বিশ্বরূপ মজুমদার

তৃণা মোবাইলটা বন্ধ করল৷
হ্যাঁ! ছেলেটা আসছে চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে৷ পাখি জালে উঠেছে৷ এসব ছেলেদের চোখ মুখের ভাষা পড়ার সহজাত ক্ষমতা তার আছে৷ সে কি মেয়ে বলেই?
ভ্যাবলা ছেলেটাকে মিষ্টি কথায় প্রেমের জালে ফাঁসানো তৃণার কাছে বাঁ-হাতের খেলা৷ গত দু’দিন থেকে ভ্যাবলা ছেলেটাকে যে শ্যাডো করছে বিদ্যুতের দলবল ছেলেটা তা বোঝেনি৷ সজলের ছবি তার হোয়াটসঅ্যাপ-এ বিদ্যুৎ আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল৷ আর জামিল কাল দূর থেকে তৃণাকে দেখিয়ে দিয়েছে ছেলেটাকে৷ সজল রোজই ভাগীরথীর ধারে বিকালে বসে থাকে৷ তবে হ্যাঁ, জামিল পকেটমারের অভিনয়টাও করেছে ফাটাফাটি৷ জামিলের কাজ শেষ৷ আজই কেটে পড়বে এখান থেকে৷ তবে তৃণার নিজের অভিনয় দেখে নিজেরই হাততালি দিতে ইচ্ছে করছে৷ নির্বোধ ছেলেটা, তার উদ্বিগ্ন মুখ আর মোবাইল ফেরত পাবার পর নির্মল হাসি দেখে ভুলে গেছে আর নিজেকে হিরো ভাবছে৷
—“আপনার চা…”
—“ও হ্যাঁ৷ আপনাকে কী বলে যে ধন্যবাদ দেব…”
—“আরে ওটা কোনও ব্যাপারই নয়৷ বাদ দিন তো ওসব৷”
—“আসলে এমনভাবে ঘটনাটা ঘটে গেল…এখনও আমি একটা ঘোরের মধ্যে আছি৷ আপনি না-থাকলে কপালে অশেষ দুর্গতি ছিল৷ জানেন তো এখনও পড়াশুনো করি আর খুব গরিব ঘরের মেয়ে আমি৷ টিউশনি করে খরচ চালাই৷ বহু কষ্ট করে পয়সা জমিয়ে এই ফোনটা কিনেছিলাম৷ মা-বাবার সঙ্গে রোজ রাতে কথা বলতে হয়৷ দু’জনেরই শরীর খারাপ। আমার ফোনটা আজ চলে গেলে কী হত ভাবুন তো!
—“আরে বাদ দিন না৷ ওসব ভেবে লাভ নেই৷ চলুন নদীর ধারে একটু হেঁটে আসি৷ বাই দ্য বাই আপনার তাড়া যদি না থাকে…”
—“না না৷ চলুন না৷ আপনার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ৷ আপনি আজ না থাকলে...”
ভাগীরথীর জলে লাল আবীরের ছোঁয়া৷ সূর্য অস্তরাগে৷ দূরে দেখা যাচ্ছে জেলে নৌকাদের৷ একঝাঁক পাখি উড়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশের উজানে৷
সজল আড়চোখে তাকাল তৃণার দিকে৷ এরমধ্যে তৃণার হাতে ওর হাত লেগেছে বার কয়েক৷ তৃণা যেন নির্লিপ্ত, কোনও ভাবান্তর নেই৷ এমনকী সজলের পাশে গা ঘেঁষেই বসেছে সে৷ মেয়েটা একটু ভাবুক প্রকৃতির।
আচ্ছা তৃণা ওর প্রেমে পড়েনি তো?
কৃতজ্ঞতা থেকে প্রেম আসতেও পারে৷ তবে এনট্রিটা মোক্ষম সময়ে নিয়েছিল সে৷ পুরো ফিল্মি এনট্রি৷ মেয়েটার চটক আছে ভালোই৷ এ সুযোগে তুলে নিলে এই বনবাস পর্ব ভালোই কাটবে৷ তাড়া নেই অবশ্য সজলের৷ ধীরে-সুস্থে এখন খেলতে হবে৷
নিয়তির পরিহাস বোধহয় একেই বলে শিকারী ও শিকার দু’জনেই মনে মনে চিন্তা করছে প্ল্যান৷
তৃণা একদৃষ্টে তাকিয়েছিল জলের দিকে৷
বিদ্যুৎ বারবার বলত ‘স্কাই ইজ দ্য লিমিট’, সত্যি তো তৃণাও জানে তাকে উপরে উঠতে হবে৷ একটা মই দরকার৷ বিদ্যুৎই সেই মই৷ তবে ডার্ক ওয়েব ব্যাপারটা তো তৃণাই দেখিয়েছে বিদ্যুৎকে৷ বিদ্যুৎ আইটি এক্সপার্ট নয়, তার মূল অবলম্বন তৃণাই৷ এখন তৃণার একটাই লক্ষ্য সজলকে জালে তোলা৷ মালটা নেশা করে৷ একবার শুধু ড্রাগস-এর নেশা ধরিয়ে দিতে হবে৷ ব্যস! তবে যে সে ড্রাগস নয়৷ একেবারে আয়াহুয়াস্কা!
বিদ্যুতের বুদ্ধিকে স্যালুট করে তৃণা৷ হয়তো বা ভালোওবাসে৷ সুমন্ত মিত্রর পরিবারের উপর ভীষণ রাগ বিদ্যুতের৷ কারণ জানতে চেয়েছিল তৃণা, কিন্তু প্রত্যেকবারই এড়িয়ে গিয়েছে বিদ্যুৎ৷ শুধু বলেছে ওই পরিবারকে শেষ করবে৷ যারা বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী তাদের শেষ হওয়াই ভালো৷ তাই টার্গেট এবার সজল৷
সজল আর তৃণা খেয়ালও করতে পারছিল না৷ দূর থেকে ভবঘুরে, ভিখারি একজন তাদের দিকে নজর রাখছিল৷ লোকটির চোখ দুটি শুধু ঘুরছিল চারপাশে৷ আর তার মুখে একটা বিচিত্র হাসিও খেলা করছিল৷
**********
একটা চৌকো টেবিলের উপর প্রচুর কাগজপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে৷ সঞ্জয় বোস নিবিষ্ট মনে সেগুলো দেখছেন৷ প্রদীপ ঘোষ অধস্তন হিসাবে ভালোই জানেন স্যার যখন কোনও কিছুর মধ্যে ডুবে যান তখন এরকমই হয়৷ চোখদুটো জ্বলতে থাকে৷ সামনের ছাইদানিটা সিগারেটের টুকরোতে ভরে যায়৷ সারা পৃথিবীতে কী ঘটছে সঞ্জয় বোস ভুলে যান৷ ভুলে যান পরিবারের কথাও৷
—“বুঝলে প্রদীপ, এ রহস্যের জাল অনেক গভীরে৷ নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরোর (এনসিবি) বক্তব্য হল মাদক চক্রের জাল ধরা তো দূর, হোম ওয়ার্কেই আটকে গিয়েছে তারা। এর কারণ হিসাবে ওই কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকেরাই জানাচ্ছেন, ইন্টারনেট ব্যবহার, বিশেষ করে ‘ডার্ক ওয়েব’-এর ধাঁধায় আটকে গিয়ে শ্লথ হয়ে গিয়েছে তাঁদের তদন্ত।”
—“স্যার, ডার্ক ওয়েব অপারেট করা হচ্ছে যখন তখন ধরা যাবে না কেন?” অবাক হয়ে জানতে চাইলেন এ. এস. আই. প্রদীপ ঘোষ৷
—“তাহলে শোনো৷ ‘টর ব্রাউজারের’ মাধ্যমে ব্যবহার হওয়া ডার্ক ওয়েবের শেষ কথা গোপনীয়তা। যেহেতু এই ব্রাউজার ব্যবহারকারীর আইপি (ইন্টারনেট প্রোটোকল) অ্যাড্রেস সেভ করে না, ফলে একবার যদি লগ অফ করে দেয় এর ইউজার বা ব্যবহারকারীরা তাহলে ব্যবহারকারীর পরিচয় জানতে পারা প্রায় অসম্ভব। আর এই সুযোগেই পরিচয় গোপন রেখে বেআইনি কাজকর্ম চলছে আমাদের নাকের ডগায়৷ অবাধে বিক্রি হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র থেকে মাদক, যৌন পণ্য থেকে দামি জিনিস।
“হোয়াইট ওয়েব’ অর্থাৎ গুগল, ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার গোটা নেট দুনিয়ার মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশ। এটাকে বলে ‘সারফেস ওয়েব’৷ বাকিটা ‘ডিপ ওয়েব’। ‘ডিপ ওয়েব’-এর সমস্ত অনৈতিক কাজ হয় এই ‘ডার্ক ওয়েব’-এ।
“কিন্তু একটা কথা ডার্ক ওয়েবে ঢুকে কাজ শুরুর আগে পর্যন্ত ব্যবহারকারীর তথ্য আইপি অ্যাড্রেসে সেভ থাকে। সেই সময়েই নজরদারি চালিয়ে ডার্ক ওয়েবের ব্যবহারকারীদের তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব। এখন সাইবার ক্রাইম শাখা টেলিকম কোম্পানিগুলোকে দিয়ে ডার্ক ওয়েবে কারা ঢুকছে সেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। তা হলেই সত্য সামনে আসবে।
“আর একটা কথা যেটুকু জেনেছি এনসিবি বা সাইবার ক্রাইম শাখার কাছ থেকে তা হল ডার্ক ওয়েবের কাজটি সাধারণ ওয়েবসাইটগুলির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ‘গুগল ক্রোম’, ‘মোজিলা ফায়ারফক্স’, ‘সাফারি’ ইত্যাদির মতো সাধারণ ওয়েব ব্রাউজারগুলির সাহায্যে এই ডার্ক ওয়েবসাইটগুলি অ্যাক্সেস করা যাবে না পরিবর্তে আপনাকে টর ব্রাউজার (TOR Browser) নামে একটি বিশেষ ওয়েব ব্রাউজার ব্যবহার করতে হবে। শুধুমাত্র এই ব্রাউজারের সাহায্যেই তুমি তোমার সিস্টেমে ডার্ক ওয়েবসাইটগুলি খুলতে পারবে।
“বুঝলে প্রদীপ, যাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছি তারা হল সব হাই আই কিউ ক্রিমিনাল। তাছাড়াও এদের হাত অনেক দূর, অনেক রাঘব বোয়ালের সঙ্গে ওঠা বসা৷”
—“স্যার, একটা কথা বলব? এ কেসটা বেশ গণ্ডগোলের৷ বেশ কিছু প্রশ্ন মনে এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে।”
প্রদীপ ঘোষের কথা শুনে সঞ্জয় বোসের মুখে একটা হাসির ঝিলিক খেলে গেল৷
—“বেশ! বলো, তোমার কোথায় কোথায় খটকা লেগেছে? দেখি তার সূত্র আমি কিছু দিতে পারি কি না?”
—“ধরুন স্যার, স্নেহা মিত্র৷ চরিত্রটা বেশ গোলমেলে৷ মধ্যবিত্ত ঘরের মহিলা, হাইপ্রোফাইলের নয় অথচ স্মোক করে৷ আগেও প্রেম করেছে। মূল মোটিভ যেন-তেন প্রকারেণ টাকা কামানো৷ তাছাড়া স্নেহা দেবীই যে ব্যাঙ্কে প্রেমিক রাকেশ সামন্তর জাল নোট ইচ্ছাকৃত ভাবে সরাচ্ছে না তার কী গ্যারান্টি আছে? তার সুযোগ ও সুবিধা সবচেয়ে বেশি৷
“স্নেহা মিত্র এতই বোকা যে রাত দুটোর সময়ে রাকেশ সামন্তর কথা শুনে বাড়ির বাইরে যাবে! বিশেষত রাকেশ যখন তাকে জাল নোটের কারবারে ফাঁসিয়েছে এবং পুলিশের চোখে একজন সন্দেহভাজন৷ রাকেশের উপর তার এত বিশ্বাস কেন? স্নেহা দেবীর কথামতো বিদ্যুৎ তাকে রাকেশের ডেরা থেকে উদ্ধার করে এবং রাকেশকে মারে৷ তাহলে আমরা গিয়ে রাকেশের দেহ পেলাম না কেন? দেহটা কোথায় গেল?
“তাছাড়া স্নেহাদেবী পুলিশের সঙ্গে সহায়তা করেননি৷ অনেক কথা চেপে গেছেন৷ রাকেশের উপর তার এত বিশ্বাস কেন বিশেষত বিশ্বাসভঙ্গের কারণ ঘটানো সত্ত্বেও? স্নেহার ভাই সজল মিত্রকে তার বাবা-মা কোথায় সরিয়ে ফেলেছে? তার নারী দুর্বলতা আর নেশা করার অভ্যেস আছে৷ তারপর ধরা যাক মুকেশ পাটানিয়া নামের লোকটি এবং তার এটিএম কার্ড৷ কে সেই ব্যক্তি?” সঞ্জয় বোস গলাটা গম্ভীর করলেন৷
—“হুম, অনেক প্রশ্ন তোমার৷ শেষ থেকে শুরু করছি।
“মুকেশ পাটানিয়া গুজরাটি৷ বিত্তশালী বাপ-মায়ের বকাটে ছেলে৷ অল্পবয়সে মেয়েদের সঙ্গে প্রেম-প্রেম খেলা, ব্ল্যাকমেলিং এসব করে সূত্রপাত৷ দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশেষত ডারবান এবং নাটালে পরে ড্রাগস চক্রের সঙ্গে দহরম মহরম হয়৷ পয়সার লোভে মুকেশ তখন পাগল৷ যেভাবেই হোক ব্যবসায় একচ্ছত্র মালিকানা চায়৷ এদিকে বিদ্যুৎও তখন দক্ষিণ আফ্রিকায় পড়তে গিয়েছে৷ ফাইটো টক্সিকোলজি, বায়োকেমিস্ট্রি ও বায়োটেকনোলজি ছিল তার বিষয়৷ ওখানেই কোনও এক নৈশপার্টিতে মুকেশের সঙ্গে বিদ্যুতের আলাপ হয়৷ মুকেশ সখ্যতা পাতায় বিদ্যুতের সঙ্গে৷ উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিদ্যুৎ দলে ভিড়ে যায়৷ শুরু হয় ড্রাগসের কারবার৷ বেশ চলছিল এভাবেই হঠাৎ মুম্বাই ও দুবাইয়ের এক প্রাক্তন আন্ডারওয়ার্ল্ড ডনের সঙ্গে গণ্ডগোলের সূত্রপাত৷ ক্ষমতা দখলের লড়াই৷ গ্যাং ওয়ারে জখম মুকেশ পালায় দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে৷ যাওয়ার আগে সবকিছু এমনকী এটিএম কার্ড সহ অন্যান্য জিনিস বিশ্বাস করে বিদ্যুৎকে দিয়ে যায়৷ মুকেশ দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কোথায় যায় কেউ জানে না৷
“এবার ফার্স্ট-ফরোয়ার্ড দুই বছর। বিদ্যুতের পার্টনার হিসাবে রাকেশ সামন্ত তখন সেকেন্ড-ইন-কমান্ড৷ ভারতে বিশেষত কলকাতাকে কেন্দ্র করে নেপাল, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার, আফগানিস্তানে ডার্ক ওয়েবকে কেন্দ্র করে ব্যবসা চালাচ্ছে৷ বিদ্যুৎ তখন হার্বাল ড্রাগস নিয়ে উৎসাহী মানে ভারতে কীভাবে সাইকিডেলিক ড্রাগস তৈরি করা যাবে তা নিয়ে মগ্ন৷ রাকেশকে বিদ্যুৎ অন্ধের মতো বিশ্বাস করত। তাইতো নিজের সাম্রাজ্য আর গার্লফ্রেন্ডকে রাকেশের হাতে সঁপে দিয়েছিল সে।
“স্নেহা, যতদূর খবর নিয়েছি এর আগেও একাধিক পুরুষের সঙ্গে প্রেম করেছে৷ রেভ পার্টিতেও তাকে দেখা গিয়েছে বেশ কয়েকবার৷ তবে ড্রাগস নিত বলে মনে হয় না৷ অবশ্য জাল নোট পাচারের সঙ্গে সে যে যুক্ত নয় এরকম ক্লিনচিট দিতে পারব না৷ যদিও স্নেহা ডবল গেম খেলেছে তাই বিশ্বাসের প্রশ্নই নেই৷ আমরা তার পেছনে লোক লাগিয়েছি কারণ স্নেহা মার্ডার হতে পারে৷ অন্তত আমার অনুমান তাই বলছে৷
“তবে আমাদের বড় ভুল ডেডবডি দেখেই তা রাকেশের বলে সনাক্ত করা৷ আর একটু সতর্ক হওয়া উচিত ছিল৷ সর্ষের মধ্যেই ভূত আছে৷ খবর পৌঁছে যাচ্ছে ভিতরের অপরাধীদের কাছে৷ প্রতীক রায় লোকটিও সন্দেহজনক বুঝলে৷ আর সজল এখন মুর্শিদাবাদে৷ পুলিশের নজরে আছে৷
“এবার বলি ডেডবডির কথা আমার অনুমান রাকেশ সামন্ত আর বিদ্যুৎ দু’জনেই বহাল তবিয়তে বেঁচে৷ তোমার মনে আছে কোঁকড়া চুল ফ্রেঞ্চকাট দাড়িওয়ালা একটা ছেলে স্নেহা মিত্রকে টাকা দিতে এসেছিল। যদিও দিয়েছিল জাল নোট৷ আমার ধারণা সেই লোকটি বা ছেলেটি মুকেশ হলেও হতে পারে৷ সোর্সের খবর মুকেশ পাটানিয়া ভারতে ফিরে এসেছে৷ মুকেশের এটিএম ইস্যু করা হয়েছে ব্র্যাবোর্ন রোডের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চ থেকে৷ তা থেকে অনেকবার এর আগে টাকা তোলা হয়েছে৷ সম্ভবত এর পিছনে হাত রয়েছে বিদ্যুৎ আর রাকেশের৷ তাই মুকেশ অনেক কিছুর বদলা চায়৷ রাকেশ সামন্ত হাত মিলিয়েছে প্রাণের ভয়ে মুকেশের সঙ্গে৷ বিদ্যুৎও সতর্ক৷ বিদ্যুতের হাত যদিও অনেক লম্বা তবু রাকেশ একদিকে অন্যদিকে মুকেশ, বিদ্যুৎ তাই সাবধানে পা ফেলছে৷
“স্নেহার বয়ান অনুযায়ী সেদিন জঙ্গলে সে গুলির আওয়াজ এবং আর্ত চিৎকার শুনেছিল। কিন্তু, বিদ্যুতের করা গুলিতে রাকেশই যে মারা গিয়েছিল তার প্রমাণ কোথায়? এমনও তো হতে পারে বোঝাপড়া করার জন্য মুকেশ পাটানিয়াও সেখানে উপস্থিত ছিল। এই সাম্রাজ্য তার হাতেই তৈরি যা ভাঙিয়ে খাচ্ছে এখন বিদ্যুৎ আর রাকেশ সামন্ত। বিদ্যুৎ যে জীবিত তার প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই, মারা গেল কে? রাকেশ না মুকেশ? না কি পুরোটাই স্নেহার বানানো নাটক। কারণ স্নেহার কথামতো এগজ্যাক্ট লোকেশনে গিয়েও আমরা কোনও ডেডবডি খুঁজে পাইনি।
“এ পর্যন্তই জানি। কিছুটা খবরের ভিত্তিতে বাকিটা অনুমান৷ দেখা যাক সব ধাঁধার যেদিন মীমাংসা হবে সেদিন ছবিটা পরিষ্কার হবে আমাদের সামনে৷”
**********
রাত প্রায় দশটা বাজে। আজ হঠাৎ মহানগরীতে বৃষ্টি নেমেছে। জানালার কাচের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল প্রতীক। হঠাৎ প্রমিতের ছবিটার দিকে নজর গেল ওর। ওই তো! সমুদ্রের ধারে বন্ধুদের সঙ্গে প্রমিত বসে। ওর চোখের সানগ্লাসটা প্রতীকই কিনে দিয়েছিল।
ছবির সবাই বেঁচে আছে। শুধু নেই তার আদরের ভাইটা। সবই তো ঠিক ছিল। সেই দুঃস্বপ্নের পুরী ভ্রমনটাই সব শেষ করে দিল। আর কারুর তো কোনও ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হল শুধু ভাইয়েরই! অবাক লাগে প্রতীকের। এদিকে বাবার অবস্থাও চোখে দেখা যায় না। আর কত মিথ্যে বলবে প্রতীক। বাবাকে কতবার বলবে ভাই পড়তে গিয়েছে বিদেশে। সে ভালোই আছে। চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়ায় প্রতীক।
নাহ, আরও শক্ত হতে হবে। ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ সে নেবে। তবে শত্রুপক্ষ ভয়ঙ্কর চালাক। শত্রুরা বুঝলে তারও প্রাণহানির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতীক রায় মরতে ভয় পায় না। কিন্তু পিছুটান ওই শয্যাশায়ী বৃদ্ধ বাবা। বাবাকে কে দেখবে তার কিছু হয়ে গেলে…
আচ্ছা, স্নেহা যা বলছে তা কি ঠিক? প্রতীক অনেকবার ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করেছে ওর সঙ্গে, সাবধান করেছে রাকেশের ব্যাপারে। স্নেহা সত্যি নিরপরাধ না অভিনয় করে? প্রতীকের স্নেহার প্রতি দুর্বলতা আছে। কিন্তু স্নেহা কি তা বোঝে?
তবে আবেগতাড়িত হয়ে প্রমিতের মৃত্যুর ঘটনা আর রাকেশের সঙ্গে যোগাযোগের কথাটা স্নেহাকে বলা বোধহয় ঠিক হয়নি৷ স্নেহা ডাবল এজেন্ট নয়তো?
না কি পুলিশের কাছে যাবে প্রতীক?
পুলিশকেও আর বিশ্বাস করে না প্রতীক। একটা অদ্ভুত দমবন্ধকর পরিস্থিতি৷ না, এ যুদ্ধ তার একার৷ সে একাই যথেষ্ট। ভাইয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ সে নেবেই৷ যা হয় হোক৷ ঘড়ির দিকে তাকাল প্রতীক। এগারোটা বাজছে৷ বৃষ্টি থেমেছে৷ গাঙ্গুরামের মিষ্টির দোকানটাও বন্ধ৷ তার সামনে একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে৷ হঠাৎই ফোনটা বেজে উঠল৷ হ্যাঁ, এসে গেছে তাহলে...
প্রতীক রায় ফোনটা ধরে শুধু বলল – ‘কামিং’ ৷
আস্তে আস্তে সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগল প্রতীক৷ মেইন দরজাটা খুলে রাস্তার ওপাশে মিষ্টির দোকানের সামনে এগিয়ে গেল৷ আগন্তুকের মুখে একটা সিগারেট৷ মুখটা দেখা যাচ্ছে না ভালো করে৷ আলো আঁধারি খেলা করছে৷ তবে আগন্তুক বেশ দীর্ঘদেহী৷
বাঁ পকেট থেকে লাইটার বের করল আগন্তুক৷
হ্যাঁ, প্রতীক নিশ্চিন্ত৷ কোড বোঝাচ্ছে আগন্তুক। তার প্রতীক্ষিত ব্যক্তি৷
“ক’টা বাজে?” প্রতীক জিজ্ঞেস করল৷
আগন্তুক তার ডান পকেট থেকে বের করে এনেছে একটা মোটা খাম৷ আগন্তুকও প্রশ্ন শুনে নিশ্চিন্ত৷ খামটা চলে এসেছে প্রতীকের হাতে৷ বিনিময়ে পাঁচশো টাকার বেশ কয়েকটা করকরে নোট চলে গেল আগন্তুকের হাতে৷
প্রতীক বাড়ির দিকে হাঁটা দিল৷ আগন্তুক আবার গাড়িতে বসতেই গাড়িটা ভেজা মহানগরীর রাস্তা দিয়ে উত্তর দিকে চলতে শুরু করল উল্কার গতিতে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন