পুতুলমাত্র

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

আচ্ছা, এই প্রাতঃকাল আর সায়ংকালের মধ্যে তফাত কী বলুন তো?

সকাল আর সন্ধে তো! তা সকালের সঙ্গে সন্ধের তো তফাত আছেই মশাই! হঠাৎ এই অদ্ভুত প্রশ্ন কেন?

না, এই কদিন ধরে তাই ভাবছি। সকাল মানে একেবারে যাকে প্রাতঃকাল বলে সেটা যেমন আবছা মতো, তেমনি সন্ধেবেলাটাও আবছা মতো। তাই একটা ধন্দে পড়ে জিজ্ঞাসা করলাম আর কি!

আশ্চর্য কথা! দুটোই আবছা মতো বলে কি তফাত নেই? একটা হল দিনের শুরু, আর একটা হল শেষ।

সে তো ঠিক কথাই।

তাহলে আপনার ধন্দ হচ্ছে কেন?

আসলে যেটা বলতে চাইছিলাম, দুটোর মধ্যে তফাত থাকলেও মিলও কিন্তু যথেষ্ট।

ওই আবছা মতো যা বললেন, ওটুকুই যা মিল।

আচ্ছা, আপনার কোনটা ভালো লাগে? ঊষা না গোধূলি?

কী মুশকিল! ভালো লাগা, না লাগার কথা উঠেছে কেন? আবহমানকাল সকাল আর সন্ধে হয়ে আসছে। ও আমাদের গা—সওয়া ব্যাপার। ভালো লাগলেও সই, না লাগলেও সই। আপনার সমস্যাটা কোথায় বলুন তো!

আমার যেন মনে হচ্ছে আপনি সাঁটে কিছু বলতে চাইছেন। অবিশ্যি আপনি এখন ইয়ংম্যান, সাতাশ—আটাশ বয়স, এই বয়সে ঊষা বা গোধূলি নিয়ে রোমান্টিক ভাবনা আসতেই পারে। চাই কি দু—ছত্তর কবিতাই হয়তো লিখে ফেললেন। আমাদের মতো ষাটোর্ধ্ব বয়সে আর রসকষ বিশেষ থাকে না কি না। প্রাতঃকাল হলেই নানা দুশ্চিন্তা। কোষ্ঠ পরিষ্কার হবে কি না, গিন্নির মুখ গোমড়া কি না। কাজের মেয়েটা আসবে কি না, বাজারে যেতে হবে কি না, সন্ধেবেলাতেই কি আর শান্তি আছে! ছেলে আর বউমা ক্লান্ত হয়ে চড়া মেজাজ নিয়ে অফিস থেকে ফেরে, গিন্নির বাতের ব্যথা চাগাড় দেয়, টিভিতে অখাদ্য বাংলা সিরিয়াল চালানো হয়। কোথাও শান্তি নেই মশাই।

আপনাকে দেখে কিন্তু আনহ্যাপি বলে মনে হয় না। বরং আপনার মুখে বেশ একটা তৃপ্তির ভাব আছে।

আপনি যে গবেট নন তা আমি অনেকদিন আগেই বুঝেছি। তা বলতে নেই, আমি খুব একটা আনহ্যাপিও নই। কিন্তু আপনার প্রবলেমটা কী বুঝতে পারছি না।

আমার এক এক সময়ে এক—একটা অদ্ভুত সমস্যা দেখা দেয়। এই যেমন এখন ওই ঊষা আর গোধূলি নিয়ে। আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না কোন বাক্সে আমার ভোটটা দেব।

ভোটাভুটির কী আছে মশাই! সকালও থাকুক, সন্ধেও থাকুক। আপনি চান বা না চান, ও দুটো তো ঘটতেই থাকবে। সকালে সকাল হবে, বিকেলে বিকেল।

ওখানেই তো প্রবলেম কি না কাকু!

আরে মশাই, প্রবলেমটার কথাই তো জানতে চাইছি। সকাল—সন্ধে নিয়ে আর কারও কখনো প্রবলেম হয়েছে বলে তো শুনিনি!

হয় কাকাবাবু, হয়। কী নিয়ে প্রবলেম হতে পারে না সেটাই আমি ভেবে পাই না। এই যে ঊষা আর গোধূলিকে নিয়ে প্রবলেম সেটা এত বিস্ময়কর যে, আমি ভারী কাহিল হয়ে পড়েছি।

বলেন কি ইয়ংম্যান, এই বয়সে লোকের প্রেম—ভালোবাসা নিয়ে প্রবলেম হয়, চাকরি নিয়ে প্রবলেম হয়, জেনারেশন গ্যাপের দরুন বাপ—মায়ের সঙ্গে প্রবলেম হতে পারে এ তো কখনো মাথায় আসেনি!

একটু কেটেছেঁটে বললেন কাকাবাবু। এছাড়া আরও হাজারটা বিষয় নিয়ে ইয়ংম্যানদের প্রবলেম হতে পারে, আপনারা যখন ইয়ং ছিলেন, তখনকার চেয়েও এ যুগে প্রবলেম আরও বেশি।

সে না হয় হল। কিন্তু আপনার প্রবলেমটা কিন্তু একটু বিটকেল মশাই। ব্যাপারটা একটু ভেঙে বললে হয় না?

যে আজ্ঞে। আপনি একজন সমঝদার মানুষ। আপনাকে বলাই যায়।

আমি একজন স্প্রিন্টার, বুঝলেন! আমি দৌড়োই। আর লং ডিসট্যান্স দৌড় আমার ভারী পছন্দের আইটেম।

তাই বলুন, স্পোর্টসম্যান, বাঃ খুব ভালো, তা অলিম্পিকে দৌড়োনোর ইচ্ছে আছে নাকি?

আজ্ঞে, কতদূর যেতে পারব তা তো জানি না। তবে আপতত ন্যাশনাল লেভেলে দৌড়োই। কিন্তু প্রবলেমটা দৌড় নিয়ে নয়। আমি একজন ন্যাচারাল অ্যাথলিট। কাজেই দৌড়ঝাঁপ নিয়ে মাথা ঘামানোর কিছুই নেই। আমি আপনাকে সকাল নিয়ে আমার প্রবলেমটার কথাটা আগে বলে নিতে চাই যদি আপনার কৌতূহল এখনও থেকে থাকে।

নেই মানে! একশোবার আছে। শুনছি, বলুন।

হ্যাঁ, আমি শৌখিন দৌড়বাজ নই। ফলে আমাকে হার্ডওয়ার্ক করতে হয়। রোজ খুব ভোরে, রাত সাড়ে তিনটেয় উঠে চারটের মধ্যে আমি বেরিয়ে পড়ি। মোটরবাইকে চলে যাই ময়দান। আমার ট্রেনার আছেন, অন্য অ্যাথলিটরা আছে। ওয়ার্ম আপ করে আমরা দৌড় শুরু করি। দশ থেকে বারো মাইল একটানা দৌড়।

বাপ রে! সে তো বিশাল পাল্লা মশাই!

হ্যাঁ, ওটা মিনিমাম। দৌড়োতে দৌড়োতে প্রায়ই আমরা যে যার বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। ওই একা একা দৌড়োতে দৌড়োতেই একদিন মেয়েটির সঙ্গে দেখা।

মেয়ে! তাই বলুন মশাই। এতক্ষণে বোঝা গেল।

সবটাই কি বুঝে গেলেন?

আরে না মশাই! অতটা নয়, তবে গল্পটা গড়াবে ভালো।

আজ্ঞে। তা সেই মেয়েটিও ময়দানে দৌড়োতে আসে। কিন্তু খুব সিরিয়াস স্প্রিন্টার নয়। গাড়ি থেকে নেমে একটু শৌখিন দৌড়াদৌড়ি আর কি, যেমনটা ফিটনেস ঠিক রাখতে বা মেদ ঝরাতে অনেকেই করে। আর মেয়েটা রোজই গাড়ি পার্ক করে অপেক্ষা করে। আমি কাছাকাছি পৌঁছোলেই সে প্রায় আমার পাশাপাশি দৌড় শুরু করে। তারপর আমি তাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যাই।

এ তো মাখো মাখো ব্যাপার মশাই! হ্যাঁ! তা মেয়েটা দেখতে শুনতে কেমন?

ভালো, বেশ ভালো, ধরুন পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি লম্বা, অ্যাথলিট, স্ট্রাইড ভালো।

আরে ওসব নয়। মুখশ্রী কেমন?

বোধহয় ভালোই, তবে বেশ বেশি ফরসা। মেম বলে ভুল হয়।

কথাটথা হয়েছে নাকি?

মাঝে মাঝে হাই হ্যালো, গুডমর্নিং, বাই বা জাস্ট হাই। আর এগোয়নি।

নামধাম?

আগে বিকেলের গল্পটা বলি।

বিকেলেও আছে নাকি?

আছে।

বলে ফেলুন, বলে ফেলুন।

এই যে বলি। আমার একটা ছোট ব্যবসা আছে। মূলধন খুব বেশি নয়। আমি ফুড প্রসেসিং করে বিক্রি করি। এ ব্যাপারে আমার খানিকটা পড়াশোনা আছে বলেই বিদ্যেটা কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। মাশরুমটা আমি নিজেই চাষ করি। আর কিছু সবজি কিনে প্রসেস করি। প্রোডাকশন বেশি নয় কিন্তু স্টেডি কাস্টমার থাকায় আমার ব্যবসাটা চলে। স্পোর্টস ছেড়ে দিলে ব্যবসাটায় পুরোপুরি মন দিতে পারব। আমার কারখানাটা বাইপাসের কাছে। বিকেলটা সাধারণত আমি সেখানেই কাটাই। রাত হলে অনেক সময়ে কারখানাতেই থেকে যাই। ঘটনাটা ওখানেই ঘটে। মোট বাইশ জন কর্মচারী আছে, তার মধ্যে আটজন মহিলা। শেষ যে মেয়েটি কাজে ঢুকেছে, সে ঢুকেছে মাত্র একমাস আগে। যখন সে চাকরির ইনটারভিউ দিতে আসে তখনই আমার সন্দেহ হয়েছিল। এই মেয়ে আমার ছোটো কারখানায় মাত্র সাত—আট হাজার টাকার বেতনে চাকরি করার মতো মেয়ে নয়। প্রথম কথা তার মুখ—চোখ দারুণ মায়াবী, কথাবার্তায় বড়োঘরের ছাপ এবং কাজেকর্মে একটু বেশি চটপটে। মাঝে মাঝে যখন ইংরেজি বলে ফেলে তখন তাতে কনভেন্টের অ্যাকসেন্ট থাকে। মেয়েটা কম্পিউটার হান্ডেল করে এবং অনলাইন ডিল সামলায়।

প্রবলেমটা কী?

সেটাই বুঝতে পারছি না। মেয়েটা যে আমার দিকে তাকায় বা চোরাচোখে আমাকে দেখে, বা ইশারা ইঙ্গিত করে, এমনও নয়। অথচ আমার কেবলই সন্দেহ হয় মেয়েটা শুধু চাকরি করতে আসেনি। শী ইজ আফটার সামথিং হুইচ আই ডোন্ট নো।

কিন্তু প্রবলেমটা কোথায় সেটাই তো বুঝতে পারছি না।

হ্যাঁ। আমিও পারছি না। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয় যে, সকালে ময়দানে যাকে দেখি সে, বিকেলে আমার কারখানায় যে কাজ করে সে—একই মানুষ। কিন্তু দু—জনকে সকালে আর বিকেলে কেন যে এত আলাদা মনে হয় সেটাই ভেবে হয়রান হয়ে যাচ্ছি। এরা কি সত্যিই একজন, না দু—জন? আমি কি চোখে ভুল দেখছি, না মনে ভুল ভাবছি। কখনো মনে হয় ওরা দু—জন, কখনও একজন। কী করা যায় বলুন তো!

আরে ইয়ংম্যান, ওটাই তো ইটারনাল প্রবলেম। বউয়ের সঙ্গে ত্রিশ বছর ঘর করছি, তিনি আসলে কে বা কেমন তা আজও বুঝতে পারিনি মশাই।

তাহলে কী করা যায় বলুন তো কাকাবাবু?

কিচ্ছু না মশাই, কিচ্ছু না, পুরুষদের কিছু করার থাকেও না। যা করার ওকেই করতে দিন। শুধু মনে রাখবেন আপনি পুতুলমাত্র।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%