অনন্যা পাল

মাঝারি সাইজের ঘরটার একপাশে কাউন্টার, সেখানে গম্ভীর মুখে বসে বছর পঁচিশেকের একটি মেয়ে, কাউন্টারের সামনে থেকে লাইন শুরু হয়ে দরজার বাইরে সিঁড়িতে এসে ঠেকেছে।
বাইরে থেকে উঁকিঝুঁকি দিয়ে খানিকটা বিভ্রান্ত স্বরে সামনে দাঁড়ানো মহিলাকে জিজ্ঞেস করি, ‘এখানে প্রিন্সেস স্টুডিয়োটা কোথায়?’
আমাকে খানিকটা জরীপ করে মহিলা জবাব দিলেন, ‘এটাই।’
‘তাহলে এই লাইন?’
‘প্রথমবার? ও...। এটা কুপনের লাইন, কুপন নিয়ে ভেতরে বসতে হবে, ওরা নম্বর অনুযায়ী ডাকবে।’
আমি তখনও খানিকটা ধোঁয়াশায়, তবু বাঙালী তো, লাইন দেখলেই রিফ্লেক্স অ্যাকশনে দাঁড়িয়ে পড়ার অভ্যেস; তাই এখনও কথা না বাড়িয়ে মহিলার পেছনে হাতের ব্যাগ সামলে দাঁড়িয়ে গেলাম।
‘কয় জোড়া?’
কাউন্টারের কন্যের যান্ত্রিক প্রশ্নে কোনক্রমে তুতলে উত্তর দিলাম, ‘একটাই।’
তাচ্ছিল্য ভরা দৃষ্টিতে আমাকে একবার দেখে নিয়ে একটা কুপন বাড়িয়ে দিলো সে, ‘ওদিকের বেঞ্চে বসুন, সময় লাগবে’ সাথে নির্লিপ্ত নির্দেশ। দেওয়াল লাগোয়া সারি দেওয়া লম্বা বেঞ্চিতে বসে আছেন জনা পনেরো মহিলা, সকলের হাতেই বড়সড় ব্যাগ ও চোখেমুখে নির্বেদ সহিষ্ণুতা; বুঝলাম এখানে সুবিধে পেতে সময়ের হিসেব ছাড়তে হবে। যাইহোক, গুছিয়ে বসতে বসতে খেয়াল করলাম বেঞ্চির অপরপারে রয়েছে প্লাইউডের ছোট্ট ঘেরাটোপ, সেটাই আমাদের চূড়ান্ত গন্তব্যস্থল।
ঘেরাটোপের দিকে তাকিয়ে অধীর অপেক্ষায় আছি, ভেতর থেকে জাঁদরেল মহিলা কন্ঠের নির্দেশাবলী ভেসে এলো, ‘বড় করে নিঃশ্বাস নিন, হ্যাঁ, এবার হাতদুটো তুলুন… আহাহা, অতটা নয়। সোজা হয়ে দাঁড়ান, নড়ছেন কেন? গলাটা… গলাটা কি আপনার এরকম ফোলাই থাকে বরাবর না ঠান্ডা লাগিয়েছেন?’ প্রায় মিনিট দশেক কোস্তাকুস্তির পর বেরিয়ে এলেন এক আন্টি, চেহারা বিধ্বস্ত, মুখে বিজয়িনীর হাসি।
পরের জন কলেজ পড়ুয়া তন্বি, ভেতরে যেতেই শুরু হোল আর এক প্রস্থ হুকুমনামা, ‘তুমি আগের থেকে একটু শুকিয়েছো মনে হচ্ছে? পড়াশোনার চাপ না ডায়েটিং?’
‘কই আর শুকালাম, আমার তো মনে হয় মোটাই হয়েছি’ তন্বির ন্যাকা ন্যাকা স্বর চাপা পরে গেলো জাঁদরেল কন্ঠের দাবড়ানিতে।
‘রোগা মোটা কোনোটাই হওয়া চলবেনা! নিজেরা ইচ্ছেমত বাড়বে কমবে, তারপর হ্যাপা সামলাবো আমি?’ ঝাড় খেয়ে মুখ শুকিয়ে বেরিয়ে এলো মেয়েটি বেশ খানিক্ষণ পরে।
পরের জন এক মেজাজী বৌদি, মুখচোখ দেখে মনে হয় বাড়িতে কাজের মাসি ডুব মেরেছে কদিন। ‘গতবারের মত ভোগাবেন না এবার’ ঢুকেই তিনি খেঁকিয়ে উঠলেন।
‘কি বললেন? আমি ভোগাই!! আপনি নিজের ইচ্ছে মত ফুলবেন, শুকোবেন, বেছে বেছে পয়লা বৈশাখ আর পূজোর আগে হাজির হবেন, আর বলছেন আমি ভোগাই!’ এরপর জলতরঙ্গের মত চলল বাক্যস্রোত, মুখরা বৌদি একেবারে স্পকটি নট; খানিক পরে যখন বেরোলেন একেবারে বর্ষাকালের মিয়ানো মুড়ি।
এভাবেই ঘেরাটোপের নেপথ্য আলাপ শুনতে শুনতে কেমন সম্মোহিত হয়ে পড়েছি, হঠাৎ চমক ভাঙল গম্ভীর হুংকারে, ‘কি ব্যাপার নেমন্তন্ন করে ভেতরে আনতে হবে না কি?’ বুঝলাম, আমার আগের মহিলা বেরিয়ে গেছেন, এবার আমার পালা, অন্যমনস্ক থাকায় খেয়াল করিনি।
‘এই প্রথম?’ প্রশ্নকত্রীর গলার আওয়াজের সাথে তাল মিলিয়ে চেহারাও সমান রাশভারী, অনেকটা টিভি সিরিয়ালের শাশুড়ি গোছের।
‘হুম… দেখেই বুঝেছি, এমন বেখাপ্পা ফিটিং আমার এখানে হয় না’ আমাকে ভালো করে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে কথাটা ছুঁড়ে দিলেন মহিলা; ঠিক সিরিয়ালের গরীব আত্মীয়ের সাথে যেভাবে কথা বলা হয় সেভাবেই।
‘তা কি রকম চাই?’
‘আপনার যা ঠিক মনে হয়, সেরকম হলেই চলবে’ আমি বিনয়ে বিগলিত।
‘হ্যাঁ, আমার মত নিলে, আমি চেহারা বুঝে বানিয়ে দেব; যারা নিজে ওস্তাদি করতে যায়, তারাই পরে ভোগে।’ মনে হোল আমার কথায় তিনি বেশ খুশী হয়েছেন। এরপর চলল নানান ভাবে মাপ নেওয়া, আর এক গোছা ম্যাগাজিনের পাতা ঘাঁটা; এসবের মধ্যে আমার ভূমিকা সামান্যই, শুধু কাঠের পুতুল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আর নির্দেশ মত হাত পা নাড়া। প্রায় মিনিট কুড়ি এভাবে চলার পর টেবিলে রাখা কাগজে কয়েকটা ডিজাইন আঁকা হোল, এতক্ষণে দিদিমণির মুখে হাসি।
‘এগুলো একেবারে অন্যরকম, দেখবেন কেমন মানিয়েছে। এবার কাপড় গুলো চটপট বের করুন, দেখে নিই ঠিক আছে কিনা।’
‘আজ্ঞে, কাপড় গুলো তো নয়, একটাই সুতীর পিস্’ আমি মিনমিন করি।
‘কি!!’ একটা ভয়ঙ্কর গর্জনের সাথে মনে হোল পারটিশানটা নড়ে উঠলো।
সেদিন কিভাবে ‘প্রিন্সেস স্টুডিয়ো’ নামের অতি আধুনিক দর্জির দোকান থেকে প্রাণ নিয়ে ফিরেছিলাম, ভাবলে এখনও হাত পা কাঁপে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন