রঙবাহার

অনন্যা পাল

Rongbahar

সদ্য ক্লাস এইটে উঠেছি, স্কুলের ছোট ক্লাসের মেয়েরা এরমধ্যেই বেশ মান্যি গন্যি করতে শুরু করেছে আমাদের; তাই তাদের সামনে গ্রাম্ভারি চালে নিজের কেউকেটা ভাবটা চাগিয়ে রাখি সবসময়। আমি আর সীমা একই সেকশান, পাশাপাশি পাড়ায় থাকি, হেঁটেই যাতায়াত করি স্কুলে একসাথে। আমাদের দুই বন্ধুতে অনেক ব্যাপারেই ভারি মিল, যেমন পরীক্ষার হলে বসে পেন চিবানো, রেজাল্ট বেরোলে উদাসী দার্শনিক হয়ে যাওয়া; ক্লাসে পড়া দেবার সময় মৌনিবাবা আর টিফিন টাইমে বক্তিয়ার খিলজি হয়ে ক্লাস কাঁপানো। তবে অমিলও একটা আছে, ফরসা টোপা টোপা গাল আর দুটো বিনুনিতে সীমা ভারি সুন্দরী, আর সেকথা জানে বলেই সে চলনে বলনে বেশ পরিপাটি; আমাকে দেখে কেউ অন্ধকারে ভয় পাবে তা হয়তো নয়, তবে মাথার ওপর শিং হয়ে থাকা অসমান দুটো ঝুঁটি আর কুকুরের ন্যাতানো কানের মত দুমড়ানো কলার অলা শার্টে পাগলা দাশুর বোন বলে চালানো যেতে পারে আমায় সহজেই।

তখনও বসন্তের নরম ভাব রয়েছে বাতাসে, গরমটা পড়তে পারেনি সেভাবে; দোলের দিন চুটিয়ে রঙ খেলেছি পাড়ার বন্ধুদের সাথে, সীমা অবশ্য প্রতিবারের মতই লুকিয়ে রইল ঘরে, রঙে ওর বড্ড ভয়। পরেরদিন স্কুলে গিয়ে এই নিয়েই জবর আলোচনা ক্লাসে, কে কত রঙ খেলেছে, কার বাড়িতে কি কি খাবারের আয়োজন ছিল সেসব আরকি। দোল আমার বড় প্রিয় উৎসব, দেদার রঙ খেলা যায় বলে শুধু নয়, পরীক্ষার গুঁতো না থাকায়, বড়দের চোখ রাঙানি থাকেনা, ভালোলাগার সেটাই বড় কারণ; এছাড়া বিকেলে পাড়ার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কোরাসে গলা মেলানোর সুযোগ মেলে আমার মত বেসুরোরও, সেটাই বা কম কিসে! যাইহোক, ছুটির পরে যথারীতি আমরা দুইবন্ধু স্কুল থেকে বেরিয়েছি, গেট পেরিয়ে গলির ভেতর ঢুকেছি শর্টকাট রাস্তা ধরতে রোজের মতই। দেখি সামনের হলুদ একতলা বাড়িটার গেটের ভেতর থেকে ওদের বছর ছয়েকের দেড়ফুটিয়া বিচ্ছু ছেলেটা রাস্তার কুকুর গুলোকে বেলুন ছুঁড়ছে।

রাগ হোল ভারি, হেঁকে উঠলাম ‘অ্যাই, কি করছিস?’

‘কেন রঙ খেলছি?’ পুচকে মহা তর্কবাজ, গুরুজনদের মুখের ওপর জবাব দেয়!

‘লজ্জা করেনা? বোবা জীব, কথা বলতে পারেনা তাদের ওপর বেলুন ছুঁড়ছিস? বলব তোর বাড়ীর লোকেদের?’ আমরা তেড়ে উঠি ব্যাটাকে সিধে করতে।

এবার একটু ভয় পেয়েছে মনে হোল, আসলে ওর জেঠিমা আমাদের কেমিস্ট্রির টিচার, বদরাগী বলে তাঁকে আমরাও সমঝে চলি।

‘আচ্ছা ওদের মারব না আর’ মিনমিন করে জবাব দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে গেলো ছেলেটা।

আমরা এগোলাম এবার, ছেলেটাকে জব্দ করা গেছে, সেই খুশীতে আমি গলা ছেড়ে বক্তৃতা দিচ্ছি অখণ্ড মনোযোগে, সীমাও হেসে হেসে তাল দিচ্ছে আমার দিকে তাকিয়ে। কয়েক পা সবে এগিয়েছি হঠাৎ ঠিক কি হোল বুঝতে পারলাম না, কথার ঝোঁকে সীমার দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলাম! আমার দিকে ফেরানো ওর আধখানা মুখ হাবসীদের মত হয়ে গেলো কি করে? হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠে বুঝলাম, ঘন সবুজ বাঁদুরে রঙের বাহারেই অমন খোলতাই হয়েছে ওর চেহারা। পেছন থেকে আমাকে তাক করে ছোঁড়া রঙের বেলুন, পিঠের ব্যাগে ধাক্কা খেয়ে রঙ ছড়িয়েছে আমার বন্ধুর ফর্সা মুখে। পেছন ফিরে দেখি দেড়ফুটিয়ে বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে ভেংচি কাটছে। ততক্ষণে আমারও রোখ চেপে গেছে, আজ ওর একদিন কি আমার! তেড়ে গেলাম ওকে ধরতে, আমি ওদের বাড়ী অবধি পৌঁছুতে পৌঁছুতে, দেখি আমাদের কেমিস্ট্রি দিদিমনিও এসে পড়েছেন। আমাকে আর পায় কে! বন্ধুর চেহারা দেখিয়ে বললাম সব, সীমাও ফুঁপিয়ে উঠেছে নিজের দশায়; আসলে ওর পেন্সিল বক্সে লাগানো ছোট্ট আয়নায় নিজের মুখটা দেখে ফেলেছে ও ততক্ষণে। দাবার বোর্ডের মত মুখখানা আধা সাদা, আর আধা সবুজ, অন্ধকারে দেখলে ভয় পেতে হোত সন্দেহ নেই। দিদিমণি মহা রেগে ঘেঁটি ধরে টেনে বের করে আনলেন পলায়মান বিচ্ছু সর্দারকে বাড়ির ভেতর থেকে।

‘বল এরকম করলি কেন? আজ তোর পিঠে একটা আসত লাঠি ভাঙব!’

‘বারে! ওরাই তো বলল কথা বলে যারা তাদের বেলুন মারতে’, দিদিমণির বাজখাঁই চিৎকারের জবাবে মিনমিনে জবাব দিলো পুঁচকে।

এরপর একসপ্তাহ স্কুলে যেতে পারেনি সীমা ওই চাঁদমুখ নিয়ে; আমিও আর কোনও পুঁচকেকে ঘাঁটানোর চেষ্টা করিনি ওদিনের পরে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%