বারবেলায়

অনন্যা পাল

barbela e

বাসটা হেলে দুলে চলেছে নিজের খেয়ালে, অনেকটা রাস্তায় চড়ে বেড়ানো গরুর মত, কোথাও পৌছনোর তাড়া নেই; মাঝে মাঝে গোঁত্তা খেয়ে থেমে যাচ্ছে যেখানে সেখানে, রাস্তার পাশের ফুলগাছের চারা বা পড়ে থাকা তরকারির খোসা দেখে গোরু থমকে যায় যেমন করে তেমনি। গরমের দুপুর, বাসের সাথে সাথে যাত্রীরাও যেন কেমন ঝিমিয়ে পড়েছে, যারা বসার জায়গা পেয়েছে বেশ একটা ভাতঘুম দিয়ে নিচ্ছে এই সুযোগে। শুধু দরজার পাশে লেডিস সীটে বসা মহিলাদের চোখেমুখেই বিরক্তি স্পষ্ট বাসের এই বেয়াদপিতে; যদিও মাঝরাস্তায় হাত দেখিয়ে তেড়ে আসা ম্যাডামদের উদ্ধারেই এই হঠাৎ হঠাৎ থেমে যাওয়া। লেডিস সীটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন দুটি মহিলা; তাদের একজন বছর পঁয়ত্রিশের এক জবরদস্ত মা, সীটে বসা লিকপিকে বাচ্চার ঘেঁটি চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি, অন্যজন হলুদ কুর্তি পরা একটি কলেজ পড়ুয়া মেয়ে। মেয়েটির পাশে অখণ্ড মনোযোগে নিজেকে ব্যালান্স করতে করতে দাঁড়িয়ে আছে অল্প বয়সী, মিষ্টি চেহারার একটি ছেলে, তার গা বাঁচানোর শত চেষ্টা সত্ত্বেও মেয়েটির ভুরু কুঁচকে যাচ্ছে মাঝে মাঝেই। এই বয়সের অন্য কোনও ছেলে হয়তো পাত্তা দিতনা এই নীরব দাবড়ানি, কিন্তু এই ছেলেটি সে ধাতের নয়। সদ্য এম-বি-এ পাশ করে ভালো চাকরি পাওয়া অনীশ বরাবরই সিরিয়াস ও স্পর্শকাতর। মৌলালীর কাছে একটা ক্লিনিকে চলেছে আজ সে; না অসুখ বিসুখ কিছু নয়, চাকরীতে জয়েনিংয়ের শর্ত হিসেবে এই নিয়ম মাফিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা।

শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় যেই ছাড়িয়েছে, হঠাতই তাড়া খাওয়া জন্তুর মত দৌড়তে শুরু করল বাসটা; পেছনে একই রুটের দোসর এসে পড়েছে যে! যাত্রী ওঠানোর প্রতিযোগিতায় দুটো বাসই হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। এই টালমাটাল পরিস্থিতে অনীশের অবস্থাই সবচেয়ে সঙ্গীন, মাথার ওপর রড ধরে ঘড়ির পেন্ডুলামের মত দুলতে দুলতে আড়চোখে পাশের যাত্রিণীকে একেকবার দেখে নিচ্ছে সে, সহযাত্রিনীর চোখেমুখে নির্দয় নির্লিপ্ততা। এভাবে চলছিল যাহোক, তাতেও রক্ষে নেই; এক সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়ে বাসটা পেছনের প্রতিদ্বন্দীর ওভারটেক আটকাতে চাইল, আর সেইসঙ্গে হলুদকুর্তী অনীশের বুকের ওপর আছড়ে পরল ‘বিরহিণী রাধা’ স্টাইলে; আচমকা শকে রড ছেড়ে অনীশও দুহাতে খামচে ধরেছে তার কাঁধ, একেবারে উত্তম সুচিত্রার ফিল্মের ক্লাইম্যাক্স। বাস্তবের ক্লাইম্যাক্সটা আবশ্য একটু অন্যরকমই হোল; নিজেকে এক ঝটকায় ছাড়িয়ে সপাটে একটা চড় কশাল মেয়েটি অনীশের গালে, আর সেই সাথে শুরু হয়ে গেলো সীটে বসা সমব্যথিনীদের হুল ফোঁটানো মন্তব্য।

‘আমি প্রথম থেকেই লক্ষ্য করেছি, ছোঁড়াটার নজর খারাপ’।

‘আরে এত জায়গা থাকতে মেয়েদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে কেন বোঝেননা?’

শুনতে শুনতে বিস্ময়ে, অপমানে দুই কানে আগুনের হল্কা; দিশেহারা অনীশ কি করবে ভেবে না পেয়ে বাসের গতি একটু কমতেই একলাফে নেমে যায় মাঝরাস্তায়।

গরমের দুপুরে শুনশান রাস্তা, উটকো নেমে পড়ে হয়রানিই হবে; তবু মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে অনীশ, এই মুহূর্তে লোকজনের মুখ দেখতে ইচ্ছে করেনা তার। ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা কাটিয়ে ঠাওর করতে চেষ্টা করে ঠিক কোথায় নেমে পড়েছে, জায়গাটা আমহার্স্ট স্ট্রীটের কাছাকাছি কোথাও বলেই বোধ হয়। আরে একি! বাসটা খানিকদুর গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো না? মরেছে, হলুদ কুর্তি ঝাঁপ মেরে নেমে এদিকেই ছুটে আসছে তো! হাত নেড়ে প্রচন্ড উত্তেজনায় গর্জন করতে করতে তেড়েই আসছে বলা যায়।

কোনও দিকে না তাকিয়ে সামনের গলিটাতে দৌড়ে ঢুকে পড়ে অনীশ, তার ঘোলাটে হয়ে আসা বুদ্ধিতে পালানোই উচিৎ কাজ বলে মনে হয় সেই মুহূর্তে। কিন্তু মেয়েটাও ধাওয়া করে গলিতে ঢুকে পড়ল যে! তবে কি কোনও ব্ল্যাকমেল চক্রের পাল্লায় পড়ল শেষে? আজকাল তো এরকম প্রায়ই শোনা যায়, মেয়েটার দলের লোকেরা কাছেই আছে নিশ্চই। পুলিস এমারজেন্সিতে ফোন করবে? একবার মনে হয়; কিন্তু বাসের গোলমালটাতে মহিলারা সব মেয়েটাকেই সাপোর্ট করছিল, শেষে অনীশেকেই না দোষী ঠাওড়ায়। আর কিছু ভাবতে পারেনা সে, সোজা দৌড়োতে থাকে পুরোনো কোলকাতার চোরাগলির আঁকেবাঁকে। ভরসা একটাই, অনীশের লম্বা পায়ের গতির সাথে মেয়েটা এঁটে উঠতে না পেরে, হাল ছেড়ে দেবে একসময়। কিন্তু পেছনে পায়ের আওয়াজ ক্রমশঃ স্পষ্ট হতে থাকে, মেয়েটা আশ্চর্য রকম অ্যাথলেটিক; পড়ুয়া ভালোছেলে অনীশের থেকে তার দম ঢের বেশী সেটা প্রমাণ হতে দেরী হয়না। সামনে একটা সরু গলি দেখে স্যাট করে সেঁধিয়ে যায় অনীশ রাস্তার বাঁক পেরিয়ে, মেয়েটা বাঁকের মুখে এসে খুঁজে না পেয়ে এগিয়ে যায়। এমন গোঁয়ার মেয়ে জীবনে দেখেনি অনীশ, বাগে পেলে সর্বস্বান্ত করে ছেড়ে দেবে সন্দেহ নেই।

কাঁহাতক কানাগলিতে আটকে থাকা যায়, বেরোতে তো হবেই, একটু পরে সে চেষ্টাতেই গলির মুখটা আর একবার দেখে নিয়ে পা টিপে টিপে বেরিয়ে আসে অনীশ। বাঁকের মুখে পৌঁছতেই আর একটা গলি থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসে মেয়েটি। শুরু হয় আবার চোর পুলিশের খেলা। আবার এ গলি, সে গলি দৌড়নো, জীবনে শেষ কবে এত দৌড়েছে মনে পড়েনা অনীশের, অন্ততঃ ফুলপ্যান্ট বয়সে তো নয়ই; পা ধরে আসছে ক্রমশঃ, নিঃশ্বাস ভারী, বড্ড তেষ্টা। পেছনে ফেউ লেগেই আছে ক্লান্তিহীন পায়ে, কেমন অসহায় লাগে, শিরদাঁড়ায় ঠান্ডা স্রোত; দিনেদুপুরে, শহরের মাঝখানে এতরকম বিপদ জানা ছিল কি আগে!

‘কিব্যাপার, মেয়েটা তখন থেকে থামতে বলছে শুনতে পাচ্ছ না?’ ঘাড় ছাঁটা চুল, মোটা গোঁফ আর কুতকুতে চোখের এক ষণ্ডা চেহারার যুবক রাগ রাগ মুখ করে পথ আটকায় অনীশের।

‘না মানে…আমাকে না বোধহয়’।

‘কি তোমাকে না? ছিনতাই করে পালাচ্ছ? ব্যাটা তোমাদের চিনিনা?’ বাঘের মত অনীশের কলার চেপে ধরে পরোপকারী যমদূত। ততক্ষণে একটা ছোটখাটো ভীড় জমে গেছে দুজনকে ঘিরে।

‘বিশ্বাস করুন, আমি ওকে চিনিনা!’

অনীশের আর্তি মাঝ পথে থেমে যায় ষন্ডার গলাধাক্কায়; সামলাতে না পেরে মাটিতে পরে যায় সে ক্লান্ত, বিধ্বস্ত শরীরে। ভীড়ের জনতা উৎসুক, টানটান উত্তেজনায় পরিবেশ গম্ভীর, নায়কোচিত দাপটে এগিয়ে আসে দুর্দান্ত যুবক মুঠি পাকিয়ে অনেকটা দেবের স্টাইলেই; মাটিতে চিৎ হয়ে উদ্দত ঘুঁষির অপেক্ষায় চোখ বোজে অনীশ অসহায় আত্ম সমর্পণে। হঠাৎ কি হয়ে গেলো, নাকে নয়, বুকের ওপর কিছু একটা আছড়ে পড়ল ঘূর্ণিঝড়ের মত।

‘মারবেন না প্লিজ!’

মেয়েলী চিৎকারে ধীরে ধীরে চোখ খোলে অনীশ। ঘাম আর চোখের জলে ঝাপসা হয়ে আসা দৃষ্টিতে চেয়ে দেখে হলুদকুর্তী তার বুকের ওপর হুমড়ি খেয়ে রয়েছে, অনেকটা সেই বাসের ভেতরের মতই।

‘আমার সোনার দুল ওনার জামার বোতামে আটকে গেছিল, তাই ছুটে আসছিলাম, ওনার দোষ নেই’ মেয়েটি তখনও বলে চলেছে। ষণ্ডাকে কেমন বিব্রত দেখায় এরপর, ভীড় সরাতে ব্যাস্ত হয় সে।

‘আমি এনা, আপনার লাগেনি তো?’; ঘোলাটে চোখে চেয়ে থাকে অনীশ ভ্যাবলার মত।

এলোমেলো ঝুড়ো চুলে ঘিরে থাকা মুখটা ভারি সুন্দর তো! এই প্রথম লক্ষ্য করে সে এক নতুন রোমাঞ্চে। মেয়েটির হাতের চাপে, বোতামঘরে আটকে থাকা ঝুমকো বুকে হুল ফুঁটিয়ে নিজের উপস্থিতির জানান দেয় ঠিক তখনি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%