নাম সংকট

শান্তনু বসু

মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল পশুপতি। গলা শুকিয়ে কাঠ। পশুপতি স্বপ্নে দেখল, সে অফিসে যাচ্ছে। তার সারা গায়ে বড় বড় লোম গজিয়েছে। লম্বা ল্যাজও হয়েছে একখানা। সেটা উঁচিয়ে নয়ের মতো হয়ে আছে। পশুপতি চার হাত-পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছে। অফিসের ব্যাগটা ঝুলছে তার গলা থেকে।

হঠাৎ পশুপতির কানের কাছে মুখ নিয়ে কেউ যেন বলল, 'পশুবাবু মনুষ্যেতর সমাজে আপনাকে স্বাগত।'

চমকে ঘুরে ঘাড়ের কাছে একটা নেড়ি কুকুরকে দেখেই দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে এক লাফে গাছে উঠে পড়ল পশুপতি। তাই দেখে খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগল কুকুরটা। এই অবধি স্বপ্নটা দেখে পশুপতি উরিব্বাপ বলে খাটের উপর লাফ দিয়ে উঠে বসে। স্বপ্নের পরের অংশে আরও ভয়ংকর কী ছিল তা কে জানে!

অনেকে বলে, মানুষ যা নিয়ে খুব ভাবনাচিন্তা করে, তাই নাকি স্বপ্নে দেখে। ইদানীং দুশ্চিন্তায়, দুর্ভাবনায় পশুপতি জেরবার। আসলে সে একটা গভীর সমস্যায় পড়েছে। সমস্যাটা তার নাম নিয়ে।

পশুপতির ডাকনাম নেংটি। তার ঠাকুরদা আদর করে নাতির ওই নাম রেখেছিলেন। পশুপতি গায়ে সুগন্ধি মাখে। রুমালে আতর ছড়ায়। তেল চপচপে সামান্য চুলকটা যত্ন করে আঁচড়ে তালুর উপর পাট করে রাখে। অনেকদিন ধরে ঘষে ঘষে দু-একটা ডিগ্রি আদায় করায় তার বিদ্যার গুমোরও কম নয়। সেই কারণে নাকটা ঈষৎ উঁচু। এমন লোকের 'নেংটি' নাম পছন্দ হওয়ার কথা নয়। কিন্তু পশুপতির দুর্ভাগ্য হল এই যে, নেংটির দাপটে পশুপতির মতো ভারিক্কি মেজাজের নামটা চাপা পড়ে রইল।

'নেংটিদা, ভালো তো', 'ওহে নেংটি, চললে কোথায়', 'কে যায়? নেংটি নাকি?' পথে বেরিয়ে লোকের মুখে এসব শুনলেই পশুপতি তেলেবেগুনে চটে যায়।

গেলবার রবি ঠাকুরের জন্মোৎসবে অর্বাচীন এক ঘোষক বলে উঠল, 'এবার আবৃত্তি করে শোনাবেন নেংটি মিত্তির।' কথাটা শুনেই সামনে বসা কচিকাঁচাদের খিকখিক করে সে কী হাসি!

পশুপতির ইচ্ছে করছিল ছুটে গিয়ে মাইক কেড়ে নিয়ে ঘোষককে আড়ং ধোলাই লাগায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সংযত করে। এদের দুষে লাভ নেই। তার ঠাকুরদাই গোলমালটা পাকিয়ে গিয়েছেন। অবশ্য তাদের বংশে নামকরণের ধরনধারণই উদ্ভট রকমের। তার বাবার ডাকনাম ছিল ফড়িং। ঠাকুরদার ডাকনাম টিকটিকি।

যাই হোক, চাকরি-সূত্রে গ্রাম-ছাড়া হয়ে রাধাবিনোদপুরে এসে পশুপতি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। নতুন জায়গায় তার নেংটি নামটা কেউ জানে না। কেউ নাম শুধোলে শ্বাস টেনে বুক ফুলিয়ে সে গম্ভীর গলায় বলে, 'আমার নাম পশুপতি মিত্র।'

কিছুদিন পরে দেখা দিল অন্য এক সমস্যা। রাধাবিনোদপুরের বেয়াক্কেলে ফাজিল লোকজন পশুপতির নামের 'পতি' ছেঁটে দিয়ে ভারিক্কি নামটার একেবারে দফারফা করে দিল। পশুপতি হয়ে গেল 'পশুবাবু', না হয় 'পশুদা' অথবা 'পশুভাই'। লোকের মুখে ক্রমাগত এসব শুনতে শুনতে হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করল পশুপতি। সত্যি সত্যিই নিজেকে তার মনুষ্যেতর জীব বলে মনে হতে লাগল। এটা যে এক ধরনের বাতিক, এটা তাকে বোঝায় কে?

বড় নাম কেটেছেঁটে ছোট করে নেওয়ার রেওয়াজ খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। রঘুপতি উকিলকে রঘুবাবু বলেই সবাই ডেকে থাকে। উমাচরণ কোবরেজকে উমাচরণবাবু বলে ডাকে ক'জন লোকে, বেশিরভাগ লোকই তাকে উমাবাবু বলে সম্বোধন করে। তেমনই পশুপতি হল পশুবাবু। এর মধ্যে যে রসিকতার কোনও গন্ধ নেই সেটা পশুপতি মানতে চায় না। সে ভাবে তার অসুন্দর চেহারা নিয়ে এটা মানুষের ইচ্ছাকৃত রসিকতা।

পশুপতির গায়ের রং মিশকালো। মাথার চুল পাতলা। নাক থ্যাবড়া। সে মোটেই সুন্দর দেখতে নয়। কিন্তু তাতে কি এসে যায়? এভাবে ভাবতে পারলেই কোনও ঝামেলা ছিল না। কিন্তু পশুপতির মনটা বেয়াড়াপনা শুরু করল।

কেবলই তার মনে হতে লাগল, সে বোধ হয় এখনও পুরোপুরি মানুষ হয়ে উঠতে পারেনি। বিবর্তনের সিঁড়িতে থমকে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোকে তাই তাকে 'পশুবাবু', 'পশুদা', 'পশুভাই' বলে সম্বোধন করে।

অমন একটা ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখার পর নিজের নামটা মুছে ফেলার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠল পশুপতি। এবং কয়েকদিনের মধ্যেই কোর্টে গিয়ে কাজ হাসিল করে চলে এল সে। নাম নিল আদিত্যনারায়ণ। একেবারে রাজা-রাজড়ার নাম, আভিজাত্যের গন্ধে ভরা। উচ্চারণের ধকল কমাতে চাইলে লোকে তাকে আদিত্যবাবু বা নারায়ণবাবু যে নামেই ডাকুক না কেন, কোনওটাই খারাপ শোনাবে না।

আদিত্যনারায়ণ মিত্র, বি কম (অনাঃ), এম এ (দর্শন)। ফুরফুরে মেজাজে বাড়ির দরজায় বড় নতুন নেমপ্লেটখানা সাঁটিয়ে দিল পশুপতি। এবারে আদিত্যনারায়ণ নামটা লোকের মনে গেঁথে দিতে পারলেই কেল্লাফতে। পথে পরিচিত কারও সঙ্গে দেখা হলেই সে এক গাল হেসে বলে, 'ভালো আছেন? এই আর কী! নামটা বদলে নিলাম। নতুন নাম নিয়েছি আদিত্যনারায়ণ। উচ্চারণে অসুবিধা হলে আমাকে আদিত্যবাবু বা নারায়ণবাবু বলতে পারেন।'

একথা শুনে অনেকেই ভাবের ঘোরে বলে, 'বা! বা! চমৎকার। বেশ নাম বাগিয়েছেন তো মশায়। মূল্য কত নিল?'

কিন্তু পরে দেখা গেল এসব লোকের স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত দুর্বল।

ফলে পশুবাবু, পশুদা, পশুভাই...এসব সম্বোধন চলতেই থাকল। হাল ছেড়ে না দিয়ে এবার একখানা লিফলেট ছাপিয়ে ফেলল পশুপতি। তাতে প্রথমেই বড় বড় হরফে লেখা 'পশুপতির নির্বাসন, সুখে থাক আদিত্যনারায়ণ'। এর একটু নীচে ছোট হরফে লেখা নাম পরিবর্তনের কথা।

ছাপা না হয় হল, কিন্তু লিফলেট বিলি করা খুব সহজ কাজ নয়। এর জন্য লোকবল লাগে। কথায় বলে, যার কেউ নেই তার আছেন ভগবান। কয়েকদিনের মধ্যে ভগবানই লিফলেট বিতরণের একটা দারুণ সুযোগ করে দিলেন।

পাড়ায় হরিসংকীর্তন হবে। কমিটির লোকেদের হাতে পাঁচশো টাকা চাঁদা ধরিয়ে দিয়ে পশুপতি হাত কচলে বলল, 'হেঁ হেঁ ভাই, এবার কিন্তু খিচুড়ি ভোগের কুপন বাঁটার দায়িত্বটা আমি নেব। দশের কাজ করার আনন্দই আলাদা।' কমিটির লোকেরা পঞ্চাশ টাকা প্রত্যাশা করেছিল। পাঁচশো টাকা পেয়ে তারা খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল, 'এ তো অতি উত্তম প্রস্তাব।'

অনুষ্ঠানের দিন গাঁয়ের লোক একেবারে ভেঙে পড়ল হরিসংকীর্তনের আসরে। ভোগের কুপন বিলির ফাঁকে লোকের হাতে হাতে একখানা করে লিফলেট গুঁজে দিতে লাগল পশুপতি। নিমেষে হাজারদুয়েক বিলি হয়ে গেল। এরপরে সে খুশি মনে কোমরে গামছা বেঁধে ভোগ পরিবেশনের কাজে লেগে গেল। খিচুড়ির বালতি ও হাতা হাতে দ্রুত ছুটতে হচ্ছে এদিক-ওদিক। তবুও লোকের সন্তুষ্টি নেই। পঙক্তি ভোজনে বসে তারা হাঁকডাক করেই চলেছে। 'ও পশুবাবু, এদিকে আর দুহাতা', 'পশুদা, এদিকটা যে দেখছেন না একেবারে', 'ও হে পশু, তাড়াতাড়ি হাত চালাও'।

পশুপতি বুঝল লিফলেট ছাপানোর টাকাটা বেমালুম জলে গিয়েছে। তার মেজাজ খিঁচড়ে গেল। এর উপরে ক্রমাগত পশুদা, পশুবাবু সম্বোধন শুনে তার মাথাটা বারুদঠাসা হতে হতে একসময় ভয়ানক বিস্ফোরণ ঘটল। হরিপদ হালদার হেঁকে বললেন, 'ও হে পশু, তুমি যে দেখছি ঘোর অকম্মা। কাজের কোনও ছব্বা নেই। এদিকে আর দু'হাতা লাবড়া দিয়ে যাও তো দেখি তাড়াতাড়ি। সেই কখন থেকে ডাকাডাকি করছি।'

বালতি-হাতা এসব ঝনঝনাৎ শব্দে ফেলে দিয়ে হরিপদ হালদারের উপর বাঘের মতো লাফিয়ে পড়ল পশুপতি। গলার শিরা ফুলিয়ে বলল, 'পশুপতির নির্বাসন। সুখে থাক আদিত্যনারায়ণ।' লিফলেট তো দিয়েছি একখানা। কত টাকা গ্যাঁটগচ্চা গেছে জানেন? নতুন নামটা মনে রাখতে পারেন না? ফের পশু বললে মাথা গুঁড়িয়ে দেব।'

হরিবাবু নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তেড়িয়া মেজাজে বললেন, 'হুঁ আদিত্যনারায়ণ! যেমন আঁচড়ে কামড়ে দিলেন, তাতে আপনার ওই পশু নামটাই ঠিক। আপনাকে পশুরাজ বললেও অত্যুক্তি হয় না।'

একথা শুনে পশুপতি আবার তেড়ে যেতে চায়! লোকজন তাকে টেনে ধরে নিরস্ত করে। হরিবাবুও সহজে দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি ফুঁসে উঠে বললেন, 'ভেবেছেনটা কী? গুন্ডামি করার আর জায়গা পাননি? আপনার নামে আমি ফৌজদারি মামলা করব। ঘানি ঘুরিয়ে ছাড়ব।'

যাই হোক, ব্যাপারটা আর বেশি দূর এগোয়নি। পাড়ার মাতব্বরেরা দুজনের মাঝে ঢুকে গোলমালটা মিটিয়ে দিল। মাথা ঠান্ডা হওয়ার পর পশুপতি বুঝল, এত লোকের সামনে মাথা গরম করাটা বড্ড আহাম্মকির কাজ হয়ে গিয়েছে। লোকে বুঝে ফেলেছে নাম নিয়ে তার দুর্বলতার কথা।

এরপর থেকে পথে বেরোনো দায় হয়ে উঠল পশুপতির। সে রাস্তায় বেরোলেই পাড়ার বখাটে ছেলেরা আড়াল থেকে বলে, 'পশুদাদা ধায়, জুতোমোজা পায়।' পশুপতি তেড়ে যায় তাদের দিকে। ছেলেরা ছুটে পালায়।

রাধাবিনোদপুরে বসবাসও পশুপতির কাছে ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠল। বাসা বদলানোর কথা ভাবতে লাগল সে। একদিন অফিস ফেরত সে গোবিন্দপুরে বাসা দেখতে যাচ্ছিল। নাম ভাবনায় পশুপতি এমনই মশগুল ছিল যে গাড়ি থেকে নামার সময় অফিসের ব্যাগের কথা ভুলেই গেল। সম্বিৎ ফিরল স্টেশন থেকে গাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর। মাথা চাপড়ে হায় হায় করতে লাগল পশুপতি। ব্যাগে ছিল অফিসের বাহাত্তর হাজার টাকা। ব্যাঙ্কে গিয়ে জমা দেওয়া যায়নি। গোবিন্দপুরে পৌঁছতে দেরি হয়ে যাবে ভেবে টাকাটা ব্যাগে নিয়েই সে রওনা হয়। কাল ছুটি। পশুপতি ভেবেছিল, পরশু সকালে অফিসের পথে ব্যাঙ্কে গিয়ে জমা দিয়ে দেবে টাকাটা। কিন্তু এখন উপায়? রাতারাতি বাহাত্তর হাজার টাকা কোথা থেকে জোগাড় করবে সে? ওদিকে পরশু বড়সাহেব আবার হিসেব দেখবেন। হিসেব না মিললে পশুপতি যে চুরির দায়ে পড়বে!

থানা-পুলিশের ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল পশুপতির। নতুন বাসা দেখা মাথায় উঠল। ঘোরতর দুশ্চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফিরে মনের দুঃখে ঘর অন্ধকার করে সে বিছানায় শুয়ে ভাবতে লাগল টাকা খোয়ানোর সংকট থেকে কী করে উদ্ধার পাওয়া যায়। বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় ঘুম জড়িয়ে এল তার চোখে।

'পশুবাবু! পশুবাবু! পশুবাবু আছেন না কি?' মানুষের গলা শুনে ধড়ফড় করে উঠে বসল পশুপতি। কেউ একজন দুম দুম করে দরজা ধাক্কাচ্ছে আর হেঁড়ে গলায় ডেকেই চলেছে। সাতসকালে এমন পশুবাবু সম্বোধন শুনে রাগে আগুন হয়ে লাঠি হাতে দরজা খুলে বেরিয়েই এক অচেনা লোকের মুখোমুখি হল পশুপতি। লোকটার বয়স পশুপতির চেয়ে সামান্য বেশি। পরনে খদ্দরের পাঞ্জাবি ও খাটো ধুতি।

পশুপতির মারমুখী মেজাজ দেখে লোকটি এতটুকু না ঘাবড়ে পালটা ধমকের সুরে বলল, 'আপনি উন্মাদ না কি? কেউ বাড়ি এলে এভাবে অভ্যর্থনা জানান?'

'আপনিই বা সাতসকালে অমন হেঁড়ে গলায় 'পশুবাবু' বলে চেঁচাচ্ছিলেন কেন? সকালের ঘুম মাটি করে মশকরা করতে এসেছেন?'

'আপনার পিতামহ প্রদত্ত নাম ধরেই তো সম্বোধন করেছি। এতে দোষের কী আছে?'

পশুপতি বলল, 'ও নাম আমি বদলে ফেলেছি। আমার নতুন নাম আদিত্যনারায়ণ।'

'সে কথা জানি। তবে কেউ আপনাকে ওই নামে চেনে না। তা হঠাৎ নাম বদলালেন কেন? পশুপতি নামটা কী দোষ করল?

পশুপতি জবাব দেয়, 'ভয়ানক বিচ্ছিরি নাম। লোকে 'পতি' ছেঁটে দিয়ে 'পশু' বলে ডাকে।'

'আপনি তো আশ্চর্য প্যাঁচালো লোক! তাতে কী এসে যায়?'

পশুপতি ক্ষোভের সঙ্গে বলে, 'এসে যায় না মানে? আমি কি চারপেয়ে জীব? আমাকে দেখে কি তাই মনে হয়?'

আগন্তুক বলে, 'আপনি নিজে ছাড়া আর কেউ বোধহয় তা মনে করে না।'

মাটিতে বাঁশের লাঠিটা ঠুকে পশুপতি জোর দিয়ে বলে, 'আলবাৎ মনে করে। সেই জন্যই পশু বলে ডাকে। কিছু বুঝি না ভাবেন? আমি কি গর্দভ?'

লোকটি এবারে মুচকি হেসে বলল, 'আপনি একটা আস্ত গবেট, আহাম্মক।'

গলা চড়াল পশুপতি, 'কী—এত বড় কথা? বাড়ি বয়ে গালাগাল করতে এসেছেন?'

'গালাগালে কাজ হবে কি না জানি না, আপনাকে ধোলাই লাগানো উচিত। রঘুপতিকে রঘু, যদুপতিকে যদু নামে ডাকাটাই তো চল।

তাই আপনি পশুপতি থেকে পশু। এ নিয়ে এত বিচলিত হওয়ার কী আছে?'

পশুপতি এবার বিরক্ত হয়ে বলল, 'ঠাকুরদার মতো জ্ঞান দেবেন না তো। এখন আসুন। আমার মন মেজাজ ঠিক নেই।'

'বাহাত্তর হাজার টাকাটা বড় কম টাকা নয়। অত টাকা খোয়া গেলে কারও মেজাজ শরিফ থাকতে পারে না। তার উপরে টাকাটা অফিসের। পুলিশ এল বলে!'

চমকে উঠে পশুপতি বলে, 'কী—! আপনি জানলেন কী করে?'

'এ তো সামান্য ব্যাপার। আরও অনেক কথাই জানি। এই যেমন আপনার ডাক নাম নেংটি।'

'অ্যাঁ! তাও জানেন?'

'আরও অনেক কিছু জানি। আপনি একটি বাতিকগ্রস্ত লোক। নাম নিয়ে আদিখ্যেতায় অস্থির। ঠাকুরদার দেওয়া নেংটি নামটা আপনি লুকিয়ে রেখেছেন, পশুপতি নামটাও ফেলে দিতে চান। এতে তো আপনি আপনার ঐতিহ্যকেই অস্বীকার করে বসছেন। আরে বাপু, নাম নিয়ে অত হীনমন্যতা কীসের? নাম আর চেহারায় কি লোকে সুন্দর হয়? মানুষের সৌন্দর্য তার কাজে, ব্যবহারে। এই যেমন আপনার ঠাকুরদার ডাকনাম ছিল টিকটিকি। চেহারা অসুন্দর। তা বলে কি তিনি মনঃকষ্টে বিবাগি হয়ে গিয়েছিলেন? ওই টিকটিকি নাম নিয়েই সাহেবকে ঢ্যালা মেরে বীরের মর্যাদা পেয়ে গেলেন। তাম্রফলকও পেয়েছিলেন একখানা। আর আপনি? সমাজের কোনও কাজে লাগেন না। যাও বা চাকরি করছিলেন, নামের বাতিকে আনমনা হয়ে অফিসের টাকা

খুইয়ে সেটাও হারাতে বসেছেন।'

লোকটার কথার তোড়ে ভেসে গিয়ে বোকার মতো হাঁ করে চেয়ে রইল পশুপতি। কে এই লোকটা? এত কথা জানল কেমন করে? তবে এর মুখটা কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকছে। আগে কি সে দেখেছে কোথাও একে?

আগন্তুক তার কাঁধের ঝোলা থেকে একটা ব্যাগ বের করে বলল, 'এই ব্যাগটা তো কাল ফেলে এসেছিলেন ট্রেনে। ভেতরে বাহাত্তর হাজার টাকা আছে। গুনে নেবেন। কেউ বাড়ি বয়ে উপকার করতে আসলে আপনি লাঠি হাতে বেরিয়ে আসেন, এমন জানলে থোড়াই ধকল করে এতটা পথ আসতাম আপনার ব্যাগ ফিরিয়ে দিতে?'

টাকা সমেত ব্যাগটা ফেরত পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কেঁদে উঠল পশুপতি। তারপর চোখের জল মুছে হাতজোড় করে বলল, 'আমার ভুল হয়ে গেছে দাদা। মাফ করবেন। কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব? বড় একটা ফাঁড়া কাটল। আসুন। ঘরে এসে বসুন, একটু জল-টল খান।'

লোকটি গম্ভীর গলায় বলল,'মেলা কাজ আছে। এখন বসার ফুরসত নেই।'

পশুপতি মাটির দিকে মাথা নত করে বলল, 'আমি সত্যিই খুব লজ্জিত। আমার আচরণে আপনি নিশ্চয়ই খুব আঘাত পেয়েছেন। আমি কি আর ইচ্ছে করে...ও কী! চললেন যে!'

পশুপতি চোখ তুলে অবাক হয়ে দেখল, লোকটা হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে চলে গিয়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার! চোখের নিমেষে অত দূরে গেল কী করে লোকটা? পশুপতি খানিকদূর দৌড়ে গেল। কিন্তু লোকটার নাগাল পেল না। লোকটা আচমকা যেন বাতাসে মিলিয়ে গেল। পশুপতির গা-টা ছমছম করে উঠল।

ঘরে ঢুকে দেওয়ালে ঝোলানো ঠাকুরদার ছবির দিকে ভালো করে চাইতেই দারুণ চমকে উঠল পশুপতি। ছবিটা তার ঠাকুরদার অল্পবয়সের। কোনও ভুল নেই, অচেনা লোকটাকে অবিকল তার ঠাকুরদার মতো দেখতে। কম্পিত হাতে ব্যাগ খুলে টাকাপয়সা গুনে পশুপতি দেখল পুরো টাকাটাই রয়েছে।

পশুপতি ঘামতে লাগল। ঠাকুরদা কি নিজে এসে এই বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করে গেলেন? ছবির পিছন থেকে একটা টিকটিকি ডেকে উঠল, ঠিক ঠিক ঠিক।

এসব শুনে দু'একজন বললে, 'গয়াটা একবার ঘুরে এসো।'

পশুপতি মাথা চুলকে বলল, 'এ মোটেই গয়া-কাশীর ব্যাপার নয়।'

এরপর থেকে পশুপতির নাম নিয়ে বাতিকটা এক্কেবারে ঘুচে গেল। এখন পথে বেরোলে পাড়ার কেউ যদি হেঁকে বলে, 'এই যে পশু, চললে কোথায়? সব ভালো তো?'

পশুপতি একগাল হেসে জবাব দেয়, 'ভালো আছি। আপনি হলেন পাড়া প্রতিবেশী, ঘরের লোক। পোশাকি নাম ছেড়ে আমায় ডাক নামে ডাকলেই খুশি হব। আমার ডাকনামটা জানেন তো? নেংটি।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%