হা-চিত্রাঙ্গদা

অনন্যা পাল

পুজোর তখনও মাসখানেক বাকী, পাড়ার কাকু আর দাদারা ঠিক করলেন এবার বিজয়া সম্মিলনীটা বড়সড় করে করতে হবে। আসলে, ব্যানার্জী কাকুর ছেলে টুকাইদা এম-বি-এ করে ভালো চাকরি পেয়েছে ব্যাঙ্গালোরে, দাস জ্যেঠুর নতুন ফ্যাক্টরী টাও নাকি চলছে রমরমিয়ে, বাজেটের তাই পরোয়া নেই। প্রথমেই মিটিং বসলো এক রবিবারের বিকেলে, ভুরিভোজ ছাড়াও আর কি কি করা যায় সেই নিয়ে। ডজন কয়েক সিঙ্গারা আর অগনিত কাপ চায়ের সদ্গতি শেষে পাড়ার মাথারা স্থির করলেন, ম্যারাপ বেঁধে ফাংশান হবে; পাশের পাড়ায় প্রতিবারই হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আমরা দেখতে গিয়ে মুগ্ধ হই। তাই এবার আমরাও, মানে খানিকটা দেখিয়ে দেওয়া গোছের ব্যাপার আর কি। জানা গেলো পূজোর দশমীর দিন হবে বড়দের নাটক আর একাদশীর দিন আমাদের অনুষ্ঠান, মানে যারা ডেঁপো হওয়ার বয়সে পৌঁছেছি, তবে বড়দের দলে জায়গা পাইনি এখনও তাদের। আমাদের দলের নেত্রী পচাদার বৌ খুকু বৌদি, যিনি নাচে, গানে, বলা কওয়ায় রীতিমত পাড়ার সেলিব্রিটি; মজার কথা হোল, পচাদা বড়দের দলের একজন হোতা, কিন্তু বৌদি আমাদের কচিদের দলেই রয়ে গেছেন, বুঝিবা কিছুটা নাম মাহাত্মেই।

খুকু বৌদির উৎসাহে নৃত্যনাট্য করা হবে ঠিক হোল, এবার কোন নৃত্যনাট্য হবে সেই নিয়ে চলল কদিন জোর চেঁচামেচি। কেউ বলে ‘শ্যামা’, তো কেউ বলে ‘নটীর পূজা’, শেষমেশ বিস্তর জল্পনা ও রীতিমত পলিটিক্স করে সবচেয়ে বেশী ভোটে জিতে গেলো খুকু বৌদি আর গাইয়ে গজাদার সিলেকশান ‘চিত্রাঙ্গদা’। চিত্রাঙ্গদায় প্রধান চরিত্র তিনটি, কুরূপা নায়িকা (মানে পার্লারে মেক ওভারের আগে), আর সুরূপা, অর্থাৎ মেক ওভারের পরে। এছাড়া অবশ্যই অর্জুন; তবে আর এক জনও আছে, সে হোল মেক ওভার স্পেশালিস্ট মদনদেব। চিত্রাঙ্গদার চরিত্রে অভিনয়ের জন্যে রেষারেষি পড়ে গেলো নাচিয়েদের মধ্যে; দুবেলা সবাই হত্যে দিচ্ছে খুকু বৌদির বাড়ি। বৌদিও সেয়ানা কম না, এই ফাঁকে, নিজের কচি মেয়েটাকে একেকজনের ঘাড়ে চাপিয়ে বেশ দুদিন সিনেমা দেখে এলো ঝাড়া হাত পা। তো যাই হোক, শেষমেশ নায়িকা বাছাই হোল, যদিও ঢের বেশী সুন্দরী হয়েও দীপা পেলো কুরূপার পার্ট আর চলনসই মিলি হোল সুরূপা। কানাঘুষো শুনেছিলাম, মিলির মা নাকি খুকু বৌদিকে বাচ্চার আয়া ঠিক করে দিয়েছেন। সমস্যা হোল অর্জুন নিয়ে, প্রথাগত ভাবে কোনও নাচ জানা মেয়েই কাজটা চালিয়ে নেওয়ার কথা, কিন্ত টুম্পা, (না সে মেয়ে নয়, রীতিমত জিমে যাওয়া ছেলে) ঝুলে পড়ল নায়ক হবে বলে। টুম্পা, টুকাইদার ভাই, তাকে খাতির না করলে চাঁদায় টান পড়ার আশঙ্কা, অতএব নাচ না জানা মুশকো অর্জুনই সই।

Chitrangada

আমি চিরকালই গলাবাজেদের দলে, অর্থাৎ মুখে মুখে উপদেশ দিতে ওস্তাদ, কাজের বেলায় ঢেঁড়শ। খুকু বৌদির চিত্রাঙ্গদা পলিটিক্সে তাল দিয়েছিলাম (চিয়ার লিডার গোছের ব্যাপার আর কি), তাতেই বৌদি খুশি হয়ে আমায় সুরূপার গান গাইতে বলল। খেয়েছে, আমার গান মাহাত্য পাড়ার কুকুরগুলো আর বেপাড়ার ফচকে গেঁড়িগুলোর ভেংচিতেই প্রমাণ হয়েছে এর আগে; তাই ওই ঝামেলায় পা দিতে আর সাহস হোল না।

বললাম, ‘আমাকে বরং নাচে একটা ছোটখাটো কিছু ...।’

‘ছোটোখাটো? কি বলছ, তোমাকে কি সখীর দলে ভেড়ানো যায়?’ মুখের কথা কেড়ে নিয়ে খুকু বৌদির আর্তনাদ। বুঝলাম দূরদর্শী বৌদি বক্তিয়ার ক্যাডার হারাতে রাজী নন।

‘দাঁড়াও এক কাজ করি, তুমি তাহলে মদনের পার্টটা কর’ নিজেই বুদ্ধি বাতলালেন খুকু বৌদি।

অতএব, চিত্রাঙ্গদায় মদনা হয়ে সেদিনকার মত বাড়ী ফিরলাম।

যাইহোক, শুরু হোল জোরতালে রিহার্সাল, নাচতে গিয়ে পা আর হাত একসাথে চলেনা, যদিবা হাত পা নাড়ি কোনোরকমে, কোমর তো নড়েই না। ভরসা ছিল এই যে, অর্জুনের নৃত্যশৈলী আমার থেকেও দড়; রোমান্টিক সিনে তার নাচ যেন পালকি বেহাড়াদের কুচকাওয়াজ। এদিকে মদনের গান গাইবে বাপ্পাদা, সে একটা পেন কোম্পানীর সেলসে কাজ করে; রোদে ঘুরে ঘুরে তার গলা পুরোনো ট্রাঞ্জিস্টার, কখন বিগরোবে বলা দায়। এসবের মধ্যেই ফাংশানের দিন এগিয়ে এলো, দশমীর দিন সকালে হঠাৎ আমার চোখ লাল, জয়বাংলার শিকার হয়ে আমি মিয়োনো লুচি। যতই থেটার দলের মদনা হই, সেজেগুজে স্টেজে উঠে দেখিয়ে দেওয়ার সুপ্ত বাসনা আমারও ছিল।

খুকু বৌদি সাহস দিল, ‘কুছ পরোয়া নেহি, শো মাস্ট গো অন; নাহয় চোখে মেকাপ হবেনা।’

যেমন কথা তেমন কাজ; খকু বৌদির নির্দেশমত ভাড়াটে মেক আপ ম্যান (রিটায়ার্ড এক যাত্রা আর্টিস্ট, পাড়ার এক কাকুর চেনা) মুখে সাদা ও ঠোটে লাল রং, আর মোটা কালো ভুরু এঁকেই ক্ষান্ত দিল; আমার চোখ চিরকালই ছোট, হাসতে গিয়ে বুজে যায়, তার ওপর সারা মুখে জবরদস্ত মেকাপের প্রকোপে হারিয়েই গেলো বলা যায়। কাকতাড়ুয়ার হাঁড়ির মত মুখ নিয়ে মোহনীয় কামদেবের ভূমিকায় আমার সে রূপ অনেকেই ভুলতে পারেননি বহুদিন।

এবার ফাংশানের কথায় আসি, দর্শকের আসন সেদিন ভরপুর, আমাদের পাড়ার প্রথম ফাংশান, তায় নায়কের ভূমিকায় পুরুষ অভিনেতা, উত্তেজনা তুঙ্গে। প্রথম দিকটা ঠিকই চলছিল, দীপা ও সখীদের নাচ বেশ জমিয়ে দিয়েছে, অর্জুনকেও লোকে মেনে নিয়েছে, সে তখন তপস্বী, তাই নাচের দরকার পড়েনি; কিন্তু গোল বাধল যখন সুন্দরী দীপা প্রাত্যাখ্যাত হয়ে হাঁড়িমুখো মদনের কাছে সুন্দরী হবার বর চাইল। সিটি ও আওয়াজ দেওয়ার সেই শুরু, এরপর অর্জুনের কুচকাওয়াজ, মদনকন্ঠী বাপ্পা দার ফাটা বাঁশের মত গলা, তার ওপর আমার আলো করা রূপ, সব মিলিয়ে যাকে বলে ফুলটু এন্টারটেইনমেন্ট; দর্শকেরা সম্ভবত এটা চিত্রাঙ্গদার প্যারোডি মনে করে দারুন এনজয় করেছিল সেদিন। আমরা অবশ্য এরপর বহুদিন বেপাড়ার লোক দেখলে পালাতে পথ পাইনি; ‘হা চিত্রাঙ্গদা!’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%