শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
তা তোর বউ কলকাতায় কাজ করে, কিন্তু তোর ট্যাঁকে পয়সা নেই কেন? তুমিও যেমন গোরাংদাদা, বউয়ের পয়সায় খেয়ে কি নরকে পচব নাকি? কোন শাস্তরে ও কথা পেলি? বউয়ের পয়সায় খেলে পাপ হয়, তা জন্মে শুনিনি বাবা।
আহা, পুরুষ মানুষ বলে একটা ব্যাপারও তো আছে, নাকি?
মাগ—ভাতারের সম্পর্ক তো আর উলটে যায়নি।
মদনার দোকানের বাইরে কাঠের পায়ার ওপর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বসবার একটা বেঞ্চি মতো হয়েছে। দিনমানে লোকজন বসে। রাতে মদনার চাকর নেপাল বস্তা পেতে শোয়। সেই বেঞ্চিখানায় এখন এই বেলা দশটায় গৌরাঙ্গ পাল বসে বিড়ি ধরিয়েছে। সামনেই নদীর ঘাট। হাটবারের ব্যাপারিরা নৌকো থেকে কাদায় নেমে গুটি গুটি উঠে আসছে মালপত্তর নিয়ে। শরৎকাল হলেও রোদের তেজ আছে মন্দ নয়। তবে নদীর ওপর দিয়ে জল—ছোঁওয়া বাতাসও আসছে তেড়ে। রোদ উড়িয়ে নিচ্ছে।
গৌরাঙ্গ পাল বিজ্ঞের মতো বলে, আজকাল তো শুনি মেয়েছেলেদেরই বাড়বাড়ন্ত। ব্যাটাছেলেদের লেজ এখন দু—পায়ের ফাঁকে সেঁদিয়ে আছে।
শ্রীপতি বলল, না না, অতটা নয়। তবে মেয়েছেলেদের গাড়ু গামছার মতো ব্যবহার করাটাও ঠিক নয় কিনা। দিনকাল পালটাচ্ছে কিনা বলো! ছ টাকা আট টাকা কিলো বেগুন জন্মে দেখেছ? তা বেগুনও যদি জাতে উঠতে পারে তাহলে মেয়েছেলের আর কী দোষ?
মদনার দোকানে আজ বেশ ভিড়। এই একটা হাটবারেই সে সারা সপ্তাহেরটা কামিয়ে নেয়। তমিজ মিয়া খেয়া নৌকোর মাঝি। আধবুড়ো রোগাটে পাকানো চেহারা। পায়ের কাদা ঝেড়ে এসে বেঞ্চের একধারে বসে পা থেকে তিনটে জোঁক ছাড়িয়ে বলল, নাওটা বড় লজঝড়ে হয়ে গেছে হে। জল ছেঁচতে দিয়ে এলুম। গাবের আঠা দিয়ে তাপ্পি দেওয়া চলবে না, তক্তা পালটাতে হবে।
গৌরাঙ্গ বলে, তা পালটাও না কেন? ডুবিয়ে মারবে নাকি মানুষকে? কাঠের দাম কোথায় উঠেছে জানো? জামাল মিস্তিরি চারশো টাকা হাঁকছে। এদিকে দু টাকা ভাড়া আড়াই টাকায় তুললেই লোকে বাপ চোদ্দো পুরুষ উদ্ধার করে, শাপশাপান্ত দেয়।
তমিজ মিয়ার পায়ে সাদা হাজা। নখের রং নীলচে। চুল—দাড়ি কটাসে রং ধরেছে, এবার পাকবে। গা থেকে আঁশটে গন্ধ ছড়াচ্ছে খুব। মদনার দোকান থেকে এক বান্ডিল লাল সুতোর বিড়ি আর একটা দেশলাই নিয়ে এসে ফের বসল। মদনার লাল সুতোর বিড়িটা বড্ড সরেস। যেমন মিঠে, তেমনি কড়া। বিড়ির ধোঁয়ায় বাতাসটা ম' ম' করে উঠল।
গৌরাঙ্গ বলল, তা হ্যাঁ রে শ্রীপতি, মনসা তাহলে বেশ সুখেই আছে! কী বলিস!
শ্রীপতি ভারী আহ্লাদের গলায় বলে, মনসা কাকে বলছ? সে কি আর মনসা আছে নাকি? তার নতুন নাম হয়েছে, পিয়ালি। বলিস কী! বাপ দাদার দেওয়া নাম, ও কি পালটায়!
তা কী করবে বলো! যেখানকার যা দস্তুর। গিন্নিমা সাফ বলে দিয়েছেন, ওসব মনসা ফনসা চলবে না। নামের মধ্যে নাকি ফোঁসফোঁসানি আছে।
তা পিয়ালি আবার কেমনধারা নাম? ঠাকুরদেবতার গন্ধই নেই। শহুরে নাম ওরকমই হয়। ও তুমি বুঝবে না। তবে আছে ভালো। হাতে পায়ে হাজা, ফাটা কিচ্ছু নেই। তেল গড়াচ্ছে শরীরে। বটে!
সব সময়ে পায়ে হাওয়াই চটি। বছরে চার পাঁচখানা শাড়ি। গত মাসেই গিয়ে দেখা করে এলাম তো। দিব্যি আছে।
তা খাতির টাতির করল তোকে?
তা আর করবে না? খুব করল। দুঃখু করছিল, কত হাড়গিলের মতো চেহারা হয়েছে তোমার। পেট পুরে খাও না নাকি? বাড়িঘর কেমন দেখলি?
উরে বাবা! পেল্লায় দোতলা বাড়ি। বাগান আছে, গাড়ি আছে, রান্নার ঠাকুর, ঠিকে ঝি সব আছে।
খাওয়াল টাওয়াল?
তা আর খাওয়াবে না! গরম রুটি, আলুর ছেঁচকি।
দূর বোকা! ও কি একটা খাওয়া হল? ভাত খাওয়াল না?
নাঃ! আমিই বললুম, এসবের দরকার নেই।
চেয়ারটেয়ারে বসলি নাকি?
না গো! ওপরে ওঠা নাকি বারণ। নীচে সিঁড়িঘরে বসেই কথা হল দু—চারটে। তবে তার তো দম ফেলার সময় নেই। মেশিনে নাকি কাপড় কাচছিল, এসে কোনোরকমে দেখা করে গেল আর কি! গিন্নিমার সঙ্গে আলাপ করে এলি না! কেমন বাড়িতে বউটাকে কাজে লাগিয়ে এলি দেখতে হয় তো!
শ্রীপতি দুঃখের সঙ্গে মাথা নেড়ে বলে, সেখানে একটু বাধা আছে গো, গোরাংদা। গিন্নিমা বিয়ে—করা মেয়ে কাজে নেবে না। বলে নাকি, বিয়ে করা ছুঁড়িদের বরের ওপর টান থাকে, কেবল দেশে যেতে চায়। আর বরের হাত দিয়ে মাল পাচার করতে সুবিধে পায়।
বলিস কী রে পাগল! তোর বউ কি সিঁথের সিঁদুর মুছে ফেলে কাজে লেগেছে নাকি?
উপায় কী? আজকাল নাকি সিঁদুরের রেওয়াজও নেই তেমন। গৌরাঙ্গ পাল ভারী গম্ভীর হয়ে বলে, কাজটা কি ভালো হল রে শ্রীপতি? সধবা সিঁদুর মুছে ফেলল, এ তো ভারী খারাপ লক্ষণ। আচ্ছা, সিঁদুর মুছে ফেলেছে বলে তো আমি আর মরে যাইনি! গেছি বলো! ওসব আজকাল কেউ মানেটানে না। চার বছর তো হল।
মনসার এখন বয়স কত?
পনেরো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল। তা এখন উনিশ কুড়ি তো হিসেবে দাঁড়ায়।
কাঁচা বয়স। ঘরও তো করলি না। বিয়ের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কাজে লাগিয়ে দিলি। তোকে এখন দেখে কে?
ইচ্ছে আমারও তেমন ছিল না, বুঝলে! বিশ্বেসদা এনে এমন ধরে পড়ল, সাত শো টাকা মাইনে শুনে বউটাও নাচতে লাগল যে; আর আমিও কাত হয়ে পড়লাম।
তাতে তোর সুবিধেটা হল কী, বল। বউ টাকা পায়, ভালো খায় দায়, গায়ে গত্তি লাগছে। আর তুই যে ভাঙা ঘরে চ্যাটাইয়ে শুয়ে ঠ্যাং নাচাচ্ছিস! তোকে দেখে কে? ভাইয়েরা তো পাঁচ কাঠা বাস্তুজমি ঠেকিয়ে আলাদা করে দিয়েছে, চাষের জমি কতটা আছে তোর?
বিঘে দশেক হবে বোধহয়। কী হবে বলো দাদা, একাবোকা লোক আমি, চলে যায়।
চারটে ভ্যান রিকশা ছিল তোর। সেগুলো কী করলি?
বেচে দিয়েছি। মা বাপ নেই, বউ চাকরি করতে গেছে, কার জন্য আর খাটব পিটব, বলো। দু—বেলা দু—মুঠো জুটে তো যাচ্ছে। সেই ঢের।
তুই বরাবরই একটু বৈরাগী গোছের বটে, কিন্তু সংসারেরও একটা ধর্ম আছে তো। বউ যদি আসতে চায় তখন কী করবি?
সে কি আর কলকাতা ছেড়ে এই অখদ্দে জায়গায় আসতে চাইবে? তুমিও যেমন।
তবে কি চিরটা কাল পরের বাড়ির খেদমত খাটাবি নাকি? হ্যাঁ রে, তোর বউয়ের ওপর টান আছে তো! নাকি অন্য কোনো মেয়েছেলের দিকে ঝুঁকে পড়েছিস?
জিব কেটে শ্রীপতি বলে, কী যে বলো দাদা! বউয়ের ওপর বড্ড টান বলেই না কেমন বাউন্ডুলে হয়ে গেলুম।
তোর ওপর বউটার টান বুঝতে পারিস?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শ্রীপতি বলে, একটু আধটু কি নেই? নতুন নতুন তো চোখে হারাত। মাঝেমাঝে বলত, তুমি এত ভালো কেন গো? সেই কথাটা এখনও কানে বাজে।
গৌরাঙ্গ পাল নদীর বাতাস আড়াল করে ফের একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, সে কথা তো আমরাও বলি। কিন্তু ভালো হয়ে ম্যান্দামারা থাকা কি ভালো? যাই রে, আজ সুপুরি কটা এই হাটেই বেচে দিতে হবে।
বেঞ্চির ওপর কাত হয়ে শুয়ে তমিজ মিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। খাটিয়ে পিটিয়ে লোক, শুলেই ঘুমোয়, ঘাট থেকে উঠে এসে তমিজের ছোট ছেলে আকবর হাঁক দিচ্ছে, আব্বাজানও, নাও ছাড়ব?
শ্রীপতিই ঠেলে তুলল তমিজ মিয়াকে, ও বড় ভাই, উঠে পড়ো। তমিজ উঠল। বলল, শালা ফুটো নাওয়ের জন্য হাটবারের একটা ক্ষেপ নষ্ট। হ্যাঁ রে শ্রীপতি, তোর একটা নাও ছিল না! বড়সড় একখানা।
আছে। সনাতন মাল চালান দেয় তাতে।
পয়সা দেয়?
উদাস গলায় শ্রীপতি বলে, মাঝে মধ্যে দেয়। আবার দেয়ও না।
এই বয়সে তোর যে কী হল, বাপ!
শ্রীপতি একা বসে হাটুরে লোকজন দেখতে লাগল। সে নিজেও বুঝতে পারে, সংসার থেকে সে বড় আলগা হয়ে গেছে। চার বছরের মধ্যে সে বার পাঁচেক মনসার সঙ্গে দেখা করতে গেছে। যাওয়ার হ্যাপা বড় কম নয়। দুটো নদী পেরিয়ে দুবার বাস বদলে সেই সল্ট লেক। পাক্কা চার পাঁচ ঘণ্টা। তার ওপর গিয়েও তো স্বস্তি নেই। বড়লোকের বাড়ি, মনসা সেখানে পাঁচটা কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। খবর পাঠালে নেমে আসে বটে, কিন্তু ভারী ব্যস্ত সমস্ত ভাব। দু—চারটে কথা হতে না হতেই বলে, তুমি একটু বোসো, আমি কাজ সেরে আসছি। দিনে দিনে মনসার চেহারা খুলেছে, পোশাকে আশাকে পালিশ। কিন্তু কেমন যেন তাদের গাঁ ঘরের মেয়ে বলে আর মনে হয় না। মনসা যে আর ফেরত আসবে না, এ কথা ভাবতে তার বড় কষ্ট হয়।
উঠে গুটি গুটি গিয়ে সে নদীর ধারটায় দাঁড়ায়। বড় উদাস বাতাস বইছে। সে আনমনে দূরের দিকে চেয়ে রইল। মনসাবালার সঙ্গে বছরটাক ঘর করেছিল সে। তারই নানা কথা মনে পড়ে। আর ফাঁকাও লাগে খুব। কিছুতেই মন বসতে চায় না।
কোরাকাঠির শচীমাসিমা মঙ্গলচণ্ডীর পুজোয় ডেকে পাঠিয়েছিল তাকে। তাদের অবস্থা ভালো। মেসো তেজেন হালদারের ক্যানিংয়ে মস্ত দোকান। লোহার বালতি, ড্রাম, শেকল, কাঁটা, কোদাল, শাবল, লাঙলের ফাল, দড়িদড়া, কী নেই দোকানে! টাকায় ভাসাভাসি।
মায়ের সঙ্গে চেহারার মিল থাকলে কী হবে, শচীমাসি খুব দাপটের লোক। এক সময়ে তারা সব ভাইবোন মাসির দাবড়ানিতে চলত। মনসাবালার সঙ্গে শ্রীপতির বিয়েটাও ঠিক করেছিল মাসি। সেদিন জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ রে, মনসা তোকে টাকা—পয়সা পাঠায় না? শ্রীপতি মাথা নেড়ে বলল, না, মাসি। আমাকে পাঠাবে কেন, তার কষ্টের রোজগার। আর আমারও তো দরকার নেই।
সে কথা হচ্ছে না। এখানে মনসার মা—বাপও তো কষ্টে আছে।
শুনলুম তাদের সঙ্গেও সম্পর্ক নেই। টাকা দূরে থাক, একটা চিঠিও দেয় না। তাহলে টাকাগুলো নিয়ে করে কী?
জমাচ্ছে বোধহয়। তার টাকা সে যা খুশি করুক। তা নিয়ে কথা ওঠে কেন? ওমা! ছেলের কথা শোনো। মাস গেলে সাতশো টাকা রোজগার, ক—বছরে তো কয়েক হাজার টাকা দাঁড়ায়। বউয়ের হয়ে ফোড়ন কাটছিস কেন? বিয়ে আমি দিয়েছি, আমার তো একটা দায় আছে। তুই গেলে কী বলে, কয়?
ওই কথা—টথা হয় আর কী। সে যেন ভালোই আছে।
বড়লোকের ঝি, ভালোই তো থাকার কথা। তা বলে তার নিজের জনদের দেখবে না একটু? ও আবার কেমনধারা? ওখানে গিয়ে কেমন বুঝে এলি? আসতে চায়?
তা চায় বোধহয়। তবে বড্ড জড়িয়ে পড়েছে তো। গিন্নিমা নাকি বেজায় ভালোবাসেন।
অমন ভালোবাসার মুখে আগুন! এক কুড়ি বয়স হতে চলল, সংসার ধর্ম আর কবে করবে? তুই আবার বিয়ে কর তো! শিহরিত হয়ে শ্রীপতি বলে, বলো কী?
ঠিকই বলছি। এই বাদায় তো আর আইন কানুন নেই। একটা চিঠি দিয়ে জানিয়ে দে, এক মাসের মধ্যে না ফেরত এলে তুই আবার বিয়ে করবি। মেয়ে আমি দেখে রেখেছি। গোবিন্দ রায়ের মেয়ে মেনকা। খাটিয়ে পিটিয়ে আছে, মুখ নেই মোটে, লেখাপড়াও খানিক জানে।
আহা, দুদিন দ্যাখোই না, সে তো আর কাটান ছেড়ান করতে চায়নি। গাঁয়ের থেকে কলকাতায় গিয়ে মনটা একটু অন্যরকম হয়েছে আর কি। বিবেচনা হলে দেখবে, ফিরে আসবে। আর এসেছে। যদি আসেই বা, ততদিনে তুই যে ছন্নছাড়া হয়ে যাবি। লোকের মুখে শুনি ভ্যানগাড়ি চালাস না, নৌকোটা কাকে দান খয়রাত করলি, চাষবাসে মন নেই। এসব কি ভালো? তবে আক্কেল থাকলে বুঝত, মনিবানির মন জুগিয়ে চললেই জীবন কাটবে না। সোয়ামি কি ফ্যালনা? আজই ফিরে গিয়ে তুই একটা পোস্টকার্ড ছাড়বি তার নামে।
এসব কথা শ্রীপতির গায়ে ছ্যাঁকা দেয়। মনসার নিন্দে এখনও তার সহ্য হয় না। কিন্তু মাসির মুখের ওপর কথা বলবে তেমন বুকের পাটা তার নেই। মিনমিন করে বলল, হপ্তাখানেকের মধ্যে আমারই কলকাতায় যাওয়ার কথা। তখন বলব'খন।
বেশ হাঁকডাক করে বলবি, যেন কথাটা মনিবানির কানে যায়, তাহলেই মনিবানির টনক নড়বে।
বলব'খন।
তুই যে কী বলবি তা ভগাই জানে। গিয়ে নিশ্চয়ই মেনিমুখোর মতো মিনমিন করে আসিস। নরম মাটিতে বেড়ালে হাগে, জানিস তো! দাপের খাপের লোক হতি, বউ লটকে এসে পায়ে পড়ত। চিঠিটাই বরং লিখে দে, তাতে কাজ হবে। মুখোমুখি হলে তোর মর্দানি উবে যাবে সে আমি জানি।
সন্ধে সাতটার সময় নন্দিনী লাহিড়ী টিভি দেখতে বসেন। খুব গুছিয়েই বসেন। হাতের কাছে পানের বাটা, বোতল, পিকদানি, সামনে পা রাখার জন্য একটা নরম গদিওয়ালা মোড়া সব গুছিয়ে রাখে পিয়ালি। সন্ধে সাতটার বাংলা খবর থেকে শুরু করে রাত এগারোটা পর্যন্ত তিনি টানা পরপর দু'তিনটে চ্যানেলে বাছাই করা সিরিয়াল দেখে যান। সিনেমা থাকলে সিনেমা। এই সময়ে কোনোরকমে ডিস্টার্বেন্স তাঁর সহ্য হয় না। ডালে ফোড়ন দেওয়ার শব্দ হলেও বিরক্ত হন। তাই বাড়ির লোক এ সময়ে সাবধানে থাকে। আজকাল টিভি সিরিয়ালের কল্যাণে সন্ধেবেলা অতিথি অভ্যাগত আসা কমে গেছে। তাই বাঁচোয়া। নন্দিনীর সংসার অতিশয় সুখের। স্বামী মস্ত সরকারি অফিসার ছিলেন। প্রচুর রোজগার করেছেন তিনি। নন্দিনী নিজে কলেজে পড়াতেন। এখন দুজনেরই অবসর জীবন। তাঁদের একমাত্র ছেলে কৃতী ডাক্তার। বিদেশে পড়তে গিয়েছিল, বড় ডিগ্রি নিয়ে বিদেশে থেকে যায়নি। দেশে ফিরেছে। আর মা—বাবার পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করে এ বাড়িতেই আছে, মা—বাবার সঙ্গেই। নন্দিনীর তিন বছর বয়সি একটি ন্যাওটা নাতনি আছে। পুত্রবধূটি উত্তরবঙ্গের এক বাগচী পরিবারের। মুখরা নয়, জেদি নয়, বেশ সরল সহজ খোলামেলা স্বভাবের। একটু আবেগপ্রবণ, আর কোনো দোষ নেই। শাশুড়ির সঙ্গে তার বেশ ভাবসাব। নন্দিনীর বাড়িতে রান্না এবং কাজের জন্য আলাদা আলাদা লোক আছে, সুতরাং পুত্রবধূ প্রমিতাকে কাজকর্ম বিশেষ করতে হয় না। সন্ধেবেলাটায় সেও শাশুড়ির পাশে বসে টিভি দেখে।
বাড়ির কর্তা চন্দ্রজিৎ লাহিড়ী সকালে খবরের কাগজ পড়েন, বাজার করেন, বাগানের পরিচর্যা, করেন, দুপুরে বই পড়েন, বিকেলে ক্লাবে গিয়ে টেনিস খেলেন এবং তারপর সামান্য একটু মদ্যপান ও আনুষঙ্গিকের সঙ্গে রাত দশটা পর্যন্ত ব্রিজ খেলে বাড়িতে ফেরেন। রাত্রে প্রায়ই তিনি বাড়িতে কিছু খান না। রাত এগারোটায় ঘড়ি ধরে শুতে চলে যান। খবর শোনা বা খেলা দেখা ছাড়া তিনি টিভির বিশেষ ভক্ত নন। চন্দ্রজিৎ ঘড়ি ধরে চলতে পছন্দ করেন। নন্দিনীর ঠিক উলটো। তিনি রাত এগারোটার পর ছেলে চেম্বার সেরে ফিরলে খেতে বসেন। টেবিলের মাথায় তিনি, ছেলে সত্রাজিৎ এবং পুত্রবধূ প্রমিতা দু—ধারে। নাতনি পিউ ততক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা। খেতে বসে তাঁদের মধ্যে নানারকম গল্প হয়। নন্দিনী বেশি কথা বলেন না, তবে মন দিয়ে শোনেন। নন্দিনীর ঘুমের সমস্যা আছে। ষাট পেরোনোর পর তাঁর ঘুম কমে গেছে। প্রথম রাতে ঘুম আসতেই চায় না। চেষ্টা করতে করতে রাত তিনটে চারটে নাগাদ একটু তন্দ্রামতো আসে। বেশিক্ষণ নয়, ঘণ্টা তিনেক বাদেই উঠে পড়তে হয়। অথচ চাকরি—জীবনে এসব সমস্যা ছিল না, শুলেই ঘুমিয়ে পড়তেন। চন্দ্রজিৎ পরামর্শ দেন, একটু—আধটু ড্রিংক করে দেখতে পারো, ভালো ঘুম হবে। নন্দিনী রাজি হন না। তাঁর সংস্কারে বাঁধে।
স্বামী চন্দ্রজিতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা মিশ্র ধরনের। উষ্ণও নয়, শীতলও নয়। চন্দ্রজিতের অনেক কিছুই তিনি পছন্দ করেন না, এবং অনেক কিছু করেন। চন্দ্রজিতের বয়স এখন ছেষট্টি। বয়স ধরলে বুড়ো। তবে চন্দ্রজিৎ টেনিস খেলে এবং কম খেয়ে চেহারাটা বুড়িয়ে যেতে দেননি। চুলে কলপ দেন নিয়মিত। নিজের হাতে বাজার করতে যান পায়ে হেঁটে এবং বোঝা নিয়ে হেঁটেই ফেরেন। বেশ ফিট, তুলনায় নন্দিনী ততটা ফিট নন। তাঁর হাঁটুতে ব্যথা এবং স্পন্ডেলাইটিসজনিত ঘাড় আর কোমরের সমস্যা আছে। সাঙ্ঘাতিক কিছু নয়, তবে একটু আধটু কষ্ট তো আছেই। চোখে ছানিও আসছে। এবার শীতেই কাটিয়ে নেবেন বাঁ চোখটা। সত্রাজিৎ ডাক্তার ঠিক করে রেখেছে।
রাত আটটা বাজে। শীতের রাত এবং আজ বেশ ঠান্ডাও পড়েছে। সল্ট লেকে এমনিতেই ঠান্ডা একটু বেশি। আজ নন্দিনী পায়ে একটা কম্বল ঢাকা দিয়ে বসেছেন, গায়ে ফুল হাতা কার্ডিগান এবং গরম চাদর। প্রমিতার পরনে একটা গরম কাপড়ের হাউসকোট। একটা জমজমাট বাংলা সিরিয়াল এখনই শুরু হবে। তার আগে একটা বিজ্ঞাপনের বিরতি চলছে। নন্দিনীর সোফার পাশেই পিয়ালি একটা মোড়ায় বসা। সে সুন্দরবন অঞ্চলের মেয়ে। বাড়ি বেশ দুর্গম জায়গায়। কোরাকাঠি গ্রাম। চার বছর ধরে এ বাড়িতে আছে। তার প্রধান কাজ হল নন্দিনীর দেখাশুনো করা। নন্দিনী কিছু অশক্ত মহিলা নন। তবু পিয়ালি তাঁকে বেশ তোলা—তোলা করে রাখে। আর নন্দিনী পিয়ালির মধ্যে তাঁর না হওয়া মেয়ের একটা অনুষঙ্গ পান।
পিয়ালি বলল, এবার চা করে আনি, মা?
একটু আদার রস দিস তো।
ঠিক এই সময়ে ডোর বেল বাজল।
দ্যাখ তো, কর্তা ফিরল নাকি?
প্রমিতা দেয়াল ঘড়িটা দেখে বলল, এত তাড়াতাড়ি!
তাই তো! এ সময়ে কে এল আবার! হুট করে দরজা খুলিস না, আই হোল দিয়ে দেখে নিস।
পিয়ালি নীচে গিয়ে দেখে এসে বলল, অচেনা লোক মা। তবে ভদ্রলোকের মতো চেহারা।
শেকলটা আটকে দরজা ফাঁক করে জিজ্ঞেস কর, কী চায়।
কুরিয়ারের পিয়ন নয় তো?
না, সেরকম চেহারা নয়। অল্পবয়সি, পরনে জিনস আর ফুলহাতা সোয়েটার, ফর্সা। জিজ্ঞেস করে নে আগে। পিয়ালি নীচে গেল ফের। একটু বাদে ফিরে এসে বলল, ও মা! ইংরিজি বলছে যে!
বিরক্ত নন্দিনী বলেন, ইংরিজি বলছে! সেলসম্যান নয় তো! প্রমিতা, একটু দ্যাখো তো!
প্রমিতা উঠে গিয়ে কিছুক্ষণ বাদে এসে বলল, শ্বশুরমশাইয়ের খোঁজ করছে। নেই বলাতে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে এখন। দরকার কীসের?
তা তো বলছে না। আপনাকে বলবে বলছে।
কাল সকালে আসতে বলে দাও।
বলেছি, কিন্তু বলছে কাল সকালে ও মুম্বাই ফিরে যাবে।
কী নাম?
সাঁইদাস লাহিড়ী।
লাহিড়ী! বাংলা বলছে না?
না। বাংলা জানে না।
কী আর করা! ভিতরেই ডাকো। প্রমিতার সঙ্গে যে ছেলেটা এসে ঘরে ঢুকল সে অন্তত ছ'ফুটের ওপরে লম্বা, টকটকে ফর্সা রং, মুখশ্রী চমৎকার। নীল জিনস আর উটের গায়ের রঙের পুল ওভারে কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে! ঘরটা যেন আলো হয়ে গেল।
সুপুরুষ ছেলেটিকে দেখে চোর ডাকাত বলে মনে হয় না। চেহারায় বাঙালিয়ানাও নেই। নন্দিনী বিরক্তি ভুলে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থেকে বললেন, হোয়াট ডু ইউ ওয়ান্ট, ইয়ং ম্যান? ছেলেটি সুন্দর একটু হেসে ইংরিজিতে বলল, বড় অসময়ে এসে পড়েছি। কিন্তু আমি আর সময় করতে পারিনি। মাফ করবেন। নন্দিনী দেখলেন, ছেলেটি চোস্ত ইংরিজি বলে। নন্দিনী একটু নরম গলায় বললেন, তোমার কি খুব জরুরি কোনো দরকার? আমার স্বামী রাত দশটার আগে ফিরবেন না।
ওঁর সঙ্গে দেখা হলে ভালো হত। কিন্তু আমার ফ্লাইট কাল সকালে। আজ সারাদিন আমি ব্যস্ত ছিলাম বলে আসতে পারিনি।
তুমি কী করো?
আমি বিজনেসম্যান। আপনি আমার কার্ড রেখে দিন।
আমার স্বামী কি তোমাকে চেনেন?
না। চেনার দরকারও নেই। শুধু একটা জিনিস যদি দয়া করে ওঁকে দিয়ে দেন তাহলেই হবে।
বলে প্যান্টের পকেট থেকে সেলোফেনে মোড়া একটা জিনিস বের করে সেন্টার টেবিলে রেখে দিল।
জিনিসটা কী বলো তো!
একটা গয়না।
নন্দিনী অবাক হয়ে বললেন, গয়না! কার গয়না? কাকে দিতে চাইছ?
ছেলেটি মাথা নেড়ে বলল, সে সব আমার জানা নেই। আপনি শুধু আপনার হাজব্যান্ডকে বলবেন মুম্বই থেকে সরোজা দেবী ওটা পাঠিয়েছেন। এর বেশি কিছু সরোজা দেবী আমাকে বলেননি। উদ্বেগের গলায় নন্দিনী বললেন, কিন্তু তাঁকে তো আমরা চিনি না, গয়না নেব কেন?
সম্ভবত আপনার হাজব্যান্ড ওঁকে চেনেন।
হিপ পকেট থেকে একটা কার্ড হোল্ডার বের করে একটা কার্ডও ছেলেটা সেন্টার টেবিলে রেখে দিল। বলল, আমি অপেক্ষা করতে পারছি না। আমার একটা জরুরি মিটিং আছে।
দাঁড়াও বাপু। আগে গয়নাটা দেখি।
প্রমিতা তাড়াতাড়ি মোড়কটা এনে নন্দিনীর হাতে দিল। নন্দিনী খুলে চমকে গেলেন। চমৎকার একটা নেকলেস। একটু পুরোনো ডিজাইন বটে, কিন্তু বেশ ভারী এবং দামি পাথর বসানো। ও বাবা! এ তো দামি জিনিস! কিন্তু আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।
সাঁইদাস তেমনি সুন্দর হেসে বলল, আমি দুঃখিত যে, এর বেশি আমিও কিছু জানি না।
সরোজা দেবী তোমার কে হন?
আমাদের চেনা জানা আছে।
তোমার পদবি লাহিড়ী! তোমার বাবার নাম কী?
এস লাহিড়ী। তিনি বাঙালি। কিন্তু আমি বাংলা জানি না।
তিনি কী করেন?
রিটায়ার্ড। চাকরি করতেন।
সাঁইদাস, গয়নাটা যদি আমরা না নিই?
আপনার হাজব্যান্ড মিস্টার লাহিড়ী হয়তো রিফিউজ করবেন না।
আর যদি করেন তাহলে আমাকে জানিয়ে দেবেন।
সরোজা দেবীর ফোন নম্বর কী? সেটা লিখে দিয়ে যাও।
সরি মিসেস লাহিড়ী, ওঁর কোনও ফোন নেই। উনি আশ্রমে থাকেন। খুব সেকলুডেড লাইফ। কারও সঙ্গে কন্ট্যাক্ট রাখেন না।
সাধিকা নাকি?
ওই রকমই।
কী যে মুশকিল হল! তুমি বোসো বাপু, একটু চা খাও।
না মিসেস লাহিড়ী, বসবার সময় নেই। আমার জন্য অনেক লোক অপেক্ষা করছে।
ছেলেটা যেমন হুট করে এসেছিল তেমনি হুট করেই চলে গেল। নেকলেসটা হাতে নিয়ে ভারী স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন নন্দিনী।
প্রমিতা, কিছু বুঝতে পারছ?
না, মা।
সরোজা দেবীর নাম তো জন্মেও শুনিনি ওঁর মুখে।
আমার কী মনে হচ্ছে, জানেন মা?
আমার মনে হয় বাবা যখন মুম্বইতে ছিলেন তখন বোধহয় ওই সন্ন্যাসিনীর কাছে দীক্ষা টীক্ষা নিয়েছিলেন। কিন্তু নেকলেসটা এল কেন? শিষ্যকে হয়তো গুরুর আশীর্বাদ!
উঁহু। গুরু শিষ্যকে নেকলেস পাঠায়, এ তো জন্মে শুনিনি।
বাবাকে তো ক্লাবে তখনই একটা ফোন করতে পারতেন, মা!
ওই দেখো! তাই তো! কথাটা তো আমার মাথায় আসেনি। তুমিও তো বাপু বলতে পারতে আমায়!
আসলে আমারও কেমন যেন একটু হকচকিয়ে যাওয়ার মতো হয়েছিল। ছেলেটা কী হ্যান্ডসাম, বলুন!
হ্যাঁ, আবার পদবিটাও লাহিড়ী। কী জানি বাপু, আমার বড্ড গোলমেলে লাগছে।
পিয়ালি তিন কাপ চা ট্রেতে করে এনে বলল, ও মা! লোকটা কোথায় গেল! চা নিয়ে এলুম যে!
নন্দিনী বললেন, তুই খা না মুখপুড়ি। সে চলে গেছে।
আমার চাও তো আছে।
তাহলে বলরামকে দে।
তোমার যেমন কথা! বলরাম হল নিষ্ঠে বামুন, বাইরের লোকের কাপে ঢালা চা সে খায় নাকি? জাত যাবে না?
তাহলে ফেলে দিগে যা।
ঝকমকে দাঁতে এক গাল হেসে পিয়ালি বলল, ফেলব কেন, আমিই দু—কাপ খেয়ে নিই।
নন্দিনী চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললেন, আমার সিরিয়ালটার আজ বারোটা বাজল। কতটা হয়ে গেল বলো তো!
কাল রিপিট শোটা দেখে নেবেন।
নন্দিনী সিরিয়ালটায় মন দিতে পারছেন না। মনটা বারবার নেকলেস, সাঁইদাস আর সরোজা দেবীতে ঘোরাফেরা করছে। চন্দ্রজিৎ সরকারি চাকরির সুবাদে দিল্লি, মুম্বই আর চেন্নাইতে থেকেছেন। কোথাও কোথাও তিন চার বছর ধরে। নন্দিনী নিজের কলেজের চাকরি ছেড়ে, স্বামীর সঙ্গে কখনো টানা বসবাস করেননি। তবে গ্রীষ্ম আর পুজোর ছুটিতে গিয়ে থেকে আসতেন। তাতে সম্পর্কটা যেন তরতাজা থাকত। দুজনে দুজনের কাছে একঘেয়ে বা পুরোনো হয়ে যাননি।
সরোজা দেবী কে, প্রশ্নে মনটা উচাটন। ক্লাবে ফোন করে চন্দ্রজিৎকে জিজ্ঞেস করবেন কিনা সেটা ঠিক করতে পারছিলেন না। ব্রিজ খোলার সময় কোনো বিক্ষেপ চন্দ্রজিৎ পছন্দ করেন না। তা ছাড়া দশটা সাড়ে দশটায় লোকটা তো ফিরে আসবেই। ততক্ষণ কষ্ট করে ধৈর্য ধরে থাকাই তাঁর যুক্তিযুক্ত মনে হল। সেন্টার টেবিলে রাখা কার্ডটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে দেখলেন নন্দিনী। প্লাস্টিকের ভারী সুদৃশ্য কার্ড। সাঁইদাস লাহিড়ী। সাঁই এন্টারপ্রাইজ। ওরলি। মুম্বই। নীচে কয়েকটা টেলিফোন নম্বর, ফ্যাক্স নম্বর, ই—মেল অ্যাড্রেস ইত্যাদি যেমনটা হয় আর কি। লেবু, বিট নুন আর আদা দেওয়া কালো চা—টা এ সময়ে খুবই উপভোগ্য লাগে নন্দিনীর। আজ যেন চায়ের কোনো স্বাদগন্ধই পেলেন না। পিয়ালিকে বললেন, জানালার একটা পাল্লা খুলে পরদা সরিয়ে দে তো! কেমন হাঁফধরা লাগছে!
পিয়ালি গিয়ে জানালার পাল্লা খুলে দিতেই কনকনে বাতাসের ঝাপটা এসে দুলিয়ে দিল দেয়ালের ক্যালেন্ডার।
এ বাড়িতে কাজে ঢুকে ভারী অবাক হয়ে গিয়েছিল মনসাবালা। বাসন মাজা নয়, ঘর ঝাঁট দেওয়া বা পোঁছা নয়, কাপড় কাচা হয় মেশিনে। কাজ বলতে ঝাড়ন দিয়ে ফার্নিচার আর দরজা জানালা মোছা, কুটনো কাটা, গিন্নিমার এটা ওটা এগিয়ে দেওয়া। এইটুকুন কাজের জন্য নাকি সাতশো টাকা! অবাক কাণ্ড! আর হ্যাঁ, কেউ এলে নীচে গিয়ে দরজা খুলতে হয়। কোরাকাঠির বাপের বাড়ি বা শ্বশুর বাড়ির গাঁয়ে তাকে এর চেয়ে দশগুণ খাটতে হত। রান্নাবান্না তো ছিলই, সেই সঙ্গে বাসন মাজা, উঠোন আর ঘর নিকোনো, ধান সেদ্ধ করে শুকোনো, চিঁড়ে কোটা, মুড়ি ভাজা, টিপকলে গিয়ে জল ধরা—কী নয়? এ বাড়িতে আসার সাত দিনের মধ্যে তার শরীর ফিরল। পায়ের হাজা সারল, আরও অনেক কিছু হতে লাগল। প্রথম প্রথম কি একটু আধটু মন খারাপ হত না? কান্না পেত না? সে হত বটে, বিশেষ করে শ্রীপতির জন্য। কখনো একটা বেফাঁস কথা কয়নি। তা ছাড়া গাঁয়ের মাটি, নদী, গাছপালা, আকাশ, টিয়ার ঝাঁক, শশা আর শাকের খেত সব কিছুই মনে পড়ত। বড্ড হু হু করত মন। কিন্তু দিন পনেরোর মধ্যেই সে সব যেন পালা জ্বরের মতো সেরে গেল। গিন্নিমা হয়ে গেল মা, বাড়ির কর্তা বাবা। বাড়ির ছেলে দাদা, তার বউ বউদি। মনসার নতুন নাম হল পিয়ালি। বেশ লোক এরা। দেওয়া থোওয়ার হাত আছে। প্রথম মাসে মাইনে দিয়েই গিন্নিমা বলল, টাকা কাকে পাঠাতে চাস? তোদের সুন্দরবনে মানিঅর্ডার যায় তো! পিয়ালি একটু ভাবনায় পড়ে গিয়ে বলে, তা আছে বোধহয়। আমরা তো কখনো চিঠি পত্তর পাইনা। পিয়ালি টাকাটা নিয়ে খুব কষে খানিক ভাবল। তার কি কোরাকাঠিতে মা বাবার কাছে টাকা পাঠানো উচিত? কিছু টাকা কি শ্রীপতির কাছেও পাঠানো উচিত নয়? কিন্তু ভেবে দেখল, মা বাবার সুখে দুঃখে চলে যাবে। টাকা গেলে তার মদখোর দাদাই সেটা উড়িয়ে দিয়ে আসবে শুঁড়িখানায়। আর শ্রীপতি মোটেই অভাবী লোক নয়। তার ভ্যানগাড়ি আছে, নৌকো আছে, ধানজমি আছে। সুতরাং সে টাকা পাঠাল না। গিন্নিমা তাকে তিনমাস বাদে স্টেট ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়। রাস্তাঘাট আজকাল সড়গড় হয়ে গেছে। পিয়ালি এখন নিজেই গিয়ে প্রতি মাসে ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে আসে। গাঁয়ে থাকতে লেখাপড়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল না। গত চার বছরে এ বাড়িতে সে যেমন মাইক্রোওয়েভ, ওয়াশিং মেশিন, মিউজিক সিস্টেম চালাতে শিখেছে, তেমনি কাজ চালিয়ে নেওয়ার মতো বাংলা, ইংরিজি আর অঙ্কও।
প্রথম কাজে ঢোকার চার পাঁচ মাস বাদে একদিন শ্রীপতি দেখা করতে এল। নীচে গিয়ে দরজা খুলে মানুষটাকে দেখে ভারী আহ্বাদ হয়েছিল সেদিন। এক গাল হেসে বলেছিল, তুমি এসেছ? ভাবতে পারছি না।
শ্রীপতি ভারী লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, দেখতে এলুম। এখানে সব ঠিক আছে তো! অসুবিধে নেই?
না না। ভীষণ ভালো বাড়ি। এসো, এই সিঁড়ির নীচেই বসতে হবে কিন্তু।
শ্রীপতি ঘাড় নেড়ে বলল, সেই ভালো।
দুজনে বসে কিছুক্ষণ কথা হল। তারপর শ্রীপতির জন্য কিছু খাবার আনতে ওপরে গিয়ে গিন্নিমাকে বলল, মা, দেশ থেকে আমার এক জ্ঞাতি ভাই এসেছে খবর নিতে। একটু রুটি তরকারি দিই? সেটা আবার জিজ্ঞেস করার কী আছে? রুটি তরকারির সঙ্গে একটা সন্দেশও দিস। ফ্রিজ থেকে বের করে নে।
শ্রীপতি ভারী যত্ন করে খেল। খাওয়া দেখে চোখে জল এল পিয়ালির। কেন এল তা কে বলবে!
আরও সাত আট মাসে যখন লোকটা এল তখন আর তেমন আবেগটা টের পেল না পিয়ালি। একটু যেন তফাত হয়ে গেছে দুজনের মধ্যে। তবে কথাটথা হল অনেক। শ্রীপতি বলেই ফেলল, দেখে মনে হয় এখানে বড্ড ভালো আছ তুমি। গাঁয়ে তো এত যত্নআত্তি পাও নি! থাকো তাহলে। শেষে বোধহয় একটা দীর্ঘশ্বাসও ফেলেছিল শ্রীপতি। পাছে তাকে নিয়ে যাওয়ার বায়না করে সেই ভয়ে কাঁটা হয়েছিল পিয়ালি। দেখা গেল শ্রীপতি সেই ধার দিয়েও গেল না। ভারী নিশ্চিন্ত লাগল তার।
এই বছরখানেক আগে থেকে একটা ঘটনা একটু একটু করে ঘটতে লেগেছে। ঘটনাটা ভারী অদ্ভুত। দুলাল নামে একজন ছোকরা কাঠমিস্তিরি এ বাড়িতে কাজে লেগেছিল। তার হাতের কাজ খুব ভালো। গিন্নিমা তাকে দিয়ে একটা মস্ত ঠাকুরের সিংহাসন করালেন। সে ভালো ঝুন কাঠ নিয়ে এসে গ্যারেজ ঘরের এক কোণে কাঠ কুঁদে কুঁদে সিংহাসনটা বানাচ্ছিল। মাঝে মাঝে তাকে চা—বিস্কুট দিয়ে আসতে পিয়ালিকে পাঠাত গিন্নিমা। পিয়ালি চা পৌঁছে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দুলালের কাজ দেখত। তন্ময় হয়ে কাজ করত দুলাল। এক ডাকে সাড়া পাওয়া যেত না। করাত, হাতুড়ি, বাটালি, ছেনি, র্যাঁদা, কত যে তার যন্ত্রপাতি। কাজ করতে করতে প্রায়ই তার চা যেত ঠান্ডা হয়ে। পিয়ালি ঝংকার দিত—বলি, চা—টা খাবে নাকি? আমি বাপু এঁটো কাপের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। দুলালের স্বভাব ভারী ভালো। ঝকঝকে দাঁতে হেসে বলত, ওঃ, চা এনেছ বুঝি? আমার কাজের সময় কেমন যেন মাথায় ভূত চাপে। দাও, ঠান্ডাই মেরে দিই।
কিন্তু মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো ছিল তার হাতের কাজ। মাস খানেকের মাথায় যখন সিংহাসনটা শেষ হল তখন যে দেখে সেই দশমুখে তারিখ পরে। সিংহাসন তো নয়, যেন একখানা মন্দির। তার সর্ব অঙ্গে কারুকার্য, পনেরো হাজার টাকার বরাত ছিল। গিন্নিমা খুশি হয়ে আরও হাজার টাকা দিয়ে বলল, তোমার হাতের কাজ যখন এতই ভালো, তাহলে আমাকে বাবা আরও কিছু আসবাব করে দাও। ইংলিশ খাট আমার বড্ড ন্যাড়া ন্যাড়া লাগে। আমাকে আগের দিনের মতো খুব কারুকাজ করা একখানা পালঙ্ক করে দাও। সঙ্গে ম্যাচিং টেবিল, বুককেস।
দুলাল সবই করে দিল। সেগুলোও হল দেখার মতোই। তার দুঃখ নিজের দোকান নেই, ঘুরে ঘুরে কাজ করতে হয়। মানিকতলার এক ফার্নিচারের দোকানে দুলাল চুক্তিমতো কাজ করে দেয়। সেই দোকানেই রাতে থাকে।
গিন্নিমা একদিন তাকে বললেন, আমার আউট হাউসটা ফাঁকা পড়ে আছে। সেখানে থাকতে পারিস। বদলে আমার বাইরের ফাইফরমাস খেটে দিস, বাজার করে দিস।
ছয় মাস হল দুলাল আউট হাউসে আছে। সকালে বাগানে জল দেয়, দরকার হলে দোকানপাটে গিয়ে দরকারি জিনিস এনে দেয়। বেলা এগারোটা বারোটায় বেরোয়, রাত দশ সাড়ে দশটায় ফেরে। এ বাড়ির দু'দুটো গাড়ি সেই ধোয়ামোছা করে। তা ছাড়া সে ইলেকট্রিকের কাজ জানে, জামাকাপড় ইস্তিরি করতে পারে, প্লাম্বিং করতে পারে। তা ছাড়া বাড়ির একটা পাহারার কাজও হয়। গিন্নিমা একদিন পিয়ালিকে বলল, হ্যাঁ, রে, দুলালকে তোর পছন্দ হয়?
পিয়ালি ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠল আতঙ্কে। বলল, ও কী কথা মা?
কেন রে, খারাপ কী বললুম বল তো! সেও তো শুনি বাদা অঞ্চলের ছেলে। তোর সঙ্গে তো দিব্যি মানায়।
পিয়ালির মুখ শুকিয়ে গেল। বলল, তাই কি হয়?
কেন রে, তোর কি বিয়ের বয়স হয়নি? আমার তো ইচ্ছে তোরা দুটিতে আমার কাছেই থাক। তুই যেমন আমার কাজ করছিস তেমনি করবি। দুলালকে যত্নআত্তি করবি। বেচারার তো শুনেছি মা—বাপ নেই। হাতের কাজই ভরসা। দেখবি, একদিন ও বেশ উন্নতি করবে। পছন্দ নয় কেন রে?
পিয়ালির মনে হচ্ছিল, এ কথা শোনাও পাপ হচ্ছে। সিঁদুর লুকিয়ে কাজে ঢুকেছে বটে, কিন্তু তা বলে বিয়েটা তো আর মিথ্যে হয়ে যায়নি! সে কিছুই বলতে পারল না। তবে ভয়ে বড্ড গুটিয়ে গেল। বুকের মধ্যে গুড়গুড় করতে লাগল তার।
গিন্নিমা বলল, তোর চেহারাখানা ভালো, মনে হয় দুলালেরও তোকে মনে ধরেছে। সে তো ফচকে ছেলে নয়! চেহারায়, বয়সে সব দিক দিয়েই তো তাদের মানায়। দুলালটাকে যদি বেঁধে ফেলতে পারিস তাহলে তোরও ভবিষ্যতের ভাবনা থাকবে না। তোদের তো আরও অল্প বয়সেই বিয়ে হয়, তবে ওরকম করছিস কেন?
পিয়ালি পালাতে পারলে বাঁচে। রাতে সে প্যাসেজের বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে খুব কাঁদল। এসব কেন হচ্ছে? তার কি উচিত হবে শ্রীপতির কাছে ফিরে যাওয়া? কিন্তু তাই বা হবে কী করে? এ বাড়ির সুখ আরাম ছেড়ে সে কি ওই গাঁয়ে গিয়ে থাকতে পারবে এখন? মাথাটা বড্ড গরম হল তার। অনেক রাত পর্যন্ত এপাশ ওপাশ করল, ঘুম হল না ভালো করে। পরদিন সকালেই দুলালের সঙ্গে নীচে দেখা। পিয়ালি দরজায় গুঁজে রাখা খবরের কাগজ আনতে গিয়েছিল। মুখোমুখি হতেই দুলাল তার বেজায় সুন্দর হাসিটা হেসে বলল, তোমার মুখটা অমন শুকনো কেন?
এমনি।
একটা কথা কইব তোমাকে?
শক্ত হয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে সে বলল, বলো। এ বাড়ির মা তোমাকে কিছু বলেছে? পিয়ালি মুখ নামিয়ে চুপ করে রইল। দুলাল খুব সরল মুখে বলল, আমার চালচুলো নেই বটে, বাপের কাছ থেকে যেটুকু হাতের কাজ শিখেছি তাই ভরসা। বাদায় একখানা টিনের ঘর আছে আর দু বিঘে জমি, কিন্তু তার তিনজন ভাগিদার। সব বললুম তোমাকে, কিছু লুকোছাপা নেই।
পিয়ালি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, বিয়ের কথাটা কে তুলল? তুমি?
দুলাল ফের হাসল। বলল, না গো, আমি তুলিনি। ইচ্ছে ছিল আগে একখানা দোকান টোকান দিয়ে বসি, তারপর সংসার করার কথা ভাবব। এখন টাকা জমাচ্ছি। তবে এ বাড়ির মা যখন বলল, হ্যাঁ রে দুলাল, পিয়ালিকে বিয়ে করবি, তখন শুনে আমার মন্দ লাগল না। তুমি একটা বেশ মেয়ে।
পিয়ালি একবার চোখ তুলে তাকাল দুলালের দিকে। দাঁড়িয়ে শুধু হাসছে, ওর হাসিটা বরাবর ভালো লাগে পিয়ালির। সোজা সরল মানুষ, বিভোর হয়ে কাজ করে শুধু। সংসারের ঘোরপ্যাঁচ তেমন জানে না। শ্রীপতির সঙ্গে খানিকটা যেন মিলও আছে। তফাত হল শ্রীপতির তেমন আলাদা গুণ নেই।
শ্রীপতির তেমন আলাদা গুণ নেই।
পিয়ালি ঠোঁটটা কামড়ে বলল, আমার এখন ওসব নিয়ে ভাববার সময় নেই।
দুলাল একটু যেন থতিয়ে গিয়ে বলল, রাগ হল নাকি?
না, রাগ নয়। আমার তো মনে হয়, এই বেশ আছি।
তা তো ঠিকই। কিন্তু এরকম ভাবে তো সারাজীবন কাটবে না।
মেয়েরা কি একা একা জীবন কাটাতে পারে?
আমার কথা ভেবে ঘুম হচ্ছে না বুঝি?
সত্যি কথা বলব?
আবার কী কথা?
তুমি হলে বড় ভালো হয়। তুমি বড় সাব্যস্তের মেয়ে।
তার মানে কী?
আমার মা বলত, সাব্যস্ত মানে সব দিকে নজর, বুদ্ধি বিবেচনা এই সব আর কী? বাড়ির মাও বলেন, পিয়ালি শুধু গতরে খাটে না, বুদ্ধিও খাটায়।
ঝি হিসেবে ভালো, বউ হিসেবে ভালো কিনা তা কে বলবে?
এটাও তো বেশ বুদ্ধির কথা বললে! আমি কেমন বর হয়ে দাঁড়াব তা কি আমিই জানি? শুধু মনে হয়, আমার পিছনে একটা আপনজন কেউ থাকলে বড় ভালো হত। শুধু মেয়েমানুষ নয় কিন্তু, আপনজন, নিজের জন। বুঝলে!
পিয়ালি বুঝল। কিন্তু রাতে ফের চুপি চুপি কাঁদল, ভাবল। ঠিক বটে তাদের সমাজের স্বামী—স্ত্রীর ছাড়ান কাটান আকছার হয়। কেউ তো আর তা নিয়ে আইন আদালত করে না। তবে বদনাম হবে একটু। কিন্তু কথা সেটা নয়। কথা হল, তার ভিতরে একটা দোটানা দেখা দিয়েছে।
তিন চারদিন পরেই একদিন বেলা দশটায় শ্রীপতি এসে হাজির। তাকে দেখে পিয়ালির যে কী হল, চোখের দিকে মোটেই তাকাতে পারে না। শ্রীপতি কোনো দাবি—দাওয়া নিয়ে আসে না, সে জানে। কোনোদিন একটা পয়সা চায়নি তার কাছে, টেনে নিয়ে যেতে চায়নি গাঁয়ে। বরং ভারী লজ্জা আর বোকা—বোকা মুখ করে ভয়ে ভয়ে দু—চারটে কথা বলেই চলে যায়। গা ছোঁয়ারও চেষ্টা করে না। পিয়ালি ভালো করে কথাই কইল না সেদিন। তাড়াতাড়ি দুটে রুটি খাইয়ে, 'কাজ আছে' বলে বিদায় করে দিল।
দোটানা ভাবটা কয়দিন ছিঁড়ে খাচ্ছিল তাকে। হ্যাঁ বটে, শরীর, মন সবকিছুই একজন কাউকে লতিয়ে নিয়ে বেড়ে উঠতে চায়। দুলালকে বিয়ে করলে তার দু—দিক রক্ষা হয়। এ বাড়িতে থাকা এবং সংসার ধর্ম। তার মন ধীরে ধীরে, খুব ধীরে ধীরে দুলালের দিকে ঝুঁকে পড়ছে, সে বুঝতে পারছিল। শ্রীপতি অশান্তি করবে না, সে জানে। জোর জবরদস্তি করা বা এসে চেঁচামেচি করে হাল্লাচিল্লা ফেলে দেওয়ার লোকও সে নয়। তবে শ্রীপতির কথা জানাজানি হবে, এটাও ঠিক। ব্যাপারটা দুলালকে একদিন বুঝিয়ে বলতে হবে।
তবে তার ভয়—ভয় করছে। মন কু গাইছে। কেমন পাপের গন্ধ পাচ্ছে সে। নীচের তলায় এক জোড়া স্বামী—স্ত্রী ভাড়া ছিল এতকাল। তারা সারাদিন বাসায় থাকেই না। সকালে বেরোয়, অনেক রাতে আলাদা আলাদা ফেরে। মেয়েটা নাকি খবরের কাগজে চাকরি করে, ছেলেটা কোন কোম্পানিতে। একদিন রাতে রাতের তুমুল ঝগড়া লাগল। চেঁচামেচি গভীর রাতে দোতলাতেও পৌঁছে গিয়েছিল। শুনে চুপি চুপি নেমে এসেছিল সে আর প্রমিতা। কী গালাগাল যে করছিল দুজনে দুজনকে। ইংরিজিতে, বাংলায়। তখনই জানা গেল, তারা মোটে স্বামী—স্ত্রীই নয়। বিয়ে টিয়ে হয়নি। একসঙ্গে থাকে। সেই রাতেই মেয়েটা চলে গেল।
রাত্রি দশটার সময় গাড়ি চালিয়ে ফিরছিলেন চন্দ্রজিৎ। মনটা কিছু বিক্ষিপ্ত। শেষ ডিলটায় গেমটা হয়ে যাওয়ার কথা। চারটে নো ট্রাম্পের খেলা। কন্ট্রাক্ট ব্রিজ অতি সূক্ষ্ম ক্যালকুলেশনের ব্যাপার। ডামি থেকে স্পেডের বিবি খেললেই তিনটে পিট অনায়াসে চলে আসত। ওই একটা ভুলেই...
কথা হচ্ছে, ভুলভ্রান্তি হচ্ছে কেন? বুড়ো হচ্ছেন নাকি? বুড়ো বয়সে মাথায় কুয়াশা জমে, রিফ্লেক্স কমে যায়। নিজেকে বুড়ো ভাবা তাঁর কখনো পছন্দ নয়। ভাবেনও না। সকালে হাঁটা, ব্যায়াম করা, খাদ্য নিয়ন্ত্রণ এবং মনকে উদ্বেগমুক্ত রাখার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়েও বার্ধক্য কি নানা রন্ধ্রপথে ঢুকে পড়তে চাইছে তাঁর সত্তায়? আগে ষাট পেরোলে লোকে জড়ভরত হয়ে যেত। আজকাল তো তা নয়। আশি নব্বই পেরিয়েও বিস্তর লোক নানাবিধ গুরুতর কাজ করে যাচ্ছে। আর তিনি একটা উটকো ভুল করে ফেললেন ছেলেমানুষের মতো! তাঁর পার্টনার সঞ্জিৎ রায় তো বলেই ফেলল, এ কী দাদা, এটা যে আনাড়ির মতো খেলা হল!
লজ্জাটা এখনও লিঙ্গার করছে মনের মধ্যে। স্পিডোমিটারে চোখ পড়তেই ভ্রু কুঁচকে গেল তাঁর। বাপ রে! বে—খেয়ালে নব্বই কিলোমিটারের কাছাকাছি স্পিড তুলে ফেলেছেন। সচরাচর পঞ্চাশ থেকে ষাটের বেশি গতিতে চালান না কখনো। রাস্তা ফাঁকা থাকলেও না। আসলে ভিতরকার উত্তেজনা শরীরে ছড়িয়ে গেছে। তাই পা শক্ত হয়ে বসেছে অ্যাকসেলেটরের ওপরে।
গতি কমিয়ে তিনি সল্ট লেকের নির্জন পথে ঢুকে পড়লেন। মন থেকে শেষ ডিলটা তাড়াতে পারছেন না। ভিতরে শরীর, মন, বোধ ও বুদ্ধির মধ্যে কো—অর্ডিনেশন ছিন্নভিন্ন হয়ে আছে। এত অসতর্ক মানুষ তিনি নন।
বাড়িতে ঢুকবার সময় একবার হর্ন দেন চন্দ্রজিৎ। সেই শব্দে পিয়ালি দরজা খুলে দেয়। আজও দিল। গাড়ি গ্যারাজে ঢুকিয়ে চন্দ্রজিৎ সদর পেরিয়ে নিজের ঘরে এসে জামাকাপড় বদলান। কারও দিকে তেমন তাকিয়ে দেখেন না। আজ আবার প্রবল অন্যমনস্কতা রয়েছে। মাথাটাও গরম। চারপাশটা যেন আবছা আবছা। কোনো ছাপ পড়ছে না মনে, চোখে, বোধে, যেন চারপাশে কেউ নেই।
হাত মুখ ঠান্ডা কনকনে জলে ধুয়ে তিনি শোওয়ার ঘরে এসে বিছানায় একটু বসলেন। দরজাটা বন্ধ রাখতে হয়। সামনের ঘরে রাত এগারোটা পর্যন্ত টিভি চলে।
সেই শব্দে ঘুম আসতে চায় না। শুতে যাচ্ছিলেন, দরজা ঠেলে নন্দিনী ঘরে ঢুকলেন।
শোনো, একটু কথা আছে।
অন্ধকারেই স্ত্রীর মুখের দিকে চেয়ে বললেন, বলো।
মুম্বই থেকে সাঁইদাস লাহিড়ী নামে একটা ছেলে আজ তোমার খোঁজে এসেছিল।
সাঁইদাস লাহিড়ী!
হ্যাঁ। চেনো?
নাম থেকে তো চিনতে পারছি না। কী চায়?
সরোজা দেবী নামে কেউ আছে তোমার চেনা?
এক সেকেন্ড চুপ করে থেকে চন্দ্রজিৎ বললেন, সরোজা!
হ্যাঁ।
কী ব্যাপারটা বলবে?
সরোজা দেবী তোমাকে একটা নেকলেস পাঠিয়েছেন।
আবার একটু চুপ থেকে চন্দ্রজিৎ বললেন, নেকলেস!
হ্যাঁ। তোমার রি—অ্যাকশন দেখে মনে হচ্ছে, চেনো।
চন্দ্রজিতের মনটা এখনও বিক্ষিপ্ত। বিরক্তির সঙ্গে বললেন, অমন গোয়েন্দার মতো জেরা করছ কেন? এটা তো রহস্যকাহিনি নয়! জেরা করব কেন? সিম্পলি জানতে চাইছি। রহস্যকাহিনি কিনা তা তুমিই জানো। কারণ আমি এদের নাম কখনও তোমার মুখে শুনিনি।
চন্দ্রজিৎ এবার একটু রেগে গিয়ে উঁচু গলায় বললেন, আমি কয়েক হাজার লোককে চিনি। তাদের সকলের কথা কি তোমাকে বলা সম্ভব? আর বলতে যাবই বা কেন? বলতে হবেই না কেন? চেঁচিও না। একজন মহিলা তোমাকে একটা দামি নেকলেস কেন পাঠাল সেটা জানার কৌতূহল কি আমার হতে পারে না? কৌতূহল হলে কথা ছিল না। কিন্তু তোমার কথায় একটা সন্দেহও বেরিয়ে আসছে।
সেটা কি অন্যায়? আমি জানতে চাই সরোজা দেবী কে?
বলব না। নান অফ ইওর বিজনেস। তুমি যেতে পারো।
ছোটলোক ইতরের মতো মেজাজ দেখিও না। আমি তোমার অন্নে প্রতিপালিত নই, তোমার ওপর নির্ভরও করি না। কাকে মেজাজ দেখাচ্ছ?
আমি কি তোমার বাপেরটা খাই না পরি? তুমি আমাকে ধমকানোর কে? তোমাকে কি আমার সব কাজের কৈফিয়ত দিতে হবে? সেই অধিকার অর্জন করেছ কখনো?
লোকে জানে আমি তোমার স্ত্রী, আইনসংগত স্ত্রী। স্ত্রীর অবশ্যই সবকিছু জানবার অধিকার আছে।
থাকত, যদি তুমি শুধু আইনসংগত স্ত্রী না হয়ে প্রকৃত স্ত্রী হতে। তোমার সঙ্গে আমার স্বামী—স্ত্রীর সম্পর্ক কবে হল? চিরকাল তো নিজের কেরিয়ারের জন্য কলেজে পড়ে রইলে। আমি কী খাই, কী পরি, তার খবর নিয়েছিলে কখনো? শুধু ভ্যাকেশনে গিয়ে মুখ দেখিয়ে আসতে। চমৎকার ব্যবস্থা, রাত এগারোটায় এখন স্ত্রীর অধিকার ফলাতে এসেছেন!
প্রমিতা বোধহয় মেয়ের ঘরে ছিল। এবার ছুটে এসে তাড়াতাড়ি নন্দিনীকে পিছন থেকে দু—কাঁধে ধরে বলল, মা, শান্ত হোন! শান্ত হোন! এত উত্তেজিত হওয়ার মতো কিচ্ছু হয়নি তো!
নন্দিনী ফুঁসে উঠে বললেন, হয় নি! কিছু না হলে তোমার শ্বশুর অমন ষাঁড়ের মতো চেঁচাত? কথায় বলে, চোরের মায়ের বড় গলা। পাপ ঢাকতে চেঁচিয়ে পাড়া মাত করছে।
এবার গলা সপ্তমে উঠে গেল চন্দ্রজিতের। পাপ! কিসের পাপ! অ্যাঁ! কিসের পাপ? ডুবে ডুবে জল খেলে বুজি একাদশীর বাপেও টের পায় না, না? সুজিত রায়ের সঙ্গে তোমার লটর পটরের কথা আমি জানি না ভেবেছ? সেটা তো আজকের নয়। লং ফিফটিন ইয়ার্স। কী বললে! কী বললে তুমি! তোমার জিব খসে পড়ল না?
কেন জিব খসে পড়বে? সত্যি কথা বললে জিব খসে পড়ে নাকি? তুমি এতদূর নীচ! এত অধঃপতন তোমার?
আমার অনেক আগে তোমার অধঃপতন শুরু হয়েছিল। জানতে চাও সরোজা কে? তুমি যা বলে সন্দেহ করছ তাই। আর সাঁইদাস আমার ছেলে। আসল ছেলে। কিছু বলার আছে তোমার?
নন্দিনী থরথর করে কাঁপছিলেন। প্রমিতা তাঁকে জড়িয়ে ধরে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল, মা, এখন চুপ করে থাকুন। বাবা এখন ভীষণ রেগে আছেন। এ বয়সে এত রাগ হলে হার্টে প্রেশার পড়বে।
সামনের ঘরে দেয়ালে পিঠ দিয়ে দু—হাতে শক্ত করে কান চেপে বিস্ফারিত চোখে দাঁড়িয়ে ছিল পিয়ালি। ডোরবেল বাজতেই হঠাৎ হরিণের গতিতে তরতরিয়ে নীচে নেমে গেল।
একটু বাদে যখন সত্রাজিৎ ঘরে এসে ঢুকল তখন ঘরের সব আসবাবপত্র স্বাভাবিক। সংসারের কোথাও কোনো ভাঙচুর বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে না। নিচু হয়ে জুতো মোজা ছাড়তে ছাড়তে সে বলল, ফাঁকা ঘরে টিভি চলছে কেন রে? মা কোথায়, তোর বউদিই বা কোথায় গেল?
ফ্যাঁসফ্যাঁসে গলায় কোনোরকমে পিয়ালি বলল, ঘরে আছে।
ও।
নিজের ঘরে অন্ধকারে গুম হয়ে বসে আছেন চন্দ্রজিৎ। হুইস্কিটা যেন মাথায় উঠে বসে আছে। মাথার মধ্যে ঘূর্ণিঝড়ে উড়ছে খড়কুটো। স্থির চিন্তা অসম্ভব। রাগ আর ঘেন্না রক্ত কণিকায় বুঝি স্ফুলিঙ্গের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। নন্দিনীকে তিনি ঘৃণা করেন। এত ঘৃণা তিনি পৃথিবীর আর কাউকে করেন না।
তিনি কি কোনো অন্যায় করেছেন? অনেক বিচার করে দেখেছেন চন্দ্রজিৎ। না, তিনি কোনো অন্যায় করেছেন বলে তাঁর মনে হয় না। তাঁর বিবেকে কোনো দাগ নেই। একজন লম্বা চওড়া, সক্ষম যুবক নারীসঙ্গ চাইতেই পারে। তিনি স্ত্রীকে বহুবার বলেছেন, তিনি যথেষ্ট রোজগার করেন, চাকরির বাহানায় স্ত্রীর ওই দূরে সরে থাকা তাঁর পছন্দ হচ্ছে না। কিন্তু কিছুতেই চাকরি ছাড়তে রাজি হয়নি নন্দিনী। পুজো বা গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়ানোর মতো আসত বটে, তাও প্রতি ছুটিতে নয়। পরীক্ষার খাতা দেখা, শরীর খারাপ, বাবার অসুখ—নানা টালবাহানায় বিরহী যক্ষের কাছে সে অধরা থেকেছে। অথচ একজন ক্ষুধার্ত পুরুষ অপেক্ষা করেছে তার জন্য। সরোজা ছিল তাঁরই অফিসের একজন কর্মচারী। খুব মিশুকে স্বভাবের। চেহারাটি মিষ্টি। প্রথম প্রথম নিজের টিফিনের বাক্সে তাঁর জন্য খাবার নিয়ে আসত, পান খাওয়াত। এইভাবেই সূত্রপাত হয়েছিল। তারপর যা হওয়ার কথা তাই হয়েছিল। নন্দিনীকে ডিভোর্স করে সরোজাকে বিয়ে করা সহজ ছিল না। এদেশে ছেলেরা যে সহজে ডিভোর্স পায় না তা মারাঠি উকিল বুঝিয়েছিল তাঁকে। তাই আর চেষ্টা করেননি। সরোজা সাহসী মেয়ে, সংস্কারমুক্ত, বিয়ের জন্য চাপও দেয়নি তাঁকে। বলেছিল, আই শ্যাল রিমেন এ সিঙ্গল মাদার। বুদ্ধিমতী মেয়ে, নন্দিনী যখন মুম্বই যেত কখনো দেখাসাক্ষাৎ করার চেষ্টা করেনি। নারীমুক্তি মোর্চার সংগঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকত সে। সেই সংগঠন কুমারী মায়েদের পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করত দেশ জুড়ে।
সরোজার গর্ভস্থ সন্তান বিষয়ে যখন চন্দ্রজিৎ খুব উদ্বেগে রয়েছেন, তখন সরোজা তাঁকে একদিন বলেছিল, তুমি ভেবো না যে, তুমিই আমাকে নষ্ট বা অন্যায়ভাবে ব্যবহার করেছ। ব্যাপারটা তা নয়। আমিও তোমাকে ব্যবহার করেছি। সুতরাং তোমার অনুতাপের কোনো দরকার নেই। পুরুষ ও মহিলার মধ্যে মুক্ত সম্পর্কের তো আমি পক্ষপাতীই।
তার উদারতা দেখে চন্দ্রজিৎ মুগ্ধ। এমনিতে তিনি যে এরকম মুক্ত সম্পর্কের সমর্থক তা নয়। কিন্তু ওই সংকটের সময় ওই আশ্বাসবাক্য মন্ত্রের মতো কাজ করেছিল।
সরোজার ছেলে যখন জন্মায় তখন চন্দ্রজিৎ দিল্লিতে। সরোজা যখন ফোনে তাঁকে খবরটা দিয়েছিল, তখন ভারী অদ্ভুত লেগেছিল তাঁর। তিনি বাবা হয়েছেন, কিন্তু বৈধ বাবা নয়। এটা যে কীরকম ব্যাপার দাঁড়াল, সেটা তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। খুশি হচ্ছেন আবার একটা হাহাকারও হচ্ছে।
বছর বারো আগে মুম্বই গিয়ে সরোজার সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। সরোজাকে গম্ভীর, শান্ত, গভীর বলে মনে হয়েছিল তাঁর। তখনই বলেছিল, দ্যাখো, কোনো কৃতকর্মকে গোপন রাখা দুর্বলতা, আমি চাই, তুমি অকপটে তোমার বউকে সব বলে দাও। আমার কথা, সাঁইদাসের কথা।
চন্দ্রজিৎ ভয় পেয়ে বললেন, তা হলে যে খুব অশান্তি হবে। হোক না। তুমি কি মনে করো তুমি গর্হিত কোনও পাপ করেছ? যদি তাই মনে হয় তবে সেটা তোমার স্ত্রীর কাছে গোপন করা আরও পাপ। অকপট হয়ে দ্যাখো। প্রথমে অশান্তি হবে, কিন্তু তারপর তুমি মনে শান্তি পাবে। আমাকে দ্যাখো, আমি তো এই সমাজের মেয়ে হয়েও লুকোইনি যে আমি এক কুমারী মা।
আমি তোমার মতো সাহসী নই।
তা হলে নিজেকে তোমার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লম্পট বলে মনে হবে। আমার মনে হয়, তোমার বউয়ের কাছে এখনই সব খোলাখুলি বলে দেওয়া উচিত। তোমার ছেলেকেও বলো। বললেই দেখবে মনের ভার কমে গেছে। আমি তো উসির কাছেও কিছুই লুকোইনি। আমার ওপর তাতে তার শ্রদ্ধা নষ্ট হয়নি। আমার মনে হয় মানুষ অকপট হতে পারে না বলেই চোরের মতো অপরাধবোধ নিয়ে থাকতে হয়। তাতে অনেক বেশি কষ্ট।
চন্দ্রজিৎ অবশ্য তা পেরে ওঠেনি। তাঁর সাজানো শান্তির সংসার, তাতে বজ্রাঘাত করার সাহস তাঁর হল কই?
সরোজা শেষ অবধি একটা কথাই তাঁকে বারবার বলেছিল, কনফেস, প্লিজ কনফেস। দুনিয়ার মুখোমুখি সোজা হয়ে দাঁড়াও। পশুপাখিরাও মিথ্যে কথা বলে না, মিথ্যাচার করে না। আমরা কি তাদের চেয়ে বেটার স্পিসিস নই?
কয়েক মাস আগে উসি অর্থাৎ সাঁইদাস কলকাতায় তার ব্যবসার কাজে এসেছিল। সে বরাবর কলকাতায় এলে চন্দ্রজিৎকে ফোন করে খুব সৌজন্য ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করে, খোঁজখবর নেয়। তাঁকে 'স্যার' বলে ডাকে বরাবর। সে খবর দিয়েছিল, সরোজা এখন আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করে। কারও সঙ্গে তেমন সংযোগ রাখে না। উসি যে আজ এসে সরোজাকে বহুদিন আগে তাঁর উপহার দেওয়া নেকলেসটা ফেরত দিয়ে গেছে সেটা এমনি নয়, তা চন্দ্রজিৎ বুঝতে পারছেন। নেকলেস ফেরত পাঠানোর মধ্যে সেই পুরোনো বার্তাই পাঠিয়েছে সরোজা, কনফেস, প্লিজ কনফেস। কনফেস করার কথা ইদানীং ভাবছিলেন চন্দ্রজিৎ। কিন্তু উপায় এবং সঠিক সময়টা নির্ধারণ করতে পারছিলেন না। আজ উত্তেজিত হয়ে আচমকা বলে দিয়েছেন। হয়তো এভাবে না হলে পেরে উঠতেন না কোনোদিন। হ্যাঁ, তাঁর মুখ দেখাতে লজ্জা করছে। ঘরের আলোটা জ্বালতেও হচ্ছে সংকোচ। তাঁর বৈধ ছেলে সত্রাজিৎ একটু বাদেই সব জেনে যাবে। ওরা সবাই ঘেন্না করবে তাঁকে। করুক। চন্দ্রজিৎ চিৎ হয়ে শুয়ে বাঁ হাতটা আড়াআড়ি চোখের ওপর চেপে চুপ করে শুয়ে রইলেন। আজ রাতে ওরা আর তাঁকে ডিস্টার্ব করবে না। এখন ওদের অনেক রাত অবধি মিটিং হবে। যা হওয়ার হোক। তবে তাঁর রাগটা কমে গিয়ে শরীর অবসন্ন লাগছে।
ঘরদোরে কতকাল ঝাঁটপাট পড়ে না। ঘরখানা পাকাই করেছিল বটে শ্রীপতি। ওপরে নতুন টিন। ঝাড়লে মুছলে একটু ছিরি ফিরত। তা কে আর ওসব ঝঞ্ঝাট করতে যাবে! বাস্তুজমি ছিল বাগান সমেত দু—বিঘের ওপর। তার দুই সাদা গয়াপতি আর পশুপতি নিজেদেরটা আলাদা করতে গিয়ে তাকে মোটে পাঁচ কাঠা ছেড়েছে। চাষের জমি বিঘে দশেক আছে বটে, কিন্তু দেখাশুনো না করলে, নিজে না গত খাটালে আয়পয় তেমন নেই। চারটে ভ্যানগাড়ির মধ্যে একটার চাকা ভেঙে কেতরে পড়ে আছে উঠোনের কোণে, তিনটে বন্দোবস্তে দিয়েছে। কিন্তু আদায় উশুল করার তাগিদটাই নেই বলে কেউ তেমন পয়সা ঠেকায় না। দুপুরে ঘরে বসে সাত পাঁচ ভাবছিল শ্রীপতি। মাসির কথামতো একটা পোস্টাকার্ড জোগাড় করে মনসাকে একটা চিঠিও লিখেছে সে। একটা লাইনে একথাও লিখেছে, মাসি আবার আমার বিয়ে দেওয়ার কথা বলছে। আমি বলি, সে কি হয়?
কিন্তু চিঠিটা পোস্ট করেনি সে। পকেটে থেকে থেকে পোস্টকার্ডটা নেতিয়ে গেছে। চিঠিটা পোস্ট করা উচিত হবে কি না সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না সে। চিঠি দেওয়াটা বোধহয় ঠিক হবে না। সর্বনাশটা করেছিল বিশ্বাসদাদা। কোরাকাঠির মানুষ। কলকাতায় কোনো ঠিকাদারের রাজমিস্তিরি, যে বাড়িতে মনসা কাজ করে সেই বাড়িখানায় কাজ করেছিল। সেই সূত্রে বাড়ির গিন্নিমার সঙ্গে ভাব হয়। গিন্নিমা গাঁ থেকে একটা খাটিয়ে পিটিয়ে কাজের মেয়ে এনে দিতে বলেছিল তাকে। সেই যে মনসাকে কাজে ঢোকাল তারপর বিশ্বাসদাদার আর দেখা নেই। দেখা হলে শ্রীপতি একবার জিজ্ঞেস করত, তার নতুন বিয়ের বউটাকে অমন লোভ দেখিয়ে ঘরছাড়া করাটা কি ঠিক হয়েছে বিশ্বাসদাদার? গাঁ ঘরের মেয়ে, বড়লোকের বাড়ির ব্যবস্থা দেখে মাথা ঘুরে গেছে।
ঘরে ইঁদুর দৌড়োদৌড়ি করছে খুব। চৌকির নীচে চালের বস্তা আছে কয়েকটা। সেইখানেই যাতায়াত। গ্রীষ্মে বর্ষায় সাপও ঢোকে। ওসব তেমন গ্রাহ্য করে না শ্রীপতি। মনটা বড্ড এলিয়ে পড়েছে। নইলে এক সময়ে সে অসুরের মতো খাটত। বাস্তুজমিটা ছাড়া বাপের তো তেমন কিছু পায়নি সে। মাইক ভাড়া দিয়ে, ভ্যান চালিয়ে নৌকোয় মালামাল পার করে উদয়াস্ত খেটে পাকা ঘর, জমিজিরেত করেছিল। সেই অসুরটা যে কোথায় গিয়ে গা—ঢাকা দিল, কে জানে! এখন পড়ে আছে শুধু খোলটা।
বাইরে থেকে কে যেন তার নাম ধরে ডাকছে, শ্রীপতিবাবু আছেন নাকি! শ্রীপতিবাবু!
গলাটা চেনা নয়। এ তল্লাটে তাকে বাবু বলে ডাকেই বা কে? শ্রীপতি বাইরে এসে দেখল, পাতলা চেহারার একজন তার বয়সি ছেলেই দাঁড়িয়ে আছে। চারদিক চেয়ে চেয়ে দেখছে। দেখার মতোই দৃশ্য বটে। সারা উঠোন জুড়ে গাছের পাতা, ছোট ছোট শুকনো ডালপালা, খড়কুটো পড়ে আছে। ঝাঁট পড়েনি, নিকোনো হয়নি।
তুলসী মঞ্চে তুলসী গাছটা শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে। জল দেওয়া হয়নি গাছে।
কাকে খুঁজছেন?
আপনিই কি শ্রীপতিবাবু?
হ্যাঁ।
ছোকরা ভারী সুন্দর হাসল। বলল, বাড়িতে ঢুকে চারদিকে দেখে মনে হচ্ছিল, বাড়িতে বহুকাল কেউ নেই বুঝি!
শ্রীপতি হেসে বলল, না থাকার মতোই আছি।
আমার নাম দুলাল দাস। কলকাতা থেকে আসছি। গোসাবার দিকে বাড়ি। তা দেশেই যাচ্ছিলাম। ভাবলাম একবারটি দেখা করে যাই। কলকাতা থেকে আসছে শুনে শ্রীপতি একটু খাতির করে বলে, তা ভিতরে এলে হয়।
ভিতরে এলে হয়।
ভিতরেই ভালো। একটু কথা আছে।
লোহার চেয়ারটায় ছোকরাটাকে বসিয়ে নিজের চৌকির বিছানাটায় বসল শ্রীপতি। ছোকরা ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরটা দেখছিল। ঝুল, মাকড়সার জাল, মেঝেময় ধুলো, বিছানায় ময়লা চাদর। দেখার মতোই ব্যাপার।
ছেলেটা তার দিকে চেয়ে বলল, আর কেউ থাকে না বুঝি? না। আমি একা।
ছোকরা একটু চুপ করে বসে কী যেন ভেবে নিয়ে বলল, দেখুন, আমি একটু বিপদে পড়ে এসেছি। দোষঘাট ধরবেন না। শুনেছি, আপনি লোক বড় ভালো, তাই সাহস করে এসেছি।
আমি ভালো লোক কে বলল?
কোরাকাঠির শীতল বিশ্বেসকে চেনেন তো!
শীতল বিশ্বেসকে না চিনে উপায় কি শ্রীপতির। সে—ই তো নষ্টের গোড়া, সে মাথা নাড়া দিয়ে বলল, চিনি।
শীতলদা ভরসা দিয়ে বলেছিলেন, তুমি শ্রীপতির কাছে যাও। সে বড় ভালো লোক।
নিজের প্রশংসা শুনতে এখন বিশেষ ভালো লাগছিল না শ্রীপতির। সে মাথা নিচু করে বলল, কথাটা কী?
বলছি। আমি কাঠের মিস্তিরি। গাঁয়ে কদর নেই, বাজারও নেই, তাই কলকাতায় গিয়ে বসেছি। বলতে নেই, সেখানে এখন আমার মেলা কাজ। বালিগঞ্জে একটা বাড়ির কাঠের কাজ করতে গিয়ে শীতলদার সঙ্গে আলাপ। কথায় কথায় তার কাছে কিছু কথা ভেঙে বলে ফেলেছিলুম। তাতে ফের অনেক কথা জানা হল। আপনার কথাও। শ্রীপতি চেয়ে রইল চুপ করে। তার যেন মনে হচ্ছিল এরপর একটা ধাক্কা আসবে।
ছোকরা ফের একটু ফাঁক করে দিয়ে বলল, আমি সল্ট লেকের ডিডি ব্লকে একটা বাড়িতে থাকি। লাহিড়ীদের বাড়ি। চেনেন তো!
চিনি। ও বাড়িতে—
ছোকরা হাত তুলে তাকে থামিয়ে বলল, দোষঘাট নেবেন না কিন্তু। ও বাড়িতে এই অঞ্চলের একটা মেয়ে কাজ করে। নাম পিয়ালি। গিন্নিমা তার সঙ্গে আমার বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। মেয়েটিও বড় ভালো। চেহারা, স্বভাব, সহবৎ সব দিক দিয়েই অমন মেয়ে হয় না। শ্রীপতির মুখটা একটু হাঁ হয়ে গেল। কথাই এল না মুখে।
ছেলেটা একটু হেসে বলল, কুমারী মেয়ের মতোই থাকে। আমি তো কিছু বুঝতেও পারিনি। তাই আমিও বিয়েতে মত করলুম। কিন্তু মেয়েটা শুনে কেমন গুম মেরে গেল। কাটা কাটা কথা কইল। এমনটা হওয়ার কথা নয়। বলতে নেই, আমার হাতের কাজ ভালো। ভগবানের দয়ায় ভালোই কামাই হয়। শিগগিরই দোকান দেব। আমার মনে হয়েছিল পিয়ালি বর্তে যাবে। কিন্তু সে তেমন খুশি হল না শুনে। তবে দু—চারদিন বাদে যেন নিমরাজি মতো হল।
শ্রীপতি শূন্য চোখে চেয়ে বলল, 'ও'।
আজ এই দিন চারেক হল শীতলদার সঙ্গে আলাপ। কোথায় থাকি জিজ্ঞেস করায় যখন লাহিড়ীবাড়ির কথা বললুম তখন শীতলদা লাফিয়ে উঠল, ও বাড়িতে তো আমিও কাজ করেছি। এখন কথায় কথায় মনসাবালার সব কথা বেরিয়ে পড়ল। আমার তো মাথায় হাত! না জেনে একটা কাজ করে ফেলেছি। তখন শীতলদা বলল, দ্যাখো বাপু, আমি শ্রীপতির মাসির কাছে শুনে এসেছি, সে আবার শিগগির বিয়ে বসবে। পিয়ালির তো ফেরার লক্ষণ নেই। তা যদি হয় তবে তোমার পিয়ালিকে বিয়ে করার কথা পরিষ্কার। তবে কথাটা আমার বিশ্বাস হয়নি। তুমি বরং গিয়ে শ্রীপতির কাছে জেনে এসো।
তাই জানতে এসেছেন?
হ্যাঁ। গত সাতদিন পিয়ালির সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। সে মোটে আমার সঙ্গে দেখাই করতে চায় না। ডাকলে সাড়া দেয় না। ওপর থেকে নীচে নামে না। মনে হয় দোটানায় আছে। আপনি যে বিয়ে করছেন, এ খবর কি সে জানতে পেরেছে? শ্রীপতি হেসে বলে, খবর তো আমিই জানি না।
ভারী অবাক হয়ে দুলাল বলে, তাহলে কি কথাটা সত্যি নয়? না। তবে পিয়ালির যদি আপনাকে বিয়ে করার ইচ্ছে হয় তবে করবে।
দুলালের মুখ ভারী উজ্জ্বল হল, রাগ করলেন না তো, ভাই?
শ্রীপতি ম্লান হেসে বলে, রাগারাগির ব্যাপার তো নয়। গায়ের জোরে তো সব দখল করা যায় না। আমার সে সাধ্যও নেই। না দুলালবাবু, আমার দিকে কোনো দাবিদাওয়া নেই। যান, বিয়ে করে সুখে থাকুন গে।
আপনার মতো মানুষ দেখিনি শ্রীপতিবাবু। শীতলদা বলেছিল বটে আপনি মানুষ ভালো। কিন্তু এতটা ভালো তা বুঝতে পারিনি। শ্রীপতি মৃদু হেসে বলে, মনসার কাছে যাব—যাব করছিলাম কয়েকদিন ধরে। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে আর যাওয়ার দরকার নেই। কী বলেন?
দুলাল মাথাটা নিচু করে রইল। বোধহয় লজ্জা হয়েছে। তারপর খুব সংকোচের সঙ্গে পকেট থেকে একখানা মাঝারি ডায়েরি আর সস্তা ডটপেন বের করে শ্রীপতির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, কটা কথা লিখে দেন।
কী কথা?
আপনার যে আপত্তি নেই। সেই কথাটা পিয়ালি নইলে ঠিক বিশ্বাস হবে না।
শ্রীপতির হাত কাঁপল না। সুন্দর গোটা গোটা অক্ষরে সে ডায়েরির পাতায় লিখে দিল, কল্যাণীয়া মনসা, দুলালবাবুকে তুমি বিয়ে করতে পারো। আমার কোনো আপত্তি নেই। ইতি।
ডায়েরিটা পকেটে রেখে দুলাল বলল, আপনার চেয়ে বয়সে বোধহয় আমি বড়ই হব, নইলে পায়ে হাত দিয়ে একটা প্রণাম করে যেতাম। ছিঃ ছিঃ। ও কথা শুনলেও পাপ হয়। আপনি আসুন। নিশ্চিন্তে আসুন।
দুলাল চলে যাওয়ার পর মনটা বড্ড ফাঁকা হয়ে গেল শ্রীপতির।
সামনের জীবনটা যেন ধু ধু করছে। মনসাকে লেখা পোস্টকার্ডখানা বের করে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ল সে। তারপর ছিন্ন টুকরোগুলো মুঠোয় নিয়ে বসে রইল চুপ করে।
দিনটা কেটে গেল একটা ঘোরের মধ্যে। রাতটা কাটল দুঃস্বপ্ন দেখে। বিটকেল সব স্বপ্ন।
দুটো দিন কাটল ভারী কষ্টে। মনটা যেন কেমন কুয়োর মধ্যে পড়ে আছে। মাথাটা কেন যেন পাগল—পাগল। জীবনের একটা কপাট বন্ধ হয়ে গেল তো! সে কপাট আর খুলবে না কখনও। হয়তো এই ভালো হল। এখন নিশ্চিন্তে থাকা যাবে।
দু—দিনের মাথায় বেলা এগারোটা নাগাদ মদনার দোকানের বেঞ্চে বসেছিল শ্রীপতি। মদনা খদ্দের সামলাচ্ছিল। হঠাৎ হেকে বলল, ওরে শ্রীপতি, পটল গায়েন একটা চিঠি রেখে গেছে তোর নামে।
পটল গায়েন! সে কে?
পিয়ন। তোর খোঁজ করছিল কাল। চিঠি আছে। আমি বললুম, এখন তাকে বাড়িতে পাবে না, আমার কাছে রেখে যাও, দিয়ে দেব। শ্রীপতি পোস্টকার্ড হাতে নিয়ে দেখল, আঁকাবাঁকা কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং অক্ষরে লেখা, শ্রীচরণেষু হ্যাঁ গো, তুমি শিগগির একবার আসবে? ভীষণ দরকার, চিঠি পেয়েই আসবে কিন্তু। দেরি করবে না, মা কালীর দিব্যি। ইতি মনসা।
চিঠিটা হাতে নিয়ে বজ্রাহতের মতো বসে রইল শ্রীপতি। মনসা, মনসা ডাকে কেন? সব তো চুকেবুকে গেল। তবে ডাকে কেন? চটকা ভেঙে সে উঠে পড়ল, বলল, মদনদা, দুশোটা টাকা হাওলাত দেবে? বড্ড দরকার।
মদন অবাক হয়ে বলে, দেব না কেন? নিয়ে যা, বলি চললি কোথায়?
ঘাটের দিকে দৌড়তে দৌড়তে শ্রীপতি বলল, কলকাতায়। পৌঁছতে বেলা প্রায় দুটো হল। ডোরবেল বাজানোর পর মাত্র কয়েকবার চোখের পাতা ফেলতে না ফেলতেই দরজা খুলে সামনে দাঁড়াল মনসা। আলুথালু চুল, চোখ বড় বড়। মুখখানা শুকনো, কেমন অবাক অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে বড় বড় শ্বাস ফেলছে। তারপরই হঠাৎ তার দু—হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতে দিতে বলল, কেমন পুরুষ তুমি? কেমন পুরুষ? নিজের বউকে পরের বাড়িতে ফেলে রাখতে লজ্জা করে না তোমার? লজ্জা করে না?
শ্রীপতি এমন অবাক যে বাক্যস্ফূর্তি হচ্ছে না।
টপটপ করে দু—চোখ থেকে জল পড়ছে মনসার। নাকের পাটা ফুলে ফুলে উঠছে কান্নায়, এক্ষুনি তুমি আমাকে এই যক্ষের পুরী থেকে নিয়ে চলো, এক্ষুনি! আমি আর এক লহমাও থাকব না এখানে! শ্রীপতির বড় ভোম্বল লাগছে মাথাটা, কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।
তাকে কথা বলতে দিলও না মনসা, তার চোখের দিকে চেয়ে উদ্ভ্রান্ত মুখে বলল, এরা ভীষণ খারাপ! ভীষণ! নোংরা ঢেকে বাবু বিবি সেজে থাকে। কেন এখানে ফেলে রেখেছিলে আমাকে? কেন?
শ্রীপতি শুধু কোনো রকমে বলতে পারল, নিয়ে যেতেই তো আসি, তারপর ফিরে যাই।
আর নয়! আর এক মুহূর্ত নয়! দু—মিনিট দাঁড়াও, আমি আসছি। বলে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল মনসা, একটু বাদেই তরতর করে নেমে এল নীচে। এক হাতে একটা সুটকেস বগলে একটা পুঁটুলি।
চলো, চলো, আর দেরি নয়।
এই তাড়াহুড়োয় শ্রীপতির শ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। বড্ড জোর পায়ে হাঁটছে মনসা। শ্রীপতি তাল রাখতে পারছে না। সাজেওনি ভালো করে। চুল এখনও আলুথালু, চোখের নীচের জলের দাগ। মনসা একটা ট্যাক্সি দাঁড় করাল। বলল, ওঠো।
শ্রীপতি ভারী আতঙ্কিত হয়ে বলে, ট্যাক্সিতে কোথায় যাবে?
ধামাখালি।
ওরে বাব্বা, সে যে অনেক ভাড়া লাগবে।
লাগুক। আমার টাকাগুলো দিয়ে কি আমার শ্রাদ্ধ হবে? ওঠো তো। তিন দিন আগেই ব্যাংক থেকে সব টাকা তুলে রেখেছি। অনেক টাকা।
শ্রীপতির যে কেমন লাগছে সে নিজেই বুঝতে পারছে না।
পাশাপাশি বসে সে একটা গভীর স্বস্তির শ্বাস ছেড়ে চোখ বুজল। ঠেলা দিয়ে মনসা বলল, ঘুমোবে না। কথা বলো, আমার কত কথা জমে আছে।
ঘুমোচ্ছি না, গো। ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। দুলালবাবু নামে একজন এসেছিল আমার কাছে ক—দিন আগে।
জানি। সে আমাকে বিয়ে করতে চায়। শোনো, নিজের জিনিস যদি পাহারা দিয়ে না রাখতে পারো তবে শেয়াল শকুনে ছিঁড়ে খেতে চাইবেই। বুঝেছ?
শ্রীপতি হঠাৎ টের পেল তার ভিতরকার যে অসুরটা ফেরার হয়ে গিয়েছিল সে হঠাৎ কোন ফাঁকে ফিরে এসে ভিতরে সেঁদিয়েছে। তার ভিতরটা এখন ফুঁসছে, টগবগ করছে, লন্ডভন্ড হচ্ছে। একেবারে ভাসাভাসি কাণ্ড!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন