শব্দ সন্ধান

শান্তনু বসু

সাতসকালে ঘুম ভাঙল তারক স্যারের ফোনে।

'সুমিত?'

'মর্নিং স্যার। বলছি।'

'সকালে ফ্রি আছ? মেসে থাকবে?'

'হ্যাঁ স্যার। বেরোনোর তেমন কোনো প্রোগ্রাম নেই।'

'এক ভদ্রলোক যাবেন তোমাদের সঙ্গে দেখা করতে। সাড়ে আটটা নাগাদ। কাল বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। ভদ্রলোকের নাম—লোকনাথ বসাক। আমার বিশেষ পরিচিত।

'সাক্ষাতের কারণটা স্যার?'

'উনি বাড়ি নিয়ে এক বিশেষ সমস্যায় পড়েছেন। ব্যাপারটা ভূতুড়ে।'

আমি বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলাম 'ভূতুড়ে?'

'ভূত কি অন্য কিছু তোমরাই বুঝে নিয়ো। মনে হচ্ছে এবারে তোমাদের ভূমিকা হবে ওঝার। ইলিশের পেটের মধ্যে দিয়ে সোনা পাচারের কেসে, কঙ্কণদিঘির মূর্তি চোর ধরে তোমাদের নাম তো কম ছড়ায়নি। দেখো ভদ্রলোককে যদি একটু হেল্প করতে পারো—রাখছি।' আমাকে বেশ একটা ধন্দের মধ্যে ফেলে দিয়ে ফোন রেখে দিলেন তারক স্যার।

রোববারের সকাল। ভেবেছিলাম আর একটু গড়িয়ে নেব। উপায় নেই। ঘড়িতে পৌনে আটটা। তারক স্যারের কথা অনুযায়ী লোকনাথ বসাকের আগমনের খুব দেরি নেই। চটপট তৈরি হয়ে নিতে হবে।

'এই কুঁড়ের বাদশা সুমিত, উঠিসনি এখনও?' বাইরে থেকে বিনায়কের গলা শোনা গেল। দরজা ভেজানো ছিল। সশব্দে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকল বিনায়ক ও অরুণাভ। দু-জনেই গলদঘর্ম। শরীর চর্চা করতে গিয়েছিল কলেজ স্কোয়্যারে। আমার আবার এসব পোষায় না।

বিনায়ক মজা করে বলল, 'বাবু সুমিতেন্দ্র এরই মধ্যে গাত্রোত্থান করেছেন দেখছি। ব্যাপার কী রে?'

আমি উঠে মশারির দড়ি খুলতে খুলতে বললাম, 'মক্কেল আসছে।'

বিনায়ক প্রশ্ন করল, 'মক্কেল মানে?'

'মক্কেল মানে মক্কেল।'

অরুণাভ বলল, 'যাঃ বাবা! বোমকে বাইশ!'

আমি বললাম, 'বাজারে নাম ফেটে গিয়েছে বস।'

অরুণাভ বিরক্ত হয়ে বলল, 'এই তোর এক দোষ। সব কথা অর্ধেক বলিস।'

'পরে বলছি। চট করে বাথরুম থেকে ঘুরে আসি। ফটকেকে বল চা দিয়ে যেতে।' টুথব্রাশ নিয়ে আমি ঢুকে পড়লাম বাথরুমে।

আমি, অরুণাভ ও বিনায়ক তিন বন্ধু। কলেজ স্ট্রিটের এক মেসে থাকি। অরুণাভ ও আমি রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ থেকে পদার্থ বিদ্যায় মাস্টার ডিগ্রি করেছি। বর্তমানে আমি ওখানেই রিসার্চ করছি। আমার গাইড হলেন প্রফেসর তারক দাস। উনিই ফোনটা করেছিলেন সকালে। অরুণাভ সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সামনে ওর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। গ্র্যাজুয়েশনের সময় বিনায়ক আমাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ত। পরে ও কলকাতা পুলিশে সাব-ইন্সপেক্টরের চাকরি নেয়। এখন হেয়ার স্ট্রিট থানায় পোস্টেড।

বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে মক্কেলের ব্যাপারটা খুলে বললাম বিনায়ক ও অরুণাভকে। বিনায়ক বলল, 'রহস্যের সমাধান করতে পারি বা না পারি ভদ্রলোকের নামটা মনে রাখতে হবে। আমাদের প্রথম মক্কেল বলে কথা।'

লোকনাথ বসাক প্রকৃত অর্থেই আমাদের প্রথম মক্কেল। এর আগে গোটা কয়েক রহস্যভেদ আমরা করেছি ঠিকই তবে সে সব ক্ষেত্রে পাকেচক্রে গোলমেলে ঘটনার মধ্যে আমরা জড়িয়ে পড়েছিলাম। রহস্য সমাধানের জন্য কেউ আমাদের দোরে এসে হত্যে দেয়নি। দেবেই বা কেন, আমরা তো আর পেশাদার গোয়েন্দা নই। তবে বেশ কয়েকটা ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে রহস্যের জাল কেটে সফল ভাবে বেরিয়ে আসার জন্য আর সেসব কাহিনি ফলাও করে কাগজে ছাপা হওয়ার জন্য আমাদের নাম যে কিছুটা হলেও ছড়িয়েছে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। না হলে আমাদের পিছনে সাতসকালে মক্কেল ছুটবে কেন?

লোকনাথ বসাক এলেন পৌনে ন'টায়। ভদ্রলোকের পরনে সাদা পাঞ্জাবি ও ঢোলা পাজামা। বয়স আন্দাজ ষাটের আশেপাশে। মাথায় চুল কম। হাইট মাঝারি। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। পায়ে ক্যাম্বিসের জুতো। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ। গালের বেড়ে ওঠা কাঁচাপাকা দাড়ি দেখে মনে হচ্ছে গত দু-এক দিনে শেভ করেননি। ভদ্রলোকের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

'আমার নাম লোকনাথ বসাক।' হাতজোড় করে আমাদের দিকে চেয়ে নমস্কার করলেন ভদ্রলোক।

আমি প্রতি নমস্কার জানিয়ে বললাম, 'নমস্কার। বসুন।'

মেসের অগোছালো ঘরে অতিথি আপ্যায়নে নিবেদিত হাতলবিহীন একমাত্র কাঠের চেয়ারটিতে বসে লোকনাথ বসাক বললেন, 'প্রফেসর দাস নিশ্চয়ই আমার কথা আপনাদের বলেছেন।'

আমি বললাম, 'সামান্যই বলেছেন। বাড়ি নিয়ে আপনি কোনো একটা সমস্যায় পড়েছেন।'

বিনায়ক বলল, 'আপনি বয়সে প্রবীণ। আমাদের তুমি করে বলতে পারেন।'

লোকনাথ বসাক বললেন, 'সেই ভালো। তোমরা প্রায় আমার ছেলের বয়সি।'

আমি বললাম, 'বেশ। এবারে সমস্যাটা কী বলুন।'

'সমস্যাটা আমার কাছে গুরুতর। কিন্তু মুশকিল কি জানো, ব্যাপারটাকে কেউ তেমন আমল দিচ্ছে না।'

বিনায়ক প্রশ্ন করল, 'আমাদের কথা জানলেন কী করে আপনি?'

'তোমাদের কথা আমি কাগজে পড়েছি। কিছুদিন আগে তোমরা অ্যান্টিক পাচারের বড় একটা চক্রকে ধরেছিলে। কাগজেই লিখেছিল তোমরা রাজাবাজার সায়েন্স কলেজে পড়ো। আমার বাড়ি হাতিবাগানে। প্রফেসর দাসের আদি বাড়ি ওই এলাকাতেই। আমার বাড়ির দুটো বাড়ি পরে। একই পাড়ায় বাড়ি, সেই সূত্রেই প্রফেসর দাসকে আমি চিনি। তোমাদের কথা জিগ্যেস করাতে বললেন যে তোমরা ওঁর ছাত্র।'

'আপনি কী করেন?'

'নারকেল তেলের ব্যবসা। তিন পুরুষের কারবার।'

'তা আপনার সমস্যাটা কি হাতিবাগানের বাড়ি নিয়ে?'

'আজ্ঞে না। সম্প্রতি ডায়মন্ডহারবারে একটা বাগানবাড়ি কিনেছি আমি। ওই বাড়ি নিয়েই ঝঞ্ঝাট। বড় দুশ্চিন্তায় আছি। বাড়িটা কিনেছিলাম কাগজে বিজ্ঞাপন দেখে। গঙ্গার পাড়ে বাগান সমেত বাড়ি। দেখতে গিয়েই ভালো লেগে গেল। পাছে বেহাত হয়ে যায়, তড়িঘড়ি কিনেও ফেললাম। ভেবেছিলাম মাঝেমধ্যে গিয়ে থাকব। তা বাড়ি কি আর সবার কপালে সহ্য হয়!'

'বাড়ি তো কিনেই ফেলেছেন, থাকতে অসুবিধা কীসের?' আমি প্রশ্ন করলাম।

'অসুবিধা মানে? ভয়ানক অসুবিধা। সাধে কি তোমাদের ঠিকানা খুঁজে বের করে ছুটে এসেছি? বাড়িটা একটু গোছগাছ করে নেব বলে দিন পনেরো আগে ওখানে গিয়েছিলাম। দু-দিন ছিলাম। তারপরে আর থাকার সাহস হয়নি।'

'কেন?'

'রাতের দিকে ও-বাড়িতে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। কেউ যেন থেকে থেকে আর্তনাদ করে উঠছে।'

অরুণাভ বলল, 'বলেন কী? সারারাত ধরে কেউ আর্তনাদ করে যাচ্ছে?'

লোকনাথ বসাক সবেগে মাথা নেড়ে বললেন, 'না, না, একটানা নয়। থেকে থেকে শোনা যায় শব্দটা। শুনলে হাড় হিম হয়ে যায়। ভয়ে কাঁটা দেয় গায়ে। মনে হয় কেউ যেন বাঁচার আকুল তাগিদে আর্তনাদ করে উঠল।'

বিনায়ক বলল, 'স্ট্রেঞ্জ ব্যাপার! দিনের বেলায় এ ধরনের কোনো শব্দ শোনা যায় না?'

একটু ভেবে লোকনাথবাবু বললেন, 'না, সেরকম কিছু শুনিনি।'

'আপনি কি একাই ছিলেন ওই বাড়িতে?'

'না, সঙ্গে আমার স্ত্রী ছিলেন। উনি ভীষণ ভয় পেয়ে যান। আমাকে বার বার বলছেন ও-বাড়ি ছেড়ে দিতে।'

আমি প্রশ্ন করলাম, 'ডায়মন্ডহারবারে আপনার বাগানবাড়ির আশেপাশে বসতি আছে নিশ্চয়ই। অন্য কেউ কি অমন অদ্ভুত শব্দ শুনেছে? প্রতিবেশীদের জিগ্যেস করেছিলেন?'

'আসলে বাড়িটা একটু নিরিবিলি জায়গায়। ধারেকাছে সেই অর্থে বসতি নেই। ওই বাড়ির আশেপাশে রয়েছে ফাঁকা জমি-জায়গা, ঝোপজঙ্গল আর কিছু পরিত্যক্ত বাড়ি। ওসব কলকাতা পোর্টের সম্পত্তি। আমার বাড়ি থেকে মিটার পঞ্চাশেক দূরে পোর্টের একটা জেটিও আছে। পাশে নাইট গার্ডের ঘর।'

বিনায়ক প্রশ্ন করল, 'নাইটগার্ড রাতে ওখানে থাকে?'

'থাকে।'

'তাকে জিগ্যেস করেছিলেন? সে কি অদ্ভুত কোনো শব্দ শুনতে পেয়েছিল?'

'হ্যাঁ, জিগ্যেস করেছিলাম। আমার কথা শুনে সে অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকায়। দু-দিকে ঘাড় নেড়ে জানায় অমন কোনো শব্দ সে শোনেনি।' লোকনাথ বসাক ফের বললেন, 'ডায়মন্ডহারবারের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটা প্রাইমারি স্কুল আছে। হেডমাস্টারমশায় বয়স্ক লোক। অনেকদিন কাজ করছেন ওই স্কুলে। প্রথম রাতে শব্দটা শোনার পর তাকেও বলেছিলাম ঘটনাটা।'

বিনায়ক প্রশ্ন করল, 'তিনি কী বললেন?'

'ও তল্লাটে অমন আশ্চর্য শব্দের বিষয়ে কখনও কিছু শোনেননি। তবে তিনি বললেন যে ওই এলাকার একটা বদনাম আছে।'

'বদনাম? কীরকম?'

'আমার বাগানবাড়ির সামনেই বহু বছর আগে বোম্বেটেদের একটা জাহাজ নাকি গঙ্গায় ডুবে যায়। কেউ কেউ নাকি ও-তল্লাটে বোম্বেটেদের ভূত দেখেছে।'

মুচকি হেসে বিনায়ক প্রশ্ন করল, 'আপনি কি বলতে চান বোম্বেটেদের ভূত রাতে আর্তনাদ করে?'

লোকনাথ বসাক ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, 'মানলাম না হয় এসব আজগুবি কথা। কিন্তু শব্দের উৎসটা কী? কোথা থেকে আসছে শব্দটা? অমন স্পষ্ট হাড় হিম করা আর্তনাদের শব্দ?' শেষ কথাটা বলার সময় লোকনাথ বসাকের চোখে-মুখে কেমন যেন একটা আতঙ্কের ছাপ পড়ল।

বিনায়ক বলল, 'আপনার কি মনে হয় না কেউ আপনাকে ভয় দেখাতে পারে?'

'ভয় দেখাবে? কেন?'

'বাড়িটা খুব লোভনীয় জায়গায়—গঙ্গার একেবারে ধারে। হোটেল বা রিসর্টের জন্য আইডিয়াল। ডায়মন্ডহারবারে এমনিতেই হোটেল বানানোর হিড়িক আছে। মাছ বিক্রির প্রচুর টাকাও আছে অনেক স্থানীয় লোকের পকেটে। কেউ হয়তো বাড়িটা কিনে হোটেল বা রিসর্ট বানাতে চায়। মাঝখান থেকে আপনি বাড়িটা কিনে বাগড়া দিয়েছেন তার ইচ্ছায়। এখন আপনি যদি ভূতের ভয়ে বাড়িটা সস্তায় বেচে দেন, তাহলে তার সুবিধা হয়।'

লোকনাথ বসাক বললেন, 'এমন যে ভাবিনি তা নয়। যদি তাই হয়, তাহলে কে ভয় দেখাচ্ছে সেটাও তো জানা দরকার।'

আমি জিগ্যেস করলাম, 'ওই শব্দ ছাড়া আর কোনো ভৌতিক বা অদ্ভুতুড়ে ঘটনা নজরে আসেনি আপনার?'

'না।'

'আপনার কথায় রহস্য তাহলে ওই একটাই। আর্তনাদের শব্দ। তাই তো?'

লোকনাথ বসাক মাথা নেড়ে বললেন, 'হ্যাঁ।'

বিনায়ক শুধোল, 'আপনি ও আপনার স্ত্রী দু-রাত কাটিয়েছেন ওই বাড়িতে। এর পরে আর কেউ থেকেছে ওখানে?'

'আমার শ্যালক ও আমার ছেলে প্রথমে বিশ্বাসই করতে চায়নি আমার কথা। গেল সপ্তাহে মামা ও ভাগ্নে একরাত ছিল ও-বাড়িতে। ওরাও ওই একই শব্দ শুনেছে। আর থাকার সাহস করেনি।'

'আপনি তো ঘটনাটা স্থানীয় পুলিশকে জানাতে পারতেন।' বলল বিনায়ক।

লোকনাথবাবু হতাশ গলায় বললেন, 'সে চেষ্টা কি আর করিনি? ডায়েরি করতে থানায় গিয়েছিলাম। সব শুনে ও.সি. বলল, 'আপনি কম উন্মাদ না কি মশায়? ভূতের নামে কমপ্লেন করতে এসেছেন থানায়? ওঝার খোঁজ করুন।'

বিনায়ক মুচকি হেসে প্রশ্ন করল, 'তা আপনি কী চাইছেন, ওঝার ভূমিকাটা আমরা পালন করি?'

'ঠিকই ধরেছ। তোমরা যদি দিন দুয়েক ওই বাড়িতে গিয়ে থাকো আর ওই শব্দ রহস্যের সমাধান করতে পারো, তাহলে খুব খুশি হব।'

বিনায়ক বলল, 'ঠিক আছে। আমরা যাব। সামনের শুক্রবার। দু-রাত থাকব। শুক্র ও শনি।'

লোকনাথ বসাকের মুখে এতক্ষণে একটু হাসি ফুটল। বললেন, 'আমার গাড়ি আছে। তোমাদের নিয়ে যাব।' ভদ্রলোক এবারে পকেট থেকে একটা খাম বের করে আমাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, 'তোমাদের অ্যাডভান্স।'

আমি হাতজোড় করে বললাম, 'ওটা আপনার কাছেই রাখুন। আমরা পেশাদার গোয়েন্দা নই।'

টাকার ব্যাপারে লোকনাথ বসাক আর জোরাজোরি করলেন না। টাকার খামটা পকেটে পুরে ব্যাগের ভিতর থেকে বড় একটা শিশি বের করে বললেন, 'এটা নিতে নিশ্চয়ই তোমাদের আপত্তি হবে না। আমার কোম্পানির নারকেল তেল।'

বিনায়ক বলল, 'বাঃ! এটা চমৎকার।'

তেলের ব্র্যান্ডের নাম রেশমি। প্রশ্ন করলাম, 'তেলের নাম রেশমি কেন?'

লোকনাথ বসাক এবারে হেঁ হেঁ করে হেসে বললেন, 'মাথায় কদিন মেখে দেখো, বুঝতে পারবে চুল একেবারে রেশমের মতো মসৃণ হয়ে যাবে। মাথা ঠান্ডা হবে, চিন্তাভাবনাও মসৃণ হবে। মেজাজ ফুরফুর করবে।'

লোকনাথ বসাক চলে যাওয়ার পর বিনায়ককে জিগ্যেস করলাম, 'কী বুঝলি?'

'এর মধ্যে কী আর বুঝব? দুটো তো মাত্র তথ্য পেলাম। মাঝরাতে বোম্বেটে ভূতের আর্তনাদ আর রেশমি নারকেল তেল। বাকিটা ডায়মন্ডহারবারে গিয়ে বোঝা যাবে।'

অরুণাভ বলল, 'এ রহস্য তো বোঝাই যাচ্ছে। কেউ বাড়ি ছাড়া করার জন্য ভয় দেখাচ্ছে লোকনাথবাবুকে।'

'সেটার সম্ভাবনাই প্রবল। তবু দেখা যাক।'

সামনে সিভিল সার্ভিসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা আছে বলে অরুণাভ গেল না আমাদের সঙ্গে। পরের শুক্রবার বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমরা পৌঁছে গেলাম ডায়মন্ডহারবারে। আমরা বলতে আমি, বিনায়ক ও লোকনাথ বসাক। লোকনাথবাবু অনেক সংকোচের সঙ্গে বললেন, 'দেখো ভাই, এ-বাড়িতে এখনও রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করে উঠতে পারিনি। গাড়ি থাকবে সঙ্গে। আমাদের একটু কষ্ট করে হোটেলে গিয়ে খেয়ে আসতে হবে।'

আমি বললাম, 'এসব নিয়ে ব্যস্ত হবেন না। হোটেলে খাওয়া আমাদের অভ্যেস আছে।'

লোকনাথবাবুর বাড়িটা ডায়মন্ডহারবার শহরের ঠিক বাইরে। জায়গাটার নাম সুলতানপুর। সুন্দর ছিমছাম বাগানবাড়ি। বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে অবস্থিত। ক্যাম্পাসের মধ্যে প্রচুর গাছপালা আছে। লন আছে। তবে লনের অবস্থা ভালো নয়। ঘাসগুলো অনেক বড় হয়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে বেড়ে উঠেছে আগাছা। নিয়মিত দেখভাল না হলে যা হয় আর কী।

গাড়িবারান্দা থেকে সিঁড়ি দিয়ে উঠেই একতলায় বিশাল ড্রয়িং রুম। ঘরে বেশ কিছু নতুন আসবাবপত্র ডাঁই করা আছে। লোকনাথবাবু বললেন, 'বাড়িটাকে মনের মতো করে সাজাব বলে কিনেছিলাম। বুঝতেই পারছ গুছিয়ে ওঠা হয়নি।'

ড্রয়িং রুম থেকে সিঁড়ি উঠে গিয়েছে দোতলায়। দোতলায় অ্যাটাচড টয়লেট-সহ মোটামুটি সাজানো-গোছানো দুটো বেডরুম। পশ্চিম দিকের বেডরুম লাগোয়া এক চিলতে খোলা ছাদ আছে। ছাদ থেকে চমৎকার নদী দেখা যায়।

ফ্লাস্কে করে চা নিয়ে এল লোকনাথবাবুর ড্রাইভার পিন্টু। আমরাই ধরাধরি করে কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার ও টেবিল নিয়ে ছাদে বসলাম। ঠিক হল রাতে এখানে বসেই আমরা ভূতুড়ে আর্তনাদের প্রতীক্ষা করব।

চেয়ারে বসে কাগজের কাপে চা ঢালতে ঢালতে লোকনাথবাবু বললেন, 'বাড়িটা কেমন লাগল?'

বিনায়ক বলল, 'চমৎকার। এই বাড়ির উপর অনেকের লোভ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। এ বাড়িটা রিসর্ট হলে ট্যুরিস্ট একেবারে বাঁধা।'

'বাড়ি দখলের জন্য ভূতের ভয় দেখাচ্ছে কেউ। এই তাহলে তোমাদের অনুমান।'

'এছাড়া তো আর কোনও যুক্তিসম্মত কারণ দেখতে পাচ্ছি না।' বলল বিনায়ক।

প্লেটে করে কিছু সন্দেশ দিয়ে গেল পিন্টু। লোকনাথবাবু বললেন, 'খাও। নকুড়ের সন্দেশ। তোমাদের জন্যই নিয়ে এসেছি।'

পিন্টু বলল, 'একবার গ্যারেজে যেতে হবে। চাকায় একটা বিশ্রি শব্দ হচ্ছে।'

লোকনাথবাবু বললেন, 'তাড়াতাড়ি চলে আসিস। আটটা নাগাদ খেতে যাব।'

চা শেষ করে বাইরে বেরিয়ে আমি আর বিনায়ক প্রথমে গোটা ক্যাম্পাসটা খুব ভালো করে ঘুরে দেখলাম। না, বাড়ির চৌহদ্দিতে সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়ল না। বিনায়ক বলল, 'চল, এবারে জেটির দিক থেকে ঘুরে আসি।'

বাঁধের উপর দিয়ে এবড়ো-খেবড়ো রাস্তা ধরে সামনে কিছুটা এগোতেই পোর্টের জেটিটা দেখতে পেলাম। জেটির পাশে নাইটগার্ডের ঘর। গ্যাংওয়ের মুখে কোমর সমান উঁচু লোহার গেটটায় তালা লাগাচ্ছিল একজন। খুব সম্ভবত এই হল নাইটগার্ড।

বিনায়ক বলল, 'শুনছেন? আমরা বেড়াতে এসেছি। পন্টুনের উপর একটু যাব?'

'যান, চট করে ঘুরে আসুন। গেট বন্ধ করতে হবে।'

'পন্টুনের উপর মিনিট পাঁচেক ঘোরাঘুরি করে আমি ও বিনায়ক ফিরে এলাম। ভালোরকম জং পড়েছে পন্টুনের গায়ে। গ্যাংওয়ের লোহার রেলিং-এর গায়েও অনেকদিন রং পড়েনি। জেটি যে নিয়মিত ব্যবহার হয় না, সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

নাইট গার্ডের কাছ থেকে জানা গেল, আগে এটাই ছিল মেইন জেটি। পোর্টের রিভার সার্ভের লঞ্চ নিয়মিত ভিড়ত এখানে। ভাটায় জল অনেকটা নেমে যায়। তাই মাইলখানেক দূরে আরও লম্বা গ্যাংওয়ে-সহ আরও একটা পন্টুনজেটি তৈরি হয়েছে। এই জেটি এখন কালেভদ্রে ব্যবহার হয়।

'রাতে এদিকে কোনো অদ্ভুত শব্দ শোনা যায়?' নাইটগার্ডকে প্রশ্ন করল বিনায়ক।

'কীসের শব্দ?'

'ধরুন কেউ চিৎকার করছে।'

গামছা দিয়ে মশা তাড়াতে তাড়াতে নাইটগার্ড বলল, 'মাথায় ছিট আছে নাকি?'

আমরা আর কথা বাড়ালাম না। নাইটগার্ড আমাদের পাগল ঠাউরেছে। যাই হোক বোঝা গেল কোনো অদ্ভুত শব্দ সে শোনেনি। অন্ধকার নেমেছে। বাড়ির পথ ধরতেই দেখি পিন্টু এদিকে আসছে।

বিনায়ক হেঁকে জিগ্যেস করল, 'কোথায় চললে?'

'এই আপনাদের খোঁজেই যাচ্ছিলাম। অন্ধকারে আপনারা কোনদিকে গেলেন, কাকাবাবু খুঁজতে পাঠালেন।'

'তোমার গাড়ি ঠিক হয়েছে?'

'হ্যাঁ! প্রবলেম সামান্যই ছিল। চাকার গ্রিজ শুকিয়ে গিয়েছিল।'

হাইওয়ের পাশে একটা হোটেল থেকে খাওয়া-দাওয়া সেরে ন'টা নাগাদ আমরা ফিরে এলাম। বাড়ি ঢোকার মুখেই ঝপ করে আলো চলে গেল। চারিদিকে একেবারে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

লোকনাথবাবু বললেন, 'জেনারেটর নেই। দুটো ইমারজেন্সি লাইট আছে।'

বিনায়ক বলল, 'আলোর দরকার নেই। ভূতুড়ে শব্দের জন্য অন্ধকারই ভালো।'

রাতের পোশাক পরে ছাদে এসে বসলাম আমরা। 'শব্দটা কখন শোনা যায়?' প্রশ্ন করল বিনায়ক।

লোকনাথবাবু জবাবে বললেন, 'নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। হঠাৎ হঠাৎ শোনা যায়।'

আকাশের চাঁদটা মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে। বাতাসে কেমন একটা গুমোট ভাব। হাওয়া নেই। অনেক দূরে আকাশের গায়ে বিদ্যুতের ঝলকানি দেখা গেল। এপ্রিল মাস। কালবৈশাখী আসতে পারে।

জিগ্যেস করলাম, 'এই বাড়িটা কার ছিল?'

'এক ডাক্তারের।'

'হঠাৎ বিক্রি করলেন কেন?'

'শখ করে তৈরি করেছিলেন। কিন্তু কাজের চাপে এতদূর আসতে পারেন না। সম্প্রতি পৈলানে একটা বাগানবাড়ি কিনেছেন। তাই এ বাড়ি আর রাখতে চান না।'

'ওঁর কাছে জিগ্যেস করেছিলেন, উনি এ-বাড়িতে থাকাকালীন রাতে কোনো ভূতুড়ে শব্দ শুনেছিলেন কি না?'

'জিগ্যেস করেছিলাম।'

'কী বললেন?'

'বিগত প্রায় বছরখানেক ভদ্রলোক এদিকে আসেননি। আগে যখন থেকেছেন তখন অদ্ভুত কোনো শব্দ তিনি শোনেননি।'

রাত দশটা বাজল। এখনই মনে হচ্ছে গভীর রাত। আলো আসেনি। চারিদিক শুনশান। ঘুটঘুটে অন্ধকার। গঙ্গার জল ঘন কালো। অনেক দূরে দু-একটা মাছমারা নৌকোর টিমটিমে লণ্ঠনের আলো দেখা যাচ্ছে। ঝিঁঝির ডাকের শব্দ খুব তীব্র। ছলাৎ-ছলাৎ করে জলের শব্দও শুনতে পাচ্ছি। পাড়ে এসে ধাক্কা খাচ্ছে নদীর জল। মশার উৎপাত থেকে বাঁচতে মাঝে মাঝে হাত চালাতে হচ্ছে।

রাত বারোটা অবধি বসে থেকেও আর্তনাদ বা অদ্ভুতুড়ে কোনো শব্দ আমরা শুনতে পেলাম না। খানিকটা মুষড়ে পড়া গলায় লোকনাথবাবু বললেন, 'কী ব্যাপার হল বলো তো? আজ যে কোনো শব্দ নেই।'

আমি বললাম, 'আমরা এসেছি শুনেই হয়তো ভূত পালিয়ে গেছে।'

সাড়ে বারোটা অবধি অপেক্ষা করার পর বিনায়ক বলল, 'আর্তনাদের প্রতীক্ষায় খামোখা রাত জেগে কাজ নেই। চলুন শুয়ে পড়ি।'

পাশাপাশি দুটো খাট। মাঝে বেডসাইড টেবিল। আমি আর বিনায়ক দু-জনে দুটো খাটে গা এলিয়ে দিলাম। পাশের ঘরে শুলেন লোকনাথবাবু। এদিকে পিন্টুর কোনো আত্মীয় আছে। সে গিয়েছে তার আত্মীয়ের বাড়ি।

রাত তখন ক'টা বাজে জানি না। হঠাৎ ধড়াম শব্দে খাটের পাশের জানালাটা বন্ধ হল। ঘুম ভেঙে গেল শব্দের গুঁতোয়। জোর হাওয়া ছেড়েছে। কালবৈশাখী এল বোধহয়। আমি জানালা বন্ধ করতে যাব, ঠিক তখনই এক ভূতুড়ে শব্দ ভেসে এল কানে। আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ। আর্তনাদই বটে। আমি চমকে উঠলাম। বিনায়কও উঠে বসেছে বিছানায়।

আমি সন্ত্রস্ত গলায় বললাম, 'শুনলি?'

বিনায়ক জবাব দিল, 'হুঁ।'

বাইরে হাওয়ার তেজ প্রবল। খানিক বাদে আবার সেই শব্দ—আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ। আমাদের দরজায় এবারে ঘন ঘন টোকা পড়ল। দরজা খুলতেই লোকনাথবাবু বললেন, 'শুনলে শব্দটা? মাঝ রাতে এমন ভূতুড়ে শব্দ শুনলে পিলে চমকে যাবে না কেন বলো?' ভদ্রলোকের গলায় ধরা পড়ল আতঙ্ক ও তীব্র উত্তেজনা।

তিন জনে খোলা ছাদে গিয়ে দাঁড়ালাম। একটু বাদে আবার সেই শব্দটা শোনা গেল। আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ। শব্দটা আসছে জেটির দিক থেকে।

বিনায়ক বলল, 'আপনি ঘরে থাকুন। আমি আর সুমিত একটু বেরোচ্ছি।'

ঝোড়ো হাওয়া থেমেছে। টর্চ হাতে অন্ধকারের মধ্যে বেরিয়ে পড়লাম আমি ও বিনায়ক। জেটির দিকে ছুটে গেলাম। জলের ছলাৎ ছলাৎ ও ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। অন্ধকারে উৎকর্ণ হয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। কিন্তু সেই ভূতুড়ে শব্দটা আর শোনা গেল না। এদিকে ওদিকে কিছুক্ষণ এলোপাথাড়ি টর্চ ঘোরাল বিনায়ক। না, কোনো সূত্র পাওয়া গেল না। আমরা ফিরে এলাম।

ঘরে ঢুকতেই প্রবল উৎকণ্ঠার সঙ্গে লোকনাথবাবু জিগ্যেস করলেন, 'কিছু বুঝলে?'

বিনায়ক বেজার মুখে বলল, 'না।' লোকনাথবাবু আর কথা না বাড়িয়ে নিজের ঘরে ঢুকে গেলেন। আমি ও বিনায়ক মশারির ভিতরে ঢুকে পড়লাম। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইলাম। ভেবে কূল পেলাম না, কোথা থেকে আসতে পারে এমন ভূতুড়ে শব্দ।

বিনায়ক প্রশ্ন করল, 'হ্যাঁ রে, ঘুমোলি নাকি?'

'না শুয়ে আছি।'

'লোকনাথবাবুর দেওয়া রেশমি নারকেল তেলের শিশিটা সঙ্গে এনেছিস?'

'ব্যাগে আছে। এই মাঝরাতে তেল নিয়ে পড়লি কেন?'

'কাল ভোরবেলা ব্রহ্মতালুতে ভালো করে তেল দিয়ে চান করতে হবে। চিন্তাভাবনার শক্তি কমে যাচ্ছে।'

খানিকবাদে খুব জোরে একঝলক দমকা হাওয়া ছাড়ল। আবার সেই শব্দটা শোনা গেল—'আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ-আঁ...!' চমকে গিয়ে আবার বিছানায় উঠে বসলাম। বিনায়ককে ডেকে সাড়া পেলাম না। তবে তার নাক ডাকার শব্দ কানে এল।

সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন দক্ষিণ-পুবের জানালা দিয়ে চড়া আলো এসে পড়েছে ঘরে। নিশ্চয়ই বেলা হয়ে গিয়েছে অনেক। ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখি স্নানটান সেরে বাইরে বেরোনোর পোশাক পরে একেবারে ফিটফাট হয়ে চেয়ারে বসে কী একটা বই পড়ছে বিনায়ক। তার মশারি ভাঁজ করা, বিছানা তোলাও কমপ্লিট।

বিনায়ক বলল, 'ঘুম ভাঙল? সত্যিই কিছু ঘুমোতে পারিস তুই!'

আমি অবাক হয়ে বললাম, 'এর মধ্যে স্নান হয়ে গেল?'

'কাল রাতে যে বললাম, ভোরবেলা ব্রহ্মতালুতে তেল দিয়ে ভালো করে স্নান করতে হবে।' লক্ষ করলাম বিনায়কের মুখে একটা রহস্যজনক হাসি।

বিনায়কের ভাবসাব দেখে আমার কেমন যেন খটকা লাগল। বললাম, 'কী ব্যাপার বল তো?'

'কী আবার ব্যাপার? তাড়াতাড়ি স্নান করে ফিটফাট হয়ে নিলাম। রেডি হয়ে নে। কলকাতায় ফিরতে হবে।'

আমি বললাম, 'মানে? আজ রাতেও তো আমাদের এখানে থাকার কথা।'

'শুধু শুধু এখানে থেকে কী হবে?'

'কিন্তু শব্দসন্ধান?'

বিনায়ক উত্তর দিল না। এবারে আমার চোখ পড়ল রেশমি তেলের বড় শিশিটার দিকে। তেল ভরা শিশিটা একেবারে খালি। আমার বিস্ময়ের ঘোর কাটতে না কাটতেই দরজায় টোকা পড়ল। উঠে গিয়ে দরজা খুলল বিনায়ক। লোকনাথবাবু ঘরে ঢুকে বললেন, 'গুড মর্নিং! এর মধ্যে স্নান সেরে নিয়েছ?'

বিনায়ক বলল, 'এখনই কলকাতায় ফিরব আমরা। পথে ব্রেকফাস্ট করে নেব।'

কথাটা শুনে খানিকটা হতচকিত হয়ে গিয়ে লোকনাথবাবু বললেন, 'তোমাদের তো আজও থাকার কথা। শব্দ রহস্যের গিঁট কাল খুলল না যে।'

'আমাদের আর থাকার প্রয়োজন নেই। আপনার শব্দভূত পালিয়ে গিয়েছে। আর আর্তনাদ করবে না।'

লোকনাথ বসাকের চোখদুটো গোল্লা গোল্লা হয়ে গেল। মুখ হাঁ। মনে হল বিনায়কের কথা শুনে ভারি আশ্চর্য হয়েছেন। আমারও কৌতূহলের পারদ চড়ছে। বিনায়ক বলল, 'বসুন বলছি।'

চেয়ারে বসে হাঁ-মুখ নিয়েই বিনায়কের দিকে চেয়ে রইলেন লোকনাথ বসাক। বিনায়ক বলল, 'ভূতের বসত হল আপনার বাড়ির কাছে পোর্টের পুরোনো জেটিতে। ওখান থেকেই ভূতটা আর্তনাদ করে। তবে আপাতত আর সাড়া শব্দ করবে না। আমি খুব ভোরে গিয়ে ওষুধ দিয়ে এসেছি। এক শিশি রেশমি নারকেল তেল খরচ হয়েছে।'

আমি অবাক। লোকনাথবাবুর হাঁ-টা আরও বড় হয়ে গেল।

বিনায়কের চোখে-মুখে কৌতুকের অভিব্যক্তি। 'জল ওঠা নামার সঙ্গে পন্টুনও ওঠানামা করে। সেই অনুযায়ী আগুপিছু করে রোলারের সাপোর্টে থাকা গ্যাংওয়ে। এখন বিষয় হল জং পড়ে রোলারের অবস্থা বেহাল। লুব্রিকেটিং অয়েল বহুদিন দেওয়া হয়নি। তাই জং পড়া রোলারটা রেলের উপর দিয়ে বেশি নড়াচড়া করলেই ওই বিৎঘুটে শব্দ হয়। এই নড়াচড়ার পিছনে বাতাসেরও একটা ভূমিকা আছে।

'আপনি খেয়াল করে দেখবেন, আমরা যখন কাল রাত বারোটা পর্যন্ত ছাদে বসে ছিলাম তখন কোনো শব্দ শোনা যায়নি। তখন ছিল বাতাসে গুমোট ভাব। হাওয়া নেই। মাঝরাতে যেই জোরে হাওয়া দিতে শুরু করল তখনই আর্তনাদের মতো শব্দটা শুনতে পেলাম আমরা। আসলে সেই সময় জলের রোলিং খুব বেশি হওয়ায় পন্টুন দুলছিল খুব বেশি। তাই রোলারের নড়নচড়নও বেড়ে যায়।'

লোকনাথবাবু গোল গোল চোখে বিনায়কের দিকে চেয়ে বললেন, 'ঠিকই বলেছ ভাই। আমি ও আমার স্ত্রী যে দু-রাত এখানে ছিলাম, দু-রাতেই বেশ ঝোড়ো হাওয়া বইছিল। কিন্তু এই ব্যাপারটা তুমি বুঝলে কেমন করে?'

'বিকেলে আমরা দেখে এসেছিলাম রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় জং পড়ে জেটির অবস্থা কাহিল। রাতে শব্দ শুনে আমি আর সুমিত ছুটে গেলাম জেটির কাছে। তখন হাওয়ার বেগ নেই। কাজেই জেটির কাছে গিয়ে কোনো শব্দ শুনতে পাইনি আমরা। আমার মনে হল শব্দটা হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। আর হাওয়া বেশি হলে পন্টুন দোলে। ঘরে ফেরার পর খাটে শুয়ে বিষয়টা নিয়ে ভাবছিলাম, হঠাৎ মনে পড়ল পিন্টুর কথা।'

লোকনাথ বসাক প্রশ্ন করলেন, 'পন্টুনের মধ্যে আবার পিন্টু এল কোথা থেকে?'

বিনায়ক বলল, 'রহস্যের সমাধানে ওর ক্রেডিট কম নয়। গাড়ির চাকায় কী একটা বিশ্রী শব্দ হচ্ছে বলে গ্যারেজে গিয়েছিল পিন্টু। পরে সে ব্যাপারে জিগ্যেস করায় পিন্টু বলে, গাড়ি ঠিক হয়ে গেছে। চাকার গ্রিজ শুকিয়ে গিয়েছিল বলে শব্দ হচ্ছিল। গ্রিজের কথা মনে হতেই মাথাটা ঝাঁ করে খুলে গেল।

হাতের কাছে খানিকটা গ্রিজ পেলে ভালোই হতো। কিন্তু কাকভোরে গ্রিজ পাব কোথায়? কাজেই আপনার রেশমি তেলের শিশি নিয়ে ছুটলাম জেটির কাছে। ভোরের হাওয়ায় জেটি তখন অল্প দুলছে। রোলার নড়ছে। আলতো একটা শব্দ আসছে। সেটা কাল রাতে শোনা শব্দের মতোই। তবে শব্দের তীব্রতা কম এই যা। বেশ কিছুক্ষণ কান খাড়া করে রেখে ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারলাম। ব্যস। এক শিশি তেল ঢেলে দিলাম রোলারের চাকায়। শব্দ ভ্যানিশ।

আর কেউ না শুনুক পোর্টের নাইটগার্ড এ শব্দটা প্রায়ই শুনত। খুব সম্ভবত শব্দের কারণটা তার জানা বলে এটা তার কাছে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি। আর একটা কথা, দিনের বেলায় রোলার নড়াচড়ার শব্দটা যে একেবারে হতো না তা নয়, তবে দিনের কোলাহলের মধ্যে শব্দটা স্পষ্ট ও তীক্ষ্ন ভাবে ধরা পড়ত না। রাতের নিশ্চুপ আবহ শব্দটাকে স্পষ্ট ও ভৌতিক করে তুলেছিল।

এবারে ঘর ফাটিয়ে প্রাণ খুলে হেসে উঠে লোকনাথ বসাক বললেন, 'কী কাণ্ড দেখো দেখি! এ যে রজ্জুতে সর্পভ্রম!'

বিনায়ক বলল, 'রেশমি নারকেল তেলের গন্ধটা সুন্দর। মাথায় দেওয়া হল না।'

'আক্ষেপ কোরো না ভাই। আমি তোমাদের মেসে এক কার্টুন তেল পাঠিয়ে দেব।'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%