শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
স্কচের বোতলটা খুলতেই একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ বেরিয়ে এল। তারপর যেন নিজেকে একটু সামলে নিয়ে একটা ভারী মোটা গলা বলে উঠল, হাই! গুড ইভনিং!
বোতলটার খোলা গোল মুখটার দিকে স্থির চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বিষাণ বলল, ইভনিং! কিন্তু দীর্ঘশ্বাসটা কেন?
দীর্ঘশ্বাস! ওঃ, নো নো! দীর্ঘশ্বাস কেন হবে। জাস্ট ইগনোর ইট।
দীর্ঘশ্বাসটাও কিন্তু একটা এক্সপ্রেশন। আমার জন্য দুঃখ হচ্ছে?
আরে নাঃ। সন্ধের পর দুনিয়ার লক্ষ লক্ষ লোক হুইস্কি নিয়ে বসে, দুঃখ কিসের? আনন্দ করার জন্যই তো হুইস্কি!
কিন্তু আমার তো সবসময়ে হুইস্কি খেলে আনন্দ হয় না। কখনো কখনো ভারী দুঃখও হয়। ভীষণ দুঃখ, আই ফিল লোনলি।
তাহলে মালে গন্ডগোল আছে। ব্র্যান্ড চেক করে নেবেন।
দোষটা বোধহয় ব্র্যান্ডের নয়। দুঃখও একটা এনজয়মেন্ট।
তাহলে তো ঠিকই আছে। দুঃখেও যদি আনন্দ হয় তো বাক আপ। সঙ্গে একটু শুয়োরের নাড় খেয়ে দেখুন, ব্যাপারটা জমে যাবে।
শুয়োরের নাড়?
সসেজের কথা বলছিলাম স্যার। ফ্রিজে আছে।
ফ্রিজটা নিঃঝুম হয়ে ছিল। ভিতরের ঠান্ডা আরামে যেন কুঁকড়ে বসে আছে। চেতনা নেই। বিষাণ উঠে গিয়ে ফ্রিজের পাল্লাটা খুলতেই ভিতর থেকে একটা বিরক্তির শব্দ বেরিয়ে এল, আঃ, জ্বালালে। মাঝরাতে ঘুমটা ভাঙল...
বিষাণ বলল, সরি। একটু সসেজটা নেব।
সরি স্যার, কাঁচা ঘুমটা ভাঙায় বেফাঁস কমেন্ট করে ফেলেছি। নিন স্যার, আপনারই জিনিস।
সসেজের পাত্রটা বের করে বিষাণ বলল, গুড নাইট।
থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, অলওয়েজ ওয়েল কাম...
দরজাটা বন্ধ করে বিষাণ শুধু বলল, শালা।
চলন্ত টিভি থেকে একটা হাই তোলার শব্দ এল। ঘোষককে দেখা যাচ্ছে। সাউন্ড লেভেল মিনিমামে রাখা হয়েছে বলে ঘোষকের কথা শোনা যাচ্ছে না। তবে ছবি দেখা যাচ্ছে। হাই—এর শব্দটা কিন্তু বেশ স্পষ্ট কানে এল বিষাণের।
ঠান্ডা সসেজটা কামড়ে এক চুমুক হুইস্কি খেল সে। তারপর টিভিটার দিকে চেয়ে নিউজ চ্যানেলের অদ্ভুত সব স্পষ্ট কভারেজ একটুও না বুঝে দেখতে লাগল। কোথাকার ছবি, কিসের ছবি তা সে বুঝতে পারছিল না বটে, তবে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, পৃথিবীতে কিছু ঘটনা ঘটছে। ঘটেই চলেছে।
যে—লোকটা অ্যাঙ্করিং করছিল সে হঠাৎ বিষাণের দিকে চেয়ে বলল, আর কতক্ষণ চলবে?
কী?
এই বোকা বাক্সের তামাশা? এই ভারচুয়াল রিয়ালিটি?
চলুক না, ক্ষতি কি?
আপনি তো ইমপ্রেসড হচ্ছেন না মশাই।
আমার হাত থেকে রেহাই চাই?
পেলে মন্দ হয় না। অলস লোকের চিত্তবিনোদনই আমাদের কাজ। কিন্তু আপনার চিত্ত বিনোদিত হচ্ছে না। বন্ধ করে দিলেই তো হয়। আই সে টেক এ বিট অফ রেস্ট।
ওকে। বলে বিষাণ রিমোটটা তুলল।
টিভি—টা অফ হয়ে যাওয়ার পর অ্যাঙ্কারের গলা পাওয়া গেল, গুডনাইট, স্লিপ টাইট। থ্যাঙ্ক ইউ।
হুইস্কিটা জলের মতো লাগছে। সসেজ যেন রবার। তবু চিবোতে চিবোতে দেয়ালে টাঙানো আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় বিষাণ। এবং অবাক হয়ে দেখে, আয়নায় তার কোনো প্রতিবিম্ব নেই। শুধু আলোকিত ঘরখানা দেখা যাচ্ছে।
বিষাণ রেগে গিয়ে চিৎকার করে উঠল, আরে। আমার রিফলেকশন কোথায়? অ্যাঁ! কোথায় আমার রিফলেকশন?
আছে বাবা, আছে! বলতে বলতে আয়নার ভিতরে একজন লম্বাপানা লোক খালি গায়ে পায়জামার দড়ি বাঁধতে বাঁধতে এসে দাঁড়ায়।
বিষাণ ধমক দিয়ে বলল, কোথায় ছিলে এতক্ষণ?
লোকটা একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে বলল, আই ওয়াজ হ্যাভিং সেক্স উইথ ইওর ওয়াইফ!
অ্যাঁ! উইথ মাই ওয়াইফ!
থুড়ি থুড়ি। ভুল হয়ে গেছে। তোমার বউয়ের রিফলেকশনের সঙ্গে।
মিথ্যে কথা! আমার বউয়ের সঙ্গেই তুমি...
আহা, তাতেই বা দোষটা কী হল? তুমি কি তোমার বউয়ের কোনো খোঁজ রাখো? জান এখন সে কোথায়? কিংবা তার মুখশ্রী কি তোমার মনে আছে?
সেসব কি তোমার কাছে শিখতে হবে নাকি?
বল তো সে এখন কোথায়?
আছে কোথাও। এটা বিশাল বড় ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট, আটটা বেডরুম, কে কখন কোথায় থাকে তার কি কিছু ঠিক আছে?
কতদিন তোমাদের দেখা হয়নি?
খুব বেশি দিন নিশ্চয়ই নয়। দিন পনেরো আগেই দেখা হয়েছে। আমরা কথাও বলেছি।
কিন্তু খবর হল, গত পরশু দিনও তোমার সঙ্গে তোমার বউয়ের দেখা হয়েছে, কিন্তু তুমি তাকে চিনতে পারোনি।
মিথ্যে কথা! কোথায় দেখা হয়েছিল?
সিঁড়িতে। সেদিন লিফট খারাপ থাকায় তুমি হেঁটে উঠেছিলে সন্ধেবেলায়, তোমার বউ নামছিল।
ওঃ। হতে পারে আমি তখন অন্যমনস্ক ছিলাম, লক্ষ্য করিনি।
বাজে বোকো না। সুন্দরী মেয়েদের লক্ষ্য করতে তোমার কখনো ভুল হয় না। তুমি হাঁ করেই তোমার বউকে দেখেছিলে। ড্যাব ড্যাব করে।
বাজে বোকো না। তুমি অত্যন্ত টেঁটিয়া লোক।
লোকে তোমাকেও তাই বলে।
অ্যাই! তোমার লজ্জা করে না? দেখছ আমি গায়ে পাঞ্জাবি পরে আছি। তুমি আমার রিকলেকশন হয়েও কি করে খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছ?
সরি, সরি, এক মিনিট।... এই যে দেখ, পাঞ্জাবি পরে এসেছি।
তোমার হাতে মদের গেলাস কোথায়?
তাড়াহুড়োয় ভুল হয়ে গেছে।... এই যে, এবার দেখ। তোমার ডান হাতে মদের গেলাস, আমার বাঁ হাতে। এবার ঠিক আছে?
গো টু হেল।
থ্যাঙ্ক ইউ। আই লাভ হেল।
বিষাণ আয়নার কাছ থেকে সরে এল। বিশাল লিভিংরুম পেরিয়ে সে তার আলো—আঁধারি শোওয়ার ঘরটায় এসে ঢুকল। বড় বড় কাচের জানালায় মোটা পরদা ঝুলছে। ফুটলাইটের আলোতে ঘরখানা খুব সামান্য আলোকিত। মাঝখানে বিশাল খাট? বিছানাকে আজকাল ভয় পায় বিষাণ, ভয় পায় রাত্রিকেও। এক একদিন যথেষ্ট হুইস্কি খেলেও ঘুম আসতে চায় না।
ঘরে ঢুকে পাঞ্জাবি ছেড়ে একধারে ছুঁড়ে ফেলে দিল সে। তারপর স্বগতোক্তি করল, আজ ঘুম আসবে কি?
ভারী মিষ্টি একটি মেয়েলি কণ্ঠস্বর বলে উঠল, আসছি সোনা, একটু বাদেই আসছি। তুমি শুয়ে পড়, আমি লেখাগুলো শেষ করেই আসব তোমার কাছে। সারা রাত তোমাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকব।
লিখছ! কী লিখছ তুমি?
তোমার জন্য কয়েকটা স্বপ্ন লিখছি আমি।
কীরকম স্বপ্ন, ভয়ের না আনন্দের?
তোমাকে সারপ্রাইজ দেব, তাই বলব না।
আমি স্বপ্ন দেখতে চাই না। নিঃসাড়ে ঘুমোতে চাই শুধু।
তাই কি হয়! কত কষ্ট করে লিখছি।
স্বপ্ন থাক, শুধু তুমিই এসো ঘুম।
স্বপ্ন হল আমার গয়না, আমার রূপটান। তুমি শুয়ে পড়ো লক্ষ্মীটি, শুয়ে শুয়ে হিজিবিজি ভাবো, দেখবে কখন নিঃশব্দে আমি তোমাকে বুকে টেনে নিয়েছি, টেরও পাবে না।
প্রায়ান্ধকার ঘরে একটু দাঁড়িয়ে রইল অনিশ্চিত বিষাণ। বলল, রাত্রিটা নিয়েই আমার যত প্রবলেম।
একটা গমগমে পুরুষ—গলা বলে উঠল, আসলে আমার কালো পোশাকটার জন্যই অনেকে ওরকম ভাবে। পোশাকটা কালো হলেও তার মধ্যে মজা কিছু কম নেই।
বিষাণ বিছানায় নিজেকে পেতে ছিল। যদি অতর্কিতে গোপন প্রেমিকার মতো তার ঘুম আসে।
মোবাইল ফোনটার কথা খেয়ালই ছিল না বিষাণের। ছুঁড়ে দেওয়া পাঞ্জাবির বাঁ পকেটে ছিল। বাচ্চা একটা ছেলের হাসির শব্দ হচ্ছে। ওটা তার মোবাইলের সেট করা রিংটোন।
বিষান উঠল। কার্পেটের ওপর পড়ে—থাকা পাঞ্জাবিটা তুলে মোবাইলটা বের করে কানে চেপে ধরে ফের শুয়ে পড়ল।
আমি স্বপ্না।
স্বপ্না! কে স্বপ্না?
তুমি কি খুব বেশি মাতাল হয়ে গেছ? আমি স্বপ্না, তোমার বিয়ে করা বউ।
গড! আসলে আমার একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল বোধহয়।
তন্দ্রা! তুমি এখন কোথায়?
ফ্ল্যাটে, সাত তলায়।
সরি, ঘুম ভাঙালাম।
তুমি কোথায়?
এই ফ্ল্যাটেই। ছয় তলায়। জয় তোমাকে বার্থ ডে গ্রিটিংস পাঠিয়েছে, এস এম এস করে। পেয়েছো?
না তো!
পাঁচ ছটা মোবাইল থাকলে এরকমই হওয়ার কথা। যাক গে, আমাকে জানিয়েছে, যেন তুমি নাইন ফোর থ্রি থ্রি এইট টু সিক্স টু ফোর ফাইভ নম্বরটা চেক করে দেব।
বার্থ ডে! বার্থ ডে—টা কবে?
আজ। ইউ আর ফর্টি ফাইভ টুডে।
তাই বুঝি!
কে গ্রিটিংস পাঠিয়েছে বললে?
জয়, তোমার ছেলে। জয় যে দুন মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে পড়ছে তা আশা করি ভুলে যাওনি।
আরে না! আই মিসড দি নেম ওভার টেলিফোন। আচ্ছা আমি চেক করে নেবো।
তোমার ইচ্ছে।
ও ঠিক আছে তো!
ঠিক আছে।
গুড নাইট।
নাইট।
ঘুমের গায়ে একটা কোলনের গন্ধ কি? ভারী মোহময়। ভীষণ নরম। ঘুম বিছানায় বেড়ালের মতো নরম শরীরে গড়িয়ে যাচ্ছে। দু—হাতে ঘুমকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করে বিষাণ। ধরা দিয়েও দিচ্ছে না। এই সময়টায় ঘুম ও জাগরণের চৌকাঠ বড় সংকটের সময়। জেগে থাকাটাই ধীরে ধীরে ডাইল্যুট হয়ে যায় স্বপ্নে, ঘুমে। এই সময়টায় দোল খায় শরীর, চমকে ওঠে। তারপর ঘুমের কুয়োর মধ্যে পড়ে—যাওয়া।
সেরকমই হল।
বালিশটা ফিসফিস করে তার কানে কানে বলল, হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ স্যার।
ধন্যবাদ, নাউ শাট আপ।
বেড—সাইড রিডিং ল্যাম্পটা নেবানো ছিল। হঠাৎ সেটা কয়েকবার জ্বলে উঠে নিবে যেতে লাগল। বলতে লাগল, হ্যাপি বার্থ ডে...হ্যাপি বার্থ ডে...
তারপর একটা মৃদু কোলাহল সারা ঘর জুড়ে জেগে উঠতে লাগল। আলমারি, চেয়ার, টেবিল, ওয়ার্ডরোব সব জায়গা থেকেই হ্যাপি বার্থ ডে... শোনা যেতে লাগল।
বিরক্ত বিষাণ পেল্লায় একটা ধমক ছাড়ল, চোপরও বেয়াদব!
ঘরটা চুপ করে গেল।
ঘুমের মিষ্টি মেয়েলি গলাটা ভারী করুণ স্বরে বলল, তুমি কি খুব রেগে গেছ সোনা? অত রেগে গেলে আমি কী করে তোমার কাছে যাব বলো তো! আমার যে ভয়—ভয় করছে!
প্লিজ কাম মাই লাভ। প্লিজ...
শুয়ে শুয়ে একটু হিজিবিজি ভাবতে থাকো তো। মাথাটা একটু ঠান্ডা হোক।
মুখোমুখি দেওয়ালে মোনা লিজার একটা বড় প্রিন্ট সুন্দর ফ্রেমে বাঁধিয়ে শখ করে টাঙিয়েছিল স্বপ্না। একদা, যখন এই মাস্টার বেডরুমে তারা একসঙ্গে থাকত। এখন স্বপ্নার আলাদা এস্টাব্লিশমেন্ট ডুপ্লেক্স ফ্যাটটার নীচের তলায়। মোনা লিজার ছবিটা সে কেন নিয়ে যায়নি কে জানে।
মোনা লিজা তাকে দেখছিল। চোখ দুটো ফুটলাইটের আলোয় কেন এত ঝলমল করছে কে জানে। হাসিটাও যেন একটু চওড়া। এতটাই যে, ওর সুন্দর দু—পাটি মিহিন দাঁত দেখা যাচ্ছে।
কোলের ওপর থেকে দুটো হাত তুলে ফ্রেমের ওপর রেখে ঝুঁকে তাকাল মোনা লিজা। ঠিক যেমন কোনো মেয়ে জানালায় হাত রেখে বাইরে নীচের দিকে তাকায়।
কতটা উঁচু বলো তো! নামতে পারব?
বেশি উঁচু নয়। পাঁচ ছয় ফুট হবে।
আমার যা জবরজং পোশাক, নামতে গিয়ে পোশাকে না পা জড়িয়ে যায়।
নামবার দরকারটা কী?
তেষ্টা পেয়েছে যে!
দাঁড়াও, জল দিচ্ছি।
জলের তেষ্টা নয়।
তবে?
বলছি বাপু, আগে নামতে দাও। নামটা ডিফিকাল্ট হবে মনে হচ্ছে।
ওরকম জবরজং পোশাক পরো কেন?
পোশাকটাকে হ্যাটা করছ নাকি? মনে রেখো, এটা জগদ্বিখ্যাত পোশাক।
হলেই বা। আধুনিক পোশাক অনেক ভালো।
মানছি বাপু, কিন্তু আমার তো উপায় নেই। শো—গার্লরা কি নিজের ইচ্ছেমতো পোশাক পরতে পারে?
তুমি কি শো—গার্ল?
তা নয়তো কি বলো? চৌপর দিন লোকে প্যাট প্যাট করে চেয়ে চেয়ে আমাকে দেখছে, তিনশো পঁয়ষট্টি দিন।
ফ্রেমের চৌকাঠে উঠে পড়ল মোনা লিজা। মুখে একটু দুষ্টুমির হাসি। নীচের দিকে চেয়ে বলল, মুক খেয়ে নামছি কিন্তু। পড়ে গেলে একটু ধোরো আমাকে।
ঠিক আছে। নেমে পড়ো, বেশি উঁচু তো নয়।
মোনা লিজা তার বড়সড় ঘের—ওলা গাউন সমেত নেমে পড়ল।
হুইস্কিটা কোথায় রেখেছে?
তাই বলো। হুইস্কির তেষ্টা পেয়েছে তোমার!
ইস, কতক্ষণ ধরে গন্ধ পাচ্ছি আর প্রাণটা আঁকুপাঁকু করছে।
ফ্রিজে রেখেছি। খাও গিয়ে কিন্তু বেশি গিলোনা, আরও মোটা হয়ে যাবে। এমনিতেই তুমি বাপু বেশ থলথলে।
গুলি মারো। আমি বাপু ফ্যাট নিয়ে মাথা ঘামাই না। ভালো—মন্দ খেতে ভালোবাসি, মদ না খেলে শরীর ম্যাজ ম্যাজ করে।
তা চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। অথচ দুনিয়ার লোক তোমার জন্য কেন পাগল কে জানে! দেখতে তো তেমন কিছু নও।
অ্যাই! ভালো হবে না বলছি!
আমি আর্টিস্ট হলে কখনো তোমার মতো সাদামাটা আর গিন্নিবান্নি চেহারার মহিলার ছবি আঁকতে রাজি হতাম না। দা ভিঞ্চি তোমার প্রেমে পড়েছিল বলে এঁকেছিল।
ভ্যাট। প্রেমে পড়বে কি? লোকটা তো হোমো সেক্সুয়াল।
তাই যদি হবে, তাহলে মেয়েদের এত ছবি এঁকেছে কেন?
ও দিয়ে কিছু প্রমাণ হয় না। তবে বাপু, সত্যি কথা যদি বলতে হয় তো বলি আমার ভিতরে সত্যিই কিন্তু রহস্য—টহস্য কিছু নেই। কেন যে মাথা—পাগলা লোকগুলো আমার ছবির দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে আর পাতার পর পাতা মোনা লিজা এই, মোনা লিজা সেই, মোনা লিজার পেটে বাচ্চা আছে, মোনা লিজা আসলে মেয়েবেশী পুরুষ বলে নানা থিওরি আর বুকনি ঝেড়ে সকলের মাথা গরম করে কে জানে বাবা। আমি তো জানি আমি একজন আহ্লাদী, হালকা—পলকা মনের সাদামাটা মেয়ে। কেন যে আমাকে নিয়ে লোকের এত মাথা ব্যথা, আচ্ছা তোমার ফ্রিজে বোধহয় সসেজ আছে, না?
হ্যাঁ। বেশি সাঁটিও না। হাই ক্যালোরি।
হোক বাপু, আমি হুইস্কির সঙ্গে কিছু নোনতা না খেয়ে পারি না।
যাও বাপু, গেল, কিন্তু আমি বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছি। এবং স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি।
রিনরিনে মেয়েলি গলাটি বলে উঠল, না সোনা, তুমি এখনও ঘুমোওনি। যা দেখছো তা ভারচুয়াল রিয়ালিটি। তোমার মনের প্রক্ষেপ। ওই হারামজাদি খুব নটখটে মেয়েছেলে। তোমার মাথাটা গরম করে দিয়ে গেল। ওই দেখ, ঢক ঢক করে হুইস্কি গিলছে।
এই ফাঁকে তুমি চলে এসো। আমরা ঘুমিয়ে পড়ি!
রোসো বাপু রোসো। যতক্ষণ ওই মোনা লিজা মাগি জেগে আছে ততক্ষণ বিশ্বাস নেই। আমি পাহারা দিই। তুমি বরং তোমার আরও কিছু হিজিবিজি ভাবনা ভাবতে থাকো।
কিসের একটু সুঁই সুঁই শব্দ হচ্ছিল। ঠিক বুঝতে পারছিল না বিষাণ। শব্দটা খুব কাছেই হচ্ছে। সে গাড়ির ব্যাক সিটে বসে এপাশে ওপাশে তাকিয়ে দেখল। কিছু বুঝতে পারল না।
ড্রাইভার, চাকার হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে নাকি?
তার ড্রাইভার নরেশ ফিরে তাকিয়ে গম্ভীর মুখে বলল, না স্যার।
তাহলে হাওয়া বেরোবার শব্দ হচ্ছে কেন?
হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে বলেই শব্দ হচ্ছে।
তবে বলছ কেন যে চাকার হাওয়া বেরোচ্ছে না?
চাকার হাওয়া বেরোচ্ছে না স্যার।
তবে?
আপনার হাওয়া বেরিয়ে যাচ্ছে।
আমার হাওয়া! হাউ স্ট্রেঞ্জ। আমার হাওয়া কী করে বেরোবে?
শরীরে তো অনেক ফুটো স্যার, নাক, কান, গুহ্যদ্বার। কখনো কখনো তার কোনো একটা দিয়ে মানুষের হাওয়া বেরিয়ে যায়।
শাট আপ।
ও কে স্যার।
আরও কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল বিষাণ। শব্দটা হয়েই যাচ্ছে। মৃদু কিন্তু অবধারিত। খুব ধীরে, অল্প অল্প করে কোথা থেকে একটা হাওয়া বেরোনোর শব্দ আসছেই।
গাড়ি থামাও। আই মাস্ট চেক।
নরেশ গাড়ি থামাতেই নেমে পড়ল বিষাণ। নেমে গাড়ির চারটে চাকাই ঘুরে ঘুরে দেখল সে। না, চাকা লিক করছে না। তাহলে? তাহলে?
ড্রাইভারের সিট থেকে নরেশ সকৌতুকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। পিত্তি জ্বলে গেল বিষাণের। সে ধমক দিয়ে বলল, এই স্টুপিড, অমন হাঁ করে কী দেখছিস?
কে জানে কেন, নরেশ ভয় পেয়ে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে, বিষাণকে ফেলে রেখেই চলে গেল।
এই! এই! বলে চিৎকার করে ছুটছিল বিষাণ। কিন্তু পেরে উঠল না। তার গা থেকে ধড়াস করে কী যেন একটা খুলে পড়ে গেল ফুটপাথে। পিছনের লোকজন হইহই করে উঠল।
বিষাণ অবাক হয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখল, ফুটপাথে একটা ফাটা প্রমাণ সাইজের মানুষের খোল পড়ে আছে। আর মানুষজন ছুটে আসছে সেটা দেখতে।
বিষাণ এগিয়ে যেতেই একজন মোটা মতো লোক পানের পিক ফেলে বলল, এটা কি আপনার খোল নাকি মশাই?
বিষাণ খোলসটার দিকে চিন্তিতভাবে চেয়ে ছিল। হ্যাঁ, এটা তারই খোলস। কি করে যে পড়ে গেল গা থেকে!
একটা সবুজ জামা—পরা ছোকরা বলল, সাইকেলের দোকানে নিয়ে যান মশাই, সলিউশন মেরে সারিয়ে দেবে।
একজন বুড়ো মাথা নেড়ে বলল, আরে না। এটা নিতে হবে মোটর টায়ার সারানোর দোকানে। অনেকটা ফেটে গেছে।
পানখেকো লোকটা বিষাণের দিকে চেয়ে হেসে বলল, ওসব কথায় কান দেবেন না। খোলসটা নিয়ে আমার সঙ্গে আসুন। আমি ঠিক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি আপনাকে চলুন।
বিষাণ নিজের খোলসটা তুলে বাঁ কাঁধে চাদরের মতো ঝুলিয়ে নিয়ে বলল, কোথায় যাব?
আরে, এই তো সামনের মোড়টা থেকে বাঁ হাতে ঘুরলেই ভগবানদাস মুচির দোকান। এখন আর কেউ পৌঁছে না বটে, তবে বড় ভালো কারিগর। কাঁটা—ছেঁড়া—জোড়ায় ওর কোনো জুড়ি নেই। এমন জুড়ে দেবে যে জোড়ের দাগ অবধি থাকবে না। আসুন আমার সঙ্গে।
মোড় ঘুরে একটা পুরোনো বাড়ির সামনে এসে লোকটা যে জায়গাটা দেখিয়ে দিল সেটা হল, পুরোনো বাড়ির রকের নীচে একটা গুহার মতো গর্ত। সেই গর্তে কতকালের অন্ধকার জমে আছে কে জানে। সামনে চামড়া, রবারের টুকরো, দস্তানা, ভাঙা পুতুল, পুরোনো জুতো, কত কি ঝুলছে। আর তারই ভিতরে একটা খুব বুড়ো থুথুরে লোক কী যেন একটা সেলাই করে যাচ্ছে তার রোগা হাতে।
যান না, মশাই, সাহস করে চলে যান। পারলে ওই বুড়োই পারবে।
এরকম নোংরা, ঝুলকালো কোনো দোকানে কখনো যায়নি বিষাণ। দোকান নয়, যেন প্রাচীন এক গুহা। বুড়ো মানুষটা কি কানে শোনে? চোখে দেখে? বিশ্বাস তো হয় না।
দোকানের সামনে গিয়ে কাঁধের খোলসটা নামিয়ে নিচু হয়ে বিষাণ বলল, শুনছেন। এই খোলসটাই সারিয়ে দিতে পারবেন?
লোকটা মুখ তুলে তাকাতেই কেমন যেন বিহ্বল হয়ে গেল বিষাণ। মুখখানায় যেন কোন সুদূর অতীতের প্রাচীন বলিরেখা। চামড়ার কুঞ্চনের মধ্যে যেন শত সহস্র বছরের ঋতু আবর্তন তার ছাপ রেখে গেছে। মাথায় সাদা চুল কতকাল ছাঁটেনি। গায়ে হাফুচ ময়লা একটা জামা। একবার তাকিয়েই মুখ নামিয়ে তার কাজ করে যেতে লাগল লোকটা।
শুনছেন?
লোকটা আর চোখ না তুলেই বলল, হাঁ হাঁ, শুনিয়েছি মালিক। খোলস সিলাই হবে তো?
পারবেন তো!
লোকটা তেমনি মাথা নিচু রেখেই বলল, হাঁ হাঁ, পারবে, পারবে। বইসুন, হাতের কাজটা করে লেই।
লোকটা তাকে বসতে বলছে? কিন্তু বসবে কোথায় বিষাণ? বসার তো কোনো ব্যবস্থাই রাখেনি লোকটা।
বুড়ো তেড়ছাভাবে তাকে একবার দেখে নিয়ে ফোকলা হেসে বলল, ইটের উপরে বইসুন মালিক। ওই যে, ইট।
লোকটার স্পর্ধা দেখে অবাক মানে বিষাণ। তাকে ইটের ওপর বসতে বলছে! অ্যা।
কতক্ষণ লাগবে?
লোকটা খোলটা তুলে নিয়ে উলটে পালটে একটু দেখে নিয়ে বলল, ভিতরে হাওয়া কমজোরি হলে মাঝে মাঝে এইসন হোয়, হয়ে যাবে বাবু, বইসুন।
বিষাণ বসল না। গোঁজ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ তার অন্তহীন সেলাই করে যেতে লাগল বুড়ো। তারপর মিহিন গলায় জিজ্ঞেস করল, সিলাই তো হোবে মালিক, কিন্তু ট্যাক্সিডার্মি করতে হব তো! ভিতরে কী ভরবেন?
তার মানে! ওটা তো আমার খোলস!
হাঁ হাঁ, উ তো জরুর। বাত তো ঠিক আছে। লেকিন খোলের মধ্যে কী ভরবেন মালিক? খড়—বিচালি ভরতে পারেন, কাঠের গুঁড়া ভি ভরতে পারেন, মিট্টি ভি ভরতে পারেন।
বিষাণ রাগের গলায় বলে, আমার খোলসের মধ্যে ওসব ভুসিমাল ভরব কেন?
লোকটা একমনে কাজ করতে করতে খুব দূরের গলায় বলে, ভুসিমাল ভরবেন না তো কী করবেন মালিক?
বিষাণ বিরক্ত হয়ে বলে, আহা, আমার খোলসের মধ্যে তো আমি ঢুকব হে মুচিভাই। ভুসিমাল ভরব কেন?
লোকটা যেন বহু দূর থেকে ভারী স্তিমিত স্বরে বলে, হাঁ হাঁ কিউ নেহি? উতো সব বরাবর আছে মালিক। ভুসিমাল ভরলেও যা, আপনি ঘুমে গেলেও তা। সব তো বরাবর আছে মালিক।
বিষাণ রাগে যেন দেশলাই কাঠির মতো দপ করে জ্বলে উঠল। বলে কি বুড়োটা? সে আর ভুসিমাল কি এক হল? লোকটাকে কোটর থেকে টেনে এনে বারকয়েক ঝাঁকুনি দিতে খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তার।
তার মনের ইচ্ছেটা টের পেয়েই যেন লোকটা একবার মুখ তুলে তার দিকে তাকাল। দুটো ব্যথাতুর চোখের আর্দ্র দৃষ্টি যেন তার সর্বাঙ্গে পালকের মতো স্পর্শ করে গেল।
কাম হয়ে যাবে মালিক। বইসুন।
বিষাণ খুব ধীরে প্রথমে হাঁটু গেড়ে, তারপর একখানা ইটের ওপর থ্যাবড়া হয়ে বসে পড়ল। নিজের খোলসটার দিকে চেয়ে কেন যে তার চোখে জল আসছিল কে জানে।
কিন্তু এখন তার কোনো তাড়াহুড়ো নেই আর। লোকটার কখন সময় হবে কে জানে। সে চুপ করে বসে অপেক্ষা করতে লাগল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন