মেকানিকসের ফাঁদে

শান্তনু বসু

শখ করে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স নিয়েছি, কিন্তু মেকানিকসের ক্লাস শুরু হতেই বুঝলাম এ আয়ত্ত করা আমার কম্ম নয়। স্কেলার, ভেক্টর, মোমেন্ট অফ ইনারশিয়া, রকমারি ফরমুলা, ইন্টিগ্রেশন, ডিফারেনসিয়েশন, সব হজম করতে গিয়ে আমি ঘেমেনেয়ে একসা। অন্তর্নিহিত তত্ত্ব মাথায় ঢোকে না। বহিরঙ্গের ফরমুলাগুলো শুধু মুখস্ত করার চেষ্টা করি, মনে থাকে না, সব ঘুলিয়ে যায়।

সুঁনন্দর অবস্থা আমারই মতো। একই ধরনের অক্ষমতা থাকলে পরস্পরের মধ্যে বন্ধুত্ব প্রগাঢ় হয়। সেটা আমার ও সুঁনন্দর মধ্যেও হয়েছে। মেকানিকসের ক্লাসে পিছনের বেঞ্চটাই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মনে হয় দু-জনের। সামনে বসে ড্যাবড্যাবে চোখে স্যারের দিকে ঠায় তাকিয়ে থাকার কাজটা বেশ কঠিন। পিছনের বেঞ্চে অন্য ছাত্রদের পিঠের আড়ালে খানিকটা ঘুমিয়ে নেওয়া যায়।

আমাদের মেকানিকস পড়ান অধ্যাপক প্রহ্লাদ সরকার। আমেরিকা ফেরত দাপুটে বিজ্ঞানী। আইনস্টাইনের বিরাট ভক্ত। ওঁর মতোই গোঁফ রেখেছেন। দুষ্টু ছেলেরা বলে, 'গোঁফটাকে আড়েবহরে বাগে রাখতে নাপিতের পিছনে স্যারকে মেলা খরচ করতে হয়।'

সেদিন ক্লাসে নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র পড়ানো হচ্ছিল। হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে ঝোলানো গোঁফে হাত বুলিয়ে প্রহ্লাদ সরকার বললেন, 'ইউ ইয়ংম্যান সুঁতীর্থ, তখন থেকে মনে হচ্ছে তুমি মহাশূন্যে উদ্দেশ্যহীনভাবে লাট্টুর মতো পাক খেয়ে বেড়াচ্ছ। গ্র্যাভিটেশনাল কনস্ট্যান্টটা একটু ব্যাখ্যা করো দেখি।'

আমি উঠে দাঁড়িয়ে হাবাগোবার মতো মুখ করে চেয়ে রইলাম। মনে মনে যত রাগ গিয়ে পড়ল নিউটনসাহেবের উপর। কী দরকার ছিল ওঁর আপেল গাছতলায় বসে থাকার? বসার আর জায়গা পেলেন না? সূত্রটা আবিষ্কার না হলে আজ আমাকে এই ঝক্কি পোয়াতে হয়? অনেকেই ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছে। ভয়ানক অস্বস্তির ব্যাপার। আমি স্ট্যাচুর মতো দাঁড়িয়ে আছি।

প্রহ্লাদ স্যার মৃদু হেসে বলে উঠলেন, 'রাত কত হল? মেলে না উত্তর।' কথাটা বলেই ঘুরে গিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের উপর ফরমুলা ওয়ানের গতিতে চক ছোটাতে শুরু করলেন। কয়েকজন মুখ টিপে হেসে উঠল।

আমাদের সহপাঠী নিত্যানন্দ সরখেল হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, 'স্যার আপনি ভুল ফরমুলা লিখছেন।'

প্রহ্লাদ সরকার চমকে গিয়ে ঘুরে তাকালেন। বিস্ফারিত চোখে নিত্যানন্দের দিকে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে থাকার পর স্যার বললেন, 'কাম হিয়ার। এদিকে এসো। দেখাও দেখি ভুলটা কোথায় হল?'

আমরাও হতবাক। নিত্যানন্দ কি না প্রহ্লাদ স্যারের ভুল ধরছে? প্রত্যয়ের সঙ্গে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে গিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে স্যারের লেখা মুছে নিমেষে ফরমুলাটা ঠিক করে দিল নিত্যানন্দ।

প্রহ্লাদ স্যার ছেলেমানুষের মতো খুশি হয়ে বললেন, 'রাইট। বিষয়টা তুমি ঠিক বুঝেছ। তুমি তো এ যুগের নিউটন হে!'

