একটি গোয়েন্দা ছবি ও পাঁচ ভূত

অনন্যা পাল

ektigpyendachobiopanchvut

গত সোমবার, সাত বন্ধুর আড্ডার হিড়িকে কথা উঠলো একসাথে সিনেমা দেখার; থাকি তেপান্তরে, কোলকাতায় এলে সিনেমা না দেখলে প্রাণ আইঢাই, তাই সবার আগে লাফিয়ে উঠলাম আমিই। পিয়ালী আর শর্বরীও রাজী, দুপুরে সংসারে ফাঁকি মেরে পালিয়ে আসবে, মিতুসী থাকে বন হুগলী, তায় ছেলে আসবে দুদিন পরেই, দেখলাম ফাঁকি মারতে ওর আগ্রহ তুঙ্গে। সুমনা হাই সুগারে কাতরাচ্ছে, সেই কোঠারীতে যাবে ডাক্তার দেখাতে; শরীর যাক চুলোয়, সিনেমা দেখতে জীবন পণ রাখতে রাজী, শেষে কিনা কষ্টে নিরস্ত করা গেলো ওকে। এদিকে দীপার অফিস, বেটা প্রথমে খানিক দায়সারা কাঁইকুঁই করছিল, শেষে আমাদের গুঁতোয় হাফ সি-এল নেবে বলে হুঙ্কার ছাড়লো (‘যা চেয়েছ তার কিছু বেশী দেবো বেণীর সঙ্গে মাথা’ স্টাইলে)। ঠিক হল সব জুটবো বাড়ীর কাছের মলে ১.৩০টা নাগাদ।

দীপার হাফ ডে নিলে ১২ টায় ছুটি হয়, তাই বুদ্ধি দিলাম ‘দেরী না করে চল তুই আমি ১টায় পোঁছই, হকের ছুটি পুরোটা উশুল না করলে চলে!’ সেই মত আমরা দুজনায় ফুডকোর্টে যতক্ষণে পৌঁছেছি, প্রায় সওয়া একটা বাজে, দীপা অফিস থেকে এসেছে তাই খেতে হবে।

বললাম ‘হাতে সময় কম, তুই ধোসা খা।’

তা না, দীপা দৌড়ল নান কিনতে, নান তো আর শুধু খাওয়া যায় না, তাই সাথে পনিরের সবজি। আমরা তীর্থের কাক হয়ে দোকানের কাউন্টারে এঁটে আছি, তাড়াতে না পেরে তাড়াতাড়ি খাবারটাই দিলো দোকানদার শেষে। এবার খাবারের পরিমাণ দেখে দীপার অবস্থা খারাপ, পনির এক গামলা, আর নানটা একটা ছোটখাটো গামছা।

‘আমি একা এতো কি করে খাব, তুইও খা’, দীপার কাকুতি’।

বিপদ বুঝে, ‘সময় হয়ে গেছে, আমি ওপরে গিয়ে দেখি’ বলে কেটে পড়লাম আমি (ম্যাও সামলাক ও)।

ওপরে শর্বরী এসে গেছে ততক্ষণে, একটু পরে এসে গেল পিয়ালীও, দীপার তখনও দেখা নেই। মিতুসীর ফোন এলো এরমধ্যে, আমি কানে চিরকালই খাটো, ভালো বুঝলাম না কি বলছে, তবে আন্দাজ করলাম মলে ঢুকছে। কি সিনেমা দেখা যায়? দেখা গেলো সময় অনুযায়ী খালি একটা নতুন বাংলা গোয়েন্দা সিনেমা সুবিধেজনক হচ্ছে। আমি বাংলা সিনেমার নামে এক পায়ে খাড়া, দেখলাম বাকিরাও ওতেই আগ্রহী (ততক্ষণে বেজার মুখে দীপাও হাজির)। মিতুসীটা কি ভুল করে ফুডকোর্টে গেলো!

পিয়ালী ফোন করছে ওকে, ফোন ছেড়ে হঠাৎ তেড়ে এলো আমার দিকে; ‘কি শুনলি তুই, ও মলে ঢুকছে? কালা কোথাকার! বন হুগলী থেকে সবে বাসে উঠেছে ও।’

যাঃ কেলো! কি করা যায় শেষে পাঁচটা টিকিট কেটে আমরা আগে ঢুকে যাবো ঠিক হোল, মিতুসী এসে ফোন করলে একজন বেরিয়ে এসে নিয়ে যাবে ওকে। আমরা চারটে টিকিট দেখিয়ে ঢুকছি যথারীতি, সেটিংবাজ পিয়ালী সিকিয়রিটির মহিলাকে পটিয়ে রাজী করাল যে মিতুসী নাম বললে বিনা টিকিটেই ঢুকতে দেবে।

‘টিকিটটা কি আপনাকে দেবো?’

‘না লাগবে না, এমনিতেও আপনারা ছাড়া আর তিনজন দর্শক।’

কথাটা শুনে খুশী হব কিনা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। যাইহোক, সময় প্রায় হয়ে এসেছে, হলের দরজা খোলা পেয়ে আমরা হুড়মুড়িয়ে ঢুকে দেখি সাদা কালো একটা ছবি হচ্ছে। সেখানে অপু দুর্গার বাবা স্টাইলে এক প্রখ্যাত অভিনেতা এক্সপ্রেসন দিচ্ছেন; এ কেমন গোয়েন্দা ছবি রে বাবা! হলে এক বৃদ্ধ ছাড়া আর কেউ নেই, আমরা গিয়ে শেষ সারির দামী ঘুম পাড়ানি সোফা গুলোতে হামলে পড়লাম, আমাদের কাছে সস্তার টিকিট বলাই বাহুল্য।

বসেই পিয়ালীর চিৎকার, ‘সন্দীপা কি সুইচ টিপতে হবে রে শোয়ার জন্যে?’ আমি ওর থেকে তিন সীট দূরে, তাই রিলে সিস্টেমে বোঝাতে চেষ্টা করলাম।

‘এত করে বোতাম টিপছি, তবু কিছু হচ্ছে না রে!’ পিয়ালী চেঁচিয়ে চলেছে।

ততক্ষণে অভিনেতা, চিঠিতে পুত্রের মৃত্যুসংবাদে মূহ্যমান; বৃদ্ধ কটমট করে তাকালেন আমাদের দিকে। এরপর আরও দুটো ভাবনা ভাবনা সিন, পিয়ালী প্রাণপণ সুইচ টিপে যাচ্ছে তখনও।

‘এরা তো সব ধুতি পরা গ্রামের লোক, গোয়েন্দা কোনটা রে?’ শর্বরী খোঁচাচ্ছে আমায়।

তারপরেই দেখি আলো জ্বলে উঠে পরদায় ‘সমাপ্ত’ ঘোষণা। ও হরি আগের সিনেমাটায় ঢুকে পরেছিলাম। সাফাই কর্মীরা ঢুকে আমাদের তাড়া লাগালো উঠে যেতে, ‘ঢুকে যখন পড়েছেন, নিজেদের সীটে বসুন’ আদেশ এলো।

‘এত টিপছি সীট খুলছে না কেন?’ পিয়ালী ভাঙা রেকর্ড।

‘ওগুলো বন্ধ করা আছে, টিকিট বিক্রী হলে তবেই খোলা হয়’ সাফাই কর্মীর গম্ভীর উত্তর।

এরপর সিনেমা শুরু হোল, সিনেমার কচি সাজগোজ করা বিগত যৌবনা নায়িকা (তিনি লেখিকা এবং প্রযোজিকাও) বিকট ব্যাকগ্রাউণ্ড মিউজিকের ওপর ভর করে থেকে থেকে ভয় পাচ্ছেন, আর আমাদের হাসির বেগও তত তীব্র হচ্ছে। ইতিমধ্যে ঘুম পারানি সীটের দুটোতে এসে বসেছেন এক বয়স্ক দম্পতি (খবরটা পিয়ালীই দিলো, ওর পেছনেও দুখানা চোখ আছে সন্দেহ নেই)। বয়স্ক জ্যেঠুটি ঠান্ডা ঘরের আরামদায়ক সোফায় রীতিমত নাকডাকিয়ে ভাতঘুম দিতে শুরু করলেন কিছুক্ষণেই, জ্যেঠিমা স্বামীর অমানবিকতায়, নাকি নায়িকার ন্যাকামিতে বিরক্ত হয়ে জানিনা মহা রেগে খুঁচিয়ে তুললেন গোবেচারা জ্যেঠুটিকে, আর তারপরেই একটানা বাক্যবান। আমরা মহানন্দে যুগপৎ সামনে ও পেছনে সিনেমা দেখলাম; পয়সা উশুল আর কাকে বলে!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%