বিশ্বরূপ মজুমদার
দেবীকে ছুটি দিয়ে প্রতীক স্নেহার লকআপে গিয়ে ঢুকল।
জোর গলায় বলল, “দেবী বলল তুমি কনফেস করেছ! খুব ভালো খবর!” তারপর চট করে সামনের দিকে দেখে এসে নিচু গলায় বলল, “হিরেগুলো কোথায়? মুকেশ অত্যন্ত চিন্তিত। সে আমার ফোনের অপেক্ষায় রয়েছে।”
স্নেহার চোখ ছোট ছোট হয়ে গেছে। সারা মুখে আর গায়ে মারের দাগ। দেবীকে সামলানো সহজ ছিল না। জামাকাপড়গুলো ভিজে গায়ের সঙ্গে সেঁটে রয়েছে। ছিঁড়েও গেছে কয়েক জায়গায়। তাও মহিলা বলে তাকে সেইরকম অর্থে থার্ড ডিগ্রি দেয়নি দেবী।
স্নেহা মাথা নাড়ল, ফিসফিস করে বলল, “আমাকে এখান থেকে বেরোতে না দিলে আমি কিছুই বলব না। আর হ্যাঁ, এইটুকু বলে দিতে পারি আসল হিরে দুটো আমার কাছেই আছে। সাউথ আফ্রিকার কিম্বারলির হিরে দুটো। হালকা নীল রং। নীলা আমার সহ্য হল কি হল না সেটা পরে ভেবে দেখা যাবে।”
প্রতীক গলা তুলে বলল, “আচ্ছা বদ মেয়ে তো তুমি!” পরক্ষণেই গলা নামিয়ে বলল, “আমি সেইজন্যে তৈরি হয়েই এসেছি। দুটো স্মোক বম্ব রয়েছে আমার কাছে। ওগুলোকে ফাটালেই ধোঁয়ার প্রাচীর তৈরি হয়ে যাবে আমাদের চারিদিকে। কিন্তু একটা কথা মনে থাকে যেন, যেখানেই যাবে আমার সঙ্গে যেতে হবে। আর ফাঁকি দিতে পারবে না।”
“আমার ভাই আর বাবাকে ছেড়ে দিতে হবে,” হিসহিস করে বলল স্নেহা, “আমি অর্থ ভালোবাসি কিন্তু পরিবার সবসময় আগে আমার কাছে।”
“ঠিক আছে ঠিক আছে সব হবে।”
“না, আপনার মতন দু’মুখো সাপদের আমি মোক্ষম চিনি! আমি এটাও জানি যে কাজ হাসিলের পর আপনারা হয়তো আমাকে মেরে ফেলবে। তাই সবকিছু আদায় না করে আমি হিরের সন্ধান কিছুতেই দেব না!”
প্রতীক স্বাভাবিক স্বরে বলল, “মেয়ের এত বুদ্ধি তো জানাছিল না!” বলে চট করে একবার লকআপের সামনেটা দেখে এল। কেউ ওদের দিকে দেখছে না, সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। চট করে পকেট থেকে একটা ধোঁয়ার বোমার সলতেতে আগুন লাগিয়ে শিকের মধ্যে দিয়ে গলিয়ে টুক করে সামনের অফিসের দিকে ঠেলে দিল। গলগল করে ধোঁয়া বেরতে লাগল সেটা দিয়ে আরেকটাতে আগুন ধরিয়ে লকআপের মধ্যে বসিয়ে রাখল। স্নেহার হাত নিজের হাতে নিয়ে বলল, “চলো এবার আমার সঙ্গে।”
প্রদীপের সমস্ত খুশির আমেজ এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। সারা জীবনের যত শিক্ষা, প্রশিক্ষা, অভ্যাস সব কিছু মাথা চাড়া দিয়ে উঠল সেই একটি মুহূর্তে। রাত আড়াইটের সময় যতটা সজাগ হওয়া যায় ততটাই সজাগ হয়ে উঠল সে। এম পি যে কে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই তার মনে। প্রতীকের বলা কথাটা মনে পড়ে গেল তার, ‘এই সমস্ত কেসে নিজের ছায়াকেও বিশ্বাস করতে নেই।’
ফোনটা ধরতে হবে। পুলিশের চাকরিতে অনেক কিছুই শিখেছে প্রদীপ। যেমন শিখেছে অনেক কিছু ব্যাপারে খেয়াল রাখতে। যে গুণের জন্যে সে সঞ্জয় বোসকে ধরিয়ে দিতে পারল সেই গুণের জোরেই প্রতীকের ফোনের পাসওয়ার্ড জানে সে। স্যার যখন ফোন রিসিভ করে তখন তার আঙুলের দিকে খেয়াল রেখেছে প্রদীপ। ১২৮৫১২, কীসের নম্বর জানে না প্রদীপ কিন্তু ওটাই পাসওয়ার্ড। ফোনটা মিসড কল যাওয়ার আগে দ্রুত গতিতে নম্বরগুলো টিপে সবুজ বোতামে আঙুল ছোঁয়াল প্রদীপ।
ওপাশ থেকে একটা কন্ঠস্বর ভেসে এল, ‘কী ব্যাপার বস? তোমার কোনও পাত্তাই নেই। কথা ছিল তুমি আমাকে পদে পদে ইনফরমেশন দেবে আর এখন তো বেশ কয়েক ঘণ্টা হয়ে গেছে! আমাকে ভুলে যাওনি তো?’
ফোনটাকে মুখ থেকে দূরে করে মুখে রুমাল চাপা দিয়ে যতটা প্রতীকের মতন গলা করা সম্ভব তার পক্ষে ততটাই করে প্রদীপ বলল, ‘ব্যস্ত ছিলাম। চারপাশে লোক, ফোন করা সম্ভব হয়নি। এখনও কাজেই রয়েছি। অনেক ডেভেলপমেন্ট হয়েছে, পরে ফোন করছি।’
‘ঠিক আছে তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে পারব না। তুমি যদি দু’মুখো সাপ হও তাহলে আমিও কিন্তু দু’মুখো বিছে! এত সব কিছু এমনি এমনি হয়নি! যদি তোমার ডবল ক্রসের একটাও ইঙ্গিত পাই তাহলে কিন্তু তুমি শেষ। তুমিও জানো আর আমিও জানি সে ক্ষমতা আমার আছে। জোড়া নীলকমল ঘরে না ফিরলে কিন্তু তোমার নিস্তার নেই, মনে থাকে যেন।’
প্রদীপ কোনও রকমে উত্তর দিল, ‘হুঁ!’
ওপাশ থেকে লাইন কেটে দিল এমপি ওরফে মুকেশ পাটানিয়া। ফোন ছেড়ে প্রদীপের মাথা ভোঁ-ভোঁ করছিল। হিরেগুলো তার মানে আসল। প্রতীক মিথ্যে বলে ওকে কাটিয়েছে। স্নেহার কাছেই রয়েছে তার মানে ওগুলো। কী করবে সেই নিয়ে কয়েক সেকেন্ড ভাবল প্রদীপ। এটা বিশাল জাল। সেই জাল ওর পক্ষে একা গোটানো সম্ভব নয়। প্রতীক গভীর জলের মাছ হতে পারে কিন্তু কথায় বলে না যে বাপেরও বাপ আছে! সেটা একেবারে একশো পার্সেন্ট ঠিক।
চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে স্টিলের ক্যাবিনেটের তালা খুলে কয়েকটা ফাইল ঘেঁটে একটা নম্বর খুঁজে বার করল প্রদীপ। অফিসের ফোন থেকেই সেই নম্বরটাতে ফোন করল।
রাত আড়াইটের সময়ও ওপাশ থেকে সজাগ কন্ঠস্বর ভেসে এল, ‘হ্যালো? কে বলছেন?’
‘স্যার আমি প্রদীপ বলছি। প্রদীপ ঘোষ। কয়েক বছর আগে সাত বছরের একটা বাচ্চার অপহরণের কেসে আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তখন আপনি বলেছিলেন কোনও ব্যাপারে দরকার হলে সোজা আপনাকে ফোন করতে। তাই আজ আপনার কথা মনে হল স্যার। একটা বিশাল জালে জড়িয়ে পড়েছি। আমার পক্ষে একা কিছু করা সম্ভব নয়। আর ফোনেও কিছু বলতে চাই না। দেওয়ালেরও কান থাকতে পারে। আপনাকে দলবল নিয়ে আসতে হবে খুব শিগগির। নাহলে বড্ড দেরি হয়ে যাবে। আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে ওরা জিতে যাবে। সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না।’
‘কী ব্যাপারে সেটার কিছু ইঙ্গিত দিতে পারবে? কিছু নাম?’
‘হ্যাঁ স্যার, বিদ্যুৎ, রাকেশ সামন্ত, মুকেশ পাটানিয়া, এই নামগুলোই যথেষ্ট আমার মনে হয়, তাই না?’
‘ওরে বাবা সে তো জ্যাকপট!’
‘হ্যাঁ, স্যার তাই বলছিলাম। ইয়ে মানে সরষে দিয়ে মাছের ঝালটা সবে খেতে বসেছি এমন সময় ফোনটা এসে গেল!’
‘বুঝেছি! তুমি যা করার করো, আমরা এক্ষুনি পৌঁছচ্ছি। তোমার সুপারভাইসার প্রতীক কোথায়?’
‘উনি স্নেহাদেবীর কনফেসান রেকর্ড করতে গেছেন, সরষে দিয়ে মাছের ঝাল স্যারেরও খুব পছন্দ কিন্তু তখনই দেবী ম্যাডাম এসে বললেন স্নেহা কনফেস করেছে তাই স্যারকে যেতে হল।’
‘ঠিক আছে। আমি রত্নাকর আর টিম নিয়ে এক্ষুনি আসছি। সাবধানে থেকো।’
প্রদীপ ফোনটা রেখে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল ধোঁয়ায় ভরে গেছে ঘর!
ফোন ছেড়েই সিবিআইয়ের স্পেশাল ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন অশোক সান্যাল। অফিসার রত্নাকর দিঘে বহুকাল কলকাতায় থাকার দরুন পরিষ্কার বাংলা বলেন এবং বোঝেন। অশোক সান্যাল তাঁকে বললেন, “টিমকে খবর দিয়েছি। আমাদের এক্ষুনি যেতে হবে রত্নাকর। সরষের মধ্যে ভূত!”
স্নেহাকে নিয়ে ধোঁয়ার চাদরের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে গাড়ি করে কিছুটা দূর গিয়েই প্রতীকের খেয়াল হল যে তার মোবাইলটা তার কাছে নেই। নিজের বোকামির জন্যে নিজের কান মুলতে ইচ্ছে করছিল তার। কোথায় পড়ে গেল ফোনটা? ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে স্নেহাকে নিয়ে পালাবার সময় লকআপেই পড়ে গেল নাকি অন্য কোথাও? হঠাৎ মনে হল অফিসেই ফেলে আসেনি তো? তাহলে তো খুব মুশকিল। ওই সবজান্তা প্রদীপটার হাতে পড়লে আর রক্ষে নেই। মুকেশকে ফোন করে বলা দরকার যে ওর ফোন হারিয়েছে সেটাতে ফোন না করতে। কিন্তু ফোন করা তো যাবে না। সব নম্বর তো মোবাইলেই সেভ করা। এখন তো আর কেউ নম্বর মনে রাখে না অত বড় বড় নম্বর সব। স্নেহার কাছে মুকেশের নম্বর থাকতে পারে অবশ্য।
“তোমার কাছে ফোন আছে? মুকেশকে একটা ফোন করতে হবে। আমার ফোনটা হারিয়েছি।”
“নাহ, আমাকে লকআপে নিয়ে যাওয়ার আগেই পকেটের সব জিনিস তোমার ওই দেবী মেয়েটা নিয়ে নিয়েছিল। বলল ছাড়া যখন পাব তখন ফেরত দেবে তাই আমার কাছে কিছু নেই,” স্নেহা গোমড়া মুখ করে বলল।
“ঝামেলা হয়ে গেল তাহলে তো। মুকেশ না আবার ব্যস্ত হয়ে আমার ফোনে ফোন করে বসে।”
“ওকে ফোন করা থেকে আটকাবার একমাত্র উপায় হল ওর ডেরায় গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করা। মুখোমুখি সব কিছু বলে দিতে পারবেন তখন।”
“হিরে না নিয়ে ওর কাছে পৌঁছলে ও আমাদের আস্ত রাখবে না!”
“হিরে ও পেয়ে যাবে। কিন্তু আগে আমার ভাই, বাবা আর আমার কারও কিছু হবে না সেই প্রতিশ্রুতি চাই আমি ওর কাছে।”
“আর আমি?”
“আমি এখন নিজের পরিবার ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। রাকেশকে না, বিদ্যুৎকে না, আপনাকেও না। কার মনে কী আছে তা বোঝা দুষ্কর। অনেক হয়েছে এইসব আমি এখন এইসব থেকে মুক্তি চাই। আমার ভাগের পাওনা পেয়ে গেলেই আমি সরে পড়ব।”
হা হা করে হাসল প্রতীক, “আরে বাবা এটুকুও জানো না এই পথ হল পিচ্ছিল পথ, একবার হড়কে গেলে সেই যে নীচে নামতে শুরু করবে আর ওপরে ওঠার উপায় নেই সোনা। এ চোরাবালি এখন তোমাকে টেনে নিয়ে কালো আরও কালোর দিকে। ফেরার তো পথ নেই! তোমারও না আমারও না। তোমার অতগুলো বয়ফ্রেন্ড, বিদ্যুৎ, রাকেশ, মুকেশ, আমি… তুমি সবার মুখ দেখেছ, সবার সঙ্গের ফায়দা লুটেছ, এবার কি আর তারা তোমার ছেড়ে দেবে ভেবেছ? একেবারে ষোলোআনা উসুল করে ছাড়বে। এই চক্র থেকে ছাড়া পাওয়ার একমাত্র উপায় মৃত্যু! এছাড়া এসব লাইন থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না, সেটা তোমার আগেই বোঝা উচিত ছিল। কিন্তু তোমরা এসব বোঝো না। তৃণাও বোঝেনি…”
“হুঁ। হয়তো বোঝা উচিত ছিল যে রাকেশ, বিদ্যুৎ, মুকেশ এরা কেউ ভালো লোক নয় কিন্তু ইন্টারনেটে আলাপ হলে প্রথমে তো আর সেইসব বোঝা যায় না। পরে যখন বুঝলাম তখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে লোভ, সেই লোভ সংবরণ করতে পারিনি আমি। এত তাড়াতাড়ি এত টাকা আমি সারাজীবন চাকরি করেও রোজগার করতে পারতাম না। আর এখন আমি জানি যতক্ষণ ওই হিরে দুটো আমার কাছে আছে ততক্ষণ ওরা আমাকে মারবে না। ওই দুটো ওদের চাই। ওই দুটোই এখন আমার ট্রাম্পকার্ড।”
“হুঁ, লোভ অতি সাংঘাতিক জিনিস। সেইজন্যেই তো কথায় বলে ‘লোভে পাপ, পাপে মৃত্যু’…”
স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে প্রতীক গাড়িটাকে শহরের বাইরের একটা ভাঙা গোডাউনের দিকে নিয়ে চলল। মুকেশের সঙ্গে ওর শেষ যখন কথা হয়েছিল তখন সে বলেছিল হিরে নিয়ে ওখানেই যেতে। আর উপায় নেই। বাবার অসহায় মুখটা মনে পড়ে গেল প্রতীকের। বিড়বিড় করে সে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা কোরো বাবা।’
অশোক সান্যাল আর রত্নাকর দিঘের টিম এসে পৌঁছতে দেবী আর প্রদীপ ওদের রিসিভ করল।
প্রদীপ হতাশ স্বরে বলল, “খুব দেরি হয়ে গেছে স্যার। স্নেহাকে সঙ্গে নিয়ে সে হাওয়া হয়ে গেছে। স্মোক বম্ব দিয়ে আমাদের অন্ধকরে। কী ভয়ঙ্কর চালাক!”
দেবী এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিল সে হঠাৎ বলল, “দেরি হয়তো হয়েছে কিন্তু খুব বেশি না। আমাকে যখন লকআপ থেকে বার করে দিলেন তখনই আমার ব্যাপারটা খুব একটা ভালো লাগেনি। আমি কনফেশান আদায় করলাম আর আমাকেই কিনা বাইরে বার করে দিলেন। এমন কিছু একটা হতে পারে আন্দাজ করে আমি প্রতীক স্যারের গাড়িতে একটা জিপিএস ট্র্যাকার লাগিয়েছি। ট্র্যাকারের সিগনাল ফলো করলে গাড়িটা কোথায় আছে সেটা সহজেই জানা যেতে পারে!”
রত্নাকর বাহবা দিয়ে বললেন, “ভেরি ওয়েল ডান দেবী!”
দেবী গম্ভীর মুখে বলল, “আমার স্যারই বলতেন — পুলিশের জটিল কেস যখন চলছে তখন কাউকেই বিশ্বাস করতে নেই। অপরাধীর খোঁজ না পাওয়া অবধি সিনিয়ার অফিসার, জুনিয়ার সহকারী সবাইকেই সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবে। অনেক কিছু শিখেছি তাঁর কাছে।”
অশোক সান্যাল বললেন, “মুকেশ পাটানিয়াকে তো ইন্টারপোল এবং সাউথ আফ্রিকার পুলিশও খুঁজছে। ওই হিরে দুটোর পিছনে ভয়ঙ্কর সব খুনের ইতিহাস আছে। এছাড়া ড্রাগস, মানি লন্ডারিং এই রকম অনেক কিছু লাভজনক ব্যবসায় মুকেশ জড়িত। বিদ্যুৎ আর রাকেশ ওর ডান আর বাঁ হাত। আন্তর্জালের সাহায্যে স্নেহা সজলের মতন একটা সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়ে কীভাবে ওদের জালে জড়িয়ে পড়ল সেটা ভাবলেই আমার গা কেঁপে ওঠে। শেষ হয়ে গেল পরিবারটা। প্রতীক ছিল যাকে বলে একেবারে ডার্ক হর্স, তার মনে কী আছে কেউ জানত না। মুকেশের এত অর্থ যে তার পক্ষে যে কাউকে কিনে ফেলাটা খুব সহজ ছিল। সেইজন্যেই এই কেসে কাউকে বিশ্বাস করা যাচ্ছিল না।”
সিবিআইয়ের স্পেশাল কম্ব্যাট টিম আর পুলিশের গাড়ি জিপিএস ট্র্যাকার ফলো করতে করতে শহরের বাইরে পরিত্যক্ত গোডাউনে পৌঁছে গেল।
এরপর ওখানে যা ঘটেছিল সেটা একটা ছোটখাটো যুদ্ধের চেয়ে কম কিছু নয়। আশপাশের বাসিন্দারা অনেকদিন পর্যন্ত সেই ক্রমাগত বন্দুকের গুলির শব্দ, আর্ত চিৎকার, রক্তের নদী, আগুনের গোলা আর সারি দিয়ে ঢেকে রাখা মৃতদেহগুলোর কথা বলাবলি করেছিল। অনেকদিন অবধি সাংবাদিকরাও ওই এলাকায় যাতায়াত করেছিল খবরের আশায়। কম্ব্যাট টিমের গুলির বর্ষায় একে একে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েছিল স্নেহা এবং মুকেশের দলের আরও বেশ কিছু মানুষ। এমন সব মানুষ যাদের লোভ এবং নেশা, এই দুই ভয়ানক রিপু ওই জগতে টেনে নিয়ে গিয়েছিল। সেই রাতে মুকেশ পাটানিয়া অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে পালিয়েছিল বটে কিন্তু একমাস পরে একটা টেলিফোনের সূত্র ধরে মুম্বাই থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বিদ্যুৎ কোমা হয়ে হাসপাতালেই পড়ে রয়েছে। ওর জ্ঞান ফিরবে কিনা কেউ বলতে পারছে না। সে অবশ্যই জানে না যে স্নেহা মৃত। রাকেশ পুলিশের হেফাজতে। মাদক দ্রব্যের বিষ দিয়ে অজস্র ছেলেমেয়ের জীবন নষ্ট করার যা শাস্তি হওয়া উচিত সেই শাস্তি এরা সবাই পেয়েছে বা পাবে। প্রতীক কম্ব্যাট টিমের গুলিতে আহত হয়েছিল সেদিন। কড়া প্রশিক্ষণের দরুন নিজের প্রাণটাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছিল সে। হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পরে সে বলেছিল যে সে ডাবল এজেন্টের কাজ করছিল মুকেশকে ধরার জন্যে। স্নেহার সাহায্য নিয়ে সে মুকেশের ডেরায় পৌঁছতে চেয়েছিল। কিন্তু টিমের কাউকে সঙ্গে না নিয়ে একা একা সেখানে গিয়ে যে সে নিজের জীবনই বিপন্ন করতে যাচ্ছিল সেটা কেন, সেই প্রশ্নের উত্তর সে দেয়নি। এটা জানিয়েছে সে নিজের উকিলকে সব বিস্তারিত ভাবে বলেছে। তার কথা সত্যি না মিথ্যে প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত তাকে জেলেই থাকতে হবে। সে অপরাধী না নিরপরাধ সেটা আদালত ঠিক করবে।
“এই গাছের কোটরে হাত দিস না বোকা মেয়ে! ওখানে সাপ থাকতে পারে!” ছেলেটা বোনকে সাবধান করল।
“আমি তোর মতন ভীতু নই!” ছ’বছরের পুঁচকে মেয়েটা গাছের কোটরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বলল।
পরক্ষণেই কাপড়ে মোড়া কী একটা বার করে আনল ভিতর থেকে, “এই দ্যাখ দাদা গাছের কোটরের মধ্যে কীসব রাখা রয়েছে!”
কাপড়ের মোড়ক খুলে দুই ভাইবোন দেখল হালকা নীল রঙের দুটো ছোট পাথর।
“কী সুন্দর দেখতে না রে দাদা?”
“হুঁ।”
“মাকে দেখাব?”
“নাহ থাক এখানেই। আমরা মাঝে মাঝে এসে এগুলোকে নিয়ে খেলা করে যাব। কার জিনিস কে জানে। অন্যের জিনিস নিতে নেই জানিস না?”
“হ্যাঁ, তা তো ঠিক বলেছিস। তবে একটু খেলে আবার রেখে দিলে তো দোষ নেই, তাই না দাদা?”
“নাহ, তাহলে দোষ নেই!”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন