চুল বাহার

অনন্যা পাল

chul bahar

কর্তার চাকরীর গুঁতোয় ব্যাঙ্ককে আসা স্থির হোল যখন, বন্ধুরা শুনে হুড়ো দিল, ‘দারুণ জায়গা খুব মজা করবি, মল, রেস্তোঁরা, ম্যাসাজ পার্লার আরো কত কি’! তাদের উৎসাহ দেখে আমার মনটাও ফুরু ফুরু। শেষমেষ আসা হল ব্যাঙ্ককে, বাড়ী টাড়ি গুছিয়ে থিতু হতে লেগে গেলো কয়েক মাস। এর মধ্যে অনেক ঠেকে একটা জিনিষ বুঝলাম যে, জায়গাটা দারুণ বটেই, তবে তা টুরিষ্টদের জন্যে; আর নিদারুণ তাদের জন্যে যারা এখানকার বাসিন্দা অথচ থাই ভাষা মোটেও জানেনা। থাইল্যান্ড কোনোকালেই বিদেশীদের উপনিবেশ ছিলনা, ফলে ভিন্ন ভাষা শেখার তাগিদও তাদের নেই; অতএব এখানে টিঁকে থাকতে গেলে থাই শেখো, নতুবা নাকাল হও।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যপারটা বেশ খোলসা হবে। সুপার মার্কেটে গেছি একটা ছোট মই কিনতে, বিস্তর চেষ্টা করেও বোঝাতে পারছিনা, শেষে ভাবলাম বেশ ডাম্বশেল হার্ট স্টাইলে অভিনয় করে দেখাই। দোকান ভর্তি লোকের সামনে হাঁচোড় পাঁচোড় করে মইয়ে ওঠার ভঙ্গী করলাম, তারপর মইয়ে উঠে ঝুল ঝাড়ার ভঙ্গী সেও বাদ দিলাম না; দেখলাম আমাকে ঘিরে বেশ একটা ছোটখাটো জটলা তৈরী হয়েছে, সবাই মুগ্ধ হয়ে আমার কাণ্ড দেখছে। মনে মনে বেশ একটু আত্মশ্লাঘা অনুভব করছি যে অভিনয় ভালই করেছি; পরক্ষণেই মেয়েটি একগোছা মোটা দড়ি নিয়ে এসে হাজির, সেই মূহুর্তে নিজেকে চিড়িয়াখানার বাঁদর ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারলাম না; আমার অভিনয় দেখে মেয়েটি ওই দড়িতেই ঝুলে পরতে পরামর্শ দিলো না তো? কেমন সন্দেহ হল মনে মনে।

তা এভাবেই চালাচ্ছি কোনোক্রমে, না চালিয়ে উপায় নেই; তাদের খটমট ভাষা এবং অদ্ভুত উচ্চারণের গুঁতোয় দুএকবার শেখার চেষ্টা করে রণেভঙ্গ দিয়েছি। সামনেই বোনপোর বিয়ে, কোলকাতায় যেতে হবে, যাবার আগে ধোপদুরস্ত হওয়া চাই; শুনলাম বোনটি আমার কুটুম বাড়িতে গেয়ে রেখেছে, ‘দিদি থাকে ব্যাঙ্ককে, সেখানকার রকমসকমই আলাদা’।

কি করি, বাড়ির কাছাকাছি একটা পার্লারে গেলাম, ঢোকার সময় জেনে নিলাম ইংরেজি জানা হেয়ার স্টাইলিস্ট আছে কিনা (এখানে নাপিতদের তাই বলে)। মস্ত করে ঘাড় নেড়ে, আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হল চুলোচুলি (শ্যাম্পু) করতে। আসলে এরা চুল ধোয়ার সময় শ্যাম্পু লাগিয়ে রীতিমত আটামাখা স্টাইলে ম্যাসাজ করে মাথায়, ঘিলু টিলু ঘেঁটে আমার কাছে সেটা প্রায় চুলোচুলিরই সামিল। যাইহোক, সেসব পাট চুকতে বেশ একটি পুতুল পুতুল চেহারার মেয়ে মিষ্টি হেসে কাঁচি নিয়ে তেড়ে এলো, আমি তড়িঘড়ি বোঝাতে চাইলাম, ঠিক কি চাইছি। মেয়েটি বেশ মন দিয়ে শুনে বারকয়েক ঘাড় নেড়ে, প্রথমেই মাথার পেছনের চুলে লাগালো এক কোপ একেবারে ঘাড় চেঁছে।

‘একি! একি!’, তখন মাতৃভাষাই সম্বল। আমার মরণপন আর্তনাদে একটুও না ভড়কে সে লেগে রইল আমার কেশবিন্যাসে; এই বিন্যাসে যে আমার কত বড় সর্বনাশ তা বোঝানোর চেষ্টা ততক্ষণে আমি ছেড়েছি। প্রায় শহীদ হবার মানসিকতায় বুকবেঁধে বসে রইলাম চুপ করে, আয়নার দিকে তাকানোর সাহস আর বাকি নেই তখন। চুল কাটা শেষে হতে আধো আধো বুলিতে সে জানালো ‘ফিনিশ’।

ফিনিশ তো বটেই, তবে সে আমি। দেখলাম মাথায় ব্যাঙের ছাতা পরে একটা অদ্ভুত জন্তু আয়না দিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আর তারপরেই নাপতেনি কন্যে আমার মুখটা বেশ করে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে মন্তব্য করল, ‘নো গুড’!

থাইরা সরল এবং স্পষ্টবাদী, সেদিন একথা মরমে মরমে উপলব্ধি করলাম। শুধু তাই নয়, বিল মেটানোর সময় মেয়েটি জুলু জুলু চোখে পাশে দাঁড়িয়ে রইল, ফলে অতবড় সর্বনাশের পরেও তাকে বখশিস দিতে হল বেশ কিছু। দরজা খুলে বেরিয়ে আসছি, গেটে পাহারারত দারোয়ানজী হাসি হাসি মুখে সেলাম ঠুকলো; লক্ষ্য করলাম, তার চুলের স্টাইলটিও হুবহু আমারই মত।

বাড়ী ফেরার পথে তখন আমার একটাই চিন্তা, বিয়েবাড়ীতে এই রূপ নিয়ে হাজির হলে বোনপোর বিয়েটা না ভেস্তে যায়; বংশে পাগল কেউ আছে জানলে অনেকেই বিয়ে দেয়না কিনা!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%