শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
আচ্ছা, আপনার কি মনে হয় ভগবান আসলে দু—জন আছেন?
কেন বলুন তো!
আমার ইদানীং কেমন যেন সন্দেহ হচ্ছে ভগবান আসলে দু—জন আছেন। একজন বড়লোকের ভগবান, আর একজন গরিবের ভগবান। আরও কি মনে হয় জানেন, গরিবের ভগবানও বেশ গরিব।
এরকম মনে হওয়ার তো একটা কারণ থাকবে, নাকি?
না, সে রকম লজিক্যাল কারণ কিছু নেই। মনে হল, তাই বললাম। এই গতকালকের কথাই ধরুন। মাসের শেষ বলে পুঁইচচ্চড়ি আর ডাল হয়েছে। তা খেতে বসে মনে হল, একটু লেবু আর লংকা হলে বেশ হত। তাই ভগবানকে খুব কষে ডাকতে লাগলাম। কারণ, ঘরে লেবু বা লংকা কোনোটাই ছিল না। তা ডাকতে ডাকতে যখন আর্ধেক ভাত সাবাড় করে ফেলেছি ঠিক সেই সময়ে আমাদের পাশের ঘোষবাড়ির বউটি কয়েকটা কাঁচা লংকা এনে বলল, তাদের গাছে সূর্যমুখী লংকা হয়েছে, তার শাশুড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। ওই লংকার জোরে বাকি ভাতটা খেয়ে উঠলাম। লক্ষ করবেন ভগবান অর্ধেকটা দিলেন, কিন্তু বাকি অর্ধেক দিলেন না।
আপনার কি ধারণা বড়লোকের ভগবান বেশি সার্ভিস দেন?
সেরকমই মনে হয়। নব চাটুজ্যের কথাই ধরুন না। বিশাল কারবার। নিউ আলিপুরে প্যালেসের মতো বাড়ি, গ্যারেজে খানচারেক গাড়ি। টাকায় লুটোপুটি খাচ্ছেন। তা এই তো সেদিন কোন কনজিউমার প্রোডাক্টের স্লোগান প্রতিযোগিতায় হেলাফেলায় একটা স্লোগান লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মাস দেড়েক বাদে সেই কোম্পানির লোক একখানা ঝকঝকে মার্সিডিজ বেঞ্চ গাড়ি নিয়ে এসে হাজির। উনি স্লোগান কমপিটিশনে ফার্স্ট হয়ে প্রাইজ পেয়েছেন। শুনলাম সেটার দাম নাকি সতেরো লাখ টাকা। ভগবান যদি একজন হতেন তাহলে এরকমটা হতে পারত কি?
খুবই শক্ত প্রশ্ন। ভগবান সম্পর্কে আমি প্রায় কিছুই জানি না।
আরে সে তো আমিও জানি না। আপনার কি ধারণা আমি ভগবান বিষয়ে বিশেষজ্ঞ? শাস্ত্রটাস্ত্র, বেদ—বেদান্ত, পুরাণ—উপনিষদ, গীতাটিতা আমি কিচ্ছু পড়িনি। তবে ভগবান মানি খুব।
আপনি দু—জন ভগবানের কথা বললেন। কিন্তু হিন্দুদের তো শুনি তেত্রিশ কোটি দেব—দেবী।
আহা, ওসব হচ্ছে একজনেরই নানারকম প্রতীক, বুঝলেন না? কখনো ঘেঁটু, কখনো শীতলা, কখনো শিব, কখনো বিষ্ণু। খুব কমপ্লিকেটেড ব্যাপার। তাই আমি ধর্মের মধ্যে বিশেষ মাথা গলাই না। তবে মন্দিরটন্দির দেখলে একটা নমো ঠুকে যাই।
আপনার আস্তিকতা বেশ সহজ সরল, তাই না?
যা বলেছেন। জটিলতা ব্যাপারটা আমার সহ্য হয় না। আমি শুধু জানি, ওপরে একজন কেউ আছেন। আজকাল মাঝে মাঝে মনে হয়, একজনের জায়গায় দু—জনও হতে পারেন।
ওপর বলতে আপনি ঠিক কোন জায়গাটা মিন করছেন?
কেন, ওপর বলতে ওপরটাই মিন করছি।
যদি আকাশ মিন করে থাকেন তাহলে আপনার জানা উচিত যে আকাশ হল মহাশূন্য। আর মহাশূন্যে ওপর—নীচ, পূর্ব—পশ্চিম কিছু নেই। মহাশূন্য সম্পূর্ণ দিদ্বিদিকশূন্য।
আহা, আবার আপনি জট পাকিয়ে তুললেন। আমি তো অত ভেবেটেবে বলিনি। লোকে যা বলে তাই বললাম। সামওয়ান ইজ আপ দেয়ার।
তাহলে অবশ্য কথা নেই। বেশি জানতে গেলে অনেক সময়ে বিশ্বাসটাই ভেঙে যায়।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক তাই। আমাদের মহাশূন্য নিয়ে মাথা ঘামানোর কী দরকার মশাই, আমরা তো আর মহাশূন্যে মর্নিংওয়াক করতে যাচ্ছি না। আমরা যেমন ওপর আর নীচ দেখছি সেরকমটাই তো ভালো।
যার কাছে যেমন। না জানারও নিশ্চয়ই কিছু উপকারিতা আছে।
ঠিক বলেছেন। বেশি জানতে গেলে নানারকম ভজঘট্ট বাঁধে। এই ধরুন, বউকে নিয়ে দিব্যি সুখে—দুঃখে সংসার করছেন, হঠাৎ যদি জানতে পারেন, বিয়ের আগে বউয়ের একটা কেলেঙ্কারি বা অ্যাফেয়ার ছিল তাহলে কি সংসারটা তেতো হয়ে যাবে না?
খুবই ঠিক। আপনি কি সংসারী মানুষ?
বিয়ের কথা বলছেন? না ও ব্যাপারটা আর হয়ে উঠল না। তার জন্য দায়ী হল অর্থনৈতিক অবস্থা। আমি একজন ব্যবসায়ীর কর্মচারী। বুঝতেই পারছেন, এসব কোম্পানি কর্মচারীদের কীভাবে ট্রিট করে। উদয়াস্ত খেটে চার হাজার টাকা হাতে পাই। ঘাড়ে বুড়ো বাবা—মা, একটা বোন, পড়ুয়া ভাই। বাড়িওলা জল বন্ধ করে দিয়েছে, গুন্ডা লাগাবে বলে শাসাচ্ছে। একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থায় বত্রিশ বছর বয়সেই যেন বার্ধক্য এসে গেছে। বিয়ের শখও নেই। মেয়েদের দেখলে আজকাল ভারি জড়সড় হয়ে পড়ি, হীনম্মন্যতায় ভুগি।
অর্থনৈতিক অবস্থা কবেই বা ভালো বলুন। দেশজোড়া দারিদ্র্য। তাতেও তো বিয়ে হচ্ছে, সন্তান জন্মাচ্ছে।
ওসব দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ। আমি বিয়ে পাগল নই। এই বেশ আছি। দারিদ্র্য থাকলেও তাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। শখ—আহ্লাদ বলতে কিছু নেই। ভাতের পাতে একটা দুটো ব্যঞ্জন হলেই হল। মা—বাবা, ভাই—বোনেরা সবাই আমার প্রতি সিমপ্যাথেটিক। কিন্তু বউ এলেই যে আমার নানা অযোগ্যতা, অকর্মণ্যতা, ডিসকোয়ালিফিকেশনগুলো দেখতে পাবে এবং আমাকে গঞ্জনা দেবে।
বিয়ের ওসব সাইড এফেক্ট তো আছেই। ওসব জেনেশুনেই লোকে বিয়ে করছে তো!
যে করছে সে করুক। আমি ওর মধ্যে নেই।
আচ্ছা, এই যে আপনি বললেন, বউ এলে যে আপনার অযোগ্যতা, অকমর্ণ্যতা, ডিসকোয়ালিফিকেশনগুলো দেখতে পাবে, তার মানে কি? আপনার ডিসকোয়ালিফিকেশনগুলো কি বউ ছাড়া আর কেউ দেখতে পাচ্ছে না?
পাচ্ছে বইকি, কিন্তু তার জন্য তারা আমার ওপর চড়াও হচ্ছে না, হামলা করছে না। বউ পরের বাড়ির মেয়ে, তার স্বার্থ আমার ওপর নির্ভরশীল, সে ছাড়বে কেন? আমার এক বন্ধু তো বউয়ের গঞ্জনা শুনতে শুনতে ভ্যাবলা মতো হয়ে গিয়ে শেষে ঢাকুরিয়া স্টেশনের কাছে রেললাইনে গলা দিয়ে... ওঃ, সে কথা মনে করলেই ভয় হয় মশাই। আমার কি মনে হয় জানেন, দুর্বলচিত্ত মানুষদের বিয়ে না করাই উচিত। শরীরের প্রয়োজনে বরং প্রস কোয়ার্টারে যাক, বিয়ে করার রিস্ক না নেওয়াই ভালো।
দুর্বলচিত্ত মানুষের সংখ্যাই তো বেশি। সারা পৃথিবীর অ্যাসেসমেন্ট করলে দেখবেন, দুনিয়ার নাইনটি পারসেন্ট মানুষ দুর্বলচিত্ত।
তা হতে পারে। অন্যের খবরে আমার দরকার কি বলুন। আমি যে দুর্বলচিত্ত সেটাই আমার কাছে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।
ওঃ হ্যাঁ, আপনি তো আবার বেশি জানতে চান না।
দূর মশাই, জেনে হবেটা কি? জানলে যদি জ্বালা বাড়ে তাহলে লাভটা কি? ওই ভয়ে তো আমি খবরের কাগজও পড়ি না। কাগজ রাখার পয়সা নেই বটে, কিন্তু আমাদের ম্যানেজারের টেবিলে খবরের কাগজ থাকে। আমি কখনো তাকাইও না।
তার মানে কি পৃথিবী সম্পর্কে আপনার কোনো আগ্রহই নেই? রাজনীতি, খেলাধুলো, সিনেমা, যুদ্ধবিগ্রহ, আর্ট কালচার?
ছিল, ছিল। বছর দশ পনেরো আগেও ওসবে ইন্টারেস্ট ছিল। তারপর দেখলাম, দুনিয়াটা তার নিজের মতো চলেছে, আমি মাধ্যাকর্ষণের ফলে তার গায়ে ছারপোকার মতো সেঁটে আছি মাত্র। টিকে থাকা ছাড়া আমার কোনো ধর্ম নেই, কর্মও নেই। দুনিয়াকে জানার চেষ্টা করা বৃথা। সায়েন্টিস্টরা চেষ্টা করছে, দার্শনিকরা করছে, জ্ঞানী পণ্ডিতরা করছে। কিন্তু লাভ হচ্ছে অষ্টরম্ভা। দুনিয়াকে জানা ও বোঝা অত সহজ নয়। তাই আমি আর ওসব চেষ্টাই করি না। সকাল নটায় বেরোই, হিসেব বুঝিয়ে বাড়ি ফিরতে রাত দশটা। হপ্তায় এই একদিন ছুটি।
ছুটির দিনে কী করেন?
সকালে বাজার, তারপর জামাকাপড় কাচা, দুপুরে একটু ঘুম। বিকেলে এই একটা দিন এসে এই পার্কটায় একটু বসে থাকি।
আর কোনো এন্টারটেনমেন্ট নেই আপনার? সিনেমা থিয়েটার?
দুর দুর, ওসব বানানো কৃত্রিম জিনিস দেখে মনকে বিভ্রান্ত করার মানেই হয় না। গত দশ বছর আমি সিনেমা দেখিনি, বিশ্বাস করবেন?
করলাম। তা পার্কে বসে থাকাটাই এন্টারটেনমেন্ট আপনার?
বসে থাকি, আর ভাবি।
কী ভাবেন?
আমার ভাবনার কোনো মাথামুন্ডু নেই। ব্রেন পাওয়ার কম তো, তাই চিন্তার জগতে কোনো শৃঙ্খলাও থাকে না। বসে বসে যা মাথায় আসে তাই ভাবি।
কোনো মহিলার কথা?
ওঃ, আপনি ওই একটা দিকেই আমাকে গোত করতে চান তো? তা মশাই, সত্যি কথা বলতে কি, এক—আধজন মহিলার কথাও যে মনে আসে না তা নয়।
কোনো বিশেষ মহিলার কথা কি?
তাও বলতে পারেন। আমি যতই অপদার্থ হই, আমারও যৌবন ডাকাডাকি করেছে এক সময়ে। তা ওই কাঁচা বয়সে কখনো সখনো এক আধজন মেয়েকে ভারী পছন্দও হয়েছিল।
তাহলে রোমান্স হয়েছিল?
রোমান্স কথাটা ভারী বাবু কথা। অত ভালো ব্যাপার কি আমাদের মতো অপদার্থের কপালে হয়? তখন কসবায় একটা খোলার ঘরে থাকতাম। এ চাকরিটা তখনও পাইনি। বাবা ছিল প্রাইভেট বাসের কন্ডাকটর। অবস্থা অনুমান করে নিন। তা সেই সময়ে আমি কলেজে পড়ি। যাতায়াতের পথে একটা গোলাপি রঙের বাড়ির একতলার জানালায় একটা ফুটফুটে মেয়েকে প্রায়ই দেখতে পেতাম। কোঁকড়া চুল ছিল মাথায়, বেশ ফরসা, মুখখানা যেন নরুণে চেঁছে যত্নে বানানো। মেয়েটা ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকত।
তার বয়স কত ছিল?
তেরো চোদ্দো হবে।
তারপর?
যাতায়াতের পথে রোজই চোখে চোখ পড়ত। একটু লাজুক ছিলাম বলে ওই একবার তাকিয়েই চোখ নামিয়ে নিতাম। তবে এইভাবে চলল, আর আমার ভিতরে নানারকম কেমিক্যাল চেঞ্জ ঘটতে লাগল। প্রেমে পড়লে তা হয় আর কি।
আপনি কি বিজ্ঞানের ছাত্র?
কেন বলুন তো! কী করে বুঝলেন?
কেমিক্যাল চেঞ্জের কথা বললেন কি না।
সায়েন্স পড়েছি বটে, কিন্তু তাতে কোনও সম্ভাবনা তৈরি হয়নি আমার জীবনে। পাসকোর্সে বি এসসি পাশ করেছিলাম। পয়সার অভাবে ফিজিক্সে অনার্স কন্টিনিউ করতে পারিনি।
অনার্স ছিল, তার মানে সম্ভাবনা তো ছিলই!
পয়সার অভাব আমাদের দেশে সবরকম মেধাকেই গলা টিপে মেরে দেয়, বুঝলেন?
হ্যাঁ। কথাটা খুবই সত্য। কিন্তু সেই মেয়েটার কথা শেষ করুন।
শেষ না করলেও হয়। তবে হ্যাঁ, তার প্রতি আমার প্রবল দুর্বলতা জন্ম নিয়েছিল। আর আমার যাওয়া আসার সময় সর্বদাই সে জানালায় থাকত, এটাও একটা পয়েন্ট, অর্থাৎ তারও আমার প্রতি আগ্রহ ছিল, তাই না?
তাই তো মনে হচ্ছে! পরিচয় হল কী করে?
পরিচয়ে বাধা ছিল। একে আমি লাজুক, গরিবের ছেলে, টিউশনি করে কলেজে পড়ি। আর ওই মেয়েটি বড়লোক না হলেও আমাদের চেয়ে অন্তত তিন চার ধাপ ওপরের সমাজের লোক। বামন হয়ে চাঁদে হাত বাড়ানোর মতো ব্যাপার। তবে মেয়েটি যে আমার জন্যই অপেক্ষা করত তাতে সন্দেহ ছিল না আমার। বেশ কিছুদিন চোখাচোখি খেলার পর সে আমাকে দেখে একটু হাসতও।
বটে!
হ্যাঁ মশাই। আমিও মনে মনে বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম। জীবনে ওটাই আমার প্রথম ও একমাত্র প্রেম কি না।
বুঝেছি। বলুন।
বোধহয় মাস দুয়েক এরকম চলার পর একদিন হঠাৎ দেখলাম, জানালায় মেয়েটির পাশে একজন ফরসা বয়স্কা মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। যতদূর মনে হল মেয়েটির মা।
এই রে!
হ্যাঁ, আমি খুব চমকে গিয়েছিলাম, ভয়ও পেয়েছিলাম। মিতুর মাকে দেখে আমি সেদিন প্রায় ছুটে পালাই।
মেয়েটির নাম বুঝি মিতু?
হ্যাঁ।
তারপর?
দিন দুই বাদে একদিন কলেজ থেকে ফেরার সময় দেখি সেই ভদ্রমহিলা তাঁদের গ্রিলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে ডাকলেন, এই ছেলে, শোনো!
ও বাবা!
হ্যাঁ, আমি তো ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। উনি বললেন, ভয় পেও না, ভিতরে এসো। কথা আছে। আমি ভাবলাম, ভিতরে নিয়ে গিয়ে বোধহয় লোক ডেকে ধোলাই দেবেন। তবু ভদ্রতার খাতিরে না গিয়েও পারলাম না। ভদ্রমহিলা আমাকে যত্ন করে বসালেন, পাখা ছেড়ে দিলেন। তারপর আমার বাড়ির খোঁজখবর নিতে লাগলেন।
বাঃ, এ তো গ্রিন সিগন্যাল।
হ্যাঁ। গ্রিন সিগন্যালই। আমি অকপটে তাঁকে সব বলে দিলাম। উনিও দেখলাম, আমাদের সব খবরই রাখেন। বেশ কিছুক্ষণ নানা কথা বলার হঠাৎ বলে বসলেন, তুমি কি আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাও? আমি তো প্রস্তাব শুনে হাঁ। কী বলব ভেবেই পাচ্ছিলাম না। বুকের মধ্যে উথালপাথাল। উনি তখন খুব করুণ মুখ করে বললেন, বিয়ে করতে চাইলে আমাদের আপত্তি নেই। তোমার অবস্থা জেনেও বিয়ে দেব। তবে আমার মেয়ে কিন্তু পঙ্গু।
পঙ্গু? এঃ হেঃ, কীরকম পঙ্গু?
কোমরের তলা থেকে পা অবধি সমস্ত নীচের অংশটাই ছিল আনডেভেলপড। হাঁটাচলার ক্ষমতাই ছিল না মেয়েটার। তাই ওকে জানালার পাশে একটা চেয়ারে বসিয়ে রাখা হত। বসে বসে মিতু বাইরের জগৎ দেখত—যে জগতে যাওয়ার ক্ষমতাই ছিল না তার। কিন্তু কোমর থেকে মুখ পর্যন্ত সম্পূর্ণ স্বাভাবিক—যে কোনো মেয়েকে টেক্কা দেওয়ার মতো।
আপনি কি করলেন? পিছিয়ে গেলেন?
না। সে বয়সটা তো বিবেচনা বা স্থিরবুদ্ধির বয়স নয়। ভাবলাম, পঙ্গু তো কী হয়েছে, ওকে নিয়েই জীবন কাটিয়ে দেব। বাড়িতে এসে বললামও সে কথা। মায়ের তো মাথায় হাত। বাবা বাক্যহারা।
আর মিতু? তার মতামত নেননি?
সেখানেই তো গোল বাঁধল।
কিসের গোল?
কথা কইবার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝলাম, অমন সুন্দর মেয়েটাকে ভগবান অনেক দিক দিয়ে মেরে রেখেছেন। মিতুর বুদ্ধিটাও তেমন ডেভেলপ করেনি।
জড়বুদ্ধি নাকি?
অনেকটাই। স্পষ্ট কথা বলতে পারত না। ভ্যাবলা।
তবে তো ব্যাপারটা কেঁচে গেল!
হ্যাঁ। ওই যে আপনাকে দু—নম্বর ভগবানের কথা বলছিলাম, কেন বলছিলাম বুঝতে পারছেন তো! গরিবের ভগবান হয় নিজেই গরিব, নইলে হাড়কেপ্পন। লংকা আর লেবু চাইলে লংকাটা হয়তো দেন, লেবুটা টেনে রাখেন।
ভগবানের ওপর যখন আপনার এতই রাগ তখন তাকে ঝেড়ে ফেললেই তো হয়।
ভগবান আমাদের মতো কিছু লোকের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছেন। ঝেড়ে ফেললেই তিনি যাবেন কেন? আচ্ছা, আপনি কি নাস্তিক নাকি?
আস্তিক নাস্তিক কিছুই নই। ও নিয়ে কিছু ভাবিনি কখনো। দরকারও হয়নি।
তার মানে আপনার জীবনটা বেশ স্মুথ। কোনো সমস্যাই নেই। তাই না? হয়তো ভালো চাকরি করেন, মেলা টাকার মালিক, কলকাতার নিজ বাটি, ঘাড়ে গন্ধমাদন কোনো দায়িত্ব নেই। ঠিক কি না!
তাই যদি হত তাহলে সন্ধেবেলা এসে একা একা এই নেড়া পার্কে বসে থাকতাম নাকি? এটাকে পার্ক বললে পার্ক কথাটারই অপমান হয়। দেখছেন গোটা মাঠটায় কেমন টাক—পড়া ভাব। গাছপালার নামগন্ধ নেই!
হ্যাঁ, পার্কটার কোনো সৌন্দর্য নেই বটে। তা ছাড়া উত্তর দিকের ওই ভ্যাটটা থেকে খুব দুর্গন্ধও আসছে।
গত দশ দিন ময়লা নেয়নি। কালও দেখেছি, মরা বেড়াল পড়ে আছে পাশে। গন্ধ তো হবেই। আর পার্কটার ওই কোণে আজ সকালেই দুটো ডেডবডি পাওয়া গেছে। একটা মেয়ে আর একটা ছেলের। দুজনেরই গলার নালি কাটা।
বলেন কি? কিছু টের পাইনি তো!
এই পার্কটা আজকাল অ্যান্টিসোশ্যালদের আড্ডা, তা জানেন তো! প্রকাশ্যেই মদ, গাঁজা, সেক্স, জুয়া সবই চলে। আজকাল ওদের ভয়ে কোনো ভদ্রলোক আর এ পার্কে আসে না। আজ দেখুন, পার্ক পুরো ফাঁকা। কেন জানেন? ডেডবডি পাওয়ার পর পুলিশ অ্যাকশন হয়েছে সারাদিন। এখনও পেট্রল চলছে। বদমাশরা ভেগেছে বলেই পার্কটা এত ফাঁকা।
তা বটে, পার্কে তো আসি সপ্তাহে একদিন। দেখি, কিছু ছেলে—ছোকরা অন্ধকারে কেমন সন্দেহজনক আচরণ করছে। তবে তাতে আমার আর কী বলুন। আমি একটু কোনার দিক বেছে নিয়ে ঘাসে বসে থাকি চুপ করে। আমাকে কেউ গ্রাহ্য করে না। যারা খুন হল তারা কারা বলুন তো?
কে জানে! ড্রাগ পেডলার হতে পারে। চোরা চালানদার হলেই বা কি। মোট কথা, খুব ক্লিন লোক নয়। কম হলেও আপনার তবু একটা চার হাজার টাকা বেতনের চাকরি আছে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থায় আপনার পজিশন কিন্তু বেশ ভালো। এই যারা খারাপ কাজটাজ করে বেড়ায় তাদের চার হাজার টাকার চাকরি জুটলে অনেকেই হয়তো খারাপ কাজ করত না। কী বলেন?
কে জানে মশাই, দেশ, সমাজ, বেকার সমস্যা এসব নিয়ে আমি মাথাই ঘামাই না। ঘামিয়ে কিছু হয়ও না। আমি শুধু একবগগা আমার আয় আর ব্যয়ের ব্যাপারটা প্রাণপণে মেলানোর চেষ্টা করি। আমাদের আয়ের সঙ্গে আমাদের ব্যয়ের মেলানোর চেষ্টা করি। আমাদের আয়ের সঙ্গে আমাদের ব্যয়ের কোনোদিন বন্ধুত্ব হয় না, জানেন? সবসময়ে ওই ব্যয় ব্যাটা এগিয়ে থাকে। দুটোয় কোনোদিন বনিবনা হল না।
আচ্ছা, সেটা তো দেশের লাখো লোকের সমস্যা। কিন্তু অবস্থাটা পালটে দিতে ইচ্ছে হয় না?
পালটে দেব? আমার কোন দায় বলুন তো! দেশে কোটি কোটি লোক থাকতে আমারই বা হঠাৎ দেশের অবস্থা পালটানোর ইচ্ছে হবে কেন? আপনার হয় নাকি?
হয়। খুব হয়। তবে পন্থাটা ভেবে পাই না।
ঝুটমুট ভেবে শরীরপাত করার দরকারটা কি? ওসব আমার আপনার কম্মো নয়। আমি তো ধরেই নিয়েছি যা করার ভগবানই করবেন।
আপনি কিন্তু হতাশাবাদী।
না মশাই, না। হতাশাবাদী হল আশাটাশা ছেড়ে দিয়েছে যে, আমার তো ওসব আশাটাশা ছিল না কিছু, আমি তো আপনাকে বলেইছি, আমি হলাম বাস কন্ডাক্টরের ছেলে। বাপ খেয়ে না খেয়ে ছেলেকে মানুষ করার জন্য বিএসসি অবধি পড়িয়েছিল। মানুষ হওয়া অবশ্য হয়নি। কিন্তু তার জন্য আমার কোনো হা—হুতাশও নেই। যা আছি, যেটুকু পাচ্ছি তাই নিয়েই আমাকে থাকতে হবে। বিপ্লবটিব্লব করার কথা কখনো ভাবিনি। আর বিপ্লবও তো আর এক রকমের নয়। নানা পার্টি নানা বিপ্লবের কথা বলে। তাতেই বুঝে গেছি, কারও এখনও মনস্থির হয়নি।
হাল ছেড়ে দিচ্ছেন?
সেটাই বুদ্ধিমানের কাজ। যদিও নিজেকে আমি মোটেই বুদ্ধিমান ভাবি না।
আপনার গল্পটা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি।
কোন গল্পটা?
ওই যে মিতুর সঙ্গে আপনার প্রেমের গল্প।
প্রেমের গল্পের দু—রকম পরিণতি থাকে। হয় মিলনান্তক, নয় বিয়োগান্তক, তাই না?
হ্যাঁ, আপনারটা কীভাবে শেষ হল?
আমারটা ঠিক মিলন বা বিয়োগ কোনোটাই হল না। কেমন যেন নষ্ট দুধের মতো কেটে গেল, আমি নিজেকে তখন প্রশ্ন করেছিলাম, বাপু, প্রেমেই যদি পড়ে থাকো, তাহলে সেই প্রেমের এমন জোর নেই যে মেয়েটার শরীর আর মনের খামতিগুলো উপেক্ষা করতে পার? এ আবার কেমন প্রেম? কিন্তু কি জানেন, ভিতর থেকে কোনো সাড়াই এল না। আর সেই যে প্রেম কেঁচে গেল আর কখনো পেকে উঠল না।
মিতুর কোনো খবর রাখেন না?
না, খবর রেখে হবেটাই বা কি বলুন। ও পাড়া ছেলে চলে আসার পর আর সম্পর্কও নেই। তবে মাঝে মাঝে একটু—আধটু মনে পড়ে আর কি। আচ্ছা আপনি কি এ পাড়ার বাসিন্দা?
তা বলতে পারেন। কাছেপিঠেই আমার আস্তানা।
এই পার্কে প্রায়ই আসেন বুঝি?
না, তবে যাতায়াতের পথে পার্কটা নজরে পড়ে। আজ পার্কটা ফাঁকা দেখে একটু বসবার লোভ হল।
বেশ করেছেন। আপনার সঙ্গে বেশ আলাপও হয়ে গেল আমার। আজকাল কারও সঙ্গেই যেচে আলাপটালাপ করা হয় না। মনে হয় চেনা—জানা বাড়িয়ে হবেটা কি?
মানুষের সঙ্গে আলাপ—পরিচয় থাকাটা কি ভালো নয়?
আমার কি মনে হয় জানেন? মানষ জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কাটিয়ে দেয় নানারকম অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন কাজে। তার মধ্যে একটা হল এই লোকের সঙ্গে আলাপ—পরিচয়। দেখা হলে দেঁতো হাসি হেসে কুশল প্রশ্ন বা খেজুর করা, ওতে কি লাভ বলুন, কিছুটা সময় ফালতু কাটানো ছাড়া আর কি?
আপনি বুঝি কম কথার মানুষ?
তা নয়, কেউ কথাটথা কইলে আমর বরং বেশ অহংকার হয়। ভাবি, লোকটা পাত্তা দিচ্ছে। আমিও তাকে খুশি করারই চেষ্টা করে থাকি। এসব আমি করি বটে, কিন্তু কাজটা যে অর্থহীন সেটাও ভুলতে পারি না।
চেনাজানা থাকলে দায়ে দফায় মানুষের সাহায্যও তো পাওয়া যায়।
হ্যাঁ, সেরকম কিছু হয় বটে। কিন্তু চেনাজানাদের কাছ থেকে আমরা কখনো তেমন কোনো উপকার পাইনি। অবশ্য উলটোটাও সত্যি। আমরাও কারও তেমন কোনো উপকার করিনি। মানুষের উপকার করার জন্যও কিছু যোগ্যতার দরকার হয়। আমার সে যোগ্যতা নেই।
আপনি আপনার বাইরের জগৎটাকে নিয়ে ভাবেন না তো!
না। ওই যে বললাম, ভেবে সময় নষ্ট।
বই পড়েন?
পাগল! ওসব বাতিক আমার নেই।
চাকরিটা আপনার কেমন লাগে?
খারাপ কি? মালিকের বিল্ডিং মেটেরিয়ালের বিরাট ব্যবসা। সিমেন্ট, বালি, স্টোন চিপস, রড, চুন, ইট, সুরকি নিয়ে এলাহি ব্যাপার। রোজ পঞ্চাশ ষাট লরি বোজাই হয়ে সাপ্লাই যাচ্ছে চারদিকে। যাকে বলে কর্মযজ্ঞ।
আপনার কাজটা কী?
সবকিছু নলেজে রাখা।
শুধু নলেজে রাখা? আর কিছু নয়?
ওটাই তো হাড়ভাঙা খাটুনি। সারাদিন গোটা পাঁচেক গো—ডাউনে চক্কর মেরে বেড়াতে হয়। কোন অর্ডারে কত মাল যাচ্ছে তার হিসেব রাখতে হয়। একশোটা কৈফিয়ত দিতে হয়।
আপনি কি ম্যানেজার?
অনেকটা সেরকমই শোনায় বটে। ম্যানেজারের ইজ্জত অবশ্য নেই, তবে খাটনি আর ঝুঁকিটা আছে।
মালিকের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক তাহলে ভালোই?
না, ভালো বললে ভুল হবে। তবে হুকুম তামিল করি বলে মালিকরা আমাকে নিয়ে ঝামেলা পোয়ায় না। আর তাই, আমাকে তারা লক্ষও করে না।
তাদের নজরে পড়ার জন্য চেষ্টা করেন না?
মানুষের ওপর নজর দেওয়ার ফুরসত তাদের কই? তাদের নজর তো আগম নির্গমের ওপর। কত মাল বেরোচ্ছে, কত টাকা ঢুকছে।
এতে আপনার বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে হয় না?
বিদ্রোহ কিসের? মাসের শেষে যে চার হাজার টাকা দিচ্ছে! ওটাই তো জোঁকের মুখে নুন। আচ্ছা, আপনি কি পলিটিকস করেন?
না তো!
তবে কি ইউনিয়ন—টিউনিয়ন?
না না, ওসব নয়।
আমাদের কারবারে অবশ্য ইউনিয়ন নেই। কারও চাকরিই পাকা নয়, ইউনিয়ন করবে কোন সাহসে বলুন!
আপনার কি মনে হয় না একটা ইউনিয়ন থাকলে ভালো হত?
না, হয় না। ইউনিয়ন যেখানে আছে সেখানেই বা ভালোটা কী হচ্ছে বলুন। ইউনিয়ন বেশি পেশি প্রদর্শন করলে মালিক লক আউট করে দিচ্ছে, না হয় তো কারখানা বা ব্যবসা তুলে নিয়ে যাচ্ছে।
তাহলে কি আপনি আত্মবিক্রয় করে দিয়ে বসে আছেন?
যথার্থ বলেছেন। আমরা কে না আত্মবিক্রয় করতে বসে আছি বলুন। মানুষ তো নিজেকে সবসময় আরও বেশি সেলেবল কমোডিটি করে তোলার জন্যই নানাভাবে নিজেকে ঘষামাজা করছে। তাই নয় কি?
অনেকটা তাই বটে।
সবটাই তাই। আমরা কে কতটা কার কাছে বিক্রয়যোগ্য বা ক্রয়যোগ্য সেটাই আসল কথা। দুঃখের বিষয় হল শাহরুখ খান চার কোটিতে বিকোয়, আমি চার হাজারে।
সেই দুঃখেই কি মাঝে মাঝে আপনার ভিতর থেকে একজন ঘাতক বেরিয়ে আসতে চায়?
না মশাই, না। ঘাতকটাতক আমার মধ্যে নেই। আমার মতো লোকেরা বড় জোড় নিজেকে মারতে পারে। আত্মঘাতী একটা প্রবণতা আমার মধ্যে এক সময়ে ছিল। কিন্তু সেটাও আজকাল ঘুমিয়ে পড়েছে। আচ্ছা, আপনি তো আমার নামটাও জিজ্ঞেস করেননি। অবশ্য নাম জেনে হবেটাই বা কি। রাম বা হরি, রমেশ বা যতীন যা হোক একটা হলেই হল। আমাদের তো আর নামের মহিমা নেই, কী বলেন?
আপনার নামটা আমি জানি।
বলেন কি মশাই? নাম জানেন! কী করে জানলেন?
পুলিশের রেকর্ডে আপনার নাম আছে।
হাঃ হাঃ কী যে বলেন মশাই। পুলিশের রেকর্ডে আমার নাম! আমি কি জাতে উঠে গেলাম নাকি। হাঃ হাঃ! না মশাই, আপনি একটা মস্ত ভুল করে ফেলেছেন। অন্য কারও সঙ্গে গুলিয়ে ফেলছেন আমায়।
সেটাও সম্ভব।
আজ্ঞে সেটাই ঘটনা। কিন্তু পুলিশের রেকর্ডের কথা আপনি জানলেন কী করে? আপনি কি পুলিশের লোক?
পেট চালানোর জন্য কিছু তো করতেই হবে। পুলিশের চাকরিটাই জুটেছিল কপালে।
ও বাবা, আমি তা হলে এতক্ষণ একজন জবরদস্ত পুলিশ অফিসারের সঙ্গে বসে খেজুর করে যাচ্ছিলাম! কী সৌভাগ্য! বলতে কি আপনিই আমার জীবনের প্রথম পুলিশ—বন্ধু। অবশ্য বন্ধু বললে যদি আপনি অপমান বোধ না করে।
না, অপমান বোধ করব কেন?
আচ্ছা, পুলিশের রেকর্ডে আমার কী নাম আছে তা বলবেন?
মনোরঞ্জন রায়। সঞ্জীব সবরওয়াল—অর্থাৎ আপনার এমপ্লয়ার আপনাকে মনো বলে ডাকে।
ও বাবা! আপনি সবরওয়ালের নামও জানেন দেখছি! কী আশ্চর্য! আপনার ইনফর্মেশন তো একেবারে ঠিক! আমার নাম মনোরঞ্জন রায়, আমার মালিক সঞ্জীব সবরওয়াল আমাকে মনো বলে ডাকে। সবই তো মিলে যাচ্ছে! কিন্তু পুলিশের রেকর্ডে আমার নাম উঠল কেন বলুন তো! ক্রিমিন্যাল হিসেবে নাকি?
না। তবে একজন অত্যন্ত সন্দেহজনক এবং রহস্যময় মানুষ হিসেবে।
মশাই, আপনি আমার মাথা ফের গুলিয়ে দিলেন। আমার মতো একজন ডিসকোয়ালিফায়েড লোকের জীবনে সন্দেহজনক বা রহস্যময় কী থাকতে পারে বলুন তো!
সেটাই তো লাখ টাকার প্রশ্ন।
লাখ টাকার প্রশ্ন! কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। আমি নিজের সম্পর্কে আপনাকে যা বলেছি তা কি সবই মিথ্যে? আষাঢ়ে গল্প?
না। বরং আপনি নিজের সম্পর্কে অত্যন্ত সত্যি কথাই বলেছেন। আপনি নিজেকে যেমন বর্ণনা করেছেন আপনি ঠিক সেরকমই।
তবে?
আপনি একজন টোটালি ফ্রাস্ট্রেটেড, হতাশাবাদী উচ্চাশাহীন, আত্মবিশ্বাসহীন মানুষ। দুর্বলচিত্ত, দ্বিধাগ্রস্ত, ভিতু সবই ঠিক।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমি ওরকমই তো!
অন্তত এক বছর আগে অবধি আপনি ওরকমই ছিলেন। আপনার একটা গুণ আছে। আপনি খুব প্রভুভক্ত মানুষ। সবরওয়াল আপনার কাছে ঈশ্বরতুল্য। এটা অন্যদের চোখে গুণ না হয়ে দোষ বলেও গণ্য হতে পারে। কিন্তু আপনার স্থির বিশ্বাস, সবরওয়ালের ওপরেই আপনার অস্তিত্ব নির্ভরশীল। আপনার আরও বিশ্বাস যে, পৃথিবীতে একমাত্র সবরওয়াল ছাড়া আর কেউ আপনাকে চাকরি দেবে না। আর তার ফলে প্রভুভক্ত হয়ে ওঠাটা আপনার অবশ্যম্ভাবীই ছিল।
হ্যাঁ, কথাটা খুব ভুল নয়। সবরওয়াল আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
আর সেই জন্যই সবরওয়ালকে বাঁচিয়ে রাখাটাও আপনার প্রয়োজন। তাই না?
সে তো ঠিকই।
যিশু দাস নামে কাউকে আপনার মনে পড়ে কি?
যিশু দাস! ও বাবা, সে তো বিরাট গুন্ডা ছিল!
হ্যাঁ, তোলাবাজ মস্তান। এলাকার টেরর। সবরওয়াল তাকে নিয়মিত তোলাও দিত। ব্যবসায়ীদের ওসব হিসেবের মধ্যেই ধরা থাকে। কাজেই কোনো গোলমাল ছিল না। কিন্তু মুশকিল হয়েছিল যিশু দাসের হঠাৎ ইচ্ছে হয়েছিল বম্বের একজন বিশেষ নায়িকাকে নিয়ে একটা হিন্দি ফিল্ম প্রোডিউস করবে। ওটাই নাকি ছিল তার জীবনের স্বপ্ন। সেই জন্য তার প্রচুর টাকার দরকার হয়ে পড়ে। আর সেজন্যই সে সবরওয়ালের কাছে পঞ্চাশ লাখ টাকা দাবি করে বসে। না হলে খুনের হুমকি দিতে থাকে। তার ফলে সবরওয়াল ভয় খেয়ে কারবার গুটিয়ে ফেলার কথা ভাবতে শুরু করে। ঝানু ব্যবসায়ীরা জানে টাকাটা দিলে এরপর দাবি আরও বাড়তে থাকবে। ঘটনাটা আপনার মনে আছে কি?
খুব আছে মশাই, খুব আছে। আমরা ভয়ে শুকিয়ে গিয়েছিলাম।
হ্যাঁ, সবরওয়ালের বিপদ ঘটলে আপনারও অস্তিত্বে সংকট। তবে যাই হোক, একদিন যিশু দাস হঠাৎ বেপাত্তা হয়ে যায়। তার পরিবার এবং গ্যাং তন্ন তন্ন করে তাকে খুঁজেছে, হিল্লিদিল্লিতেও খোঁজ করা হয়েছে, কোথাও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। খুন হয়ে থাকলে লাশটা তো পাওয়া যাবে। তাও পাওয়া যায়নি।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবই জানি। অনেকে বলে যিশুর হঠাৎ মতির পরিবর্তন হয় এবং সে সাধু হয়ে কোথাও চলে গেছে।
আমাদের ধারণা আর একটু প্র্যাকটিক্যাল। তদন্তে জানা যায় যিশু দাসকে শেষবার দেখা গেছে সবরওয়ালের গোডাউনের কম্পাউন্ডে ঢুকতে। তারপর থেকেই সে বেপাত্তা। সন্ধের পর সে সবরওয়ালের গোডাউনে যায়। তারপর থেকেই তাকে আর দেখা যায়নি। তখন গোডাউনে প্রায় কোনো কর্মচারীই ছিল না। শুধু সবরওয়াল আর আপনি। গেটে অবশ্য দুজন দারোয়ান ছিল।
তা হবে হয়তো! আপনি কি বিশেষ কিছু ইঙ্গিত করছেন?
হ্যাঁ, আমার নিজস্ব ধারণা, যিশু দাস সবরওয়ালের গোডাউনেই খুন হয়ে যায়। সবরওয়াল কোনো ভাড়াটে গুণ্ডা আনায়নি বা তার কাছে কোনো অস্ত্রশস্ত্রও ছিল না। সবরওয়ালের কাছ থেকে যিশু বিদায় দেয় রাত আটটার কিছু পরে। যিশু সেদিন আলটিমেটাম দেওয়ায় সবরওয়াল খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। সে পুলিশকেও ফোন করেছিল তার প্রোটেকশনের জন্য। সে নিজের অফিসঘরেই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল। অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে এক নার্সিং হোমে নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনাটা আমার খুব মনে আছে। ওঃ কী টেনশনই গেছে। কিন্তু খুনের কথা কী যেন বলছিলেন?
বলছিলাম, আমার নিজস্ব রিকনস্ট্রাকশন অফ ইভেন্ট অনুযায়ী, যিশু দাস খুন হয় এবং তা হয় সবরওয়ালের গোডাউনের বিশাল চত্বরেরই কোথাও।
বলেন কী! এ তো সাঙ্ঘাতিক কথা!
না, খুব সাঙ্ঘাতিক কিছু নয়। একজন টোটালি ফ্রাস্ট্রেটেড লোক যখন নিজের অস্তিত্বের সমূহ সংকট দেখতে পায় তখন তার ভিতরে ঘুমন্ত ঘাতক জেগে উঠতেই পারে।
কী যে বলেন স্যার, কিছুই বুঝতে পারছি না।
একটা লোককে মেরে ফেলা খুব কঠিন কাজ নয়, যদি হাতে কোনো মারাত্মক অস্ত্র থাকে, যদি ভিকটিম অপ্রস্তুত থাকে এবং যদি খুব স্ট্রং মোটিভেশন থাকে, ঠিক কি না মনোবাবু?
আজ্ঞে, খুবই ঠিক স্যার। আপনি পুলিশ অফিসার, কত জানেন।
তনন্তকারী পুলিশেরা কিন্তু কোনো সূত্রই পায়নি। এমনকী এটা মার্ডার কেস না অ্যাবডাকশন না নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়া তারা আজও জানে না। কেসটার চার্জে আমি ছিলাম না। তবে শুনেছি। যিশু যেসব ঠেক থেকে তোলা আদায় করত তার সব কটা আমি একে একে গিয়ে দেখেছি। সবচেয়ে লাইকলি স্পট বলে আমার মনে হয়েছে সবরওয়ালের গোডাউনের বিরাট চত্বর। আমি কখনো আপনাকে জেরা করিনি বা মুখোমুখিও হইনি। শুধু আড়াল থেকে দুদিন আপনাকে একটু ওয়াচ করেছি। আপনাকে সবসময়ে শহব্যস্ত, টেনশনে ভোগা নিরীহ লোক বলেই আমার মনে হয়েছে।
হ্যাঁ স্যার, আমিও তো তাই বলতে চাইছি।
কিন্তু আপনার চোখে সেই গ্লিন্টটা আছে।
সেটা কী জিনিস স্যার!
গ্লিন্টকে বাংলায় ঠিক কী বলে তা জানি না। একটা ঝলকানির মতো। একটা ঝিলিক। ঠিক বোঝানো যাবে না। অ্যান্ড দেয়ার ওয়াজ দ্যাট গ্লিন্ট ইন ইওর আইজ। খুনি চিনতে আমার ভুল হয় না মনোবাবু।
হাসব না কাঁদব তা বুঝতে পারছি না স্যার।
প্রবলেম হল যিশুর ডেডবডিটা নিয়ে। খুন হয়ে থাকলে তার লাশ যাবে কোথায়। আমি একদিন সকালে, যখন কেউ কাজে আসেনি, জায়গাটা তন্ন তন্ন করে দেখি। উত্তর—পশ্চিম দিকে একটা ন্যাচারাল ডিচ আছে। পাঁচ ছ—ফুট ডায়ামিটারের একটা ডিচ। চারদিকে প্রচুর আগাছা থাকায় গর্তটা চোখেই পড়ে না। টর্চ ফেলে দেখি, বেশ গভীর। অন্তত আট দশ ফুট নীচে ডিচের তলায় কয়েকটা সিমেন্টের চাঙড়। জলে ভিজলে সিমেন্ট জমে যায়, আর সময়টা ছিল বর্ষাকাল। আমার অনুমান ডিচের মধ্যে একটা ডেডবডি ফেলে ওপরে কয়েক বস্তা সিমেন্ট ঢেলে দিলে কাজটা এগিয়ে থাকে। সিমেন্টের ওপর অবশ্য যথেষ্ট রাবিশও ফেলা হয়েছে।
হ্যাঁ স্যার, গোডাউনে মাঝে মাঝে এক—আধটা সিমেন্টর বস্তা জমে যায়। সেগুলো ডিচের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়।
হ্যাঁ, তা আমি জানি। ওই চাঙরগুলোর মধ্যে যদি যিশুর খণ্ডবিখণ্ড অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো পাওয়া যায় তাহলে আমি অবাক হব না। তবে আমি চাঙড়গুলো ভেঙে দেখিনি। সবই আমার অনুমান।
স্যার, কেন যে ওসব ভয়ংকর অনুমান করছেন কে জানে। যিশু মস্ত গুন্ডা, সে যদি খুন হয়েও থাকে সেটা তার সমকক্ষ লোকই করেছে।
আপনি যিশুর সমকক্ষ নন?
পাগল! কী যে বলেন স্যার!
নরম্যালি, যিশু যদি বাঘ তো আপনি ইঁদুর। কিন্তু যখন অস্তিত্বের সংকট দেখা দেয়, প্রভুভক্ত যখন প্রভুর বিপদের গন্ধ পায় তখন বিশেষ সিচুয়েশনে অর্ডার অফ পারসোনালিটিজ উলটে যেতে পারে। তখন বাঘ হয়ে যায় ইঁদুর, ইঁদুর বাঘের জায়গা নেয়।
স্যার, আপনার কথা শুনে বড্ড ভয় পাচ্ছি।
কেন, ভয়টা কিসের?
আপনি যা সব বললেন সেগুলো কি ভয়ের কথা নয়? একটা নেংটি ইঁদুর হঠাৎ হালুম—বাঘা হয়ে উঠলে সে নিজেই যে ভয় খেয়ে যাবে। না মশাই, না, আপনি আমার ভিতরে ভুল জিনিস দেখেছেন। আমি ওরকমই নই।
সেটা আমিও জানি। আপনি ওরকম নন।
আজ সকালেই তো বাজারে পাতিলেবু কিনতে গিয়ে একটু দরাদরি করছিলাম, লেবুওয়ালা এমন রক্ত—জল—করা চোখে চাইল যে আমি পালানোর পথ পাই না।
হ্যাঁ, আপনি ওরকমও বটে। খুব ভিতু, ঝঞ্ঝাটবিরোধী, এসকেপিস্ট।
তাহলেই বুঝুন, আপনি আমাকে ভুল অ্যাসেস করছেন কি না।
না, তাও করছি না। খুনের কিনারা করার দায়িত্ব আমাকে কেউ দেয়নি। যিশু দাস মোট বাইশটা খুন করেছে বলে পুলিশের হিসেব আছে। বেঁচে থাকলে সে হয়তো আরও বাইশটা খুন করত। সুতরাং তার লোপাট হওয়া নিয়ে পুলিশের তেমন মাথাব্যথাও নেই। তবে হাঁ, সে বেঁচে থাকলে পুলিশ তার কাছ থেকে কমিশন পেত। সেইটেই যা লস। কিন্তু আমার ইন্টারেস্ট অন্য জায়গায়। সেটা আপনি।
কী যে বলেন স্যার, এ যে অবিশ্বাস্য! তবে বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে। জীবনে আমাকে কেউ এত ইম্পর্ট্যান্স দেয়নি।
তারা ভুল করেছে। আপনার ইম্পর্ট্যান্স এতটাই বেশি যে, আমি অনেক খোঁজখবর নিয়ে, আপনার ডেলি রুটিন চেক করে তবে এই পার্কে ঠিক আপনার পাশে এসে বসে আছি।
আমার ভারী গুমোর হচ্ছে স্যার, বুকটা ফুলে উঠছে অহংকারে।
আপনি যিশুকে মারার জন্য কি লোহার রড ব্যবহার করেছিলেন মনোবাবু?
আপনি যে কেন আমাকে বারবার ঠেলে খুনখারাপির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন বুঝতে পারছি না। তবে আমি স্বীকার করি লোহার রড একটি মারাত্মক জিনিস।
স্বীকার করেন?
হ্যাঁ, আমাদের কারখানায় একজন লেবারের বাঁ চোখের ভিতর দিয়ে কেবার একটা রড ঢুকে গিয়েছিল তার মাথার মধ্যে, তক্ষুনি মারা যায়। ঘটনাটা ভাবলে এখনও শিউরে উঠি।
যিশুকে কি ওভাবেই মারা হয়েছিল মনোরঞ্জনবাবু? চোখের ভিতরে রড ঢুকিয়ে?
কি করে জানব স্যার? ওসব যে বীভৎস ব্যাপার।
আর তার ডেডবডিটা? সিমেন্টের মধ্যে ঢুকিয়ে, জল ছিটিয়ে হুইলব্যারোতে নিয়ে গিয়ে ডিচের মধ্যে ফেলে দিয়েছিলেন?
মা গো! আপনি যে কীরকম সব ভয়ংকর কথা বলেন! আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
বাঁচার জন্য মানুষ তো সবকিছু করতে পারে। তাই না?
তা অস্বীকার করছি না স্যার। তবে আমি বলতে চাই, আপনি ভুল লোককে সন্দেহ করছেন। আমি সে—নই।
আমি তা স্বীকার করি। এই যে মনোরঞ্জন আমার পাশে এখন বসে আছে সে খুনি নয়, মারকুট্টা নয়, ভয়ংকর নয়। কিন্তু এই মনোরঞ্জনের মধ্যে আরও একজন মনোরঞ্জন সেই দিন জেগে উঠেছিল, তাকে আমিও চিনি না, আপনিও চেনেন না।
তার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই স্যার।
জানি। কিন্তু সে যখন একবার জেগেছে তখন প্রয়োজন দেখা দিলেই সে কিন্তু আবার জাগবে।
সেটা তো ভয়ের ব্যাপার স্যার।
হ্যাঁ, আপনাকে সেই মনোরঞ্জন সম্পর্কে হুঁশিয়ার করে দিতেই আমার আসা। পুলিশ আপনাকে ধরতে পারবে না, আপনার ফাঁসি বা জেলও হবে না, কিন্তু আমি তবু বলছি, আপনি বিপন্ন। ওই ভয়ংকর মনোরঞ্জন কিন্তু আপনাকে সহজে রেহাই দেবে না।
চলে যাচ্ছেন স্যার?
হ্যাঁ।
যাবেন না স্যার, আর একটু বসুন।
কেন?
একা থাকতে আমার বড় ভয় করছে স্যার। দয়া করে অন্তত আমাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যান।
কাকে ভয় পাচ্ছেন মনোরঞ্জনবাবু?
আজ্ঞে, মনোরঞ্জনকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন