শান্তনু বসু

নাড়ুগোপাল নামটা শুনলে কেমন যেন গোলগাল নাদুসনুদুস, এক সুবোধ বালকের কথা মনে আসে। আমাদের নাড়ুগোপাল মোটেও কিন্তু সেরকম প্রকৃতির ছেলে ছিল না। তার ভালো নাম ছিল নারায়ণ, ডাক নাম নাড়ু। আমরা সহপাঠীরা নাড়ুর সঙ্গে গোপাল জুড়ে তাকে নাড়ুগোপাল বলে ডাকতাম।
ইস্কুলে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সেই ছিল সবচেয়ে দুরন্ত, দস্যিপনায় দুর্দান্ত। ভয়ডর বলে কোনো শব্দ তার অভিধানে ছিল না। তাকে নিয়ে তটস্থ থাকতাম আমরা। হঠকারিতা করে কখন সে যে কী করে বসবে, তা আন্দাজ করা ছিল খুব কঠিন।
একদিন ক্লাসে ঢুকেই বাংলার শিক্ষক প্রকৃতিবাবু খসখস করে চক দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডের উপর লিখে ফেললেন 'কপোল ভাসিয়া যায় নয়নের জলে।' তারপর আমাদের দিকে ঘুরে হাতের দু আঙুলের ফাঁকে ধরা বেত নাচিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'কপোল মানে কী, বল দেখি নারায়ণ।'
যার উদ্দেশে কথাটা বলা, নারায়ণ মানে আমাদের নাড়ুগোপাল তখন লাস্ট বেঞ্চে মাথা নীচু করে বসে রুদ্ধশ্বাসে একখানা ডিটেকটিভ গল্প পড়ে চলেছে।
প্রকৃতিবাবু রাশভারী গম্ভীর লোক। হাই পাওয়ারের চশমার মোটা কাচের পিছনে জেগে থাকা তাঁর গোল গোল দুই চোখের দিকে তাকালেই আমাদের বুকের রক্ত হিম হয়ে যায়। জানা প্রশ্নের উত্তর ঘুলিয়ে যায়। পদ্য মুখস্থ বলতে বললে আমরা অনেকেই তিন চার লাইন পরে কাটা রেকর্ডের মতো আটকে যাই। এরপরে প্রকৃতিবাবুর হাতের বেত শোঁ-শোঁ শব্দে বাতাস কাটে। আমাদের হাতের তালু লাল হয়ে যায়। নাড়ুগোপাল অবশ্য এইসব বেত্রাঘাত অবলীলায় হজম করে নিত।
প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে প্রকৃতিবাবু ফের জিগ্যেস করলেন, 'কপোল শব্দের অর্থ কী? নারায়ণ?' স্যারের গলার স্বর একপর্দা চড়ে গেল।
নাড়ুগোপাল বই ছেড়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে 'প্রেসেন্ট স্যার' বলে মাথা চুলকোতে লাগল।
'তুই যে উপস্থিত তা তো দেখতেই পাচ্ছি। এতক্ষণ যোগনিদ্রায় মগ্ন ছিলি নাকি? কী জিগ্যেস করলাম?' স্যারের হাতের বেতটা নড়েচড়ে উঠল।
নাড়ুগোপাল বলল, 'শুনতে পাইনি স্যার।'
'তাই বুঝি? কানে কম শোনা তো ভালো কথা নয়।' এই বলে এগিয়ে এসে আচ্ছা করে তার কান মুচড়ে দিয়ে স্যার ফের প্রশ্ন করলেন, 'বোর্ডে কী লেখা আছে?'
অমন মোক্ষম কানমলা খেয়েও নাড়ুগোপালের চোখে-মুখে ভয় বা ঘাবড়ে যাওয়ার বিন্দুমাত্র চিহ্ন নেই। সে গড়গড় করে পড়ে গেল, 'কপোল ভাসিয়া যায় নয়নের জলে।'
'কপোল শব্দের অর্থ কী?' প্রশ্ন করলেন প্রকৃতিবাবু।
নাড়ুগোপাল জবাব দেয়, 'আপনি ভুল লিখেছেন স্যার। কথাটা কপোল নয়, কপাল হবে।'
এই জবাব শুনে আমি আঁতকে উঠলাম। নাড়ুগোপাল এবার নির্ঘাত সপাং সপাং বেত খাবে। এমনিতেই তার কান লাল হয়ে আছে। এবারে ওর হাত-পা লাল বা বেগুনি কিছু একটা হয়ে যাবে।
কিন্তু প্রকৃতিবাবু তখনই হামলার মধ্যে গেলেন না। গম্ভীর গলায় বললেন, 'কপাল কী করে নয়নের জলে ভাসবে? জল তো উঁচু থেকে নীচুতে যায়।'
নাড়ুগোপাল প্রত্যয়ের সঙ্গে বলল, 'সে তো ঠিকই। তবে হেটমুণ্ড ঊর্ধ্বপদ হলেই হল। কপাল ভেসে যাবে।'
প্রকৃতিবাবু এবার প্রায় হুংকার দিয়ে উঠলেন, 'মানে? রসিকতা হচ্ছে?'
এই ভীমনাদ শুনেও এতটুকু না ঘাবড়ে নাড়ুগোপাল জবাব দিল, 'দু'পা বেঁধে কাউকে গাছের ডাল থেকে ঝুলিয়ে দিলেই কপাল নয়নের জলে ভেসে যাবে। আগেকার দিনে ডাকাতরা এমন করত। আমি বইতে পড়েছি। কপাল ভাসিয়া যায় নয়নের জলে, দুই ঠ্যাং বাঁধা আছে কদম্বের ডালে।'
অনেকেই মাথা নীচু করে মুখ টিপে হাসতে লাগল। হাসি চাপতে গিয়ে আমার নাক দিয়ে ঘোঁত করে একটা শব্দ বেরিয়ে গেল। প্রকৃতিবাবু কড়া চোখে আমার দিকে একবার দেখলেন। তারপর নারায়ণের উদ্দেশ্যে বললেন, 'বেঞ্চ থেকে উঠে আয়, কপোল কী করে নয়নের জলে ভাসে বুঝিয়ে দিই।'
এবারে সপাং সপাং, চটাশ-পটাশ শব্দে প্রকৃতিবাবুর বেত চলল। বেদম মার খেয়েও নাড়ুগোপাল নির্বিকার। খানিকবাদে নিজেই হাঁপিয়ে গিয়ে স্যার বললেন, 'যা বাইরে গিয়ে নিলডাউন হয়ে থাক।' আমার দিকে চেয়ে বললেন, 'তুই হাসছিলি না? তুইও যা বাইরে। নিলডাউন।'
আমার মধ্যে আবার ভালো ছেলে ভাবটা বড় বেশি। নিলডাউন হওয়া, বেঞ্চের উপর কান ধরে দাঁড়ানো এসব আমার বড্ড মানে লাগে। গোলমাল পাকাল নাড়ুগোপাল, মাঝখান থেকে আমি শাস্তির ফেরে পড়লাম। অমন বেমক্কা কথা শুনলে কার না হাসি পাবে শুনি? আমি কি খিলখিল করে হেসেছিলাম? শুধু হাসি চাপতে গিয়ে একটা ঘোঁত করেছি। সেটা কখনোই ইচ্ছাকৃত নয়।
এই সামান্য কারণে নিলডাউন হতে হবে বলে আমার মনটা খচখচ করছিল। রাগও হচ্ছিল নাড়ুগোপালের উপর। কী দরকার ছিল ওর ওই ধরনের অসম্ভব, আজগুবি কথাবার্তা বলার। কপোল মানে যে গাল যাকে বলে গণ্ডদেশ এটা কি নাড়ুগোপাল জানে না? আর যদি নাই বা জানে, তাহলে জানি না বলে চুপচাপ দু-ঘা বেত খেয়ে নিলে তো আজ আমার এই হেনস্থা হয় না। কপালে গেরো থাকলে কি আর করা যাবে।
ক্লাসের বাইরের বারান্দায় হাঁটুতে ভর দিয়ে খাড়া হয়ে রইলাম দুজনে। আমার দিকে চেয়ে খ্যাঁচ করে বিশ্রী একটা হাসি হেসে নাড়ুগোপাল বলল, 'ভালো ছেলে হয়ে ক্লাসের মধ্যে অমন হাসা হচ্ছিল কেন?'
কথাটা শুনে আমার গা-পিত্তি জ্বলে গেল। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম।
'আমার উপর রাগ করলি ভাই? এই নে খা।' পকেট থেকে একটা হজমিগুলি বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিল সে।
আমি মাথা নেড়ে বললাম, 'খাব না। স্যার দেখলে বকবেন।'
'না খেলে আমার কী? তোরই ক্ষতি।' আর কথা না বাড়িয়ে দুটো হজমিগুলি মুখে পুরে দিয়ে নাড়ুগোপাল আয়েশ করে চিবোতে লাগল।
আমার চেহারাটা গোলগাল টাইপের। দেহের কসরতে একেবারেই দড় নই। প্রতিবছর খেলার পরীক্ষায় কম নম্বর পাই। হাঁটুর উপর ভর দিয়ে খাড়া হয়ে থাকা আমার কাছে মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। সামনে বা পাশে হুড়মুড়িয়ে যাতে না পড়ি সেজন্য আমাকে এদিক-ওদিক নড়ে সমানে ব্যালান্স করতে হচ্ছে।
'অমন লাউডগার মতো দুলছিস কেন? বুঝেছি। অভ্যাস নেই তো, নির্ঘাত হাঁটু টনটন করছে।' এই বলে মাঝখান থেকে চেরা ক্যাম্বিস বলের দুটো টুকরো পকেট থেকে বের করে সে আমায় বলল, 'এ দুটো দু-হাঁটুর নীচে চালান করে দে। তাহলে হাঁটু ব্যথা করবে না। মাঝেমধ্যেই নিলডাউন হতে হয় বলে আমি এগুলো পকেটে রাখি।'
আমি রাগ দেখিয়ে বললাম, 'আমার চাই না এসব।'
'বেশ, তাহলে কষ্ট পা গে যা। এই জন্যই লোকে বলে কারও ভালো করতে নেই।' ক্যাম্বিস বলের টুকরোদুটো নিজের দুই হাঁটুর নীচে চালান করে দিল নাড়ুগোপাল। আমি মনে মনে ভাবলাম, বাঃ! এ তো বেড়ে বুদ্ধি! ক্যাম্বিস বলের টুকরো দিয়ে দিব্যি হাঁটুর প্যাড বানিয়ে নিয়েছে।
শাস্তি পেয়ে আমার মুখটা বোধহয় একটু কালচে মেরে গিয়েছে। নাড়ুগোপাল বলল, 'মুখটাকে অমন লোডশেডিং করে রেখেছিস কেন? দুঃখ হয়েছে? তবে কী জানিস সব কিছুরই ভালোমন্দ আছে। আমার ঠাকুরদা তো কোবরেজ। তিনি বলেন, নিলডাউন হয়ে থাকা ভালো।'
নাড়ুগোপাল মহাগুলবাজ। আমি বললাম, 'তোর ঠাকুরদা আবার কবিরাজ হলেন কবে? একদিন যে বলছিলি তিনি মিলিটারিতে চাকরি করতেন?'
'এই তোর বুদ্ধিশুদ্ধি? মিলিটারিদের কোবরেজি শিখতে হয়। তা জানিস না? যুদ্ধ হয় বনে জঙ্গলে পাহাড়ে গুহায়। সেখানে ডাক্তার-বদ্যি কোথায় পাবি? হাত-পা কেটেছড়ে গেলে শিকড়বাকড়, লতাপাতাই ভরসা। পাহাড়ে জঙ্গলে কত আশ্চর্য লতাপাতা পাওয়া যায় জানিস? তা দিয়ে ওষুধ বানিয়ে আমার ঠাকুরদা কাটা হাত-পা জুড়ে দিতে পারেন। এ খবর রাখিস?'
আমি আর কথা বাড়ালাম না। নাড়ুগোপাল কথার তুবড়ি। বিশেষ করে আজগুবি কথায় তার জুড়ি মেলা ভার।
সে ফের বলল, 'নিলডাউন হল একপ্রকারের যোগাসন। দাদু বলেন ওতে হজম ভালো হয়। আমার বাবা তো পেটরোগা মানুষ। তাই আমার ঠাকুরদা এখনও রোজই বাবাকে ঘণ্টাদুয়েক নিলডাউন করে রাখেন।'
আমি মনে মনে বললাম, যতসব বাজে কথা। বাচাল কোথাকার।
খানিক বাদে সিক্সের ছেলেরা হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এল। ওদের খেলার ক্লাস। আমার ভীষণ লজ্জা করতে লাগল। আমি সেভেনে পড়ি। নীচু ক্লাসের ছেলেরা আমাকে বেশ সমীহ করে। অনেকে টিফিনের সময় অঙ্ক বুঝতে আসে। এদের সামনে নিলডাউন হয়ে থাকা মানে বেইজ্জতির একশেষ। দু-একটা ছেলে আমার দিকে চেয়ে ফিক করে হেসেও ফেলল। মনে হল ঠাস করে একটা চড় কসিয়ে দিই। গুরু-লঘু জ্ঞান নেই।
সিক্সে পড়ে শুভজিৎ, আমাদের পাড়াতেই থাকে। আমাদের বাড়িতে ভালোই যাওয়া আসা করে। সে দু-একজনকে ডেকে বলল, 'ওরে দেখ কাণ্ড। সুতীর্থদা নিলডাউন।' অনেকেই উঁকিঝুঁকি মেরে আমাকে দেখতে লাগল।
মাথা নীচু করে রইলাম। নাড়ুগোপালের উপর ভয়ানক রাগ হতে লাগল। চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এসে গাল বেয়ে গড়িয়ে গেল। নাড়ুগোপাল শুধোল, 'কপোল কি সত্যিই নয়ন জলে ভাসে? কপোল মানে কী রে?'
আমি জবাব দিলাম না। তবে এ প্রশ্নের উত্তর নাড়ুগোপাল একদিন অন্তর থেকে উপলব্ধি করেছিল। সে অনেক পরের কথা।
ইস্কুলের আমবাগানে একটা মোটা গাছকে উইকেট বানিয়ে আমরা ক্রিকেট খেলতাম। একবার বল আটকে গেল গাছের ডালে। বেশ উঁচু ডাল। আমরা অনেকক্ষণ ধরে ঢিল ছুড়ে গাছ থেকে বল পাড়ার চেষ্টা করে চলেছি। কিছুতেই লক্ষ্যভেদ করতে পারছি না।
নাড়ুগোপাল কাছেই একটা গাছের তলায় বসে গল্পের বই পড়ছিল। আমাদের ঢিল ছুড়তে দেখে হঠাৎ বইটই ফেলে উঠে এসে বলল, 'সর সর, এ তোদের কম্ম নয়। আমি বল পেড়ে দিচ্ছি।' বলেই একটা বড়সড় সাইজের ইটের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে দুম করে ছুড়ে দিল।
সেই ইটের টুকরো বল ফসকে গাছ ভেদ করে পড়বি তো পড় একেবারে হেডস্যারের কোয়ার্টারে গিয়ে পড়ল। ঝনঝন শব্দে জানালার কাচ ভাঙল একখানা। 'কোন বাঁদর রে' বলে হেডস্যার গিন্নি ঠ্যাঙা হাতে বেরিয়ে এলেন। পিছনে হেডস্যার। তিনি টিফিনের সময় মধ্যাহ্নভোজন সারতে এসেছিলেন বাড়িতে।
নাড়ুগোপাল নিমেষের মধ্যে পাঁচিল টপকে পালাল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য ধরা পড়লাম আমরা। হেডস্যারের কড়া জেরার মুখে সত্যি কথা বলতে হল। বল পাড়ার জন্য ঢিল ছুড়েছিল নারায়ণ। সত্যি বললেও কয়েক ঘা করে বেত জুটল আমাদের কপালে।
এবারে নারায়ণের গার্জিয়ান কল হল। নারায়ণের বাবা বড় চাকরি করতেন। জেলা কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি এসে হেডস্যারের সামনে দাঁড়িয়ে জোড়হাত করে বললেন, 'ছেলেটার জ্বালায় একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেলাম মাস্টারমশায়। কম ঠ্যাঙানি খায় বাড়িতে? কিন্তু কিছুতেই হেলদোল নেই। লেখাপড়া একদম করে না। এবারে পাশ করবে কিনা সন্দেহ। পিটিয়ে একেবারে পাট করে দিন মাস্টারমশায়। দেখুন না সিধে করতে পারেন কিনা, আমি আপনাদের ভরসাতেই রয়েছি।'
স্বয়ং জেলা কোর্টের ম্যাজিস্ট্রেট বলে কথা। যাঁর এজলাসে দাঁড়িয়ে লোকে হুজুর বলে মাফ চায়, যার একটা আদেশে লোকের জেল, জরিমানা, খালাস হয়, তিনি ছেলের জন্য মানসম্মান খুইয়ে এভাবে করজোড়ে দাঁড়িয়ে আছেন দেখে হেডস্যার সংকুচিত হয়ে বললেন, 'ঠিক আছে তরণীবাবু আপনি চিন্তা করবেন না, আমরা দেখছি। বুদ্ধিশুদ্ধি তো ওর মাথায় কম নেই। বেয়াড়াপনাটা বড্ড বেশি এই যা।'
কিছুদিন পরে খবর এল আমাদের ইস্কুলে ইনস্পেকশনে আসবেন ডিসট্রিক্ট স্কুল ইনস্পেকটর তিরুপতি সমাদ্দার। মাস্টারমশায়দের মুখে শুনেছি তিনি নাকি খুব কড়া লোক। ছোট ছেলেদের কী করে লেখাপড়া শেখাতে হয়, এ নিয়ে নাকি বিদেশ থেকে লেখাপড়া করে এসেছেন। স্কুলের কাজকর্মে সামান্য বিচ্যুতি দেখলে তিনি বিশ্রী ভাষায় কড়াকড়া রিপোর্ট লিখে দেন। শিক্ষকদের মানসম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ে যায়।
হেডস্যার বললেন, 'তোরা সব মন দিয়ে পড়া মুখস্থ কর। স্কুলে লেখাপড়া কেমন হয় সেটা পরখ করার জন্য তিরুপতিবাবু কিন্তু পড়া ধরবেনই। তোরা না পারলে ইস্কুলের বেইজ্জতি। আমাদের সকলের বেইজ্জতি।'
নারায়ণকে ডেকে তার পিঠে হাত বুলিয়ে প্রকৃতিবাবু বললেন,'বাবা নারায়ণ, এই বেলা অন্তত একটু লেখাপড়া করে নে। বুদ্ধি তো তোর যথেষ্টই আছে, মন দিলেই হবে। আমাদের সবাইকে যেন বেইজ্জত করিসনে।'
নাড়ুগোপাল প্রত্যয়ের সঙ্গে বলল, 'ভাববেন না স্যার। পড়া আমার তৈরিই আছে।'
নির্দিষ্ট দিনে তিরুপতি সমাদ্দার এসে পৌঁছলেন ইস্কুলে। গাড়ি থেকে নামতে বেশ কসরত করতে হল তাকে। বিরাট চেহারা। পেল্লায় ভুঁড়ি। ছোট মাথাটা যেন সরাসরি কাঁধের উপর বসানো। গ্রীবাদেশ প্রায় অদৃশ্য।
হেডস্যার শশব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তিনি ও প্রকৃতিবাবু গোটা স্কুল ঘুরে ঘুরে দেখালেন তিরুপতি সমাদ্দারকে। গত একসপ্তাহ ধরে স্কুল সাফসুতরো করা হয়েছে। কোথাও ঝুল, কালি, ময়লা নেই। ফুলের বাগানে একটাও আগাছা নেই। সুন্দর ফুল ফুটে আছে। ক্লাসে ঢোকার সময় গুড ডে স্যার বলে ছেলেরা সব অভিবাদন জানাল। তিরুপতি সমাদ্দার দুয়েকজনকে নামধাম জিগ্যেস করলেন। ছেলেরা সুন্দর ভাবে উত্তর দিল। সব কিছুই সুচারুভাবে চলল। কোনো গোলমাল নেই।
স্কুল সম্বন্ধে দুপাশ থেকে হেডস্যার ও প্রকৃতিবাবু অনর্গল ভালো ভালো কথা বলতে বলতে গলদঘর্ম হয়ে গেলেন। তিরুপতিবাবু বড় একটা কথা বললেন না। কথার পৃষ্ঠে মাথা দুলিয়ে গম্ভীরভাবে কেবল হুম হুম শব্দ করে গেলেন। স্কুল ঘোরা শেষ হয়ে গেলে তিরুপতিবাবুকে সঙ্গে নিয়ে হেডস্যার নিজের ঘরে ঢুকলেন। প্রকৃতিবাবু স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার। তিনিও হেডস্যারের ঘরে গেলেন।
ততক্ষণে হেডস্যারের খাস বেয়ারা শিউচরণদা টেবিলের উপর খাবারের প্লেট সাজিয়ে ফেলেছে। সাত-আট রকমের সন্দেশ, রসগোল্লা, পান্তুয়া। আমাদের স্কুলের পাশেই রতন মোদকের মিষ্টির দোকানের জেলাজোড়া নাম। সেখান থেকেই ওসব আনা।
হাঁটাহাঁটিতে বেশ পরিশ্রম হয়েছে। ঘরে ঢুকেই হেডস্যারের চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ে তিরুপতিবাবু বললেন, 'শুধু বাইরের চাকচিক্য দেখলে তো চলবে না, স্কুলে লেখাপড়া কেমন হয়?'
প্রকৃতিবাবু বললেন, 'ভালোই। এ বছরে আশি ভাগ ছেলে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করেছে।'
'ছেলেরা বিজ্ঞান কেমন শিখছে?'
'ভালোই।' বললেন হেডস্যার।
'বেশ, একটু পরখ করে দেখি।' একটা সন্দেশ মুখে ফেলে তিরুপতি সমাদ্দার বললেন, 'বেশ খেতে।'
প্রকৃতিবাবু হাত কছলে বললেন, 'রতনের দোকানের জিনিস। খাঁটি ছানা।'
'ছেলেদের বিজ্ঞান শিক্ষাটা এমন খাঁটি হচ্ছে তো এখানে?'
'অবশ্যই স্যার।'
'এখানেই কি ডেকে দেব ছেলেদের?' প্রশ্ন করলেন হেডস্যার।
'উহু' বলে মুখে একটা রসগোল্লা ফেললেন তিরুপতিবাবু। চোখ মুদে রসগোল্লাটাকে মুখের মধ্যে একটু কায়দা করে নিয়ে বললেন, 'তোতা পাখির মতো শেখানো পড়ানো দু-চারটে ভালো ছাত্রকে আমার সামনে এনে হাজির করাবেন, তা হবে না। এই যে হাজিরার খাতায় যাদের নামের পাশে দাগ দিয়ে দিচ্ছি তাদের ডেকে দিন।'
তালিকা দেখে প্রমাদ গুনলেন প্রকৃতিবাবু ও হেডস্যার। টিক দেওয়া নামগুলোর মধ্যে নারায়ণের নামও আছে। বাছাই করা ছেলেদের হেডস্যারের ঘরের থেকে একটু দূরে একটা ঘরে বসানো হল। এই দলের মধ্যে আমিও আছি। বরাবরই আমার মৌখিক পরীক্ষা দিতে গেলে বুক ধড়াস ধড়াস করে। তার উপরে এ আবার জাঁদরেল স্কুল ইনস্পেকটর তিরুপতি সমাদ্দারের কাছে মৌখিক পরীক্ষা দেওয়া। আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল।
নাড়ুগোপালকে জিগ্যেস করলাম, 'তোর বুক ঢিব ঢিব করছে না?'
'ভিতুর ডিম কোথাকার। তিরুপতিবাবু কি খেয়ে ফেলবেন? যা জিজ্ঞেস করবেন সোজাসাপটা জবাব দিবি। মনে রাখিস আমাদের উপর কিন্তু ইস্কুলের প্রেস্টিজ নির্ভর করছে।'
প্রথমেই ডাক পড়ল নারায়ণের। শিউচরণদা এসে তাকে ডেকে নিয়ে গেল। এর পরে নাকি আমার ডাক পড়বে। আমরা যে ঘরে বসে আছি সেটা বারান্দার বাঁক পেরিয়ে। এ ঘর থেকে হেডস্যারের ঘর দেখা যায় না। বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেল। উত্তেজনার বশে ঘর থেকে বেরিয়ে হেডস্যারের ঘরের দিকে উঁকি দিতে গিয়ে দেখি শিউচরণদা হন্তদন্ত হয়ে টিচার্স রুমের দিকে দৌড়চ্ছে। হেডস্যার দ্রুত একবার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে শিউচরণদার উদ্দেশে 'একখানা হাতপাখা নিয়ে আয়' বলেই দ্রুত ঘরে ঢুকে গেলেন।
আমাদের ঘরে পাখা ঘুরছে। লোডশেডিং-এর ব্যাপার নয়। তিরুপতি সমাদ্দার বেজায় মোটাসোটা মানুষ। হয়তো ফ্যানের হাওয়া তার জন্য যথেষ্ট নয়। হাতপাখা লাগতেই পারে।
খানিক বাদে দেখলাম শিউচরণদা দু-খানা তালপাতার পাখা হাতে নিয়ে দৌড়চ্ছে। তার পিছন পিছন আরও কয়েকজন মাস্টারমশায় শশব্যস্ত হয়ে হনহন করে চললেন হেডস্যারের ঘরের দিকে।
ব্যাপারটা যে কী কিছুই বুঝতে পারছি না। এদিকে নারায়ণের দেখা নেই। তার পরীক্ষা কি এখনও শেষ হয়নি? না হওয়ারই কথা। নাড়ুগোপালের পরীক্ষা শেষ হলে তো আমার ডাক পড়ত।
'কই? কোথায়? কোনদিকে?' কথাটা শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে হেডস্যারের ঘরের উদ্দেশে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে চলেছেন এ তল্লাটের বিখ্যাত ডাক্তার শশী হালদার। আমাদের স্কুলের পাশেই তার চেম্বার। ডাক্তারবাবুর পিছনে চামড়ার ব্যাগ হাতে হনহনিয়ে চলেছে তার কম্পাউন্ডার দুলালকাকু। ডাক্তারবাবুকে নিয়ে হেডস্যারের ঘরের দিকে যেতে যেতে গেমটিচার রাখহরিবাবু বললেন, 'এইচ এমের ঘরে।'
এইচ এমের ঘর মানে হেডমাস্টারের ঘরের কথা বললেন রাখহরিবাবু। এবার ভাবনায় পড়লাম। হঠাৎ হেডস্যারের ঘরে ডাক্তারের দরকার পড়ল কেন, নাড়ুগোপাল কি পড়া না পেরে মারধোর খেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেল?
কী ঘটেছে জানার জন্য আমি আর হিরন্ময় হেডস্যারের ঘরের দিকে দুপা এগোতেই হেডস্যারের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃতিবাবু পেল্লায় এক ধমক দিলেন, 'তোদের আবার এদিকে কী চাই? ঘরে চুপ করে বোস।' ধমক খেয়ে আমরা আবার আমাদের ঘরের মধ্যে সেঁধিয়ে গেলাম।
খানিকবাদে শশীডাক্তার ফিরে গেলেন। আমাদের ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় রাখহরিবাবুকে বলতে শুনলাম, 'না, না, চিন্তার কিছু নেই। সাডেন শকে এমন হতে পারে।'
বাপরে! শক? তার মানে তো ইলেকট্রিকের ব্যাপার। শক লাগল কার? নির্ঘাৎ শক খেয়ে মূর্ছা গিয়েছে নাড়ুগোপাল। শক লাগতেই পারে। হেডস্যারের ঘরে রয়েছে নানারকম বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির মডেল। সারাদিন তিনি এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। নাড়ুগোপালের তো আক্কেল বলে কিছু নেই, হয়তো না বুঝে দুম করে কোনো যন্ত্রপাতিতে হাত দিয়ে শক খেয়েছে।
তবে যাই হোক, তেমন বড় বিপদ কিছু হয়নি। শশীডাক্তার তো বললেন, চিন্তার কিছু নেই। আমি মনে মনে প্রস্তুত হতে লাগলাম এবার নিশ্চয়ই আমার ডাক পড়বে।
না, শেষ পর্যন্ত আমার ডাক পড়ল না। একটু পরে প্রকৃতিবাবু আমাদের ঘরে এসে বললেন, 'তিরুপতি সমাদ্দার আজ আর কারও পরীক্ষা নেবেন না। একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সব বাড়ি চলে যা।'
আমাদের নাড়ুগোপাল নয়, তিরুপতিবাবু শক খেয়েছেন তাহলে। কিন্তু নাড়ুগোপাল গেল কোথায়? গোটা স্কুল জুড়ে তাকে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। শেষে স্কুল থেকে বেরোনোর সময় দেখি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে নাড়ুগোপাল একমনে আলুকাবলি খাচ্ছে।
জিগ্যেস করলাম, 'কী হল বল তো?'
শালপাতা চাটতে চাটতে নাড়ুগোপাল বলল, 'কোথায় কী হল?'
'তুই ঘরে ঢুকলি, আর তিরুপতিবাবু শক খেলেন?'
পাতাটা ফেলে দিয়ে নাড়ুগোপাল বলল, 'শক নয় ভিরমি খেয়েছেন।'
হিরন্ময় জিগ্যেস করল, 'হঠাৎ ভিরমি খেলেন কেন?'
নাড়ুগোপাল খেঁকিয়ে উঠল, 'সেটা কি আমার দোষ? শ্বাসনালীতে সন্দেশ সিধোলে তিরুপতিবাবু কেন রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারও ভিরমি খাবে।'
'তা তোর পরীক্ষা কেমন হল?' প্রশ্ন করলাম আমি।
'পরীক্ষা আর হল কোথায়? মাত্র একখানা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পরেই তো হুড়োহুড়ি লেগে গেল।'
'কী প্রশ্ন করেছিলেন তোকে?'
'খুব সোজা প্রশ্ন। কারেন্ট কী?'
'ঠিকঠাক বলতে পেরেছিলি?'
ঠোঁট উলটে নাড়ুগোপাল বলল, 'না পারার কী আছে? বললাম, যাতে হাত দিলে গা-হাত-পা ঝিনঝিন করে ওঠে সেটাই কারেন্ট।'
আমি চোখ কপালে তুলে বললাম, 'এই কথা বললি?'
কোমরে হাত রেখে নাড়ুগোপাল বলল, 'কেন ভুল কী বলেছি? শক খেয়েছিস কখনো? আমাকে কারেন্টের সংজ্ঞা জিগ্যেস করে রতন মোদকের বিখ্যাত জলভরাটা মুখে ফেলেছিলেন তিরুপতিবাবু। আমার কথা শুনে আমার দিকে গোল্লা চোখে এমন ভাবে তাকালেন, যেন আমি জলভরার ভাগ চেয়েছি।'
আমি রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করলাম, 'তারপর?'
'তারপর আর কী? তিরুপতিবাবু বিষম খেলেন। ছেতরে যাওয়া সন্দেশের খানিকটা ওনার মুখ থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃতিস্যারের মাথায় পড়ল। আর তিরুপতিবাবু চোখ উলটে গোঁ-গোঁ করতে লাগলেন। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করতে লাগল, সন্দেশ মাথায় নিয়ে প্রকৃতিবাবু খাতা দিয়ে বাতাস করতে লাগলেন। আমি ঘর থেকে সুট করে হাওয়া হয়ে গেলাম।'
এই বলে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বাড়ির দিকে হনহন করে হাঁটা দিল নাড়ুগোপাল। তাহলে এই হল ব্যাপার, নাড়ুগোপালের বিজ্ঞানের জ্ঞান পরখ করতে গিয়ে তার দেওয়া কারেন্টের সংজ্ঞা শুনে বিষম খেয়ে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছিলেন তিরুপতি সমাদ্দার।
এখানে গল্পটা শেষ করলে নাড়ুগোপালের প্রতি অবিচার করা হবে। ক্লাস নাইনে ওঠার পর নাড়ুগোপাল একদম বদলে গেল। অমন দুরন্ত ছেলে কোন মন্ত্রবলে যে একেবারে শান্ত হয়ে গেল তা জানি না। লেখাপড়ায় খুব মন হল তার। লাস্ট বেঞ্চের ছেলে ফার্স্ট বয় হয়ে গেল। তারপর সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়ে সে মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করে বসল। আমাদের স্কুলের আর কেউ অতীতে কখনো এই কৃতিত্বের অধিকারী হতে পারেনি।
মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরোনোর পর নাড়ুগোপালকে কাঁধে তুলে প্রকৃতিবাবু আনন্দে ধেই ধেই করে নেচেছিলেন। নারায়ণ চৌধুরী মানে আমাদের নাড়ুগোপাল এখন মস্ত একজন সায়েন্টিস্ট। শুনেছি তড়িৎ-বিজ্ঞান নিয়েই তার গবেষণা।
রিটায়ার করার পর চোখের অসুখে পড়লেন প্রকৃতিবাবু। দুচোখে সব ঝাপসা দেখতে লাগলেন। সেই ঝাপসা দৃশ্যও ক্রমশ কালো হয়ে আসতে লাগল। ডাক্তার বলল অপারেশন করলে চোখ হয়তো সারবে। তবে এ চিকিৎসায় এদেশে সাফল্যের হার কম। বিদেশে গেলে সুবিধে হতে পারে। তবে অনেক খরচের ব্যাপার। অত টাকা কোথায় প্রকৃতিবাবুর? চোখের আশা তিনি একপ্রকার ছেড়েই দিলেন।
আমারই ফেসবুকের এক পোস্ট থেকে এ কথা জানতে পেরে বিদেশ থেকে ছুটে এল নাড়ুগোপাল। প্রকৃতিবাবুর প্রখর আত্মসম্মানবোধ। ছাত্রের কাছ থেকে সাহায্য নেবেন না। নাড়ুগোপাল বলল, 'এভাবে ভাবছেন কেন স্যার? গুরুদক্ষিণার রেওয়াজ তো আমাদের দেশে সেই প্রাচীন কাল থেকেই আছে। আমি তো বখে যাওয়া ছেলে ছিলাম। আপনাদের বেতই তো শেষমেষ সোজা করল আমাকে।'
প্রকৃতিবাবুর কোনো ওজর আপত্তি নাড়ুগোপাল শুনল না। একরকম জোর করে স্যারকে নিয়ে গেল বিদেশে। চিকিৎসা হল। নাড়ুগোপাল সব খরচ বহন করল।
অপারেশনের পর ডাক্তার যখন চোখের কালো পটি খুলে দিল, চোখের সামনে নাড়ুগোপালকে দেখে প্রকৃতিবাবু বললেন, 'তুই সেই নারায়ণ?'
'চিনতে পারছেন না স্যার?'
'বাপরে! লম্বায়, চওড়ায়, বিদ্যায়, বুদ্ধিতে যে অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস। কিন্তু ব্যাপার কী বল তো? চোখে যে চশমা ছাড়াই দিব্যি দেখছি। আমার মরা চোখ খুবলে নিয়ে নতুন চোখ বসিয়ে দিল নাকি? সাহেবদের ব্যাপার- স্যাপারই আলাদা। অবশ্য তুই ছুটে না এলে কিছুই হতো না রে নারায়ণ। পৃথিবীর সব রং আমার কাছে কালো হয়ে যেত।'
নাড়ুগোপালের চোখের কোনায় জল চিকচিক করে উঠল। প্রকৃতিবাবুর চোখ দিয়েও জল বেরিয়ে এসে গড়িয়ে গেল কুচকে যাওয়া দুই গালের উপর দিয়ে। মুখে হাসি এনে ধরা গলায় বললেন, 'কপোল যে সত্যিই নয়ন জলে ভেসে যায় রে নারায়ণ।'
স্যারের হাতদুটো ধরে নারায়ণ বলল, 'কথাটার আসল অর্থ এতদিনে বুঝলাম স্যার।' প্রকৃতিবাবুর হাতদুটো ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল নারায়ণ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন