অনন্যা পাল
আজকালকার টাচ ফোন বড় স্পর্শকাতর, কিছুদিন আগে এরকম একটা ফোন কিনে অবধি আমিই কাতরাচ্ছি সমানে। এমনিতেই ইংরেজী শব্দে বাংলা লেখার চাপ, বাংলা টাইপে লেখা কিছুতেই রপ্ত করতে পারিনি আমি এখনও, তার ওপর সব সাংকেতিক শব্দ, ‘লল’, ওএমজি’; তাতেও শান্তি নেই সঙ্গে আছে হরেক ইমোজি। এতকিছু শিখতেই যদি পারব, ক্লাস নাইনে দুবার গড়িয়ে, বিকম এ অনার্স খুইয়ে মা সরস্বতীর চৌকাঠ পেরোই?

সে যাই হোক, কয়েকমাস আগের কথা, আমার মাসতুতো বোন জয়ার বিয়ের সব ঠিকঠাক; হবু বরের সাথে আলাপ করিয়ে দিলো ও একদিন। সেই সূত্রে ফেসবুকে আমরা ফ্রেন্ড হলাম। বিয়ের দিন প্রায় এসে গেছে, হবু জামাইবাবু ফেসবুকে নিজের ফ্রেঞ্চকাট দাড়িসমেত ও দাড়ি ছাড়া দুটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপসান দিলেন, ‘ক্লিন শেভ বেটার? বন্ধুরা কি বল?’ আমি মহাউৎসাহে তড়িঘড়ি কমেন্ট দিলাম, ‘একেবারে লালটু’। তবে আজকালকার টাচ ফোন তো, তাড়াতাড়ি টাইপ করতে গিয়ে ইংরেজি অক্ষরে ‘এল’ এর জায়গায় ‘এফ’ লেখা হয়ে গেলো, মানে ‘একেবারে ফালতু’। এমন কপাল আমি সেটা খেয়ালও করিনি, তবে জামাইবাবু ঠিকই খেয়াল করেছিল; ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই আনফ্রেন্ড হলাম। স্বাভাবিক ভাবেই, জয়ার বিয়ের নিমন্ত্রনে আমার মজাটা কেমন পানসে হয়ে গেছিল এরপর।
আরও কিছুদিন পরের কথা, সদ্য ম্যাসেঞ্জারে চ্যাট করতে শিখেছি। অটোতে যাচ্ছি একটা চাকরীর ইন্টারভিউ দিতে, ম্যাসেঞ্জারে দেখা দিলেন আমার বর্তমান অফিসের এক সহকর্মীনি; তিনি আমার সিনিয়ার, খাতির করে দিদি দিদি বলি; খাতিরের আসল কারণটা হল তিনি বসের ডানহাত। অফিসে মিথ্যে বলে বেরিয়েছি, অন্য চাকরীর চেষ্টা করছি একথা কেই বা অফিসে জানায়! তাই একটু ঘাবড়ে গেলাম।
‘তুমি কোথায়?’ সিনিয়ার প্রশ্ন করছেন।
‘ডাক্তারের চেম্বারে!’ আমি সাবধানে উত্তর দিই।
‘অফিসে এমারজেন্সী’।
‘কি হয়েছে?’ আমার ততক্ষণে গলা শুকিয়ে কাঠ।
‘বসের হার্ট অ্যাটাক, অবস্থা খারাপ’ দিদি খোলসা করলেন। সেই মুহূর্তেই গর্তে চাকা পড়ে অটোতে প্রচন্ড ঝাঁকুনি; আর আমার হাত লেগে ম্যাসেঞ্জারে থাম্স আপ স্টিকার পোস্ট হয়ে গেলো। এরপর ইন্টারভিউ মাথায় উঠলো, আমি যে বসের অসুখে উল্লাসিত নই, বরং দুঃখ পেয়েছি খুব, সেটা বোঝানোর আপ্রাণ চেষ্টায় লেগে রইলাম মোবাইলে। সেদিনের চাকরীটা আমি পাইনি, উপরন্তু, অফিসের সেই দিদিও কেমন এড়িয়ে চলতে শুরু করল আমায় এরপর থেকে।
ফোন কোম্পানীদের পাঠাব বলে একটা আর্জি লিখিয়েছি পাড়ার বুনো কাকাকে দিয়ে, ইংরেজীতে মনের কথা খোলসা করতে পরের সাহায্য নিতেই হল! বুনো কাকাও খুশী হয়ে লিখে দিলেন, শুনলাম কাকার একটা দামী টিউশনি চলে গেছে গতমাসে, ছাত্রের মা কে স্মাইলি পাঠাতে গিয়ে, হার্ট পাঠিয়েছিলেন কিনা! তা যাইহোক, আর্জি জানিয়েছি বোতাম ফোন ফেরত আনার জন্য, আমি অস্পৃশ্য ফোনে বিশ্বাসী; ভরসা আছে তাতে অনেকেরই সই জোগাড় করতে পারব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন