শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
প্রথমে ভূপতি ঢুকল। তারপর অনিমেষ। সব শেষ সুকুমার।
ভূপতির হাত সামান্য কাঁপছিল, যেন এই ঘরে ও প্রথম আসছে। ইন্টারভিউ দেওয়ার মতো উত্তেজনা। মুখের হাসিটা ছিলই। সেটাকেই শেষ অবলম্বন করে চৌকাঠ পেরোতে গিয়ে শব্দ করে হাসল ভূপতি।
অনিমেষ পর্দাটিকে অনেকটা সরিয়ে দিল যেন ওটা যে এ ঘরের আব্রু সেটা তার মনে হয়নি। ভ্রূ কুঁচকে নিজের মুখে কয়েকটা ভাবনাচিন্তার রেখা ফুটিয়ে তুলল। ওর মনে হল ওকে দেখেই সবাই হেসে ফেলবে।
সুকুমার সবচেয়ে আস্তে ঢুকল, যেন ওর ঢোকাটা কেউ মনোযোগ দিয়ে দেখছে। খুব মেপে মেপে পা ফেলল আর যতদূর সম্ভব শিরদাঁড়াকে টান রাখল। জানে দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলে ওকে সুন্দর দেখায়।
তিনজনের কেউ আগে কেউ পেছনে দাঁড়াল। প্রত্যেকেরই নিজের দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে মনোযোগ।
ঘরটা ছোট, নিখুঁত চৌকোণা। কেউ যেন খুব সাবধানে মেপে একটা সাদা পাথর খুঁজে ঘরটা তৈরি করেছে। তিনটে জানলা দিয়ে বিকেলের আলো আসছে—ঘরটা এত ছোট যে মনে হয় এত আলোর দরকার ছিল না। পাতলা মিহি সাদা গোলাপি রঙের পরদা জানলায়। নতুন কেনা টেবিলের ওপর কিছু বই উপহারের দেয়াতদানি, বাসি ফুল এলোমেলো, নতুন খাটের ওপর নতুন বিছানার চাদর, পাটভাঙা নতুন শাড়ি, শার্ট, সিল্কের পাঞ্জাবি এলোমেলো। একটা ছোট আলমারি আয়না দেওয়া। মেঝেতে খোলা ট্রাঙ্ক, পাশে খবরের কাগজ বিছিয়ে কেউ থাক করে করে লাল, হলদে এবং মিশ্রিত অদ্ভুত রঙের অনেকগুলো শাড়ি সাজিয়ে রেখেছে। যেন শাড়িগুলো গোনা হচ্ছিল, তাদের পায়ের শব্দ পেয়ে কেউ উঠে গেছে।
—এসে ডিস্টার্ব করা গেল। ভূপতি বলল। সে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পাচ্ছিল। অনিমেষ নিজের কাঁধ দেখছিল। সুকুমার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল যেন কেউ না ডাকলে মুখ ফেরাবে না।
—ওরা বোধহয় বেরোতো। অনিমেষ বলল।
—বাঃ, আমাদের আসতে বলা হয়েছিল যে—সুকুমার মুখ না ফিরিয়ে ফিসফিস করে বলে।
ভূপতি হাসে। অনিমেষ খাটের কাছে এগিয়ে গিয়ে পাটভাঙা নতুন শাড়িটা সরিয়ে দিয়ে বসবে কিনা ভাবতে ভাবতে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে চিন্তিত প্রবীণের মতো দেখায়। যেন এই ঘরের কোনো জিনিসপত্র বা বিষয়বস্তুর ওপর তার সমর্থন নেই।
ভূপতি এই ঘরের অবস্থা দেখে মনে মনে যুক্তিবিজ্ঞানসম্মত কয়েকটি সিদ্ধান্তে আসতে চেষ্টা করে। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ঘরটাকে দেখে। নতুন চুনের গন্ধ পায়। কোরা কাপড়ের গন্ধ। ইউ—ডি—কোলোন। জানালা দরজায় বার্নিশ।
—ওঃ খুব হাঁটা হয়েছে। অনিমেষ বলে।
—তোর জন্যই তো। সুকুমার গলায় ঝাঁজ নিয়ে অনিমেষের দিকে তাকায়—আমরা একঘণ্টা আগে বেরিয়েছি। তখন ট্রামে বাসে ভিড় ছিল না।
—তোদের কি, সরকারি অফিসে কাজ করলে অফিসে ঢুকবার আগেই বেরোনো যায়।
—প্লিজ, ভূপতি বলে। সুকুমার আবার মুখ ফিরিয়ে জানলার বাইরে তাকায়।
—ক—দিন হল বলতে পারিস? ভূপতি থুতনির দাড়ি চুলকোলো।
—কিসের? সুকুমার মুখ ফেরায়।
—ওদের বিয়ে।
—ওঃ। সুকুমারকে নিরুৎসুক দেখায়।
অনিমেষ মনে মনে হিসেব করে।
—একমাস বোধহয়।
—কী হয়েছে। সুকুমার লাল হয়।
—যাঃ বাবা, তোর সবতাতেই লজ্জা। ভূপতি বলে,—একটু আওয়াজ দে। নইলে কখন বেরোবে ঠিক কি?
ভেতরের দরজায় পরদা সরিয়ে রজত ঢুকল। ঢুকতে ঢুকতেই চেঁচিয়ে বলল,—এই যে, এসে হাজির তোরা, সুকু, গৌরীপ্রসন্ন অ্যান্ড দি ওল্ডম্যান! বাট ইউ আর লেট পলস। চারটের সময় দেওয়া ছিল যে! এখন সাড়ে পাঁচ।
সুকুমার ভূপতির পাশে দাঁড়াল। ভূপতি বলল,—বেশ লোক!
অনিমেষ পকেট থেকে রুমাল বের করে বলল,—লুক হিয়ার, ইয়ংম্যান, নাউ ওয়াচ হোয়াট ইউ সে। আমরা মেহনত করে খাই—
রজত জোরে হাসল। মসৃণভাবে কামানো গাল, ফর্সা পায়জামা আর গেঞ্জিতে ওকে খুব তাজা দেখায়। হাতে নতুন ঘড়ি। বলল—সরি।
রজত দ্রুত হাতে খাটের ওপর থেকে জামাকাপড়গুলো সরিয়ে দিয়ে জায়গা করে দিল। বলল,—বোস।
অনিমেষ খাটের রেলিঙে হেলান দিল। ওর পায়ের কাছে সুকুমার পা ঝুলিয়ে বসল; ও পাশের বেঞ্চিতে ভূপতি হেলান দিয়ে বসল। রজত টেবিল থেকে বই নামালো মেঝেতে। তারপর টেবিলটা খাটের কাছে টেনে নিয়ে তার ওপর হাঁটু তুলে বসল।
—তারপর? রজত বলল।
—দেখতে এলাম। অনিমেষ গম্ভীর থাকবার চেষ্টা করে।
—তোদের খবর আগে বল। রজত বলে।
—নো নো। ভূপতি সিগারেট ঠোঁটে চেপে সাহেবি কায়দায় বলল!
—দেখতে এলাম। অনিমেষ তেমনি গম্ভীরভাবে বলে।
—কী? রজত বলে।
—পাখিটা আর কি ছটফট করে? উড়িবার জন্য আর কি ডানা ঝাপটায়? নড়িতে চড়িতে পায়ের শিকলটা কি ঠুন ঠুন করিয়া বাজে? উইথ ডিউ রেসপেক্ট টু দিন পোয়েট, সেটা কি আদৌ শিকল? অনিমেষ থামে।
—আসল কথা তোমার এক্সপিরিয়েন্সটা বল। ভূপতি ধোঁয়া ছাড়ল মেঝেতে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে।
—ইয়ার্কি করিস না, এটা কফি হাউস নয়! সুকুমার খুব ঠান্ডা গলায় বলল।
অনিমেষ সোজা হয়ে রজতের দিকে তাকাল। রজত হাসছিল। অনিমেষ ফাঁপা গলায় বলল,—এসো রজত আমরা অ্যালায়েন্স করি। আমরা ব্যাচেলরদের সঙ্গে কোনো করুণ ব্যবহার করব না। পুওর সোলস দে ডোন্ট ডিজার্ভ ইট।
ভূপতি অবিচলভাবে বলল, সুকুমারের যেখানে হার্ট থাকা উচিত সেখানে একটি ভগবদগীতা আছে। সেই গীতাই ওকে খেলো।
—গীতা? আই সি? অনিমেষ ভ্রূ কোঁচকাল।
সুকুমার নিজের রাগ চাপা দিয়ে হাসতে চাইল। মুখ তুলে তিনজনের দিকে তাকাল। ভূপতি নির্বিকার। অনিমেষ যেন চিন্তিত। রজত হাসছে। সুকুমার লাল হয়ে হাসে।
রজত কোমরের ভাঁজ থেকে ক্যাপস্ট্যানের প্যাকেট বের করে একটা নিয়ে প্যাকেটটা তিনজনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। অনিমেষ আর সুকুমার একটা করে সিগারেট নেয়। ভূপতি বলে—'থ্যাঙ্কস'।
রজত সিগারেট ধরিয়ে বলল—আসলে কি জানিস ছাপা—বাঁধাই মন্দ নয়, প্রচ্ছদপটও ভালো, তবে—
—বাজে উপমা। অশ্লীল। সুকুমার বলল খুব আস্তে। ভূপতি উদাস গলায় বলল—বলে ফেল। তবে—
—তবে আগের লাভার—টাভার আছে কিনা জানতে হলে পুরো উপন্যাসটা পড়তে হয়। সেটা সময়সাপেক্ষ। রজত ধোঁয়া ছেড়ে অনিমেষের দিকে তাকায়।
—আগে কহ আর! অনিমেষ বলে।
রজত হাসে,—ওল্ডম্যান, তুমি রোমান্টিক নও সুকুমারের মতো। সুকুমার অভিজ্ঞ নয় তোমার মতো। ও এখনো ছেলেমানুষ—
—হুঁ, আমাদের দায়িত্ব—অনিমেষ বলে।
ভূপতি চুপ করে ধোঁয়া ছাড়ে। সুকুমার বলল—ক্যারি অন।
রজত সুকুমারের দিকে তাকায়,—তোমাকে নষ্ট করতে চাই না।
—তোমরা ওকে অপমান করছ। ভূপতি বলে কোনোদিকে না তাকিয়ে সুকুমার হয়ে থাকাটাই ওর ধর্ম, যেমন জলের ধর্ম তারল্য তেমনি শিশুর ধর্ম সারল্য। বিবাহিত হলে ওর ধর্ম পালটাবে, যেমন জল জমে বরফ হয় শিশু পক্ক হলে অনিমেষ কিংবা ভূপতি হয়।
ওঃ, অনিমেষ ধোঁয়া ছাড়ে,—শিশু এবং বৃদ্ধদের সামনে লজ্জা করতে নেই।
সুকুমার কথা বলল না। সন্তর্পণে সিগারেটের ছাই মেঝেতে ঝেড়ে পা দোলাতে লাগল। অনিমেষ পা ছড়িয়ে শরীরটাকে ছেড়ে দিল যেন এটা ওর নিজের ঘর। রজত টেবিলের থেকে পা নামিয়ে চটিতে পা ঢোকাল। দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,—বৃদ্ধদের কথায় একটা ঘটনা মনে পড়ল। গোল দীঘিতে বিকেলবেলায় এক বুড়ো আর এক বুড়োকে নিজের দেশি ভাষায় বলছিল—'বয়সকালে আমরাও দুই চাইরটা মাইয়া নষ্ট করছি, কিন্তু রায়মশায়, এখনও যখন দেখি বয়সের মাইয়াগুলা বুকটান কইর্যা রাস্তা দিয়া হাঁটে তখনও ইচ্ছা করে যে—'
অনিমেষ সোজা হয়ে বসে দ্রুত প্রশ্ন করে—কী ইচ্ছে করে?
রজত হাসল,—প্লিজ, আর এগোতে পারব না। সুকুকে কনসিডার কর।
সুকুমার হাসি চেপে গম্ভীর থাকতে চাইল। ভূপতি অবহেলায় একটু হাসল। অনিমেষ চিন্তিতভাবে গালে হাত দিল।
সুকুমার খুব আস্তে প্রায় নিশ্বাসের সঙ্গে রজতকে বলে,—তোকে দেখে মনে হচ্ছে না যে তুই সদ্য বিবাহিত!
—আ হা, আমি সদ্য বিবাহিত! রজত প্রথমে অনিমেষ তারপর ভূপতির দিকে তাকায়। হাসে হি হি করে।
সদ্য বিবাহিত! অ্যাঁ?—অনিমেষ, হাত ঘষে সিনেমার কোনো ভিলেনকে নকল করে হাসল।
ভূপতি গম্ভীরভাবে সুকুমারের দিকে তাকায়,—প্রিয় সাহিত্যিক, তোমার মন তোমার লেখনীর অনুধর্ম নয়। তুমি ভাবো এক লেখো অন্য।
—কলমের আব্রু ঘোচাও, কবি। রজত হাসে।
অনিমেষ হাতের ছোট হয়ে আসা সিগারেটের দিকে তাকিয়ে বলে,—সেই কারণেই পৃথিবীর কোনো জিনিসকে আমি ঘেন্না করি। যেমন কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, প্রেমিক, রজনিগন্ধা এবং বিলিতি কুকুর।
—যাঃ ভালো লাগে না। সুকুমার ঠোঁট বেঁকায়।
ভূপতি আর অনিমেষ দুজনে দুজনের দিকে তাকাল।
—তুই কবি। অনিমেষ বলে।
—তুই সাহিত্যিক। ভূপতি বলে।
—তুই শিল্পী।
—তুই প্রেমিক।
—তুই রজনিগন্ধা।
—তুই...
ভূপতি হঠাৎ থাকে। অনিমেষের পা নাচানো বন্ধ হয়। রজত দু'হাত শূন্যে ছুঁড়ে দিয়ে হাই তুলে বলে—টা—য়া—র্ড।
ওঃ। সুকুমার দূরের জানালা দিয়ে আকাশে তাকায়।
—কথাটা হচ্ছে কাওয়ার্ডস ডাই মেনি টাইমস বিফোর—ভূপতি একটু থামে। তারপর উদাস গলায় বলে—দেয়ার ডেথ। অর্থাৎ বিবাহিত হওয়ার আগেই আমরা মনে মনে বহু বিবাহ করে থাকি। মনের হারেম কখনো শূন্য থাকে না, কবি। সেদিক দিয়ে আমরা কুলীন।
রজত খাটের তলা থেকে একটা গ্যাটাপার্চারের কালো অ্যাশট্রে বের করে সিগারেট ফেলে বলে—স্বাধীন ব্যক্তিরা কখনো অ্যাশট্রেতে সিগারেট ফেলে না। এখন অভ্যেস করতে হচ্ছে। তার মানে—
—ওঃ জমেছে। ভূপতি বলে। রজত বলল—তার মানে জমছে। আমি জমে যাচ্ছি। সুকুমার অ্যাশট্রেটার জন্য হাত বাড়ায়।
—কেমন জমছে বল। অনিমেষ কৃত্রিম সুরে বলে।
—সুপার। রজত হাসল,—ও ছেলেবেলা থেকেই উত্তরপ্রদেশে। সে জন্যে কথায় একটু টান আছে, তাতে আবহাওয়াটা আরও মিষ্টি হয়।
—যথা—? ভূপতি সুর টানে।
—যেমন পড়ে গেল—কে বলে গিরে গেল, 'বাসন'—কে বলে 'বর্তন', তুমি দুষ্ট না—বলে বলে 'তুমি দুষ্টু হচ্ছ'।
অনিমেষ বুকে হাত চেপে চাপা চিৎকার করল,—উঃ তোকে চাক্কু মারছে।
রজত হাসে। সুকুমার মাথা ওঠায় না। ভূপতি আর একটা সিগারেট ধরায়।
রজত সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল—রেডি হয়ে নে। ডাকছি।
রজত ভেতরের দরজার কাছে গিয়ে পর্দাটা ছুঁয়ে ফিরে তাকাল। হেসে বলল,—অন ইওর মার্ক। রেডি। সুকু, স্মাইল প্লিজ, একটু চোখ তুলে নাকিও, মেয়েদের দিকে না তাকানো মানে ইনসাল্ট। তারপর অনিমেষকে বলল,—ওল্ডম্যান, তুমি সব দেখবে জানি কিন্তু কথা শুনে হেসো না।
—সুকু হইতে সাবধান। ভূপতি বলে।
রজত হাসল,—আমি ওকে বলে রেখেছি যারা আসছে তাদের মধ্যে একজন সাহিত্যিক আছে। সেই শুনে ও ভয় পেয়েছিল। সাহিত্যিকরা নাকি ক্যামেরার চোখের মতন, ফাঁকি দেওয়া যায় না। সে জন্যেই মেয়েরা সাহিত্যিকদের ভয় পায়।
—সুকু, তোমার কেস খারাপ। অনিমেষ মাথা নাড়ল।
—বাঃ, তাতে আমার কী? সুকুমার মাথা তুলে বলে, আমি সাহিত্যিক নই, বিলিতি কুকুরও না। কেউ যদি বানিয়ে বলে—
—তুমি সাহিত্যিক নও? অনিমেষ প্রশ্ন করে।
—আমি মনে করি না। সুকুমার ঝাঁঝালো গলায় বলে।
রজত দরজার কাছ থেকে বলে—তোরা কতক্ষণ চালাবি? আবহাওয়া অনুকূল না হলে আমি সাহস পাচ্ছি না। প্লিজ—
—আমরা একযোগে সুকুমারকে ক্ষমা করছি। অনিমেষ হাসে। ওর মুখে রাগের চিহ্ন নেই।
সুকুমার বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর ঠোঁট দুটো সাদা আর অল্প কাঁপছে।
—তুই রেগেছিস। অনিমেষ বলে। সুকুমার উত্তর দেয় না।
রজত পরদা সরিয়ে ভেতরে যায়। পরদার ওপাশ থেকে ওর গলা শোনা যায়,—অন ইওর মার্ক, ফেলাজ। রেডি।
—বিচিত্র রঙ্গমঞ্চ। ভূপতি উত্তর দিল।
—একটা সিগারেট খা। অনিমেষ পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে সুকুমারের দিকে এগিয়ে দিল। সুকুমার সিগারেট নিয়ে হাসল, বলল,—ধন্যবাদ। কিন্তু খাব না, নট বিফোর লেডিজ।
—বিচিত্র রঙ্গমঞ্চ। ভূপতি আবার বলল।
অনিমেষ সুকুমারের হাত থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা ফেরত নিয়ে বলল—ভূপতি, অস্ত্র সংবরণ কর। ওকে রাগিও না। এই সিচুয়েশনে ওর নার্ভ ফেল করলে কেলেঙ্কারি। ওকে শান্ত থাকতে দাও। শান্ত হয়েও কোনো সুন্দর মেয়েমানুষ কথা ভাবুক।
—আঃ কি হচ্ছে! ভূপতি উঠে সোজা হয়ে পা নামিয়ে বলল। বলল,—ইউ আর আউট টু—ডে। বিনা মদেই মাতাল।
অনিমেষের মুখটা বোকা বোকা হয়ে গেল। ও সোজা হয়ে বসে পা নামালো,—কী করব? উঠে দাঁড়িয়ে বাও করব না হাতজোড় করে—
—ফুঃ—ভূপতি বলে,—তুমি বাও করবে, আমি কুর্নিশ, আর সুকু অর্ধেক উঠে এবং অর্ধেক ব'সে ঘরেও নহে পারেও নহে গোছের মুখ করে মিষ্টি হেসে বলবে ন—ম—স্কা—র।
ভূপতি চুপ করল। অনিমেষ একটু হাসল। সুকুমারের কথা বলল না। পাশাপাশি পা ঝুলিয়ে চুপ করে রইল।
ঘরের কোথাও ঘড়ি ছিল না। কিন্তু সুকুমার মনে হল কানের কাছে অবিশ্রান্তভাবে প্রতিটি সেকেন্ড টিপ টিপ করে কলের জলের মতো বয়ে যাচ্ছে। নিজের হাতঘড়িটা কানের কাছে তুলে খুব ক্ষীণ শব্দ শুনল। ভাবল প্রতিটি সেকেন্ডই প্রয়োজনীয় নয়। কয়েকটি সেকেন্ড মূল্যবান কখনো কিছু ঘটলে। বাদবাকি সময় প্রতীক্ষাশূন্য, ঘটনাবিরল, অর্থহীন। এই ঘরে এমন কিছু নেই যাতে মনোযোগ দেওয়া যায়। তবে এই ঘরের ভিতরই খুব অস্পষ্ট মৃদু লয়ে কি যেন একটা বদলে যাচ্ছে কার যেন একটা রূপান্তর—
রজত ভেতরে যাওয়ার পর পাঁচ মিনিট হয়েছে। ভূপতির মনে হল রজত বহুক্ষণ গত। যেন চেষ্টা করলেও রজতের মুখটা মনে আসবে না। তবু সময় স্থির হয়ে আছে। অনড়, অচল, নিষ্ঠুর। কেউ এলেও কিছু না, কেউ গেলেও কিছু না। আসলে কিছুতেই কিছু না—
সাতটা সতেরোতে একটা ট্রেন তারপর সাড়ে আটটায়। ভাবল অনিমেষ। কবজি উলটে ঘড়ি দেখল। এখন ছ—টা। পদ্মপাতায় পা ফেলে আসবার মতো আস্তে আস্তে রজতের বউ আসবে। আস্তে কথা বলবে অনেকক্ষণ সময় নিয়ে। অনেকক্ষণ সময়ে চায়ের পেয়ালার চামচ নাড়বে আর নিজের হাতের নতুন সোনার চুড়ির শব্দ শুনবে ঠুন ঠুন। ঘড়ি দেখতে ভালো লাগে না। কেমন যেন মন—খারাপ হয়। তবু সাড়ে আটটায়া একটা ট্রেন, তারপর কখন কে জানে—
—রজতদা দেরি করছে। অনিমেষ বলে।
—আমাদের শুধু শুধুই আসা। আসলে—ভূপতি থামে।
—আঃ, আস্তে। পায়ের শব্দ—সুকুমার বলল।
পর্দা সরিয়ে রজত ঘরে ঢুকল—এই যে! ওঃ! অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। তারপর রজত পেছন ফিরে দরজার দিকে তাকিয়ে অন্তরালবর্তী কাউকে বলল—বুলা, এরা আমার বন্ধু, এসো।
একটা মোমের আলোর মতো নরম হলুদ হাত নীল পরদাটাকে সরিয়ে দিল। সোনার চুড়ির শব্দ হল ঠুং করে। চাবির শব্দ। প্রথমে ফুলের গন্ধের মতো একটা কোনো গন্ধ ঘরের বাতাসে ছড়িয়ে গেল। তারপর বুলা এসে দাঁড়াল ঘরের মাঝখানে। পরনে হলুদ শাড়ি হলুদ ব্লাউজ।
রজত বুলার দিকে তাকাল তারপর তিনজনের দিকে। তারপর আবার বুলার দিকে তাকাল। শেষপর্যন্ত তিনজনের দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হেসে বলল,—এই হচ্ছে বুলা। আমার—
অনিমেষ উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার বসল। ওর পায়ের চটির শব্দ হল। হাতজোড় করে বলল—নমস্কার।
ভূপতি দেখল বুলা ওকে দেখছে না। বুলা কোনো দিকেই তাকিয়ে নেই। ভূপতি একটা হাত সেলামের ভঙ্গিতে মাথার কাছে তুলল কী ভেবে সেই হাতটা দিয়েই কপালটা চুলকোলো।
সুকুমার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে হাতজোড় করল। মুখে কিছু বলল না। বসল।
রজত নাটকীয় ভঙ্গিতে সামনের দিকে ঝুঁকে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,—ইনি অনিমেষ সেন।
বুলা বলল,—নমস্কার।
—ইনি সুকুমার চট্টোপাধ্যায়।
—নমস্কার। বুলা বলল।
—ইনি ভূপতি রায়চৌধুরী।
বুলা বলল,—নমস্কার।
—আর আমি অধম শ্রী—
বুলা বলল—থাক—চিনি—
বুলা মিষ্টি হাসল। যেন ও সকলের চেয়ে আলাদা। বলল,—ওর কাছে আপনাদের কথা শুনেছি। আপনাদের প্রায় চিনি।
বুলার গলায় এতটুকু জড়তা নেই, কথার টান পরিষ্কার, তবে ও 'র' কে 'ড়' উচ্চারণ করে সুকুমার লক্ষ্য করল। ওর গায়ের রং লালচে আভা মেশানো হলুদ। সম্ভবত ও হলুদ মেখে চান করে। হাতে মেহেদি পাতার অস্পষ্ট রং। আঙুল সুঠাম হাতের আঙুলের মতো সদৃশ—সম্ভবত কথক নাচের যে কোনো মুদ্রা অনায়াসে আঙুলের ঢেউ তুলতে পারে—এমন লীলায়িত,—হাড়, বোঝা যায় না। ওর মুখ গোল, চোখ মানা, চোখের তারা একটু চঞ্চল কালো, সপ্রতিভ। কপাল ছোট, মাথায় চুল টান করে বাঁধা। শাড়ির রং পুজোর সময়ে গ্রামে দেখা কোনো মেয়েকে মনে করিয়ে দেয়।
বুলা রজতের কাছ থেকে আলাদা হয়ে একটু দূরে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। ওকে রজতের চেয়ে লম্বা বলে মনে হল ভূপতির। সম্ভবত আলাদা করে দেখেছে বলেই এমন মনে হল। পাশাপাশি দাঁড়ালে ও রজতের কান ছাড়িয়ে যাবে না। ওর দেহ—কে প্রায় লতার মতো বল যায়—পেলব এবং ভারাক্রান্ত। মেয়েদের দেহের যে যে জায়গাগুলো উঁচু কিংবা নিচু বা সমতল হওয়া ভালো—ওর দেহও ঠিক তেমনভাবেই ভালো। পাতলা শাড়ির আড়াল থেকে ওর পরিমিত স্তন কিংবা কোমর কিংবা বাহুমূলের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ভূপতি মাথা নামিয়ে একটা অচেনা গন্ধ পেল। কোনো ফুলের।
পদ্মের পাপড়ির মতো পাতলা পায়ের পাতা মেঝের সঙ্গে মিশে আছে, আঙুরের মতো টুসটুসে ছোট আঙুল যেন চুলের মতো সরু কাঠি দিয়ে পায়ের সঙ্গে লাগানো। পাতলা কোমল মাংস বিস্তৃত হয়ে আছে, যেন হাঁটলে শব্দ হবে না—মেঝেতে কান রাখলেও শোনা যাবে না কেউ হেঁটে যাচ্ছে। অনিমেষ ধ্বনি, কয়েকটা কথার অংশ একটু শব্দ তরঙ্গ শুনেছিল। বুলার গলায় কোনো কৃত্রিম সুর নেই,—যেন ও কখনো অভিনয় করেনি। ওর দাঁত সুন্দর।
—আমাদের সময় হয় না। নইলে পরিচয়টা আগেই সেরে নেওয়া যেত। ভূপতি বলল।
—বিয়ের সময়ে আপনাকে দেখেছি। কিন্তু অনিমেষ কথা শেষ করল না!
বুলা হাসল, বলল,—বিয়ের সমেয় ভারী জবরজঙ দেখায়। আমি এমনিতে অত শাড়ি গয়না পরি না। কেমন যেন চেনা যায় না—
সুকুমার একদৃষ্টে দেওয়াল দেখছিল। ওর মুখটা কোনো অহংকারী ছেলের মতো যাকে সম্প্রতি অপমান করা হয়েছে।
—বউ আর কনেতে, অনেক তফাত। কোন ছদ্মবেশটা ভালো কে জানে! রজত জোরে নিশ্বাস ফেলে বলে।
—আঃ হা—বুলা ঘুরে দাঁড়াতে গিয়ে গতি না থামিয়েই বলল।
—তোমরা জাদুকরী। রজত হতাশ হয়ে বসে।
বুলা হাসল। তিনজনের দিকে তাকিয়ে বলল—আপনারা একটু বসুন। আমি চা নিয়ে আসছি এক্ষুনি, দেরি হবে না—
বুলা দরজার কাছে গেল।
—রজত ডাকল, শোনো। বুলা ফিরে তাকায়। রজত আঙুল দিয়ে সুকুমারকে দেখাল—আমার সাহিত্যিক বন্ধু। সুকুমার এবং লাজুক। তোমাকে বলেছিলাম—
—ও! বুলা হাসল যেন এর আগে ও উত্তরপ্রদেশে কোনো সাহিত্যিককে দেখে নি। ভ্রূ কোঁচকালো যেন ও এর আগে সুকুমারের কথা শুনেছে কিনা মনে করতে পারল না।
—তুমি ওর সঙ্গে ভাব জমাও। হয়তো ও কোনোদিন তোমাকে নিয়ে একটু কিছু লিখবে নিদেন চার লাইনের কবিতা কিংবা রবিবারের গল্প—
সুকুমার প্রথমে হাসল, তারপর অন্য সবাই।
বুলা হাসতে হাসতেই পরদার ও পাশে চলে গেল।
সুকুমার বলল—ইডিয়ট।
রজত হাসল—ও অত সিরিয়াস নয় তোর মতো। ঘাবড়াচ্ছিস কেন?
—স্টুপিড। সুকুমার বলল।
—আঃ ননসেন্স। কেমন লাগল বল। রজত হাসল। তারপর গম্ভীর হয়ে কোমরের ভাঁজ থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে তাকাল।
—ইউ আর এ লাকি ডগ। অনিমেষ হাত বাড়াল, কংগ্র্যাচুলেশনস।
—থ্যাঙ্কস। রজত স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলে।
—কংগ্র্যাচুলেশনস—ভূপতি অন্য কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বলে।
—তোর—? রজত সুকুমারের দিকে তাকায়।
সুকুমার ঠোঁট চেপে হাসে। বলে,—নির্জন দ্বীপে নির্বাসিতা করুণ কোনো মহিলার মতো। কোনো পুরুষের সাধ্য নেই তাকে স্পর্শ করে।
—অ্যাঁ? মস্ত বড় হাঁ করল অনিমেষ।
—দি বেস্ট কমপ্লিমেন্ট। থ্যাঙ্কস—রজত জোরে শ্বাস টেনে হাসতে হাসতে হাত বাড়াল,—ওকে বলব।
—কবি, আমরা পরাভূত। ভূপতি বলে। তারপর হাসতে থাকে।
—ইউ উইন দি রেস। অশোক বনে সীতার ইমেজ—ভাবা যায় না। অনিমেষ জোরে হাসে। সুকুমার মুখ নামায়।
তিনজনের হাসির শব্দ।
তারপর বুলা মাত্র একবার এই ঘরে এল। চা নিয়ে, সঙ্গে খাবারের প্লেট হাতে বাচ্চা চাকর। কয়েকটি মামুলি কথা, কিছু ওজর—আপত্তি। এবং তারপর একসময়ে ওরা তিনজনে উঠে দাঁড়াল। ভূপতি হাতজোড় করে বলল,—আজ চলি বউদি, আর কোনো সময়ে আবার দেখা হবে।
—আজ গৃহিণীপনা দেখে এলাম। আমরা অতিথিরা তুষ্ট। অনিমেষ কপালে হাত ছোঁয়াল।
সুকুমার হাতজোড় করে বলল,—আমি সত্যিই লিখি না। ওরা বানিয়ে বলে—
—তাতো বলেই। আমি আপনাকে বিশ্বাস করি। বুলা হাসতে হাসতে বলল, যেন কোনো বাচ্চা ছেলেকে ভোলাচ্ছে! ওর গলা চতুর শোনালো।
অনিমেষ রজতের দিকে তাকাল—দেখছো রজত। কপালে কত অপবাদ লেখা আছে।
রজত বেরোবে বলে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়ে নিচ্ছিল। প্যান্টের শেষ বোতামটা আটকানো আছে কিনা দেখে নিয়ে বলল,—দেখছি। সুকুর দিন—
ওরা দরজার কাছে এগিয়ে একবার ঘাড় ফেরালো।
—আবার আসবেন।
—আসব নিশ্চয়ই। বাঃ—
—আসব—সময় পেলে—
—মনে থাকে যেন—
—দেখবেন রজত তো দূরের কেউ না—
—আচ্ছা, দেখব কেমন—
—এরপর তাড়াতে চাইবেন কিন্তু—
—ইস। দেখা যাক।
—আজ যাই—
—চলি—
—দেখবেন, সিঁড়িটা যা অন্ধকার—
—যেতে পারব—
—সাবধানে যেও—
—হুঁ—
—চলি—
—আচ্ছা—
—চললাম—
—আ—চ্ছা।
পরদা সরানোর শব্দ। জুতোর শব্দ। সিঁড়িতে।
ওরা চারজন রাস্তায় এসে দাঁড়াল।
—কোথায় যাওয়া যায়? রজত বলল।
—কফি হাউস। সুকুমার খুব আস্তে বলল।
—ওঃ অনিমেষ ঠোঁট ওলটাল—সেই ছবি আঁকা, সেই কবিতা লেখা, সেই নতুন রীতির গল্প।
—সেই কাফকা—কামু—জয়েস—মান—রিল্কে। ভূপতি বলে—
—সেই বোদলেয়ার—এলুয়ার—লোরকা—পাউন্ড—
—সেই গগ্যাঁ—গয়্যা—গঁগ—সেজাঁ—পিকাসো—
—এবং রবীন্দ্রনাথ—
এবং সিগারেটের ধোঁয়া, কয়েকটি শুকনো ছেলে, কিছু বাসী মেয়ে—
—হরিবল।
—তবে কোথায় যাওয়া যায়? রজত আবার প্রশ্ন করল।
সুকুমার দাঁত দিয়ে নোখ কাটতে কাটতে বলল—কফি হাউসে এখন ভিড় নেই।
—দূর। ভূপতি বলে।
—শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। একটু তাজা হওয়া দরকার। অনিমেষ বলে।
—আমারও গলাটা খুশখুশ—কেমন ব্যথা। ক—দিন রাত জেগে,—রজত গলায় হাত দিয়ে বলল।
—হুঁ, সন্ধেটা মাটি না করে—ভূপতি রজতের দিকে তাকাল তারপর সুকুমারের দিকে।
—তবে যাওয়া যাক। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ না এসপ্ল্যানেড—রজত বলে।
—কিন্তু সুকু—ভূপতি প্রশ্ন করে!
