দোলনা

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

লেখাপড়া হল ভারী গোলমেলে ব্যাপার, বুঝলে খুকি? কেন লেখাপড়া গোলমেলে ব্যাপার কেন?

গোলমেলে নয়? ইস্কুলেই দশ বারো বছর ধরে লম্বা পড়াশুনো, তারপর ধরো আরও পাঁচ সাত বছর লেগে যায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা স্কলার হতে। পরীক্ষার ফল নিয়ে সারাক্ষণ টেনশন, মুখ গুঁজে পড়া, মনে রাখা, পরীক্ষা দেওয়া। ওরে বাবা! আমার তো দম আটকে আসত।

কিন্তু আমি তো শুনেছি আপনার বাড়িতে সবাই খুব লেখাপড়া জানে!

ঠিকই শুনেছ। আমার দাদা দিদিরা বেশ লেখাপড়া করেছে বটে!

আর আপনি?

আমি! আমার কথা আর বোলো না। আমি তিনবার বাড়ি থেকে পালাই।

ওমা! কেন?

লেখাপড়ার ভয়ে। বই—খাতা দেখলেই যেন জ্বর আসত। বাবা শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে বললেন, তুই করবি কী? যা, চাষবাস করে খা গিয়ে।

সেই জন্যই বুঝি আপনি নিজে হাতে কোদাল নিয়ে লেগে পড়লেন।

ঠিক তা নয়। আসলে চাষবাস করার মতো আমাদের তো ভালো জমিই নেই। শুনেছিলাম এই মফস্সল শহরে আমাদের পুরোনো বাড়িটা পড়ে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। এখানে আমাদের তিন পুরুষদের বাস ছিল বলে বাবা সেন্টিমেন্টাল কারণে বাড়িটা বিক্রি করেননি। বাড়ির লাগোয়া বাগান আর পুকুর আছে বলে জানা ছিল। তাই ভাবলাম...

কী ভাবলেন?

ভাবলাম, যদি বাগান—টাগান কিছু করা যায়।

আপনাদের বাড়িটার খুব বদনাম আছে, জানেন তো!

তাই নাকি! বদনাম কেন বলো তো?

লোকে বলে ওটা ভূতের বাড়ি। আর ভূতে আমার যা ভয়। আমি সন্ধের পর আর কখনো আপনাদের বাড়িটার দিকে তাকাতাম না। বাবাকে কতবার বলেছি, চলো আমরা অন্য কোথাও বাড়ি করে গিয়ে থাকি।

হ্যাঁ হ্যাঁ, কথাটা আমিও শুনেছি। অনেকদিন ধরে ফাঁকা পড়ে আছে, তারপর যত্ন হয় না বলে দেওয়াল টেওয়াল ফেটে অশ্বত্থের গাছ গজিয়ে যাচ্ছেতাই ব্যাপার! আমার তো সাতদিন সময় লেগেছে বাড়িটা সাফ—সুতরো করতে।

একা থাকতে ভয় লাগে না?

না তো! ভয় কিসের?

আপনার অবশ্য ভয়ডর খুব কম। নইলে কি গোখরো সাপ ধরতে পারতেন! মা গো! কী করে ধরেন বলুন তো? ঘেন্নাও লাগে না?

আমাদের ভয় আসে আননোন থেকে। যা জানি না, চিনি না তাকেই যত ভয়। কিন্তু সাপকে একটু কাছ থেকে স্টাডি করলে দেখতে, ভয় করবে না।

ও বাবা! আমি ভয়ে মরেই যাব। কিলবিলে জিনিস দেখলেই আমি ভয় পাই। আচ্ছা, গত পনেরো দিনে আপনি ক—টা সাপ ধরেছেন?

আমাদের বাড়িটাতেই অনেকগুলো ছিল। বোধহয় তেরোটা। আর তোমাদের বাড়ি থেকে দুটো।

সাপগুলো কী করলেন? মেরে ফেলেছেন?

পাগল! সাপ টাপ মারতে নেই, দুনিয়াজুড়ে এত সাপ মেরে ফেলা হয়েছে যে, বেচারিরা এখন এক্সটিংক্ট হওয়ার মুখে। যারা সাপের বিষ বিক্রি করে তাদের দিয়ে দিয়েছি।

আপনাদের বাড়ির সামনের বারান্দায় দেওয়ালের গায়ে একটা মস্ত ভিমরুলের চাক ছিল। ঠিক যেন একটা মেটে কলসি কেউ উপুড় করে দেওয়ালে লাগিয়ে রেখেছে। এ পাড়ায় সবাই খুব ভয় পেত। ভিমরুল কামড়ালে নাকি লোকে মরেও যায়। সেটা কী করে ভাঙলেন? আপনাকে কামড়ায়নি?

