জিরাফমামার কুপন

শান্তনু বসু

বেশ কয়েকবছর আগেকার কথা। সবে গ্রাম থেকে শহরে এসেছি আমরা। আমরা বলতে আমি আর সুঁনন্দ। কলকাতার একটা কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। থাকি মেসে। তখনও এত বড় শহর দেখে গা ছমছমে ভাবটা কাটেনি। দৌড়ে গিয়ে চলন্ত বাসে ট্রামে ওঠার কথা ভাবলে গা-হাত-পা কাঁপে। মুখ-চোখের ভাষা দেখে পকেটমার বোঝে, জলের মাছ ডাঙায় উঠেছে। ভিড়ে ঠাসা বাসে মাঝেমধ্যেই পকেট সাফ হয়ে যায়। আমার সামান্য রেস্ত পকেটমার আত্মস্থ করে। প্যান্টের কাটা পকেটটা ব্যাঙের উলটানো জিভের মতো ঝুলতে থাকে।

অবশ্য আমার পকেট কেটে পকেটমারের খুব বেশি লাভ হয় না। প্রতি মাসে বাড়ি থেকে রেশন করে টাকা আসে। হস্টেলের খরচ, আর কলেজের মাইনে বাদ দিলে হাত খরচের টাকা থাকে খুব সামান্য। প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা হাতে পড়লে বড় শহরে ছেলে বখে যেতে পারে, এ নিয়ে বাবা খুব সচেতন। তাই সাধ থাকলেও পকেটে বেশি টাকা রাখার সাধ্য নেই। উপরন্তু কলকাতা আসার আগে গুরুজনেরা সবাই বার বার সতর্ক করে দিয়েছেন, 'খুব সাবধান! কলকাতায় পকেটমারের ছড়াছড়ি।' তাই রাস্তায় বেরোলে আমি গাড়ি ভাড়া ও চিনে বাদামের বরাদ্দটুকু নিয়ে বেরোই।

একদিন ময়দানে ফুটবল খেলা দেখতে যাচ্ছি আমি আর সুঁনন্দ। চলন্ত বাস থেকে উলটোমুখো হয়ে আনাড়ির মতো নামতে গিয়ে হুড়মুড়িয়ে পড়ছিলাম আর একটু হলে। হাতটা টেনে ধরে বাসের চাকার তলায় যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিল বগাদা। সেই থেকে বগাদার সঙ্গে আমাদের আলাপ।

বগাদা বলল, 'শহরে নতুন বুঝি?'

আমি আর সুঁনন্দ বোকার মতো খানিকটা হাসলাম।

গম্ভীর মুখে বগাদা বলল, 'বুঝেছি। একটু মেজে ঘষে গড়ে নিতে হবে। তা যাওয়া হচ্ছে কোথায়?'

আমি বললাম, 'ইস্টবেঙ্গল মাঠে। খেলা দেখতে।'

'কোন দলের সাপোর্টার? ইস্টবেঙ্গল না মোহনবাগান?'

সুঁনন্দ বলল, 'ইস্টবেঙ্গল।'

খুশি হয়ে বগাদা বলল, 'চমৎকার।'

হঠাৎ জামার বুক পকেটে হাত দিয়ে আমি আঁতকে উঠি, 'এই যাঃ!'

বগাদা জিগ্যেস করল, 'কী হল?'

আমি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, 'খেলার টিকিট, খুচরো টাকা বুক পকেটে ছিল, এখন নেই।'

বগাদা হেসে বলল, 'পকেটমারের কি অত সময় আছে যে নেড়েচেড়ে দেখবে কোনটা টিকিট আর কোনটা টাকা? ভিড় বাসে বুক পকেটে ওসব কেউ রাখে? বাস থেকে নামা দেখেই বুঝেছি, একেবারে আনাড়ি।'

সুঁনন্দ অন্ধকার মুখ করে বলল, 'কী হবে? তাহলে তো খেলা দেখা হবে না আজ।'

বগাদা বলল, 'চিন্তা নেই। সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। আমার কাকা হলেন ইস্টবেঙ্গলের প্রেসিডেন্ট।'

আমরা খুশি হয়ে বললাম, 'তাই বুঝি?'

মাঠের দিকে হাঁটতে হাঁটতে কথাবার্তা এগোতে থাকে। বগাদাও কলেজের ছাত্র। আমাদের থেকে দু-বছর উঁচুতে অন্য কলেজে পড়ে। ভালো নাম, সুঁপ্রকাশ সোম। বাড়ি শ্যামবাজারে, কলকাতায় তিনপুরুষের বসবাস। কিছু মানুষ আছে, যারা খুব সহজে আর পাঁচজনকে আপন করে নিতে পারে, লিডার হয়ে ওঠার সহজাত ক্ষমতা নিয়ে তারা জন্মায়, বগাদা তাদেরই মতো। তার সঙ্গে আপনি, আজ্ঞে দিয়ে কথা শুরু করতে গিয়েছিলাম, কিন্তু একটা গাট্টা খেয়ে তুমিতে নেমে আসতে হল।

মাঠের কাছে এসে জিগ্যেস করলাম, 'এবার তোমার কাকার কাছে গেলে হতো না? আমাদের যে টিকিট নেই।'

অবাক হওয়ার মতো মুখ চোখ করে বগাদা বলল, 'তোর মাথায় ছিট-টিট আছে না কি? কিছুক্ষণ পর খেলা শুরু হবে। কাকা হল প্রেসিডেন্ট। এ সময় প্রেসিডেন্টের কত কাজ থাকে জানিস? এখন দেখা পাওয়া যায়?'

আনাড়ির মতো কী বলতে কী বলে ফেলেছি, নিজেই লজ্জা পেয়ে গেলাম। তবুও টিকিটের আশায় বললাম, 'একবার ফোন করলে হতো না?'

বগাদা আরও অবাক হয়ে বলল, 'কাকে ফোন করব?'

আমি বললাম, 'কেন তোমার কাকাকে।'

বগাদা খিক খিক করে হেসে বলল, 'তুই দেখছি একেবারেই গাধা। অফিসিয়ালদের ফোন নিয়ে মাঠে ঢুকতে দেয় বুঝি?'

সুঁনন্দ মরিয়া হয়ে বলল, 'তাহলে আমাদের কী হবে?'

মৃদু ধমক দিয়ে বগাদা বলল, 'নাকে কাঁদিস না তো, ভাবতে দে।'

বগাদার ভাবনার উপর ভরসা রেখে দু-জনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। এদিকে লোকজন এক এক করে মাঠে ঢুকছে। হঠাৎ মাঠের ভিতর থেকে হই-হই চিৎকার শুনে বুঝলাম, খেলা শুরু হয়ে গেছে। এদিকে বগাদা অবিচলিত চিত্তে কোমরে হাত দিয়ে, আকাশের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা ছাড়া মাঠে ঢোকার মতো কেউ বোধ হয় আর বাইরে নেই। গেটটা ফাঁকা হয়ে গেছে। শুধু একজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে।

এবার বগাদা মাঠে প্রবেশের যে বুদ্ধি দিল, সেটা শুনে দু-জনেরই পিলে চমকে গেল। বগাদা বলল, 'আমি পুলিশকাকুকে অন্যমনস্ক করে রাখছি। তোরা সেই তালে টুক করে মাঠে ঢুকে পড়বি। তারপরে আমি। আমার টিকিট আছে। কাজেই কোনও সমস্যা নেই।'

আমি কাঁচুমাচু মুখ করে বললাম, 'যদি ধরা পড়ে যাই?'

নির্বিকার মুখ চোখ করে বগাদা বলল, 'কী আর হবে? দুটো রুলের গুঁতো খাবি।'

আমাদের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা না করে বগাদা এগিয়ে গেল পুলিশের দিকে। আমরা ভাবলাম পুলিশ বোধহয় বগাদাকে হাঁকিয়ে দেবে। ও মা, দেখি পুলিশের সঙ্গে রীতিমতো গল্প জুড়ে দিয়েছে বগাদা। এরই ফাঁকে একবার গেটের দিকে যাওয়ার জন্য আমাদের ইশারা করল। তারপর কথা বলতে বলতে পুলিশকে গেট থেকে সামান্য তফাতে টেনে নিয়ে গেল।

একটা লোক চা নিয়ে হেঁকে যাচ্ছিল। বগাদা নিজে একটা চা নিল, পুলিশের হাতে এক কাপ চা ধরিয়ে দিল। তারপর দেখি, বগাদা কী সব বলছে, আর তার স্রোতা প্রায় হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আমরা জয় মা দুর্গা বলে ঢিব ঢিব করা বুক নিয়ে গেট দিয়ে মাঠের ভিতরে গলে গেলাম, কোনো বিপত্তি হল না। মাঠে ঢুকে কোথায় বসব বলে জায়গা খুঁজছি, এমন সময় হঠাৎ পিছন থেকে একটা খোঁচা মেরে বগাদা বলল, 'আর ক্যাবলামি করিস না, এদিকে আয়।'

গ্যালারিতে বসে কৌতূহল দমন করতে না পেরে বগাদাকে জিগ্যেস করলাম, 'তুমি পুলিশকে কী বলছিলে যে সে অমন খ্যাল খ্যাল করে হাসছিল?'

বগাদা গম্ভীর ভাবে বলল, 'আমার আবার মজার পদ্য লেখার বদভ্যাস আছে। সেই লেখা থেকেই পুলিশকাকুকে কয়েকটা পদ্য শোনাচ্ছিলাম।'

'গো-ও-ও-ও-ল।' বগাদার কথার প্রতিক্রিয়ায় আমার ও সুঁনন্দর বিস্ময় ও বিহ্বলতা চাপা পড়ে গেল জনতার সমবেত চিৎকারে।

বগাদার কেরামতি দেখে সেদিন থেকেই আমরা দু-জন ওর চ্যালা বনে গেলাম। বগাদাও আমাদের মতো দুই গেঁয়ো ভূতকে কলকাতা শহরের উপযোগী করে তোলার মহান দায়িত্ব স্বেচ্ছায় নিজের কাঁধে তুলে নিল। রোববারে রোববারে হানা দিতে লাগলাম বগাদাদের শ্যামবাজারের বাড়িতে।

কিছুদিনের মধ্যেই বুঝলাম, কথার জাদুতে সবাইকে বশ করে নিতে বগাদার জুড়ি নেই। আরেকটা বিষয় হল, বগাদা যখন কথা বলে তখন, মাঝখানে কোনো কথা বলা যায় না, ভুল কিছু বললেও সেটা মেনে নিতে হয়। না হলে আমরা যা ঠিক বলে জানি, সেটাকেই কথার মার প্যাঁচে বগাদা ভুল বলে চালিয়ে দেয়। আমরাও বিশ্বাস করতে শুরু করি, আমরা যেটা জানতাম সেটা ভুল।

মাঠে আলাপ হওয়ার কয়েক মাস পরে, এক রোববার সকালে বগাদার বাড়িতে গিয়ে দেখি, তিনতলায় তার নিজের ঘরে ইজিচেয়ারে শুয়ে, হাতদুটোকে মাথার পিছনে দিয়ে একটা পা আরেকটা পায়ের উপর তুলে বগাদা পা নাচাচ্ছে আর গুনগুন করে গান গাইছে। আমাদের দেখেই গান থামিয়ে বলল, 'এসে গেছিস তোরা? তোদের জন্যই বসে আছি। দারুণ একটা খবর আছে।'

সুঁনন্দ বলল, 'কী ব্যাপার কী গো?'

পাশে রাখা টুলের উপর থেকে একটা কাগজ তুলে নিয়ে বলল, 'পিছনের পাতার নীচের দিকের বিজ্ঞাপনটা পড়ে দেখ। পেন দিয়ে টিক মারা আছে।'

আমরা দু-জন কাগজের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়লাম। রেস্তোরাঁর নাম, 'গরম কড়াই'। ধর্মতলায় নতুন খুলেছে। বাংলা নতুন বছরের বিশেষ আকর্ষণ, 'মহাভোজ'। জমিদার বাড়ির পরিবেশে বসে রাজকীয় আহার। প্লেট পিছু বারোশো টাকা।

লুচি, ছোলার ডাল, বেগুনভাজা, ঘি-ভাত, পোস্তর বড়া দিয়ে শুরু। তার পরে পটলের দোরমা, ইচড়ের কোপ্তা, ভাপা ইলিশ, চিংড়ি মালাইকারি হয়ে কচি পাঠার গোয়ালন্দ স্টিমারকারি—এর পরে আছে আমের চাটনি, রাজভোগ, মাখা সন্দেশ আর পায়েস। মেসের অখাদ্য রান্না দিনের পর দিন খেয়ে খেয়ে আমাদের বুভুক্ষু দশা। এসব ভালো-মন্দ খাবারের কথা পড়েই জিভে জল এসে গেল।

সুঁনন্দ উৎসাহের সঙ্গে বলল, 'তুমি আমাদের ওখানে খাওয়াবে নাকি?'

'আমি খাওয়াব না, মামা খাওয়াবে।' কান খোঁচাতে খোঁচাতে সংক্ষেপে জবাব দিল বগাদা।

আমি প্রশ্ন করলাম, 'কার মামা?'

'আমার মামা। জিরাফমামা। না জিরাফমামাও খাওয়াবে না। খাওয়াবে মামার কুপন।'

এসব কথার মাথামুন্ডু কিছু বুঝতে না পেরে হতবুদ্ধি হয়ে বগাদার দিকে চেয়ে রইলাম আমরা।

আমাদের বোকাটে চোখ-মুখ দেখে বগাদা হেসে বললে, 'একেবারে সব বোমকে গেলি যে! আমার জিরাফমামার কথা তোদের বলিনি না?'

আমি বললাম, 'না তো।'

'মামার নাম বটেশ্বর চক্রবর্তী। গলাটা একটু বেশি লম্বা বলে ছেলেবেলায় বলতাম, জিরাফমামা। তা সেই নামটাই রয়ে গেছে। মামা হাইকোর্টের মস্ত উকিল। গেল মাসে একটা কাজে দিল্লি গিয়েছিলেন। সুঁপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি আইনের একটা জটিল বিষয়ে আলোচনার জন্য মামাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন।'

সুঁনন্দ চোখ কপালে তুলে বলল, 'বলো কী? এ তো বিরাট ব্যাপার।'

বগাদা মুখ ভেংচে বলল, 'এতেই হাঁ হয়ে গেলি? জিরাফমামার কাজের খ্যাতি সারা পৃথিবী জুড়ে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট দিনে দু-বার জিরাফমামার খোঁজখবর নেয়। আইন নিয়ে ধন্দে পড়লেই মামাকে ফোন করে।'

সুঁনন্দর মুখের হাঁ-টা আরও বড় হয়ে গেল। আরেকটু হলে জলের বোতলটা আমার হাত থেকে পড়ে গিয়ে ভাঙত। যাই হোক, আমি দেখলাম মহাভোজের বিষয়টা ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে। বললাম, 'জিরাফমামা তো দিল্লি গেলেন, তারপরে কী হল?'

ইজিচেয়ার থেকে উঠে টেবিলের ড্রয়ার টেনে, ভিতর থেকে একটা খাম বের করে বগাদা উৎসাহের সঙ্গে বলল, 'প্লেনের টিকিটের সঙ্গে গরম কড়াই রেস্তরাঁর একটা কুপন পেয়েছিলেন মামা। লটারিতে বেঁধেছে। দু-জনের জন্য মহাভোজ ফ্রি। অফারটা আর তিনদিন আছে। কাল যাব ভাবছি।'

সুঁনন্দ বলল, 'বিনা পয়সায় মহাভোজ? এ যে দারুণ ব্যাপার! একা একা যাবে?'

খামের ভিতর থেকে কমলা রঙের চৌকো মতো একটা কাগজ বের করতে করতে বগাদা বলল, 'না রে তোদেরও নিয়ে যাব। এই হল সেই কুপন।'

আমি বললাম, 'কুপনে তো দুজনের কথা বলা আছে।'

আমার দিকে কটমট করে চেয়ে বগাদা বলল, 'হাঁদা কোথাকার একটা। খাবারের যা ফিরিস্তি দিয়েছে, একা এক প্লেট খেতে পারবি? তুই তো আবার পেট রোগা। দু-প্লেট নেব। তিনজনে ভাগ করে খাব। ল্যাঠা চুকে গেল। কাল এগারোটা নাগাদ বেরিয়ে পড়ব। তৈরি হয়ে থাকিস। আমি তোদের মেসে চলে যাব।'

মহাভোজের স্বপ্নে মশগুল হয়ে আমরা মেসে ফিরে এলাম। পরের দিন বাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে ধর্মতলায় যখন পৌঁছলাম, তখন দুপুর দুটো বাজে। দারুণ গরমে আমরা ঘেমে নেয়ে একাকার। বৈশাখের দুপুরের রোদ চারিদিক জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে গরম কড়াইতে একেবারে ভাজাভাজা হয়ে যাচ্ছি। বেজায় খিদে পেয়ে গেছে। পেটের মধ্যেও আগুন জ্বলছে।

এর মধ্যে একটা কাণ্ড ঘটে গেছে, বগাদার মতো চৌখস ছেলেরও যে পকেটমার হতে পারে, সেটা ভাবতেই পারিনি। বগাদা বাস থেকে নেমেই প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে বলল, 'এই যাঃ! মানিব্যাগটা গেছে।'

আমি ব্যথায় কাতরে ওঠার মতো গলায় বললাম, 'কুপনটা?'

'তোর মতো গাধা না কি যে সব এক জায়গায় রাখব, ওটা বুক পকেটে আছে।'

'গরম কড়াই' রেস্তোরাঁটা খুঁজে পেতে বেশি সময় লাগল না। ভিতরে ঢুকে প্রথমেই এসি মেশিনের ঠান্ডা হাওয়ায় প্রাণ জুড়িয়ে গেল। লোকজন বড় একটা নেই। একটা টেবিলে দু-জন বয়স্ক লোক খাওয়া-দাওয়া করছে। আমরা একটা শ্বেত পাথরের টেবিল দখল করে বসলাম।

রেস্তোরাঁর আসবাবপত্র, দেওয়ালের গড়ন সব সাবেকি আমলের। দেওয়ালের গায়ে শোভা পাচ্ছে ফ্রেমে বাঁধানো কালিঘাটের পটচিত্র। মাথার উপর একটা টানা পাখা রয়েছে। সেটা মৃদুমন্দ গতিতে দুলছে। ছাতা থেকে ঝুলছে ঝাড়বাতি। রেস্টুরেন্টের বয়দের পরনে, ধুতি পাঞ্জাবি। মাথায় তবলার বিড়ের মতো টুপি। কলকাতা শহরে এসে এত বড় রেস্তোরাঁয় ঢোকার অভিজ্ঞতা এই প্রথম। টালুস মালুস করে চারদিকে চোখ বুলিয়ে সব নজর করছি।

বগাদা মৃদু ধমক দিয়ে বলল, 'অমন আদেখলার মতো করিস না।' একটু পরে হেলতে দুলতে একটা ছেলে এগিয়ে এল।

বগাদা খাবারের অর্ডার দিল। 'দুটো মহাভোজ আর একটা একসট্রা প্লেট।'

মিনিট দশেক পর খাবার এল। বড় বড় কাঁসার থালা আর জামবাটিতে টেবিল প্রায় ভরে উঠল। দু-জনের জন্য যা খাবার দিয়েছে, সত্যিই তিনজনে খেয়ে সারা কঠিন। আমরা দ্রুত হাত লাগিয়ে হাউমাউ করে খেতে শুরু করে দিলাম। বেজায় খিদে পেয়েছে। অপূর্ব সুঁস্বাদু রান্না। তারিফ না করে উপায় নেই। প্রায় মিনিট তিরিশ-চল্লিশ হাত আর মুখের পেশি সঞ্চালনের পর আমরা যখন খাওয়া শেষ করলাম, তখন মহাভোজের ধকলে আমরা রীতিমতো বিধস্ত। পেট জয়ঢাক। নড়তে চড়তে কষ্ট হচ্ছে।

কিছুক্ষণ পর হেলতে দুলতে ধুতি পরা বয় এগিয়ে এল। হাতে একটা খয়েরি রঙের প্যাড। টেবিলের উপর সেটা নামিয়ে রেখে বাসন-কোসনগুলো নিয়ে চলে গেল। প্যাডটা খুলে দেখলাম, খাবারের বিল, ট্যাক্সসহ ছাব্বিশশো তিরিশ টাকা। বগাদা পকেট থেকে কমলা রঙের কুপনটা বের করে প্যাডের ভিতরে গুজে দিল। ছেলেটা ফিরে এসে প্যাডটা তুলে নিয়ে চলে গেল।

আমরা উঠি উঠি করছি, এমন সময় দেখি, হন্তদন্ত হয়ে বয় আমাদের টেবিলের দিকে আসছে। মৌরি মুখে ফেলে বগাদা বলল, 'টিপস দিতে ভুলে গিয়েছিলাম। ছেলেটা বোধ হয় টিপস নিতে আসছে। তোদের কাছে দশ-কুড়ি টাকা হবে?'

ওটুকু টাকা পকেটে থাকে। আমি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করলাম। কিন্তু ছেলেটা যে ভগ্নদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চলেছে, তা কী করে জানব? ছেলেটা এসেই বলল, 'এই কুপনে হবে না। টাকা দিন।'

বগাদা অবাক হয়ে বলল, 'টাকা? কীসের টাকা?'

'এই যে খাওয়া-দাওয়া করলেন।'

'সেজন্য তো কুপন দিলাম।'

'বললাম তো কুপনে হবে না।'

'হবে না মানে? জিরাফমামার কুপন কি ফেলনা? তিনি কুপিত হলে কী হবে জানেন?'

লোকটা কান চুলকে বলল, 'আপনারা ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে কথা বলুন।'

বগাদা তেড়ে মেরে বলল, 'বেশ ডাকুন আপনাদের ম্যানেজারকে।'

ছেলেটা চলে গেল। আমি আর সুঁনন্দ বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছি। কুপনে যদি না হয় তো আমরা টাকা দিতে পারব না। তখন কী হবে? আমার ও সুঁনন্দর কাছে কুড়িয়ে-বাড়িয়ে একশো টাকা হবে। এদিকে বিলের পরিমাণ আকাশছোঁয়া। বুক ধড়ফড় করতে লাগল।

এ নিয়ে বগাদার কোনো ভাবনাচিন্তা আছে বলে মনে হল না। সে দিব্যি নুন আর গোলমরিচের কৌটো দুটো নিয়ে খেলা করছে। একবার আমাদের আতঙ্কগ্রস্ত চেহারার দিকে চেয়ে বলল, 'কী রে ঘাবড়ে গেলি মনে হচ্ছে?'

আমি বললাম, 'ঘাবড়াব না মানে? কুপনে যদি না হয় পয়সা কী করে দেবে শুনি?'

সুঁনন্দ বলল, 'ওরা পুলিশ ডাকবে না তো বগাদা?'

'অত সোজা? বেশি ত্যাণ্ডাই-ম্যাণ্ডাই করলে ওদেরই পুলিশে দেব। কুপন ছাপিয়ে লোক ঠকানো হচ্ছে? জিরাফমামাকে দিয়ে জালিয়াতির মামলা করাব।'

আমি করুণ গলায় বললাম, 'সে সবের আগেই তো আমাদের হাজতে ভরে দেবে।'

'চুপচাপ বসে থাক। দেখ না, কী হয়।'

কিছু সময় পর শশব্যস্ত হয়ে কালো স্যুট পরা একটা লোক এগিয়ে এল আমাদের দিকে। বুঝলাম, এই হল ম্যানেজার। সে এসে আমাদের দিকে চেয়ে একগাল হেসে বলল, 'নমস্কার স্যার।'

বগাদা তাকে দেখেই রেগেমেগে বলে উঠল, 'কুপনটা চলবে না কেন শুনি?'

ম্যানেজার বলল, 'চলবে না তো বলিনি।'

'সে কী আপনাদের লোকই যে এসে বলল—'

'আজ্ঞে', সে ভুল কিছু বলেনি।'

বগাদা দ্বিগুণ রেগে গিয়ে বলল, 'কাস্টমারের সঙ্গে রসিকতা হচ্ছে? আপনাদের হেড অফিসে কমপ্লেন করব আমরা। মালিকের নাম বলুন।'

'আজ্ঞে' আমিই এ রেস্তোরাঁ মালিক। আপনার নাম?'

'আমার নাম জেনে আপনার কী হবে?' ঝাঁঝের সঙ্গে বলল বগাদা।

'বেশ আপনার নামটা না হয় না বললেন, কিন্তু কথা হল, বটেশ্বর চক্রবর্তী প্লেনের টিকিটের সঙ্গে কুপনটা পেয়েছিলেন, উনি আপনার কে হন?'

'উনি আমার জিরাফমামা।'

জিরাফমামা শুনে ম্যানেজার হকচকিয়ে গিয়ে বলল, 'কী বললেন?'

বগাদা বলল, 'বটেশ্বর চক্রবর্তী হলেন, আমার জিরাফমামা। মস্ত উকিল। কোর্টে দাঁড়িয়ে জিরাফমামার জেরার মোকাবিলা করতে পারবেন তো?'

ম্যানেজার শান্ত গলায় বলল, 'বেশ মানলাম, বটেশ্বর চক্রবর্তী মহাগুণী মানুষ। কিন্তু উনি কি আছেন এখানে?'

'ওনার তো আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই, কুপনের ভোজ খেতে আসবেন। ওঁর সারাদিন কত জরুরি কাজ থাকে আপনি জানেন?'

ম্যানেজার মৃদু হেসে বলল, 'সমস্যাটা তো এখানেই। এই কুপনের সুঁবিধা নিতে হলে যিনি বিমানে ভ্রমণ করেছিলেন, অবশ্যই তাঁকে আসতে হবে। তাঁর সঙ্গে অন্য আর একজন কেউ আসতে পারে।'

আমি আর সুঁনন্দ মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। বুঝলাম, মহাভোজ খেতে এসে গভীর সংকটে পড়েছি। কী করে এ যাত্রা পরিত্রাণ পাব, জানি না।

বগাদা জোরের সঙ্গে বলল, 'আপনাদের কুপনে তো এসব কথা লেখা নেই।'

'সব কি লেখা থাকে? বিটুইন দ্য লাইনস বলে একটা কথা আছে না?'

বগাদা বলল, 'বা রে আপনার মনে কী আছে সাধারণ লোকে সেটা বুঝবে কেমন করে?'

'মগজে ঘিলু থাকলেই বুঝবে।'

বগাদা একেবারে ফেটে পড়ল। 'জানেন আমরা কলেজে পড়ি। আপনি কী বলতে চান আমরা তিনজনেই মাথামোটা? আপনি তো চিটিংবাজ। মুখে একরকম বলছেন, অথচ কুপনে সে সব লেখা নেই।'

ম্যানেজার এবার বেশ রাগের সঙ্গে বলল, 'দেখুন আমার অত সময় নেই। টাকা বের করুন। কলকাতা শহরে নানারকম জালিয়াতি কারবার হয় আমরা জানি।'

বগাদা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে কিছু একটা কথা বলতে যাচ্ছিল, আমি বাধা দিয়ে বললাম, 'আমাদের কাছে অত টাকা নেই। হাতের ঘড়ি খুলে দিলে হবে?'

'আপনাদের হাতে যে ঘড়ি আছে, বাজারে তার দাম মেরে কেটে পাঁচশো টাকা হবে। চটপট টাকা বের করুন।'

বগাদা হাতা গুটিয়ে বলল, 'ঠিক আছে আমরা পুলিশে খবর দিচ্ছি। কলকাতা পুলিসের এক বড়কর্তা জিরাফমামার ক্লায়েন্ট। আপনাদের চিটিংবাজির কারবারের একটা হেস্তনেস্ত হওয়া উচিত।'

ম্যানেজার বলল, 'লালবাজারের ফোন-নম্বরটা আমরাও জানি। পকেটমারির কারবার কতদিন ধরে চলছে শুনি?'

'তার মানে?' ভীষণ রেগে প্রশ্ন করল বগাদা।

'বাসে উঠে বটেশ্বর চক্রবর্তীর পকেট মেরে যে কুপনটা হস্তগত করেননি, তার প্রমাণ কী? ঠিক আছে। আপনারা এখানে বসুঁন। আমি লালবাজারে খবর দিচ্ছি।'

ম্যানেজার হনহন করে হেঁটে চলে গেল। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম ম্যানেজার রিসিভার কানে দিয়ে ফোনের নম্বর ডায়াল করছে। রেস্তোরাঁয় এখন আমরা ছাড়া আর কোনো কাস্টমার নেই। ঢোকার সময় যে দু-জনকে খাওয়া-দাওয়া করতে দেখেছিলাম, তারা চলে গেছে।

আমি মরিয়া হয়ে বললাম, 'এবার কী হবে বগাদা? আমাদের যে এবার পুলিশে দেবে।'

সুঁনন্দ বলল, 'আমরা এখানে বসি। তুমি বাড়ি থেকে টাকা নিয়ে এসো না?'

বগাদা বলল, 'খেপেছিস? বাবা এসব জানতে পারলে ঠেঙিয়ে আমার পিঠের ছাল তুলে দেবেন।

আমি বললাম, 'তাহলে তোমার জিরাফমামাকে ফোন করো।'

'উনি তো হাইকোর্টে। আজ খুনের মামলা আছে। এসময় মামাকে এসব তুচ্ছ ব্যাপারে বিরক্ত করা যায় না কি?'

হঠাৎ দেখলাম রেস্তোরাঁর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মুশকো চেহারার সিকিউরিটি আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। ম্যানেজার হেঁকে বলল, 'জনার্দন ছেলেগুলোর উপর নজর রাখ, যেন পালাতে না পারে।'

জনার্দন সামনে এসে পান খাওয়া দাঁত বের করে বগাদার দিকে চেয়ে ফিক করে বিচ্ছিরি রকম হেসে বলল, 'রাতের বেলায় লালবাজারের লক আপে মহাভোজটা ভালোই জমবে।'

এবার বগাদা যে কাণ্ড বাঁধিয়ে বসল, সেটার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। তবে সেই দুঃসাহসিক কাণ্ডের জন্যই আমরা সে যাত্রা লালবাজারের হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিলাম। নুন আর গোলমরিচের কৌটো নিয়ে খেলা করতে করতে বগাদা কখন যে গোলমরিচের কৌটোর মুখ খুলে ফেলেছে সেটা খেয়াল করিনি। বগাদা দুম করে কৌটোশুদ্ধ গোলমরিচ ছুড়ে দিল লোকটার দিকে।

লোকটা হাউমাউ করে উঠল। হ্যাঁচ্চো হ্যাঁচ্চো করে হাঁচতে লাগল। বগাদা সংক্ষেপে আমাদের বলল, 'পালা।' আমরা তিনজনেই টেবিল চেয়ার উলটে, জ্যা-মুক্ত তিরের মতো ছুটে গেলাম দরজার দিকে। ম্যানেজার 'ডাকাত ডাকাত' বলে দৌড়ে আসার আগেই দরজা ঠেলে বাইরের রাস্তার উপর এসে পড়লাম। তারপর গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে রাস্তা পার হয়ে তিনজনেই প্রাণপণে ছুটতে লাগলাম। কোনদিকে যাচ্ছি সে বোধ তখন নেই। শুধু মনে হতে লাগল, আমাদের ধরার জন্য লোকজন লাঠিসোটা নিয়ে পিছনে তেড়ে আসছে।

ফাঁকা জায়গায় এসে আমরা হাঁপাচ্ছি। খেয়াল করে দেখলাম মনুমেন্ট ছাড়িয়ে গড়ের মাঠের কাছে এসে পড়েছি। পাশেই রয়েছে একটা বড় বটগাছ। তার চারপাশ সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। ভরা পেটে অমন ভয়ানক দৌড়ের পর আমাদের সবারই বেদম অবস্থা। গা গোলাচ্ছে। ভাবলাম গাছতলায় সিমেন্টের বেদিতে শুয়ে একটু জিরিয়ে নিই। কিন্তু অত সুঁখ আমাদের কপালে সইল না।

আশপাশটা ভালো করে নজর করতে গিয়ে দেখি, একজন ঘোড়সওয়ার পুলিশ টগবগ করে আমাদের দিকে দৌড়ে আসছে। আমি কাঁদো-কাঁদো গলায় বললাম, 'বগাদা পুলিশ তাড়া করেছে।'

আবার দৌড়-দৌড়-দৌড়। তবে এবার তিনজন তিনদিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি পুলিশের ঘোড়া তিরবেগে বগাদার দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। ঘোড়ার সঙ্গে দৌড়ে পারা কী চারটিখানি কথা? দেখতে দেখতে ঘোড়াশুদ্ধ পুলিশটা হুড়মুড় করে বগাদার উপর হামলে পড়ল।

পুলিশ, ঘোড়া আর বগাদা তিনজনেই চিৎপটাং হল। বগাদা গড়িয়ে গিয়ে পড়ল শুকনো ড্রেনের মধ্যে। আমি আর সুঁনন্দ ছুটে গিয়ে তাকে টেনে তুললাম। এদিকে আরও তিন চারজন পুলিশ ঘোড়া নিয়ে দৌড়ে এসেছে ঘটনাস্থলে। আমার চোখে জল আসছে। শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে গেলাম। পুলিশে ধরেছে খবর গেলে বাড়িতে কী অবস্থা হবে, সেই ভেবে চোখের জল হুহু করে গাল বেয়ে নামতে লাগল।

ঘোড়ার পিঠ থেকে ভূপতিত পুলিশ উঠে দাঁড়িয়ে দ্রত ছুটে এল আমাদের কাছে। 'লেগেছে না কি ভাই?'

আমাদের ঘিরে চারিদিকে একজন দু-জন করে লোক জমতে শুরু করেছে। ঘোড়াটা চিঁ-হি-হি-হি করে ভয়ানক চেল্লাচ্ছে আর বেজায় দাপাদাপি করছে। দু-জন পুলিশ ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে তাকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে।

পুলিশ লোকটি বলল, 'সরি ভাই, ঘোড়াটা হঠাৎ বিগড়ে গেল। সামলাতে পারলাম না।'

সুঁনন্দ দুম করে বোকার মতো বলে বসল, 'সে কী? আমরা তো ভেবেছিলাম আপনি আমাদের তাড়া করেছেন।'

পুলিশ হেসে বলল, 'খামোখা তোমাদের তাড়া করতে যাব কেন?'

আমাদের বুকের ধুকপুকানি একধাক্কায় কমে গেল। ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল। অকারণে ভয় পেয়ে দৌড়োদৌড়ি করছিলাম আমরা। পুলিশ মোটেও আমাদের তাড়া করেনি।

কথা ঘোরানোর জন্য সুঁনন্দ বলল, 'না, মানে ঘোড়া তেড়ে আসলে কার না ভয় লাগে বলুন?

পুলিশ লোকটি বলল, 'কালও দু-জনকে ধাক্কা মেরেছে। ঘোড়াটাকে বাতিল করতে হবে। একেবারে পাগলা হয়ে গেছে। লোকটা এবার ঝুঁকে পড়ে বগাদাকে প্রশ্ন করল, 'উঠে দাঁড়াতে পারবে ভাই?'

দাঁড়িয়ে পড়া পথচারীদের একজন বলে উঠল, 'মনে হয় কোমর ভেঙেছে।'

'চলো তাহলে পিজি হাসপাতালে ভর্তি করে দিই।' ওয়াকিটকিতে কাউকে অ্যাম্বুলেন্স পাঠানোর নির্দেশ দিল পুলিশ লোকটা। অ্যাম্বুলেন্স, পিজি হাসপাতাল ও পুলিশ এই ত্র্যহস্পর্শেই বোধহয় বগাদা কাতরাতে কাতরাতে উঠে দাঁড়াল।

হঠাৎ দেখি, ভিড়ের মধ্যে 'গরম কড়াই' রেস্টুরেন্টের জনার্দন যমদূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখদুটো টকটকে লাল। সেটা যে গোলমরিচের প্রভাব সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। জনার্দন কড়া চোখে চেয়ে আছে আমাদের দিকে। মুখের ভাষা পড়ে মনে হচ্ছে, পারলে আমাদের চিবিয়ে খেয়ে ফেলে।

আমি চোখ সরিয়ে নিলাম, বুকের মধ্যে আবার হাতুড়ি পেটা শুরু হল। জনার্দনের দিকে চোখ পড়তেই বগাদা বলে উঠল, 'কী চান বলুন তো মশাই আপনি? কাল থেকে আমাকে ফলো করছেন। আপনার ভয়ে দৌড়তে গিয়েই তো এই বিপত্তি হল। আমাকে দৌড়তে দেখে ঘোড়াটা খেপে গেল। মাঝের থেকে পুলিশকেও বেকায়দায় ফেললেন। ছেলেধরার কারবার যদি করতেই হয়, তাহলে ছোট ছোট ছেলেদের ধরলেই হল। আমরা কলেজে পড়ি। কোনো ছেলেধরা কলেজের ছেলেদের ধরে বলে তো শুনিনি।'

জড় হওয়া পথচারীরা রহস্যের গন্ধ পেয়ে জলজলে চোখে জনার্দনের দিকে তাকাল। 'ছেলেধরা নাকি?' ষণ্ডামতো একজন লোক জামার হাতা গোটাতে শুরু করল। জনতার মতিগতি ভালো নয় বুঝে উলটো মুখে দৌড় লাগাল জনার্দন।

ভিড়ের মধ্যে থেকে একজন বলে উঠল, 'লোকটা পালিয়ে গেল যে!'

বগাদা বলল, 'ছেড়ে দিন। কোনো ক্ষতি তো করেনি। শুধু শুধু ঝামেলা করে কী হবে? লোকটা পাগলও হতে পারে।' ভিড় পাতলা হয়ে গেল।

পুলিশের ঘোড়ার দোষে বগাদা আহত হয়েছে। ব্যথায় কাতরাচ্ছে। এ নিয়ে পুলিশের অনুতাপের শেষ নেই। তাই প্রায়শ্চিত্য করতে পুলিশের গাড়ি আমাদের পৌঁছে দিল শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে। গাড়ি থেকে নেমে আমাদের দু-জনের কাঁধে হাত রেখে বগাদা ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। পুলিশের গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হেসে উঠল সে।

আমি বললাম, 'সে কী তোমার লাগেনি?'

'ধুর বোকা। একটু হাত পা ছড়ে গেছে। বাড়িতে গিয়ে ডেটল লাগালেই ঠিক হয়ে যাবে?'

সুঁনন্দ বলল, 'তোমার জিরাফমামার সঙ্গে কিন্তু একবার আলাপ করিয়ে দিতে হবে।'

ভীষণ অবাক হয়ে বগাদা বলল, 'তাকে পাবি কোথায়?'

আমি বললাম, 'কেন তোমার সঙ্গে একদিন তোমার মামাবাড়িতে হানা দেব।'

'দূর দূর! জিরাফমামা বলে কেউ আছে নাকি?'

মাথায় এবার সত্যি সত্যি যেন বাজ পড়ল। বললাম, 'তার মানে?'

'জিরাফমামা একটা কাল্পনিক চরিত্র।'

সুঁনন্দ ভয়ানক ঘাবড়ে যাওয়া গলায় বলল, 'তাহলে কুপনটা?'

'কী জানি কোথা থেকে উড়ে এসে আমাদের বাড়ির দরজার সামনে পড়েছিল। কী মনে হল, তুলে রাখলাম। কুপনের গায়ে লেখা ছিল বটেশ্বর চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট। ঠিকানাটা জানলে লোকটার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া যেত। দিল্লিগামী প্লেনের টিকিটের সঙ্গে যে কুপনটা দেওয়া হয়েছে সেটা কুপনের গায়েই লেখা আছে। হঠাৎ সেদিন সকালে খবরের কাগজে দেখলাম 'গরম কড়াই'-এর বিজ্ঞাপন। 'গরম কড়াই' নামটা দেখেই কুপনের কথা মনে পড়ে গেল। কোন কুপন মহাভোজের অফার জিতেছে, সেটা বিজ্ঞাপনে দেওয়া ছিল। কুড়িয়ে পাওয়া কুপনের নম্বরটা মিলিয়ে দেখলাম। মিলে গেল। ব্যস।'

ক্লাইম্যাক্সের ধাক্কায় হাঁ হয়ে বগাদার মুখের দিকে চাইতে গিয়ে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে প্রায় ধাক্কা খাচ্ছিলাম, বগাদা হাত টেনে ধরে বাঁচিয়ে দিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%