দেখা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

রাজধানী এক্সপ্রেস ছেড়ে যাওয়ার পর হঠাৎ হাওড়া স্টেশনের নয় নম্বর প্ল্যাটফর্মটা আজ বড্ড ফাঁকা আর নির্জন ঠেকছিল নবেন্দ্রর কাছে। নবেন্দ্র চেয়েছিল দূরে বিলীয়মান ট্রেনটার পশ্চাদ্দেশের দিকে। অতি দ্রুত চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে। তারপর মাঠঘাট ভেঙে হা—হয়রান হয়ে দৌড়বে দিল্লির দিকে। পৃথা ওই ট্রেনে দিল্লি গেল। দিল্লিতে দিদি—জামাইবাবুর বাড়িতে দিন তিনেক থেকে লন্ডনের ফ্লাইট ধরবে। আপাতত এক বছরের। পরে সময়টা বাড়তে পারে।

ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকার মানে হয় না। কিন্তু একটা মানসিক বৈক্লব্যে স্থান—কাল—পরিস্থিতি ভুলে সে বেশ কয়েক মিনিট দাঁড়িয়েই থাকে। ফেরার কথা মনেই হয় না। তার কারণ পৃথার এই দূর—গমনটি বড় আকস্মিক। নবেন—একটা অনিশ্চয়তার অশুভ গন্ধ পাচ্ছে।

তাদের বিয়ে হয়েছে তিন বছর। এই তিন বছরই পৃথা ব্যস্ত থেকেছে তার বিপুল পড়াশুনা নিয়ে। প্রথম শ্রেণির মেধাবী ছাত্রী সে নয়। কিন্তু অগাধ পরিশ্রমী। অসম্ভব ধৈর্যশীল ও উদ্যোগী। নবেনের জ্ঞাতসারেই পৃথা অন্তত শতখানেক চিঠি লিখেছে বিদেশে। দিল্লিতে গিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রকে যোগাযোগ করেছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সঙ্গে পরিচয় করেছে। নিজেকে উপস্থাপিত করার একটা নিজস্ব ক্ষমতা আছে ওর। আর এই সব করতে গিয়ে নবেনের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কটা সে প্রায় ভুলে গিয়েছিল। সংসারে ঠিকমতো সেটাই হল না। তাদের মধ্যে ভাব—ভালোবাসার কথা শুরু হয়েই কেমন করে যেন নানা স্কলারশিপ, গ্র্যান্ট, ফেলোশিপের প্রসঙ্গে চলে যেত।

নবেনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, তা বলে পৃথার থাকবে না কেন? সেটা দোষেরও নয়। এবং শেষপর্যন্ত এই যে কী একটা সায়েন্স স্কলারশিপ পেয়ে সে বিদেশে গেল এটাও তার নিজের কৃতিত্ব। প্রায়ই বলত, সে আর পাঁচটা বাঙালি মেয়ের মতো বিয়ের পর থমকে যেতে চায় না।

বলতে নেই, বিয়েটাও পৃথার অনিচ্ছের অঘটন। বাবার দু—দুটো স্ট্রোক হয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন বাপ মেয়েকে প্রায় হাতে পায়ে ধরে বিয়েতে রাজি করান। তখন পৃথা ফিজিক্সে এম এসসি করছে। সেই সুবাদে ফুলশয্যা সেরেই কয়েকদিনের মধ্যে বাপের বাড়ি চলে যায়। যায় তো যায়ই। তিন মাস পাত্তা নেই। পরীক্ষার পর পরই কোনো মন্ত্রীর সেক্রেটারির সঙ্গে সমঝোতা করতে দিল্লি গেল। গেল তো গেলই। বিয়ের প্রায় ছ মাস বাদে শ্বশুরবাড়িতে এল। একমুখ হাসি, একটুও বিরক্তি নেই। যেন সে বাড়ির পুরোনো বউ। কিছুদিন দিব্যি শ্বশুর শাশুড়ি, বর আর অবিবাহিত ভাসুরের সঙ্গে মানিয়ে নিল। মিষ্টি কথা, মিষ্টি ব্যবহার, মনোমালিন্যের নামগন্ধ নেই, বরকে নিয়ে আলাদা থাকার ধান্ধা নেই। মানিপুলেশন শব্দটার অর্থ পৃথার কাছেই প্রথম শেখে নবেন। শব্দের অর্থ জানলেই হয় না, প্রয়োগ না জানলে সব শব্দই কাগুজে থাকে মাত্র।

হয়তো বা নিজের ক্যারিয়ারের জন্য লাগাতার তদ্বির করত গিয়েই ম্যানিপুলেশনের প্রয়োগ—কৌশল অর্জন করেছিল পৃথা। একটু আহ্লাদী গোলগাল মুখ এবং সামান্য মেদসম্পন্ন চেহারার ডলপুতুলের মতো দেখতে পৃথাকে নিয়ে নবেন প্রায়ই ধন্ধে পড়ে যেত। সে প্রায় শৈশব থেকেই স্ত্রৈণ অর্থাৎ যখন তার স্ত্রী বলে কিছুর ছায়ামাত্র জীবনে ছিল না, তখন থেকেই সে তার ভাবী স্ত্রীর অধীন হওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল। বিয়ের পরই যে সে তার বউয়ের অনুগামী হবে এটা তার ভবিতব্যই ছিল। ওই মনোভাব নিয়েই সে বড় হয়েছে। তার নিজস্ব ধারণা হল, বিয়েটা একটা টার্মিনাস। জীবনের উদ্যোগপর্বের ওইখানেই সমাপ্তি। তারপর বউয়ের ছায়ায় নিশ্চিন্তে জীবনটা কাটিয়ে দাও।

আর একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল। বউ যেন সুন্দরী হয়। তা ভাগ্যক্রমে পৃথা বেশ ফরসা, গঠন দুর্গা প্রতিমার মতো। খুব সুন্দরী না হলেও কেউ হ্যাক—ছিঃ তো করবে না। কিন্তু পৃথার স্ত্রৈণ স্বামী হওয়ার জন্য যে অবকাশটা দরকার সেটা কোথায়? স্ত্রী—বৃক্ষের ছায়া চেয়েছিল সে, কিন্তু বৃক্ষ যদি চঞ্চল ও সংক্রমণশীল হয় তা হলে ছায়া জুটবে কী করে?

সে আশা করেছিল, পৃথা তাকে আলাদা ফ্ল্যাটে সংসার পাতার কথা বলবে। কিন্তু পৃথা সেই ধার দিয়েও গেল না। বরং কথা ওঠায় বলেছিল, ও মা। তা কেন? এইখানেই তো বেশ আছি। আমি ট্যুরে বা বিদেশে গেলে তোমাকে দেখার লোক চাই তো। বাচ্চাকাচ্চার প্রসঙ্গ উঠলে একটুও আঁতকে উঠত না, আপত্তিও করত না। শুধু বলত, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার তো দু—তিনটে বাচ্চার মা হওয়ার শখ। প্রিপারেশনের জন্য একটু সময় দাও।

এম এসসির পর অতি দ্রুত পিএইচ ডির গবেষণার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল সে। ফার্স্ট ক্লাস না পেয়েও এই সুযোগ পেয়ে যাওয়া যার তার কর্ম নয়। তবে সে খাটত, লাইব্রেরি, ল্যাব, প্রফেসরদের বাড়ি গিয়ে হানা, কম্পিউটার ঘাঁটা, চরকিবাজি আর কাকে বলে। আর তার ওই সাঙ্ঘাতিক ব্যস্ততার মধ্যে দাম্পত্য ঢুকবার মতো ফাঁকই থাকত না।

সুতরাং স্ত্রৈণ হওয়ার স্বপ্নটা পূরণ হল না নবেনের। তবে সে পৃথার ব্যাপারটা খুব আন্তরিকতার সঙ্গে হৃদয়ঙ্গম করেছে। সমবেদনা এবং সমর্থনও জানিয়েছে। এমনকী মা ঘরের বউয়ের উড়নচণ্ডীপনা নিয়ে মৃদু আপত্তি তোলায় মাকে বখাঝকাও করেছে। এ সব উচ্চশিক্ষিতা মেয়ের লাইফ তোমরা বুঝবে কী করে? বলার সময় অবশ্য ভুলে গিয়েছিল যে তার মা সুচেতা দেবীও পলিটিকাল সায়েন্সের এম এ। কিছুদিন অধ্যাপনাও করেছিলেন। দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেন।

সব ঠিক আছে। তবু আজ পৃথা বিদেশে চলে যাওয়ার পর ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে বড্ড কাহিল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নবেন। মনের ভিতর কী একটা যেন গুড় গুড় করছে। নরমাল লাগছে না। বড্ড অনেক দূরে চলে যাওয়া হল নাকি পৃথার? দূরত্বটা কি বাড়বে?

না এটা যে বিরহ নয় অন্য ব্যাপার, সেটা বুঝতে পারছে নবেন। বিরহের মধ্যে হতাশা থাকে না, মিলনাকাঙ্ক্ষা থাকে, আশা থাকে, একটা সুদূর উজ্জ্বলতার আভাস থাকে। এটা তা নয়। ইংরেজিতে একে বোধহয় বলে ডিজেকশন। ভোম্বল ভাবটা কাটাতে সময় লাগলেও নবেন সংবিৎ ফিরে পেয়ে ভারী অন্যমনস্কভাবেই ঠিক বাস ধরে বাড়ি ফিরে এল।

রাতে খাওয়ার টেবিলে মা বলল, বিয়ের পর ছেলেপুলে না হলে স্বামী—স্ত্রীর সম্পর্ক পাকা হয় না। দাদা নবেনের চেয়ে বছর চারেকের বড়। মাথা নেড়ে বলল, ঠিক নয় মা। ছেলেপুলে হওয়ার পরও বিস্তর ডিভোর্স হচ্ছে। কিন্তু কথাটা হঠাৎ উঠছে কেন? পৃথা বিলেত গেল বলে ভয় পাচ্ছ নাকি?

মা একটু অস্বস্তির সঙ্গে বলল, বিলেত—আমেরিকা আজকাল যা হয়ে উঠেছে, ভাবলে ভয় করে।

শিবেন হাসল, বিলেত আমেরিকার চেয়ে এ দেশ কিছু পিছিয়ে নেই। পরিবারপ্রথা টিকিয়ে রাখতে পারবে না মা। তবে পৃথা ভালো মেয়ে, লেখাপড়া ছাড়া আর কিছু নিয়ে ভাবে না। আমার বিশ্বাস, নবেনের একটা ব্যবস্থা করে ঠিক নিয়ে যাবে ওকে।

নবেনের কাছে এ সব প্রসঙ্গ স্বস্তিকর নয়। তবে পৃথা তাকে কিন্তু কখনো বলেনি যে, বিদেশে গিয়ে সে তার জন্যও ব্যবস্থা করার চেষ্টা করবে। নবেন একটু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, বউয়ের আঁচল ধরে বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছে আমার নেই।

শিবেন বলে, সুযোগ এলে ছাড়বি কেন? পৃথা তো আর পর নয়। স্বামীর জন্য এটা তো সে করতেই পারে। বেচারা তো নিজের চেষ্টায় চান্স পেয়ে বিদেশে গেছে। তাতে তোর ইগো প্রবলেম হওয়ার কথা নয়।

নবেন বিরক্ত হয়ে বলে, আমার বিদেশে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলে চেষ্টা নিজেই করতাম। আমার কোয়ালিফিকেশনে যাওয়াই যায়। কিন্তু আমার ইচ্ছে নেই।

বাবা পরিতোষ এতক্ষণ কথা বলেননি, এবার বললেন, তা হলে বউমা যদি বিলেতেই ভালো চান্স পেয়ে থেকে যায়, তা হলে কী করবি? আমাকে একবার বলেওছে ওর বিলেত বা আমেরিকায় থাকা খুব পছন্দ।

নবেন গম্ভীর হয়ে বলে, ভেবে দেখতে হবে, এখনই এ সব আলোচনার সময় হয়নি।

মা বলল, বিলেত যাওয়া তোর অপছন্দ হলে তুই তো ওকে বারণও করতে পারতিস। করলি না কেন?

ওর বিলেত যাওয়া আমার অপছন্দ হবে কেন? ইচ্ছে করলে যেতেই পারে। অপছন্দটা তো আমার নিজের ক্ষেত্রে।

আবহাওয়া উত্তপ্ত হচ্ছে দেখে বুদ্ধিমান পরিতোষ আলোচনা অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিলেন। নবেন ভালো করে খেল না, ফেলে ছড়িয়ে উঠে পড়ল।

পরদিন দিল্লি পৌঁছে পৃথা ফোনে পৌঁছ—সংবাদ দিল। খুব ব্যস্ত বলে বেশি কথা বলতে পারল না। দিন পাঁচেক পর ই—মেল চেক করতে গিয়ে অফিস নবেন পৃথার লন্ডনে পৌঁছনোর খবরও পেয়ে গেল। লন্ডনে পৌঁছে পৃথার খুব রোমাঞ্চ হচ্ছে। ভীষণ সুন্দর, ভীষণ ভালো শহর।

অ্যাকোমোডেশনের ব্যবস্থা এখনও হয়নি। অস্থায়ী বন্দোবস্তে আছে। জবাবে নবেন তাকে শুভেচ্ছা জানাল, ভালোবাসা এবং চুম্বনও। তবে আবেগটা তেমন কাজ করছিল না। একটা অসম্পূর্ণ সম্পর্ক কেমন যেন স্মৃতির চেহারা নিচ্ছে। পৃথা তার বিধিসম্মত বউ বটে, কিন্তু যেন আপনজন নয়, পর মহিলা।

এরপর প্রায় দিন কুড়ির ফাঁক, ফের ই—মেল এল। পৃথা একটি চমৎকার দক্ষিণ ভারতীয় পরিবারে পেয়িং গেস্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। কাজের জায়গা খুবই কাছে। পার্ট টাইম জব পেয়ে গেছে, ভালো আছে, খুব ভালো আছে।

পৃথা যেসব বাধা জয় করবেই এই আস্থা নবেনের আছে। নাছোড়বান্দা, ধৈর্যশীল, সর্বদা আশাবাদী এবং অমিত পরিশ্রমী ম্যানিপুলেটররা কখনো ব্যর্থ হয় না। কিন্তু দুটো ই—মেলের কোথাও কোনো আবেগ, ভালোবাসা বা চুম্বনের কথা নেই। নবেন পৃথার স্বামী, নিজস্ব মানুষ, কিন্তু সেই ভাবটা কোথাও প্রকাশ পাচ্ছে না। বিয়ের পর সে আর পৃথা দেহগতভাবে মিলিত হলেও নবেন বুঝতে পারত, পৃথা ব্যাপারটা উপভোগ করছে না। তাড়াতাড়ি দায়সারাভাবে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলত এবং ঘুমোত। সারাদিন দেদার দৌড়ঝাঁপের ফলেই বোধহয় ওর ঘুম ছিল খুবই গভীর। সারারাত জেগে প্রেমালাপ করেনি কখনো।

নবেনের ধন্ধ কাটছে না।

তিন মাস বাদে পৃথা একটা ফোন করল।

শোনো, আমি একটা খুব ভালো স্কলারশিপ পেয়ে গেছি।

বাঃ, খুব ভালো কথা

বোধহয় আমি এখন পার্মানেন্টলি এখানে থেকে যেতে পারব।

পার্মানেন্টলি?

হ্যাঁ, ইস আমার যে কী থ্রিলিং লাগছে। এর মধ্যে একটা মিনি ট্যুরে ইউরোপ ঘুরে এসেছি। এখানে কাজের যে কত সুযোগ।

ভালো, খুব ভালো। দেশে কবে আসবে?

এখন তো যাওয়ার প্রশ্নই নেই। কাজের ভীষণ চাপ, ও সব পরে ভাবা যাবে, তোমরা সবাই ভালো তো!

হ্যাঁ, এ দেশে যতটা ভালো থাকা যায়।

একটা অ্যাপার্টমেন্টও নিয়েছি। নিজের জায়গা না হলে কাজকর্মের খুব অসুবিধে।

কিনলে নাকি?

হ্যাঁ, ক্রেডিটে ছোট অ্যাপার্টমেন্ট, তবে কোজি। সবাইকে জানিয়ে দিও। কেমন? ভালো থেকো।

নবেন বুঝতে পারল না, এটা বিরহকাতরা স্ত্রী ও স্বামীর সংলাপ হওয়া উচিত কি না।

সাধারণত নবেনের তেমন কোনো কেনাকাটা করার থাকে না। ডিসেম্বরের এক সন্ধেবেলায় সে অফিস থেকে বেরিয়ে এক কলিগের পাল্লায় পড়ে সল্ট লেকের শপিং মলে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। ঘ্যাম জায়গা, বিস্তর জিনিস। নবেনের জিনিসপত্র বেশি লাগে না। তার কলিগ শুভ্র সংসারী মানুষ, ইংরেজি নববর্ষে কার্ড আর গিফট কিনতে ব্যস্ত। নবেন এ পাশে ও পাশে ঘুরছে।

হঠাৎ একটি নারীকণ্ঠ বলে উঠল, আপনি রণজিৎ, না? নবেন একটা দোকানের শো কেসে বিচিত্র সব মোবাইল ফোন দেখছিল। তার এ যন্ত্র নেই। অপ্রয়োজনবিধায় কেনার কথা মনে হয়নি। তবু দেখতে দোষ কী? সে সোজা হয়ে মহিলার দিকে তাকাল। ছোটখাটো চেহারা, শ্যামলা, মুখের তুলনায় বেঢপ বড় একটা চশমা চোখে, সাদামাটা একটা হলুদরঙা শাড়ি আর গায়ে কমলারঙের শাল জড়ানো একটা মেয়ে। বয়স ছাব্বিশ—সাতাশ মুখের ডৌলটা ভারী মিষ্টি।

নবেন মাথা নেড়ে বলল, না, আমি রণজিৎ নই।

মেয়েটা বেশ অবাক। অবিশ্বাসের গলায় বলল, নন?

না। আমি নবেন বোস।

মেয়েটা একটু হতাশার গলায় বলল, ক্ষমা করবেন। ভুল করে ফেলেছি। আপনি ঠিক রণজিতের মতোই দেখতে। তবে বারো—তেরো বছর আগেকার দেখা তো। কিছু মনে করবেন না।

আরে না। এরকম ভুল তো লোকে আখছার করে।

মেয়েটার ডান হাতে একটা দড়ি দিয়ে বোনা সুন্দর ব্যাগ। তাতে কেনাকাটা জিনিসপত্র। বাঁ কাঁধে ঝুলছে কালো ভ্যানিটি ব্যাগও, চোখের বিস্ময়টা এখনও কাটেনি, বলল, আমি একটু আনমনা মানুষ, মাঝে মাঝে এরকম ভুল করে ফেলি।

বলে হাসল। আর এই হাসিটা যেন মেয়েটার বয়স বছর দশেক পিছিয়ে দিল হঠাৎ। একেবারে সহজ সরল শিশুর মতো হাসি। দুপাটি সুচারু সাদা দাঁত।

নবেনের বেশ লাগল মেয়েটাকে। বলল, কলকাতা শহরে আনমনা মানুষের কিন্তু বিপদ।

বিপদে পড়ি না নাকি? প্রায়ই রাস্তা পেরোতে গিয়ে গন্ডগোলে পড়ে যাই। বার দুই ট্রাফিক পুলিশের বকুনি খেতে হয়েছে। আমার নাম সঞ্চিতা মিত্র। সেক্টর ফাইভে থাকি। আপনি কি সল্ট লেকে থাকেন?

না। কাঁকুড়গাছি। রণজিৎ কে? কোনও আত্মীয় নাকি?

মেয়েটি বোধহয় আলাপী মানুষ। মাথা নেড়ে বলল, না, রণজিৎ শিলিগুড়ির ছেলে। আমাদের পাড়ায় থাকত। ভালো ফুটবল প্লেয়ার। একটা খুনসুটির সম্পর্ক ছিল আমাদের।

খুনসুটি?

হ্যাঁ, খুব খ্যাপাত আমাকে, দাদার বন্ধু।

এনি সফট কর্নার?

খুব হাসল মেয়েটি। শিশুর মতো। বলল, ও বয়সে কি আর খারাপ লাগে?

বারো—তেরো বছরের মধ্যে দেখা হয়নি বুঝি?

কী করে হবে? রণজিৎ কলকাতায় এল খেলতে। তারপর আর কোনো খবর নেই। শুনেছিলাম খেলার সুবাদে রেলে চাকরি পেয়েছে। কোথায় আছে কে জানে।

তাকে মিস করেন বুঝি?

না, না। ও সব ব্যাপার নয়। চেনা ছিল। ওই পর্যন্তই। হুবহু আপনার মতো দেখতে। লম্বা, ছিপছিপে, একই রকম লম্বাটে পুরুষালি মুখ। এমনকী গোঁফটা পর্যন্ত।

মানুষে মানুষে চেহারার মিল তো থাকতেই পারে। আপনি শিলিগুড়ির মেয়ে বললেন, সেক্টর ফাইভে কি আপনার শ্বশুরবাড়ি নাকি?

না না, আমার এখনও বিয়ে হয়নি। রিটায়ার করার পর বাবা কলকাতায় সেটল করলেন। আমি একটা স্কুলে পড়াই। আপনি?

ব্যাঙ্কে।

শুভ্র তার কেনাকাটা সেরে বেরিয়ে এসে ডাকল, হাই নবেন।

এই যে! সব কেনাকাটা হয়ে গেল?

হ্যাঁ! লেটস হ্যাভ সাম কফি। ওঃ সরি, ইউ আর বিজি।

আরে না, এঁর সঙ্গে এখানেই আলাপ হল। আমাকে ওঁর এক চেনা লোক বলে ভুল করেছিলেন। আচ্ছা ম্যাডাম, আসি।

নমস্কার। নমস্কার। আসুন।

শুভ্র খুব স্পোর্টিংলি বলল, ম্যাডাম, আপনিও আসুন না, একসঙ্গে একটু কফি খাই। আজ জব্বর ঠান্ডাও পড়েছে।

থ্যাংক ইউ। কিন্তু আজ আমার একটু তাড়া আছে। কিছু মনে করবেন না।

পথেঘাটে এরকম ঘটনা যতই ঘটে, মানুষ ভুলেও যায়।

প্রায় আট মাস বাদে পৃথা ফোন করল। ফোন করার ব্যাপারে পৃথার হয়তো কিছু হিসেবনিকেশ আছে। কিন্তু ই—মেল দশ পনেরো দিন বাদে বাদেই করে এবং তাতে নিজের খবরই দেয়। সবই সাকসেস স্টোরি। তাতে নবেন সম্পর্কে কোনো জিজ্ঞাসা থাকে না।

টেলিফোনে পৃথা স্কটল্যান্ড ভ্রমণের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিল। জেফারসন নামে এক অধ্যাপকের প্রশংসা করল এবং বলল সে একটা মিনি অস্টিন গাড়ি কিনেছে। লাল টুকটুকে, ছোট্ট আর ভারী কিউট।

নবেন যথাসাধ্য আনন্দ প্রকাশ করল এবং পৃথাকে জীবনে আরও এগিয়ে যেতে বলল। এবং একেবারে শেষে জিজ্ঞেস করল, কবে আসবে?

আসব কেন? এখন তো আসার প্রশ্নই নেই। কত কাজ!

তোমাকে যে ভুলতে বসেছি!

আহা, ও আবার কী কথা! ভুলবে কেন?

তুমি আর আমি যদি দু—দেশেই থেকে যাই তা হলে তো সম্পর্কটাই উঠে যাবে।

তা যাবে কেন? সম্পর্ক ঠিকই থাকবে। কিন্তু দেখো, কেরিয়ারটার একটা দাম আছে। হয়তো এখানকার কাজ শেষ হলে আমি ইউ এস এ চলে যাব। সেখানেও কথাবার্তা চলছে। খুব শিগগির দেশেফেরার তো চান্স নেই। কাজেই ও সব ভেবে মন খারাপ কোরো না, আমার স্বপ্ন আগে স্বপ্ন সফল হোক।

ডিসেম্বরের পর জুলাই, এক ঘোর বর্ষার দিনে তার বন্ধু সুবীরের বিবাহবার্ষিকীতে যেতে হয়েছিল তাকে। উপহার কেনা ছিল না বলে সিটি সেন্টার নামে এক শপিং মলে নিজের নতুন মারুতি গাড়িটা পার্ক করে কিছু কিনতে নামল নবেন। কিন্তু কেনাকাটায় সে বিশেষ অপটু। কী উপহার দেবে, কত টাকা বাজেট এ সব কিছুই ঠিক করতে পারছিল না। একবার সোনাদানা, একবার বই, একজোড়া মোবাইল ফোন, এবং শাড়ি আর ধুতি পাঞ্জাবির কথাও মাথায় এল। কিন্তু কিছুই স্থির করতে পারছিল না।

সিটি সেন্টারের অতিশয় চাকচিক্যময় দোকানগুলোর বাইরে থেকে ঘুরে ঘুরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করছিল সে, এবং তখনই আচমকা মেয়েটাকে দেখতে পেল। হাতে সেই দড়ির ব্যাগ, চোখে চশমা, সবুজ শাড়ি আর ব্লাউজ।

আপনি সঞ্চিতা না?

আপনি নবেন। বলেই সেই শিশুর মতো হাসি। মুগ্ধ হয়ে গেল নবেন। এত ভাল হাসি কারও দেখেনি সে। বলল, আপনি এখানেই কেনাকাটা করেন বুঝি?

এটা কাছে হয়। তা ছাড়া কেনাকাটা আমার এক বাতিক। জিনিস কিনি বলে মা খুব বকে। কিন্তু কী করব, শপিং আমার একটা নেশা। আপনি এখানে যে?

আমি আবার আপনার উলটো, কেনাকাটা একদম পারি না। আমার বন্ধুর ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে উপহার কিনব বলে নেমেছি কিন্তু কী কিনব, সেটাই ঠিক করে উঠতে পারিনি এখনও।

বাজেট কত?

সেটাও ঠিক করিনি। ব্যাঙ্কের ক্রেডিট কার্ড আছে, সুতরাং যা খুশি কিনে ফেলব। কী দেওয়া যায় বলুন তো?

ম্যারেজ অ্যানিভার্সারিতে দামি জিনিস দেবেন কোন দুঃখে? সস্তায় দেখনসই জিনিস দিলেই তো হয়। কেনাকাটায় সমস্যা থাকলে স্ত্রীকে নিয়ে এলেই তো হয়।

সেটা সম্ভব নয়। আমার স্ত্রী একজন আছেন বটে, তবে তিনি এখন বিলেতে, নিজের কেরিয়ার তৈরি করছেন।

বাঃ দারুণ ব্যাপার তো?

হ্যাঁ, দারুণ। নিদারুণও বলতে পারেন। তিনি এ দেশে আদৌ ফেরার কথা ভাবছেন না।

তাতে কী? আপনিও চলে যান না?

দেখুন ম্যাডাম, আমি বিদেশ—প্রেমিক নই। সাহেবরা খেটেখুটে তাদের দেশটাকে ঝাঁ চকচকে রেখেছে, আর আমি গিয়ে সেখানে হামলে পড়ে লুটেপুটে খাব। এই আইডিয়াটা আমার পছন্দ নয়।

ও বাবাঃ, আপনি তো বেশ ইগোইস্ট দেখছি। নাকি বউ বিলেতে গেছে বলে প্রেস্টিজে লাগছে?

না, সে ব্যাপার নয়, যে গেছে যাক, আমি যেতে রাজি নই।

পুরুষদের অনেক কমপ্লেক্স।

তা হবে হয়তো।

আচ্ছা, লেটস ড্রপ দ্য সাবজেক্ট। এখন চলুন তো?

এরপর সঞ্চিতা তাকে সঙ্গে নিয়ে একটা বুটিক থেকে চমৎকার একটা ঘর সাজানোর জিনিস কিনে দিল, মাত্র বারোশো টাকার মধ্যে। তারপর বলল, চলুন, আপনাকে কফি খাওয়াই।

কফি খেতে নবেন বলল, ভাগ্যিস আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে গিয়েছিল, নইলে উপহার নিয়ে অকুলপাথারে পড়ে গিয়েছিলাম। ধন্যবাদ।

ধন্যবাদ কিসের? কেনাকাটা করতে তো আমার ভালোই লাগে। বউয়ের চিঠি পেয়েছেন?

আজকাল চিঠি আবার কেউ লেখে নাকি? ই—মেল করে। পনেরো কুড়ি দিন পর পর ই—মেল আদানপ্রদান হয়। তিন মাস পর ফোন।

ওমা, সে কী?

তার মানে?

কতদিন বিয়ে হয়েছে আপনাদের?

এই তো সাড়ে চার বছর।

বউ বিলেতে আছে কতদিন?

দেড় বছর হল।

তা হলে ই—মেল আর ফোন এত কম হচ্ছে কেন?

পৃথা আর কোনো নম্বর দেয়নি। আমাকে ফোন করতে বারণ করে। বলে ভীষণ ব্যস্ত। বাড়িতে থাকে না। ই—মেল অবশ্য আমি প্রায়ই করি, কিন্তু ও পনেরো দিন পরপর চেক করে।

রাগ করে যায়নি তো?

না, পৃথা কাজের মেয়ে, রাগ অভিমান নেই।

আপনার স্ত্রীরা ভেনচারের কথা জেনে ভীষণ ভালো লাগছে। আমাদের দেশের মেয়েরা তো আকাশের দিকে তাকাতে ভয় পায়।

প্লিজ! প্রসঙ্গটা থাক না। কফিটা বরং এনজয় করি?

ঠিক আছে। সাতটা বাজে, নেমন্তন্নে যেতে হবে তো!

ও হ্যাঁ, সময়টা খেয়াল ছিল না।

যাবেন কী করে? বাইরে তো এখনও প্রচণ্ড বৃষ্টি।

হ্যাঁ, তবে গাড়ি আছে। চলুন, আপনাকে ড্রপ করে দিয়ে যাই।

তার দরকার নেই। আমারও একখানা গাড়ি আছে।

ফের কেনাকাটার দরকার হলে আপনাকে পাব কোথায়? মোবাইল নম্বরটা দিন।

ফোন নম্বর দেওয়া—নেওয়ার ভিতর দিয়ে দুজনের আজকের পালা শেষ হল। যাওয়ার সময় সঞ্চিতা বলল, শুনুন, আপনার সঙ্গে যে আমার বন্ধুত্ব হয়েছে, সেটা আপনার স্ত্রীকে চিঠি লিখে জানিয়ে দিন।

কেন?

দিন না। শুনে রাখুন, ই—মেল নয় কিন্তু। বেশ ভাল প্যাডের কাগজে লিখবেন, আর খামে করে পাঠাবেন।

কারণটা কী?

যা বলছি তা করেই দেখুন না। ভালো হবে।

যাঃ, কিসের ভালো হবে? কিছুই বুঝতে পারছি না।

মেয়েদের পরামর্শ উপেক্ষা করতে নেই।

উপেক্ষা করল না নবেন। দিন সাতেক ভেবে তারপর একদিন সত্যিই লম্বা একটা চিঠি লিখে ফেলল পৃথাকে। সঞ্চিতাকে যে তার বেশ ভালো লাগছে সেটাও সবিস্তারে লিখল। লিখল সঞ্চিতার আনমনা উদাসীন স্বভাবের কথা। আর চমৎকার হাসির কথাটাও।

চিঠি ডাকে দেওয়ার পাঁচদিনের মাথায় রাত বারোটায় পৃথার উত্তেজিত ফোন এল।

হ্যালো, কী ব্যাপার বলো তো? সঞ্চিতাটা কে?

সেটা তো চিঠিতে লিখেছি। পড়োনি?

এই প্রথম পৃথার গলায় অদ্ভুত উত্তেজনা লক্ষ করল নবেন। প্রায় চেঁচিয়ে সে বলল, কতদিন পরিচয় হয়েছে?

মাস পাঁচ—ছয় হবে।

ওর সঙ্গে আর মিশবে না।

মেলামেশির ব্যাপার নয়। সবে তো দু দিন দেখা হয়েছে।

সেটা কি আর দু দিনেই থেমে থাকবে?

তুমি এরকম অ্যাজিটেটেড হচ্ছ কেন? জাস্ট একটা—পট করে ফোন কেটে দিল পৃথা।

তারপর মাসখানেকের মধ্যে আর সঞ্চিতার সঙ্গে দেখা হয়নি বটে, কিন্তু ফোনে কথা হয়েছে বার কয়েক। আন্তরিক কথাবার্তা, সমবেদনামূলক ভাববিনিময়।

মাস দেড়েক বাদে হঠাৎ রাতে পৃথার থমথমে গলা পাওয়া গেল ফোনে, তোমার পাসপোর্ট কোথায়?

পাসপোর্ট? আমার তো পাসপোর্ট নেই। তুমি তো তা জানো।

কেন নেই?

পাসপোর্টের কোনো প্রয়োজন তো দেখা দেয়নি।

আমি এ সব শুনতে ছাই না। তুমি কালই পাসপোর্টের ফর্ম নিয়ে এসো। পরশুর মধ্যে জমা দাও। তৎকাল লিখে আপ্লাই করলে তাড়াতাড়ি পাওয়া যাবে।

হঠাৎ পাসপোর্টের দরখাস্ত করতে যাব কেন? কোনো প্রয়োজন তো দেখা দেয়নি। কোনো স্কলারশিপ বা ফেলোশিপ বা ইনভিটেশন তো পাইনি।

প্রয়োজনটা তোমার নয়, আমার। সামনের সপ্তাহে আমি তোমাকে টিকিট পাঠিয়ে দিচ্ছি।

কিসের টিকিট? কী ব্যাপার বুঝিয়ে বলো।

তুমি চলে এসো।

তার মানে? হঠাৎ আমি বিলেতে দৌড়ব কেন? আমার বিদেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই।

আমার খুব তোমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।

ইচ্ছেটা এত দেরি করে হল?

তুমি আসবে কি না।

এই প্রথম পৃথার গলায় রাগের উত্তাপ পেল নবেন। সে ধরে নিয়েছিল গ্রেট ম্যানিপুলেটররা কখনো রাগ করে না।

যাওয়া সোজা নয় পৃথা, গিয়ে হবেই বা কী? তুমি ব্যস্ত মানুষ, আমাকে সময় দিতে পারবে না।

তোমার জন্য আমি ছুটি নেব।

তাতে তোমার কাজের ক্ষতি হবে না?

হলে আমি সেটা ঠিক ম্যানেজ করে নেব।

ঠিক আছে, আমি একটু ভেবে দেখি।

তার মানে, তোমার আসার ইচ্ছে নেই?

দেখি, তোমার অভিনব প্রস্তাবে ইচ্ছেটা জাগে কি না।

আমি জানি, ওখানে একটা কিছু হচ্ছে।

কী হচ্ছে?

সেটা তুমিই জানো।

বলে খুব রাগ করেই যেন ফোনটা কেটে দিল। আশ্চর্যের বিষয় পৃথার এই নতুন চরিত্র দেখে একটুও অখুশি হল না নবেন। তার যেন ভালোই লাগল ব্যাপারটা।

পরদিন অফিস থেকে ফোনে সঞ্চিতাকে ব্যাপারটা বলল নবেন। সঞ্চিতা মৃদুস্বরে বলল, আপনি আপনার স্ত্রীকে এতদিন ঠিক বুঝতে পারেননি।

তাই হবে হয়তো, কিন্তু এখন কী করি?

আপনার যাওয়া উচিত?

আমার ইচ্ছে হচ্ছে না। আপনি নারীবাদী বলেই আমার স্ত্রীর পক্ষ নিচ্ছেন।

আপনি কি ভেবেছিলেন আমি আপনার পক্ষ নেব?

নিরপেক্ষ থাকতে পারেন তো!

আমি তো নিরপেক্ষই। আপনি অন্য দিকে ঝুঁকে আছেন বলেই পক্ষপাত দেখছেন।

কোন দিকে ঝুঁকে আছি?

আপনার স্ত্রীর উলটোদিকে। ওঁর দোষ কী বলুন তো! নিজের কেরিয়ার তৈরি করছেন, এই তো? আর কোনও দোষ আছে কি?

না, অন্তত আমার জানা নেই।

তা হলে শি ইজ গুড, নাথিং রং?

ওর আবেগ কম, ভালোবাসা কম।

ও সব আপনার আরোপিত ব্যাপার। ভালোবাসার কথা না বলাটাই অপরাধ নয়। বরং যারা ভালোবাসার কথা বেশি বলে তাদের দুধে জল আছে।

আপনি তো পৃথাকে চেনেন না। তা হলে বলছেন কী করে?

আমি ওঁর বয়সি একটা মেয়ে। মেয়েরা মেয়েদের অনেক বেশি বোঝে।

খুব অনিচ্ছের সঙ্গে পাসপোর্টের দরখাস্ত জমা দিল নবেন। তৎকাল স্কিমেই। এবং পাসপোর্ট অফিসের প্রথাসিদ্ধ হয়রানির পর পেয়েও গেল।

তিনদিনের মধ্যে পৃথার ফোন।

পাসপোর্ট পেয়েছ?

পেয়েছি।

এখানে খুব শীত। তবে তোমাকে বেশি গরম জামা আনতে হবে না। এখানে অনেক বেশি ভালো জিনিস পাওয়া যায়। টিকিট আর দুশো পাউন্ডের চেক পাঠিয়ে দিয়েছি। পেয়ে যাবে।

কেন যে এ সব করছ?

আমার ইচ্ছে।

আমি কিন্তু দু—সপ্তাহের বেশি ছুটি পাব না।

আগে এসো তো, যাওয়ার কথা পরে।

তার বিলেত যাওয়ার কথা শুনে দাদা শিবেন ও বাবা পরিতোষ খুব খুশি। মা খুব খুশি নন। তবে তেমন কোনও মন্তব্য না করে শুধু বললেন, দ্যাখ, ভাব কতক্ষণ থাকে।

অফিস থেকে অনায়াসেই এক মাসের ছুটি মঞ্জুর হল। কলিগরা দারুণ আনন্দ প্রকাশ করল। বেশ একটা উৎসবের মেজাজ। যাওয়ার আগের দিন সঞ্চিতা তাকে ডাকল কফিশপে। অক্টোবরের এক বিকেলে। মৃদু হেসে বলল, বিরহ শেষ হয়েছে তা হলে?

যার শুরুই ছিল না, তা শেষ হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।

এখনও স্ত্রীর ওপর রাগ পুষে রেখেছেন। আশ্চর্য!

রাগ। আ ফিলিং অফ ডিজেকশন। ওকে যখন রাজধানী এক্সপ্রেসে তুলে দিলাম তখনও ওর তোমন কোনো মন খারাপ দেখিনি। বরং নিজের ব্যাপার নিয়ে ভারী ব্যস্ত।

পুরুষরা যে মেয়েদের কাছে কী চায়! একটা মেয়ে ভালো চান্স পেয়ে নিজের চেষ্টায় বিদেশে যাচ্ছে, তার তো থ্রিল হবে। আপনি থ্রিলটা উপভোগ করলে পারতেন।

যাকগে বাদ দিন। আমি কিন্তু কিছুতেই যেতাম না। শুধু আপনার কথায় যাচ্ছি।

কথাটার প্রতিবাদ করল না সঞ্চিতা। বড় বড় চশমার ভিতর দিয়ে নিবিড় চোখে তার দিকে চেয়ে একটু সিক্ত গলায় বলল, এখন থেকে আমার কথা শুনে চলবেন।

কিন্তু কেন যে আপনি আমাকে পরামর্শটা দিলেন সেটা বুঝতে পারলাম না। স্বামী—স্ত্রীর মধুর মিলন ঘটানোর জন্য, নাকি আমার স্ত্রীকে আমার উপর টেক্কা দেওয়ার সুযোগ করে দিতে?

কোনোটাই নয়।

তা হলে?

ভালোবাসা কথাটার অর্থ জানেন?

কেন জানব না? সবাই জানে।

আমি যে ভালোবাসার কথা বলছি তার অর্থ আপনার জানা নেই।

আপনার নতুন অর্থটা বলুন, শুনি।

নতুন নয়। আসল অর্থটা মানুষ ভুলে গেছে। ভালোবাসা মানে হল, যাকে ভালোবাসি তার ভালো—তে বাস করা।

বুঝলাম না। আমার আর পৃথার মধ্যে এখনও ভালোবাসা জন্মায়নি।

আমি আপনাদের কথা বলছি না। আমার কথা বলছি।

তার মানে?

যে দিন রণজিৎ বলে আপনাকে ভুল করেছিলাম, সে দিন থেকেই আমি আমার বশে ছিলাম না। সিটি সেন্টার রোজ যেতাম শুধু আপনার জন্যে। কতদিন পরে এলেন আর সে দিনই জানলাম আপনি পৃথার। বুকে জ্বালাপোড়া হল, তিন দিন ঘুমোতেও পারিনি।

স্তম্ভিত নবেন অনেকক্ষণ বাক্রুদ্ধ থেকে বলল, বলেননি কেন?

কী বলব বলুন তো? প্রথমদিন যখন দেখা হল তখন বুকে অদ্ভুত আনন্দের রিমঝিম, মাথার মধ্যে যেন অনেক রঙিন বেলুন উড়ছে। ঠিকানা, ফোন নম্বর কিছুই জানতে চাইনি লজ্জায়। কিন্তু জানতাম একদিন ঠিক দেখা হবে। হবেই। হল। কিন্তু যেই শুনলাম আপনার বউ আছে, অমনি এক অদেখা, অচেনা মেয়ের ওপর এমন বিদ্বেষ আর ঘৃণা এল যে আমি অবাক হয়ে ভাবলাম, একজন লোককে ভালোবাসলে কি তার বউটাকে অকারণে ঘেন্না করতেই হবে? যে ভালোবাসার সঙ্গে বিদ্বেষ আর ঘেন্নাও জন্মায় সে কেমন ভালোবাসা? এই সব ভেবে দুটো দিন জ্বলে পুড়ে মরেছি, তারপরে কী করে যেন মনে এল, ওকে যদি ভালোইবাসি তবে ওর যাতে ভালো হয় তাই করা যাক। কেড়ে নিলে জিনিসটা সব সময়ে পাওয়া হয় না।

কিন্তু আমিও যে—

জানি, আপনিও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। আর একটু সুতো ছাড়া হলেই আপনিও পৃথাকে ঘেন্না করতে শুরু করতেন। আপনি ছোট হয়ে যেতেন, আমিও। দখলদারিই তো ভালোবাসা নয়।

আপনাকে বোঝা কঠিন।

না, মোটেই কঠিন নয়। তবে বুঝবার আর চেষ্টা না করে সবসময়ে আমার কথা শুনে চলবেন। কী, চলবেন তো?

নবেন মুখ নিচু করে মাথা নেড়ে বলল, হুঁ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%