সেদিন দুজনে

অনন্যা পাল

sedindujon e

বেশ কয়েক বছর আগের কথা, তখন সবে কলেজে ঢুকেছি, বি-কম ফার্স্ট ইয়ার। নামী কলেজ, ক্লাসে ডজন তিনেক ছেলের মধ্যে মেয়ে মোটে আমরা সাতজন; তাই অনেকটা সাতভাই চম্পা স্টাইলে ওঠা বসা এবং আড্ডা দলবেঁধেই চলে। সেদিন বাসস্ট্যান্ডে ছুটির পরে জটলা করছি সবাই মিলে, মনোজ্ঞ আলোচনায় উত্তেজনা তুঙ্গে। একসপ্তাহ হল এক নতুন ইকনমিক্স প্রফেসর এসেছেন কলেজে; সদ্য পাশ করা যুবক, জিন্স-টিশার্ট আর রকস্টার স্টাইল চুলে একেবারে হিরো। আলোচনা তাঁকে ঘিরেই, বলা বাহুল্য। ‘বিয়ে হয়েছে? বাড়ী কোথায় রে? টিউশন পড়াবে আমাদের?’ এহেন বিতর্কে গলা ফাটাচ্ছি কয়জনে। খানিক পরে দুজনের রুটের বাস এসে পড়াতে আলোচনায় ভাঁটা পড়ল তখনকার মত; আমিও ব্যাগ হাতড়ে খুচরো পয়সা দেখে নিতে থাকি আমার বাসের অপেক্ষায়, আজ বাড়ীতে সদ্য বিবাহিত ছোট পিসি-পিসেমশায় এসেছেন, রাতে হেভি খাওয়া দাওয়া, মনটা তাই চঞ্চল।

‘সন্দীপা!’ হঠাৎ পেছন থেকে নিজের নাম শুনে ফিরে তাকিয়ে বেশ একটা চমক লাগলো। ‘আমি নিলয়, তোমার সেকশনেই পড়ি’ আমার দিকে এগিয়ে আসা ছেলেটির পরিচয়ের দরকার ছিলনা, ক্লাসের সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ছেলে হিসেবে ওকে বাকি মেয়েদের মত আমিও চিনে রেখেছি প্রথম দিন থেকেই।

‘বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছ?’ হেসে সায় দিলাম, মনে মনে বললাম, ‘বাসস্ট্যান্ডে আর কিসের জন্যে দাঁড়াবো!’ নিলয় কথাবার্তা চালিয়ে যাচ্ছে, আমি হুঁ-হাঁ করে উত্তর দিচ্ছি, ভেতরে যাই হোক বাইরে বেশ একটা অন্যমনস্ক ভাব ধরে রেখেছি। এরমধ্যেই কয়েকজন সহপাঠিনী আমাদের লক্ষ্য করেছে, তাদের চোখে ঈর্ষার রেশ দেখে আমার মন ফুরফুরে।

একটু পরে যথারীতি আমার বাস এসে পড়ল; এগোতে যাব, ‘এটা বড্ড ভীড়, পরেরটায় যেও’ নিলয় বাধা দিল। তারপর আধঘন্টা ধরে যত বাস এলো, নিলয়ের হিসেবে সবগুলোই খুব ভীড়; অগত্যা! এই মনোযোগ ভালো যতই লাগুক, সন্ধ্যে হয়ে আসছে তাই আমি উশখুশ করতে থাকি।

‘আমাদের তো একই রুট, চলো তোমাকে স্টপে নামিয়ে দেবো’ ব্যাপার বুঝে প্রস্তাব দেয় নিলয়। আমাদের রুট এক হলেও আমার বাড়ী ওর স্টপেজ ছাড়িয়ে আরও অনেকটা, ওর উৎসাহে মনে মনে হেসে রাজী হলাম। ততক্ষণে আমাদের গন্তব্যের একটা বাস এসে পড়েছে, বেশ ফাঁকা । নিলয় বীরত্ব দেখিয়ে একলাফে বাসে উঠে দখল নিলো জানলার ধার ঘেঁষে দুটো সিটের, আমি শেষবারের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বান্ধবীদের দিকে তেরছা দৃষ্টি হেনে এগোলাম প্রায় সেলিব্রিটি স্টাইলে। বাসের পাদানিতে সবে বাঁ-পাটা রেখেছি, এমন কপাল, ডান পায়ের চটির স্ট্র্যাপটা ছিঁড়ে গেলো পটাং করে; বাসটা গোঁত্তা খেয়ে স্টার্ট নিলো ঠিক সেই মুহূর্তেই।

এদিক ওদিক তাকিয়ে, ডান-পায়ের বুড়োআঙুল থেকে ঝুলন্ত চটিটা স্যাট করে ঝেড়ে ফেলে উঠে আসতে যাচ্ছি, কন্ডাক্টর চেঁচিয়ে উঠল, ‘আরে, চটি পড়ে গেল যে!’ না শোনার ভান করে লাভ হলনা, কন্ডাক্টর আমার উপকার করতে ততক্ষণে মরিয়া; বাস থামিয়ে ছেঁড়া চটি রাস্তা থেকে তুলে নিতে বাধ্য করল। কি করি, এক হাত, আর এক পায়ে চটি নিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিলয়ের পাশে গিয়ে বসলাম। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছি না, দুজনেই চুপচাপ। যাইহোক, এভাবে কিছুটা যাবার পরে নিলয়ই অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে হাসি হাসি মুখ করে পড়াশোনার কথা তুললো একসময়; জানলার মিষ্টি হাওয়া, আর পাশাপাশি আমরা দুজন, ভাললাগাটা আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে ততক্ষণে।

‘কি হল, লেডিস সীটটা ছাড়ুন!’ একজন কানের কাছে হেঁকে উঠল নিলয়কে লক্ষ্য করে।

‘ভাইটি বোধ হয় ঠিক সিওর নয়!’ আর একজন ফোঁড়ন কাটল পাশ থেকে (সুন্দরী মহিলার সঙ্গী পুরুষকে হ্যাটা করার সুযোগ পেলে কেই বা ছাড়ে!)।

চমকে সীটের ওপরে তাকিয়ে দেখি ‘মহিলাদের জন্যে’ লেখা। আগ্রহের আতিশয্যে জায়গা রাখতে গিয়ে নিলয় খেয়াল করেনি নির্ঘাত। ফর্সা মুখ লাল করে ও ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে, আমারও কান গরম, কি বলব ভেবে পেলামনা।

‘টিকিট!’ ঠিক তখনই কন্ডাক্টর টিকিটের পয়সা চাইতে এসে অস্বস্তি থেকে বাঁচালো, মনে মনে লোকটাকে আগের অপরাধের জন্যে ক্ষমা করে দিলাম।

‘আমি টিকিট কাটছি’ নিলয় আগ্রহভরে দুজনের টিকিটই কাটতে চাইল, আমি হেসে পরিস্থিতি হালকা করতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু একি! জিনসের এ পকেট, ও পকেট, শেষে শার্টের বুক পকেট নিলয় আকুল হয়ে হাতড়াচ্ছে; কেমন পাগল পাগল ভাব।

‘কি হল পকেটে পয়সা না নিয়েই বাসে ওঠেন নাকি?’ কন্ডাক্টর বিরক্ত হয়ে খেঁকিয়ে উঠল। নিলয়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, মানিব্যাগ বেপাত্তা, বাসস্ট্যান্ডে পকেটমারি হয়েছে সন্দেহ নেই। অবস্থা সামলাতে, পয়সা বের করে আমিই দুজনের টিকিট কাটলাম; দুজনের মুখেই বর্ষার মেঘ, কথা ভাষা হারিয়েছে।

‘আমি বলি কি, আর কষ্ট করবে কেন, তুমি বরং নেমে যাও; আমি একাই যেতে পারব’ নিলয়ের স্টপেজ আসতে আমি চেষ্টা করে বলে উঠি। ও স্পষ্টতই হাঁফ ছেড়ে বাঁচল, আর কথা না বাড়িয়ে এগোল দরজার দিকে। আমিও মনে মনে বললাম, ‘ভাগ্যিস চেনা কেউ ছিল না!’

আমাদের বন্ধুত্ব যে এরপর আর এগোয়নি, সেকথা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%