সুভাষিণী

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না তো। আমি আপনাকে চিনতে পারছি না।

একদম না?

আমার আপনাকে চেনার কথা?

হ্যাঁ।

তাহলে চিনতে পারছি না কেন?

মানুষ যদি কিছু ভুলে যেতে চায়, তাহলে সে নিজের মস্তিষ্ক থেকে ওই অনভিপ্রেত স্মৃতি মুছে ফেলতে পারে।

তাই যদি হয় তাহলে কি এটাও সম্ভব যে, মানুষ তার কিছু প্রিয় ভুলে যাওয়া স্মৃতিকে ফের জাগিয়েও তুলতে পারে?

সেটা আমি জানি না। আমি সাইকিয়াট্রিস্ট নই।

নন?

না।

মানুষের মনের অনেক সমস্যা, সবটাই কি সাইকিয়াট্রিস্টরা জানে? মন বা স্মৃতি কোনোটাই মানুষের বশীভূত তো নয়। সাইকিয়াট্রিস্টেরও মানসিক সমস্যা হতে পারে।

সেসব আমার জানা নেই। আমি আপনাকে একটা কথা বলার জন্য এসেছি।

বলুন। কিন্তু তার আগে বলুন, আপনাকে আমি যদি চিনতামই ভুলতে চাইবার কি কোনো বিশেষ কারণ আছে?

হয়তো আছে।

আমি সম্প্রতি একটা লস অফ মেমরি থেকে ভুগছি। ডাক্তার বলেছে ইট ওয়াজ এ মেন্টাল শক। কী জানি, হতেও পারে। কিন্তু ভাইরাল অ্যাটাকে যেমন কম্পিউটারের মেমরি উড়ে যায়, আমারও ঠিক সেরকমই কিছু হয়েছে। আপনি যদি একটু খুলে বলেন, তাহলে আমি আমার হারানো স্মৃতি ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা করতে পারি। ইন ফ্যাক্ট, আমি এখন সারা দিন এই বারান্দায় বসে সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি রোজ।

আপনার চাকরিটা কি গেছে?

চাকরিটা এখনও যায়নি বটে, তবে যাবে। আমি লম্বা ছুটিতে আছি। অসুখের ছুটি। কোম্পানি কতদিন ছুটি বহাল রাখবে বলা মুশকিল। আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কেন, চেয়ার তো খালি রয়েছে। বসুন। এবং একটু ডিটেলসে বলুন, আমি আপনাকে কীভাবে চিনতাম।

তখন আমি ফ্রক পরি, স্কুলে যাই, তেরো বছর বয়স। আপনার বয়স হয়তো তখন বাইশ—তেইশ। তেজি, টগবগে, প্রাণবন্ত একজন যুবক। খুব যে হ্যান্ডসাম ছিলেন তা নয়, তবে ফিগারটা দারুণ ছিল। আমাদের শহরের মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান ছিলেন আপনার বাবা। আপনাদের ট্রাকের ব্যবসা ছিল। ষাট—সত্তরখানা ট্রাক। এসব নিশ্চয়ই আপনি ভুলে যাননি!

ঠিক ভুলে যাইনি! তবে একটু আবছা। যেন পূর্বজন্মের কথা।

সেই তখন আপনাকে আমি প্রথম দেখি, দশ বছর আগে।

দশ বছর! দশ বছর তো অনেকটা সময়!

তেরো বছর বয়সে আমার না ছিল রূপ, না কোনো গুণ।

দাঁড়ান, দাঁড়ান! কোথাও একটা গন্ডগোল হয়েছে।

কীসের গন্ডগোল?

আপনি বরং একটু ধীরে ধীরে বলুন। আমি বুঝতে পারছি না।

না বোঝার মতো কিছু বলিনি তো! রূপহীনা, গুণহীনা এক ত্রয়োদশীর কথাই তো বলছি।

আপনার গুণের কথা আমি জানি না। কিন্তু আপনাকে রূপহীনা বলে মনে হচ্ছে না তো! আপনি কি দেখতে খারাপ? আজকাল হয়তো সুন্দর কুচ্ছিতের সংজ্ঞাও আমি গুলিয়ে ফেলেছি।

আমি আমার তেরো বছর বয়সের কথা বলছি। কালো, রোগা, গাল—বসা কোটরগত চোখের একটা মেয়ে, যার প্রতি ভ্রূক্ষেপ না করলেও চলে। আপনি তখন আমাদের সেই শহরের বেশ একজন চোখটানা পুরুষ। ফুটবল খেলেন, পাহাড়ে চড়েন, লোকের উপকার করে বেড়ান, আবার তেমনই লাফাঙ্গা, বদমাশ, মেয়েবাজ ছেলে। মনে পড়ে?

একটু একটু মনে পড়ে। তবে বড্ড কুয়াশায় ঢাকা। আমি খুব খারাপ ছিলাম, না?

সেটা বললে অন্যায় হবে। খারাপ ছিলেন, আবার ভালো কাজও তো করেছেন। সেই ভয়ংকর বন্যার বছরে যখন শহর চার—পাঁচ ফুট জলের তলায় ডুবে গিয়েছিল, তখন আপনি নাওয়া—খাওয়া ভুলে কত লোককে এনে স্কুলবাড়ি আর ইনস্টিটিউটে পৌঁছে দিয়েছেন, রিলিফের জোগাড় করেছেন। এমনকী মার্চেন্টদের কাছ থেকে চাল ডাল কেড়ে এনেছেন।

হবে হয়তো।

মফস্সলে আপনার গ্রুপ থিয়েটারের খুব নাম ছিল। আপনি অভিনয়ও বেশ ভালোই করতেন। শুনেছি আপনি সিনেমায় নামবার চেষ্টা করছেন।

তাই নাকি? কিন্তু আপনার সঙ্গে কি তখনই দেখা হয়েছিল?

আমাকে আপনি রাস্তায়—ঘাটে, ফাংশনে বা আরও অনেক জায়গায় অনেকবার দেখেছেন, কিন্তু কখনো লক্ষ করেননি। করারও কথাও নয়। লক্ষ করার মতো তো ছিলাম না।

তা হবে।

আপনি দেবযানীদির সঙ্গে প্রেম করতেন। আবার রুচিরার সঙ্গেও। এবং নন্দিনীও ছিল আপনার প্রেমিকা। এই নন্দিনী ছিল আমার দিদি। আপনার মনে নেই?

বড় লজ্জায় ফেললেন। দেবযানীর কথা খুব সামান্য মনে পড়ছে। তার বাঁ গালে জড়ুল বা আঁচিল গোছের কিছু একটা ছিল বোধহয়। তাই না?

ছিলই তো।

ব্যস, ওইটুকু মনে আছে, বাকিটা নয়। আপনার দিদি—কী নাম বললেন যেন!

দু—বার। প্রথমবারের বিয়ে ভেঙে যায়। দ্বিতীয়বার বিয়ে করে এখন জার্মানিতে আছে।

না, তাকে আমার একদমই মনে পড়ছে না।

দিদিকে মনে না—পড়াটা আশ্চর্যের কথা। দিদি শুধু সুন্দরীই ছিল না, দারুণ গান গাইত। শহরে এবং অন্যান্য জায়গায় ফাংশনের মধ্যমণি ছিল। পরে রেডিও আর টিভিতে অনেক প্রোগ্রাম করেছিল।

আপনি আর বলবেন না। খুব বেশি রেফারেন্স দিলে আমার মাথার ভিতরে একটা ওলটপালট হতে পারে। মেমরি আরও গুলিয়ে যায়। খুব হতাশ লাগে তখন।

কিন্তু আপনিই তো বললেন, কথা বললে মেমরি রিচার্জ হতে পারে।

হ্যাঁ, সেও ঠিক। তবে খুব উপর্যুপরি রেফারেন্স দিলে আমি সূত্র হারিয়ে ফেলি।

সরি, আমি বুঝতে পারিনি।

আপনার তো দোষ নেই। আমিই কীরকম যেন হয়ে গেছি।

আমি কিন্তু দিদির কথা বলতে আসিনি।

তাহলে বরং তার কথা থাক। তাকে বোধহয় আমার মনে পড়বে না। সুন্দরী বা গায়িকা যাই হোক। বরং কালো, রোগা, ইনসিগনিফিক্যান্ট যে, মেয়েটির কথা বলতে চাইছেন—অর্থাৎ আপনার কথা বলুন।

আমার কথা! না আমাকে আপনার মনে পড়ার কোনো কারণই নেই। রূপবতী, গুণবতীদেরই যখন মনে নেই, তখন আমাকে তো মনে পড়ার কথাই নয়।

কী জানেন, অনেক কথাই মনে পড়ে না বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে খুব তুচ্ছ, সামান্য অর্থহীন ছোট ছোট ছবির মতো দৃশ্য মনে পড়ে। কেন মনে পড়ে তা বুঝতে পারি না। যেমন ধরুন, একটা বৃষ্টির দিনের কথা মনে আছে। স্কুলবাড়ির গাছতলায় সবুজ জামা গায়ে একটা ছেলে একটা ছাগলকে কাঁঠালপাতা খাওয়াচ্ছে আর গলা জড়িয়ে ধরে আদর করছে, এই দৃশ্যটা কেন মনে পড়ে বলুন তো। কিংবা ধরুন, সেই যে যেবার আকাশে একটা বিরল ধূমকেতু দেখা গিয়েছিল। আমরা ভোররাতে প্রচণ্ড শীতে ছাদে সেই ধূমকেতু দেখতে উঠতাম। একটা ভোরে কে একজন পাশের ছাদে ভরাট গলায় একটা রবীন্দ্রসংগীত গাইছিল, আর আমার কেন যেন গান শুনে খুব মৃত্যুর কথা মনে হয়েছিল।

আর কিছু মনে পড়ে না?

হ্যাঁ, এইরকমই ছোট ছোট চৌখুপির মতো দৃশ্য বা শব্দ। ঠিক যেন একটা অন্ধকার খামের গায়ে এলোমেলো সংগতিহীন কয়েকটা ডাকটিকিট সাঁটা। একটার সঙ্গে আর একটার কোনো পারম্পর্য নেই। তবু যে মনে পড়ে, তার কারণ হয়তো এইসব স্মৃতি বোধহয় উপেক্ষা করার মতো নয়। মনে পড়ার কারণ আছে।

সেটা বোধহয় সব মানুষেরই আছে। আমারও এমন সব কথা মনে পড়ে যার কোনো মানেই হয় না। আমাদের বাড়িতে লাঠিতে ভর দিয়ে একটা বুড়ো ভিখিরি আসত। কেন কে জানে, ওই লাঠিটার কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। সাধারণ বাঁশেরই লাঠি, তবে গাঁটে গাঁটে আঁকাবাঁকা। তিরিক্ষি ছিরির একটা লাঠি। সব ছেড়ে ওই লাঠিটাকেই কেন মনে পড়বে বলুন। অমন অবাক হয়ে চেয়ে আছেন কেন বলুন তো!

আমি পরের যে—ঘটনাটা আপনাকে বলতে যাচ্ছিলাম তা ওই লাঠিকা নিয়েই।

সে কী?

ওই বুড়ো ভিখিরিটার নাম ছিল দেলু। মা ওকে খুব ভালোবাসত। বহুদিন বসিয়ে ভাই খাইয়েছে। লোকটার ভালো একটা নামও ছিল। বোধহয় দিলদার সিং। সেই বাঁশের বাঁকা লাঠিকার কথা আমার যখনই মনে পড়ে, তখনই দিলদারকেও যেন দেখতে পাই। কাঁচামিঠে আমগাছটার তলায়, পাশে লাঠিখানা রেখে উবু হয়ে বসে কলাইকরা থালায় ভাত খাচ্ছে।

আশ্চর্য তো! ওই লাঠিটার কথা আপনারও মনে আছে?

হ্যাঁ। খুবই অবাক কাণ্ড! দেলুর লাঠির কথা মনে রেখেছে এমন লোক বোধহয় পৃথিবীতে খুবই বিরল।

আর কী মনে আছে আপনার?

উমমম! দাঁড়ান, ভাবতে দিন। মুশকিল কি জানেন, চেষ্টা করলে তেমন মনে পড়ে না। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এক একটা ছবি যেন অন্ধকারে ভেসে ওঠে। মস্তিষ্ককে বেশি তাড়না করলে একটা যন্ত্রণা হয়। ভয় হয় গোটা মেমরি ডিস্কটাই না শেলেটের মতো মুছে যায়। কিন্তু আপনি আমার কাছে কেন এসেছেন তা এখনও জানি না।

ধরুন, এমনিই। আমরা এক শহরে বাস করতাম, ছেলেবেলায় আপনি আমার কাছে খানিকটা হিরোও তো ছিলেন। মনে করুন সেই হিরোকেই একটু দেখতে আসা।

ভালো, খুব ভালো। আজকাল কেউ বড় একটা আসে না। এখানে খুব হাওয়া বয়, বেশ শীত। সারা দিন এই খোলা বারান্দায় বসে থাকি। শালগাছে বাতাসের যে শব্দটা হয় সেটা অনেকটা হাহাকারের মতো, মন খারাপ লাগে। আর এ বাড়িটার অনেক গাছ। এত বড় বড় গাছ থাকায়, আমি বাইরেটা খুব ভালো দেখতে পাই না।

এ বাড়িটা বুঝি আপনারা কিনেছেন?

হ্যাঁ। বাবাকে ডাক্তার বুঝিয়েছে, নির্জন স্বাস্থ্যকর জায়গায় আমাকে রাখতে। তাই এ বাড়িটা কেনা হয়েছে।

আপনি বেড়াতে যান না!

মর্নিং ওয়াক? না। আমার ওসব ভালো লাগে না। সন্ধেবেলা ছাদে অনেকক্ষণ পায়চারি করি। এখানে খুব ঠান্ডা পড়ে। সন্ধের পর আমাদের ছাদটায় খুব হিম বাতাস বয়ে যায়। আর ভীষণ অন্ধকার। খুব কুয়াশা না হলে আকাশভরা তারা দেখা যায়। বেশ লাগে তখন পায়চারি করতে। হাসছেন কেন?

এমনিই। ভাবছিলাম বড়লোক হওয়ার কত সুবিধে। আপনার ডিমেনশিয়া হয়েছে বলে আপনার বাবা ঝাড়গ্রামে আস্ত একটা শালবনসুদ্ধু দোতলা বাড়িই কিনে ফেললেন আপনার দেহমন ভালো রাখার জন্য। আমাদের মতো গরিবদের এর চেয়ে অনেক বেশি শক্ত রোগ হলেও কিছু করার থাকে না।

ঝাড়গ্রাম! হ্যাঁ, ঝাড়গ্রামই তো বললেন! এই নামটা দিনের মধ্যে আমি আমি যে কতবার ভুলে যাই! আপনার বাড়ি বুঝি এখানেই?

না। আমি কাছাকাছি একটা কলেজে পড়াই। খুব সম্প্রতি, মাত্র মাস ছয়েক আগে জয়েন করেছি।

গরিব আর বড়লোকের ব্যাপারটা আপনি ঠিকই বলেছেন। বড়লোক হওয়ার কিছু অন্যায্য সুবিধে আছে। কিন্তু তার জন্য শুধু বড়লোকদের দোষ দিয়ে বা মুন্ডুপাত করে লাভ নেই। বড়লোকেরা এই সামাজিক সিস্টেমটা তৈরি করেনি। আমি অনেক ভেবে দেখেছি, এ দেশের সিস্টেমটাই এরকম। তবে আমাদের অবস্থা কিন্তু আগের মতো ভালো নেই।

জানি। আপনার বাবার নামে অনেকগুলো মামলা ঝুলছে। ট্রাকের ব্যবসা মার খেয়েছে। আপনার দাদা দীপঙ্কর জেল খাটছেন।

হ্যাঁ। আপনি তো সবই জানেন। চিরকাল তো কারও সমান যায় না। বেশ একটা দুঃসময় চলছে আমাদের।

এসব কথা তো আপনার বেশ মনে আছে দেখছি।

ইমিডিয়েট পাস্ট, অর্থাৎ অনতি অতীত বেশ মনে করতে পারি, কিন্তু তার বেশি অতীতটাই কুয়াশা ঢাকা। আবার একটু একটু করে এই অনতি অতীতও যে মুছে যাচ্ছে তাও টের পাই। তখন খুব ভয় করে। এক বছর আগে আমাদের বাড়িতে একটা গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ হয়ে আগুন লেগে যায় এবং তাতে আমার বোন টিকলি ভীষণভাবে পুড়ে যায়। পরে সে মারাও গেছে। এই ঘটনাটা আমি কি করে যে ভুলে গিয়েছিলাম কে জানে। সেদিন সুবল আমাকে ঘটনাটা মনে করিয়ে দিয়েছিল।

টিকলিদির জন্য আমরা সবাই খুব দুঃখ পেয়েছি। খুব ভালো ছিলেন টিকলিদি। জামাইষষ্ঠীতে বাপের বাড়িতে এসেছিলেন। ভাগ্য খারাপ থাকলে কত কী হয়। সেদিনই নতুন সিলিন্ডার লাগানো হয়েছিল আর টিকলিদি গিয়েছিলেন বিরিয়ানি রাঁধতে।

অত ডিটেলস আমার মনে নেই। টিকলির মুখটাও স্পষ্ট মনে পড়ে না।

ওঁর একটা মেয়ে আছে, না?

আছে বোধহয়। হ্যাঁ, আছে।

আপনি সুবলের কথা বললেন, সুবল কে?

আমার দেখাশোনা করে। পুরোনো লোক।

আপনি ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতেন, মনে আছে?

ব্যাডমিন্টন! হয়তো খেলতাম।

মনে নেই আপনার?

না। খেলাটা ভালো নয়।

কেন, ব্যাডমিন্টন তো বেশ একটা খেলা।

শাটল কক কী দিয়ে তৈরি হয় জানেন?

পাখির পালক।

হাজার হাজার শাটল কক তৈরি করার জন্য এত পালক ওরা পায় কোথায়? ওরা কি পাখি মেরে পালক উপড়ে নেয়?

আমি তা জানি না।

আমার সন্দেহ, শাটল ককের জন্য পাখি মারা হয়।

হতেও পারে।

পাখির মতো এমন সুন্দর আর আশ্চর্য প্রাণী আর হয় না, না? আমি আজকাল চারদিকে অনেক পাখি দেখতে পাই। তাদের ডাক শুনি। আজকাল আমার কাকের ডাকও ভালো লাগে। হাসছেন যে!

ভাবছি আপনি মুরগি খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন কিনা। আপনার মা খুব শুদ্ধাচারী মহিলা ছিলেন বলে হেঁসেলে মুরগি ঢুকতে দিতেন না। আপনি আর আপনার বন্ধুরা বাড়ির পিছনের উঠোনে মুরগি কেটে রান্না করে খেতেন, মনে নেই? ও কী, অমন সাদা হয়ে গেলেন কেন?

না, না, ও কিছু নয়। আমার মনে হয় অস্বচ্ছ অতীতে আমি এমন সব কাজ করেছি যা মনে না পড়াই বোধহয় ভালো। না, এখন আমি মুরগি খাই না। মাছমাংস কিছুই খাই না।

বৈরাগ্য এল বুঝি!

ঠাট্টা করছেন! বৈরাগ্য তো সহজ ব্যাপার নয়! তবে সহনশীলতা বলে একটা কথা আছে না? বোধহয় সেইটে এসেছে। নাকি, কে জানে, আমি হয়তো ধীরে ধীরে কাঠ বা পাথরের মতো হয়ে যাচ্ছি।

ও কথা বলছেন কেন?

কিছুদিন আগে আমাকে একটা কাঁকড়াবিছে হুল দিয়েছিল। ডান পায়ের বুড়ো আঙুল। সে যে কী অসহ্য যন্ত্রণা, মনে হচ্ছিল হার্ট ফেল হয়ে মরে যাব। সুবল একটা হাতুড়ি নিয়ে বিচেটাকে মারতে এসেছিল। ও নাকি তুক জানে, কাঁকড়াবিছের রস লাগালে ব্যথা কমে যায়। আমি ওকে মারতে দিইনি। মেরে কী হবে বলুন। বেচারা তো নিজেই জানে না যে, ওর বিষ এতটা মারাত্মক। মানুষের কত অস্ত্রশস্ত্র আছে, ওদের তো ওই হুল বা দাঁত বা নখ বা হিং—ই ভরসা।

গাঁধীবাদী হতে বারণ করছি না। তবে পেস্ট কন্ট্রোল এজেন্সিকে খবর দিয়ে বাড়ি থেকে পোকামাকড় তাড়িয়ে দেওয়াই ভালো। দাঁত নখ হুলের সঙ্গে সহাবস্থান মোটেই নিরাপদ নয়। আমি জুলজিস্ট, পোকামাকড় সম্পর্কে আপনার চেয়ে একটু বেশি জানি। কাঁকড়াবিছের বিষে মানুষ মারাও যায়। আপনি ডাক্তার ডাকেননি?

না।

খুব অন্যায় করেছেন।

একটা অদ্ভুত ব্যাপার হল যে।

কী হল?

খবর পেয়ে একটা লম্বাপানা লোক এল। এ পাড়াতেই থাকে। সেই লোকটা আমাকে বাথরুমে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করিয়ে মাথায় মগের পর মগ জল ঢালতে লাগল। বিড়বিড় করে কী একটা মন্ত্রও পড়ছিল। জল ঢালতে ঢালতে আমার সর্বাঙ্গ ঠান্ডা হয়ে কাঁপুনি ধরে গিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জল ঢালার পর আমার ব্যথাও একদম কমে গেল।

যাঃ! ওই বিষের ব্যথা উইদাউট মেডিকেশন চব্বিশ ঘণ্টা থাকার কথা। শুধু জল ঢাললে ব্যথা কমার কথাই নয়।

কিন্তু কমল যে!

আপনি এখানে থাকতে থাকতে অন্ধ বিশ্বাস বা বুজরুকিও মানতে শুরু করেছেন।

তাই হয়তো হবে, কিন্তু ব্যথাটা সত্যিই ছিল না আর।

ঠিক আছে, আপনার কথাই মানছি।

আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে আপনি আমার কথা বিশ্বাস করছেন না। ঠোঁটে একটু চাপা হাসি, চোখে একটু বিদ্রুপের চাউনি। আজকাল আমি অবশ্য কাউকেই কিছু বোঝাতে পারি না। এমন কী, সুবল অবধি আমার অনেক কথা সিরিয়াসলি নেয় না।

আমি ভাবছি মানুষ অনেক সময়ে যা বিশ্বাস করতে চায় সেটাই ঘটে যায়। আপনি হয়তো খুব জোরের সঙ্গে লোকটার অলৌকিক ক্ষমতাকে বিশ্বাস করেছিলেন, আর সেই জোরেই হয়তো ব্যথাও কমেছে। মানুষ মন দিয়ে কত কী করতে পারে। কিংবা লোকটা হয়তো আপনাকে হিপনোটাইজ করেছিল।

আপনি পারেন?

কী?

হিপনোটাইজ করতে?

না। আমার পারার কথাও নয়।

কেউ যদি আমাকে বাকি জীবনটা হিপটোটাইজ করে রেখে দিত তাহলে বড্ড ভালো হত।

বাস্তব থেকে পালাতে চান তো! আমার সবাই কমবেশি পালাতেই তো চাই। কিন্তু পালিয়ে লাভ হয় না, ফের বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয়। নিস্তার নেই। একটা সময় ছিল যখন আপনি পালানোর মানুষ ছিলেন না। হাসপাতালের মোড়ে সেই যে ভীষণ হাঙ্গামাটা হয়েছিল তার কথা আপনার মনে আছে? বাবুপাড়ার ছেলেদের সঙ্গে মেছোবাজারের গুন্ডাদের কী ভয়ংকর মারপিট! কত বোমা পড়েছিল, গুলি চলেছিল, পুলিশ অবধি এগোতে সাহস পায়নি। একটা মোটরবাইক নিয়ে এগোতে সেই হাঙ্গামার মধ্যে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। খুব পপুলার ছিলেন বলেই বোধহয় সেই হাঙ্গামা থামাতে পেরেছিলেন আপনি। আমি অবশ্য ডিটেলস জানি না, তবে তখন লোকের মুখে মুখে আপনার নাম ফিরত। মনে আছে?

না। কিছু মনে নেই।

কিংবা রুচিরা আর পল্লুর সেই ভালোবাসার বিয়ে! মনে আছে?

নাম দুটো প্রথম শুনছি।

বদমাশ, জুয়াড়ি, জোচ্চোর, মিথ্যেবাদী বলে পল্লুকে সবাই চিনত। তবু রুচিরা যে কী করে ওর প্রেমে পড়ল কে জানে! শান্ত, শিষ্ট, ভারী ভালো মেয়ে। ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল। তবু পল্লুর প্রেমে পাগল হয়ে প্রেগন্যান্ট হয়ে পড়ল। কেলেঙ্কারির একশেষ। পল্লু দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছিল। রুচিরার বাবা পল্লুর সঙ্গে বোঝাপড়া করতে গিয়ে গুণ্ডাদের মার খেয়ে এলেন। পুলিশ অবধি পল্লুকে আড়াল করেছিল, কারণ ওর মামা ছিল ডি এস পি। রুচিরাকে আত্মহত্যা করতে হত আপনি না থাকলে।

পল্লু! রুচিরা! এসব শব্দ শুনছি আর আমার মাথার ভিতরে গভীর কালো জলে টুপটাপ করে পড়ে তলিয়ে যাচ্ছে। কোনো ঝংকারও নেই, টংকারও নেই। পল্লুকে কি আমি মেরেছিলাম?

না। বরং তাকে প্রবল মারের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। রুচিরা যখন বিষ খেয়ে হাসপাতালে, তখন ওদের পাড়ার লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে তেড়ে এসে পল্লুকে পাকড়াও করে। সেদিন আপনি গিয়ে আড়াল না করলে ও মরেই যেত। শুনেছিলাম, কিছুদিন আপনি ওকে বন—বাংলোয় নিয়ে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার জন্য পুলিশ ওকে খুঁজছিল। খুব গন্ডগোল চলেছিল কিছুদিন। আপনাকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। কিছুদিন পরে অবশ্য রুচিরা আর পল্লুর বেশ মিলমিশ হয়ে যায়। পল্লু কিন্তু আর আগের মতো ছিল না, পালটে গিয়েছিল। কী করে সেটা হয়েছিল তা আজও জানি না।

আচ্ছা এই ঘটনাটা শুনে আমাকে তো বেশ ভালো লোক বলেই মনে হচ্ছে তাই না?

খারাপ তো বলতে চাইছি না।

কিন্তু একটু আগে আপনিই না বলেছিলেন যে, আমি ছিলাম লাফাঙ্গা, বদমাশ, মেয়েবাজ! একই সঙ্গে একটা লোক ভাল আর খারাপ কী করে হতে পারে?

সেই জন্যই তো আপনাকে একদম বুঝতে পারতাম না। কখনো মনে হত ভীষণ ভালো, ডাকাবুকো, সাদা মনের মানুষ। আবার কখনো মনে হত ভীষণ পাজি, ভীষণ দুষ্টু, ভীষণ অ্যাগ্রেসিভ।

খুব মুশকিলে ফেলেছেন আমাকে।

মুশকিল শুধু আপনার নয়, আমারও। মনে মনে আপনার যে পোর্ট্রেটটা আঁকার চেষ্টা করেছি, সেটা বারবার বদলে গেছে। কখনও আপনাকে মনে হয় ইভান দি টেরিবল, কখনো বা সন্ত জন। আপনি এমন অদ্ভুত ছিলেন বলেই আমার কিশোরী বয়সে আপনাকে নিয়ে আমি মনে মনে ভারি জ্বালাতন হতাম।

আমাকে নিয়ে আপনার প্রবলেমটা কী ছিল বলবেন?

অনেক সময়ে কেউ কেউ নিজের অজান্তেই অন্য কারও প্রবলেম হয়ে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আমার একটা ধারণা হয়েছিল যে, আপনি আমার দিদিকে বিয়ে করবেন এবং একদিন আপনাকে জামাইবাবু বলে ডাকতে হবে।

ও হ্যাঁ, এ কথাটা বলেছিলেন বটে। আপনার দিদির সঙ্গে আমার—

ঠিক তাই

তখন আপনার বয়স কত যেন?

তেরো—চোদ্দো।

কালো ছিলেন, রোগা ছিলেন, আর যেন কী?

কালো, রোগা, আনঅ্যাট্রাকটিভ, শুধু পাখির মতো সরু গলায় গান গাইতে পারতাম।

এখন গান না?

না। এখন জুলজি পড়াই।

হ্যাঁ, সেকথা আমার মনে আছে।

গানের কথায় একটা মেঘলা দিনের কথা মনে পড়ল। বলব?

কি জানি কেন, আজ এই শীতের সকালে আপনার কথা শুনতে আমার বেশ ভালো লাগছে। আপনি আমার সেই ছোট্ট শহরের মেয়ে। কত ছোট ছোট কথা মনে আছে আপনার। শুনে ফের সেই ছেলেবেলায় ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে।

ইচ্ছে করছে?

হ্যাঁ। ভীষণ।

আপনার ইচ্ছের আরও জোর হোক।

সেই যে মেঘলা দিনের কথা বলবেন বলছিলেন! বলুন।

হ্যাঁ, সেটা এক আশ্চর্য দিন। আমাদের শহরের এক পলিটিক্যাল লিডার তার আগের দিন কদমতলার মোড়ে খুন হয়েছিলেন। বিমলাংশু সেন। পরদিন সকাল থেকেই দোকানপাট বাজার সব বন্ধ। গাড়িঘোড়া কিচ্ছু চলছে না। অথচ সেদিন জেলা শহরে আমার গানের কমপিটিশনের ফাইনাল পরীক্ষা। না গেলেই নয়। শহর প্রায় পঁচিশ মাইল দূর। সকালে এসব খবর পেয়ে মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। রাগ—অভিমান—হতাশায় খাওয়া—দাওয়া বন্ধ করে বিছানায় পড়ে পড়ে কেবল কাঁদছি, তখন দিদি এসে বলল, কাঁদিস না। ঠিক একটা উপায় হবে, দেখিস। কিন্তু ওসব যে ছেলে ভোলানো কথা তা জানা ছিল বলে একটুও বিশ্বাস হয়নি। কিন্তু উপায় সত্যিই হয়েছিল। দিদি আপনাকে খবর দিয়েছিল।

আমাকে! কেন?

সেটাই তো গল্প। আপনি আমাকে জেলা শহরে নিয়ে যেতে রাজি হয়েছিলেন। ছ—টায় পরীক্ষা, আপনি ঠিক সাড়ে চারটের একটা বিরাট মোটরবাইক নিয়ে এসে হাজির। এক মুখ হাসি নিয়ে বললেন, চলো খুকি, তোমাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসি।

দাঁড়ান, দাঁড়ান! কী নাম যেন বললেন! বিমলাংশু সেন?

হ্যাঁ তো!

লম্বা, ফরসা, কোঁকড়া চুল, চোখে ভারী চশমা?

হ্যাঁ।

বিমলাংশু সেনকে পেটে আর বুকে ছুরি মারা হয়েছিল, তাই না?

হ্যাঁ।

তাকে আমার বেশ মনে পড়ে যাচ্ছে।

সত্যি?

তারপর বলুন।

আমি তৈরি হয়েই ছিলাম। আপনি আমাকে কীভাবে মোটরবাইকের ক্যারিয়ারে বসতে হবে তা শিখিয়েছিলেন। বলেছিলেন আপনার কাঁধ বা কোমর জড়িয়ে ধরে শক্ত হয়ে বসে থাকতে হবে। জীবনে সেই প্রথম মোটরবাইকে চড়া আমার। যা ভয় করছিল! আর সেইসঙ্গে লজ্জায় মরে যাচ্ছিলাম।

লজ্জা কীসের?

ওমা! লজ্জা নয়! তখন যে মনে মনে আপনাকে নিয়ে সারাক্ষণ গবেষণা করি! তখন, বালিকা বয়সে আপনার চেয়ে রহস্যময় পুরুষ আর কেউ ছিল না আমার।

রহস্যময়! রহস্যময় ছিলাম বুঝি আমি?

ভীষণ। আপনার কাঁধে হাত রেখে পিছনের সিটে আমি কাঁটা হয়ে বসেছিলাম। সারা শরীর বারবার শিউরে শিউরে উঠেছিল। আপনি অবশ্য পাত্তা দেননি আমাকে। আর তেরো বছরের কালো, রোগা একটা পেতনি মেয়েকে কেনই বা পাত্তা দেবেন আপনি!

সেটা ছিল বুলেট।

তার মানে?

মোটরবাইকটার কথা হঠাৎ মনে পড়ে গেল।

আপনার মোটরবাইকটা ছিল ভীষণ বিচ্ছিরি। একে তো দৈত্যের মতো চেহারা, তার ওপর যা জোরে ছুটত। শব্দে কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়।

আপনার অভিজ্ঞতা নেই বলে বলছেন। নইলে বুলেট একটি চমৎকার বাইক। যে কোনো রাস্তায় চলতে পারে, একনকী পাহাড়ি রাস্তায়ও।

আপনি এমন উদাসীনভাবে চালাচ্ছিলেন যে, আপনার পিছনে যে একটা তেরো বছরের ভিতু মেয়ে বসে আছে সেটা আপনার খেয়ালই ছিল না।

না, না, ভুল ভেবেছেন। নিশ্চয়ই খেয়াল ছিল, কাউকে ক্যারি করার সময় আমি তো সাবধানেই চালাতাম।

সেটা বুঝি মনে আছে আপনার?

অ্যাঁ! তাই তো, মনে আছে দেখছি! ভারী আশ্চর্যের ব্যাপার!

সেদিন কিন্তু মোটেই সাবধানে চালাননি। ভয়ে আমি বারবার দু—হাতে আপনাকে আঁকড়ে ধরেছি আর লজ্জায় মরে গেছি।

আপনি খুব লাজুক ছিলেন তো?

হ্যাঁ। এখনও তাই। খুব আনস্মার্ট, ঘরকুনো। ভিতুও।

হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক মেয়েদের যেমন হওয়া উচিত!

তার মানে! মেয়েদের আনস্মার্ট, ঘরকুনো আর ভিতু হওয়া ভালো বুঝি?

ভালো নয়? তাহলে কি অন্যরকম হওয়া উচিত?

যদি তাই হবে তাহলে আপনি আমাকে পাত্তা দেননি কেন?

তেরো বছর বয়সের মেয়েরা তো ইজের পরে!

আমি সেদিন সালোয়ার—কামিজ পরেছিলাম। অ্যান্ড ফর ইওর ইনফরমেশন, যথেষ্ট সেজেওছিলাম।

হাঃ হাঃ! তাই বুঝি! তাহলে তো আপনাকে আমার সমীহ করাই উচিত ছিল! কিন্তু ঠিক কীরকম ব্যবহার করেছিলাম আপনার সঙ্গে, একটু বলবেন?

একটু নাক সিঁটকোনোর ভাব তো ছিলই। আর ছল অ্যান অ্যাটিটিউড অফ রিজেকশন। ভাবটা যেন, তুমি যতই সাজো, কিচ্ছু যায় আসে না আমার।

আজ আমি সেদিনের ব্যবহারের জন্য যদি ক্ষমা চাই?

যাঃ, ঠাট্টা করছিলাম। আমার ওই বয়সে কি কারও কাছে পাত্তা পাওয়ার কথা!

দাঁড়ান, দাঁড়ান, একটা গন্ধ পাচ্ছেন?

পাচ্ছি তো। পাতাপোড়ার গন্ধ। কেউ কাছে পিঠে শুকনো শালপাতা জড়ো করে আগুন দিয়েছে বোধহয়।

না, না, সে গন্ধ নয়।

তবে?

ক্যা—ক্যালিফোর্নিয়ান পপি!

ক্যানিফোর্নিয়ান পপি!

ক্যানিফোর্নিয়ান পপির গন্ধ!

আমি তো পাচ্ছি না! তবে আমরা একসময়ে ওই নামের একটা তেল চুলে মাখতাম। কিন্তু সে তো ছেলেবেলায়!

কিন্তু আমি গন্ধটা পাচ্ছি যে! আর একটা বাসন্তী রঙের ওড়না—হ্যাঁ, বাসন্তী রঙের ওড়না ঝোড়ো বাতাসে খুব উড়ছে, রিয়ার ভিউ মিররে আমি যেন এখনও দেখতে পাই। ভয় করছিল আমার।

উঃ।

কী হল?

সেটা তো বাসন্তী রঙেরই ওড়না ছিল! আমিই ভুলে গিয়েছিলাম! আপনি বাইক থামিয়ে আমাকে বললেন ওড়নাটা কোমরে জড়িয়ে নিতে। নইলে নাকি চাকায় ওড়না জড়িয়ে অ্যাকসিডেন্ট হতে পারে। এটা কী করে মনে পড়ল আপনার?

না, মনে পড়েনি। একটা নিরেট নিশ্চিদ্র অন্ধকারে একটা—দুটো বিচ্ছিন্ন তারা ফুটে উঠছে মাত্র। পূর্বাপর সম্পর্ক নেই। ওই বাসন্তী রঙের ওড়না আর ক্যালিফোর্নিয়ান পপির গন্ধ। কিন্তু দুটোকে মেলাতে পারি পারি না যে? কোথা থেকে এক একটা স্মৃতি। পাখি, প্রজাপতি বা মৌমাছির মতো উড়ে আসে, তারপর আবার উড়ে কোথায় হারিয়ে যায়। সারাদিন আমার মাথায় এইসব দৃশ্য, গন্ধ, শব্দের পারম্পর্যহীন যাতায়াত। আপনি কী বলছিলেন যেন!

ভাবছি, বলে লাভ আছে কিনা।

কিন্তু শুনতে আমার ভালোই লাগছে। আপনার কথাগুলো যেন আমার বন্ধ দরজায় মৃদু টোকার শব্দ। দরজাটা আমি খুলে দিতে চাই, কিন্তু ইচ্ছে করলেও যেন পারি না। তবু শব্দটাও তো একটা সংকেত। কে জানে দরজাটা ওই সংকেতে আপনা থেকেই খুলে যাবে কিনা। প্লিজ, থামবেন না, বলুন।

শুনতে আপনার ভালো লাগছে কি? বোর হচ্ছেন না তো!

না, বরং আমার ভিতরে যেন শুকনো মাটিতে বৃষ্টির ফোঁটার মতো কিছু পড়ছে। বলুন, প্লিজ!

বলছি। সেই পঁচিশ মাইলের ভয়, লজ্জা, শিহরণ সব এখনও পুরোনো বইয়ের মতো সাজিয়ে রেখেছি মনের মধ্যে। কিন্তু পথ তো একসমেয় শেষ হয়। আপনি আমাকে ঠিক জায়গায় নামিয়ে দিয়ে বললেন, তোমার ফাংশন হয়ে গেলে আমি এসে তোমাকে নিয়ে যাব। চিন্তা কোরো না। সেদিন আমি কোকিলকে হার মানিয়ে গান গেয়েছিলাম। ফেরার সময় আমার হাতে একগাদা প্রাইজ দেখে আপনি অবাক হয়ে বলেছিলেন, ও বাবা, তুমি তো সাঙ্ঘাতিক মেয়ে! সব প্রাইজ লুট করে এনেছ দেখছি! বাইকে সেইসব প্রাইজ নিয়ে আসা কত শক্তি ছিল বলুন। আপনিই গিয়ে একটা বিগ শপার ব্যাগ কিনে আনলেন, তারপর সেটা যত্ন করে ক্যারিয়ারে বাঁধা হয়েছিল।

কত মনে আছে আপনার! আপনি ভাগ্যবতী। আমার যে কেন কিছুই মনে পড়ে না! কী জানি কেন, এখন হঠাৎ আমার একটা ভাঙা কাচের বোল—এর কথা মনে পড়ছে। সবুজ রং ছিল বোলটার, ভারী সুন্দর দেখতে।

আপনি একটা বিচ্ছু।

কেন ওকথা বলছেন?

আপনার সব মনে আছে, কিছুই ভোলেননি। আমার চেয়েও বেশি মনে আছে আপনার। কারণ প্রাইজে আমি এক সেট বোলও পেয়েছিলাম। মোটরবাইকের ঝাঁকুনিতেই বোধহয় একটা বোল ভেঙে গিয়েছিল। বোলগুলো ছিল সবুজ রঙের। আমিই ভুলে গিয়েছিলাম, আপনার কী করে মনে আছে?

না, না, কিছু মনে নেই। কিছুই মনে নেই। কীসের একটা আড়াল বলুন তো! কে আমার অতীতকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রয়েছে?

কেউ নয়। ওটা আপনার অটো সাজেশন।

আপনিই না একটু আগে বলেছিলেন, আমি কিছু একটা ভুলতে চাইছি বলেই ভুলে যাচ্ছি। কিন্তু কী ভুলতে চাইছি সেটাই তো আর মনে নেই আমার।

মনে পড়লে হয়তো আপনার ভালো লাগবে না।

তা হোক, তবু তো এই আধখানা হয়ে বেঁচে থাকার হাত থেকে রেহাই পাব। আপনি জানেন?

না তো?

কিন্তু আপনার মুখ দেখে আমার কেন মনে হচ্ছে যে, আপনি জানেন!

অনুমানটা ভুল।

তাই হবে হয়তো।

আজ আমি আসি!

যাবেন! তাই তো, আপনার তো চলে যাওয়ারই কথা! আবার আসবেন?

বলতে পারি না।

দাঁড়ান, দাঁড়ান। না, নড়বেন না, ওই রোদ আর ছায়ার ঠিক মাঝখানে যেমনটি দাঁড়িয়ে আছেন, তেমনই থাকুন তো! আপনার ডান দিকে রোদ, বাঁ দিকে ছায়া...

দাঁড়ালাম তো!

সুভাষিণী...সুভাষিণী... আশ্চর্য! কেন এ নামটা মনে পড়ল!

মনে পড়ল তাহলে!

পড়ল। কিন্তু আপনি কে বলুন তো?

আমাকে ভুলতে গিয়ে কত কী ভুলতে হল আপনাকে!

একটু দাঁড়ান, আশ্চর্য, আমার আদিগন্ত সব মনে পড়ে যাচ্ছে যে? উঃ, ভীষণ মনে পড়ে যাচ্ছে সব!... রেপ চার্জ, পাবলিকের মার, মামলা, কয়েদখানা, নাবালিকা ধর্ষণের জন্য... ওঃ!

সব ঠিক। কিন্তু আপনি বোকা, ভীষণ বোকা। যদি সব উপেক্ষা করে জোর করে এসে আমার হাত ধরতেন, তাহলে আমিও ভয় ঝেড়ে ফেলে সবাইকে মুখের ওপর বলতে পারতাম, উনি আমাকে রেপ করেননি, আমিই ওঁকে বাধ্য করেছিলাম।

কিন্তু কেন করেছিলে? কেন বাধ্য করেছিলেন আমায়?

তখন আমার পনেরো বছর বয়স। গুটিপোকার খোলস ছেড়ে একটি প্রজাপতি বেরিয়ে এসেছে। কেউ ফিরেও দেখত না যাকে তার দিকে সকলেরই অবাক চোখের চাউনি। অহংকারে মক মক করে বুকের ভিতরটা। তখন আমার ট্রফি চাই, মুগ্ধতা চাই, স্তাবকতা চাই, পুরুষদের হাঁটু গেড়ে বসা দেখতে চাই। কিন্তু একচোখো অন্ধ আবেগ একটা পুরুষকেই শুধু খুঁজে বেড়ায় তখনও। ওই একটা পুরুষের শিলমোহর না হলে তার জীবন—যৌবন বৃথা। বুঝেছেন? ওই পঁচিশ মাইলের উজান—ভাঁটায় মাথাটা চিবিয়ে খেয়ে রেখেছিলেন আপনি। কিন্তু সবাই যখন আমাকে লক্ষ করে, আপনি ফিরেও তাকান না। নাবালিকা বলেই হয়তো, সুন্দরী প্রেমিকার এক ফোঁটা একটা রোগা প্যাংলা বোন বলেই হয়তো। কী দিয়ে আপনাকে আমার দিকে ফেরাই? আমার পাগলিনী মন তখন ওই একটা পথই খুঁজে পেয়েছিল। এক নিরালা দুপুরে সেজেগুজে আপনার নির্জন একটেরে ঘরটায় হানা দিয়েছিলাম। মাথার ঠিক ছিল না, বশে ছিলাম না। নিজের শ্বাসেই আগুনের হলকা টের পেয়েছিলাম। আপনি অবাক হয়েছিলেন, ঠেকাতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মানুষ কি পারে নিজের শরীর—মনকে রাশ টেনে রাখতে। ভেসে গিয়েছিলেন, ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম আমি। দুই মাতাল আর পাগলের খেয়ালই ছিল না কিছু। বীরু নামে সেই মিস্তিরি ছেলেটা আপনাদের বাইরের দেওয়ালে রং করেছিল, যে লোক ডেকে এনেছিল... উঃ, তারপর পৃথিবীটা উলটেপালটে গেল একেবারে। কোন অন্ধকারে ঠেলে দিলাম আপনাকে, আর এক অন্ধকারে ডুবে গেলাম আমিও। সত্যি কথাটা যতবার বলতে গেছি, আমার মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। অঝোরে চোখের জল ঝেরে গিয়েছিল শুধু। কত কষ্ট পেতে হল আপনাকে!

কী চাও সুভাষিণী? আজ আমার কাছে আর কী চাও?

আপনি কি ভেবেছিলেন সেই দিনের সেই কিশোরী সুভাষিণী ওই দিনের ওই গন্ডগোলে ভয় পেয়ে বোবা হয়ে থাকবে চিরকাল? দুই বাড়ির মধ্যে সম্পর্ক তেতো হয়ে গেল, যাতায়াত বন্ধ, আপনাকে নিয়ে কী বিচ্ছিরি টানাহ্যাঁচড়া—মামলা মোকদ্দমা! ভয় হয়েছিল ঠিকই, তবু মনস্থির ছিল। কত কষ্ট করে, কত কাঠখড় পুড়িয়ে এখানে এসে ঘাঁটি গেড়েছি জানেন?

সুভাষিণী, আমাকে বরং আমার সব ভুলিয়ে দাও। বিস্মৃতিই তো ভালো ছিল এক চেয়ে। এত যন্ত্রণা ছিল না! আধখানা হয়েই থেকে যাই না কেন সুভাষিণী!

বাকি আধখানা খুঁজে দিতেই তো এত কষ্ট করে এত দূর আসা।

বাকি আধখানা! ও!

এখন আসুন তো, আমার হাতখানা ধরুন। চলুন, ওই শালবনের ছায়ায় দুজনে একটু হাঁটি।

চলো সুভাষিণী।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%