—তোমরা যাও। আমি ওর মধ্যে নেই। সুকুমার এক পা পিছু হটল।
—পাগল, রজত হাত বাড়িয়ে সুকুমারের জামাটা ধরল, ছুকুও সঙ্গে যাবে। ও লাইম জুস খাবে—আমরা খাব জিন উইথ ফ্রেস লাইম—কেমন জুঁইফুলের গন্ধ,—বিয়ার দিয়ে শুরু করলে কেমন হয়?
—নট ব্যাড আইডিয়া—অনিমেষ বলল,—আমার ট্রেন সাড়ে আটটায়। বেশি খাব না, বউ মুখে গন্ধটন্ধ পেলে—
—বউ একটা আমারও আছে, অত ঘাবড়ায় না—ভূপতি বলে।
—সে সব কথা থাক, এখন কোথায় যাওয়া যায়? রজত সুকুমারের জামাটা ধরে থেকেই বলে।
—যেটা কাছে হয়। তাড়াতাড়ি অনিমেষ বলে।
—কিন্তু সুকু? ভূপতি বলে।
—এবং সুকু? অনিমেষ বলে।
সুকু যাবে। রজত হাসল,—ওকে পাকানো দরকার।
—পাকাতে হলে ওর বিয়ে দাও। মদ খেয়ে ছেলেরা পাকে না। ভূপতি বলে গম্ভীরভাবে।
—হুঁ ওর বিয়ে দাও। ওর দরকার—অনিমেষ বলে।
—হুঁ বয়স যাওয়ার আগেই বিয়ে দাও। ভূপতি বলে।
—কেন না,—অনিমেষ বলে,—বৃদ্ধ বয়সে বিবাহে বিবিধ বাধা।
সকলে জোরে হাসল। তারপর চলতে লাগল। সুকুমারের একটা হাত রজতের হাতে, অন্যটা ধরল অনিমেষ। ভূপতি ওদের পেছনে।
ঘরের ভেতর ঘর। ছোট্ট পার্টিশান দেয়া। কাঠের দেওয়াল বার্নিশ না করা, পুরোনো রং! গোপন নির্জন। টেবিল ঘিরে চারটে চেয়ার। ঠিক চারটে চেয়ার যেন কথা ছিল ওরা চারজনেই আসবে। বেশি না, কম না। যেন কথা দেওয়া ছিল যে আমরা আসব, সুকুমার ভাবল—চারজনের জন্য চারটে চেয়ার আর একটা ছোট টেবিল, দাগ ধরা নোংরা সাদা টেবিলক্লথ যার ওপর আমার হাত এবং হাতের ওপর কখন মুখ রাখব—তারা অপেক্ষা করছিল। সব টেবিলকে ঘিরে চারটে চেয়ার থাকে না—চেয়ারের সংখ্যা কখনো বাড়ে কমে। কিন্তু সাধারণত চারটে চেয়ারই থাকে যেন কারো তিনজনের বেশি সঙ্গী থাকা ভালো নয়। যদি আসতে চাও তিনজনকে নিয়ে এসো—যে কোনো তিনজন কিন্তু তিনজন। বেশি না, কম না।
চেয়ারের শব্দ হল। ওরা বসল। পরদা সরিয়ে একজন বেয়ারার মুখ উঁকি দিল। ওর মুখটা কালো, নির্বিকার এবং বৈশিষ্ট্যহীন। একটু যান্ত্রিক হাসি ঠোঁটে।
—জী সাব? বেয়ারা বলল।
—দুটো বিয়ার—বেশ ঠান্ডা দেখে। চারটে গ্লাস রজত বলে।
—আউর? বেয়ারা প্রশ্ন করে। রজত বিয়ারের নাম বলল!
পরে আরও বলছি। রজত বসে। বেয়ারা চলে গেল। পরদাটা আবার নিভাঁজ!
চারদিকে পার্টিশানের ওপাশে বিচিত্র শব্দ হচ্ছে। কখনো হাসির টুকরো, কথার বা কাচের শব্দ। এ ঘরটা নিঃশব্দ। ভূপতি রুমাল বের করে মুখ মুছল। অনিমেষ টেবিলের ওপর আঙুল দিয়ে বাজাল, সুকুমারের হাত ওর কোলে, রজত চুপচাপ মেনুটার দিকে চোখ রাখে।
—আমি কিন্তু খাব না। সুকুমার বলে।
—ওঃ, একটু—প্লীজ, আমার বউ—এর স্বাস্থ্য পান করব—রজত হাসল।
—তোর ভাবনা কি,—অনিমেষ বলল সুকুমারকে,—তুই তো মেস—এ থাকিস। কাউকে কৈফিয়ত দিতে হবে না।
—আর তোর তো নতুন কিংবা পুরোনো কোনো বউ নেই,—ভূপতি বলে,—তোর চিন্তা কি?
—কিন্তু,—সুকুমারকে চিন্তিত দেখায়,—লজ্জা কিংবা ভয় করছে। কেমন অপরাধবোধ—
—কেন? রজত প্রশ্ন করে।
—বেয়ারাটার মুখটা আমার চেনা—চেনা। ঠিক আমার জ্যাঠামশাইয়ের মতো মুখ—কেমন যেন লাগে। অস্বস্তি—
ভূপতি আর অনিমেষ শব্দ করে হাসে। অনিমেষ হাসি চাপতে কুঁকড়ে যায়। রজত স্থির থাক।
—এ রকম হয়, রজত বলে—এটা কোনো পাপ নয়।
—আঃ জ্যাঠামশাই—ভূপতি বলে!
—দ্যাটস এ প্রবলেম—অনিমেষ হাসে।
—আঃ, জ্যাঠামশাই মদ সার্ভ করছে,—এ সুপারফিসিয়াল ইমেজ। ভূপতি চোখ বন্ধ করে বলল।
বেয়ারা ঘরে ঢুকল। চারটে গ্লাস রেখে বিয়ার ভাগ করে দিল। দুটো প্লেটে চাকচাক করে কাটা শসা, পেঁয়াজ আস্ত পাঁপড় ভাজা।
—খুব ফেনা—সুকুমার বলে।
—বেশ ঠান্ডা। খা—রজত বলে।
—আঃ—চুমুক দিয়ে অনিমেষ বলে।
—এই সময়ে সুকুর একটা কবিতা শুনলে বেশ লাগত। ভূপতি সিগারেট ধরিয়ে বলে।
—বেশ, তাই হোক,—রজত হাসে।
—জমবে। হুঁ—অনিমেষ ঠোঁটের কাছে গ্লাস তোলে।
—দুর—সুকুমার বিয়ারের রংটার দিকে চোখ রাখে।
—প্লিজ,...ভূপতি বলে, তোর সেই কবিতাটা—
—কোনটা?
—যেটা রজতের বউকে শোনাবি বলে লিখেছিলি। তোর পকেটে ছিল তুই লজ্জা পাবি বলে আমি চেপে গেছি। ভূপতি আন্তরিকভাবে চাপা সুরে বলে।
—ওঃ! অনিমেষ বলে।
—বোঝা গেল রজত হাসল,—বেশ এবার পড়ো, পড়তেই হবে।
সুকুমার ভূপতি পাশাপাশি! মুখোমুখি রজত অনিমেষ দাঁড়িয়ে উঠে সুকুমারের পকেটের দিকে হাত বাড়িয়ে বলে,—বের করো।
সুকুমার চেয়ারসুদ্ধু পেছনে হেলল,—যা এটা কবিতা পড়ার জায়গা নয়, কে কখন উঁকি মারবে।
—বয়ে গেল—রজত ঠোঁট ওলটায়।
—পড়তেই হবে,—অনিমেষ বলে, আমাদের দাবি—
মানতে হবে,—ভূপতি হাসল। হেসে সুকুমারের কাঁধে হাত রাখল।
পকেট থেকে নিঃশব্দে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের করল সুকুমার। ভাঁজ খুলে তিনজনের দিকে তাকাল। হাসল।
—না, বসে বসে চলবে না,—অনিমেষ বলে,—উঠে দাঁড়াও।
—যাঃ এটা নাটক করবার জায়গা নয় সুকুমার বলল।
—আঃ এটা পরেশনাথের মন্দিরও নয়। মদের দোকানের লোকেরা ন্যাংটো মেয়ের নাচও দেখে। অনিমেষ বলে।
—লজ্জা কী? দাঁড়া না—রজত হাই তোলে।
—দাঁড়া। কিছু হবে না—ভূপতি হাসে।
সুকুমার উঠে দাঁড়ায়।
—অ্যাটেনশন প্লিজ। সুকু, জ্যাঠামশাই উঁকি মারলে ঘাবড়ে যেওনা;—অনিমেষ বলল।
সুকুমারের মুখটা সম্পূর্ণ লাল। ও তিনজনের দিকে তাকায়। অল্প আলোয় তিনজনের মুখ ঝাপসা—ঝাপসা ওয়াশ—এর ছবির মতন। সুকুমার একটু কেশে বলল—কবিতার নাম 'বন্ধুরা প্রবীণ হলে'।
তিনজন টেবিলের ওপর ঝুঁকল।
সুকুমার পড়ল,—বন্ধুরা প্রবীণ হল,
বন্ধুপত্নী হ'ল চৌকিদার,
সাতটায় বাড়ি ফিরে চলে,
না হলে ঘরের বন্ধ দ্বার।
অনিমেষ টেবিলে হাত চাপড়ে বলল,—ই—উ—নিক।
—ওকে পড়তে দে—ভূপতি সিগারেটে টান দেয়। রজত চুপ।
সুকুমার পড়ল,—এতদিন কাফে রেস্তারাঁয়।
ভ্রমর করিত গুঞ্জন—
যে স্বর্গ—স্বপ্ন—সুষমায়...
অনিমেষ অস্ফুট করে বলল—যে স্বর্গ—স্বপ্ন—সুষমায়।
রজত চোখ বুজে হেলান দিয়ে হাসল—চমৎকার! যে স্বর্গ—স্বপ্ন—সুষমায়। আবার পড়, কবি।
সুকুমার পড়ল,—যে স্বর্গ—স্বপ্ন—সুষমায়—
সে স্বর্গ এখন গৃহকোণ!
যে স্বর্গ—স্বপ্ন সুষমায়...এখন গৃহকোণ অনিমেষ আবৃত্তি করে হাসতে হাসতে বলল—তুলনা নেই—
—আস্তে। রজত বলে পড়তে দাও।
সুকুমার হাতের কাগজ থেকে চোখ ওঠাল। পরদা সরিয়ে বেয়ারা উঁকি দিল। বলল,—আউর কুছ, সাব?
—ওঃ, রজত সোজা হয়ে বসে বলল, চারটে ড্রাই জিন আর ফ্রেশ লাইম।
বেয়ারা চলে গেল।
—পড়। ভূপতি বলে।
সুকুমার পড়ল—
বালিশের ওয়াড়ে নাম লিখে।
বন্ধুপত্নী অবসর পেলে,
বন্ধুর পুঁজির নিরীখে
অসামান্য প্রেম দেন ঢেলে।
—আঃ, তুমি একজন পেসিমিস্ট কবি। অনিমেষ চোখ বুজে বলে।
—পড়তে দাও। রজত বলে।
সুকুমার পড়ল,—বন্ধু তাতেই খুশি হয়ে
দুই হাতে পেয়ে যান চাঁদ।
—কবি, ইউ আর ক্রুয়েল। দাউ স্ট্রিকেথ এ ড্যাগার ইন মি—
—আঃ ক্লান্ত কোরোনা—ভূপতি বলে।
—তারপর? রজত প্রশ্ন করে।
সুকুমার পড়ল, বন্ধুরা প্রবীণ ঘুঘু সব,
বন্ধুপত্নী ঘুঘুধরা ফাঁদ।
সুকুমার প্রায় হাঁপাতে হাঁপাতে বসল। ওর মুখটা লাল।
—কংগ্র্যাচুলেশনস—অনিমেষ সুকুমারের দিকে হাত বাড়ায়। সুকুমার একহাত দিয়ে ওর হাত ধরল, অন্য হাতে বিয়ারের গ্লাসটা তুলে নিঃশেষ করল।
—হুঁ—রজত তেমনি চোখ বুজে হেলান দিয়ে বলে—তোর আর একটা কবিতার লাইন মনে পড়ছে। 'চরিত্রগুণ মানিব্যাগে থাকে, জীবনটা অতি বাহ্য। মাথার খোঁপাটি খোঁপার মালাটি সবই তো চিতায় দাহ্য।' রজত একট হাসে।
—এ হ্যান্ডসাম পোয়েট। ভূপতি বলে।
—ওঃ—অনিমেষ বলে।
—কিন্তু আমি বিশ্বাস করি না। ভূপতি রজতের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,—তুমি সুকুমারের কবিতার স্টেটমেন্ট বিশ্বাস কর? তোমার মুখ থেকে শোনা যাক—যেটা সত্যি কথা—যা রিয়্যাল—
—ওয়েল—রজত হাসল।
—না, বল। ইউ হ্যাভ টু সে—ভূপতি উত্তেজিতভাবে বলল।
বেয়ারা পরদা সরিয়ে এল। করিডোরের উজ্জ্বল আলোর একটু আভাস ঘরে ঢুকল। চারটে গ্লাস সাজিয়ে রেখে বেয়ারা বেরিয়ে গেল। চারটে গ্লাস, প্লেটের ওপর কাটা লেবুর টুকরো, চামচ। জুঁই ফুলের গন্ধ।
—তুমি আনরিয়্যাল—ভূপতি সুকুমারকে বলল।
একটু আগে দাঁড়িয়ে কবিতা পড়ার জন্য সুকুমার লজ্জিত ছিল। এখন মুখ তুলল—বলল,—রিয়্যালিটি অনেকটা নগ্নতার মতো অশ্লীল। আমি ইমাজিনেশন দিয়ে তাকে এড়িয়ে যাই—
—কত আর পালাবে? ভূপতি প্রশ্ন করে।
—হুঁ, মনের দিক দিয়ে তোমার ন্যাংটো হওয়া দরকার। অনিমেষ বলে!
—কমপ্লিটলি নেকেড। ভূপতি রজতের দিকে তাকায়।
—বেশ,—সুকুমার বলে,—রজতকে বলতে দাও।
রজত জোরে হাসল,—নেভার বিন ইন সাচ এ জ্যাম বিফোর।
—অর্থাৎ? অনিমেষ প্রশ্ন করে।
—আমি অত ভাবি না—রজত সিগারেট ধরিয়ে বলে। ওর কথা অল্প এড়িয়ে যাচ্ছে।
—সুকু কবিতা লিখে আমাদের—অর্থাৎ আমরা যারা বিবাহোত্তর জীবনে প্রেম—বিবর্জিত এবং যারা অসামান্য প্রেমের জন্য উদ্বাহু বামন এবং যারা কোনো মহিলার,—এটুকু বলে অনিমেষ হিহি করে হাসল যেন ওর ইতিমধ্যেই নেশা হয়েছে, তারপর সামনে ঝুঁকে চাপা স্বরে বলল,—যারা কোন মহিলার নগ্নতায় অভিজ্ঞ, তাদের গাল দিয়েছে। নাউ প্লিজ ডিফেন্ড। বস্তুত ও খোঁপা, খোঁপার মালা এবং চিতার সংযোগে কি বোঝাতে চায় জানি না।
—আমি নিজের অভিজ্ঞতাকে জানি,—রজত অস্বাভাবিকভাবে হেসে বলল,—সেটা কিছুটা রিয়্যাল কিছুটা আনরিয়্যাল। যদি শুনতে চাও—
—অফকোর্স, শুনব। বল—ভূপতি গ্লাস তুলে চুমুক দেয়।
—বলব, তোমাদের কাছে বলব—রজত মাতালের মতো হাসল,—ওল্ডম্যান, ছেলেবেলা থেকেই আমার নগ্নতার সাধ। যা অনেকের কাছে বলা যায় না, ভেবেছিলাম তা বুলার কাছে বলা যায় না। যা বলতে চাই তাই সাজিয়ে বলা হয়ে যায়—
—ওটা স্বাভাবিক,—সুকুমার ভীত গলায় বলল গ্লাসের দিকে তাকিয়ে,—কিন্তু আমি আর শুনতে চাই না, আমরা মূল প্রসঙ্গ থেকে দূরে—
—আঃ,—অনিমেষ প্রায় ধমক দিল,—রজতকে বলতে দাও।
—রজতকে বলতে দাও,—ভূপতি মাথা নাড়ল,—আমরা ওল্ড ফসিল। ওর নিউ ব্লাড।
রজত শুরু করল। প্রথমে আড়ষ্ট। আস্তে আস্তে বলল...হুঁ, তারপর মনে হল আমি একজন ভিলেন। তদুপরি অন্ধকার আমাকে সাহস দিচ্ছিল। কিন্তু ওর চোখ দুটো আধ—বোজা চোখ দুটো বাতি জ্বেলে দেখতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু লজ্জা—সেটা প্রথম দিন। তোমরা জানো...কী গভীর ঘন শ্বাস যেন স্পর্শ করা যায়...
আঃ, প্লিজ প্লিজ—সুকুমার হাত বাড়িয়ে রজতকে ছুঁল।
রজত হাসল। তারপর গ্লাসে চুমুক দিয়ে ভাবল আড়ষ্টতা কেটে যাচ্ছে। গ্লাসটা নিঃশেষ করে রজত বুলার দেহের কয়েকটি বিচিত্র কারুকার্যের উপমা দিল।
—রজত? সুকুমার বলল। রজত ওর হাত সরিয়ে দেয়।
—আমাকে ন্যাংটো হতে দাও—রজত হাসল।
ওরা ভেবেছিল রজত থামবে। ভূপতি আর অনিমেষ বোকার মতো হাসল।
রজত বেছে বেছে কয়েকটি অশ্লীল শব্দ জিভে তুলে আনল। রজত বলতে লাগল এমনভাবে যেন বুলা ওর কেউ নয়।
সুকুমারের দুটো কান ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক শুনতে পেল। ওর চোখের সামনে বুলার ছবিটাকে যেন দু—হাতে নাড়া দিল রজত। সুকুমার ভাবল ওর যেন নেশা হয়েছে। রজত থামল না—
সুকুমার উত্তেজিত হয়ে বলল,—প্লিজ—প্লিজ, আমাকে একা হতে দাও, অনি—ভূপতি—প্লিজ—
—ইউ মাস্ট স্টপ। অনিমেষকে কেমন গভীর দেখাল।
—ইউ আর আউট—আউট টু—ডে। ভূপতি চেয়ারের শব্দ করে উঠে দাঁড়িয়ে রজতের কাঁধে হাত রাখে,—বি সিরিয়াস,—আমরা—
রজত হাসল,—আঃ—
—না, আর নয়—অনিমেষ বলল,—আর শুনতে চাই না।
বেয়ারা উঁকি দিল। বলল—সা'ব?
—ড্রিঙ্কস,—রজত হাসল,—চারটে হুইস্কি কিংবা রাম—
বেয়ারা মাথা নাড়ল,—দশটার পর ড্রিঙ্কস বন্ধ—
—ওঃ—রজত মার—খাওয়া বোকা ছেলের মতো অসহায়ভাবে তাকাল।
—কিছু চাই না,—সুকুমার বেয়ারাটাকে—যার মুখ ওর জ্যাঠামশাইয়ের মতো, তাকে বলল।
বেয়ারা পরদা নামালো, চলে গেল।
—আমরা এবার যাবো,—অনিমেষের মুখ চিন্তিত দেখায় যেন কোনো আকস্মিক আঘাতে নেশা কেটে যাওয়ার পর ও এখন ট্রেনের কথা ভাবছে!
—তার মানে—তা'হলে,—রজত সম্পূর্ণ মাতালের মতো হেসে বলল। তারপর উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করল।
—তা হলে? ভূপতি প্রশ্ন করে।
রজত উঠে দাঁড়িয়ে এমন বোকার মতো হাসল যে মনে হল তাকে কেউ অন্যায়ভাবে অপমান করেছে। হাসিটা মুখে রেখে বলল,—তাহলে স্বীকার করতে হবে সুকুমারের কবিতাটা মন্দ হয়নি, আর—
সুকুমার আর অনিমেষ উঠে দাঁড়িয়ে কি করতে হবে ভেবে না পেয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রজত আবার বোকার মতো হাসল সোজা হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করে টাল খেতে খেতে বলল,—আর তার মানে, আমাদের কারুর নিষ্পাপ নগ্ন মন নেই। নিষ্পাপ এবং নগ্ন—নেই—নেই—
বলতে বলতে ও দাঁড়াবার জন্য টেবিলের ওপর হাতের ভর দিয়ে ভারসাম্য রাখতে চেষ্টা করে আবার বসে পড়ল। বলল,—তা হলে সুকুমারের কবিতাটা মন্দ হয়নি।—ও ক্লান্তভাবে হেলান দিল। ওরা তিনজন দাঁড়িয়ে ওকে দেখতে থাকে যেন ওরা খুব অবাক হয়েছে।
রজতের মনে হল, কেউ ধরে না নিয়ে গেলে ওর পক্ষে বাড়ি যাওয়া অসম্ভব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন