কনিষ্ক

অনন্যা পাল

kanishka

সেবেশ অনেক কাল আগের কথা, তখন স্কুলে পড়ি...

মে মাসের প্রথম সপ্তাহ, পচা গরমে শরীর হাঁসফাঁস। অভিজাত স্কুলের গাছপালা ঘেরা খোলামেলা বিল্ডিং তাই রক্ষে; তবে গরমের ছুটির আর মোটে দিন দুয়েক অপেক্ষা তার পর আর পায় কে! টেনের ক্লাসরুমে বসে একমনে পেন্সিল চিবুতে চিবুতে সে কথাই ভাবছিলাম। সদ্য শেষ হওয়া হাফ ইয়ারলি পরীক্ষার খাতা টাতা বেরচ্ছে তাই বেশ একটা চাপা উত্তেজনা, আমি অবশ্য ‘রাগ দুঃখ ভয় তিন থাকতে নয়’ গোছের দর্শনে বিশ্বাসী তাই আপাতত মা টিফিনে কি দিয়েছে সেই নিয়ে গবেষনায় ব্যস্ত। ইতিহাসের দিদিমণি মিসেস রয় ক্লাসে ঢুকলেন, হাতে যথারীতি উত্তরপত্রের গোছা।

‘এগুলো তোমাদের নয়, তোমরা কাল পাবে’ ব্যক্তিত্বময়ী সদাপ্রসন্না দিদিমনি আজ মনে হোল তেমন প্রসন্ন নন।

নিজের জায়গায় বসে গম্ভীর মুখে জানতে চাইলেন X-A র মিতালী বসু কে চেন তোমরা?’ চুপচাপ নিরীহ মিতালী হঠাৎ এত বিখ্যাত কি করে হোল ভাবার চেষ্টা করছি, দিদি নিজেই ব্যাপারটা খোলসা করলেন।

‘একটু আগে মিতালীর খাতা চেক্ করছিলাম, তাই ওর সম্বন্ধে আগ্রহ বোধ করছি।’

আমি তো শুনে থ! মিতালী তো জানতাম পড়াশোনায় আমার থেকেও সরেশ, এর আগে আমরা এক সেকশানে পড়েছি; কলিকালে কত কি যে দেখব!

‘তোমাদের এখন মিতালীর খাতা থেকে সম্রাট কনিষ্কের ওপর যে প্রশ্ন ছিল তার উত্তর পড়ে শোনাচ্ছি, মন দিয়ে শুনে বলবে কি বুঝলে।’ উত্তেজনায় এবং খনিক ঈর্ষায় আমার পেটের ভেতর গুড়গুড়, যাই হোক দিদিমণি তাঁর উদ্দাত্ত গলায় শুরু করলেন।

‘কনিষ্ক অনেক দিক থেকেই আর সব সমকালীন রাজার থেকে আলাদা ছিলেন এবং তার প্রথম কারণ হল তিনি মুণ্ডহীন ছিলেন। মুণ্ডহীন হওয়া সত্তেও বুদ্ধিতে ও পরাক্রমে অন্য মুন্ডওয়ালা রাজাদের থেকে কোনও অংশে কম ছিলেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে যখন শত্রু তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলত, বিনা মুণ্ডেও তিনি অর্জুনের মতই লক্ষভেদ করতে পারতেন। শুধু তাই নয় মুণ্ডহীনতা সত্তেও তিনি সঙ্গীত ও সাহিত্যের অনুরাগী ছিলেন। শুধু একটা বিষয়েই তাঁর বিশেষ অসুবিধে ছিল, মুণ্ড না থাকায় সম্রাটের মুকুট মাথায় পরার সুবিধে ছিল না, তবে মনে হয় সেটা তিনি কোমরবন্ধে ঝুলিয়ে কাজ চালিয়ে নিতেন।’

বাকিটা শোনার মত অবস্থা তখন ক্লাসের কোনও মেয়েরই আর নেই, উদ্বেলিত হাসি চাপার অসীম চেষ্টায় সকলের মুখ লাল। আমি মনে মনে ক্ষনজন্মা মিতালী কে স্যালুট না জানিয়ে পারলাম না। শুধু দিদিমনির মুখে থমথমে গাম্ভীর্য।

‘এটা কি আমাকে অপমানের চেষ্টা?’ উনি দেখলাম ব্যাপারটা ব্যাক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। নিরীহ, ল্যাকপ্যাকে মিতালীকে আর যাই হোক ঠিক অপমানকারিনী হিসেবে ভাবতে পারলাম না।

***

প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি, সম্রাট কনিষ্কের একটি মাত্র প্রতিকৃতি মাটি খুঁড়ে পাওয়া গেছে, সেটি কালের প্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মুণ্ডহীন ছিল। ফলে ইতিহাসের বইয়ে তাঁর যে ছবি পাওয়া যায়, সেটি সেই মুণ্ডহীন ধরের প্রতিকৃতি।

অধ্যায় ১ / ২৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%