ভিমরুল কামড়ায় না, হুল দেয়। আমাকে দুটো ভিমরুল হুল দিয়েছিল বটে। তবে ধোঁয়াকে খুব ভয় পায়। ধোঁয়া দিয়ে তাড়িয়েছি। তারপর ভেঙেছি।

হুল দিয়েছিল। আপনার লাগেনি?

আমার তো তেমন কোনো গুণ নেই। দু—একটা গুণ যা আছে তার মধ্যে একটা হল, আমি খুব ব্যথা সহ্য করতে পারি। ভিমরুল তো তবু ভালো, পুরোনো বাড়িটার দেওয়ালের ফাটলে কয়েকটা তেঁতুল বিছে ছিল। দু—রাতে দু—বার হুল দিয়েছে।

ওমা! বলেননি তো?

বলার কী আছে! বললাম না, আমি খুব ব্যথা সহ্য করতে পারি।

বিছেগুলো মারলেন তো?

না আমি সহজে পোকামাকড় মারি না। চিমটে দিয়ে ধরে ধরে কৌটোয় পুড়ে জঙ্গলে গিয়ে ছেড়ে দিয়ে এসেছি। মারব কেন বলো, পৃথিবীতে হয়তো ওদেরও প্রয়োজন আছে।

আপনি কিন্তু খুব অদ্ভুত লোক।

না খুকি, অদ্ভুত নয়, তবে একটু বোকা আছি ঠিকই।

আপনি বোকাই বা কেন বলুন তো?

সেইটেই তো বুঝতে পারি না। মাথায় কমা বলে আমার গায়ের জোর বেড়েছে। আমি ভাবি মাথায় যেটুকু কম আছে সেটুকু শরীরে খেটে পুষিয়ে দেব।

হিঃ হিঃ। আপনি একটা যাচ্ছেতাই লোক!

হ্যাঁ তো! আমার বাবা দাদারা আর দিদি সবাই ওকথা বলে। আমি নাকি ভদ্রসমাজের যোগ্য নই।

যাঃ, আমি কি তাই বললুম!

না। তুমি বলোনি। তুমি তো ভারী ভালো মেয়ে খুকি!

যাঃ! আমি আবার কিসের ভালো?

এই যে তুমি রোজ এসে তোমাদের বাগানের বেড়ার ধারে দাঁড়িয়ে আমার সঙ্গে কথা বলো, তাতে বুঝতে পারি তুমি মানুষকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করো না।

কিন্তু আমি আপনাকে একটুও পছন্দ করি না। আপনার ওপর আমার কিন্তু রাগ আছে।

ওই তো মুশকিল। আমাকে কেউই বিশেষ পছন্দ করে না। এই তো দেখলে না সেদিন অভয়বাবু আমাকে কেমন বকাঝকা করলেন সকলের সামনে! কিন্তু আমি তো কিছু করিনি। পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলছিলাম। কিন্তু ওরা তো নিয়ম করেই দিয়েছে আমি ব্যাটও করতে পারব না, বলও করতে পারব না। শুধু ফিল্ডিং। আমি তো তাই করছিলাম। কুট্টুর মারা একটা বল গিয়ে অভয়বাবুর জানালার কাচ ভেঙেছিল। আর অভয়বাবু এসে আমাকেই কত কী বললেন। ধেড়ে ছেলে কাণ্ডজ্ঞান নেই, শিং ভেঙে বাছুরের দলে...

আপনি কুট্টুর নাম বলে দিলেন না কেন? কুট্টু তো অভয়জেঠুর ভাগনে।

না বাবা, নাম বললে ওরা আমাকে আর খেলায় নেবে না।

হিঃ হিঃ। কিন্তু আপনার ওপর আমার রাগ অন্য কারণে। অনেকে বলে আপনি নাকি টেররিস্ট ছিলেন। অনেক নিরীহ মানুষকে মেরেছেন। আর তাই পুলিশের খাতায় আপনার নাম আছে। এমনকী টেররিস্টদের খতম তালিকাতেও আপনার নাম আছে ডেজার্টার বলে। আপনি মানুষ মেরেছেন ভাবলেই আমার রাগ হয়। হাসছেন কেন, এ কি হাসির কথা?

বোকাদের তো ওইটেই রাজলক্ষণ। যেখানে হাসির কথা হচ্ছে না সেখানেও বোকারা হাসে। কেন হাসছে তা না বুঝেই হাসে। এমনকী কারও মৃত্যুসংবাদ পেলেও দেখবে বোকা লোক দাঁত বের করে হাসছে।

জবাবটা কি এড়িয়ে যাচ্ছেন?

না খুকি। আসলে লম্বা কাহিনি তো!

আমি তো শুনতেই চাইছি।

বোরিং লাগবে কিন্তু। গুছিয়ে বলতে পারি না বলে মাঝে মাঝে কথার খেই হারিয়ে ফেইল কি না।

সেভাবেই বলুন না হয়।

আমার মেজদা একজন আইএএস অফিসার। বাড়ির আর কেউ আমার ওপর ভরসা না করলেও মেজদার আমার ওপর একটু মায়া আছে। ওই মেজদাই আমাকে খানিকটা শিখিয়ে পড়িয়ে প্রায় জোর জবরদস্তি করে একবার আইএএস পরীক্ষায় বসিয়েছিল। আমার বরাবর চাকরিকে ভীষণ ভয়। দশটা—পাঁচটা চাকরি করলে আমার ঠিক দম বন্ধ হয়ে আসবে। তবু মেজদার জোরাজুরিতে পরীক্ষা দিতে হল। তারপরই ভয় হল, যদি বাইচান্স আমার চাকরি হয় তাহলে তো ভীষণ মুশকিলে পড়ে যাব। তাই পরীক্ষার ফল বেরোবার আগেই আমি পালিয়ে জঙ্গলে চলে যাই।

পরীক্ষার ফল কী হয়েছিল?

অনেকদিন বাদে জানতে পারি খুব নীচে র‍্যাঙ্ক পেয়েছিলাম। কিন্তু তাতে আর কী লাভ হল! আমার ওসব পোষায় না। ওই জঙ্গলে গিয়েই আমি উগ্রবাদীদের দলে ভিড়ে যাই।

তারপর?

ওরা আমাকে সবরকম ট্রেনিং দিয়েছিল। জোট বেঁধে থাকতে বেশ লাগত কিন্তু। তারপর অ্যাকশন করতে যখন নামলাম তখনই বুঝতে পারলাম, আমি খুন টুন করতে পারছি না। একটা পুলিশের জিপে সাত—আটজন। পুলিশকে মারবার প্ল্যান ছিল। রাইফেল চালাতে গিয়ে নার্ভাস হয়ে আমি বমি করে ফেলেছিলাম। চোখের সামনে যখন আমার সঙ্গীরা গুলি চালিয়ে ওই সার্জেন্টকে মেরে দিল, তখন আমার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। ফলে আমাকে ওরা আর অ্যাকশনে পাঠাত না। রান্নার কাজে লাগিয়ে দিল।

আপনি রাঁধতেন বুঝি?

হ্যাঁ। কাঁধে রাইফেল ঝুলিয়ে আমি রাঁধতাম। কিন্তু রান্নার তো কিছুই জানি না। দ্বাদশী নামে একটা আদিবাসী মেয়ে একটু আধটু রাঁধতে জানত। সে—ই রাঁধত, আমি সাহায্য করতাম। জল ধরে আনা, মাংস কাটা, মশলা তৈরি করা, এইসব। বাজারহাটও করতে হত।

দ্বাদশীর বয়স কত?

কে জানে! আমার মতোই হবে হয়তো।

দেখতে কেমন, সুন্দর?

না। তেমন সুন্দর নয়। নাক থ্যাবড়া, কালো, পুরু ঠোঁট। তবে খুব খাটতে পারত।

খুব ভাব ছিল বুঝি তার সঙ্গে?

তা ছিল। সুখ—দুঃখের কথা হত। সংসারে বড্ড অভাব ছিল দ্বাদশীর। সেইসব কথা বলত। সেই আমাকে সাপ ধরতে শিখিয়েছিল। অবশ্য সাপ ধরে তখন সাপের মাংস খাওয়া হত। ছুঁচো, ইঁদুর, খরগোশ, সজারু, এমনকী বকের মাংস অবধি খেতে হয়েছে তখন।

এঃ মা গো! বমি আসত না?

খুব খিদে পেলে আর বমি টমি আসে না। বুঝলে খুকি? খিদে যে কী জিনিস তা তো জানো না!

দ্বাদশীর সঙ্গে কি আপনার কোনো সম্পর্ক হয়েছিল?

ও বাবা, তুমি খুব বিচ্ছু আছো তো!

বলুন না! হয়েছিল? অমন গম্ভীর হয়ে গেলেন কেন?

জঙ্গলের জীবনে কত কী হয়। সেসব মনে না রাখাই ভালো।

না না, বলুন।

মেয়েদের স্কোয়াড আর ছেলেদের স্কোয়াড তো পাশাপাশিই থাকত। তাই অনেক সময়ে ভাব ভালোবাসাও হত। তবে সে ঠিক স্বাভাবিক যুবক যুবতীদের মতো তো নয়। সব কমিটমেন্ট, ডিসিপ্লিন বজায় রাখতে হত তো। আর মৃত্যুর তো কোনো দিনক্ষণও ছিল না। হাওয়া—বাতাস, পাতা নড়ার শব্দ, পাখির ডাক, কুকুরের চিৎকার, সবকিছুর মধ্যেই থাকত নানা সংকেত, সতর্কবার্তা। এত অ্যালার্ট থাকতে হত যে, রোমান্স টোমান্স ছিল স্বপ্নের মতো। বুঝলে খুকি?

কিন্তু আপনার সঙ্গে দ্বাদশীর?

এই তো বললাম, ওই জীবনটাই ছিল অ্যান্টি রোমান্টিক, কমিটেড। দ্বাদশী শুধু একদিন আমাকে বলেছিল, তুই অমন ভিখারির মতো আমার দিকে চেয়ে থাকিস কেনে? লুটমার হয়ে যাবি। সাবোধান!

এ আবার কেমন কথা?

সেটা আমিও বুঝতে পারিনি। তবে ভেবে ভেবে পরে মনে হয়েছে এটার মধ্যে বোধহয় একটা ভালোবাসার বার্তা ছিল।

আপনি বুঝি দ্বাদশীর দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকতেন?

না খুকি। চেয়ে থাকা অন্য জিনিস। আর চাইব কখন, সারাক্ষণ তো কাজ করতে হত, চারদিকে নজর রাখতে হত। একসঙ্গে অতগুলো লোকের রান্নাও তো কম ব্যাপার নয়।

তবে দ্বাদশী বলল কেন?

কী জানি!

তারপর কী হল?

শুনলে আমার ওপর তোমার ঘেন্না হবে।

ওমা! কেন? কী করেছিলেন আপনি?

অনেক সময়ে কাছাকাছি পুলিশ আসত রেড করতে। আড়কাঠি খবর দিত পুলিশ অ্যালার্টের। তখন আমাদের রান্না বন্ধ রাখতে হত। কারণ আগুন জ্বাললে তার ধোঁয়া পুলিশকে সংকেত দেবে। অনেক সময়ে চেলা কাঠের উনুন নিবিয়ে ফেলতে হয়েছে। সেদিনও পুলিশ অ্যালার্ট দিল। আমরা উনুন জ্বালিনি। দুজনেই—আমি আর দ্বাদশী রাইফেল হাতে ডেরা আগলে আছি। বাকিরা এনকাউন্টারে গেছে। দূর থেকে গুলির আওয়াজও পাচ্ছিলাম। এমন সময় ঘুঘু পাখির ডাক জানান দিল পুলিশ ডেরার দিকে আসছে। আমাদের সামনে মাটি আর পাথর দিয়ে উঁচু ব্যারিকেড করাই ছিল। আমরা দুজন তার আড়ালে উপুড় হয়ে শুয়ে রাইফেল বাগিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। পুলিশ যদি সংখ্যায় বেশি হয় তাহলে আমাদের আশা নেই। মরতেই হবে।

পালালেন না কেন?

একেবারে আমার মনের কথা বলেছ? আমি চাপা গলায় দ্বাদশীকে বললাম, দ্বাদশী পালাবি? লড়ে তো লাভ হবে না, মরতে হবে। দ্বাদশীর চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরে আসছিল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল, পালাব কেনে?

আপনি কী করলেন?

আমি জন্মগতভাবে কাপুরুষ। হঠাৎ আমার মনে হল, আরে আমি তো এদের আইডিয়াকে তেমন বিশ্বাসও করি না। শুধু চাকরির হাত থেকে বাঁচার জন্য গা—ঢাকা দিয়ে থাকতে ভিড়ে গিয়েছিলাম। তাহলে আমি মরতে যাব কেন? এই লড়াই তো আমার লড়াই নয়। আমি কিসের জন্য প্রাণ দিতে যাচ্ছি? পুলিশ যে আসছে তা গাছপালার নড়াচড়া থেকে টের পাচ্ছিলাম। একটু দ্বিধাও ছিল। পালাব? কাপুরুষ মনে হবে না নিজেকে? তবে আমি তো আসলে কাপুরুষই। পৃথিবীতে বেশিরভাগ লোকই তো কাপুরুষ। পুলিশ খুব কাছাকাছি এসে পড়েছিল। হঠাৎ দ্বাদশী গুলি চালাতে শুরু করে দিল। আর আমি হামাগুড়ি দিয়ে পিছু হটে গাছগাছালির আড়ালে গিয়ে প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম। রাইফেলটা সঙ্গে ছিল কিছুক্ষণ। তারপর একটা ছোট নদী পেরোনোর সময় সেটা জলে ফেলে দিই। পালানোর সময় দূর থেকেও অনেকক্ষণ দু—পক্ষের গুলির আওয়াজ শুনেছি। দ্বাদশী সহজে হার মানেনি। অনেকক্ষণ লড়েছিল। পরদিন খবরের কাগজে তার মৃত্যুসংবাদ পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল খুব।

আপনি দ্বাদশীকে নিশ্চয়ই ভালোবেসে ফেলেছিলেন!

ভালোবাসা যে কত রকমের আছে খুকি, তার তো হিসেব নেই। এটাও একরকম ভালোবাসাই ছিল বটে। তবে ঠিক কীরকম তা আজও বুঝে উঠতে পারিনি।

আমি কিন্তু বুঝতে পেরেছি।

বটে! এই চোদ্দো পনেরো বছর বয়সে কি আর ভালোবাসার রকম সকম বোঝা যায়।

চোদ্দো—পনেরো! আমার সতেরো প্লাস। আর তিন মাস পরে আমি ভোট দেব, তা জানেন? আর আপনিই কোন বুড়ো মানুষ? যতদূর জানি আপনার এখন সাতাশ।

আঠাশ।

তাহলে অমন বুড়োদের মতো হাবভাব কেন আপনার?

আসলে কি জানো খুকি, মানুষ তো শুধু বয়সেই বুড়ো হয় না, অভিজ্ঞতাতেও হয়।

আচ্ছা, পালানোর পর কী হল সেইটে বলুন।

জঙ্গল থেকে পালিয়ে দুটো বিপদ আমার পিছু নিল। বুঝলে! এক হল পুলিশ আর গোয়েন্দা। আর হল আমার দলের লোক। দলের লোকরা বুঝতে পারল, দ্বাদশীকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই আমি করিনি। হাতে রাইফেল থাকা সত্ত্বেও গুলি চালাইনি এবং একজন কমরেডকে মরতে দিয়ে জান বাঁচাতে পালিয়ে গেছি। ওই এলাকায় থাকলে আড়কাঠি মারফত তারা ঠিকই আমার খবর পেয়ে যেত। তাই আমি পালিয়ে যাই অসমে। কোকরাঝাড়ে আমার এক বন্ধুর কাছে।

আর আপনার আইএএস—এর চাকরি?

হ্যাঁ, অ্যালায়েড সার্ভিসে আসার ভাগ্যে একটা ভদ্রস্থ চাকরিও জুটেছিল বটে, কিন্তু সেটা থেকে আত্মরক্ষা করার জন্যই তো আমাকে এত কিছু করতে হয়েছিল। মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়ার পর আমি বাড়িতে ফিরে আসি। বাবা আমাকে প্রায় ত্যাজ্যপুত্র করে দিয়েছিল।

আপনার টেরোরিস্ট কমরেডরা কি এখনও আপনাকে খতম তালিকায় রেখেছে?

কে জানে? তবে ওসব দল মাঝে মাঝে ভেঙে যায়, নতুন নতুন ফ্র্যাকশন তৈরি হয়। কর্মসূচিও পালটায়। তা ছাড়া এক জায়গায় বেশিদিন থাকে না কেউ। ঠিকানা বদলাতে হয়। অনেকে জঙ্গল ছেড়ে সাধারণ জীবনে ফিরেও যায়। ফলে চার পাঁচ বছর আগেকার খতম তালিকা আর এতদিন বহাল আছে বলে মনে হয় না। কমরেডরা অনেকেই মারাও গেছে এনকাউন্টারে। না খুকি, আমি বোধহয় নিরাপদ। কিন্তু এই নিরাপদে থাকাটা আমার ভালো লাগে না। একটা অপরাধবোধ কাজ করে। দ্বাদশীর বয়স তখন মাত্র তেইশ—চব্বিশ। শক্তপোক্ত মেয়ে তরতাজা। সেই মেয়েটি যেভাবে পুলিশের মুখোমুখি একা লড়ে গেল ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। মাঝে মাঝে নিজেকে ঘেন্নাও হয়। কেন যে পালাতে গেলাম! না হয় মরতাম, সেটা আর এমন কী ব্যাপার!

আমার তো মনে হয় আপনি ঠিক কাজই করেছেন। আপনি একটু অদ্ভুত আছেন ঠিকই, তবে ওরকমভাবে মরাটাও কোনো কাজের কথা নয়।

ভাল করলাম, না খারাপ করলাম তাই নিয়ে আমার মনে একটা দ্বন্দ্ব কিন্তু এখনও আছে।

আপনি একটুও খারাপ কাজ করেননি।

দ্বাদশীর গায়ে ছত্রিশটা বুলেট ঢুকেছিল। একজনকে মারতে একটা গুলিই তো যথেষ্ট। বাকি পঁয়ত্রিশটা রাগ আর ঘেন্না থেকে করা।

দ্বাদশীর হাতেও তো নিশ্চয়ই কেউ মারা গিয়েছিল।

হ্যাঁ। দু'জন সেই এনকাউন্টারে। আগে আরও ডজন খানেক।

তাহলে ভাবুন, সেই লোকগুলোরই বা কী দোষ?

সেই তো। দোষ যে কার তা ভেবেই পাই না।

টেররিস্ট গ্রুপের কথা তুলে আমি বোধহয় আপনার মনটা খারাপ করে দিলাম।

আরে না। জীবনে কত কিছু হয়।

আচ্ছা, আপনি চাকরি করবেন না বুঝলাম। কিন্তু তাহলে আপনি করবেনটা কী? আমার দাদা বলছিল, আপনার নাকি ছেলেবেলা থেকেই পুরুত হওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল? সত্যি?

হাঃ হাঃ। হ্যাঁ সত্যি। আসলে আমাদের বাড়িতে বিরূপাক্ষ শাস্ত্রী নামে একজন পুরোহিত পুজো করতে মাঝে মাঝে আসতেন। খুব তেজী মানুষ। জীবনে মিথ্যে কথা নাকি উচ্চারণ করেননি। কিন্তু শাস্ত্রপাঠ করতেন। আর সব মন্ত্রই তাঁর ঠোঁটস্থ, কখনও বই পড়ে মন্ত্র উচ্চারণ করতেন না। তাঁকে দেখে খুব ওইরকম হওয়ার ইচ্ছে হত।

মাগো? চালকলার পুরুতঠাকুর!

কেন, খারাপ কী? হ্যাঁ, একটা কথা অবশ্য ঠিক যে, এই প্রফেশনটায় তেমন সচ্ছ্বলতা নেই।

নেই—ই তো? তাহলে পুরুত হওয়া হয়নি তো আপনার?

একেবারে হয়নি তা কিন্তু নয়। আমি লক্ষ্মীপুজো, সরস্বতী পুজো দিব্যি করতে পারি। ভূত প্রেত বা হোর তাড়ানোর মন্ত্র জানি।

আপনি না ভীষণ বিচ্ছিরি একটা লোক!

তা তো ঠিকই। নানা অ্যাঙ্গেল থেকে আমিও নিজেকে ভেবে দেখেছি, আমি সত্যিই একটা বিচ্ছিরি লোক। আমার এক পিসি আছেন, খুব ভালোবাসেন আমাকে। মাঝে মাঝেই বাঙাল ভাষায় বলেন, ওরে পোড়াকাইল্যা, তুই এমন দামড়া হইলি কেমনে?

হিহি। দামড়া মানে কী?

যার বয়স হয়েছে কিন্তু বুদ্ধি পাকেনি।

তাহলে আপনি কী করবেন বলুন তো?

ওই তো দেখতে পাচ্ছ, আমাদের বাড়ির সঙ্গে এক বিঘারও বেশি একটা জমি আমি নিজের হাতে কোদাল দিয়ে কয়েকদিন ধরে কুপিয়ে মাটি চৌরস করেছি।

দেখলাম তো! কাজটা লোক লাগিয়েই করাতে পারতেন। আমরা তো বাগান কোপানোর জন্য লোক রেখেছি।

তাতে মাটির সঙ্গে ভাব হত না।

মাটির সঙ্গে ভাব! সে আবার কী?

লোক দিয়ে করালে কি ওই জমিটার সঙ্গে আমার ভাব ভালবাসা হত? আমি রোজ কোদাল চালাতে চালাতে মাটির সঙ্গে কত কথা বলতাম জানো?

কী বলতেন শুনি?

আগে হাতজোড় করে একটা পেন্নাম, তারপর কোদাল চালাচ্ছি বলে ক্ষমা চাওয়া, আর কোদাল চালাতে চালাতে নানারকম মন ভোলানো কথা।

মন্ত্র তন্ত্র নাকি?

আরে না। এমনি যা মনে আসে বলি। তোমরা যেমন বন্ধুদের সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে, বাবার সঙ্গে কথা বলো তেমনই।

ওমা। কিন্তু তাতে কী হয়?

হয়তো কিছুই হয় না। কিন্তু আমার মনে হয় ফ্রেন্ডশিপ হয়। একটা আত্মীয়তা হয়। হাসছ। আমি জানি অনেকে আমাকে পাগলও বলে।

হিহি। আপনার বীরত্ব আমরা আড়াল থেকে রোজ দেখি। আমি আর মা। মা কী বলে জানেন? বলে, আহা রে, কী খাটুনিটাই না খাটছে! ওর নিশ্চয়ই খিদে পায়। কী ছাইভস্ম খায় কে জানে, একদিন ডেকে এনে ভালো করে খাওয়াতে ইচ্ছে করে।

পান্তাভাত কিন্তু ছাইভস্ম নয়। পান্তাভাতের দারুণ ক্ষমতা।

তাই বুঝি! ভাত তো শুধু কার্বোহাইড্রেট মশাই!

আমি অবশ্য সায়েন্স জানি না। তবে পান্তাভাত খাই বলে আমি গায়ে বেশ জোর পাই।

মাংস খেলে আরও জোর হবে।

কে খাওয়ায় বলো। সারাদিন মাটি কুপিয়ে আর রান্নার সময় পাওয়া যায় না। মাসিমা বুঝি সত্যিই একদিন খাওয়াবেন আমাকে?

আপনি বেশ পেটুক আছেন, না?

তা আছি।

আহা, অমন লজ্জা পাচ্ছেন কেন? আপনার পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের একটু লতাপাতায় আত্মীয়তাও তো আছে।

হ্যাঁ। তবে শেষ দিকে কী একটা গোলমালও হয়েছিল যেন।

হ্যাঁ, আপনাদের পরিবারের কে যেন আমার এক পিসিকে নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। তাই নিয়ে অশান্তি।

হবে বোধহয়। আমাদের এক জ্যাঠা মধুসূদন ব্যানার্জি, তারা এখনও বেশ সুখেই আছেন। চার ছেলেমেয়ে। ওঁদের বিয়ে তো হতেই পারত। তা নিয়ে অশান্তি কেন?

কে জানে। ওসব নিয়ে এখন আর কোনও আলোচনা হয় না। লোকে ভুলেই গেছে।

যাক, বাঁচা গেল।

আপনি তাতে হাঁপ ছাড়লেন কেন?

ভাবছিলাম, পুরোনো ঝগড়ার জেরে মাসিমার নেমন্তন্নটা বাতিল হয়ে গেল নাকি।

উঃ, কী পেটুক রে বাবা! কে রোজ রোজ পান্তাভাত খেতে আপনাকে মাথার দিব্যি দিয়েছে বলুন তো? মা তো সেই প্রথম দিনেই আপনাকে বলেছিল, ও বাবা সত্যজিৎ, যে ক—দিন থাকবে এ বাড়িতেই খেয়ো। বলেনি বলুন তো!

হ্যাঁ, তখন ভারি লজ্জা হয়েছিল। রোজ কি কেউ কারও বাড়িতে খেতে পারে?

পেটে খিদে মুখে লাজ?

হ্যাঁ হ্যাঁ, অনেকটা তাই।

কী বোকা লোক রে বাবা, আবার স্বীকারও করে নিচ্ছেন যে, আপনার পেটে খিদে মুখে লাজ? এরকম হাসছেন কেন?

এই যে তুমি ধরে ফেললে যে, আমি একটু পেটুক আর হ্যাংলা তাতে আমার কিন্তু এখন সত্যিই একটু লজ্জা—লজ্জা করছে।

ওমা! তাই তো! আপনার মুখটা যে সত্যিই লজ্জায় বেশ রাঙা দেখাচ্ছে।

আমি সত্যিই খুব লজ্জিত ফিল করছি।

আহা রে! আচ্ছা আপনার আছেটা কী বলুন তো! রোজ দেখি একটা অ্যালুমিনিয়ামের কানা উঁচু গামলার মতো জিনিসে পান্তাভাত মেখে গাছতলায় বসে খাচ্ছেন। গাছতলায় বসে খাওয়া কি ভাল? ওপর থেকে যদি পাখিতে পটি করে দেয়?

হ্যাঁ সেটা তো হতেই পারে। তবে ওখানে বসে যখন খাই তখন দেখো অনেক পাখিটাখি চলে আসে, কাছাকাছি ঘুর ঘুর করে, দুটো নেড়ি কুকুরও এসে বসে থাকে। ভাগ বাটোয়াঁরা করে খেতে ভারী ভালো লাগে।

মা রোজ বলে, দ্যাখ ছেলেটা কেমন দীনদরিদ্রের মতো বসে খায়!

মাসিমার বড্ড মায়া, না?

মায়া আরও অনেকেরই আছে মশাই, শুনুন, আপনি তো বেলা দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে খান?

ওরকমই। আমি তো আর ঘড়ি ধরে খাই না। যখন খুব চনমনে খিদে পায় তখনই বসে যাই।

আপনার সারাদিনের রুটিন আমাদের মুখস্থ। আবার ভাববেন না যে, আপনার ওপর গোয়েন্দাগিরি করা হচ্ছে।

আরে না। আমাকে যে লক্ষ করা হচ্ছে এটাই তো আমার পক্ষে বিশাল একটা পাওনা। নইলে এ যুগে কে কাকে লক্ষ করে বলো তো।

বুঝলাম। বলছিলাম কি আমাদের কালিদাসীমাসিকে কি চেনেন?

চিনব না কেন? উনি তো আমাকে রোজ জিজ্ঞেস করতেন, ও দাদাবাবু আজ কী রাঁধলে গো! আমার জবাব শুনে মোটেই খুশি হতেন না। বলতেন, অত গতরপাত করছ, মেটুলি টেটুলি খেয়ো নইলে যে টিবি হবে।

এঃ মা, বলেছে ওই কথা।

আহা, ভালো ভেবেই তো বলেছে। কিন্তু হঠাৎ কালিদাসীমাসির কথা উঠল কেন?

ওর রান্না খুব খারাপ। কিন্তু মা তো বাতের ব্যথায় অচল, রাঁধতে পারে না, আমাদের ওই কালিদাসীমাসির হাতের অমৃতই খেতে হয়। তাই বলছিলাম, এখন মোটে এগারোটা বাজে, বেলা বেশি হয়নি। বারোটা নাগাদ আমি আপনাকে মাছের ঝোল পৌঁছে দিয়ে আসব। জিভ কাটলেন যে।

আরে না, ওসবের দরকার নেই।

এই জন্যই আপনাকে আমার একটুও পছন্দ হয় না। আপনি কেমন যেন একটা লোক।

আহা, তোমাদের ভাগে কম পড়বে না?

কম পড়বে। আমাদের বাজার কে করে জানেন? আমার মনাজ্যাঠা। কাঠ—বাঙাল লোক, খাওয়া ছাড়া কিছু বোঝে না। যেখানে আধকিলো মাছে আমাদের ভেসে যায় সেখানে জ্যাঠা দু—তিন কিলো নিয়ে আসে। ফেলে ছড়িয়ে খেয়েও বেশি হয়।

সে তো বুঝলুম। কিন্তু একদিন ভালমন্দ খেয়ে আর কী লাভ বলো। কাল থেকেই তো ফের লেবুপাতা, লঙ্কা আর নুন।

ও বাবা! বোকা হলেও সেয়ানা তো কম নন আপনি! রোজকার বন্দোবস্ত করতে চান বুঝি?

আরে না না, তুমি ভুল বুঝছ।

থাক আর সাফাই গাইতে হবে না। আপনি বলার ঢের আগেই মা ঠিক করে রেখেছে রোজ আপনার জন্য মাছ তরকারি পাঠাবে।

সেটা খুবই দৃষ্টিকটু হবে খুকি। ছিঃ ছিঃ, আমার আর মান সম্মান রইল না।

কেন শুনি! মান গেল কিসে?

ও তুমি বুঝবে না। এখন আমার ভারি অনুতাপ হচ্ছে খুকি!

অনুতাপ হচ্ছে তো হোক। পেট জুড়োলে অনুতাপও জুড়িয়ে যাবে। আচ্ছা আপনি কি জানেন যে, আপনাদের ওই মস্ত জামগাছটায় আগে একটা দোলনা টাঙানো ছিল।

জানি।

সেটা কী হল?

দড়ি ছিঁড়ে গেছে, তবে পিঁড়িটা আছে।

দোলনাটা আবার টাঙাবেন?

কেন বলো তো?

আমার খুব ইচ্ছে করছে আপনি যখন খেতে কাজ করবেন, ফসল যখন ফলবে, তখন দোলনায় দুলতে দুলতে আমি দেখব।

কী দেখবে খুকি?

একটা কিম্ভূত লোককে, আর তার ফলানো ফসলকে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%