ভূতের গল্প

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

মল্লিকা সেন। মল্লিকা সেন!

অনেকক্ষণ ডাকাডাকির পর মজা খালের পাশে অত্যন্ত ঘন কাঁটাঝোপের ভিতরে অবস্থিত শ্যাওড়া গাছটি সামান্য দুলে উঠল। একটা বিদঘুটে হাওয়া দিল উত্তর দিক থেকে। সন্ধ্যার আবহাওয়া আরও গাঢ় হল। কুয়াশা জমাট বাঁধতে লাগল চারপাশে। আমি একা।

হাওয়ার শব্দের ভিতর থেকে একটা ফিসফিস শুনতে পাই, আপনি আমাকে ডাকছিলেন?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

আমার গল্প কি সবাই শুনতে চাইছে?

চাইছে।

আমাকে খুন করেছিল আমার স্বামী। এ খবর তো সব কাগজে বেরিয়েছে। আপনি নতুন কী জানতে চাইছেন?

আজকাল স্বামীরা প্রায়ই স্ত্রীদের খুন করে থাকেন মল্লিকা সেন। গল্পটা বড্ড পুরোনো হয়ে গেছে। আমি একটু নতুন অ্যাঙ্গেল চাইছি।

এ গল্পের নতুন অ্যাঙ্গেল কিছু নেই। পুরুষশাসিত সমাজে এরকমই বারবার ঘটবে। আপনাদের কাগজে আমার খবরটা হেডিং কী ছিল বলুন তো!

মল্লিকা ঝরে গেল।

বাঃ! বেশ হেডিং। এরকম কত জুঁই, মল্লিকা, বেলি ঝরে যাবে তার কি হিসেব আছে।

অর্জুন সেন লোকটা সম্পর্কে আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি, তেমন খারাপ লোক নয়। কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। অ্যাজ এ ইয়ংম্যান লোকটা ছিল দারুণ ব্রাইট, অত্যন্ত বন্ধুবৎসল এবং আড্ডাবাজ। লোকের উপকার—টুপকারও করত! এ সব কি সত্যি?

বাজে কথা। ও ছিল হৃদয়হীন নিষ্ঠুর, কর্তব্য—উদাসীন।

পাড়া—প্রতিবেশীরা অনেকেই বলেছে, আপনাদের সংসারে শান্তি ছিল না ঠিকই, কিন্তু সেইজন্য দায়ী অর্জুন সেন নন।

আপনারা কি পাড়া—প্রতিবেশীদের বিশ্বাস করছেন?

কাকে বিশ্বাস করব তা বুঝতে পারছি না। আমি যখন ভিকটিম তখন আমার চেয়ে সত্যি কথা আপনাকে কে বলবে?

তা অবশ্য ঠিক। তবে সেনবাবু যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে সে বলেছে, আমি বিয়ের পর থেকেই সব স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলতে থাকি। প্রথমে আমার স্ত্রী বন্ধুদের কাছ থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করেন, আড্ডা বন্ধ করে দেন, বাইরে বেরোনোর ওপর নানারকম বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকেন। শেষপর্যন্ত আমাকে আমার যৌথ পরিবার থেকেও নানা প্ররোচনা দিয়ে উনি বের করে আনেন। যোধপুর পার্কের পৈতৃক বাড়ি থেকে আমি চলে যাই টালিগঞ্জের ভাড়াটে বাসায়। আমার একটি মেয়ে হয়। আমি তাকে আকণ্ঠ ভালোবেসে ফেলি। আমার সেই দুর্বলতা লক্ষ্য করে আমার স্ত্রী তার সব দায়—দায়িত্ব আমার ঘাড়ে গছাতে শুরু করেন অত্যন্ত সুকৌশলে। এমনকী রাত্রিবেলা আমার বাচ্চা বিছানায় পেচ্ছাপ করলেও কাঁথা বদলানোর জন্য উনি উঠতেন না। মেয়ে কাঁদত। সুতরাং আমাকেই সে কাজের ভার নিতে হয়। ক্রমে আমি মেয়েকে ঝিনুক বাটিতে দুধ খাওয়ানো পর্যন্ত শিখে যাই।

বাপেরা কি কিছুই করবে না ছেলেমেয়ের জন্য? শুধু মেয়েরাই করবে? বাচ্চা কি তার একার?

তা অবশ্য নয়।

শুনুন আমি সদ্য খুন হয়েছি। আমাকে খুন করেছে ওই বদমাশ, লম্পট, হৃদয়হীন লোকটা। বাংলার নারী সমাজ ওর ওপর ভীষণ ক্ষেপে আছে। আমার ভাবমূর্তি এখন খুবই উজ্জ্বল। এ সময়ে ওই লোকটার উলটো—পালটা বিবৃতিতে বেশি কভারেজ দিয়ে আপনারা আমার ভাবমূর্তিটা দয়া করে নষ্ট করবেন না।

ঠিক আছে। কিন্তু আমাকে নতুন একটা অ্যাঙ্গেল দিন।

বললাম তো, নতুন অ্যাঙ্গেল বলে কিছু নেই। তবে আমি স্বীকার করছি, অর্জুন সেন নামক ওই খুনি লোকটা তার মেয়েকে খুবই ভালোবাসত। এবং মেয়েটিও তাকে?

হ্যাঁ। আমার মেয়েও বাপের খুব ন্যাওটা ছিল। কিন্তু সে আমাকেও ভালোবাসত।

আপনাদের ছোট পরিবারে একটা লাভ ট্র্যাঙ্গল ছিল, একথা কি বলা যায়?

নাঃ নাঃ! তা ঠিক নয়। আমি হিংসে করতাম না।

কিন্তু অর্জুন সেন বলছে, মেয়ে একটু বড় হওয়ার পর আপনি নানা সময়ে তার কাছে স্বামী সম্পর্কে এমন সব কথা বলতেন যাতে ওই শিশুর মন তার বাপের ওপর বিষিয়ে যায়।

মিথ্যে কথা। এসব খবরদার লিখবেন না। আমি মেয়েকে যা বলতাম তা একটুও বানিয়ে বলতাম না। ওর বাপ সম্পর্কে ওর একটা ভুল ধরনের উঁচু ধারণা তৈরি হচ্ছিল। সত্যর খাতিরে আমি সেই ভুলটা ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করতাম মাত্র।

আপনি কি সে কাজে সফল হয়েছিলেন?

খানিকটা।

আমি একটু গলা খাঁকানি দিয়ে সংকোচের সঙ্গে বললাম, আপনাদের সেক্স লাইফ সম্পর্কে কিছু বলবেন?

মল্লিকা সেনের প্রেতাত্মা খিলখিল করে হেসে ওঠে, সেক্স বলে ওর কিছু ছিল নাকি?

ছিল না?

নপুংসক বলা যায়। সেইটেই আমাদের অশান্তির আর একটা কারণ। এ ব্যাপারটার জন্যও আপনি অর্জুন সেনকেই দায়ী করছেন তো?

পুরোপুরি।

আপনার কোনোরকম শীতলতাও ছিল না তো!

মোটেই নয়।

অর্জুন সেন বলেছে, সেক্সের সঙ্গে সাইকোলজির সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। কোনো পুরুষের পক্ষেই স্ত্রীর কাছে অপমানিত হওয়ার পর তাঁর সঙ্গে উপগমন সম্ভব নয়। আপনি কি ওকে প্রায়ই অপমান করতেন?

মোটেই নয়। অক্ষমরাই ওসব অজুহাত দেয়।

কিন্তু পাড়া—প্রতিবেশীরা বলছে, রোজ রাতে আপনাদের তুমুল ঝগড়া হত।

তাতে ওদের কী?

না, বলছিলাম ঝগড়ার ফলে অর্জুন সেন অপমানিত বোধ করত এবং তার ফিজিক্যাল আর্জ নষ্ট হয়ে যেত, এটা পাঠকরা কেমন খাবে?

প্লিজ ওসব পয়েন্ট তুলবেন না। অশ্লীল।

অশ্লীলতায় একটু আঁশটে গন্ধ থাকলে অ্যাঙ্কেলটা পালটে যাবে।

যাবে। কিন্তু তাতে আমার ভাবমূর্তি নষ্ট হবে। প্লিজ।

খুনটা তাহলে অর্জুন সেনই করে?

তবে আর কে?

না, মানে এ ব্যাপারটা অর্জুন স্বীকার করেনি। সে বলেছে, আপনি নিজের গায়ে নিজে আগুন লাগিয়েছেন।

তাকে কি? ও তো ছুটে এসে আগুন নেভাতে পারত।

বাথরুমের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল। অর্জুন সেন দরজাটা ভাঙার চেষ্টা করে প্রথমটায় পারেনি। যখন ভাঙে তখন আপনি পুড়ে গেছেন।

সে না হয় হল, কিন্তু প্ররোচনা? নিষ্ঠুরতা? খুন কি শুধু নিজের হাতেই করতে হয়? মনস্তাত্ত্বিক চাপ নেই?

অর্জুন সেনও অনেকটা এইরকমই একটা কথা বলছে।

কী কথা?

বলছে, ফিজিক্যাল ডেথটা তেমন কিছু নয়। আপনি নিজের মরার অনেক আগেই নাকি অর্জুন সেনকে ওই যে কী বললেন, মনস্তাত্ত্বিক চাপে মেরে ফেলেছিলেন।

বলেছে?

আজ্ঞে হ্যাঁ।

আপনিও তাই লিখবেন?

ভাবছি। অ্যাঙ্গেলটা বেশ নতুন।

মোটেই তা নয়। ওর কথা বিশ্বাস করবেন না। আগুনটাও নিজের হাতে লাগায়নি ঠিকই, কিন্তু সারাজীবন আমি ওর জন্যই জ্বলে পুড়ে মরেছি। বিশ্বাস করুন। আমাকে ওই খুন করেছে। আমি চাই ওর ফাঁসি হোক।

হলে?

ওকে আমি কাছে পেতে চাই।

কেন?

মল্লিকা লাজুক গলায় বললেন, আহা, বোঝেন না যেন!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%