সুখ

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

এই সময়টায় ছাদে ভেজা জামাকাপড় মেলতে ওঠে চম্পাকলি। আর এই সময়টাতেই ছোকরাটা একটা সাইকেলে বাড়ির চারপাশে চক্কর খায়। চোখ প্রায় সর্বদাই ছাদের দিকে। কবে হুড়মুড় করে নর্দমায় পড়ে, কি ল্যাম্পপোস্টে ধাক্কা খায়, কে বলতে পারে। এই সময়টায় চম্পাকলির সাজগোজ থাকে না, মাথার খোঁপা ভেঙে পড়ে আছে ঘাড়ে, শাড়ি গাছকোমর করে পরা, মুখে কোনো রূপটান নেই। এ হল হাড়ভাঙা কাজের সময়। এখন কি সাজতে আছে! কিন্তু ছোঁড়াটা তাকেই দেখতে আসে রোজ, এটা বুঝতে বি এ—এম এ পাশ করতে হয় না।

চম্পার যে ব্যাপারটা খুব খারাপ লাগে, এমন নয়। যদিও সে বিবাহিতা এবং মোটামুটি সুখী একজন বউ, তবু বাড়তি পাওনা তো কখনো ফ্যালনা হয় না। দেখছে তো দেখুক না, বাড়াবাড়ি না করলেই হল।

কাপড় মেলে ক্লিপ লাগিয়ে একটু রেলিংয়ের ধারে দাঁড়াল চম্পা। আহা বেচারা রোজ এত কষ্ট করে, তাকে একটু প্রসাদ না দিলে হয়? তবে নীচের দিকে তাকায় না সে। যেন উদাস দৃষ্টিতে দিগন্তের শোভা দেখছে এমনভাবে রেলিংয়ে কনুই রেখে চেয়ে থাকে। দু—মিনিটের বেশি নয়। ফের নীচে নেমে কত কাজ।

চম্পাকলি দেখতে কেমন? নিজের মুখে চম্পা তা বলে কেমন করে? তবে ছেলেবেলায় তাকে সবাই ফুটফুটে বলত। বড় হয়ে শুনতে পায়, অ্যাট্রাকটিভ, সেক্সি, রোম্যান্টিক, লাবণ্যময়ী। হয়তো খুব সুন্দরীর পর্যায়ে সে নয়, কিন্তু রাস্তাঘাটে পুরুষরা বেশ তাকায়। ল্যা—ল্যা করেই তাকায়।

ছোকরা বোধহয় সাইকেলে তাকে সাত পাকের জায়গায় সতেরো পাক দিয়ে ফেলল। হ্যাংলাও হয় বটে পুরুষগুলো। মনে মনে হেসে চম্পাকলি ছাদ থেকে দোতলায় নেমে এল। এই তার সংসার। তিনখানা বড় বেডরুম, বেশ বড়সড় হলঘরের মতো, তার অর্ধেকটা বুককেস দিয়ে আড়াল করা আলাদা বৈঠকখানা, বাকিটা লিভিংরুম। শ্বশুর, শাশুড়ি আর তারা দুজন। ননদের বিয়ে হয়ে এখন ইন্দোনেশিয়ায়। চম্পাকলির রাজত্ব মোটামুটি বিঘ্নহীন।

লিভিংরুমে চল্লিশ ইঞ্চির এলসিডি টিভি খোলা। একটু তফাতে চেয়ারে বসে আছেন শাশুড়ি। সারাদিন টিভি দেখার নেশা। সঙ্গে পান আর স্পেশাল দোক্তা। একটু ভারভাস্তিক মানুষ, বেশ পুরু করে সিঁদুর পরেন সিঁথিতে, কপালে বড় সিঁদুরের ফোঁটা। পরনে পাটভাঙা শাড়ি, যেন এখনই বেরোবেন। কিন্তু বেরোতে বিশেষ পছন্দ করেন না। সিরিয়াল দেখতেই বেশি ভালোবাসেন। সন্ধেবেলা দেখা সিরিয়ালের পুনরাবৃত্তি এই দিনের বেলাতেও দেখতেই হবে তাঁকে। চম্পাকলির তাতে আপত্তি নেই। কারণ, ওই খেলনায় মজে থাকেন বলে সংসারের ভালোমন্দে বিশেষ নাক গলান না।

শ্বশুরমশাই বাজারে। আর বাজার মানেই তাঁর মুক্তি। সকাল আটটায় বেরিয়ে বাড়ি ফিরতে সেই এগারোটা। পথে একটা চায়ের দোকানের আড্ডা আছে, একটা কাপড়ের দোকানেও খানিক সময় কাটান। মাছ বাজার, সবজি বাজারেও বিস্তর পুরোনো চেনাজানা লোকের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। নিষ্কর্মা লোক, আর করারই বা কী আছে?

চম্পাকলির এত কী কাজ? আসলে চম্পার কাজ বলতে কিছুই নেই। রান্নার একজন আছে, বাসন মাজা, ঘর পরিষ্কার করার একজন আছে এবং সবসময়ের একজন আছে। সুতরাং চম্পাকলির সারাদিন ছুটি। কিন্তু চম্পাকলি ছুটিটা বিশেষ পছন্দ করছে না বেশি সুখেরও কিন্তু ফল—আউট থাকে। এই যে বেশ বড় বড় ঘর, আলোবাতাসের রূপকথায় ভরা ফ্ল্যাট, এ তার শ্বশুরমশাইয়ের করা। নীচের তলায় ব্যাঙ্ককে ভাড়া বসিয়েছেন তিনি। বিচক্ষণ, দূরদর্শী লোক আর কাকে বলে। মেয়েকেও সমপরিমাণ টাকা দিয়ে দিয়েছেন যাতে বাড়ির ভাগাভাগি নিয়ে কখনো ঝগড়াঝাঁটি না হয়।

চম্পাকলির সুখ এখন সর্বত্র পাখির ডাক ডাকে, প্রজাপতির মতো ওড়ে, সুগন্ধের মতো ভেসে থাকে।

এই যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চম্পা এখন চা খাচ্ছে, এটার মধ্যেও সুখের উঁকিঝুঁকি। দামি দার্জিলিং পাতার চা, সামান্য চিনি আর এক চিমটি হোয়াইটনার দেওয়া। ফরসা পোর্সেলিনের কাপে সুগন্ধী চা সুখের শিহরণে তার দম বন্ধ করে দিতে চায়। আর ওই যে ছেলেটা, উলটোদিকের ইস্তিরিওয়ালার গুমটিতে সাইকেল কেতরে পায়ের ঠেক রেখে দাঁড়িয়ে আছে ওরও কিছু উপচার আছে। রোজ ছেলেটা তাকে পুজো দিয়ে যায়। বারান্দায় চায়ের সময়টায় যে—চম্পাকলি তার একমাত্র ভক্তটিকে দর্শন দেয় মাত্র।

চম্পার আরও ভক্ত ছিল। সেই বারো—তেরো বছর বয়স থেকেই তার উদ্দেশে কত হৃদয়ের বারিধারা বর্ষিত হয়েছে তার হিসেব নেই। অঙ্কের মাস্টার, পিসতুতো দাদা, পাড়ার মস্তান, দাদার বন্ধু এবং বিপজ্জনক নিখিলেশ। নিখিলেশ আসলে দু—জন। একজন সোবার নিখিলেশ, অন্যজন মাতাল। আর নিখিলেশ তাদের বাড়িতে আসত মাতাল হয়েই, রাত বারোটার পর এবং পাড়া কাঁপিয়ে তর্জন—গর্জন করতে করতে। আসলে সে চম্পার উদ্দেশে উচ্চকণ্ঠে প্রেমই নিবেদন করত, তবে মাত্রাজ্ঞান না থাকায় দু—চারটে অশ্লীল শব্দও বেরিয়ে আসত মুখ থেকে। অন্তত বার চার—পাঁচ পাড়ার ছেলেদের হাতে এবং দাদার বন্ধুদের হাতে মার খেয়েছে সে। তবু আসত। সোবার নিখিলেশ একদম অন্যরকম। যেমন ভদ্রলোক, তেমনই স্মার্ট, তেমনি সহৃদয়। সোবার নিখিলেশ কখনো প্রেম নিবেদন করেনি চম্পাকলিকে। সোবার নিখিলেশ ছিল চম্পার বাবার শিষ্য, এস্রাজ শিখতে আসত। এস্রাজ বাজাতও ভালো। বাবা বলতেন, বড় তৈরি হাত ছিল নিখিলেশের, কিন্তু মদই ওর প্রতিভাকে খেয়ে নিল।

আশ্চর্যের বিষয় এই, চম্পাকলি আজ অবধি কারও জন্যই পাগল হল না। কারও জন্যই নয়। এই যে তার দিব্যি কৃতী বর পারিজাত, একে তার একটুও অপছন্দ নয়। মালা পরাল, সাত পাকে বাঁধল, এক বিছানায় শুয়ে পড়ল, সব মসৃণভাবে হল। তার বেশি কিছু হল না। একটা বিস্ফোরণের অভাব হল কি?

সুখ, সুখ আর সুখ... চারদিকে সুখের জাল তাকে ঘিরে রেখেছে। এই সুখের হাত থেকে তার আর রেহাই নেই। সুখে সুখে জর্জরিত জীবন। মাঝে মাঝে শ্বাস রোধ হয়ে আসে। মাঝে মাঝে নেশার মতো মনে হয়।

তার বিয়ের পর সে শুনেছে নিখিলেশ মদ আর এস্রাজ দুইয়ের মধ্যে কোনটা ছাড়বে তাই নিয়ে লটারি করেছিল। লটারিতে মদ হেরে যায়। নিখিলেশ এখন দিন—রাত এস্রাজ নিয়ে পড়ে থাকে। মদ ছোঁয় না। এ খবরটা তো কম সুখকর নয়। তার জন্য একটা মানুষের, এবং হয়তো আরও অনেক মানুষের জীবনে অনেক ওলটপালট ঘটে গেছে। এখনও ঘটে চলেছে। তার প্রমাণ ওই ছেলেটা। সাইকেলারোহী, লম্বা, রোগা, দাড়িয়াল এবং বাবরিচুলো এক উদ্ভ্রান্ত পুরুষ কেবল সাইকেল চালিয়ে চালিয়ে আয়ুক্ষয় করে দিচ্ছে। দোতলায় নিষিদ্ধ ফলের জন্য হৃদয়ের ব্যর্থ ক্ষরণ।

ঘরে ঢুকতেই ফের এক ঝলক সুখের মুখোমুখি চম্পাকলি। আয়না। লম্বা তিন খণ্ড আয়না যেন তিন সখী। চম্পাকে দেখলেই তারা যেন আনন্দে উল্লাসে শিউরে ওঠে। সে চেয়ারে বসার সময় টের পায়, চেয়ারটাও যেন একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেলে। সে যখন বিছানায় শোয়, তখন বিছানাও যেন প্রেমিকের মতো তাকে বুকে টেনে নেয়। স্নানের সময় শাওয়ারের জলকণা পর্যন্ত তার জয়ধ্বনি দিতে দিতে তার সর্বাঙ্গ লেহন করতে থাকে!

সুখের সঙ্গে একটু লুকোচুরি খেলবে বলেই সে অকাজের কাজ টেনে নেয় নিজের ঘাড়ে। ওয়াশিং মেশিন চালায়, ওটিজিতে পাউরুটি টোস্ট করে, ফল কাটে, ডাস্টিং করে, ঘর গোছায়। কখনো—সখনো শখের রান্নাও সে করে। আর মন ভালো রাখতে এস্রাজ বাজায়।

নীচে একটু বাগান। রুমালের মতো ছোট। কিন্তু সেখানে সবুজের কার্পেট পাতা, আর ফুলের অকৃপণ চাষ। দক্ষিণের জানালার ফ্রেমটা তাই যেন একটা ল্যান্ডস্কেপ। ওই কোণে একটা ঝিরঝিরে নিমগাছ বাইরেটা আড়াল করে আছে। এই জানালাটা দিয়েই মাঝে মাঝে গোপন প্রেমিকের মতো হাওয়া আসে, রোদ আসে, আর আসে চোরা হাসি নিয়ে তার সুখ। তখন সুখের সঙ্গেও কথা হয় তার।

সুখ, আমার এত সুখ কেন বলো তো!

আমি যখন দিই, নিজেকে উজার করে দিই।

মাঝেমধ্যে একটু বিরহ—যাতনা থাকবে না তা বলে। ঝালনুন, লঙ্কার গুঁড়ো, তেঁতুলের টক না হলে কি হয়!

তা কী করব বলো, তোমার বিরহের মনই তো নেই। পারিজাত যে গত মাসে পনেরো দিনের জন্য কুয়ালা লামপুর গেল, তোমার ক'ফোটা চোখের জল পড়েছে বলো!

তা অবিশ্যি ঠিক। আমার চোখে—হারাই ভাবটা নেই। আচ্ছা, তাহলে বিরহ ব্যাপারটা কেমন হয় আমাকে একটু বুঝিয়ে দাও তো।

মাখা ময়দার লেচি দেখনি? একটা বড় লেচি ছিঁড়ে দুটো আলাদা লেচি করতে যাও, দেখবে একটা অন্যটাকে ছাড়তে চায় না। গদের আঠা কেমন হয় জানোই তো!

বড্ড ভাবনায় ফেললে সুখ!

ইস্তিরি করা এক পাঁজা জামা—প্যান্ট—শাড়ি ধুতি গুছিয়ে রাখবে বলে ঘরে এসেছিল সবিতা। সবসময়ে মুখখানা হাঁড়ি। কোনো সময়ে ওকে হাসতে দেখে না চম্পা। কথাও বড্ড কম। কাজে অবশ্য ভীষণ ভালো, আর চোর—টোরও নয়।

'হ্যাঁ রে, তুই হাসিস না কেন বল তো!' একদিন জিজ্ঞেস করেছিল চম্পা।

এ কথায় সেদিন ঠোঁটে একফালি চাঁদ দেখা দিয়েছিল। বলল, 'শুধু শুধু হাসব কেন?'

'লোকে হাসির কথায় হাসে, মনে আনন্দ হলে হাসে, নইলে অন্তত মুখটা হাসি—হাসি তো থাকে। তোকে যে সেদিন দুটো শাড়ি দিলুম, আঁশটে মুখ করে নিলি, যেন মরা ইঁদুর ফেলতে যাচ্ছিস!'

'যাঃ তাই বুঝি! কী সুন্দর শাড়ি!'

'বরকে বলেছিস?'

'বলিনি আবার। শুনে বলল, বউদি খুব ভালো।'

আজও সবিতার মুখ সেইরকমই হাঁড়ি।

চম্পা বলল, 'হ্যাঁ রে, রোজ দেখি একটা দাড়িওয়ালা ছেলে সাইকেলে ঘুরে বেড়ায়। লম্বা, রোগা চেহারা। চিনিস?'

সবিতা আলমারি খুলে কাপড়—জামা খুব যত্ন করে সাজিয়ে রাখছিল। মুখ না ফিরিয়েই বলল 'কে জানে, কত লোকই ঘোরে।'

চিনেই বা কী হবে চম্পাকলির! জাস্ট কৌতূহল বই তো নয়। ভুলে যেতে তার দু—মিনিটও লাগে না। তার মনটা কি জলের মতো? যতই দাগ কাটো, কোনও চিহ্ন থাকে না?

মুচমুচে সুখ, টক—ঝাল সুখ, মিষ্টি সুখ, গরমে শীতলতার মতো, শীতে উষ্ণতার মতো সুখ ঘিরে আছে তাকে। কোকিলের মতো ডাকে, দোয়েলের মতো শিস দেয়, ফিঙের মতো লেজ নাচিয়ে পিরিক—পিরিক লাফিয়ে বেড়ায়।

'তোর বর কী করে রে সবিতা?'

'গাড়ি চালায়। অ্যাম্বুলেন্স।'

'অ্যাম্বুলেন্স! এ মা, অ্যাম্বুলেন্স চালায় কেন?'

'তা কী করবে বলো! যা জুটেছে তাই তো করতে হবে।'

'অ্যাম্বুলেন্স' শব্দটাই বিচ্ছিরি। কানে গেলেই যেন একটা করুণ সাইরেনের শব্দ শোনা যায়। আর বুকটা ধকধক করে।

'অনেক মাইনে পায়, না রে?'

'কে জানে কত পায়। আমাকে কি বলবে নাকি? আর যা পায় তার তো প্রায় সবটাই মদ গিলে উড়িয়ে দেয়।'

'ও বাবা, খুব মদ খায় বুঝি?'

'আমাদের ঘরে যত অশান্তি তো ওই নিয়ে। পুরুষ মানুষের রোজগারে সংসার চলে না, আমি রোজগার করি বলে ছেলেপুলে দুটো খেতে পায়।'

অনেকে আছে, দুঃখের সাতকাহন ফেঁদে বসে। সবিতা ঠিক সে রকম নয় বলে বাঁচোয়া। চম্পাকলির হাই উঠছিল।

'অ্যাম্বুলেন্স' শব্দটা বুকে নিয়েই সে সারা ঘর এলোমেলো পায়ে খানিকক্ষণ ঘুরল। মধ্যরাতে মাঝে মাঝে যখন অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন শুনতে পায়, তখন সে হাত মুঠো পাকিয়ে ফেলে।

দুই

নানকুর কোথাও পৌঁছনোর নেই। তার সাইকেলখানা শুধু যায় তার ঘুরে ফিরে একই জায়গায় ফিরে আসে। এই লক্ষ্যহীন সাইকেল চালিয়ে তার কোনো আনন্দ নেই। শুধু অভ্যাস আছে। একটা গতি তো। তার বেশি কিছু নয়।

নানকুর পরনে ময়লা জিনস, গায়ে একখানা হাফহাতা কামিজ, পায়ে চপ্পল। সমাজে নানকুর যে—স্তরে বাস তা দারিদ্রসীমার লেভেল ঘেঁষে। বাবা ভূতনাথ একজন ভূতপূর্ব সরকারি কর্মচারী। পিয়কন থেকে কেরানি পর্যন্ত উঠতে পেরেছিলেন, তারপরই অবসরের চিঠি এসে যায়। দুটো মেয়ের বিয়ে দিতে গিয়ে ভারি গরিব হয়ে গেছেন বেচারা। ছেলেকেও পড়াতে হয়েছে। বৃথা—বিদ্যা বলে একটা কথা আছে কি? অনেক বিদ্যে আছে যেগুলো থাকলেও যা, না থাকলেও তা। নানকুর যেমন। সে বি কম। তিনবার তিনটে চাকরি পেয়েছিল। একটা ক্যুরিয়র সার্ভিসে। একটা খবরের কাগজে। আর একটা কোম্পানির সেলসম্যান। কোনোটাই টেকেনি। ক্যুরিয়র সার্ভিসটা উঠে গেল। খবরের কাগজটাও চলল না। তৃতীয় কোম্পানিটা মেয়েদের রূপচর্চার জিনিস বানাত। পুলিশ—কেস হয়ে মালিক এখন হাজতে, কোম্পানিতে তালা।

নানকু দাড়ি রাখতে শুরু করে উনিশ বছর বয়সে। এখন সে ঊনত্রিশ। তিনটে টিউশনি সম্বল।

নিজের সাইকেলখানাকে নানকু গভীরভাবে ভালোবাসে। কবে থেকে সওয়ার হয়ে আছে তা ঠিকঠাক বলা সম্ভব নয়, তবে সাইকেল আর নানকু প্রায় অবিভাজ্য। পাড়ার লোক তাকে সাইকেলবাজ বলেই জানে।

প্রথম শুরু হয়েছিল আটচল্লিশ ঘণ্টা অবিরাম সাইকেল চালনা দিয়ে। খিদিরপুরের একটা ক্লাবের উদ্যোগে। এমএলএ, কাউন্সিলর এবং শেষ দিনে মেয়র অবধি এসেছিলেন। সেই অমানুষিক পরিশ্রমের পর বারো হাজার টাকার তোড়া পেয়েছিল সে। এ বাজারে এমন কিছু নয়। তবু সেটাই ছিল তার প্রথম পুরস্কার। এর পর হাওড়ার শিবপুরে বাহাত্তর ঘণ্টা। তাতে উঠেছিল প্রায় ত্রিশ হাজার টাকা। কিন্তু বাহাত্তর ঘণ্টার ওই অমানুষিক পরিশ্রমের পর নানকুর আর টাকা পাওয়ার আনন্দটা উপভোগ করার মতো অবস্থা ছিল না। এখন বছরে একবার—দু'বার ডাক আসে। আর কিছু করার নেই বলে নানকুকে যেতেই হয়।

নানকুর চাকরি নেই, রূপ বা গুণ নেই, প্রেমিকা নেই, আছে শুধু সাইকেল। তা সাইকেলই তাকে যা হোক কিছু তো দিয়েছে। আজও কলকাতার বিপজ্জনক রাস্তায় রাস্তায় সাইকেল চালিয়েই নানকুর দিন কেটে যায়। কোথাও পৌঁছয় না, কোথাও কারও অপেক্ষা নেই তার জন্য।

মানিক চক্রবর্তীর স্টেশনারি দোকানের সামনে একখানা টুল আছে। বলতে কি, ওই টুলখানাই তার সারাদিনের ঠিকানা। লোকে তাকে ওখানেই এসে খোঁজে এবং পায়।

বেলা দশটায় লোকটা এল। বুড়ো মানুষ। পরনে ঢলঢলে প্যান্ট আর প্যান্টে গোঁজা একখানা সাদা শার্ট, পায়ে কেডস। রোগাভোগা চেহারা। মুখে একটু ভিতু হাসি।

'আপনিই নানকুবাবু?'

'হ্যাঁ।'

'একটু দেখা করতে এলুম।'

নিয়মিত রোজগার না থাকলে স্বভাব খারাপ হয়ে যায়। টাকার জন্য মনটা ছোঁক—ছোঁক করে। হাতের চায়ের খালি ভাঁড়টা ফেলে দিয়ে নানকু বলল, 'অ। তা কী দরকার বলুন তো?'

'আপনার সাইকেলটা কোথায়?'

'কেন? ওই তো দোকানের পাশের ঘুপচিতে ঢোকানো রয়েছে।'

'হাত দিয়ে একটু দেখতুম মশাই। যা খেল দেখালেন সেবার।'

নানকু জানে সে কোনোমতেই স্পোর্টসম্যানের মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য নয়, সে কোনো অর্থেই হিরো নয়, কোনো গ্ল্যামারও নেই তার। বড় জোর তাকে একজন শ্রমিক বলে ধরা যায়। যে—শ্রমিক ঘাম আর ক্লান্তি ছাড়া কিছুই উৎপাদন করে না।

বুড়ো মানুষটি ভারী গদগদ হয়ে গিয়ে সাইকেলটা একটু ছুঁয়ে এলেন। ফিরে এসে পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে তার হাতে দিয়ে বললেন, 'এই দু—হাজার টাকা আগাম। একটা রসিদ কেটে দিন।'

'কোথায় হবে? কবে?'

'সামনের শুক্কুরবার। আমাদের ফাউন্ডার্স ডে। সকাল সাতটায় শুরু। রিয়্যালিটি ক্লাবের মাঠ।'

'চিনি। তা কত দিচ্ছেন আপনারা?'

'বাহাত্তর ঘণ্টায় পঞ্চাশ হাজার।'

'ঠিক আছে।' বলে একটা কাঁচা রসিদ কেটে দিল নানকু।

বুড়ো লোকটা চলে যাওয়ার পরই মানিক বলল, 'পারবি? গত মাসেই তোর জন্ডিস হয়েছিল।'

'পেরে যাব। আর তো কিছু পারি না। সাইকেল আজ অবধি ট্রেচারি করেনি।'

'একদিন করবে। দেখিস।'

একটা মেয়ে এসে মানিককে বলল, 'দু—মিটার লাল রিবন দেবেন?'

মানিক বলল, 'কালই তো নিয়ে গেলি রিবন।'

'সে তো হলুদ রিবন।'

'এত রিবন দিয়ে কী করিস?'

'গলায় দেব তো, তাই।' বলে আড়চোখে একবার নানকুকে দেখে নিল মেয়েটা।

নানকু ওকে মুখ—চেনে। হরিবল্লভ বিশ্বাসের মেয়ে শিবানী। কেন এ সময়ে কিছু না—কিছু কিনতে আসে তাও নানকু জানে। ওটা ছুতো। নানকুর লেটার বক্সে একবার একটা বেনামা চিঠিও ফেলে এসেছিল। কাঁচা প্রেমপত্র। কিন্তু হয়, শিবানীর সেই সাধ্য নেই যে, নানকুকে আকর্ষণ করে। আর পাঁচটা মেয়ের মতোই উঠতি বয়সের একটা লাবণ্য আছে হয়তো, তার বেশি কিছু নয়। নানকু ভালো করে তাকিয়েও দেখেনি কোনওদিন। যাকে ঘিরে তার এত অবিরাম পরিক্রমা, সে আকাশের চাঁদের মতো, মেরুশিখার মতো, রূপকথার মতোই অপ্রাপ্য বস্তু।

নিজেকে অনেক বুঝিয়েছে নানকু। পরস্ত্রী মাতৃবৎ। কাজ হয়নি। টের পেলে পারিজাত পাড়ার ছেলেদের ডেকে ঠ্যাঙাবে। উঁহু, তাতেও চিঁড়ে ভেজেনি। বউটা এরপর তোকে ঘেন্না করবে যে! করবে সে তো জানি। খুব খারাপ খারাপ কথা বলেও নিজেকে নিরস্ত করার চেষ্টা করেছে নানকু। ওরে ওই চম্পাকলিও তো রক্তমাংসের একটা ডেলা ছাড়া কিছু নয়। তারও বাহ্যে—পেচ্ছাপ আছে, দাদ—হাজা—চুলকুনি আছে বুড়ো বয়সের ঝুলে পড়া দেহযন্ত্র আছে। কিন্তু ভবি ভোলেনি। ভোলেও না। কোনো মুদগরই এই মোহের পক্ষে যথেষ্ট নয়।

তা বলে পাইপ বেয়ে দোতলায় কোনোদিন উঠবে না নানকু। উঠে লাভও নেই। সে তো ধর্ষণকারী নয়। প্রেমিক মাত্র। দৃষ্টিপ্রসাদের ভিক্ষুক। একবার তাকালেই ভিতরকার ফণা ধরা সাপ মাথা নুইয়ে ফেলে।

শিবানী তার দু—খানা মদিরতায় ভরা চোখ হেনে চলে গেল। বেচারা। আরও কত রিবন আর টিপের পাতা কিনতে হবে ওকে। পড়া নষ্ট হবে, ঘুম নষ্ট হবে, চোখের জল ফেলবে। কিন্তু নানকুর কী করার আছে?

একখানা লজঝরে দেশি সাইকেল আর প্রাণান্তকর আটচল্লিশ বা বাহাত্তর ঘণ্টার প্রাণক্ষয় করে সে এই একটি বা দু—টি মাত্র হৃদয় জয় করেছে। তার বেশি কিছু নয়।

সে কোনোদিন দুনিয়ার সেরা সাইক্লিস্টদের সঙ্গে রেসিং সাইকেলে চেপে টক্কর দেবে না, এটা জেনে যাওয়ার পর সে একবার ঠিক করল, আর কিছু না হোক গোটা ভারতটা তো একটা চক্কর দিয়ে আসা যায়। হয়তো তাতেও কিছু নামডাক হতে পারে। কয়েকটা অভিযাত্রী ক্লাবের পরামর্শ নিয়ে একটা রোডম্যাপ তৈরি করে বছর তিনেক আগে এক শীতকালের শুরুতে বেরিয়েও পড়েছিল। ইয়ুথ হস্টেলের মেম্বারশিপ ছিল। ছিল সামান্য কিছু টাকা।

কিন্তু একটা করার রোখ থেকেই সে বিহার প্রায় চষে ফেলেছিল। তারপর মধ্যপ্রদেশ। ছোটখাটো বিপন্নতা তাকে তেমন দমাতে পারেনি। ধানবাদে কিছু গুন্ডা ছেলে তার টাকাপয়সা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, টুরিস্ট বলে অনেক বোঝানোর পর কী ভেবে ছেড়ে দেয়। ডাকাতে ধরেছিল হাজারিবাগের কাছে। তেমন কিছুই নেই দেখে একটা গাট্টা মেরেছিল শুধু। বিলাসপুরে ফুড পয়জনিং হয়ে দিন তিনেক পড়ে থাকতে হয়েছিল এক ধর্মশালায়।

বড় বিপদটা হল পাঁচমারি যেতে গিয়ে। নির্জন রাস্তায় পথের হদিশ না পেয়ে আঘাটায় চলে গিয়েছিল সন্ধের মুখে। একটা ভাঙা ব্রিজের জন্য ডাইভারশন ছিল সামনে। দেখতে পায়নি ভালো করে। যখন দেখতে পেল, তখন ডাইভারশনের একেবারে মুখে। গতি কমাতে গিয়ে ব্রেক চাপতেই ঢালুতে উলটে পড়ে গেল সাইকেল সমেত সে। কিছুক্ষণ জ্ঞান ছিল না। জ্ঞান হল এক মলিন, অতি দীনদরিদ্র এক হাসপাতালে। রুগির ভিড়ে ছয়লাপ। ডাক্তার নার্সদের দেখা নেই। তার বেডও জোটেনি, প্যাসেজে একটা ময়লা কম্বলের ওপর শোয়ানো অবস্থায় চোখ চেয়ে সে প্রমাদ গুনল। বাঁ কাঁধে প্রচণ্ড ব্যথা। নড়ার উপায় নেই। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক ডাকাডাকির পর একজন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী তাকে জানাল যে, তার কাঁধের হাড় সরে গেছে। কিন্তু হাড়ের ডাক্তার আসবে আরও দু—দিন পর।

সেই দুটো দিন যে কীভাবে কেটেছিল তা বলার নয়। জঘন্য খাবার আর জঘন্যতম পরিবেশ। তবে কিনা এসব তার আন্দাজেই ছিল।

অস্থিবিশারদ ডাক্তারটি বাঙালি। তাই বলে যে নানকুকে পেয়ে খুব আহ্লাদিত হলেন তা নয়। তবে হাড়টা সেট করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন যত্ন করেই। বললেন, একদম নড়াচড়া করবেন না। অন্তত দিন সাতেক।

নানকুর মাথায় বজ্রাঘাত। ওই হাসপাতালের চেয়ে তার কাছে তখন গাছতলাও ভালো।

বারণ সত্ত্বেও পরদিনই সে বেরিয়ে খোঁজখবর নিয়ে জানল তার সাইকেলটা থানায় জমা আছে। ব্যথার বড়ি থেকে সে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে থানায় গিয়ে সাইকেলটা উদ্ধার করল। দোমড়ানো সাইকেলটার জন্য পুলিশ বিশেষ ঝামেলা করল না।

সাইকেলটা সারিয়েও নিল একটা দোকান থেকে। কিন্তু ব্যথা লাগা কাঁধে সাইকেলের ঝাঁকুনি সইবে না বলে সে ট্রেন ধরল। ভিড়ের ট্রেনে অনভিপ্রেত সাইকেল এবং ভাঙা কাঁধের ব্যথা নিয়ে সে দু—দিনও নরকবাস।

তার অ্যাডভেঞ্চারের ইতি সেখানেই। কারা যেন সাইকেলে বিশ্বভ্রমণ করেছিলেন। সেইসব মহাপুরুষকে সামনে পেলে প্রণাম করত নানকু।

চম্পাকলির একটা রুটিন আছে। সকালে ভেজা জামাকাপড় মেলতে ছাদে ওঠা, কিছুক্ষণ দূরের দিকে উদাস নয়নে চেয়ে থাকা। আধঘণ্টা বাদে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খাওয়া। তার দিকে না তাকিয়েও বুঝিয়ে দেওয়া, পুরুষ, আমি জানি তুমি আমাকে উপভোগ করছ। করো। তোমার পুষ্পাঞ্জলি আমি গ্রহণ করছি।

চম্পাকলির একজন বিশেষ পুরুষ আছে। আবার নির্বিশেষরাও আছে। বিশেষ পুরুষটি তাকে পায় বটে, কিন্তু ধীরে ধীরে তৃষ্ণা কমতে থাকে নির্বিশেষদের কাছে চম্পাকলি সহজে ফুরোয় না। তাদের তৃষ্ণা দীর্ঘস্থায়ী হয়। তৃষ্ণা দীর্ঘজীবী হোক।

শুক্রবার ভোরবেলা রিয়্যালিটি ক্লাবের মাঠে জনারণ্য। ব্যান্ড বাজছে, মাইকে ঘোষণা চলছে। এমএলএ, কাউন্সিলর আর পাড়ার বিশিষ্টজনের একটা ছোটখাটো সভা করলেন। অল্পস্বল্প বক্তৃতা। যুব সমাজের কাছে তেজস্বী ও বীর হয়ে ওঠার আবেদন। পাড়ার একদল মেয়ে গানও গাইল। গাঁদার মালা পরানো হল নানকুকে। নানকুর মাথায় টুপি, চোখে রোদচশমা, গায়ে টি—শার্ট, পরনে হাফপ্যান্ট আর পায়ে কেডস। এমএলএ সাহেব ফ্ল্যাগ অফ করলেন। নানকুর সঙ্গে পাড়ার আরও প্রায় সাত—আটজন সাইকেলে পরিক্রমা শুরু করল। বাকিরা অবশ্য এক—দেড় ঘণ্টা পরই একে একে বসে যাবে। থাকবে শুধু নানকু আর তার সাইকেল। নানকু জানে, অবিরাম সাইকেল চালানোয় কোনো মজা নেই, লড়াই নেই, রেস নেই, ফার্স্ট—সেকেন্ড হওয়া নেই। বড় একঘেয়ে এই ঘুরে ঘুরে চক্কর কাটা। কোথাও পৌঁছনোর নেই, কোথাও যাওয়ার নেই। প্রথমটায় লোকেরা কিছুক্ষণ কৌতূহল নিয়ে দেখে, তারপর একে একে কেটে পড়তে থাকে।

দুপুরের মধ্যেই মাঠ ফাঁকা হয়ে গেল। দু—চারজন গা এলিয়ে ফোল্ডিং চেয়ারে বসে গল্পগাছা করছে। রাতে আরও ফাঁকা হবে। তা বলে নজরদারি থাকবে না, তা কিন্তু নয়। নজর রাখা হয় ঠিকই। কোনো নিয়মভঙ্গ হল কিনা, লোকটা ফাঁকি দিল কিনা ঠিকই ধরে ফেলা হয়। যে—ডায়াবেটিক বৃদ্ধটি রাতে বারবার ছোট বাইরে করতে ওঠেন তিনি বাথরুমে আসা—যাওয়ার পথে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখেন। হ্যাঁ, ওই তো ঘুরছে!

প্রথম দিনটা পার করা তেমন কঠিন নয়। অভ্যাসে হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে নিয়মমাফিক বড় বাইরে, ছোট বাইরে কিংবা খাওয়ার একটু অবকাশ পাওয়া যায়, তখন লুটিয়ে পড়তে ইচ্ছে করে।

আর কোনো খেলা শিখল না কেন নানকু? কেন এটাই তার বরাতে জুটল?

শনিবার সকালেও কিছু লোক দেখতে এল নানকুর পছন্দমতো গান চলছিল মাইকে। কখনো তীক্ষ্ন হিন্দি কখনো মোলায়েম বাংলা। সঙ্গে নানকুর ঘোষণা। পঞ্চাশ হাজার প্রাইজ মানি ছাড়াও কেউ কেউ হাজার বা দু—হাজার টাকা পুরস্কার দেবে ঘোষণাও হচ্ছিল। টাকা বাড়লে হাঁটুর জোরও একটু একটু বাড়ে।

ঘটনাটা ঘটল রাতের দিকে। পেটটা বিকেল থেকেই সামান্য চিনচিন করছিল। বেলা চারটে নাগাদ একটা ঠান্ডা পানীয় খাওয়ার পরেই ব্যথাটা বাড়ল। এবং বেশ বাড়তে লাগল। একের পর এক উদ্গার উঠছে। সঙ্গে একটা মৃদু বমির ভাব। মনের জোরে শরীরকে শাসন করে খানিকক্ষণ সাইকেলের স্পিড বাড়িয়ে দিল নানকু। যদি এই ব্যায়ামে পেটের বায়ু বেরিয়ে যায়। কিন্তু তাতে বিশেষ কাজ হল না। ওর পা কাঁপছে, হাতে ধরা সাইকেলের হ্যান্ডেল এঁকেবেঁকে যাচ্ছে, চোখ ঝাপসা হচ্ছে বারবার। আর বুকে একটা কষ্ট।

আরও আধঘণ্টা দাঁতে দাঁত চেপে সাইকেল চালু রেখেছিল নানকু। প্রাইজ মানি তো কম নয়। ফসকে যাবে?

ফসকাল। রাত বারোটা নাগাদ এক ঝলক বমি উলটে এল পেট থেকে। তারপরই আকাশ থেকে যেন নিঃশব্দে প্রকাণ্ড কালো বাদুর নেমে এল তার গায়ে।

সাইকেলটা ছিটকে গেল তলা থেকে। নানকু কেমন কাত হয়ে পড়ল মাটিতে। সাইকেলের নিরালম্ব দু—খানা চাকা কিড়কিড় করে ঘুরে যেতে লাগল শুধু।

হইহই করে ছুটে এল লোকজন। ধরাধরি করে তোলা হল নানকুকে। জ্ঞান নেই। পাড়ার ডাক্তার এসে দেখেই গম্ভীর হয়ে বললেন, হসপিটালাইজড করো।

সাইরেন বাজাতে বাজাতে অ্যাম্বুলেন্স যখন নানকুকে নিয়ে যাচ্ছে তখনও তার অসহায় সওয়ারিহীন সাইকেলখানা পড়েছিল মাঠে। নিষ্প্রাণ।

তিন

শিবানী জানে, তার দিকে মন নেই নানকুদার। কিন্তু ওই লম্বা, ছিপছিপে, সাইকেলবাজ দাড়িওয়ালা পুরুষটির মধ্যে সে এক বন্য প্রেমিকের রূপ দেখতে পায়। এক কঠোর, জেদি, নাছোড় পুরুষ। যেসব ছেলেরা মেয়েদের মন ভোলানোর জন্য বোকামি করে বেড়ায়, ও তাদের দলে নয়। একদম অন্যরকম।

শিবানীর বুকের ভিতরে তার হৃদয় রক্তের স্রোতে ভেসে যায়, যতবার সে নানকুর কথা ভাবে। আর দিনের মধ্যে কতবার কে ভাবে, কখনো কখনো সারাদিন ধরে ভাবে। মায়ের ডাক কানে পৌঁছয় না, বইয়ের পড়া ঢুকতে চায় না মাথায়, কেমন যেন উদাসী বাতাসের মতো বিরহ বয়ে যায়।

শিবানী তেমন সুন্দরী নয়, আবার হেলাফেলা করার মতোও নয়। তার গানের গলায় প্রশংসা আছে। তার হাসির গুণগান সে অনেকের কাছে শুনেছে। আর তার নাকি পুকুরের মতো গভীর চোখ।

এসব কেন যে নানকু দেখতে পায় না! কেন যে পায় না! ভারী রাগ হয় শিবানীর। একটু তাকাবে তো চারদিকে! আর কতবার রিবন কিনতে মানিকদার দোকানে যাবে শিবানী? আরও কত পাতা টিপ কিনতে হবে তাকে?

পাড়ার মাঠে সেই যে বাহাত্তর ঘণ্টা সাইকেল চালিয়েছিল নানকু, লোক বিশ্বাস করবে না, শিবানী ওই তিন দিন ঠায় জেগে ছিল। কখনো মাঠের ধারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেছে, কখনো রাত জেগে জানলায় বসে থেকেছে, যেখান থেকে মাঠটা দেখা যায় না, কিন্তু আলো দেখা যায়। খুব বড় বড় সার্চ লাইটের মতো আলো জ্বলেছিল মাঠে।

যদি সে কোনোদিন নানকুর বউ হয়, কিছুতেই তাকে আর সাইকেল চালিয়ে অত কষ্ট করতে দেবে না। কী ভয়ংকর কষ্টের খেলা ওটা! পা চলতে চায় না, চোখ ঢুলে আসে ঘুমে, শরীর ভেঙে পড়তে চায়, তবু কত কষ্টে সাইকেল কেবল চালিয়েই যেতে হয় লোকটাকে। কান্না পায় শিবানীর।

রাতে শুয়ে আজ বড্ড নানকুর কথা মনে পড়ছে তার। ভালোবাসায় ভরে উঠছে বুক। তার লতিয়ে উঠতে ইচ্ছে করে ওই পুরুষকে ঘিরে। নানকু বৃক্ষ হোক সে লতা।

অনেক রাতে হঠাৎ একটা হাহাকার দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছুটে যাচ্ছিল, ওঁয়া ওঁয়া ওঁয়া। অ্যাম্বুলেন্সের আর্তনাদ। বুকটা ধক করে উঠল তার। এত রাতে কার কী সর্বনাশ হল কে জানে! হাত জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে শিবানী বিড়বিড় করে বলল, লোকটিকে বাঁচিয়ে দিও ঠাকুর।

অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন মধ্যরাতে আর একজনও শুনতে পেল। 'অ্যাম্বুলেন্স' শব্দটাই ভারী বিচ্ছিরি। মন খারাপ হয়ে যায়। আর ওই সাইরেন! কী ভয়ংকর আর্তনাদ ওটা! কোন ব্যথা থেকে উঠে আসছে!

দু—হাত মুঠো করে দাঁতে দাঁত চেপে রইল চম্পাকলি। তারপর হঠাৎ ঢেউয়ের মতো তার বিশেষ পুরুষটির বুকের মধ্যে মাথাটা গুঁজে দিল।

সকালে আজ ছাদে ভেজা কাপড় মেলতে মেলতে চম্পাকলি লক্ষ করল, আজ সেই চলমান সাইকেলটার কোনো পরিক্রমা নেই। বারবার ঝুঁকে ঝুঁকে দেখল সে চারদিকটা। কোথাও নেই। আধঘণ্টা বাদে বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা খেল আস্তে আস্তে।

না নেই। বুকটা একটু ফাঁকা লাগল চম্পাকলির একে কি বিরহ বলে? হবেও বা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%