বিশ্বরূপ মজুমদার

মাথাটা ভারী হয়ে ঝুঁকেই পড়েছিল দু’ হাঁটুর মাঝে। আচমকা ঝাঁঝালো গন্ধে চটক ভাঙে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। ডানে বাঁয়ে সব অস্পষ্ট। আশেপাশে দোকান বাজার তো নেই-ই। হাইওয়ে দিয়ে কোনও গাড়ির হর্নের শব্দও পাওয়া যাচ্ছে না। ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে শুধু শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিঁর ডানা ঝাপটানো। মশার জটলা তাজা রক্ত খেতে শরীরময় ঘুরে বেড়াচ্ছে।
হায় ঈশ্বর।
এতক্ষণ কি তাহলে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন?
ক’টা বাজে?
এতটা ভুল হল! ব্যাটারি টর্চটা আনলে অন্তত...একবার ভেবেছিলেন রাত করেই বেরোবেন। শান্তি পাচ্ছিলেন না। ডান চোখ অনবরত কাঁপছিল। ঠাকুমা বলতেন, ছেলেদের ডান চোখ নাচলে নাকি খারাপ হয়! খারাপ হওয়ার আর কি কিছু বাকি আছে? ভগবান একটা ছেলে, একটা মেয়ে দিয়েছেন। সেটাও সামলে রাখতে পারলেন না? নিজেকে নিজেই মাঝে মাঝে থুতু ছেটাতে ইচ্ছে হয়। সারাজীবন দগ্ধে দগ্ধে বাঁচা। আজ শেষবারের মতো চেষ্টা করে দেখবেন।
সব ঠিক থাকলে মেয়ে এতদিনে বাপের ক্ষমতা দেখবে। যে করে হোক স্নেহার একটা ভালো পাত্রের সঙ্গে বিয়ে দিতেই হবে। আর কত উড়বে?
চোখের পাতা টেনে খোলার চেষ্টা করলেন সুমন্ত মিত্র। গায়ের মধ্যে কেমন শিরশির করে ওঠে। গন্ধটা খুব চেনা। এই পারফিউমটা স্নেহা অনেকবার...বিশেষ করে ও যখন সেজেগুজে বেরোত। শিরদাঁড়া সোজা করে নিঃশব্দে একটু একটু করে উঠে দাঁড়ালেন। নাক জ্বলে যাচ্ছে। গন্ধটা ভীষণ উগ্র।
গ্রহের সমস্ত অন্ধকার আজ একসঙ্গে এক জায়গায় জড়ো হয়েছে। কিছুই ঠাওর করতে পারছেন না। মেইন রোড ছাড়িয়ে অনেকটা ভেতরেই এই আমবন। যতরকম অপকর্মের আড়ত এটাই। উপদ্রব বেড়েছে চৌধুরীরা কলকাতায় চলে যাওয়ার পরপরই। এই জমিটা ওদেরই। দেখাশোনার লোক না থাকলে যা হয়। সেই কবে থেকে দেখে আসছে। জেনেও আসছে। স্কুলের বন্ধু শম্ভুকে এখানেই তো কারা যেন রাতারাতি গলা কেটে ফেলে রেখে গেছিল। খুনিকে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। সব ফাইল মন্ত্রী আমলাদের ড্রয়ারে।
আজ সেখানেই কিনা তাঁকে আসতে হল? তাও লুকিয়ে? মান ইজ্জত সব জলাঞ্জলি গেল। হ্যাঁ, এখানেই আসবে স্নেহা। ফোনে তো তেমনটাই বলল।
তাহলে কি ও-ই...?
একটুর জন্য চোখ জুড়ে গেছিল। তখনই কি মেয়েটা এসেছে? বাবাকে দেখতে পায়নি তো?
নাহ এভাবে সংসারটাকে ভেসে যেতে দেওয়া যাবে না। বুক কেঁপে উঠলেও নিজেকে শক্ত করলেন সুমন্তবাবু। প্যান্টের পকেট থেকে বের করে আনলেন ৭.৬৫ মিলিমিটার (এমএম) বোরের পিস্তল।
নব বলেছে, ‘এ এমন জিনিস মরা মানুষেরও বল আনে। হিম্মত রাখ। লাইসেন্স নেই বটে। কিন্তু ওটা আমার সবচেয়ে লাকি চার্ম। জিতে ফিরবি।’
গন্ধটা আরও এগিয়ে আসছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
ষষ্ঠন্দ্রিয় সজাগ হয়।
কোনও শব্দ হচ্ছে কি?
শুকনো পাতা মাড়িয়ে আসার শব্দ। কেউ এসেছে। খুব কাছাকাছি। দূরত্ব হয়তো দশ হাতেরও কম।
ডাল ঝটপটিয়ে গুপ গুপ করতে করতে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায় একটা প্যাঁচা। আজ চাঁদ উঠবে না জানেন সুমন্তবাবু।
পায়ের শব্দটা থেমে গেল। যে আসছে সে সাবধান, সতর্ক।
কেউ কি খুব নিচু গলায় কথা বলছে?
উনি শুনতে পাচ্ছেন না কেন!
ফাঁপা বুকে একটু একটু করে রক্তস্রোত বাড়ছে। দু’হাতে প্রাণপণে চেপে ধরেন পিস্তল।
আর তারপরেই অন্ধকারের মধ্যে কারা যেন ধস্তাধস্তি শুরু করে।
বেশ খানিকটা দূরের অসংখ্য চলমান ছোট ছোট আলো তারার মতো এগিয়ে আসে। শুকনো ডালপালা মুচড়ে দিয়ে এগিয়ে আসে অনেকগুলো পা। ওই তো হালকা হুইসেলের আওয়াজ...
পুলিশ?
সুমন্ত মিত্র এগিয়ে যান।
“নাহ...” বলে চিৎকার করে ওঠে একটা নারীকণ্ঠ।
“স্নেহা...”
আতঙ্কে কলজে যেন মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে সুমন্ত মিত্রের। মুহূর্ত মাত্র। ঝিলিক দিয়ে ওঠে অস্ত্র। পিস্তল চলার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলাতে না-পেরে ছুঁচালো শাখার ওপর চিৎ হয়ে পড়ে যান তিনি। অসহ্য যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যায় পিঠের চামড়া।
“স্নেহা...”
আরেকটা অচেনা পুরুষ কন্ঠ। ভারী কিছু সজোরে আছাড় খায় মাটিতে।
উৎকট বারুদের গন্ধে একটু একটু করে হারিয়ে যায় আগের ঝাঁঝালো গন্ধটা।
**********
“কুইক দেবী কুইক...মেয়েটা যেন কিছুতেই পালাতে না পারে। প্রদীপ তুমিও যাও। যে করে হোক স্নেহাকে আমার লাগবেই। মুর্দা নয়। জ্যান্ত। মাথার মধ্যে ভালো করে গেঁথে নাও।”
“স্যার...” সাব ইনস্পেক্টর দেবী কী যেন বলতে যাচ্ছিল।
“আবার কীসের কনফিউশন? ডোন্ট শুট। রিমেমবার ইট ডোন্ট শুট।” প্রতীকের ইন্সট্রাকশন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়তে শুরু করে প্রদীপ ও জনা পাঁচেকের টিমটা।
এমনই আশঙ্কা ছিল। তাই দেবীকে সঙ্গে রাখতেই হয়েছিল। স্নেহাকে হ্যান্ডেল করা কঠিন মেয়েমানুষেরই কাজ।
“স্যার শিগগিরি আসুন। লোকটার অবস্থা ভালো নয়। এক্ষুণি হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। প্রচুর ব্লিডিং হচ্ছে।” মোটা কাণ্ডের আমগাছটার তলা থেকে গলা তুলে চেঁচায় হাবিলদার শ্যামল।
চার পা এগিয়েই স্পষ্ট দেখতে পায় প্রতীক। এবার আর একটুও বুঝতে অসুবিধা হয় না ওর। মাথার মধ্যের প্যাঁচানো জটগুলো যেন আলগা হতে চায়।
তাহলে কি ঠিক পথেই এগিয়েছে?
গুলিটা ডান হাতের কনুই ছুঁয়েছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে চারদিক। ভাবতেও অবাক লাগে একটা মেয়ে হয়ে এতটা নৃশংস? স্নেহাই নিশ্চয়ই কাউকে দিয়ে...! জ্ঞান এখনও আছে। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে গোঙানির মতো জড়ানো আওয়াজ বেরিয়ে আসছে। নিচু হয়ে বসে পড়ে প্রতীক।
“এই যে...এই যে...কে গুলিটা করল? আপনি তাকে দেখেছেন? বলুন...” ওপর দিকের কাঁধ ধরে ক্রমাগত ঝাঁকায় প্রতীক। এখন অমানবিক ঠেকলেও এটাই পুলিশি দস্তুর। মরবে না এটুকু শিওর। কিন্তু বলা তো যায় না যদি কোনও কারণে জ্ঞান না ফেরে কেসটা সলভ হতে হতেও আটকে যাবে। লোকটা আধবোজা চোখ সামান্য খুলতে চেষ্টা করে।
প্রতীক নিজের মুখটা আরও খানিকটা নিচু করতে যাবে ঠিক তখনই ডেকে ওঠে আরেকজন।
“স্যার এদিকে আরেকজন...এই দেখুন এই পিস্তলটা দিয়েই হয়তো...”
পড়ি কী মরি করে প্রতীক এসে দাঁড়ায় আরেকটা গাছের কাছে।
সর্বনাশ!
“ইনি...এখানে...?” চিৎ হয়ে পড়ে। চোখ বোজা। ডান হাতের খানিক দূরেই পিস্তল। কিন্তু...বিস্ময়ের রেশ কাটতেই চায় না। বসে পড়ে চোখ বোজা মাথাটা কোলে তুলে নেয় প্রতীক। পালস চেক করে। খুব ধীরে ধীরে চলছে নাড়ি।
এগালে ওগালে নাড়া দিতেও কোনও সাড় পায় না।
এর মধ্যেই অ্যাম্বুলেন্স চলে আসে। পাতলা লাল-রঙা আলোর চাদর ছড়িয়ে গেছে আকাশময়। বাসা ছাড়ার প্রস্তুতি করছে পাখিরাও। আর এক-দু’ঘণ্টার মধ্যেই আলো ফুটে যাবে। রাস্তায় মানুষের গলা পাওয়া যাচ্ছে। অপারেশনের খবর ছড়িয়ে পড়েছে।
তাড়াতাড়ি দু’জনকে স্ট্রেচারে তোলার নির্দেশ দিতেই খুব কাছ থেকে দু’-দুটো ফায়ারিংয়ের কান ফাটানো আওয়াজে কেঁপে ওঠে গোটা চত্বর।
উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে প্রতীক। বুঝতে পারে বাইরে থেকে দেখে বোঝা না গেলেও ভেতরটা তোলপাড় করছে। মানুষজনের অস্থিরতা বেড়ে গেছে আরও দু’ দাগ। একের পর এক চাকার শব্দ এসে থেমে যাচ্ছে হাইওয়েতেই। মিডিয়াও গন্ধে গন্ধে ঠিক চলে এসেছে।
উফ প্রতীকের ভেতর থেকে বিরক্তি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায়।
ভুরু দুটো কাছাকাছি এগিয়ে আসে। সন্দেহ...সন্দেহ...সন্দেহ...। ধাঁধাটা যেন মিলতে গিয়েও মিলছে না। পুরোটাই ওকে সলভ করতে হবে। করতেই হবে।
চোখের সামনে সিনেমার পর্দার মতো ভেসে উঠছে মৃত প্রমিত আর বাবার করুণ মুখটা।
না-মেলা অঙ্ককে মিলিয়ে দিতেই হবে।
**********
“আপনি...আপনি আমাকে এইভাবে প্ৰশ্ন করছেন? ধমকাচ্ছেন? আপনি পারলেন প্রতীকবাবু?”
“শাট ইয়োর মাউথ। খবরদার। আমার সামনে আর ন্যাকামো করবে না। তুমি কি ভেবেছ আমি আর পাঁচটা ছেলের মতোই গাধা?”
জলভরা চোখে স্নেহা একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে প্রতীকের দিকে।
“চু...চু...চু...ওসব ফালতু ইমোশনে কোনও কাজ হবে না। জলদি জবাব দাও। শাগরেদ কোথায়? নাহলে কিন্তু ধোলাই দিতে এক মিনিটও ভাবব না। দেবী বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে।”
“আপনি আমাকে কোন ইভিডেন্সে ধরেছন? কোনও প্রমাণ আছে?”
“কত প্রমাণ চাও স্নেহা?”
সশব্দে বেজে ওঠে প্রতীকের মোবাইলটা। স্নেহার চোখে চোখ রেখেই আলতো করে ফোনটা রিসিভ করে প্রতীক।
দু’-চার সেকেন্ড...
ওপাশের কথাগুলো শুনতে শুনতেই ওর ঠোঁটের কোণে হাসির ঝিলিক খেলে যায়।
কে যেন বলে ওঠে, ‘বাবা আমি ভুল করিনি। জানি তুমি আমাকে অবিশ্বাস করো। জানি প্রমিতের জন্য তুমি সারারাত ঘুমাতে পারো না। আর মাত্র কয়েকদিন বাবা...আর একটু সময় আমায় দাও। আমি ঠিক পারব।’
**********
দরজাটায় সজোরে একটা লাথি মারে প্রদীপ ঘোষ। হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে কিছু তাগড়াই চেহারার পুলিশ।
“কোথায় পালের গোদা? কোথায় ঘাপটি মেরেছে?” নেশায় টইটুম্বুর সতেরো-আঠারো বছরের ছেলেটার কলার ধরে চোখ লাল করে জিজ্ঞেস করে অফিসার।
সারা ঘর ধোঁয়ায় ধোঁয়া। চোখ মুখ দিয়ে সেই ধোঁয়া ঢুকে টিমের অনেকেরই কাশি শুরু হয়ে গেছে। শুধু মদ, সিগারেট নয়। ওরা যে সাংঘাতিক চড়া ড্রাগ নিচ্ছিল অস্বস্তিপূর্ণ আবহাওয়ায় যে কেউ বলতে পারবে।
“স্যার বাথরুমের দরজাটা খুলতে পারছি না...” জুনিয়র এসে বলতেই কলার ছেড়ে প্রদীপ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টার্ন নেয় রুমের বিপরীতে।
“ধাক্কা লাগাও জোরে আরও জোরে...”
কসরত করতে পাঁচ মিনিট মতো লেগে যায়। শেষ মুহূর্তে প্রায় সেকেন্ডের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে দু’হাতে অপরাধীকে জাপটে ধরে প্রদীপ। বলির বখরার মতো ছটফট করতে থাকে শরীরটা। কিন্তু পুলিশের হাত থেকে অত সহজে ছাড়া পাওয়া যায় না।
আর সামান্য দেরি হলেই লোকটা তিনতলার ছাদ থেকে লাফ মারত। মাথাটা বাথরুমের জানলা দিয়ে গলিয়েই ফেলেছিল। তলে তলে শয়তানি এক নিমিষে দফারফা হয়ে যেত।
কোঁচকানো চুল। ছয় ফিটের কাছাকাছি টিকালো নাক। আপাদমস্তক নিরেট ভদ্রলোক চেহারাটার আড়ালে যে কে লুকিয়ে আছে তা আর প্রদীপকে আলাদা করে বলে দিতে হয়নি। প্রতীক স্যারের কাছে কতবার যে ছবিটা দেখেছে সারা জীবনেও ভুলবে না।
হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দেবলাল আর বাকিদের দিকে অপরাধীকে ছুড়ে দেয় প্রদীপ।
পকেট থেকে মোবাইল বার করে স্যারের নাম্বার ডায়াল করে।
স্যার এতক্ষণে নিশ্চয়ই স্নেহার পেট থেকে সব ওগড়াচ্ছে।
**********
—“তাহলে স্যার আমাকেও আপনি অবিশ্বাস করেছেন? কেমন সব ঘোল খাওয়ানো কথাবার্তা বলেছেন বলুন? আপনি নাকি স্নেহার...”
—“এই সমস্ত কেসে নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে নেই। সেটা অন্তত এই প্রফেশনে ভালো করে জানা উচিত।”
—“না আসলে ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যায়। তাও এখন যখন কেসের একেবারে ফিনিশিং লাইনে। তখন না-বলে পারছি না। ভেবেছিলাম মেয়েটা যে পরিমাণ মারকাটারি দেখতে আপনি হয়তো...”
—“স্নেহার সোর্সটা কখন কীভাবে পেয়েছি তা আমি এখনই বলছি না। কিন্তু এটা ঠিক যখনই আমি শিওর হই মেয়েটা রাকেশ সামন্তর সঙ্গে মিলে ‘আয়াহুয়াস্কা’র এবং আদার ড্রাগস নিয়ে কারবার শুরু করেছে। ইনফরমেশন নিতে থাকি। পুলিশের সব সময় একটা কথা মাথা রাখতে হবে। ‘খবরি’ কিন্তু দু’দলেই মজুত থাকে।
“ওরাও আমার মতো কিছু সংকেত পাচ্ছিল। চোরেদের যতই বুকের পাটা থাকুক না কেন, ধরা পড়ার ভয় তো থাকেই। আমি যতই লোকসমক্ষে স্নেহাকে ব্যাঙ্কে কাজ করি বলে পরিচয় দিই না কেন কিছু তো বুঝেছিল। আর ঠিক সেই কারণেই প্রমিতকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়। পুরীতে নাহলে হঠাৎ করে ভাইয়ের গ্রুপটাকেই বা টার্গেট করবে কেন? এসব দল খুব ইনফরমেশন না পেলে এগোয় না।”
প্রতীকের গলাটা ভারী হয়ে আসে। সিগারেটটা মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে রগড়ে আবার বলতে শুরু করে, “ওরা ভেবেছিল রাকেশকে মৃত বলে পরিচয় দিলেই হয়তো আমার খোঁজা বন্ধ হয়ে যাবে। ভাইকে মেরে ওর মুখ থেঁতলে রাকেশের জামা কাপড় পরিয়ে লাশ ফেলে রেখে দিয়েছিল। ইচ্ছে ছিল পুলিশের খাতায় যে করে হোক রাকেশের অস্তিত্ব লোপাট করা। ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হয় স্নেহার ভাই সজলের বয়ানে। তৃণাকে যে খুন করে সে ছিল রাকেশ সামন্ত। কারণ পেছন থেকে সজল পরিষ্কার দেখেছে। কোঁকড়া চুল। ওই হাইট। আরও কিছু। স্নেহার যে পরিমাণ উঁচুতে ওঠার অভীপ্সা। তাতে ও দু’দিকেই খেলতে শুরু করেছিল। আমিও এটা টের পেয়েছিলাম। স্নেহার ভাই সজলের ওপর তৃণাকে দিয়ে যে বিদ্যুৎ নজরদারি রাখছে। সেটা স্নেহা জেনেছিল। বিদ্যুৎ স্নেহার পরিবারকে নষ্ট করার চেষ্টা করলেও স্নেহার সঙ্গে এঁটে উঠতে পারেনি। সজলের ছিল মেয়েমানুষের নেশা। বিদ্যুৎ ভেবেছিল তৃণাকে দিয়ে সেটা কাজে লাগাবে। ফল হল উলটো। এই গোটা সাপ লুডোর গেমে বিদ্যুৎ, স্নেহা, রাকেশ, মুকেশ সবাই এক লাইনের। শুধু কেউ মাঝে মাঝে সাপের মুখে পড়ে যায় এই যা।”
—“কিন্তু স্যার বিদ্যুৎ হঠাৎ স্নেহার সঙ্গে ওইভাবে দেখা করতে এল কেন? সুমন্ত মিত্র’র গুলিটা যে কোনও সময় তো ওকে টপকে দিতে পারত।”
—“পিরিতি বুঝলে এ হল পিরিতি। কাঁঠালের আঠা। বিদ্যুৎ অপরাধ জগতের মানুষ হলেও সাচ্চা মন নিয়ে স্নেহাকে চেয়েছিল। বন্ধু রাকেশের হাতে বান্ধবীকে তুলে দিয়ে তিল তিল করে মরছিল। তাই হয়তো দেখা করতে গিয়েছিল। বোঝাতে চেয়েছিল স্নেহাকে। এদিকে স্নেহা গেমের পর গেম খেলেছে। বাবা সুমন্ত মিত্র যে মেয়েকে খেয়াল রেখে চলেছেন ধুরন্ধর মেয়ে সেটা জানত। আর তাই বাবাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ফোনে এমন করে কথা বলেছিল যাতে বাবা বোঝে মেয়ে সেই ছেলের সঙ্গেই দেখা করতে যাচ্ছে যে কিনা পনেরো লাখ টাকা চেয়ে বিয়ে ভেস্তে দিয়েছে। বিদ্যুৎকে দিয়ে স্নেহার আর কোনও কাজ হবে না সেটা ও বুঝেছিল। ও আরও বড় সিঁড়ি খুঁজছিল।
—“বকাটে ছেলে থানায়, মেয়ে এইভাবে নষ্ট হচ্ছে, আর বিয়ের পর থেকে বউয়ের সঙ্গে তো বিবাদ লেগেই ছিল। সুতরাং সুমন্ত মিত্র তাঁর কোনও বন্ধুর কাছ থেকে পিস্তল ধার করেন। তবে সম্ভবত স্নেহা এটা বুঝতে পারেনি। আমার যতদূর মনে হয় ও ভেবেছিল বাবা ঠিক পুলিশে খবর দিয়ে রাকেশ নামের ছেলেকে ধরিয়ে দেবে। কিন্তু ও তো জানত রাকেশ নয় বিদ্যুৎ ধরা পড়বে। লাভ হবে ওরই। ভালোবাসার মরদের এসব রাস্তায় না থাকাই মঙ্গল। বিদ্যুতের দম যেটুকু আছে ফুরিয়ে যাবে, কথায় আছে পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা।”
—“আর স্যার সাউথ আফ্রিকার হিরেটা?”
—“ওটা নকল। তবে আসলটা পেতেও বেশি দেরি নেই। মুকেশ পাটানিয়ার অনেক কিছুই এখন বিদ্যুতের কাছে নয়, স্নেহার কাছে আছে। পাক্কা খবর আছে।”
—“স্যার ডাক্তারবাবু বললেন স্নেহার বাবাকে এবার ছুটি দেওয়া যাবে।”
—“হুঁ কোর্টে কেস ওঠার পর। যা হবে সোমবারে। ততদিনে বি কেয়ারফুল।”
“স্যার স্যার স্নেহা কনফেস করেছে...” ঘামে ভিজে প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দেয় দেবী।
টেবিলে হাতটা চাপড়ে লকআপ রুমের দিকে এগোয় প্রতীক।
প্রদীপ উঠতে যেতেই হাত নাড়ে প্রতীক। বলে, “আমি যাচ্ছি।”
স্যার মানা করলেন কেন?
ধুর যা খুশি হোক। ওর কাজ তো করেছে। রাত আড়াইটে বাজে।
প্রদীপের মাথাটা এতক্ষণে হালকা হয়। এতদিনের দৌড়ঝাঁপ কিছুটা হলেও সার্থক। লম্বা অক্সিজেন বুকে ভরে নিয়ে একটা চারমিনার ধরায়। আর কিছু না হোক আগলা বছরে ছোট্ট একটা প্রমোশন তো আশা করছেই। ওইরকম হাই প্রোফাইল ক্রিমিনাল রাকেশ সামন্তকে পাকড়াও করা কি চাট্টিখানি কথা? তাছাড়া সঞ্জয়ের বোসের কারসাজিও তো ওই ধরিয়েছে। মনে কেমন একটা পুলক জাগে। বুকপকেট থেকে মোবাইলটা বার করতেই থমকে যায়। রিনরিন করে কী যেন একটা হালকা সুরে বেজে চলেছে। ইস ভাবনার আনন্দে এতক্ষণ খেয়ালই করেনি ও এখনও স্যারের রুমেই বসে।
আওয়াজ সামনের টেবিল থেকেই আসছে।
স্যারের ফোন?
ওঁকে দিয়ে আসা দরকার। কী জরুরি ফোন কে জানে!
ঝুঁকে পড়ে ফোনটা হাতে নিতে গিয়েই কেমন একটা খটকা লাগে। ফোনের স্ক্রিনে একটা সেভ নাম্বার অনবরত ঢেউ খেলে যাচ্ছে।
মোটা ইংরেজি ক্যাপিটাল হরফ ‘এম. পি’!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন