অনন্যা পাল
ইন্টারভিউ
‘কিকরা হয়?’
‘আজ্ঞে, চাকরী; পার্মানেন্ট’, কথা হচ্ছিলো সাধন বাবুর বৈঠকখানায় বসে। বেতের সোফায় মুখমুখি বসে বছর পঞ্চান্নর সাধন বাবু আর পল্টন ওরফে প্রনব চন্দ্র গুছাইত। সাধন বাবু কর্পোরেশন অফিসের কেরানী, স্ত্রী ও দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার। এককালে দু-দুটো আইবুড়ো বোনের বিয়ে, বুড়ো বাপ-মা এসব নিয়ে কায় ক্লেশে উদ্বাস্তু কলোনির দরমার বাড়িতে কাটিয়েছেন বহুবছর। তা সেসব পাট চুকে এখন তিনি ঝাড়া হাত পা, সরকার থেকে জমি নিজের নামে পেয়ে ছিমছাম একটা দুকামরার বাড়ী তুলেছেন তাতে। ছাদটা অবশ্য পাকা করতে পারেননি; তবে শান বাঁধানো মেঝে, বাহারি গ্রীলের বারান্দা, সব মিলিয়ে নেহাত মন্দ হয় নি ব্যাপারটা। আপাততঃ ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ আর মনার দোকানের শিঙাড়া সামনে রেখে তিনি বছর পঁচিশেকের ছেলেটিকে জরীপ করছিলেন।
কদিন আগে গিন্নি এসে আর্জি জানালেন, মেয়ে বুলার গোঁ, বাপের নয়, নিজের পছন্দে বিয়ে করবে, কথাটা শুনে প্রথমেই খুব খানিক চেঁচিয়ে, অবশেষে গৃহশান্তি রক্ষার্থে রাজি হয়েছিলেন ছেলেটির সাথে কথা বলতে, অতঃপর রবিবার বিকেলের এই সাক্ষাৎকার পর্ব। কেতা দুরস্ত শার্টপ্যান্ট, কায়দায় ছাঁটা চুল, চেহারাটা একটু পাকানো গোছের তবু একটা বেশ খেলোয়াড়ি ভাব আছে, ছেলেটাকে মোটের ওপর ভালই লেগেছে সাধনবাবুর; তার ওপর বাপ মা নেই, পণের ঝক্কি থাকবে না, সস্তায় মেয়ে পার করার মানসিক হিসেব কসতে কসতে অজান্তেই ঠোঁটের কোনে ঢেউ খেলে যায় তাঁর।
‘বুলাকে চিনলে কি করে?’
‘ওই, কলেজ আসতে যেতে বাসে দেখা, মানে আমারও তখন ডিউটি থাকে কিনা’ পল্টনের জবাবে মাখনের মসৃণতা।
‘ভালো; তা তোমার অফিসটা কোথায়? বুলার কলেজ তো হেদোয়’।
‘আমার তো আউটডোর, বাইরে বাইরে কাজ, ওই পথেই যাই’।
‘মাইনে কিরকম?’ ‘মাস গেলে পনেরো, এছাড়া কাজের চাপ বাড়লে ওভারটাইম। বছরে দুবার বোনাস, আই পি এল আর পুজোর সময়’।
‘বটে! তা আই পি এল ও আজকাল বাঙ্গালীর উৎসব নাকি হে?’
‘হে হে, ওসময় বড্ড খাটুনি যায় কিনা, মালিকের খুব দরাজ মন’।
সাধন বাবুর মুখে প্রসন্নতার আভাস, পল্টন দ্বিগুন উৎসাহে চালিয়ে যায়, ‘এছাড়া মেডিকেল আছে, অন ডিউটি কিছু হলে পুরো খরচ মালিকের; আর ধরুন গে, যদি কাজের কারণে বাইরে যেতে হয়, পুরো মাইনেটা মাস গেলে আপনার মেয়ের হাতে পৌঁছে যাবে সময় মত, যতদিন না ফিরি’।
‘তোমাকে প্রায়ই বাইরে যেতে হয় না কি?’
‘না এখনও হয়নি, তবে যেতে হোতেও পারে, বোঝেনই তো আজকালকার চাকরী’ পল্টন বিনয়ে তৈলাক্ত।
‘তা ইনক্রিমেন্ট কেমন? তোমাদের প্রাইভেটে তো পে স্কেল-টেল নেই বোধহয়’ সাধন বাবু তাঁর এই পরে পাওয়া মুরুব্বিয়ানা উপভোগ করছেন বোঝা যায়।
‘টেন পারসেন্ট তো বাঁধা, ভালো কাজ করলে সেটা ডবলও হতে পারে; আমার গেলোবার তাই হয়েছিল’ পল্টনের লাজুক জবাব।
‘ভালো, খুব ভালো; শুনছ বিল্টুর মা এদিকে একবার এসো’ সাধনবাবু দরাজ স্বরে হাঁক পাড়েন গিন্নিকে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বুলাও এসে হাজির হয় মায়ের সাথে। তার চোরা চাহনির নীরব প্রশংসায় পল্টনের মুখ উদ্ভাসিত।
‘তাহলে তো হয়েই গেলো, বুলার পরীক্ষাটা হয়ে গেলেই একটা দিন ঠিক করা যাবে খন। ভালো কথা তোমার অফিসটা কোথায় যেন বলছিলে?’ হবু জামাইকে দরজা অবধি এগিয়ে দিতে দিতে বলেন সাধন বাবু।
‘আজ্ঞে বলিনি তো!’
‘কি বলোনি?’ তাঁর স্বরে বিস্ময়।
‘অফিস কোথায় বলিনি তো! মানে আমাদের লাইনে বলা চলেনা বুঝলেন না?’ সাধনবাবু সত্যিই বুঝতে পারেন না।
‘আমাদের হল গিয়ে মোবাইল ফোনের কারবার, মানে ভিড় ভাট্টায় স্যাট করে ঝেড়ে নিয়ে কেটে পড়া। তা মালিকের নুন খেয়ে অফিসের কথা বলি কি করে বলুন!’
‘বেল্লিক, ছুঁচো, জানো এটা ভদ্রলোকের বাড়ি!’ প্রথম বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ফেটে পড়েন সাধন বাবু।
‘যাঃ কেলো, ভদ্দরলোকরাই শালা সব চেয়ে ছোটলোক, ধরা পড়লে যা ক্যালায়!’ পল্টন হাঁটা দেয় হনহনিয়ে। সাধনবাবু ঘরে এসে ঢোকেন, নিজের অজান্তেই হাতটা চলে যায় পকেটে; মোবাইলটা আছে কি না দেখে নেন।
***
অন্য রাগ
কদিন ধরেই বাড়িতে চেঁচামেচি, কান্নাকাটি; কোন এক ছিঁচকে চোরের প্রেমে পড়ে বোনটা একেবারে ছড়িয়ে লাট করছে।
ভাল্লাগে না আর বিল্টুর, ‘মা ভাতটা বাড়লে’? বিটকেল স্বরে মায়ের ওপর ঝাল ঝেড়ে খেতে বসে সাধন বাবুর একমাত্র পুত্র বিল্টু ওরফে বলভদ্র।
রথের দিন জন্মেছিল সে, মায়ের ইচ্ছে নামে তার জের থাকে; তা জগন্নাথ হওয়াই স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু সাধনবাবুর বাবা নামটির আগেই দখল নিয়েছিলেন, অতঃপর এই জম্পেশ বলভদ্র। শোনা যায়, ছোটবেলায় অঙ্কের ক্লাসে ঘুমিয়ে পড়ায় স্যার তার ভদ্রতাবোধ নিয়ে বেজায় সন্দেহপ্রকাশ করেন, সেই থেকে নামের জন্যে বিস্তর খোরাক হয়েচে বিল্টু; তাই থেকেই নাকি এই বেয়াড়া রাগ তার। দিনের প্রায় বেশিরভাগ সময়টাই সে রেগে থাকে, দৈনন্দিন কাজকর্ম সে রেগে রেগেই করে; বাড়ির লোক মায় পাড়ার ছেলে ছোকরারাও তাকে ঘাঁটায় না। তবে একটা ব্যাপারে বিল্টু নিজেই বেশ ঘেঁটে আছে কিছুদিন ধরে। বি-কম পাশ করে বাড়ি বসে ছিল, হাতে কাজ নেই তাই রাগ করাটাই একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল তার। শেষে মরীয়া হয়ে বড়বাড়ির রায়মশাইকে ধরে একটা কাজের ব্যাবস্থা করলেন সাধন বাবু; ছেলের মনটা একটু ঘুরবে, হাতে টাকাও আসবে যাহোক এই ভেবেছিলেন। কাজটা রায়মশাইয়ের পুত্রবধূর শাড়ির ব্যুটিকে খাতালেখার, ব্যুটিকটা খুবই নামী, মাইনে খারাপ নয়। কিন্তু গোলমালটা অন্যখানে, সারা দোকানে পুরুষ কর্মচারী বিল্টু একা বাকি সবই মেয়ে। সবই অল্পবয়সী, কেমন যেন ফিচেল টাইপ, তেমন আয়েশ করে রাগ করতে পারে না বিল্টু, আর তাতেই যেন দমবন্ধ করা দশা তার।
বাড়ী থেকে বেরিয়ে অটোর লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মাথাটা আবার নতুন করে গরম হতে থাকে, আজ মাছের ঝোলটা একেবারে অখাদ্য ছিল, মেয়ের শোকে রান্নায় মোটে মন নেই মার। অটোর আশা ছেড়ে একটা ভীড় বাসের পাদানিতেই ঝুলে পড়ে বিল্টু, তাতেও দোকানে পৌছতে একটু দেরীই হয়ে গেলো; কেউ বলবে না কিছু, তবে ঝুমুর নামের ওই মিচকে মেয়েটা একটা জ্বালা ধরানো ফিচেল হাসি হাসবে।
‘তখন থেকে বলছি ভালো কিছু দেখাও, সেই একঘেয়ে ট্র্যাশ যত। গেলোবার কি একটা গছালে কিটি পার্টিতে আই ওয়াস জাস্ট নট গেটিং এনি আটেন্সান’, সেই মোটা মহিলা অদ্ভুত সাজপোশাকে আবার দোকানে হাজির, আজ ঝুমুরের কপাল খারাপ, সকলেই টেনশনে চুপচাপ, ঝুমুর প্রাণপণ তোয়াজে ব্যস্ত।
’কি ব্যাপার, গ্রে, বেইজ এসব কি দেখাচ্ছ? আর কালো তে তো আলমারি ঠাসা; ওই লাল জারদৌসিটা দেখাও, আর অরেঞ্জটাও’ মহিলা খিঁচিয়ে ওঠেন।
‘ম্যাডাম লালটা ক্যারি করতে একটু অসুবিধা হতে পারে, মানে ওটা আসলে ওয়েডিং কালেকশন তো’ ঝুমুর আমতা আমতা করে।
‘কি বলতে চাইছ তুমি? মানে লাল শাড়ী পড়ার বয়স নেই আমার? আই ওয়ান্ট টু টক টু দ্য ম্যানেজার; যত বস্তির মেয়ে কে দোকানে জুটিয়েছে, কথা বলতে জানেনা!’ বিশ্রী মুখভঙ্গিতে চেঁচিয়ে ওঠেন মহিলা।
‘এই! বস্তি দেখাচ্ছেন কাকে? ভদ্দরলোক এসেছে! খুকীদের লাল শাড়ী পরার বয়স বা চেহারা কোনটাই আপনার নেই; ফুটুন তো এবার! যত্ত সব!’ হঠাৎ করে তেড়ে ওঠে বিল্টু। এক পলকেই শ্মশানের নিস্তব্ধতা, অনভ্যস্ত দাবড়ানিতে থমকে যান উদ্ধত মহিলা, মুখ কালো করে বেরিয়ে যান চুপুচাপ। সকাল থেকে জমে থাকা রাগটা বের করতে পেরে বেশ ফুরফুরে লাগে বিল্টুর।
‘আজ আপনি না থাকলে!’ বাকীটা আর বলতে পারেনা ঝুমুর, তার ছলছল চোখের দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা কেমন ভেঙে চুরে যায়, এই অজানা অনুভুতি আর যাই হোক রাগ নয়, সেটা বুঝতে অসুবিধে হয়না বিল্টুর।
***
জিঘাংসা
ব্যুটিকের দুপয়সার ম্যানেজারটার অসভ্যতায় দিশেহারা লাগে তনিমার, অপমানে চোখে জল আসে। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গাড়ীতে উঠে পড়ে, ‘গ্রে স্ট্রীট চল’ ড্রাইভারকে হুকুম দিয়ে চোখ বোঁজে সে। আজকাল সব খানেতেই যেন হেরে যাচ্ছে তনিমা, পার্টিতে সৃজিতকে নিয়ে কানাঘুষো, বন্ধুমহলে অনুকম্পা, সবমিলিয়ে মাথা ঠিক রাখতে পারেনা আর। ‘সৃজিতকে প্রশ্ন করলে এড়িয়ে যায়, যদিও তনিমার প্রতি তার আগ্রহের অভাব লুকোতে চেষ্টা করেনা; তবে এটাও ঠিক বৌকে ঝেড়ে ফেলবার মত কলজের জোরও তার নেই। চোরা পথের উঠতি পয়সা হলেও, ব্যাবসা আর সম্পত্তিতে তনিমারও সমান অংশীদারী, শুরুটা যে ওর বাবার পয়সাতেই।
চুপচাপ হেরে যাবার মেয়ে অবশ্য তনিমা নয়, সৃজিতকে জব্দ সে করবেই। খবরের কাগজ থেকেই মিঃ দে-র সাথে যোগাযোগ, প্রথম দিন গ্রে স্ট্রীটের ঘুপচি অফিসটায় যাবার অভিজ্ঞতা যে খুব ভালো হয়েছিল তা নয়। একেই ভারী শরীর নিয়ে তিনতলায় খাবি খেতে খেতে ওঠা, তায় সিরাজদৌলার আমলের একটা টেবিলের ওধারে বসা মুশকো চেহারার লোকটা পরিচয় দিল ‘লক্ষ্মী দে, প্রাইভেট ডিটেকটিভ’।
‘এই গুঁফো চেহারায় এমন লক্ষ্মীমন্ত নাম’! স্বভাবসিদ্ধ ভাবে খেঁকিয়ে উঠেছিল তনিমা।
‘আজ্ঞে, লক্ষ্মীকান্ত, ছোট করে লক্ষ্মী’; খিঁক খিঁক হেসে উল্টোদিকের নড়বড়ে কাঠের চেয়ারটায় বসতে বলে ডিটেকটিভ মশাই।
‘কার পেছনে ফেউ লাগাতে হবে? স্বামী না বয়ফ্রেন্ড?’
‘কি বাজে বকছেন? আমার কিছু ইনফরমেশন চাই’।
‘ওই একই হল’।
এরপর সৃজিতের ছবি ও বাইয়োডেটা, সাথে ফি নিয়ে দরাদরি; সব সেরে চেয়ার ছেড়ে উঠতে গিয়ে পেরেকে লেগে কেপ্রির পেছনটা ফ্যাছাৎ। এটা লোকটার একটা বদমাইশি কিনা বুঝতে পারেনি তনিমা, তবে পরের বার থেকে বসতে গেলে সাবধান হয়।
ছ্যাঁচড়া হলেও লক্ষ্মী দে কাজের লোক, সৃজিতের বাঁদরামোর অনেক খবরই এনে দিয়েছে সে; লোকে যা বলে মিথ্যে নয়। তবে খবর নয় হাতেনাতে প্রমাণ চাই তনিমার, সেকারণেই আজ দে র অফিসে যাওয়া।
‘আপনি এসে পড়েছেন? আমি ফোন করতেই যাচ্ছিলাম’ এতদিনে প্রথমবার ব্যস্ততা দেখায় লক্ষ্মী দে। ‘সঙ্গে গাড়ী আছে তো? তাহলে চলুন বেরিয়ে পড়ি’,
‘কোথায়’ তনিমা স্বরে সন্দেহের সুর।
‘আরে চলুনই না, কাজটা হেভি রিস্কি হয়ে যাবে, নেহাত আপনি সঙ্গে আছেন তাই।
‘স্টেডিয়াম নেবেন ভাই’ গাড়ীতে উঠে ড্রাইভারকে নির্দেশ দেয় লক্ষ্মী। সল্টলেকে স্টেডিয়ামের পেছনের অভিজাত পাড়ায় একটা তিনতলা বাড়ীর সামনে এসে গাড়ীটা দাঁড়ায়। সাইন বোর্ড দেখে বোঝা যায় এটা একটা গেস্ট হাউস। একতলার রিসেপশনের অপবয়সী ছোকরাটার সাথে খানিক গুজগুজ, তারপর কয়েকটা পাঁচশর নোট চালান।
‘সাহেব দোতলার ঘরে, ডুপ্লিকেট চাবি ম্যানেজ করেছি; আপনি নীচে থাকুন আমি স্যাট করে কয়েকটা ছবি তুলে আনি; বাওয়াল হলে আপনি ম্যানেজ দেবেন’ লক্ষ্মীর স্বরে উত্তেজনা।
‘আপনি নীচে থাকুন, চাবিটা আমায় দিন’ ছোঁ মেড়ে চাবিটা কেড়ে নিয়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দেয় তনিমা।
দোতলায় নম্বর লেখা কাঙ্ক্ষিত ঘরটা খুঁজে পেতে সময় লাগে না। চাবি দিয়ে দরজা খুলে হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে চোখে পড়ে মেঝেতে ছড়ানো জামাকাপড় আর বিছানায় দুটো হতভম্ব মূর্তি।
‘তুমি!!’ সৃজিতের কাতড়ানি অনেকটা তাড়া খাওয়া নেড়ি কুকুরের ডাকের মতই শোনায়। কয়েক মুহূর্ত থমকে যায় তনিমাও, তারপরেই এগিয়ে গিয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা কাপড়ের বান্ডিল উঠিয়ে নিয়ে সদর্পে বাইরে পা বাড়ায়; কি মনে হতে, টেবিলের ওপরে পড়ে থাকা সৃজিতের ঘড়ি আর মোবাইলটাও উঠিয়ে নেয়; এরপর আর কোনও দিকে না তাকিয়ে সে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
‘ডোন্ট ডু দিস প্লিজ তনিমা!’ ভেতর থেকে ডুকরে ওঠে সৃজিত।
‘চলুন!’ সিঁড়ির কাছে অপেক্ষমান লক্ষ্মীকে তাড়া দিয়ে কাপড়ের পুঁটলি নিয়ে গাড়ীতে ওঠে তনিমা, অনেকদিন পরে হালকা লাগে, মনে মনে ক্ষমা করে দেয় ব্যুটিকের ছেলেটাকে।
***
ছন্দপতন
খানিক্ষণ শ্বাসরোধী নীরবতা, তারপর ফুঁপিয়ে ওঠে রিয়া। রিয়া মুন্সী বছর খানেক হোল সৃজিতের অফিসে চাকরী পেয়েছে, ডেসিগ্নেশান পাবলিক রিলেশান অফিসার, তবে অবস্থার গতিকে বসের সাথে রিলেশানের ভারি উন্নতি ঘটেছে তার।
রিয়ার বয়স সাতাশ, ছিমছাম সুন্দরী; সাজগোজের নিপুণতায় আকর্ষন আরো বেড়েছে। উত্তর কোলকাতার রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, ছোটবেলা থেকেই উচ্চাকাংক্ষী, অথচ পড়াশোনায় ধার ছিল না; কলেজ পেরোতেই তাই চাকরীর চেষ্টা। রিসেপশানিস্ট, প্রাইভেট অ্যাসিস্টান্ট, ক্রমে স্মার্টনেস আর চটকের জোরে এই পদন্নোতি। সৃজিতের সাথে ঘনিষ্ঠতা খুব বেশীদিনের নয়,দরাজ হস্ত বসের আনুকুল্যে এযাবৎ ভালই কাটছিল; তবে আজকের এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে সে।
‘এখন কি হবে?’ কঁকিয়ে ওঠে রিয়া।
‘আহা, উতলা হয়োনা, আমি তো আছি’, সৃজিতের আশ্বাসে কান্না থামায় সে।
‘দেখো প্রথমে এদের কাউকে দিয়ে কিছু জামা কাপড়ের ব্যবস্থা করছি, তারপর তোমায় বাড়ী ড্রপ করে দেবো, হোল তো?’
‘আমি বাড়ীতে কি বলব?’
‘বাড়ীতে আবার বলার কি আছে?’
‘বা রে! অফিসে গিয়ে হঠাৎ ড্রেস বদল হয়ে গেলো, মা জানতে চাইবে না?’
‘ওঃ, তা বলে দিও তোমার জামায় কফি পড়ে গেছিল, তুমি বান্ধবীর জামা পরেছ’।
‘বান্ধবী কি অফিসে জামা বগলে করে ঘোরে? আর আমারটাই বা গেলো কোথায়?’ রিয়া ব্যোমকেশী কায়দায় বিশ্লেষণ চালায়।
‘ধুর বাবা, বলে দিও না কিছু, এখন ওসব ভাবতে পারছি না’, সৃজিত অবস্থার চাপে গদগদ ভাব বজায় রাখতে পারে না।
এরপর একটা তোয়ালে জড়িয়ে, ইন্টার কমে ম্যানেজারকে হাঁক পাড়ে সে। ‘ব্যাপার কি মশাই, আপনার গেস্ট হাউসের কোনও সেফটি নেই; যে যখন পারছে ঢুকে পড়ছে?’
‘গেস্টহাউসের সেফটি তো আপনাদের মত গেস্টদের কারণেই আর থাকছে না স্যার!’ ম্যানেজার পাকড়াশীও তেড়িয়া হয়ে ওঠে।
এই মূহুর্ত্তে তাকে চটানো ঠিক হবে না ভেবে সুর নরম করে সৃজিত। ‘যাক গে যা হয়ে গেছে। ইয়ে, মানে কাউকে একটু দোকানে পাঠানো যাবে, আছে কেউ?’
‘এই তো মুশকিলে ফেলেন, দেখছি দাঁড়ান’।
‘স্যার আমায় ডেকেছিলেন?’ দরজার বাইরে থেকে জানান দেয় গেস্টহাউসের বয় শিবু।
‘হ্যাঁ দাঁড়াও আমি আসছি’, সৃজিত দরজার ভেতর থেকে সাবধানে মুখ বাড়ায়।
‘শোনো, কাছের মল থেকে এক সেট পুরুষ আর এক সেট মহিলাদের পোষাক আনতে হবে, দোকানের নাম আর সাইজ লিখে দিচ্ছি; দরকার হলে দোকানে গিয়ে ফোন করবে, আমার নম্বর দিচ্ছি’, সৃজিত এতক্ষণে হারানো আত্মবিশ্বাস খুঁজে পায়। এরপর টেবিলের ওপর থেকে নিজের পার্স আনতে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় সে। পার্স ছিল প্যান্টের পকেটে, এমনকি গাড়ীর চাবিও, আর যাবার সময় তনিমা মোবাইলটাও নিয়ে যেতে ভোলেনি; কপালে ঘাম জমে ওঠে, মনে মনে তনিমার কাছে হার মানে সে জীবনে প্রথম বার। বাধ্য হয়ে রিয়ার কাছেই হাত পাততে হয়, বসের সাথে বেরিয়ে পার্স বের করতে হওয়ার কথা নয়, তাই তার বাগে ছিল শুধু একটা পাঁচশর নোট, সেটাই অত্যন্ত অনিচ্ছায় বের করে দেয় রিয়া।
‘এ টাকায় কি হবে?’ রিয়ার চোখে জল।
পরিস্থিতি বুঝে উদ্ধারে নামে শিবু, ‘কাছেই একটা হকারদের মার্কেট আছে স্যার, আমরা কেনাকাটা করি, ওখান থেকে এনে দিচ্ছি’; অগত্যা রাজী হয় সৃজিত।
একশ টাকার একটা ফুল ছাপ বার্মুডা আর দুশ টাকার একটা নাইটি নিয়ে ফেরে শিবু আধঘন্টার মধ্যেই, বাকি দুশ টাকা সে নিজেই নিজেকে বকশিস দিয়েছে।
‘এটা পরে বাড়ী যাবো কি করে, অপদার্থ বুড়ো ভাম!’ খেঁকিয়ে ওঠে রিয়া, তার মুখভঙ্গী রীতিমত হিংস্র।
বার্মুডার ওপর গেস্টহাউসের তোয়ালে চাপিয়ে মাথা নীচু করে রিয়ার ধাঁতানি হজম করে নীচে নামে সৃজিত, রিয়ার ফোনেই ট্যাক্সি বুক করতে হয়েছে, তাকে বাড়ী ছেড়ে নিজের বাড়ী গিয়ে ভাড়া মেটাতে হবে। ভাগ্যিস গেস্টহাউসের পেমেন্ট ঢোকার সময় করতে হয়েছিল, মনে মনে ভাবে সে।
‘স্যার ওটা রেখে যান!’ ট্যাক্সিতে উঠতে যাবে, ম্যানেজার পেছন থেকে হেঁকে ওঠে।
‘তোয়ালেটা রেখে যান স্যার, ওটা নিতে গেলে আলাদা চার্জ’; গা থেকে তোয়ালে খুলে দিতে দিতে লোকটার চোখে মুখে কেমন একটা জান্তব উল্লাস লক্ষ্য করে সৃজিত।
***
রাঁদেভু
‘আজ বিকেলে কি করছিস?’
‘কি আবার করব, রুটি বানাবো, এঁটো বাসন মাজব!’ ফোনে শিবুর আদুরে প্রশ্নের উত্তরে ঝাঁঝিয়ে ওঠে রূপা।
‘সবসময় এতো রেগে থাকিস ক্যানো? একটু ভালো করে কথা বলতে পারিস না?’
‘শোন, এই কাঠ দুপুরে বাগান ঝাঁটাতে ঝাঁটাতে ভালো কথা কিছু মাথায় আসছে না, কি বলার চটপট বলে ফেল’।
‘আজ বিকেলের শোয়ে দুটো টিকিট আছে, শাহ্রুখের বই, সিটি সেন্টারে।‘
‘কি বললি? তুই মলে সিনেমার টিকিট কেটেছিস?’ রূপার স্বরে বিস্ময়ের ঘোর।
‘হ্যাঁরে, তোর কবেকার শখ তাই...’
অফিসের দিনেও মলের চত্বরে বেশ ভালই ভীড়, অল্প বয়সী প্রেমিক প্রেমিকা থেকে মধ্যবয়সী বান্ধবীদের দল, কিম্বা কলেজছুট ছাত্রছাত্রী; মল তো আজকাল অনেকেরই ঘরবাড়ী। চারপাশের চাকচিক্য দেখতে দেখতে ঘুরে বেড়ায় রূপা, শিবু পাশে পাশে চলে আহ্লাদী পোষা বেড়ালের ভঙ্গীতে। আজকে ভাইয়ের বিয়ের জন্যে কেনা শাড়ীটা পরেছে রূপা, সময় নিয়ে সেজেছে।
‘সবাই তোকে দেখছে টেরিয়ে টেরিয়ে’, শিবু ফিসফিসিয়ে বলে। কথাটা মিথ্যে নয়, এমন বিয়েবাড়ীর সাজে মলে ঘুরে বেড়ালে লোকে তো দেখবেই।
‘চা খাবি?’
‘না থাক, যা দাম!’
‘খা না, এক কাপ দুজনে ভাগাভাগি’, শিবু ঘন হবার চেষ্টা করে।
‘বলছি না দরকার নেই? শুধু শুধু পয়সা নষ্ট’, রূপা তেড়ে উঠতে গিয়ে সুর বদলায়।
এরপর খোঁজাখুঁজি করে হলে ঢোকে দুজনে; শো শুরু হয়ে গেছে, তবে বিজ্ঞাপন চলছে, সিনেমার দেরী আছে। অন্ধকারে কোনওক্রমে সিটে বসে লাইটম্যানের নির্দেশ অনুযায়ী। ঠান্ডা ঘর, নরম চেয়ার, পাশে গার্লফ্রেন্ড, শিবুর কেমন নেশা নেশা লাগে; আজকের দিনটা হঠাৎ করে কেমন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তার।
‘এত আরামে আমার তো ঘুম পাচ্ছে রে শিবু’, রূপা ফিসিফস করে।
‘সে কি রে ঘুমাবি কি তোর শাহরুখের কি হবে তাহলে?’ রূপা চিমটি কাটে শিবুকে, গদগদ প্রেমে।
রূপা মজে আছে সিনেমায়, সময়ের হিসেব থাকে না, কখন যেন ইন্টারভ্যাল হয়ে গেলো;‘বাথরুম যাবো’ শিবুকে নাড়া দেয় সে, একা যাবার সাহস নেই। হাঁচোড় পাঁচোড় করে বেরোতে গিয়ে পাশে বসা এক মহিলার পা মাড়িয়ে দেয় সে।
‘কি হলটা কি দেখে চলুন!’ মহিলার বিরক্তিপূর্ণ মন্তব্য মাঝপথেই আটকে যায়।
‘কি রে তুই? তোর না মা কলতলায় পড়ে গেছে, ডাক্তার দেখাতে হবে!’ চেঁচিয়ে ওঠেন মহিলা। বেগোতিক দেখে শিবু হাত ধরে টানে, কিন্তু মহিলাও ছাড়ার পাত্রী নন।
‘তাই বলি, ডাঁই বাসন পড়ে রইল, রাতের রান্না মাথায় উঠেছে, তিনি পড়িমড়ি করে বাড়ী ছুটলেন, এ কি মায়ের টানে? আজকালকার মায়েরা কি আর অত ভাগ্য করেছে!’
‘মা চুপ করো!’, পাশে বসা কিশোরী মেয়েটি মহিলাকে সামলানোর চেষ্টা করে, মায়ের আচরণে সে খুবই বিব্রত।
‘তুই চুপ কর, তোর আর কি? রাতে রান্না নেই, তাই পিজ্জা মিজা সব আসবে; এদিকে যে বাবার কোলেস্ট্রল, আর আমার ভিএলসিসি, তাতে কি আসে যায়!’
ততক্ষণে চারপাশের লোক এদিকের গোলমালে মনযোগী, সকলেই ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করছে। রূপা না যেতে পারছে, না বসতে, শিবুর অবস্থাও তথৈবচ; এর মধ্যেই সিনেমা শুরুর মুখে। সবাই দাবড়ানি দিয়ে থামাতে চেষ্টা করেন মহিলাকে এ অবস্থায়, ‘দিদি, বাড়ীর সমস্যা বাড়ীতেই মেটান, এখানে আমরা পয়সা দিয়ে ফিল্ম দেখতে এসেছি’। অবশেষে ক্ষান্ত দেন তিনি, ফিল্মের দ্বিতীয়ভাগ শুরু হয়। গুটি গুটি পায়ে হল থেকে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করে রূপা আর শিবু, নতুন করে শর্বরী বৌদির মুখোমুখি পড়তে চায় না তারা আর।
‘টিকিট কেটে দেখতে এসেছ, পুরোটা দেখে বাড়ী যাবে; আর শোন, কাল সকালে সময়মত এসো’, শর্বরী বৌদি হিসহিসিয়ে দাবড়ানি দেন রূপাকে।
***
ফুল ফুটিয়াছে
‘মা ওয়াস সো এম্বারাসিং, হলের মধ্যে চেঁচামেচি, তুমি জানো না বাবি!’, শর্বরীর সতেরো বছরের মেয়ে তিতলি বাড়ী ফিরে তার বাবার কাছে অভিযোগে আছড়ে পড়ে।
এই বয়সের ছেলেমেয়েদের কাছে প্রাণের চেয়ে মানের দাম ঢের বেশী, বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে; আধবুড়ো বেয়াক্কেলে বাপ মায়েরা সেটা বুঝলে তো!
‘অ্যাই, কি বললি? এম্বারাসিং! ছোটবেলা থেকে খাইয়ে পড়িয়ে পটি সাফ করে বড় করলাম, এখন মা হচ্ছে এম্বারাসিং! তুমি কিছু বলছ না যে বড়?’ শর্বরীও তার বর অনিমেষের ওপর চেঁচায়। আসলে ভালমানুষ অনিমেষ হচ্ছে বালির বস্তা, প্রয়োজনে মা মেয়ে দুজনেই খুব খানিক কিলিয়ে হাতের সুখ করে নেয়; আজকের স্ট্রেসের যুগে ফ্রাস্টেশান বের করার একটা জায়গা চাই তো!
‘আহা, তুমি শুধু মুধু কাজের মেয়ের কারণে রাগ করে নিজের শরীর খারাপ করছিলে, তিতলি সেটাই বলছে।‘
‘তুমি অমনি মেয়ের ঝোল টেনে কথা বলা শুরু করলে? তিনি যে দিন দিন ধিঙ্গি হচ্ছেন, বাড়ীতে কোনও কাজে হেল্প করে আমায়?’
‘হেল্প আবার কি করব, রূপাদি তো সারাদিন থাকে, সব করে; তুমি নিজেও তো সারাক্ষণ ফ্রেন্ডদের সাথে ওয়াট্স অ্যাপ কর।‘
‘তোর সাহস দিন দিন বাড়ছে তিতলি, তুই আমার ফ্রেন্ড তুললি!’
‘আহা, ফ্রেন্ডই তো তুলেছে, বাপ-মা তো নয়। এই মামনি তুমি মাকে সরি বলো এক্ষুনি’, মা মেয়ের কুরুক্ষেত্রে অনিমেষ শরশয্যায় খাবি খায়। এরইমধ্যে রাগ করে তিতলি নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে।
‘হ্যালো! কিরে ফোন ধরছিলি না কেন?’
‘আরে ধুর ভাল্লাগে না, মা না টোটালি ডিসগাস্টিং!’
‘যাঃ কি যে বলিস, আন্টি ইস আ সুইটহার্ট, যা দারুণ র্যাপ্স আর লাসানিয়া বানায়!’
‘হ্যাঁ তুই তো বলবিই, পেটুক কোথাকার।‘ মোবাইলে ফোনাফোনি হচ্ছে তিতলি আর তার বান্ধবী শ্রেয়ার মধ্যে।
‘আচ্ছা ঠিক আছে এত আপ্সেট কেন বল।‘
‘না রে কিছু না এমনি।‘
‘কাম অন কিছু তো নিশ্চয়ই। বাই দ্য ওয়ে, ইন্সটা তে রেহানের আজকের ফোটোটা দেখেছিস? ডেনিম জ্যাকেটে হি ওয়াস হট!’
‘সামনে থেকে হি ওয়াস লুকিং ইভেন বেটার, ছবিটা ভালো আসেনি।‘
‘মানে?’
‘ওকে সিটি সেন্টারে দেখলাম কয়েকটা বন্ধুর সাথে।‘
‘ও তাই বল! তারপর, কথা বললি?’
‘ড্যাম, সেটাই তো প্রবলেম। ওকে দেখলাম একটা কাফেতে, আমি মার সাথে উইন্ডো শপিং করছিলাম। এরপর মুভি হলে ঢুকে দেখি আমাদের পেছনের রো তে বসেছে,ভাবলাম ইন্টারভ্যালে হাই করব’।
‘ওয়াও, এই খবরটা এতক্ষণ চেপে আছিস? তাহলে তো তোর মুড ভালো হওয়ার কথা, এত রেগে আছিস কেন?’
‘সেটাই তো রিয়েল ইস্যু! ইন্টারভ্যাল হতেই মা ডিস্কভারড আমাদের বাড়ীর হেল্প মিথ্যে বলে ছুটি নিয়ে মুভি দেখতে গেছে,আর অমনি রূপাদির ওপর চ্যাঁচাতে শুরু করল বিচ্ছিরি ভাবে; সবাই ঘুরে দেখছিল। তুই ভাব আমার অবস্থাটা! রেহানও তো দেখল! মনে হচ্ছিল ছুটে পালিয়ে যাই।‘ বলতে বলতে অভিমানে তিতলির গলা ধরে আসে।
‘শীট, এটা সত্যিই খুব খারাপ হোল। এনিওয়ে, অত ভাবিস না; তাছাড়া রেহান তো এমনিতেও কাউকে পাত্তা দেয় না, ভেরি স্নব নিজেকে কি যে ভাবে! চল রাখছি’।
শ্রেয়ার শেষের কথাটাতে স্বান্তনা পায়না তিতলি, বুকের ভেতর জমে থাকা পাথরটা নতুন করে ধাক্কা দেয়, বিছানায় উপুড় হয়ে ফুঁপিয়ে ওঠে সে অজানা বেদনায়। ‘টিং টং’ মেসেজের সংকেত ধ্বনিতে বিরক্ত হয়ে ফোনটা সরিয়ে দিতে গিয়ে মেসেঞ্জারের সদ্য আগত বার্তায় চোখ পড়ে যায়।
‘পিঙ্ক জাম্পসুটে দারুণ দেখাচ্ছিলে আজ’, রেহানের মেসেজটা ফোনের স্ক্রীনে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
***
কাসুন্দি
‘রেহান খেতে এস, কি এত সারাক্ষণ মোবাইল মুখে করে বসে থাকো বুঝি না’, রাসভারি প্রফেসর মিসেস অদিতি মুন্সী খাবার টেবিল থেকে হাঁক পাড়েন।
হাতিবাগানের পৈত্রিক বাড়ীর একাংশে অদিতি, শ্যামল আর রেহানের ছোট্ট ছিমছাম সংসার। বাড়ীর অন্দরসজ্জায় স্বাচ্ছল্য ও রুচির যে পরিচয় আছে, তার পেছনে অদিতির অবদানই মুখ্য, সংসার পালনের বাকি সব কাজের মতই এব্যাপারেও শ্যামল শুধুই অর্থের যোগানদার।
‘এবাড়ীতে তো আর থাকা চলে না’, অদিতির এবারের লক্ষ্য টেবিলের উল্টোদিকে বসা শ্যামল।
‘কেন কি হোল আবার?’
‘কি একটা নোংরা পরিবেশ জানোনা? তোমার বড়দার কথা বলছি। চারতলাটা জুড়ে থাকে কিন্তু যাতায়াত তো এই কমন সিঁড়ি দিয়েই, মুখ ফিরিয়ে তো থাকা যায় না’।
‘বড়দা! বড়দা আবার কি করল?’ সরকারী ব্যাঙ্কের ছাপোষা কেরানী নির্মল, চুপচাপ নির্বিবাদি, তিন তিনটে মেয়ের বাবা হয়ে চিরকালই কেমন নুয়ে আছে। সেই নির্মল কি নোংরামি করতে পারে ঠিক কল্পনা করতে পারেনা শ্যামল।
‘কিরকম শ্যাবি ভাবে থাকে বলতো ওরা? রংচটা দেওয়াল, জানলায় শাড়ী কেটে পর্দা; বাইরেটা রং করার কথা বলতে গেলেই তো আতঁকে ওঠে।‘
‘ও তাই বল’, শ্যামল আশ্বস্ত হয়।
‘না সেসব তো এতকাল সহ্য করেই নিয়েছি, কিন্তু বুড়ি, বুড়ির সাজ পোশাকের ঘটা দেখেছ? কোত্থেকে আসে এসব?’
‘আরে, ওতো চাকরী করে; বি-এ পাশ করেই সেই যে গোঁ ধরল, এলেম আছে মেয়েটার’, শ্যামলের মন্তব্য স্নেহের ছোঁয়া।
‘সে নাহয় তর্কের খাতিরে মেনে নিলাম, কিন্তুর আজকের ব্যাপারটা? আজ আমার সকালের দিকে দুটো ক্লাস ছিল, বাড়ী ঢুকছি দেখি ট্যাক্সি থেকে নামছে বুড়ি একটা ফুটপাতের নাইটি পড়ে, গাড়ীর ভেতরে একটা চোয়াড়ে মত লোক বসেছিল, খালি গা, বার্মুডা, কেমন মিস্ত্রী মিস্ত্রী দেখতে’।
‘আরে বাবা মিস্ত্রীরা কি মানুষ নয়?’
‘আমি তা বলিনি, কিন্তু ওই লোকটার সাথে বুড়ি কি করছিল, আর ওই উৎকট পোশাকে? তার তো অফিস যাবার কথা। আমি তো প্রথমে দেখে চিনতেই পারিনি, রান্নার মাসীর মেয়ে বুলান মনে করেছিলাম।’
‘দেখো হয়তো গো অ্যাস ইউ লাইকে নাম দিয়েছিল বুড়ি, হাঃ হাঃ।‘
‘একদম ছ্যাবলামো করবে না তো অসহ্য!’ অদিতি ঝামটে ওঠেন।
‘তা কি করব? বুড়ি কেন ফুটপাতের নাইটি পরেছে সেই নিয়ে দাদার সাথে ঝগড়া করব?’ শ্যামল এতক্ষণে মেজাজ হারায়।
‘আমি মোটেও তা বলছিনা, শুধু বলছি নিউটাউনের দিকে একটা ফ্ল্যাট দেখতে’।
‘ফ্ল্যাটে নাহয় উঠে গেলে, কিন্তু আমার এই অফিস? ক্লায়েন্টরা ওই তেপান্তরে যেতে চাইবে?’ শ্যামল হাইকোর্টের উকিল, সিভিল কেস সামলায়, বাবার আমল থেকেই বাড়ীর একতলায় অফিস, পৈত্রিক সূত্রে ফার্ম ও অফিস দুইই এখন তার।
‘আসলে তুমিই এই পুরোনো পাড়া, রকের আড্ডা এসব ছেড়ে নড়বে না’ অদিতি বিরক্তি ঢেকে রাখতে পারে না।
‘নিউটাউন ইস কুল’, টেবিলে বসতে বসতে রেহান হঠাৎ মন্তব্য করে।
‘তাহলে আর কি, নিউটাউনের ফ্ল্যাটটা তু্মিই বরং চাকরী করে কিনো, তদ্দিন নাহয় মা-ছেলে একটু মানিয়ে নাও। যত্তো সব!’ চটপট খাওয়া শেষ অরে টেবিল থেকে উঠে যায় শ্যামল।
খাওয়ার পরে রোজকার মত একটা সিগারেট ধরিয়ে সিঁড়িতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে শ্যামল, অদিতির কোথায় কষ্ট সেটা যে ও বোঝে না তা নয়, তবু এতকালের শেকড় উপড়ে ফেলতে যে কলজের জোর লাগে, তা বোধ হয় ওর নেই।
‘রাতের খাওয়া হয়ে গেছে?’ সিড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে নির্মল প্রশ্ন করেন।
‘তুমি এত রাতে, অফিস থেকে?’
‘হ্যাঁ রে, আজকাল আমাদের বড্ড চাপ, আগের মত আর নেই’, নির্মলের গলায় ক্লান্তির সুর।
‘ইয়ে দাদা, এইবার বুড়ির বিয়েটা দিয়ে দাও’।
‘বুড়ির বিয়ে!’
‘হ্যাঁ বয়স তো হয়েছে, দেখতে শুনতেও ভালো, ওর পরে তো আরো দুটো, আর দেরী করা ঠিক নয়।‘
‘কিন্তু ও এখুনি বিয়ে করতে চায় না, আমি তো রিংকুর জন্য চেষ্টা করছি’।
‘বিয়ে করবে না এতদূর এগিয়েছে? দাদা, বুড়ি বোধহয় তাহলে একটা মিস্ত্রী না কার সঙ্গে প্রেম করছে, কি জানি বিয়েই করে ফেলেনি তো ভেতর ভেতর?’
‘অ্যাঁ, কি বলছিস তুই?’ নির্মল আঁতকে ওঠেন।
***
কি কেলো!
‘শুনছ, কোথায় গেলে?’ হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢোকেন নির্মল।
‘কি হয়েছে, এত চ্যাঁচাচ্ছ কেন?’ স্ত্রী সীমা ব্যাস্ত হয়ে ওঠে।
‘বুড়ি কোথায়?’
‘বুড়ি? ঘরে আবার কোথায়?’
‘ও ইয়ে, মানে ঘরেই আছে তাহলে?’ নির্মল খানিকটা আশ্বস্ত হন।
‘কি ব্যাপার হঠাৎ আজকেই তুমি ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বুড়ির খোঁজ করছ?’
‘আজকেই মানে? আজকে কোনও বিশেষ দিন নাকি?’
‘সে আর বলতে! যা বিপদ গেলো মেয়েটার ওপর দিয়ে!’
‘সেকি কিসের বিপদ?’
‘ওর মুখ থেকেই শোন সব’, সীমা বুড়ি ওরফে রিয়াকে ডাকেন, অবশ্য বিপদের ব্যাখ্যান মেয়ের বকলমে তিনি নিজেই করেন। রিয়া উল্টোডাঙ্গা থেকে বাস না পেয়ে একটা অটো রিজার্ভ করে সেক্টর ফাইভে অফিস যাচ্ছিল, দত্তবাদ বস্তির সামনে দিয়ে যেতে গিয়ে একটা গর্তে পড়ে অটোটা উল্টে যায়। রিয়া রাস্তায় ছিটকে পড়ে, জামাকাপড় ছিঁড়ে কাদা মেখে একসা, ড্রাইভারেরও চোট লেগেছিল। সেসময় ওখানকার লোকজন এসে খুব সাহায্য করে, একটি মেয়ে তার নাইটি পরতে দেয় রিয়াকে, মেয়েটির দাদা ট্যাক্সি করে বাড়ী পৌঁছে দিয়ে গেছে একটু সুস্থ বোধ হতে।
‘ওঃ খুব বেঁচে গেছিস মা!’ নির্মল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।
‘এত উপকার করল, ওদের ফোন নম্বরটা নিয়েছিস তো? জামাটাও ফেরত দিতে হবে তো, তাছাড়া আমিও একটা ধন্যবাদ জানাতাম’।
‘না বাবা, তার দরকার হবে না। মানে আমি ওদের পাঁচশ টাকা দিয়েছি’।
‘তাহলেও একটা ধন্যবাদ…।‘
‘বলছি তো দরকার নেই!’ রিয়া বাবাকে দাবড়ানি দেয়।
‘ওঃ, আচ্ছা’, বর্ষাকালের মিয়োনো মুড়ির মত মেয়ের রায় মেনে নেন নির্মল।
‘কেসটা কি?’
‘কিসের কেস?’
‘বলছি আজকের আসল কেসটা কি?’ রিয়ার পরের বোন রিংকু মাস্টার্স করছে বায়ো কেমিস্ট্রিতে, ছোটবেলা থেকেই পড়ুয়া ভালোমানুষ গোছের; তবে বাইরে থেকে যেটা বোঝা যায় না তা হোল ওর তুখোড় বাস্তববুদ্ধি; বাড়ীর লোকেদের মধ্যে ওকেই রিয়া একটু সমঝে চলে। রিংকুর জেরার মুখে নিজের সাহস বজায় রাখতে চেষ্টা করে রিয়া।
‘কি বাজে বকছিস?’
‘বলছি নাইটিটা তো সস্তার হলেও ব্রান্ড নিউ, মেয়েটা তোকে কিনে পরতে দিলো বুঝি?’
‘কিনে দেবে কেন? ঘরে ছিল, সেই থেকেই দিলো তো’।
‘ওঃ! তা, নিজের জামাকাপড় গুলো কি করলি? তুই তো ব্যান্ডেড ছাড়া পরিস না, দান করে এলি?’
‘দান করব কেন? বললাম না কাদা লেগে, ছিঁড়ে যাতা হয়ে গেছিল’।
‘আচ্ছা দিদি, অটোটা যে উল্টে যাবে, তুই বোধহয় বুঝতে পেরেছিলিস না রে?’
‘মানে?’
‘না, তোর জুতোয় তো কোনও কাদা টাদা দেখলাম না তাই। নিশ্চয়ই পড়ে যাবার আগে হাতে খুলে নিয়েছিলি বল?’ রিংকুর মিচকে হাসিতে পিত্তি জ্বলে যায় রিয়ার, কিন্তু এক্ষেত্রে রাগ দেখালে ধরা পড়বার ভয়।
‘যদিও তোকে কৈফিয়ৎ দেবার প্রয়োজন নেই আমার, তবু বলছি, ওই মেয়েটি আমার জুতো যত্ন করে পরিষ্কার করে দিয়েছিল।‘
‘যাক রহস্যের সমাধান ঘটল এতক্ষণে; মেয়েটি জড়িবুটিও জানে কি বল? জামা ছিঁড়ে ফর্দাফাই, অথচ গায়ে একটা আঁচড়ের দাগও নেই’, কথাটা হাওয়ায় ছুঁড়ে দিয়ে অন্যঘরে চলে যায় রিংকু।
‘ভাগ্যিস, বাবা-মা ওর মত বুদ্ধি রাখে না!’ মনে মনে ভাবে রিয়া।
‘শাওয়ার থেকে তো একেবারেই জল পরছে না দেখছি’, বাথরুম থেকে বেরোতে বেরোতে বিরক্তি প্রকাশ করেন নির্মল।
‘হ্যাঁ আজকেই এরকম হল, আমি গোলমালে পেরে উঠিনি গো। কাল বুড়ি মিস্তিরি ডেকে ঠিক করাবে বলেছে।’
‘অ্যাঁ বুড়ি মিস্তিরি ডাকবে? ন্না না! আমিই বরং খবর দেবো সদানন্দকে’, নির্মল তড়িঘরি সমাধান দেন।
‘সদানন্দ তিনকেলে বুড়ো, আজকাল ওর হাত কাঁপে’।
‘ওই বুড়োই ভালো, কল সারাতেই তো ডাকবে, জামাই তো করবে না’, স্বভাববিরূদ্ধ গম্ভীর স্বরে মামলার নিস্পত্তি করেন নির্মল।
***
মৎস্যপুরাণ
‘কোনাগুলো তো সব শুকনোই রয়ে গেলো, কি ঘর মুছছিস? বড্ড ফাঁকিবাজ হয়েছিস আজকাল সুভা!’ সীমা বিরক্তি প্রকাশ করেন ঠিকে ঝির ওপর।
‘তাড়া আছে গো বড়বৌদি, ছোড়দির আজ দুপুরে ডিউটি, বাড়ী আছে’। সুভা প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ মুন্সী বাড়ীতে কাজ করে, সেই ফ্রক পরা বেলা থেকেই; তখন বড়কর্তা বেঁচে, নির্মল শ্যামল ছাত্র। এরপর অনেক জল গড়িয়েছে, ভাইয়েরা ভিন্ন হয়েছে, তবে সুভা টিঁকে গেছে; আপাতত সে নির্মল আর তার ছোটবোন কমলার ঘরে কাজ করে একই বাড়ীর চারতলা ও তিনতলায়। কমলার স্বামী অসীম ঘর জামাই, মানে উড়নচন্ডী স্বভাবের কারণে নিজের পৈত্রিক ভিটে খুইয়ে শ্বশুরবাড়িতে এসে জুটেছিল শ্বশুরের আমলেই, ভাগ বাঁটোয়ারার সময় তিনতলার একটা অংশ পায় তারা। কমলা গভর্মেন্ট হাসপাতালের নার্স, কর্মদক্ষ ও রাসভারী, তাদের একটি ছেলে ব্যাঙ্গালোরে থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে, এসবই কমলার বিচক্ষণতার ফল।
‘তাহলে তো হয়েই গেলো, দিদিমনির মেজাজের দাপটে সবাইকে তটস্থ থাকতে হবে! বিয়ে হয়ে ইস্তক ছোট ননদের ভয়েই কাঁটা হয়ে রইলাম! বিকেলে এসে দয়া করে একটু সময় দিয়ো’, কথাগুলো ছুঁড়ে দেন সীমা দরজা বন্ধ করতে করতে।
‘দিদি কি করছে রে?’ থলে হাতে পা টিপে টিপে ঘরে ঢুকে কথাগুলো বলেন অসীম। পরনে একরঙা লুঙ্গি আর ফতুয়া, উস্কোখুস্কো চুল, ষাটের কাছাকাছি বয়সেও তাঁর হাবভাবে একটা আগোছালো ছেলেমানুষী রয়ে গেছে।
‘রান্নাঘরে’, সুভা ঘর মুছতে মুছতে উত্তর দেয়।
‘ওঃ তাহলে তো হয়েই গেলো, যা এটা দিয়ে আয়, বলবি বেশ রসা রসা করে ঝাল করতে’, থলেটা সুভার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন অসীম।
‘কি আছে ওতে?’ সুভার সুরে সন্দেহ।
‘কি আবার! সোনাইয়ের দোকান থেকে ফেরার পথে ফুটপাতে টাটকা চুনো মাছ দেখে আর লোভ সামলাতে পারলাম না’, অসীমের জবাবে অসীম আত্মপ্রত্যয়।
‘ও আমি দিতে পারব না, তুমি নিজেই দিয়ে এসো ছোড়দি কে।‘
‘কেন রে? এত কি ব্যস্ত তুই?’
‘এত আনন্দ করে আনলে যখন নিজেই দাওনা গিয়ে’।
‘বুঝেছি, যত্তো সব!’, সুভাকে হাত করতে না পেরে, নিজেই গুটি গুটি রান্নাঘরের দিকে এগোয় অসীম, তার মুখে একটা মোলায়েম হাসি লেগে থাকে।
‘আজ তোমার একটা দারুণ পছন্দের জিনিষ এনেছি, এই নাও’, থলেটা রান্নায় ব্যস্ত কমলার পাশে রেখে কথাটা বলেন অসীম।
‘হঠাৎ আমার প্রতি এত দয়া? কি আছে ওতে?’
‘কি বল তো? তুমি ভালবাসো’।
‘আমি অনেক কিছুই ভালবাসি, তবে সাত সকালে এই আদিখ্যেতাটা নয়। কি জড়ো করলে আবার?’
‘ওই একটু চুনো মাছ; খুব টাটকা, রোদ পড়ে রূপোর মত চকচক করছিল একেবারে’।
‘চুনো মাছ? তুমি সকাল সকাল চুনো মাছ এনে হাজির করলে?’
‘বললাম তো দেখে এত ভালো লাগল...।‘
‘দেখে ভালো লাগল তো ছবি তুললেই পারতে মোবাইলে, তারপর ফেসবুকে দিতে ফিলিং অসাম উইথ সিল্ভার চুনো! কিনে আনতে কে বলেছিল?’
‘দূর ছাই, একটু রসা রসা ঝাল খাব ভাবলাম, তা না বউয়ের মুখের ঝালেই পেট ভরে গেলো’, এতক্ষনে ধৈর্যচ্যুতি ঘটে অসীমের।
‘এই শোন! তোমার মত বাউন্ডুলে অপদার্থর সঙ্গে আমি যে টিঁকে রয়েছি এতকাল সেটাই ঢের, আবার চুনো মাছ!’
‘কেন তোমার ভাল লাগেনা চুনো?’
‘লাগে, একশ বার লাগে, যদি নিজে রেঁধে খেতে না হয় তখন। এখন বসে বাছবে কে এই জঞ্জাল?’
‘ছোড়দি, আমি বেছে দেব? মানে জামাইবাবু বড়মুখ করে আনলেন’, সুভা রান্নাঘরের একপাশে এসে দাঁড়ায়।
‘জামাইবাবুর প্রতি দরদ উথলে উঠছে দেখছি! ঘরের কাজে তো এত আগ্রহ দেখি না কখনও। মাছ বাছার বাহানায়, বারান্দা সিঁড়ি সব বাদ দিবি, তোকে জানিনা আমি?’
‘এই জন্যে কারো ভালো করতে নেই, তোমার সুবিধের কথা ভেবেই বলা, যে ভাবে সমানে খুঁড়ছ লোকটাকে!’
‘কি বললি, আমি খারাপ? আর এই বেয়াক্কেলে বুড়োটা খুব ভালো? এত ভালো তো নিজের বাড়ি নিয়ে গিয়ে রোজ চুনো মাছ গেলা’।
‘এবার থামবে তোমরা? দরকার নেই, আর বানাতে হবে না ঝাল, আমি চললাম!’ দুই মহিলার চেঁচামেচির মাঝখানে থলেটা উঠিয়ে নিয়ে বাইরের দিকে হাঁটা দেন অসীম।
‘খুব হয়েছে, থলেটা রাখো এখানে, হাড় হাভাতে বুড়ো! চা দিচ্ছি, দয়া করে পা ধুয়ে ঘরে বসবে। অ্যাই সুভা, মাছটা তাড়াতাড়ি ছাড়া!’ অভ্যস্ত স্বরে হুঙ্কার দেন অসীম গৃহিনী।
***
শেষ অঙ্ক
‘উঃ বাবারে, পিঠটা যেন ফেটে যাচ্ছে! আয়া দিদি একটু ডাক্তারবাবুকে ডাকো না গো!’ হাসপাতালের বেডে শুয়ে কাতরাচ্ছে সাধনবাবুর স্ত্রী সুনীতা; গতকাল গল ব্লাডার অপারেশান হয়েছে তার।
‘এমন চিল্লালে আমরা তো দু চোখের পাতা এক করতে পারছি না, ঢং যত!’ পাশের বেডের এক পাকাটে চেহারার বৃদ্ধা ঝামটে ওঠেন।
‘নিজের তো মোটে হার্নিয়া, আমার কষ্ট বুঝবে কি করে?’ সুনীতা পাল্লা দেয়।
‘কি! আমার অসুখ তোর চেয়ে কম? শরীরের খোঁটা দিলি, তোর খাই না পড়ি র্যা?’ বৃদ্ধার খোনা গলার চিৎকারে আশে পাশের সকলেই তটস্থ হয়ে পড়ে।
‘কি ব্যাপার? এত যদি অপারেশানের শখ, দুজনেরই কিডনি আর লিভার কেটে হাতে ধরিয়ে দিচ্ছি!’ ওয়ার্ডে রাউন্ডে ব্যস্ত কমলার বাজখাঁই হুঙ্কারে খিটখিটে বুড়িও বমকে যায়।
‘এখুনি ভিসিটিং আওয়ার শুরু হবে, কোনো বেয়াদপি শুনি না যেন!’ সবাইকে সচকিত করে রায় দেন রাসভারী কমলা ম্যাডাম।
‘তুমি একা এলে, বুলা এলোনা?’ সাধন বাবুকে ভিসিটিং আওয়ারে প্রশ্ন করে সুনীতা।
‘আমি তো অফিস থেকে এলাম, ও বাড়ী সামলাচ্ছে, বাচ্চা মেয়ে একাই রান্নাবান্না করছে।‘
‘তো মাথা কিনে নিয়েছে। বাচ্চা আবার কি? প্রেম করার বয়স হয়েছে, রান্না করার নয়?’ হিসহিসিয়ে ওঠেন সুনীতা, মেয়ের প্রেমপর্বের কেলেঙ্কারী এখনও ভুলে উঠতে পারেননি তিনি।
‘বুঝি না বাবা, তখন মেয়ের হয়ে নিজেই সালিশী করলে, আর এখন উঠেপড়ে পেছনে লেগেছ। চুকেবুকে গেছে তো সব, এবার ছাড়ান দাও মেয়েটাকে।’
‘যা মিটমিটে মেয়ে তোমার! কেমন সন্দেহ হয়’, সুনীতা বিড়বিড় করেন খানিকটা নিজের মনেই।
‘সকাল বেলা বিল্টু এসেছিল, সঙ্গে একটা রোগা মতন মেয়ে, বলল ওর দোকানে কাজ করে। মেয়েটা টিফিন বাটি করে ঝিঙ্গে পোস্ত বানিয়ে এনেছিল,স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। নিজের মেয়ের খেয়াল নেই মার খাওয়া দাওয়ায়, পরের মেয়ে মনে রেখেছে ঠিক’, ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুনীতা।
‘বাঃ, খুব ভালো, এখন বিশ্রাম নাও। আমি ডাক্তার বাবুর সাথে কথা বলে দেখি কবে ছাড়বে’, সাধন বাবু বিদায় নেন।
রাত বাড়ছে তবু ব্যস্ত বাজারের ভীড়ে কমতি নেই, সাধন বাবু বাস থেকে নেমে চট করে বাজারটা সেরে নিচ্ছেন বাড়ী যাবার জন্য টোটো ধরার আগে। বুঝে শুনে নিতে হবে সব্জি, মেয়েটা তো সবকিছু বানাতে পারবে না। হঠাৎ করে বুকে ওপর একটা ধাক্কা, একটা ছোকড়া তাঁকে পাশ কাটিয়ে সাঁ করে ভীরের মধ্যে হারিয়ে গেলো।
সাধন বাবু আবার সব্জিতে মন দেন, ‘কত হোল?’
‘দুশো পনারো দাদা’। পার্স বের করতে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বুক ধড়ফর।
‘কি হল দাদা?’
‘পার্সটা পাচ্ছিনা ভাই’, দিশেহারা সাধন বাবু ততক্ষনে সারা শরীর হাতরাচ্ছেন; এর মধ্যেই টের পেলেন, বুক পকেটের মোবাইলটাও গায়েব হয়েছে। মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে, আশেপাশের লোক সচকিত হয়।
‘স্যার আপনি আমার সাথে আসুন’, ভীড় ঠেলে বেরিয়ে আসে পল্টন ওরফে প্রণব চন্দ্র গুছাইত।
‘তুমি! আবার এসে জুটেছ!’ সাধন বাবু চেঁচিয়ে ওঠেন।
‘কিছু হয়নি দাদারা, চিন্তা করবেননা আমি ওনাকে বাড়ী পৌঁছে দিচ্ছি। কাকিমার অসুখে একটু ঘেঁটে আছেন’, ভীড়ের উদ্দেশ্যে কথাটা বলে সাধন বাবুকে একপ্রকার টেনেই গলির মুখে নিয়ে যায় পল্টন।
সেখানে একটা ঝকঝকে নতুন টোটো দাঁড়িয়ে, ড্রেনের পাশে অন্ধকারে এক হাড়গিলে ছোকড়া পাংশু মুখে অপেক্ষায়।
‘ক্ষমা চা ছেনো! স্যার বাচ্চা ছেলে, এবারকার মত ক্ষমা করে দিন’, কথাটা বলে ছেনো নামের ছোকড়ার হাত থেকে পার্স আর মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে সাধন বাবুর হাতে তুলে দেয় পল্টন।
‘গুনে নিতে পারেন স্যার, তবে গড়মিল পাবেননা। ছেনো তুই যা।’ সাধন বাবু হতভম্ব, ব্যাপার কিছুই বোধগম্য হল না; সব কিছু পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দেয় পল্টন নিজেই।
‘ট্রিপ সেরে ভজার দোকানে চা খাচ্ছিলাম স্যার, সে সময় আপনাকে দেখলাম বাজার করছেন, আর তারপরেই দেখি ছেনোর কীর্তি। সাঁ করে পিছু নিয়ে লেঙ্গী মেরে কাত করলাম ব্যাটাকে ড্রেনের ধারে; আপনি আমার ইয়ে জেনে অবশ্য খুব দুঃখ করল।
‘ইয়ে, কিসের ইয়ে?’ সাধন বাবু আঁতকে ওঠেন।
‘গেলো মাসে চাকরীতে রিজাইন দিলাম স্যার, বুলা দিব্যি দিয়েছিল বুঝলেন না? তা মালিক আমার মাটির মানুষ। বলল পল্টন, অন্য চাকরীতে পিএপ টিএপ কত কিছু, তা আমি তো আর সেসব পারলাম না। তবে তুই পাঁচ বছরের ওপর কাজ করলি, গ্যাচুইটি তোকে আমি দেবো।’
‘চুরির চাকরিতে গ্রাচুইটি?’ সাধনবাবু বাক্যহারা।
‘অমন করে বলবেন না স্যার, চাকরী তো চাকরীই, সে খাতা লেখারই হোক আর মাল সরাবার। তা, খাতা লেখা বাবুরাই কি আর মাল সরায় না স্যার?’
‘তা এখন তোমার চলছে কি করে?’
‘ওই গ্যাচুইটি, তার সাথে কিছু জমানো ছিল, আর বুলার একজোড়া কানের দুল, সব মিলিয়ে টোটো, পারমিট; এই রুটেই চালাই স্যার। চালপট্টির ঘনাদা আমায় হেভি ভালবাসে, সেই ব্যাবস্থা করে দিল’।
‘বুলার কানের দুল?’ সাধন বাবু দুলে ওঠেন।
‘চলুন বাড়ী পৌঁছে দি’, আর কথা না বাড়িয়ে সাধন বাবুকে নিয়ে টোটো হাঁকায় পল্টন, গোলমালের মধ্যেও সব্জিওয়ালার থেকে বাজারটা নিতে ভুল হয়নি তার।
‘ইয়ে, তোমার কাকিমা সুস্থ হলে এসো একদিন’, বাড়ীতে ঢুকতে ঢুকতে পল্টনকে উদ্দেশ্য করে বলা কথাটা নিজের কানেই আশ্চর্যের ঠেকে সাধনবাবুর।
***
*** ***
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন