পঞ্চম পর্ব : সঞ্জয় কর্মকার

বিশ্বরূপ মজুমদার

5

আজ নিয়ে প্রায় চারদিন হয়ে গেল একটা ছোট্ট ঘরের মধ্যে বন্দি হয়ে রয়েছে স্নেহা। কী যে দুঃসহ সময় কাটছে এখন! প্রতিটা মুহূর্তে মৃত্যু-আতঙ্ক ওকে যেন গিলে খেতে আসছে। এই চারদিনের ভিতর কারোর সঙ্গেই কোনও রকম কনট্যাক্ট করতে পারেনি স্নেহা। চেতনা ফিরতেই দেখেছিল, মোবাইলটা ওর সঙ্গে নেই। আদতে এই নরক থেকে কবে মুক্তি ঘটবে তারও কোনও দিশা খুঁজে পাচ্ছে না ও। রাকেশকে ভালোবাসার মাশুল যে এভাবে চোকাতে হবে তা দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি স্নেহা। এখন তো মনে হচ্ছে, রাকেশ ওকে নিয়ে স্রেফ গেম খেলছে। আর যে খেলাটা রাকেশ কোনও ভাবেই হারতে চায় না।

মাথার ভিতর তীব্র একটা যন্ত্রণা অনুভব করছে স্নেহা। দু’হাতে মাথা চেপে ধীরে ধীরে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে ও। ঘরের ভিতরকার অস্বাভাবিক রকম নিস্তব্ধতায় নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দটাও এখন শুনতে পাচ্ছে স্নেহা। আকস্মিক অফিস কলিগ প্রতীক রায়ের মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে ওর। প্রতীক রায় কি ওকে ভালবাসে? সরাসরি কখনও কিছু না বললেও ওর দিকে একটু বেশিই যেন নজর প্রতীকের। সব ব্যাপারেই যেচে পরামর্শ দিতে আসে। হুটহাট নিজের কিউবিকল ছেড়ে চলে আসে ওর সঙ্গে গল্প করার টানে। একবার অফিসের গেটে দাঁড়িয়ে রাকেশের সঙ্গে কথা বলতে দেখে পরের দিনই মুখটা আষাঢ়ের মেঘের মতো কালো করে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘উনি বুঝি ম্যাডামের বয়ফ্রেন্ড! বাট ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আই ওয়ান্ট টু টেল দ্য ট্রুথ—ছেলেটার সঙ্গে আপনাকে কিন্তু মোটেও মানায় না। আপনি এত সোবার আর ও...’

‘দূর থেকে কাউকে এভাবে জাজ করতে যাবেন না প্রতীকবাবু। কিছু মানুষের মানসিকতা, তার গুণ দেখেও তাকে শ্রদ্ধা করা যায়। তাকে ভালোবাসা যায়।’

স্নেহার কথায় কিছুটা ঝাঁঝ আছে বুঝতে পেরে প্রতীক রায় প্রথমে নীরবতার পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু মুহূর্তখানিক পর সেই নৈঃশব্দ্য ভেঙে গলার স্বরটা যথাসম্ভব নামিয়ে বলেছিল, ‘হ্যাঁ, কার কী গুণ আছে সেসব আমার ভালোই জানা আছে। নেহাতই মুখ খুলি না তাই!’

‘হোয়াট ডু ইউ মিন? কী বলতে চাইছেন আপনি?’ স্নেহার গলার স্বর তখন বেশ চড়া। প্রতীক রায় কী একটা বলতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই ব্র্যাঞ্চ ম্যানেজার রণজয় সেন চলে আসায় দ্রুত পা ফেলে নিজের কিউবিকলে ফিরে গিয়েছিল প্রতীক।

তাহলে কি রাকেশের সম্পর্কে প্রতীক রায় কোনও গোপন কথা জানে! যা বলতে গিয়েও বলতে পারল না সেদিন! ইস কেন যে প্রতীক রায়কে পরে চার্জ করল না ও! তাহলে কোনও না কোনও ক্লু নিশ্চয়ই পাওয়া যেত। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য এখন নিজের ওপরেই রাগ জন্মাল স্নেহার।

রাকেশ যে কেন ওর সামনে আসছে না তা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছে না স্নেহা। অথচ ওর ভরসাতেই তো এত বড় ঝুঁকি নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে ও। এই চারদিনের মধ্যে একবার মাত্র ফোনে কথা হয়েছে রাকেশের সঙ্গে। যে প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা এই ঘরটার দরজা আগলে রেখেছে সেই সুনীল নামের ছেলেটার মোবাইলে ফোন করে ওর সঙ্গে কথা বলেছিল রাকেশ। ফোন কলটা রিসিভ করতেই রাকেশ উদ্বিগ্ন স্বরে বলে উঠেছিল, ‘আমি বড় বিপদের মধ্যে আছি স্নেহা। বাগুইআটি থানার এস. আই. সঞ্জয় বোস আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। কে যেন থানায় ইনফর্ম করেছে, আমি বেঁচে আছি। আর আমি নাকি কলকাতা শহরে জাল নোট কারবারের সবচেয়ে বড় পান্ডা। আমার নেটওয়ার্ক দেশে-বিদেশেও নাকি ছড়িয়ে আছে। এমনকী নিষিদ্ধ জঙ্গী গোষ্ঠীদের সঙ্গেও আমার...’ আর কথা বলতে পারছিল না রাকেশ। কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকার পর আবার ও বলতে শুরু করেছিল, ‘কিন্তু বিশ্বাস করো স্নেহা, আমি কোনও খারাপ কাজের মধ্যে নেই। তবু যে কী করে আমার নামটা বারবার পুলিশের কাছে চলে যাচ্ছে! অ্যান্টি-সোশ্যালিস্ট হিসাবে দাগিয়ে দিচ্ছে আমাকে!’

রাকেশের কথাগুলো শুনে বুকের ভিতরটা আকস্মিক কেঁপে উঠেছিল স্নেহার! ওর নিজের সামনেও যে বড়সড় একটা বিপদ অপেক্ষা করে আছে তা অনুমান করতে পারছিল ও। আর তার জন্য দায়ী রাকেশই। এই একটা মানুষ ওর জীবনটাকে যেভাবে তছনছ করে দিয়েছে তা ভাবতেই চোখের কোণে জল চলে এসেছিল স্নেহার। আর তাই তো কিছুটা উত্তেজিত হয়েই ও প্রশ্ন করেছিল, ‘আমাকে এভাবে আটকে রাখার উদ্দেশ্যটা কী শুনি?’

‘সঞ্জয় বোস তোমাকেও খুঁজছে। এবার কিন্তু আর শুধু জিজ্ঞাসাবাদ নয়, একেবারে ডাইরেক্ট চার্জ আনবে তোমার এগেইনস্টে।’

কথাটা রাকেশ নিচু স্বরে বললে স্নেহা চরম বিস্ময়ে প্রশ্ন করে উঠেছিল, ‘ডাইরেক্ট চার্জ আনবে মানে?’

রাকেশ তখন নির্বিকারভাবে বলে যাচ্ছিল, ‘সঞ্জয় বোসের কাছে কে যেন রিপোর্ট করেছে, এই জাল নোটের কারবারে তুমি আমার পার্টনার। তোমার হাত দিয়েই আমি নাকি সব জাল নোট ব্যাঙ্কে চালান করে দিচ্ছি।’

রাকেশের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা শেষ বাক্যটা সত্যিই বেশ কানে বেজেছিল ওর। রাকেশ তো সত্যি সত্যিই ওকে দিয়ে এই ঘৃণ্যতম কাজটা করাতে চেয়েছিল! নিছকই চোয়াল শক্ত করে ব্যাপারটা নিয়ে ও ঝগড়া করেছিল বলে রাকেশ ওকে কবজা করতে পারেনি।

‘সেদিন যে দু’লাখ টাকা আমাকে পাঠালে তা যে পুরোটাই জাল সেটা কী তুমি জানো? তাছাড়া, ব্যাগটার মধ্যে হেরোইন পাঠালে তুমি কোন সাহসে? আর নিজে না এসে কেন অপরিচিত একটা ছেলেকে দিয়ে এসব করালে?’ গলার স্বর চড়িয়ে স্নেহা মুহুর্মুহু প্রশ্ন করলে রাকেশ চরম বিস্ময়ের সুরে বলেছিল, ‘কী আবোল-তাবোল বকছ! ব্যাগের ভিতরের টাকাটা জাল! আর আমি তোমাকে হেরোইন পাঠাব? তাহলে নিশ্চয়ই ব্যাগ পালটে দিয়েছে শম্ভু। আচ্ছা, ব্যাগটার রং কি ব্রাউন ছিল?’

রাকেশের প্রশ্ন শুনে স্নেহা কিছুটা ভয়ার্ত স্বরে বলেছিল, ‘ব্ল্যাক’।

‘ও মাই গড! এসব কী হচ্ছে আমি তো এখন কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না।’

রাকেশের কথা শুনে স্নেহা তখন রাগত সুরে বলেছিল, ‘বোঝাবুঝির তো কিছু নেই। তুমি দু’-দু’বার দেখা করতে চেয়েও আমার সামনে আসোনি। জাস্ট গা ঢাকা দিয়ে বেড়াচ্ছ। আরও স্পষ্ট করে বললে, লুকোচুরি খেলছ আমার সঙ্গে।’

‘জেনে রাখো, পুলিশ কিন্তু তোমার দিকে চব্বিশ ঘণ্টা নজর রেখেছে। আর তাই তো লাস্ট মোমেন্টে ভবনা চিন্তা করে সুনীলদের পাঠালাম। আসলে, এভাবে না আনলে তোমাকে সঞ্জয় বোস সিওর অ্যারেস্ট করত। তোমাকে যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে আর যাই হোক সুনীলরা তোমার কোনও ক্ষতি করবে না। সুনীল আমার খুব বিশ্বস্ত বন্ধু। সুনীল তো বলেইছে, তোমার গায়ে একটা আঁচড় অব্দি ও লাগতে দেবে না।’

‘আমাকে এক্স্যাক্ট কোথায় রাখা হয়েছে সেটা তো বলো? আর আমার ফোনটাই বা কেড়ে নিয়েছে কেন এরা?’

স্নেহা কিছুটা কাতর স্বরে প্রশ্নগুলো করতেই রাকেশের জবাব এসেছিল, ‘সরি স্নেহা। এত কথা ফোনে বলা যাবে না। আমার ফোন কিন্তু ট্র্যাকও করতে পারে পুলিশ। তাহলেই সব শেষ। ওকে, এবার রাখি। আবার পরে কথা হবে।’

বেশ ব্যস্ততার ভাব দেখিয়ে চটপট কলটা কেটে দিয়েছিল রাকেশ। তারপর থেকে আর কোনও রকম যোগাযোগ করেনি ও।

গলাটা শুকিয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে। চেয়ার থেকে উঠে ঘরের সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা জলের বোতল থেকে দু’ ঢোক জল খায় স্নেহা। বাড়ির কথা এখন খুব মনে পড়ছে ওর। ছোটবেলা থেকে যে কোনও সমস্যায় পড়লেই বাবার পরামর্শ নিত ও। ধীর-স্থির তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ বাবা বরাবরই ওকে বিপদের মুখ থেকে বাঁচিয়ে আনতে পেরেছে। আর শিখিয়েছে, কীভাবে গভীর সংকটের মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। আর মা যে এখন কীভাবে দিন কাটাচ্ছে কে জানে! মা খুব নরম মনের মানুষ। একটুতেই বেশ ঘাবড়ে যায়। অফিস থেকে এক ঘণ্টা লেট করে ফিরলেই টেনশনে ঘরদোর এক করে মা। অথচ আজ নিয়ে চারদিন ও বাড়িতে নেই। নিশ্চয়ই খুব কান্নাকাটি করছে সারাক্ষণ। নাওয়া খাওয়া ছেড়ে হয়তো রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। তাছাড়া ভাই! এতক্ষণ পর ভাইয়ের কথাটা মনে পড়তেই বুকের ভিতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল স্নেহার। কী এমন জরুরি কাজ যে সজলকে কয়েকদিনের জন্য বাইরে যেতে হল! তাও আবার এইরকম পরিস্থিতিতে। ভাগ্যিস রাকেশ মার্ডার হয়নি। যদি সত্যি সত্যি হত! ভাইকে পুলিশ মোটেও ছাড়ত না। এইটুকু ছেলের রাগ যে কী চণ্ডালের মতো সেদিন ও চাক্ষুষ দেখেছে। রাকেশকে যেভাবে ধাক্কাটা মেরেছিল! ব্যালেন্স রাখতে না পারলে রাকেশের সেদিনই গুরুতর কিছু একটা...রাকেশের দিকে আঙুল উঁচিয়ে ভাই যে কেন বলল, ‘জাস্ট ওয়েট। তিন দিনের মধ্যে তোমাকে আমি সাইজ করে দেব। তোমার লাশও কেউ খুঁজে পাবে না!’

সবকিছুই কেমন যেন ধোঁয়াশা লাগছে এখন। রাকেশের সঙ্গে ওর সম্পর্কটা ঠিক দু’বছরের। আর বিদ্যুৎও আশ্চর্যরকমভাবে এই দু’বছর গায়েব। জালনোটের কারবার, ড্রাগ সাপ্লাইয়ে একসঙ্গেই উঠে আসছে বিদ্যুৎ আর রাকেশের নাম। জীবনে টপ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড-এ পৌঁছতে চেয়েছিল ও। ছোটবেলা থেকে কিছুটা উচ্চাকাঙ্ক্ষীও ছিল। কিন্তু তাই বলে কোনও অন্যায়ের সঙ্গে আপোশ করে তো নয়। অথচ দুর্ভাগ্যক্রমে জীবনে যে দু’জনকে ও ভালোবেসেছে সেই দু’জনই এখন পুলিশের হিট লিস্টে। সত্যি সত্যিই কোনও অমোঘ শক্তি কি ওকে ‘টপ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’-এ পৌঁছে দিতে চাইছে, যেখান থেকে চাইলেও ও আর নামতে পারবে না। ফিরতে পারবে না আগের সহজ সরল জীবনে।

স্নেহার মনে একঝাঁক প্রশ্ন এখন বারবার ঘুরেফিরে আসছে। রাকেশের সম্পর্কে এত তথ্য পুলিশকে দিচ্ছেটা কে? বিদ্যুৎ নাকি অন্য কেউ! এদিকে এত ঘটনা ঘটে যাওয়া সত্ত্বেও রাকেশ ওর সঙ্গে একবারও দেখা করছে না কেন? সত্যিই কি এস. আই. সঞ্জয় বোসের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে নাকি আড়ালে থেকে ভয়ঙ্কর কোনও ছক কষছে রাকেশ! সবচেয়ে আশ্চর্যের, সঞ্জয় বোসের মতো এমন দুঁদে পুলিশ অফিসার মার্ডার হওয়া একটা মানুষকে ঠিকঠাক আইডেন্টিফাই না করেই কোন যুক্তিতে তা রাকেশের মৃতদেহ ধরে নিয়ে তদন্ত শুরু করল! সঞ্জয় বোস কি তবে কাউকে আড়াল করতে চাইছে! হয়তো এমনও হতে পারে, বড় কোনও চাঁইকে বাঁচাতে রাকেশের মতো সাধারণ একটা ছেলেকে ঘুঁটি হিসাবে ব্যবহার করছে!

হঠাৎ ঘরের বাইরে থেকে ভেসে আসে কয়েকটা গলার স্বর। সতর্ক হয় স্নেহা। ধীর পায়ে হেঁটে এসে দরজায় কান পাতে ও। আর তারপরই বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মতো কেঁপে ওঠে স্নেহা। একটা গলার স্বর ওর ভীষণ পরিচিত। বিদ্যুৎ এখানে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%