটা সে স্পষ্ট দেখছে পাচ্ছে। কোনও জাল নোট নেই, সব যেন আসল নোট৷ হাওয়ায় উড়তে উড়তে সব এসে তার কোলে জমা হচ্ছে। এই তো, তার সাধনা সফল। জাদু শুরু করে দিয়েছে তার এদেশীয় জাদু পানীয়, একেবারে আসল অ্যামাজনীয় ধাঁচে। আনন্দে বিদ্যুৎ অট্টহাস্য করে উঠল, মনে হল যেন বাজ পড়ল আবার কোথাও।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%