সেদিন আমরা নিত্যানন্দকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। ফিজিক্সে অসামান্য মেধা। ক্লাসের ছেলেদের মধ্যে নতুন একটা নামকরণ হয়ে গেল তার—নিউটন। এখন থেকে নিত্যানন্দকে আমি নিউটন বলব।

নিউটনের বাড়ি ছিল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার কঙ্কনদিঘিতে। রায়দিঘি বাজার থেকে মাইল চারেক দূরে এক ধাপধাড়া গ্রামে। শতরঞ্জিতে মোড়া, দড়ি দিয়ে বাঁধা, বিছানাপত্র ও একটা টিনের তোরঙ্গ নিয়ে প্রথম যেদিন সে হস্টেলে এল, দেখে ভেবেছিলাম একেবারে গেঁয়ো ভূত। তার উপর নামটাও বেজায় সেকেলে। বলতে দ্বিধা নেই, আমার মতো আপাদমস্তক শহুরে ছেলেরা তাকে একটু তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতাম, একটু হ্যাটাও করতাম।

নিউটন যেন আমাদের ঘাড় ধরে বুঝিয়ে দিল, বাপু আমি গাঁয়ের ছেলে হতে পারি, তা বলে অত হেলাফেলা কোরো না যেন আমায়! মেধার দিক থেকে তোমরা আমার নখের যুগ্যি নও।

সেমিস্টারের বেশি দেরি নেই। ঠিক করলাম নিউটনের কাছ থেকে মেকানিকসের বিষয়গুলো ভালো করে বুঝে নিতে হবে। না হলে ডাহা ফেল।

কয়েকদিন পর আমি আর সুঁনন্দ নিউটনকে পাকড়াও করে বললাম, 'তুই তো জিনিয়াস রে! আমাদের একটু শেখাবি?'

নিউটন অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, 'কী শেখাব?'

'মেকানিকস।'

নিউটন ঠোঁট উলটে বলল, 'ও তো জলের মতো সোজা। শেখানোর কী আছে?'

'বলিস কী? ওই সব ভয়ানক ইক্যুয়েশন, ডিফারেনসিয়েশন, ইন্টিগ্রেশন—এসব জলের মতো সোজা?'

আকাশের দিকে মুখ তুলে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে নিউটন প্রশ্ন করল, 'তোরা অঙ্ক চোখে দেখতে পাস?'

সুঁনন্দ অবাক হয়ে বলল, 'অঙ্ক আবার দেখা যায় না কি?'

'কেন দেখা যাবে না? আমি তো দিব্যি দেখতে পাই। ফরমুলা, সূত্র এসব তো আর আকাশ থেকে পড়েনি, কেউ ঘটনাটা ঘটতে দেখেছে তারপরে থিয়োরি খাড়া করেছে। যেমন নিউটন সাহেবের আপেল, আর্কিমিডিসের চৌবাচ্চা। আচ্ছা ধর, দুই আর দুই চার এটা কষতে কি কখনো ভুল হয়? হয় না। কারণ জিনিসটা তুই চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিস। এ-হাতে দুটো মার্বেল গুলি, ও-হাতে দুটো মার্বেল গুলি। একসঙ্গে মিলিয়ে দিলে চার হয়ে গেল। মেকানিক্সের অঙ্কই বল আর বিজ্ঞানের যে-কোনো তত্ত্বই বল, বিষয়টাতো এমনই।'

এই উচ্চমার্গের কথাবার্তা শুনে আমরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।

নিউটন গাল চুলকোতে চুলকোতে কী একটা ভেবে নিয়ে বলল, 'আচ্ছা, এক কাজ কর। সামনে দিন কয়েক ছুটি আছে। আমি বাড়ি যাব। তোরাও আমার সঙ্গে আমার গ্রামের বাড়িতে চল। ওখানে নিরিবিলিতে বসে তোদের জলের মতো করে মেকানিক্স বুঝিয়ে দেব।'

নিউটনের এই প্রস্তাব আমাদের দু-জনেরই মনে ধরল। গ্রাম কোনো দিন সেভাবে দেখিনি। মামা-কাকা-মাসি-পিসি চোদ্দোগুষ্টির কেউ গ্রামে থাকে না। আমি আর সুঁনন্দ উত্তর কলকাতায় মানুষ। ট্রামের ঘণ্টি শুনে ঘুম থেকে উঠি, ঘুমোতে যাই। নিউটনের কাছে তার গ্রামের যা বর্ণনা শুনেছি, তাতে তো জায়গাটা বেশ আকর্ষণীয় বলেই মনে হয়। বেশ মজা হবে। ঘোরাও হবে আবার পড়াও তৈরি হয়ে যাবে।

শিয়ালদা থেকে নামখানা লোকালে চড়ে মথুরাপুর, সেখান থেকে ভিড়ে ঠাসা বাসে চড়ে রায়দিঘি বাজারে এসে যখন পৌঁছলাম, ভ্যাপসা ভাদুরে গরমে তখন প্রায় হাফসিদ্ধ অবস্থা।

নিউটন বলল, 'তোদের খুব কষ্ট হল বোধহয়?'

আমি বললাম, 'না, না, এ আর এমন কী কষ্ট? মেজোমাসি বিরাটিতে থাকে। বনগাঁ লোকালে চড়া অভ্যেস আছে।'

'চল এবার ভ্যানোয় চড়তে হবে।'

'ভ্যানো? সে আবার কী? আমি প্রশ্ন করলাম।'

'ইঞ্জিনে চলা ফ্ল্যাট ভ্যান। এ গ্রেট ইমপ্রোভাইজেশন অফ অটোমোবাইল টেকনোলজি। দেখিসনি কখনও?'

সত্যিই দেখিনি। সামনে হাঁটতে লাগল নিউটন। আমরা ওর পিছনে। খানিক দূর এগিয়ে দেখি, সার বেঁধে পর পর ভ্যানো দাঁড়িয়ে আছে। মোটরবাইক ও ফ্ল্যাটভ্যানের মিশেল। হাঁসজারু গোছের ব্যাপার। লোকজন গাড়িতে উঠে পটাপট পা ঝুলিয়ে বসে পড়ছে। আমি ভাবলাম, বাঃ! নতুন একটা অভিজ্ঞতা হবে।

একটা ভ্যানোতে চেপে তিনজন পাশাপাশি পা ঝুলিয়ে বসে পড়লাম। পকেট থেকে ছোট্ট একটা ডায়েরি বের করে নিউটন কীসব অঙ্ক কষতে শুরু করে দিল। হঠাৎ বলল, 'বুঝলি, অনেকদিন থেকে এই গাড়িটার বেটার একটা ডিজাইনের কথা ভাবছি। যাতে নিরাপত্তার দিকটা সুঁনিশ্চিত করা যায়।'

ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, 'মানে? এই গাড়িতে চড়া কি নিরাপদ নয়?'

'মাঝেমধ্যেই উলটে যায়। পালটি খায়। রাস্তার পাশে খানাখন্দে গিয়ে পড়ে।'

ছানাবড়া চোখ করে সুঁনন্দ প্রশ্ন করল, 'তাহলে লোকে এ গাড়িতে চড়ে কেন?'

গাঁয়ের লোকের উপায় আর কী আছে? ইঞ্জিনে চলে বলে তাড়াতাড়ি যায়। সময় সবার কাছেই দামি।

ভটভট ভটভট বিকট শব্দ করে ভ্যানো ছেড়ে দিল। নিউটন বলল, 'ইঞ্জিনটা হল শ্যালো পাম্প, যা দিয়ে মাটি থেকে জল তুলে চাষিরা খেতে জল দেয়।'

'বলিস কী?'

গ্রেট ইম্প্রোভাইজেশন। আগেই বলেছি। গাঁয়ের লোকেই নিজের প্রয়োজন মেটাতে এমন গাড়ি তৈরি করেছে। ভ্যানো হল একটা মোটরযান উইদাউট গিয়ার।'

সুঁনন্দ ঢোক গিলে প্রশ্ন করল, 'গিয়ার নেই?'

'শুধু অ্যাক্সিলারেটর আছে। সেটা মোটরবাইকের মতো হ্যান্ডেলে।'

প্রশ্ন করতে গিয়ে আমার গলা কেঁপে গেল, 'আর বব-ব্রেক?'

নিউটন নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় ঘাড় কাত করে বলল, 'আছে। তবে দুর্বল।'

আঁতকে উঠে প্রশ্ন করলাম, 'মানে?'

'সেইজন্যই তো বললাম ডিজাইনে কিছু চেঞ্জ আনা দরকার। যারা এটা চালায়, তারা অনেকটা অনুমানের ওপর নির্ভর করে চালায়। ধর এখান থেকে দশ মিটার দূরে যদি গাড়িটা থামাতে হয়, তাহলে ঠিক কত দূর থেকে ব্রেক চাপতে হবে সেটা সঠিক অনুমান করতে না পারলে সামনের বস্তুর সঙ্গে সংঘর্ষ অনিবার্য।'

করুণ গলায় প্রশ্ন করলাম, 'ভাই কতক্ষণ ভ্যানোয় চড়ে যেতে হবে?'

নিউটন নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল, 'এই মিনিট কুড়ি।'

রাস্তার খানাখন্দ বাঁচিয়ে ভ্যানো সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলেছে। পা ঝুলিয়ে আরাম করে বসে দু-পাশে গ্রামের দৃশ্য উপভোগ করা মাথায় উঠল। পা দুটোর জন্য বড় ভাবনা হতে লাগল। সামনে কোনো কিছুর সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি লাগলে প্রথমেই ঊরুভঙ্গ হবে। একবার ভাবলাম পা তুলে বসি, কিন্তু সে সুঁযোগ নেই। গাড়ি একেবারে ভিড়ে ঠাসা।

নিউটন ছোট্ট নোটবুকটাকে আমার সামনে ধরে বলল, 'এবার এই ইক্যুয়েশনটা দেখ।'

হেলে পড়লাম নিউটনের গায়ে। তবে সেটা নোটবুক দেখার জন্য নয়। খুব বিপজ্জনক ভাবে ভ্যানো একটা অর্ধচন্দ্রাকার বাঁক নিল। নিউটন হেসে বলল, 'সেন্ট্রিফিউগাল ফোর্স। লোহার রডটা শক্ত করে ধরে থাক।'

কাঠ হয়ে বসে আছি। সুঁনন্দর অবস্থাও তথৈবচ। নিউটনের কোনো হেলদোল নেই। সে দিব্যি তার নোটবুকে কীসব আঁকিবুকি কেটে যাচ্ছে।

হঠাৎ সামনে দেখি অর্ধেক রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা লরি। রাস্তার পাশে বালি নামাচ্ছে। উলটো দিক থেকে আসছে আরেকটা ভ্যানো। আমাদের ভ্যানো তির বেগে লরির পিছনের ডালার গায়ে সবুজের উপর লাল কালিতে লেখা 'বিদায় বন্ধু' কথাটার দিকে একেবারে তাক করে এগিয়ে যাচ্ছে।

লরির পিছনে গিয়ে সিধে ধাক্কা মারলে আমার পা দুটো জুত করে চিবোনো শজনে ডাঁটা হয়ে যাবে। আমি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, 'বাপরে গেছি।'

চালক মৃদু ধমক দিয়ে বলল, 'চুপ করে বসেন তো, ব্রেক চেপে দিয়েছি।'

গাড়ির গতি মন্দ নয়। থামার লক্ষণ দেখছি না, বলে কিনা ব্রেক চেপে দিয়েছি। সত্যিই লরি থেকে ফুট পাঁচেক দূরে ঘ্যা-স-স-স শব্দ করে ভ্যানো থেমে গেল।

যাই হোক, পথে কোনো কেলেঙ্কারি হয়নি। খানিক বাদে একটা বটগাছ তলায় ভ্যানো থেকে নামলাম। আশপাশের দৃশ্য দেখে ভ্যানো আতঙ্ক নিমেষে দূর হয়ে গিয়ে মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল। দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ। ধানের চারাগুলো সবে একটু বড় হয়েছে। আকাশে বিকেলশেষের লাল আভা। ঘরে ফিরছে পাখির দল। নিউটন কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, 'তোদের আর একটু কষ্ট করতে হবে। আলের ওপর দিয়ে কিছুদূর হাঁটতে হবে!'

আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, 'ভ্যানোয় চড়ার চেয়ে এ অনেক ভালো। সবুজ ধানখেত দু-পাশে রেখে আলের উপর দিয়ে হাঁটা তো স্বপ্নের ব্যাপার।'

নিউটন বলল, 'স্বপ্ন ঠিকই, তবে একটু কঠিন বাস্তবও আছে। ভাদ্র মাসের মাটির আল। আজ সকালে নাকি জোর এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। পা পিছলে যেতে পারে।'

নিউটন তার ক্যাম্বিসের জুতোটা খুলে নিয়ে হাতে ঝুলিয়ে ধানখেতে নেমে গেল। আমার ও সুঁনন্দর পায়ে রবারের জুতো। শহুরে স্মার্টনেসের জন্য জুতো খুলে হাতে নিতে আমাদের কেমন যেন বাধো বাধো ঠেকল। তাছাড়া ভাবলাম, রবারের জুতো, কাদা লাগলে ক্ষতি নেই। পরে ধুয়ে নিলেই হবে।

আলের উপর পা ফেলেই বুঝলাম পথ অতি দুর্গম। প্রতি পদক্ষেপে হড়কে যাওয়ার সম্ভাবনা। ওদিকে আঙুলের উপর ভর দিয়ে নিউটন দিব্যি তরতর করে হেঁটে যাচ্ছে। আমরা ওকে অনুকরণ করার চেষ্টা করছি। পিঠে বাঁধা আছে ব্যাগ। হাতদুটো ফাঁকা। দু-পাশে হাত ছড়িয়ে দড়ির উপর ব্যালান্স করার মতো করে এগোচ্ছি।

কী আপদ! একে সরু পথ, উলটো দিক থেকে তাগড়াই একটা গোরু নিয়ে হেঁটে আসছে একজন। নিউটন আর সুঁনন্দ দিব্যি পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। আমার সামনে এসে গোরুটা এমন বেমক্কা শিং নাড়া দিল যে সরে যেতে গিয়ে বেকায়দা পা ফেলতেই স্যা-র-র-র করে পিছলে গেলাম। তারপরেই ধপাস। জামাকাপড় কাদায় মাখামাখি। তবে এই ধপাস হওয়ার ফাঁড়াটা কেবল আমার একার উপর দিয়েই যায়নি, খানিক দূর যাওয়ার পর সুঁনন্দও চিৎপটাং হল।

সুঁনন্দকে হাত ধরে টেনে তুলে হাসিমুখে নিউটন বলল, 'এই যে পড়লি এর মধ্যেও অঙ্ক লুকিয়ে আছে।'

চটে গিয়ে সুঁনন্দ বলল, 'ইয়ার্কি হচ্ছে?'

'ইয়ার্কি কোথায়? ব্যাপারটা ভাব। এরকম রাস্তায় কীভাবে পা ফেললে ঘর্ষণবল ম্যাক্সিমাম হবে সেটা ভাবতে হবে। ফ্রিকশনাল ফোর্স ম্যাক্সিমাম করে নিতে পারলে পড়ার সম্ভাবনা কম। দাঁড়া ছবি এঁকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।'

নিউটন হাঁটু মুড়ে বসে একটা কাঠি দিয়ে নরম মাটিতে আঁকিবুকি কেটে আমাদের ঘর্ষণবিদ্যার তত্ত্ব বোঝাতে শুরু করল।

গা-হাত-পা কাদায় মাখামাখি। গা থেকে বিদঘুটে গন্ধ বেরোচ্ছে। একটু রাগের সঙ্গেই বললাম, 'ঢের হয়েছে, এবার চলো। তোর বাড়ি আর কতদূর?'

'ধানখেত পেরোলেই আমাদের গ্রাম। এটাই শর্টকাট রাস্তা। না হলে আরও বাড়তি কিছুটা পথ হাঁটতে হতো।'

নিউটনের বাড়িতে মেলা লোকজন। ওর বাবারা সাত ভাই। কাকা-জ্যাঠারা সব পাশাপাশিই থাকে। একান্নবর্তী পরিবার এখন আর নেই। সবারই আলাদা আলাদা বাড়ি। এই বাড়িগুলো অনেকটা এলাকা দখল করে আছে। বাড়িঘরের মাঝে মাঝে আছে নানারকম গাছপালা। পুকুরও আছে একটা। সব মিলিয়ে ভারি স্নিগ্ধ পরিবেশ।

আমরা যখন নিউটনের বাড়িতে পৌঁছলাম, তখন সন্ধে নামছে। আমাদের দেখে চারপাশের বাড়ি থেকে নিউটনের কাকিমা-জেঠিমা, দাদা-বউদি, খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাইবোনেরা সব পিলপিল করে বেরিয়ে এল।

দু-চারটে কথাবার্তার মধ্যে দিয়েই বুঝে গেলাম, নিউটন লেখাপড়ায় ভালো বলে বাড়ির সবার চোখের মণি। আমরা নিউটনের শহুরে বন্ধু। একই কলেজে পড়ি। কাজেই সাদর অভ্যর্থনার ঘটা পড়ে গেল। এদিকে আমার ও সুঁনন্দর ভারি অস্বস্তি হচ্ছে। গায়ের কাদা শুকিয়ে আসছে। কেমন একটা পচা গন্ধ বেরোচ্ছে গা থেকে।

নিউটনের মা বললেন, 'আহা আলের উপর দিয়ে আসতে গিয়ে পড়ে গিয়েছিলে বুঝি? শহরের ছেলে তো অভ্যেস নেই। যাও বাবা, বাথরুমে গিয়ে জামাপ্যান্ট বদলে স্নান করে নাও।'

লুচি, বেগুনভাজা ও মালপোয়া-সহ জলখাবার সারার পর নিউটন বলল, 'চল তোদের থাকার জায়গাটা দেখিয়ে দিই। মাটির দোতলা বাড়িতে থেকেছিস কখনো?'

'মাটির দোতলা বাড়ি? ফার্স্ট ক্লাস। রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।'

'বাড়িটা আমার এক জ্যাঠামশায়ের। কলকাতায় থাকেন। এমনিতে খালিই পড়ে থাকে বাড়িটা। শীতকালে ভাড়া হয়।'

সুঁনন্দ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, 'ভাড়া? কারা এসে থাকে?'

'শহরের লোক। হোম স্টে। খাঁটি দুধ, খাঁটি মাছ আর খাঁটি হাওয়া—এসবের জন্য তোদের মতো শহুরেরা কেমন হেদিয়ে মরে জানিস তো? হলই না হয় দুদিনের জন্য, তাতেই খুশি। তারপরে ধর সাইকেলে চড়ে ভিলেজ ট্রেকিং।'

আমি বললাম, 'চমৎকার।'

'তোরা ওই বাড়িতেই থাকবি। চারিদিকে অনেক গাছগাছালি আছে। পাখির ডাকে ঘুম ভাঙবে। দোতলা থেকে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানখেত দেখা যায়। ভোরবেলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই মন ভালো হয়ে যাবে। ওপরের ঘরে একটা খাট আছে। দু-জন শুতে পারে। তোরা ওপরে থাকবি, আমি একতলায়। বাড়ি এলে এখানেই আমি লেখাপড়া করি। চারিদিক নিরিবিলি, খুব মন বসে।'

ছবির মতো ছোট্ট মাটির দোতলা বাড়ি। মাথায় টিনের চাল। নীচের দরজার তালা খুলে আমাদের নিয়ে ভিতরে ঢুকল নিউটন। অপরিসর কাঠের সিঁড়ি বেয়ে আমরা উপরে উঠলাম। সিঁড়ি না বলে অবশ্য মই বলাই ভালো।

মাটির মেঝে পরিপাটি করে নিকোনো। জানালা খুলতেই ঘরের ভ্যাপসা গুমোট ভাবটা উবে গিয়ে বিস্তত সবুজখেতের উপর দিয়ে ছুটে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে গেল।

ছাদ নীচু। সিলিং ফ্যান নেই, খাটের পাশে একটা টেবিলফ্যান রয়েছে। তবে লোডশেডিং চলছে।

নিউটন বলল, এ তো আর কলকাতা শহর নয়। গাঁয়ের দিকে বড্ড লোডশেডিং হয় বুঝলি। তবে অবস্থা আগের থেকে অনেক ভালো হয়েছে। খানিক বাদে আলো এসে যাবে।

আমি বললাম, না এলেও অসুঁবিধে নেই। বাইরে থেকে যেমন ঠান্ডা হাওয়া আসছে, ফ্যান লাগবে না।

রাতের আহার বেশ জম্পেশ হল। নিউটনের মা খুব যত্ন করে আমাদের খাওয়ালেন। ঘি-ভাত, সোনামুগের ডাল, বেগুনভাজা, ছানার ডালনা, পুকুরের তাজা রুইমাছের কালিয়া, মোটা সর পড়া ঘন দুধ।

নিউটন বলল, 'চল, আজ শুয়ে পড়ি। বড্ড ধকল গেছে। কাল লেখাপড়া করা যাবে।'

নিউটনের বাবা বললেন, 'টর্চ নিয়ে যেও।'

জ্যাঠামশায়ের বাড়ি নিউটনদের বাড়ি থেকে মিনিট দুয়েকের পথ। এখনও আলো আসেনি। তবে চমৎকার চাঁদের আলো আছে বাইরে। কলকাতায় যা অনুভব করা যায় না। চারিদিক নিঝুম। রাত সাড়ে দশটা বাজে। এরই মধ্যে গোটা গ্রাম যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।

দোতলার ঘরে ঢুকে দেখি আগেই কেউ আমাদের জন্য মশারি টাঙিয়ে দিয়ে গিয়েছে। জানালা দুটো হাট করে খুলতেই জোছনার নরম আলো ঘরে ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণ গল্পগুজব করার পর নিউটন গুডনাইট জানিয়ে নীচে চলে গেল। আমরা শুয়ে পড়লাম।

রাত তখন কত জানি না। আমার হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। সুঁনন্দ ঘুমোচ্ছে। বড় তেষ্টা পেয়েছে। মশারির বাইরে বেরিয়ে সবে জলের বোতলটা হাতে নিয়েছি, ঠিক তখনই পিলে চমকানো একটা শব্দ। দুম করে কী একটা যেন টিনের চালের উপর এসে পড়ল। তারপর টিনের চালের উপর সশব্দে গড়িয়ে গিয়ে মাটিতে পড়ল। 'ঢু-উ-প।'

এই ভূতুড়ে শব্দের ধাক্কায় আমার হাত থেকে জলের বোতলটা সশব্দে মাটিতে পড়ল।

সুঁনন্দর ঘুম ভেঙে গেল। 'কী রে? কী হল?'

'আওয়াজটা শুনলি?'

'কোন আওয়াজ?'

'বাড়ির মাথায় কী যেন একটা দুম করে পড়ল।'

'স্বপ দেখছিলি বোধহয়। মাঝরাতে খামোখা বাড়ির চালে ঢিল মারবে কে?'

সুঁনন্দ কাত হয়ে শুয়ে পেল্লায় একটা হাই তুলল। ঠিক তখনই আবার কিছু একটা বস্তু কান ফাটানো শব্দে টিনের চালের উপর আছড়ে পড়ল—ঝনাৎ। ঘাবড়ে গিয়ে সুঁনন্দ লাফ দিয়ে উঠে বসল।

আমি বললাম, 'বুঝলি তো ব্যাপারটা, আমি স্বপ্ন দেখছিলাম?'

'টিনের চালে বড় বড় ঢিল মারছে কে বল তো?'

আমি বললাম, 'ঢিল কোথায়? আওয়াজে তো মনে হচ্ছে আধলা ইট। ডেঞ্জারাস ব্যাপার! ছাদ ফুটো হয়ে মাথায় এসে না পড়ে।'

মশারির বাইরে এসে সুঁনন্দ বলল, 'কেমন একটা অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পাচ্ছি। চল বাইরে বেরিয়ে দেখি।'

'ওরে বাবা এই অন্ধকারের মধ্যে বাইরে? যদি ভূত হয়?'

'ধ্যাৎ! ভূত বলে কিছু আছে না কি?'

'কে বললে নেই? গাঁয়ে-গঞ্জে অন্ধকারে ভূত থাকে। না হলে লেখকরা ঝুড়িঝুড়ি ভূতের গল্প লেখে কোথা থেকে? সব কি বানানো?'

'বেশ তুই তাহলে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাক। আমি বেরিয়ে দেখি ব্যাপারটা কী?'

আমি ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, 'খেপেছিস? আমি একা একা ঘরে থাকতে পারব না। নিউটনকে ডাকলে হতো না?'

সুঁনন্দ বলল, 'দরকার নেই। হতে পারে কোনো দুষ্টু লোকের নজর আছে এই বাড়ির উপর। শীতকালে ভাড়া দিয়ে হয়তো খুব লাভ হয়। যদি ভূতের ভয়ে নিউটনের জ্যাঠামশায় বাড়িটা বেচে দেন, তাহলে বদমাশ লোকটা কিনে নিতে পারে। ভূতে পাওয়া বাড়ি প্রচার হলে দাম কমে যাবে। এতে যে কিনবে তার পোয়াবারো। বদমাশ লোকটাকে যদি ধরতে পারি, তাহলে বেশ হবে।'

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, 'বলছিস? চল তাহলে।'

পেনসিল টর্চ হাতে নিয়ে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলাম। নিউটনের ঘরের দরজাটা বন্ধ। সে নাক ডেকে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। সদর দরজাটা খুলে বাইরে এলাম আমরা।

আর কোনো ঝুপঝাপ, ঝনাৎঝন শব্দ হয়নি। ঝিঁঝির ডাক বেশ তীক্ষ্ন। টর্চের আলো জেলে বাড়ির চারদিকে ঘুরে কোনো পায়ের ছাপটাপ নজরে পড়ল না।

যাই হোক, অপরাধীর খোঁজে ঝোপের আড়ালে দু-জন বসে থেকে বেশ কিছুক্ষণ মশার কামড় খেলাম। ভৌতিক বা রহস্যময় কোনো কিছু ঘটনা ঘটল না। কোনো ভূতুড়ে শব্দও শুনতে পেলাম না।

সুঁনন্দ বলল, 'বেড়াল-টেড়াল জাতীয় কিছু টিনের চালের উপর লাফিয়ে পড়েছিল বোধহয়। ঘুম নষ্ট করে লাভ নেই, চল শুয়ে পড়ি।'

কথাটা আমার ঠিক মনঃপূত হল না। টিনের উপর অল্প সময়ের ব্যবধানে দু-দুবার বেড়াল লাফিয়ে পড়ার বিষয়টা ঠিক যুক্তি দিয়ে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না। মনের মধ্যে খটকা নিয়েই সরু কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে এলাম আমরা।

মশারিতে সবে ঢুকেছি দু-জনে, আবার টিনের ছাদের উপর আধলা ইট পড়ার শব্দ—ঝনাৎ! এবারের আওয়াজটা আগের চেয়ে আরও জোরালো। দু-জনেই চমকে গিয়ে 'বাপ রে' বলে চেঁচিয়ে উঠলাম।

আমি কাঁপা গলায় বললাম, 'এ নির্ঘাৎ ভূতের কাণ্ড।'

ভূতে ঘোরতর অবিশ্বাসী সুঁনন্দ আমার কথার কোনো প্রতিবাদ না করে হাঁ হয়ে সিলিংয়ের দিকে চেয়ে রইল। উপর দিকে টর্চ মারতেই দু-জনের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। একটা জায়গায় টিনের চালটা তুবড়ে গিয়ে বেশ বড়সড় একটা ক্ষত তৈরি হয়েছে। টিন যে বেশ পুরোনো, মরচে দেখেই তা বোঝা যাচ্ছে।

হঠাৎ বাইরে একটা দমকা হাওয়া ছাড়ল। তারপরে যে কাণ্ডটা ঘটল তাতে দু-জনেরই পিলে চমকে গেল। আবার ঝনাৎ করে একটা শব্দ, সেই সঙ্গে টিনের চাল ফুটো হয়ে একটা কাটা মুন্ডু মশারির ছাদে এসে পড়ল।

দুর্জয় সাহসে বুক বেঁধে কোনোওরকমে মশারির বাইরে এসে দরজার দিকে ছুটলাম। হুড়মুড়িয়ে নীচে নেমে নিউটনের ঘরের দরজায় পাগলের মতো লাথি মারতে লাগলাম দু-জনে।

'নিউটন ওঠ। ওঠ শিগগির। কাটা মুন্ডু!'

চোখ ডলতে ডলতে দরজা খুলে আমাদের চোখ-মুখের অবস্থা দেখে নিউটন ঘাবড়ে গিয়ে বলল, 'কী হয়েছে? ব্যাপার কী? ভয়টয় পেয়েছিস না কি?'

আমি বেশ ক্ষোভের সঙ্গেই বললাম, 'এভাবে মজা করার কোনোও মানে হয়? তোর জ্যাঠার বাড়ি যে ভূতে পাওয়া সেটা আগে বললেই হতো।'

'ভূতের বাড়ি মানে? কোথায় ভূত দেখলি?'

সুঁনন্দ কোনোরকমে বলল, 'মশারির ছাদে কা-কাটা মুন্ডু।'

'তোদের মাথার গোলমাল হল না কি?'

'বিশ্বাস না-হয় তো দেখে আয়। টিনের চাল ফুটো হয়ে মশারির ছাদে একটা কাটা মুন্ডু এসে পড়েছে। সেই মাঝরাত থেকে সমানে মুন্ডুপাত হচ্ছে।'

আমাদের কথার জবাব না দিয়ে নিউটন তরতর করে ওপরে উঠে গেল। সাহসের বলিহারি। খানিক বাদেই উপর থেকে নিউটনের অট্টহাসির শব্দ ভেসে এল। হাসির দমক কোনোরকমে চেপে সে বলল, 'ওরে শিগগির আয়।' আবার হাসিতে ফেটে পড়ল নিউটন, যেন খুব আমোদ হয়েছে।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দু-জনে উপরে গিয়ে দেখি, কাটা মুন্ডুটা হাতে নিয়ে নিউটন দাঁড়িয়ে আছে আর খ্যাল খ্যাল করে এখনও হেসে চলেছে। হাসি থামিয়ে বলল, 'কাটা মুন্ডু? তালের বড়া, তালক্ষীর খেয়েছিস কখনো? ভাদ্র মাসের তাল পড়া চোখে দেখেছিস কোনোদিন? এটা হল একটা জাম্বো সাইজের তাল।'

আমাদের চোখ ছানাবড়া। 'বলিস কী? তা-আ-আ-আ-ল?'

'হাতে ধরে দেখ না! অন্ধকারে অবশ্য মুন্ডু বলেই মনে হয়।'

বিষয়টা খোলসা হল এবার। ধুপধাপ, ঝনাৎঝন শব্দটা তাহলে তাল পড়ার!

নিউটন বলল, 'এ বাড়ির পাশে দু-দুটো তাগড়াই তালগাছ আছে। জ্যাঠামশাইকে বলতে হবে চালের টিনটা বদলে দিতে। টিনটা পুরোনো হয়ে একেবারে লজঝড়ে হয়ে গেছে।'

সকালের আলো ভালো করে ফোটার পর আমরা তালগাছের নীচে এসে দাঁড়ালাম। উপরের দিকে তাকিয়ে পিলে চমকে গেল। থোকা থোকা হয়ে ঝুলে আছে ফুটবলের সাইজের তালগুলো। যেন অদৃশ্য কোনো বোতাম টিপে দিলেই ক্ষেপণাস্ত্রের মতো আছড়ে পড়বে মাটিতে।

নিউটন বলল, 'এ বছরে তাল পড়া সবে শুরু হয়েছে। একেকটার ওজন ধর কেজি তিনেক। হাইটটা মনে মনে ক্যালকুলেট করে নে। গ্র্যাভিটেশনা—কন্সট্যান্ট তো জানাই আছে। জিরো ভেলোসিটি থেকে তাল নীচে পড়ছে। তাহলে মাটি ছোঁয়ার সময় মোমেন্টাম হবে...'

হঠাৎ সরসর করে একটা শব্দ হতেই নিউটন আমাকে জাপটে ধরে পাশে টেনে নিল। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম ঠিক সেখানেই থ্যাপ শব্দে মাটির উপর এসে পড়ল একটা তাল। সময়ের সামান্য হেরফের হলেই অবধারিত মাথায় পড়ত। মনে মনে মোমেন্টামটা ক্যালকুলেট করে শিউরে উঠলাম। মাথায় পড়লে বাঁচতাম কি না কে জানে!

হাতজোড় করে বললাম, 'ভেলোসিটি, মোমেন্টাম, গ্র্যাভিটেশন, ভেক্টর সব একেবারে জলের মতো বুঝতে পারছি। আপেলগাছের তলায় না বসে ভাদ্র মাসে তালগাছের তলায় বসলে স্যার আইজ্যাক নিউটনের পরিণতি কী হতো সেটাও অনুমান করতে পারছি। শিগগির এখান থেকে চল।'

ঠিক তখনই আমার কান ঘেঁষে আরেকটা ক্ষেপণাস্ত্র মাটিতে ল্যান্ড করল। ঝু-উ-প!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%