অষ্টম পর্ব : রিয়া ভট্টাচার্য

বিশ্বরূপ মজুমদার

8

একতাল অন্ধকার যেন জমাট মেঘের মতো থমকে আছে ঘরখানায়। এ.সি-র শীতল হাওয়া চাবুক হানছে শরীরে৷ ঘড়ির কাঁটায় এখন রাত বারোটা, চারিদিক নিস্তব্ধ। পথকুকুরের ডাকও শোনা যাচ্ছে না ঠিকঠাক।

বিছানায় শুয়ে বারবার এপাশ ওপাশ করছিল স্নেহা, ঘুম আসছে না৷ বাবা-মা অন্যঘরে নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। ভাই এখনও বাড়ি ফেরেনি, কবে ফিরবে তাও বলা যাচ্ছে না ঠিকঠাক। পুলিশি ঝামেলায় যেভাবে ওরা পাকেচক্রে জড়িয়ে গেছে তাতে এত সহজে যে নিষ্কৃতি পাবে না ধরে নেওয়াই যায়। বুকের ভেতরটা এখনও বড্ড খালি খালি লাগছে তার। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে’রাতে বিদ্যুৎ তাকে বাঁচাল কেন? কেনই বা তার সবচেয়ে বিশ্বাসের মানুষ রাকেশ তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করার আগে ভাবেনি বার দুই! আচ্ছা, তার চোখের সামনেই যখন বন্দুকের গুলি খেয়ে লুটিয়ে পড়ল রাকেশ, কই একবারও তো তার মনে একটুও কষ্ট অনুভূত হয়নি! তবে কি সে রাকেশকে ভালোবাসে না! তবে সে ভালোবাসে কাকে!

বিছানা ছেড়ে উঠে আস্তে আস্তে দেওয়াল জোড়া আয়নাটার দিকে এগিয়ে যায় স্নেহা, অন্ধকারে নিজ অবয়বই তার চোখে কেমন ঝাপসা ঠেকে৷

‘আদপে তুমি কি চাও স্নেহা? ভালোবাসা নাকি অর্থ! কীসের মোহে ছুটতে গিয়ে এমন মাকড়সার জালে আটকে গিয়েছ তুমি! কে বাঁচাবে এবার তোমায়! বলো কে!’

নিজেকেই ফিসফিস করে প্রশ্ন করে স্নেহা। আয়নায় ঠোঁট রেখে নিজের অন্ধকার অবয়বকে চুম্বন করে বার দুয়েক।

‘ওহ স্নেহা ডার্লিং, তোমার চাহিদার আর শেষ নেই! অনেক ওপরে উঠতে চাও তুমি। পয়সা দিয়ে কিনে নিতে চাও সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য-অনুভব। এত অর্থলোভী কেন তুমি স্নেহা!’

বিদ্যুতের বলা কথাগুলো এখনও কানে বাজে। তখন আর কতই বা বয়স হবে তার! সবে চাকরিতে ঢুকেছে। সুদর্শন বিদ্যুতের সঙ্গে তার তখন ধুন্ধুমার প্রেম। নিজেকে কেমিস্ট হিসাবে পরিচয় দিয়েছিল বিদ্যুৎ। কিন্তু স্নেহা কখনও জানার চেষ্টা করেনি, তাকে দেওয়া এত দামি দামি গিফটের খরচ শুধুমাত্র কেমিস্ট হয়ে বিদ্যুৎ তুলত কী করে! তার তখন শুধু চাই, আরও আরও চাই। আজীবন মাকে বাবার সঙ্গে টাকার জন্য অশান্তি করতে দেখেছে সে। বাবার ছাপোষা মধ্যবিত্ত আচরণ পছন্দ হত না মায়ের। বড্ড উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন তিনি৷ দুই কামরার ছোট বাড়ি, ছেলেমেয়েদের সরকারি স্কুল, বছরে একবার ট্রেনে অথবা বাসে দিঘা অথবা পুরী, নিদেনপক্ষে তারকেশ্বর; এই জীবনে কোনও মতেই সন্তুষ্ট হতে পারতেন না তিনি। চাপা স্বভাবের ছিলেন। মনে পুষে রাখতেন একরাশ ক্ষোভ৷ ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে নিজের অন্তরের ক্ষোভটুকু উজাড় করে দিতে কসুর করেননি মা। সজল ও স্নেহা, ছোট থেকেই বড় আত্মকেন্দ্রিক!

নিজের প্রেমের ক্ষেত্রেও স্নেহার বরাবর পছন্দ ছিল বিত্তবান পাত্র, যার কাছে আবদার করলে আকাশের চাঁদ এনে দিতে পারে৷ সেই স্নেহাই কিনা প্রেমে পড়ল বিদ্যুতের!

সম্পর্কে থাকাকালীন স্নেহাকে আদরে স্নেহে ভরিয়ে দিতে চেষ্টার কসুর করেনি বিদ্যুৎ। কিন্তু স্নেহা কি সম্পর্কের ঘেরাটোপে হাঁপিয়ে উঠেছিল খানিক! তাই হবে হয়তো৷ নয়তো বিদ্যুতের বন্ধু রাকেশকে একবার দেখাতেই দুর্বল হয়ে পড়ল কেন সে! তা কি শুধুই লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট ছিল! নাকি ছিল শুধুমাত্র মুখের স্বাদবদলের আহ্বান!

অন্ধকার ঘরে নিজেই নিজের গালে দু’খানা চড় মারে স্নেহা৷ রাকেশের জন্য, আজ রাকেশের জন্য তার এই অবস্থা৷ পুলিশি তদন্তের মুখে পড়তে হচ্ছে, অফিসে সম্মানও প্রায় তলানিতে৷ কী করে মুখ দেখাবে সে! তার উঁচু নাক যে কাটা গেল তার একটিমাত্র ভুল সিদ্ধান্তের জন্যই!

‘তোমার সিদ্ধান্তের বিরোধীতা কখনও করিনি, আজও করব না৷ যা চেয়েছ এনে দিয়েছি, এবারও তাই দিলাম। তবে একটা কথা মনে রেখো, বিদ্যুৎ ফেলা থুতু চাটে না! রাকেশের কাছে যাচ্ছ যাও, আমার কাছে আর কখনও ফিরে এসো না।’

খুব শান্তভাবে কথা কয়টি কেটে কেটে বলেছিল বিদ্যুৎ, যেদিন তার কাছ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিল স্নেহা। সে ভেবেছিল চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করবে বিদ্যুৎ, অনুনয় বিনয় করে আটকে রাখতে চাইবে তাকে। কিন্তু না, তার কোনওটাই হয়নি। নিজেই রাকেশকে ফোন করে ডেকে নিজের প্রিয়তমাকে তার হাতে সঁপে দিয়েছিল সে। সে’রাতে তারা তিনজন একসঙ্গে পার্টিও করেছিল। বিদ্যুতের মুখের ভাবে একটু ভাঁজও লক্ষ করেনি স্নেহা, কেমন যেন পাথরে কোঁদা তার মুখচ্ছবি। আচ্ছা ছেলেটার কি একটুও কষ্ট হয় না! আড়চোখে তার মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে সেদিন ভাবছিল স্নেহা৷ তার পরদিনই হারিয়ে যায় সে, কেউ সন্ধান পায়নি তার। আজ এতগুলো দিন পরে, সে ফিরল, শুধুমাত্র স্নেহাকে উদ্ধার করতে! তাহলে কি আজও বিদ্যুৎ তাকে ভালোবাসে! তাহলে সেদিন তাকে আটকাল না কেন! অতিরিক্ত আদরে বখে যাওয়া উচ্চাকাঙ্ক্ষী স্নেহাকে পারত না সে শাসন করতে! অধিকার ছিল তো তার!

অশ্রুনদী স্নেহার অজান্তেই তার কপোল বেয়ে গড়িয়ে নামে, সাক্ষী থেকে অন্ধকার ঘরের চলন্ত ঘড়িখানা।

**********

কাঠের বারান্দায় অস্থির হয়ে পায়চারি করছিল বিদ্যুৎ। তার প্ল্যান এখনও পর্যন্ত সঠিক রাস্তাতেই এগোচ্ছে। সজলকে নিজের প্রেমের জালে প্রায় তুলেই ফেলেছে তৃণা। বেইমান রাকেশটাকে সে গুলি করেছে নিজের হাতে। কিন্তু...

রাকেশ কি আদৌ মরেছে! পুলিশের ভয়ে সেই মুহূর্তে সেখান থেকে পালিয়ে আসার জন্য রাকেশের মৃত্যুটা কনফার্ম করার সম্ভব হয়নি তার পক্ষে, পরে তার লোকেরা জঙ্গলে গিয়ে খুঁজেও পায়নি বডিটা। এদিকে খবর আসছে পুলিশের কাছেও রাকেশের লাশ নেই। তাহলে লাশ গেল কই! বিদ্যুৎ জানে, অপরাধীর জান কই মাছের হয়, এত সহজে মরে না তারা। তা নাহলে, তার তো অনেক আগেই মরে যাওয়া উচিত৷ যেদিন প্রথম ওই মায়াজল পড়ল তার পেটে, এক লহমায় যেন অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল গোটা পৃথিবীটা। তবুও মরেনি সে, বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে। মায়াজলকে বশীভূত করে কাজে লাগিয়েছে নিজের। ব্যবসাকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলেছে। তবুও তার মনে সুখ নেই কেন! কেন নিজের আবিষ্কারের ওপরে গর্বিত হতে পারছে না সে! শুধুমাত্র নেশা বলে? নাকি এর পেছনে খেলা করছে সূক্ষ্ম অপরাধবোধ! বোঝে না সে।

তার মনে পড়ে মায়ের মুখখানা, আদর করে চিবুকখানা নেড়ে দিয়ে বলতেন, ‘অনেক বড় মানুষ হও, সবার প্রাণ বাঁচাও!’

প্রাণ! প্রাণ আর বাঁচানো হল কই! বায়োকেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশুনোও বিফলে গেল তার৷ অবশ্য খুব বেশি বিফলে গেল বলা যায় না, আজ তার এত প্রতিষ্ঠা, একচ্ছত্র অন্ধকারের সাম্রাজ্য, সবই তো ওই পড়াশুনার বলে।

বাবার ওষুধের দোকানটায় বসতে বসতেই ভেষজ লতাপাতা নিয়ে পড়াশুনো, রাতের ঘুম ত্যাগ করে বেডরুম সংলগ্ন ল্যাবে গাছগাছালি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, এতদিনে এর ফল পেয়েছে সে৷ কিন্তু তবুও সে সুখী নয় কেন! কেন রোজ রাত্রে ঘুমোতে যাওয়ার জন্য নিজের আবিষ্কৃত নেশার সাহায্য নিতে হয় তাকে! কেন!

স্নেহা! নামটা শুনলেই গা-টা শিরশির করে ওঠে তার। মেয়েটা রাকেশের জন্য চিট করেছিল তাকে। পুওর ওম্যান, লোভ আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার পেছনে ছুটতে ছুটতে বুঝতেই পারেনি যে সবাই আপন হয় না! আজ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে সে। তার প্রেমিক-পুরুষ তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে বেঁধে রেখেছিল। সে সঠিক সময়ে না পৌঁছলে হয়তো মেরেই ফেলত স্নেহাকে৷ ভালোই হত, অমন অর্থলোভী ব্যাভিচারিনীর বেঁচে থেকেই বা লাভ কী!

মাটিতে খক করে একদলা থুতু ফেলে বিদ্যুৎ। কী জন্য সে স্নেহাকে বাঁচাল নিজেই বুঝতে পারছে না সে। শুধুমাত্র নিজের প্ল্যানটাকে সাকসেসফুলি এক্সিকিউট করার জন্য, নাকি এখনও সে ভালোবাসে তাকে!

তৃণা, তার অন্ধকার জগতের অকুণ্ঠ সহকারিণী, সজলের জীবনে কিছুদিনের মধ্যেই মূর্তিমান কালো ছায়া হয়ে দেখা দেবে। মেয়েটা তাকে ভালোবাসে বোঝে বিদ্যুৎ। তার প্রতিটি কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে সে। এমনকী প্রথমবার মায়াজল গিলে যখন সে মরণের দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল, এই মেয়েটাই বাঁচিয়েছিল তাকে, কিন্তু...!

বিদ্যুৎ তাকে কোনওদিন ভালোবাসতে পারবে না। আসলে সে ভালোবাসতে পারবে না কাউকেই। স্নেহা আজও তার অস্তিত্ব জুড়ে ছেয়ে আছে, যা অস্বীকার করার সাধ্য তার নেই! কিন্তু কেন! কেন আজও স্নেহার প্রতি তার অকুণ্ঠ দুর্বলতা!

খক করে আরেকবার থুতু ফেলে বিদ্যুৎ। দুর্বলতা মাই ফুট! ভালোবাসা যখন ঘৃণায় বদলে যায় তখন সে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। সেও কি স্নেহাকে ঘৃণা করেনি? আলবাত করেছে! নিজেকে বছরের পর বছর ধরে তৈরি করেছে, একটা প্রায় অসম্ভব প্ল্যানকে নিয়ে এসেছে সাকসেসের দোরগোড়ায়। কেন!

শেষ দেখবে সে! জ্বালিয়ে দেবে ওই গোটা পরিবারটাকে। পরিবারটা অর্থপিশাচ, শুধুমাত্র ওই ভদ্রলোক মানে স্নেহার বাবা বাদে। তিনি তো স্ত্রী’র পোষ্য, স্ত্রী’র বিরুদ্ধে মাথা তোলার সাধ্য ওঁর নেই। অমন পুরুষের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভালো! ঘৃণায় মুখখানা বিকৃত করে বিদ্যুৎ।

‘মেয়ে যে চোখের সামনে উচ্ছন্নে গেছে স্যার! তখন আটকাননি কেন! এখন এত তৎপর হলে কী হবে! পৃথিবীর কেউই আমার হাত থেকে আপনাদের পরিবারকে রক্ষা করতে পারবে না। ভালোবাসার চেয়েও ঘৃণা শক্তিশালী!’

খ্যাঁক খ্যাঁক শব্দ করে বেশ কিছুক্ষণ হেসে নেয় বিদ্যুৎ। অন্ধকারে তার চোখ শ্বাপদের মতো জ্বলে। দূরে কোথাও কুকুর কাঁদছে। কাঁদুক শালারা! ওরাই সবার আগে বিপদের গন্ধ পায়। আর সে নিজে! সে নিজেই এখন বিপদ, মূর্তিমান অঙ্গার! ভালোবাসা তাকে কী-ই বা বাঁধতে পারে!

ভালোবাসার কথা মনে পড়তেই ভ্রূ কুঁচকে যায় তার। টেবিল থেকে বোতল তুলে নিয়ে ঢকঢক করে গিলে ফেলে নেশার তরল। ওফফ, এইবার শান্তি! এইসব ভালোবাসা-টালোবাসা বিদ্যুতের জন্য নয়৷ আদপে ভালোবাসা বলে কিছু হয়ই না এই পৃথিবীতে৷

বিদ্যুতের ঘোরলাগা চোখে মিটিমিটি নাচে জোনাকির আলো। এই তো, বড্ড ঘুম পাচ্ছে তার। ঘুমের অন্ধকারে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটা ঝাপসা আদুরে মুখ। তার কোলের কাছে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ছে বিদ্যুৎ। মুখটা আলতো ছুঁয়ে দিচ্ছে তাকে। মুখটা স্নেহার...।

81
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%