একাদশ পর্ব : প্রদীপ দে সরকার

বিশ্বরূপ মজুমদার

11

“স্যার, এই ছেলেটাকে দেখে কিন্তু তেমন বড় ক্রিমিনাল বলে মনেই হচ্ছে না। একে এত মারধর করাটা কি ঠিক হচ্ছে স্যার?”

প্রদীপ ঘোষের কথা শুনে সঞ্জয় বোস ওর দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্ল্যভরে হাসল। বুকের কাছের দুটো বোতাম খুলে ঘামে ভেজা জামার কলারটা ঘাড়ের পিছনদিকে ঠেলে দিয়ে চেয়ারে এলিয়ে বসল। তারপর প্রদীপের দিকে তাকিয়ে বলল, “ক’টা ক্রিমিনাল ডিল করেছ? ঠান্ডা মাথায় দু’-দুটো মার্ডার করেছে এই ছেলেটা। রাকেশ সামন্ত আর তৃণা বোস এর শিকার। তুমি কি ভাবছ বাবা বাছা করে কথা বলে, চা-কফি-কোল্ড ড্রিংক্স খাইয়ে, গল্পচ্ছলে স্বীকারোক্তি আদায় করে নেবে?”

“কিন্তু স্যার আপনিই তো বলেছিলেন রাকেশ সামন্ত খুন হয়নি। আমাদের কাছে যা তথ্য রয়েছে তাতেও সেটাই মনে হচ্ছে। আর তাছাড়া এখনও তো ছেলেটা কিছু স্বীকার করল না।”

“আরে, সেগুলো আমাদের অনুমান মাত্র। রাকেশ খুন না হলেও কেউ তো একজন খুন হয়েছে। আর স্বীকারোক্তির ব্যাপারে আর একটু সবুর করো। সবে তিন রাউন্ড হল। ধমকানো, চমকানোর পর থার্ড রাউন্ডে সামান্য কড়কানো হয়েছে মাত্র। নেক্সট রাউন্ডেই সব বলতে শুরু করবে।”

“স্যার, থার্ড রাউন্ডে মিনিট পনেরো যেরকম থার্ড ডিগ্রি অ্যাপ্লাই করলেন তাতে যে কেউ সব কিছু কনফেস করত। ছেলেটা কিন্তু এখনও কিছু স্বীকার করল না। আপনি নিজেই ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে গেলেন। ছেলেটাও মার খেতে খেতে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হচ্ছে স্যার এই ছেলেটা এদের সঙ্গে নেই। ফেঁসে গেছে।”

সঞ্জয় বোস কিছু বলতে যাচ্ছিল এমন সময় দরজায় নক করে কেউ বলল, “এক্সকিউজ মি, আমি না-বলেই ভিতরে ঢুকে পড়লাম।”

দু’জনেই ঘুরে তাকিয়ে দেখল দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে প্রতীক রায়। হাতে একটা ফাইল। প্রতীককে দেখে সঞ্জয় বোস একটু রাগত স্বরেই জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার! আপনি হঠাৎ এখানে ঢুকে পড়লেন কী করে? কী ব্যাপার প্রদীপ, গেটে সমীর নেই?”

প্রতীক রায় খুব ঠান্ডা গলায় বলল, “আমি ওকে বলেই ঢুকলাম। আসলে খুব জরুরি প্রয়োজনে আসতে হল।”

সঞ্জয় বোস খুব বিরক্তি সহকারে বলল, “তেমন কিছু বলার থাকলে তাড়াতাড়ি বলে কেটে পড়ুন। আমরা ব্যস্ত আছি।”

প্রতীক খুব শান্ত গলায় বলল, “স্যার, আমি নিজেও একটু ব্যস্তই আছি। তবে তাড়াতাড়ি কেটে পড়ার জন্য আসিনি।” কথা বলতে বলতে একটা চেয়ার টেনে গুছিয়ে বসল। হাতের ফাইলটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, “আমি সজলের সঙ্গে কথা বলতে চাই।”

প্রতীকের কথা বলার ধরন দেখে সঞ্জয় বোস খেপে গেল। বেশ উঁচু গলায় বলে উঠল, “থানাটাকে কি নিজের বাড়ির ড্রয়িংরুম ভেবেছেন? সজলের এখন ইন্টারোগেশন চলছে। বুঝতেই পারছেন ওর সঙ্গে দেখা করা সম্ভব নয়। আর আপনি জানলেন কোত্থেকে যে ওকে আমরা অ্যারেস্ট করেছি? আপনাকে বেশ ক’দিন ধরেই নজরে রেখেছি। আপনার অ্যাক্টিভিটি যথেষ্টই সন্দেহজনক মনে হচ্ছে।”

প্রতীক আবার ঠান্ডা গলাতেই বলল, “আমার কোন অ্যাক্টিভিটিটা আপনার সন্দেহজনক মনে হয়েছে একটু বলবেন স্যার?”

“স্নেহার সঙ্গে আপনার নিয়মিত যোগাযোগ, স্নেহা উধাও থাকার সময় ওদের বাড়ি যাওয়া, সজলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা এ সবকিছুই যথেষ্ট সন্দেহজনক। আরও কিছু তথ্য আমরা যোগাড় করেছি। তৈরি থাকবেন, প্রয়োজন হলে আপনাকেও হাজির হতে হবে থানায়। এখন সজলের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া অন্য কোনও কথা থাকলে বলুন, নয়তো ফুটুন।”

প্রতীক হেসে বলল, “আমার সম্বন্ধে অনেক খোঁজই নিয়েছেন দেখছি। তা মূল চক্রী মানে রাকেশ কিংবা বিদ্যুতের ব্যাপারেও নিশ্চয়ই সমস্ত খোঁজখবর জোগাড় করে ফেলেছেন।”

সঞ্জয় বোস বেশ উত্তেজিত স্বরে বলল, “পুলিশ কী করছে সে ব্যাপারে কি আপনার সঙ্গে আলোচনা করব? কী মতলবে এখানে এসেছেন সেটা পরিষ্কার করে বলুন তো।”

প্রতীক মুচকি হেসে ফাইলটা থেকে কয়েকটা কাগজ বের করে বলল, “আপনারা যেমন কাজ করছেন আমিও নিজের মতন করে কিছু কাজ করছিলাম। এইগুলো দেখলে অনেক কিছু বুঝতে পারবেন মনে হয়।” বলে কাগজগুলো এগিয়ে দিল সঞ্জয় বোসের দিকে।

রাগ করেই এক ঝটকায় কাগজগুলো টেনে নিয়েছিল সঞ্জয় বোস। কাগজ বলতে কয়েকটা ছবি আর কিছু প্রিন্টেড কল লিস্ট। সেগুলোয় চোখ বুলিয়েই কেমন যেন ফ্যাকাশে হয়ে গেল সঞ্জয় বোসের মুখ। পাশ থেকে ঝুঁকে পড়ে প্রদীপ ঘোষও দেখছিল কাগজগুলো। ওরও চোখ কপালে উঠল। ছবিতে দেখা যাচ্ছে কোনও একটা পার্টিতে রাকেশের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে সঞ্জয় বোস। অন্য হাতে ড্রিংক্সের গ্লাস।

সঞ্জয় বোস ভেঙে পড়লেও মচকাল না। জিজ্ঞেস করল, “আপনি এসব কোথায় পেলেন? কীভাবে পেলেন?”

প্রতীক হেসে বলল, “এটাই তো আমার কাজ।” বলতে বলতে পকেট থেকে একটা কার্ড বের করে এগিয়ে দিতে গিয়ে বললেন, “এসিপি, সেন্ট্রাল ব্যুরো অফ নারকোটিক্স, অন স্পেশাল ডিউটি টু আনআর্থ দ্য হোল র্যাকেট রিভলভিং অ্যারাউন্ড আয়াহুয়াস্কা অ্যান্ড আদার ড্রাগস। এবার নিশ্চয়ই সজলকে ইন্টারোগেট করতে পারি?”

সঞ্জয় বোস এবার কাঁপতে শুরু করেছে। বলল, “হ্যাঁ স্যার, অ-অবশ্যই পারেন। লকআপ খুলে দিচ্ছি।”

প্রতীক মাথা নেড়ে বললেন, “উঁহু, আপনি না। প্রদীপবাবুই ব্যাপারটা দেখবেন। আপাতত আপনাকেও লক আপেই থাকতে হবে যে।”

লক আপের কথা শুনে সঞ্জয় বোস প্রায় ভেঙে পড়ল। হাত জোড় করে বলল, “স্যার, প্লিজ আমাকে মাফ করে দিন। ছোট্ট একটা ভুল করে ফেলেছি। অ্যারেস্ট করলে স্যার মুখ দেখানোর উপায় থাকবে না। সেদিন আমি জানতাম না রাকেশ ওই পার্টিতে থাকবে। আর যে নম্বর থেকে ফোন এসেছিল সেটাও যে রাকেশের কারসাজি আমি জানতাম না স্যার। কিছু ইনফরমেশনের খোঁজে চলে গিয়েছিলাম।”

“তাই নাকি!” বলে সঞ্জয় বোসের চোখে চোখ রেখে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল প্রতীক। তারপর ধমকে বলল, “একদম ন্যাকামো করার চেষ্টা করবেন না। এখানে কয়েকটা ছবি আর একটা কল লিস্টের কপি দেখলেন। রাকেশের সঙ্গে আপনার আরও অনেক ছবি আমাদের কাছে পৌঁছে গেছে। তাতে অনেক কিছুই প্রমাণ করা যাবে। আপনার ফোন আমরা গত পনেরো দিন ধরে ট্যাপ করে রেখেছি। তাতে বুঝতে পেরেছি যে রাকেশের সঙ্গে আপনার যোগাযোগটা অনেক পুরনো। আর আপনার এক মামা শ্বশুরের পদবী তো সামন্ত, তাই না?”

এবারে গর্জে উঠে স্বমূর্তি ধারণ করল সঞ্জয় বোস। বলল, “অফিসিয়ালি এই কেস এখনও আমার হাতেই আছে। আর আমার অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আপনার কাছে নেই। অফিসিয়ালি আপনার পরিচয়টাও আমি জানি না। ঠিক কিনা? আর তাই তদন্তের প্রয়োজনে,” বলতে বলতে সঞ্জয় বোস কোমরের রিভলবারে হাত দিল। কিন্তু চোখের পলকে ছিটকে উঠলেন প্রতীক রায়। বাঁ পায়ের একটা সাইড কিক আর ডান হাতের মোক্ষম আপারকাট সঞ্জয় বোসকে আছড়ে ফেলল থানার মেঝেতে। পরের মুহূর্তে আর একটা মারাত্মক ঘুষিতে সঞ্জয়ের ডান কাঁধের জয়েন্ট অবশ হয়ে গেল। সঞ্জয় বোস তাকিয়ে দেখলেন এই ঘুষিটা মেরেছে তার এতদিনের সঙ্গী প্রদীপ ঘোষ।

প্রতীক মুচকি হেসে প্রদীপ ঘোষকে একটা থামস আপ দেখিয়ে বলল, “ওয়েল ডান।” তারপর সঞ্জয় বোসকে মেঝে উপুড় করে ফেলে ওর হাতদুটো পিছন দিকে ধরে রেখে ঠান্ডা গলায় বলল, “সঞ্জয় বাবুর অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট আমার কাছে আছে। আপনি বাকিটা সামলে নিন। আর আপাতত আপনিই এ থানার চার্জে থাকবেন। এ ব্যাপারে কমিশনার সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে।”

সঞ্জয় বোসকে হাতকড়া পরিয়ে লক আপে ঢুকিয়ে প্রদীপ ঘোষ প্রতীক রায়কে বলল, “স্যার, এবার কিন্তু সজলকে দেখতে হবে। আপনি আর একটু আগে চলে এলে বেচারাকে এত মার খেতে হত না।”

“কী করব বলুন। আপনি যখন সজলের অ্যারেস্টের খবর দিলেন, আমি তখন ক্যানিং-এর মাছের আড়তে বরফের চাঁই ভেঙে ড্রাগস উদ্ধার করছি। বিদ্যুৎ বেশ ভালো নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাছের সঙ্গে সাপ্লাই করত আয়াহুয়াস্কা।”

**********

আজ সকাল থেকেই আবহাওয়া ভালো নয়। ভোরবেলায় ঘণ্টাখানেক প্রবল বর্ষণের পর থেকে একটানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হয়ে চলেছে। সঙ্গে হালকা শনশনে বাতাস। রাস্তাঘাট জনমানবশূন্য। পথের কুকুরগুলিরও দেখা নেই। এমন আবহাওয়ায় খুব প্রয়োজন ছাড়া কেউ রাস্তায় বের হয় না। কিন্তু সুমন্ত মিত্রকে বের হতে হয়েছে। অবশ্য খুব বিপদে পরেই বেরিয়েছেন তিনি। তাঁর ছেলে-মেয়ে দু’জনেই মারাত্মক বিপদের মধ্যে আছে।

সজলকে পুলিশ তুলে নিয়ে গেছে। ছেলেটা একটু রগচটা হলেও মানুষ হিসেবে খারাপ নয়। ও কোনও খারাপ কাজে জড়িয়ে যাবে না। এই বিশ্বাস বাবা হিসেবে সুমন্ত মিত্রের আছে। তবুও ছেলেটা এই বিপদের মধ্যে পড়ে গেল। থানা পুলিশের চক্করে ছেলেটার ভবিষ্যৎ না নষ্ট হয়ে যায়। ওদিকে স্নেহাকে রাকেশ শাসাচ্ছে। মেয়েটা মায়ের ধাঁচ পেয়েছে। অল্পতে সন্তুষ্ট নয়। এত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ভালো নয়। নিজের যোগ্যতার ওপরেও ভরসা নেই মেয়েটার। রাকেশের সঙ্গে ওর বিয়েটা সুমন্ত মিত্র একেবারেই মেনে নিতে পারছিলেন না। ছেলেটার হাবভাব দেখে ভালো লাগেনি তাঁর। মেয়ে আর মেয়ের মায়ের চাপে পড়ে বাধ্য হয়েছিলেন মেনে নিতে। কিন্তু তারপর তো রাকেশ নিজেই পনেরো লাখ টাকা চেয়ে সব ভেস্তে দিল।

এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, রাকেশ কি ইচ্ছে করেই স্নেহার সঙ্গে ওর বিয়েটা ভেস্তে দিতে চেয়েছিল? আচ্ছা স্নেহা ওকে টাকা দিয়ে সাহায্যই বা করত কেন? এবং এতকিছুর পরেও স্নেহা ওর ফোন পেলে পুলিশকে বলতে চাইছে না কেন? মেয়ের প্রতি সন্দেহের একটা মেঘ জমা হচ্ছে সুমন্ত মিত্রের মনের কোণে।

আজ রাকেশ ফোন করে স্নেহাকে ডেকে পাঠিয়েছে। সুমন্ত মিত্র আজকাল বাধ্য হয়েই মেয়ের ঘরে আড়ি পাতেন। আজও স্নেহার ফোন আসতেই দরজায় কান পেতে শুনছিলেন। স্নেহা চাপা স্বরে কথা বললেও এটুকু বুঝেছেন আজ রাত ন’টা নাগাদ বাগুইআটির পি.ডব্লিউ.ডি-র কোয়ার্টারের পিছনে রেলপুকুরের পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় ওকে দাঁড়াতে বলেছে রাকেশ। স্নেহাকে কিছু একটা নিয়ে যেতে বলেছে। সেই জিনিসটা না নিলে ওদের বিপদ বাড়বে। অন্তত স্নেহার কথা শুনে তাই মনে হয়েছে।

সুমন্ত মিত্র এসব জানার পর আর চুপ করে বসে থাকতে পারেননি। মেয়েটা আবার কোন বিপদে পড়তে চলেছে কে জানে। ওদিকে পুলিশকেও জানানো যাবে না। এমনিতেই সঞ্জয় বোস ওদের পুরো পরিবারকে সন্দেহ করছে। তৃণা নামের একটা মেয়েকে খুন করেছে এই অভিযোগে তুলে নিয়ে গেছে সজলকে। অথচ সজল বারবার বলেছে যে লোকটা তৃণাকে গুলি করেছে তাকে দূর থেকে একঝলক দেখে রাকেশ বলে মনে হয়েছে। কিন্তু সঞ্জয় বোস সজলের কোনও কথাই বিশ্বাস করতে চাইছিল না। উলটে রাকেশের বিরুদ্ধে অভিযোগটাই উড়িয়ে দিল। এই সঞ্জয় বোসকে বিশ্বাস করা মুশকিল। সুমন্ত মিত্রের কেন জানি মনে হচ্ছে সঞ্জয় বোস সজলকে ফাঁসাতে চাইছে। এখন সজলের কী হবে কে জানে। তাই নিজেই কিছু একটা করতে চাইছেন। ন’টার অনেক আগেই এসে হাজির হয়েছেন এই জায়গায়। কৃষ্ণচূড়া গাছটার থেকে বেশ খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।

একবার পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন জিনিসটা ঠিকঠাক আছে কি না। সেই স্কুলে পড়ার সময় এনসিসি করতে গিয়ে বন্দুক চালানো শিখেছিলেন। এখন এই চরম বিপদের দিনে ছেলে আর মেয়ের জীবন বাঁচাতে একরকম বাধ্য হয়েই নব’র সঙ্গে দেখা করেছিলেন গত পরশু। একসময় নব’র সঙ্গে ফুটবল খেলেছেন। পরে নব চাকরি বাকরি না পেয়ে গুন্ডা দলে ভিড়ে গিয়েছিল। এখন আবার নামি প্রোমোটার হয়ে ভদ্দরলোক হয়ে গেছে। এলাকার লোক ওকে এখন সমাজসেবী বলে খাতির করে। বিপদে পড়ে সুমন্ত মিত্র সেই নব’র সঙ্গেই যোগাযোগ করেছিলেন। ওকে বলেছেন যে ওদের গোটা পরিবার মারাত্মক বিপদের মধ্যে আছে। অন্তত আত্মরক্ষার জন্য একটা অস্ত্রের খুব প্রয়োজন। অনেক বলে-কয়ে তবে চল্লিশ হাজার টাকার বিনিময়ে একটা পিস্তল জোগাড় হয়েছে। না, আত্মরক্ষা নয়, প্রয়োজনে মেয়েকে রক্ষা করার জন্য আজ ওটা ব্যবহার করবেন। নিজের জীবন নিয়ে আর ভাবেন না সুমন্ত মিত্র। সজল আর স্নেহাকে বাঁচাতেই হবে। আজ যদি দরকার হয় রাকেশকে গুলি করে মারবেন তিনি। ওই শয়তানটা ওদের গোটা পরিবারটাকে শেষ করে দিল। স্নেহাকে এই পাঁক থেকে বের করে আনার এটাই একমাত্র পথ।

পিস্তলটা পকেট থেকে বের করে হাতে নিয়ে একটা গাছের গোড়ায় ঠেস দিয়ে বসলেন সুমন্ত মিত্র।

**********

স্নেহা হ্যান্ডব্যাগে জিনিসগুলো গুছিয়ে নিল। ব্যাগে ঢোকানোর আগে আরেকবার হাতে নিয়ে দেখল। রাকেশ একসময় এগুলো রাখতে দিয়েছিল ওর কাছে। বলেছিল দরকার মতো নিয়ে যাবে। কিন্তু স্নেহা পরে বেঁকে বসে। ভেবেছিল রাকেশের সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলে তো এগুলো ওরই হয়ে যাবে। বুঝতে একটু ভুল হয়ে গিয়েছিল। ভাবতে পারেনি বিয়ের কথা পাড়তে এসে রাকেশ পনেরো লাখ চেয়ে বসবে। আসলে এগুলোর দাম হিসেবেই চেয়েছিল টাকাটা। স্নেহা যাচাই করে দেখেছে এগুলোর দাম পনেরো লাখের অনেক বেশি। ভেবেছিল পরে রাকেশের সঙ্গে দরদাম করে ম্যানেজ করবে। কিন্তু রাকেশ এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। এগুলো না পেলে সজলের জীবন সংশয় হতে পারে। স্নেহা ভাবতেই পারেনি রাকেশ এভাবে পুলিশকে হাত করে রেখেছে। আসলে ওদের গ্যাংটার ক্ষমতা ঠিকভাবে মাপতে পারেনি ও। ভেবেছিল শুধুই রাকেশ, বিদ্যুৎ আর মুকেশ পাটানিয়া। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে ওদের জাল অনেক বড়।

স্নেহা শেষবারের মতো হাতের তালুতে রেখে দেখে নিল। ঘরের এলইডি আলোয় ঝিকমিকিয়ে উঠল পাথরগুলো। দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত হিরের শহর কিম্বার্লের হিরে। এর মধ্যে দুটোর রং হালকা নীল। নীলা নাকি সকলের সহ্য হয় না। ওরও হয়নি বোধহয়। তাই একের পর এক বিপদ ঘনিয়েছে ওদের পরিবারকে ঘিরে। তাই কি? ভাগ্যে বিশ্বাস করে না স্নেহা। নীলা দুটোকে মুঠোয় পুরে খানিকক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর ওগুলো ব্যাগে রেখে আলমারি খুলে একটা বডি স্প্রের ছোট্ট ক্যান তুলে নিল হাতে। না, এটা বডি স্প্রে নয়, ক্লোরোফর্ম। সেরকম বুঝলে রাকেশকে...

দেখা যাক কী হয়। ভাইটাকে বাঁচাতে হবে। বাঁচাতেই হবে। ও তো এসবের মধ্যে ছিল না। তবুও ওর জীবনটা কেন নষ্ট হবে? তাছাড়া এই হিরেগুলোও হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করছে না।

**********

“স্যার, আপনি তো জানতেন স্নেহা মিত্র রাকেশ সামন্তকে মিট করতে যাচ্ছে। এখন বাড়ি থেকে বের হচ্ছে।”

কন্ট্রোলরুমের ফোনটা পেয়ে প্রতীক রায় গম্ভীর গলায় বললেন, “তোমরা ফলো করবে। পুরোপুরি তৈরি থেকো। আমি সময়মতো পৌঁছে যাব।”

প্রতীকের ফোন স্পিকারে ছিল বলে প্রদীপ ঘোষ সব কথাই শুনতে পাচ্ছিলেন। খানিকটা অবাক হয়েই বলে, “স্যার, স্নেহার সবকিছু এত ডিটেলে জানতে পারছেন কী করে?”

প্রতীক রায় চোখ নাচিয়ে বললেন, “যেদিন ওদের বাড়িতে গিয়েছিলাম সেদিন স্নেহার ঘরে একটা ছোট্ট মাইক্রোফোন সেট করে এসেছিলাম। ওর টেবিলের তলায়। আসলে কী জানো তো, স্নেহা মিত্রের প্রতি আমার অনেক দিনের দুর্বলতা। কিন্তু তিনি তো আমায় পাত্তাই দিলেন না।” বলেই হা হা করে হাসতে লাগলেন।

প্রদীপ ঘোষ অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল তার নতুন স্যারের দিকে। এই মানুষটাকে দেখে কে বলবে মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগেই এই থানায় কত কিছু ঘটে গেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%