অনন্যা পাল

চৈত্র সংক্রান্তির ছুটিতে জাপান বেড়াতে গেছি (ব্যাংককে সেসময়ে লম্বা ছুটি), বেড়াবো হপ্তা খানেক; টোকিও, কানাযাওয়া হয়ে শেষ ঠিকানা কিয়োটো। জাপান ছবির মত দেশ, প্রযুক্তিতে অগ্রগন্য, তবে তাদের ইতিহাসও সুপ্রাচীন এবং গরিমাময়। কিয়োটো পূর্বতন রাজধানী ও ঐতিহাসিক শহর, সেদেশের অতীতের সংস্কৃতি বুঝতে গেলে সেখানে যাওয়া আবশ্যক। যাইহোক, যাত্রার শেষভাগে কিয়োটো এসে পৌঁছলাম, গত কদিনের দৌড়োদৌড়িতে শরীর বেশ কাহিল, যদিও অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখে মন ভরে গেছে। এখানে থাকবো কদিন, তাই কবে কি দেখব ঠিক করেই এসেছি আগের থেকে। প্রথম দিনের তালিকায় কয়েকটি বিখ্যাত মন্দির, হিগাশিমায়ার পুরোনো লোকালয় ও গিয়ন অঞ্চলের গেইশা পাড়া, এই সবগুলিই শহরের মধ্যিখানে বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে ছড়ানো, তাই একটি জায়গায় নেমে বাকিটা পায়ে পায়ে ঘুরে দেখব। সকাল সকাল বাসে চড়ে হাজির হলাম শোরেন-ইন মন্দিরে, এটি সেদেশের সর্ববৃহৎ বৌদ্ধধর্মশিক্ষার কেন্দ্র। জাপানের বৌদ্ধমন্দিরগুলি কাঠের তৈরী এবং সুন্দর বাগান পরিবেষ্টিত শান্তির জায়গা, পাখির ডাক ভিন্ন অন্য কোনও আওয়াজ সেখানে নেই। মন্দিরের স্থাপত্য প্রায় সবক্ষেত্রেই প্রথাগত রীতি মেনে একই ধরণের, সেখানে শিল্প ও ঐশ্বর্য্যের গরিমার থেকে বৌদ্ধধর্মের সহজ জীবনদর্শনের প্রতিফলন। শোরেন- ইন মন্দির ও তৎসংলগ্ন বাগান ঘুরে এগিয়ে গেলাম খুব কাছেই আর একটি মন্দিরে, নাম সিওন-ইন, এটি চীনা পর্যটকদের তীর্থস্থল; সেখানে বড় বড় বাসে চড়ে দল বেঁধে চীনা দর্শনার্থীদের ভীড় সেই সকাল থেকেই। তীর্থস্থল মানেই আমরা বুঝি দুর্গম ও কষ্টসাধ্য যাত্রা, সেই নিয়ম মেনে এই মন্দিরের মূল ভবনটি কয়েকশ সিঁড়ি পেরিয়ে সুউচ্চ স্থানে নির্মিত, মন্দির সংলগ্ন বাগানটিও একটি টিলার ওপর তৈরী। তবে আমার মত বেতো লোকেরা প্রবেশপথের তোরণ মন্দিরে বসে বসেও বেশ চারপাশের শোভা উপভোগ করতে পারে। মন্দির দর্শন সেরে গুটি গুটি এগোলাম মারুয়ামা-কোয়েন পার্কের দিকে, গুটি গুটি এই কারনে যে রাস্তাটা বেশ চড়াই, আর আমি ছাপোশা বাঙালী, ফিটনেস লেভেল শূণ্য।
পার্কটি সুবিশাল এলাকা জুড়ে তৈরী, সেখানকার গাছপালা বেশ প্রাকৃতিক ভাবেই বেড়ে উঠেছে বলে বোধ হয়, মানুষের সুপরিকল্পিত হাতের ছাপ নেই; অবশ্য তার জন্যে সৌন্দর্য্যের কোথাও ঘাটতি পড়েনি। মাঝে মাঝেই সাকুরা ফুলে (চেরী ব্লসম) ঢাকা গাছ, মাটি ছেয়ে আছে ঝড়ে পরা হালকা গোলাপী পাঁপড়িতে, এছাড়াও রকমারি ফুলের সম্ভারে চারিদিকে বসন্তের জয়গান। পার্কের এক কোনায় একটি সাকুরা গাছের সামনে পা আটকে গেলো চলতে চলতে, ফুলেল গাছের নীচে ফুলের মত সুন্দরী এক কিমোনো পরিহিতা তরুণী; নানান ভঙ্গিমায় সে পোজ দিচ্ছে, আর ক্যামেরা হাতে এক তরুণ পাকা শিল্পীর মতই ছবি তুলে চলেছে একান্ত আনুগত্যে। ইচ্ছে হোল আমিও তার ছবি নিই, এতই মনলোভা সে দৃশ্য; আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এ এক অতীতের রূপকথা। কর্তার খোঁচায় সম্বিত ফিরল, অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলতে শুরু করলাম আবার; কিন্তু তারপরেই বিস্ময়ের শুরু। সারা পার্ক জুড়েই যে রূপকথা! কিমোনো, কাঠের চটি , ঢাউস চুলের সাজ আর রংবেরঙের ছাতা হাতে এক একটি রাজকন্যে; কেউ সহচরী সাথে, কারো সাথে বুঝি মনের মানুষ। দেখতে দেখতে আমি তো দিশেহারা, শেষে গাছপালা দেখি না এই রূপকুমারীদের! যাহোক, খানিক বাদে ক্লান্ত হয়ে বসলাম একটা বেঞ্চিতে। ‘আহা কিয়োটোর মেয়েরা ভারি ট্র্যাডিশানাল, এখনও শত অসুবিধে মেনেও কেমন জাতীয় পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায়’, আমি মন্তব্য করি। দেখলাম আমার কথায় কান না দিয়ে কর্তা লক্ষ্য করছেন পাশের বেঞ্চিতে বসা প্রণয়ী যুগলকে। তাকিয়ে দেখি তারা দুজনেই মাথা থেকে পা জাপানী সাজে সজ্জিত, মেয়েটির এশিয় মুখশ্রী, ভাল করে দেখে মনে হল থাই, সাথের ছেলেটি ইউরোপীয়, সে এই জবরদস্ত পোশাক ও কাঠের থান-ইঁট মার্কা চটির চাপে চোখে মুখের গদগদ ভাব যেন ঠিক টিঁকিয়ে রাখতে পারছেনা। ব্যাপার কি? তাহলে কি যা দেখছিলাম এতক্ষণ সবই মেকি? এখন নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখতে গিয়ে মনে হোল, কিমোনো পরীরা সকলেই ট্যুরিস্ট এবং এদের একটা বড় অংশ থাই। এপ্রসঙ্গে বলে রাখি, থাইরা জাপানীদের অগ্রজসম জ্ঞান করে ও নির্দ্বিধায় অনুকরণ ও অনুসরণ করে; জাপানে সম্ভবত সবচেয়ে বেশী থাই ট্যুরিস্টদের আনাগোনা এবং তাদের বেড়াতে যেতে ভিসাও লাগে না। থাই মেয়েরা সাজগোজ ও ছবি তোলার নামে পাগল, দেখতেও ভারি সুন্দর হয়, বেশ পুতুল পুতুল গড়ন।
এরপরে, আমরা একটা কাফেতে ঢুকে জাপানী চা খাচ্ছি (হ্যাঁ, সে দেশে কাফেতে কফি ছাড়া আর সবই পাওয়া যায়); দেখি সেই প্রণয়ী যুগল হেঁটে যাচ্ছে সামনের রাস্তা দিয়ে। মেয়েটি হাতের ছাতা দুলিয়ে হরিণীর ছন্দে ভেসেই চলেছে একরকম; ছেলেটি একহাতে কিমোনোর বেল্টটা কোনোমতে চেপে ধরে, কাঠের চটি ছ্যাঁচরাতে ছ্যাঁচরাতে চলেছে তার পিছু পিছু। আহা! দেখে বড় মায়া হোল।
চা খাওয়া শেষে আমরা গেলাম কোডাই-জি মন্দির, এটি জাপানী বীর হিডেয়োশির স্মৃতির উদ্দেশ্যে তৈরী করিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী নেনে সতেরোশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে। কোডাই-জি ‘যেইন’ মতাদর্শের মন্দির, যাঁরা ভারতীয় মহায়ন পন্থায় বিশ্বাসী ও নিরামিশাষী। এই মন্দির সংলগ্ন বাগানটি একটি পাহাড়ের ওপর, সেখানে মূল মন্দির ছাড়াও ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন স্মৃতি শৌধ। মন্দির দেখা শেষ হতে আমরা ইশিবেই-কোজি রাস্তায় ঢুকলাম, এখান থেকে পুরোনো চত্বরের শুরু; একে অন্যের সাথে যুক্ত সরু সরু রাস্তা, আর তার দুধারে সেযুগের ধরণে তৈরী সুন্দর সুন্দর কাঠের বাড়ী। তবে বেশীরভাগ বাড়ী গুলোতেই এখন হয় রেস্তোঁরা নয়তো বাহারে দোকান। ঝকঝকে তকতকে রাস্তা ও ছবির মত বাড়ীঘর যেন এখনও অতীতের ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলেছে, হাঁটতে হাঁটতে আমিও কেমন হারিয়ে যাচ্ছি তখন। তবে বেশীক্ষণ এই ভাব বজায় থাকল না, কারণ এখানেও পালে পালে কিমোনো পরী, তাদের কেউ আবার মুখে চুনকাম করে, ঠোঁটে লাল রং এঁকে গেইশা সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কানাযাওয়াতে সত্যিকারের গেইশাদের আতিথ্য পাবার সৌভাগ্য হয়েছিল, তাই এই নকল গেইশাদের সাজ দেখে হাসব কি কাঁদব ভেবে পেলামনা। এদের একেকজন সাজুগুজু করে হাটিহাটি পা-পা করে এগোচ্ছে (তার বেশী ওই চটিতে সম্ভব নয়) আর পেছনে ফেউয়ের মত কিছু ট্যুরিস্ট লেগে রয়েছে ছবি বা ভিডিও তোলার আশায়, বেচারা বাবা মায়েরাও রয়েছে সেই দলে; মেয়ের শখ পুরণ করতে গিয়ে তাদের জেরবার দশা। এসবের মাঝখানে পড়ে আমিও কখন এদেরকেই লক্ষ্য করতে শুরু করেছি বুঝতেও পারিনি। দেখি একটা রাস্তায় দুই বান্ধবী চলেছে, একজনের বয়কাট চুলে বেমানান ফুলের গয়না ও খোঁপার কাঠি বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে রয়েছে, মেয়েটিও ঘার বেঁকিয়ে সেই কেশসজ্জা ব্যালান্স করতে করতে চলেছে; তার সঙ্গীনীর চটিটা অন্ততঃ দুসাইজ ছোট, পায়ের আধখানা বেরিয়ে আছে চটি ভেদ করে, সেই মেয়েটিও মরণপন করে খুঁড়িয়ে চলেছে বেশভুসার মান রাখতে। আর এক জায়গায় দেখি গোটা পরিবার (যার মধ্যে একটি প্র্যামে চড়া দুগ্ধপোষ্যও আছে) দিব্যি কিমোনো সাজে চড়ে বেড়াচ্ছে। হাঁটতে হাঁটতে কখন গিয়ন এলাকায় এসে গেছি, এখানে সত্যিকারের গেইশাদের বাস; তবে রাস্তায় অফুরন্ত কিমোনোধারীর ভীড়ে তারা বোধহয় ঘরেই মুখ লুকিয়েছিল। দেখতে দেখতে বড় রাস্তায় এসে পড়েছি, দেখি একটা ট্যাক্সির সামনে গোলমাল। জাপানীরা শান্তিপ্রিয় সভ্য জাতি, যন্ত্রের মত কাজ করে, তাই কৌতুহলী হয়ে কাছে গেলাম ব্যাপার কি দেখতে। ট্যাক্সির ড্রাইভার বারেবারে অটোমেটিক দরজা বন্ধ করছে, আর দরজা ছিটকে খুলে যাচ্ছে, প্যাসেঞ্জার নামানোর পরে এই বিপত্তিতে লোকটি নাজেহাল; এদিকে প্যাসেঞ্জার যুগলের পুরুষটি হাত পা নেড়ে কিছু বোঝাতে চেয়ে পারছে না। লক্ষ্য করে দেখলাম, তার কিমোনোর খুঁট আটকে গেছে দরজার কোনায়, তাতেই দরজা খুলে যাচ্ছে, ড্রাইভার সাহেব তার আয়নায় তা দেখতে পাচ্ছেনা। শেষে আমরা ড্রাইভারকে ব্যাপারটা বোঝালাম কোনওমতে, প্যাসেঞ্জারটিও এরপর শান্তিতে জট ছাড়ালো কিমোনোর। এবার আমাদেরও ফিরতে হবে, সামনেই বাস স্টপ; সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে চোখে পড়ল রাস্তার দুধারে অসংখ্য কিমোনো ভাড়া দেওয়ার দোকান, মাত্র পাঁচশ ইয়েনে (ভারতীয় টাকায় আন্দাজ চারশ) সারাদিনের জন্য আর সেই সাথে কিছু অতিরিক্ত পয়সায় গেইশা মেকআপ। জানলার ভেতরে তাকিয়ে দেখি সারি সারি মেয়ে বসে আছে কাঠের পুতুল সেজে, আর দ্রুত হাতে চলছে চুনকাম আর চুলের সাজ। আমি জুলু জুলু চোখে তাকিয়ে আছি দেখে কর্তা হন্তদন্ত হয়ে বাস ধরতে ছুটলেন, তিনি বোধহয় আমার মতগতির ওপর আর ভরসা রাখতে পারছিলেন না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন