শান্তনু বসু

অফিসের নতুন বড়সাহেব রাতুল সরকার অবাক হয়ে ভুবনবাবুর দিকে চেয়ে বললেন, 'আপনার স্মার্ট ফোন নেই? বেঁচে আছেন কী করে মশায়?'
ভুবনবাবু মাথা চুলকে বললেন, 'কেনা হয়নি স্যার।'
রাতুল সরকার বিরক্ত হয়ে ধমকের সুরে বললেন, 'কেনেননি কেন? এ তো আর মার্সিডিজ গাড়ি নয়। ক'টাকাই বা দাম? মাইনে তো কম পান না।'
'সমস্যাটা টাকার নয় স্যার। মনের।'
ফাইল সই করতে করতে চোখ তুলে রাতুল সরকার বললেন, 'মনের? মানে?'
'আমার কেমন যেন নার্ভাস লাগে। আসলে মেশিনের ব্যাপারে আমি একটু আনাড়ি। ট্রানজিস্টার, টর্চলাইট, ছাতা ও হাতঘড়ি ছাড়া কোনও যন্ত্রপাতি কোনওদিন ব্যবহার করিনি। তেমন প্রয়োজনও হয়নি।'
'আপনি তো আশ্চর্য লোক!'
কপালে এসে পড়া মাথার সামান্য কয়েকগাছি চুলের একগাছি আঙুল দিয়ে পিছন দিকে চালান করে ভুবনবাবু বললেন, 'তবে আপনি যখন বলছেন, এবারে ঠিক কিনে ফেলব।'
এই সব কথা যখন হচ্ছিল, তখন বড়সাহেবের ঘরে ফাইল সই করানোর জন্য ঢুকেছিল অফিসের অ্যাকাউনট্যান্ট, বিপিন। বছর দুয়েক হল চাকরিতে ঢুকেছে।
বড়সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে এসেই সে বলল, 'আপনি পুরনো দিনের লোক, মোবাইল ফোন ছাড়াই তো দিব্যি চালিয়ে দিলেন চাকরি জীবনটা। শেষ বয়সে আর নতুন করে বিপদ ডেকে আনবেন না ভুবনদা। ফোন কিনলে রাতুল সরকার আপনার লাইফ হেল করে দেবে।'
ভুবনবাবু শুকনো মুখে বললেন, 'কীরকম?'
'রাস্তায়, বাথরুমে, ব্যালকনিতে, সিনেমা হলে সব জায়গায় ঝনঝন করে বাজবে রাতুল সরকার। আপনার প্রাইভেসি গন ফট। ফোন না ধরেও উপায় নেই, কল মিস করলে ট্যাঁকট্যাঁক করে কথা শুনিয়ে দেবে। ঠ্যালা বুঝবেন তখন।'
দিন দুই পরে অফিসে গিয়েই ভুবনবাবু শুনলেন, বড়সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন।
'দেরি হল কেন?' ভুবনবাবু ঘরে ঢুকতেই প্রশ্ন করলেন রাতুল সরকার।
'দেরি কোথায় স্যার? সোয়া দশটাতেই তো ঢুকেছি।'
'সকাল ন'টায় মিটিং ছিল জানতেন না?'
'কোনও নোটিশ তো পাইনি।'
চেয়ারের গায়ে নবাবের মতো হেলান দিয়ে রাতুল সরকার বললেন, 'হোয়াটস অ্যাপ মেসেজ দেখেননি?'
'হোয়াটস অ্যাপ' শব্দবন্ধটি সহকর্মীদের মুখে শুনেছেন ভুবনবাবু। এটুকু জানেন যে, এর মাধ্যমে মোবাইল ফোনে মেসেজ আদানপ্রদান হয়। ভুবনবাবু বললেন, 'বলেছিলাম তো স্যার আমার মোবাইল ফোন নেই।'
'এটা ফাঁকি মারার মস্ত একটা সুবিধা। এখানে ফাঁকিবাজি চলবে না।' গম্ভীর গলায় বললেন রাতুল সরকার।
কথাটা মনে লাগল, বিমর্ষ মুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন ভুবনবাবু। তিনি হলেন সেই বিরল প্রজাতির লোক, যাঁরা এখনও ধুতি-পাঞ্জাবি ও পাম্পশু পরে অফিসে আসেন, ইংরেজিতে নিখুঁত ড্রাফট করতে পারেন, অবসর সময়ে মোটা মোটা বাংলা উপন্যাস পড়েন, ট্রানজিস্টারে গান শোনেন।
সে যাই হোক না কেন, তিনি কোনওমতেই ফাঁকিবাজ নন। নিজের কাজ ও দায়িত্ব সম্বন্ধে খুব সচেতন। অফিসে আসতে তার লেট হয় না, ছুটিও বড় একটা নেন না। ফাঁকিবাজি বিষয়টাকে তিনি নিজেও অপছন্দ করেন।
ভুবনবাবুকে চুপ করে থাকতে দেখে রাতুল সরকার বললেন, 'আপনাদের সমস্যা কী জানেন, আপনারা মনে করেন অফিস মানে দশটা-পাঁচটা। হাইটেক দুনিয়ায় এই কনসেপ্ট অচল। এখন অফিস হল টোয়েন্টি ফোর ইনটু সেভেন। আমি যখন খুশি মিটিং ডাকব। ফোনে মেসেজ করেই ডাকব। আপনাকে সব সময় প্রস্তুত থাকতে হবে। ঠিক সময়ে হাজির হতে হবে। মোবাইল ফোন না থাকলে আপনি কী করে আমার মেসেজ ফলো করবেন? ইমিডিয়েট ফোন কিনে নিন। মাসে তিনশো টাকা রিইমবারসমেন্ট পাবেন। মনে রাখবেন আপনার রিটায়ারমেন্ট সামনে।'
বাকিটা আর বললেন না রাতুল সরকার। না-বলা কথাটা যেন স্পষ্ট শুনতে পেলেন ভুবনবাবু। 'আমার কথা না শুনলে এই অফিস থেকে অবসরজনিত পাওনাগন্ডা বুঝে নিতে আপনার কিন্তু অসুবিধা হবে।'
মুখ অন্ধকার করে বড়সাহেবের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন ভুবনবাবু। পাওনাগন্ডা নিয়ে তিনি অতটা চিন্তিত নন। ওসব পেতে দেরি হলেও তার ক্ষতি নেই। একা মানুষ তিনি। বিয়ে-থা করেননি। সাংসারিক দায়দায়িত্ব, বাধ্যবাধকতা তেমন কিছু নেই। জমানো টাকা যথেষ্টই আছে।
ভুবনবাবুর খারাপ লাগল 'ফাঁকিবাজি' শব্দটায়। কাজের লোক বলে আগের সাহেবরা তাঁকে দরাজ সার্টিফিকেট দিয়ে গিয়েছেন। সামান্য একটা স্মার্ট ফোন না থাকার জন্য চাকরির শেষ প্রহরে এসে তাঁর উপরে 'ফাঁকিবাজ' তকমা চেপে গেল? এ ভাবে অপমানিত হতে হল ?
সেদিনই অফিস থেকে ফেরার পথে বিপিনকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে ভুবনবাবু একটা মোবাইল ফোন কিনে ফেললেন। ফোনটা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে একটা খুশির হাসি হেসে ভুবনবাবু বললেন, 'যাই বলো, বেশ স্মার্ট দেখতে।'
বিপিন বলল, 'এই জন্যই তো এর নাম স্মার্ট ফোন। এ যুগের জপযন্ত্র।'
আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এসব ব্যাগেই ছিল। ওই দোকান থেকেই সিম জোগাড় হয়ে গেল। রীতিমতো চালু ফোন নিয়ে বাড়ি এলেন ভুবনবাবু।
বাড়ি ফিরেই তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে নিয়ে ফোন হাতে করে খাটের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন। বিপিন কয়েকটা নম্বর সেভ করে দিয়েছিল। ভাগনে বান্টিকে ফোন করতে গিয়ে ভুবনবাবু দেখলেন, ফোনবুক থেকে কী করে নম্বর সিলেক্ট করতে হয়, তা ভুলে মেরে দিয়েছেন। আঙুলের অসতর্ক চাপে স্পিকার অন হয়ে গিয়েছিল। বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ রিং টোন শুনতে পেয়ে চমকে গিয়ে ভুবনবাবু দেখলেন, একটা অচেনা নম্বরে ফোন করে বসেছেন। ফোনটা কীভাবে কাটবেন, দিশা পেলেন না।
একটি মেয়ে ফোন ধরে খুব স্মার্ট গলায় বলল, 'হ্যালো?'
ভুবনবাবু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'না মানে, ইয়ে, হ্যালো?'
মেয়েটি ঝাঁঝের সঙ্গে রিনরিনে গলায় বলল, 'আবার আপনি বিরক্ত করছেন? আপনাকে না নিষেধ করে দিয়েছিলাম। এবার কিন্তু আমি পুলিশে খবর দেব।' বলে খট করে ফোন কেটে দিল মেয়েটি।
লজ্জায় ভুবনবাবুর চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। আর ফোন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার সাহস পেলেন না। বান্টিকে ফোন করা হল না। ফোন শিয়রে রেখে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন।
পরের দিন সকালে অফিসে বেরোনোর জন্য দরজা খুলতেই পুলিশ দেখে ভুবনবাবুর পিলে চমকে গেল। বুক ধুকপুক করে উঠল। নিশ্চয়ই কালকে রাতের ব্যাপারটা নিয়ে মেয়েটি সত্যি সত্যিই অভিযোগ করেছে থানায়। পুলিশ তাঁকে অ্যারেস্ট করতে এসেছে। কী গেরো। ফোনের জন্য লকআপে যেতে হবে। ছি ছি, কী লজ্জা! এর পরে পাড়ায় কী করে মুখ দেখাবেন ভুবনবাবু? অফিসের সহকর্মীরা তাঁকে সজ্জন লোক বলে জানে, এবারে ঘেন্নায় মুখ ফিরিয়ে নেবে।
মোটা গোঁফওয়ালা পুলিস ইন্সপেক্টর গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, 'আপনিই কি ভুবন রায়?'
ভুবনবাবু শুকনো গলায় বললেন, 'হ্যাঁ।'
'বাড়িতে একা থাকেন?'
'হ্যাঁ।' ভুবনবাবুর হাঁটু কাঁপতে লাগল।
'আপনার ফোন আছে?'
'হ্যাঁ। মোবাইল ফোন। গতকালই কিনেছি।' ভুবনবাবু মরিয়া হয়ে মিনমিনে গলায়, ক্ষীণ স্বরে স্বগতোক্তির মতো বলার চেষ্টা করলেন, 'দেখুন আমি কিন্তু কাল রাতে মানে ইয়ে আমি ইচ্ছে করে, ঠিক মানে আর কী—'
পুলিশ ইন্সপেক্টর ডায়েরিতে কিছু নোট করছিল। এসব কথায় কান দিল না। ভুবনবাবুর হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলল, 'দেখুন আমরা পাড়ার সেইসব লোকজনের তালিকা তৈরি করছি, যারা একা-একা থাকেন। এই কাগজে একটা ফোন নম্বর লেখা আছে। ইদানিং চারিদিকে চোরের প্রকোপ বেড়েছে। কোনও বিপদ হলে শুধু একটা ফোন করে দেবেন। পুলিশ ছুটে আসবে। মনে রাখবেন পুলিশ আপনার বন্ধু।'
হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন ভুবনবাবু। নম্বর লেখা কাগজটা অফিসের ব্যাগে ঢুকিয়ে নিলেন।
অফিসে গিয়ে বিপিনকে বললেন রাতের ঘটনাটা। ভুবনবাবুর কললিস্ট চেক করে হেসে উঠল বিপিন। 'করেছেন কী ভুবনদা? আপনার ফোন চালু হল কি না দেখার জন্য গতকাল ফোনের দোকানের সেলসগার্ল আপনার ফোনে একটা মিসড কল করেছিল, মনে আছে? আপনার ফোনটা ওর নম্বরে চলে গিয়েছিল।'
কথাটা শুনে একহাত লম্বা জিভ কেটে ভুবনবাবু বললেন, 'যাই বলো ভাই, এসব যন্ত্রপাতি বড় বিপজ্জনক।'
কিছুক্ষণ পর বেয়ারা এসে বলল, বড়সাহেব ডাকছেন। রাতুল সরকারের ঘরে ঢুকেই ভুবনবাবু বললেন, 'ফোন কিনে নিয়েছি স্যার।'
'ভেরি গুড। নম্বরটা আমার পিএ-র কাছে দিয়ে যান।'
সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিলেন ভুবনবাবু। ভিড় বাসে ঠাসাঠাসি লোক। ফোনটা বেজে উঠল। রিংটোনে বিদেশি গানের সুর। ভুবনবাবু ফোন কানে দিয়ে বললেন, 'হ্যালো। হ্যালো! হ্যালো!' ওপাশ থেকে কোনও উত্তর নেই।
পাশের থেকে একটা লোক বলল, 'আরে দূর মশায়, কী হেঁড়ে গলায় হ্যালো হ্যালো করছেন? আপনার ফোন বাজেনি, বাজছিল ওনার ফোন।'
ভুবনবাবু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, অল্পবয়স্ক একটা ছেলে মোলায়েম গলায় কারও সঙ্গে কথা বলছে। অপ্রস্তুত হয়ে ভুবনবাবু ফোনটা আবার পাঞ্জাবির পকেটে রেখে দিলেন।
খানিকবাদে আবার ফোন বেজে উঠল। কার ফোন বাজছে সেটা বোঝার জন্য আশেপাশে জুলজুলে চোখে তাকালেন ভুবনবাবু। আগের সেই লোকটিই পাশ থেকে বলল, 'মশায় এবারে আপনার ফোন বাজছে। ফোনটা ধরুন।'
রাতুল সরকারের ফোন কি না কে জানে? তাড়াতাড়ি পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে দিয়ে ভুবনবাবু বললেন, 'হ্যালো, হ্যালো! হ্যালো!' ওদিকে ফোন তখনও বেজে চলেছে। আঙুলের সঞ্চালনের সঙ্গে ফোনের বন্ধুত্ব হয়নি এখনও। স্ক্রিনে আঙুল বুলিয়ে ফোনটা তিনি রিসিভ করেননি।
এক মহিলা সহযাত্রী বিরক্তির সঙ্গে বললেন, 'আরে ফোনটা আগে রিসিভ করুন, তারপরে হ্যালো বলুন। আচ্ছা ইডিয়ট লোক।' কথাটা শুনে বাসের অনেকে হেসে উঠল।
ঘাবড়ে গিয়ে ভুবনবাবু কী করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। স্ক্রিনের উপর দুটো বোতাম ভেসে আছে, একটা লাল ও একটা সবুজ। তিনি লাল বোতামটা টাচ করে আঙুল চালালেন। কলটা কেটে গেল।
ওদিকে ভুবনবাবু ভাবলেন তিনি ফোনটা রিসিভ করেছেন। তিনি হ্যালো, হ্যালো, বলে যেতে লাগলেন। খানিকবাদে কারও সাড়া না পেয়ে তিনি ঝপাত করে ফোনটা পকেটে ভরে ফেললেন। কে ফোন করছিল, সেটা আর দেখা হল না।
বাড়ি ফিরে দেখলেন, রাতুল সরকারের মিসড কল। এখন ফোন করা উচিত হবে কী হবে না, এসব ভাবতে ভাবতেই ফোন বেজে উঠল, স্ক্রিনের উপর ভেসে উঠল, রাতুল সরকার কলিং। এবারে ফোনটা ঠিকই রিসিভ করলেন ভুবনবাবু।
রাতুল সরকার ধমকে উঠলেন, 'ফোন করলে ধরেন না কেন? আমার ফোন রিং হয়ে যাওয়াটা আমি পছন্দ করি না। আর যেন এমন না হয়। কাল সাড়ে ন'টায় চলে আসবেন।' কোনও প্রতিক্রিয়ার আগেই খট করে ফান কেটে দিলেন রাতুল সরকার।
স্নানে ঢুকলেন ভুবনবাবু। আবার ফোন বেজে উঠল। কী মুশকিল! ফের রাতুল সরকার হানা দিল না কি? তড়িঘড়ি গামছা পরে তিনি বাথরুম থেকে তিনি ছুটে বেরিয়ে এলেন। তবু ভালো। ভাগনে বান্টি ফোন করছে।
'বল বান্টি।'
'হাঁপাচ্ছ কেন মামা? ব্যায়াম করছিলে?'
ভুবনবাবু বললেন, 'হ্যাঁ, ওই একটু—'
'দুপুরে একটা কথা বলতে ভুলে গেছিলাম। পরশু মহাজাতি সদনে আমাদের রিক্রিয়েশন ক্লাবের থিয়েটার আছে। পারলে চলে এসো।'
'ঠিক আছে চেষ্টা করে দেখি। তোরা সব ভালো তো?'
বান্টির আমন্ত্রণে মহাজাতি সদনে নাটক দেখতে গিয়ে দ্বিতীয় সারিতে বসলেন ভুবনবাবু। ভাগনে ভালো সিট রেখেছে তার জন্য। নাটক শুরু হওয়ার আগে ঘোষক বলল, আপনাদের মুঠো ফোন নিষ্ক্রিয় করে রাখুন।
নির্দেশটা পালন করতে গিয়ে ফাঁপরে পড়লেন ভুবনবাবু। ফোন নিষ্ক্রিয় করার কৌশল ভুলে গিয়েছেন। একবার ভাবলেন ফোনটা বন্ধ করে দেবেন। কিন্তু রাতুল সরকার যদি ফোন করে বসে? ফোন বন্ধ দেখলে পরে গালিগালাজ করবে। এই বুড়ো বয়সে ছোকরা বড়সাহেবের ধমকধামক বড় প্রেস্টিজে লাগে।
নাটক শুরু হওয়ার দশ মিনিটের মধ্যেই ভুবনবাবুর ফোন গান গেয়ে উঠল। পিছন থেকে এক মহিলা বলে উঠলেন, 'দাদা ফোনটা সাইলেন্ট করুন।'
এবারে দৈব কৃপায় ভুবনবাবু বেইজ্জত হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলেন। ফোনটা নিজে থেকেই কেটে গেল। রাতুল সরকারের ফোন নয় তো? একবার চেক করে দেখা উচিত।
ঘাড়ের পিছন থেকে একজন বলে উঠল, 'দাদা ফোনটা পকেটে রাখুন তো, আলোটা চোখে লাগছে।' ভুবনবাবু তাড়াতাড়ি ফোনটাকে বুক পকেটে রেখে দিলেন। কে ফোন করছিল, দেখা হল না।
খানিকবাদে আবার সেই বেয়াড়া ফোন বেজে উঠল। পিছন থেকে আগের মহিলা এবার ধমকের সুরে বলল, 'কী হল কী দাদা? আচ্ছা অভদ্র লোক তো আপনি! তখন থেকে বলছি ফোন সাইলেন্ট রাখতে। শুনছেন না কেন? এসব অসভ্য লোকের উৎপাতে নাটক দেখারও উপায় নেই। হলের বাইরে গিয়ে ফোনে কথা বলুন।'
হাতের মুঠোয় বাজতে থাকা ফোনটা নিয়ে বেশ কয়েকজনের পা মাড়িয়ে, বেশ কিছু গালাগালি হজম করে হল থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে বেরিয়ে এলেন ভুবনবাবু। অপমানে তার গা-হাত-পা জ্বালা করতে লাগল। মনে হল, হাত থেকে ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিতে পারলে বাঁচেন।
ভুবনবাবুর বই পড়ার নেশা ছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি একমনে বই পড়ে যেতে পারতেন। বাড়িতে তার অনেক বই রয়েছে। এছাড়া তিনি বেশ কয়েকটা লাইব্রেরিরও মেম্বার। তিনি খেয়াল করে দেখলেন, ফোনটা আসার পর থেকে বই পড়া তার মাথায় উঠেছে। দু'পাতা পড়তে না পড়তেই চোখ চলে যাচ্ছে ফোনের দিকে।
কিন্তু সবার কি এমন হয়? এ যুগের ছেলেমেয়েদের সবার হাতেই ফোন থাকে। তারা লেখাপড়া করে, ঘুরে ফিরে বেড়ায়। ফোন তাদের হাতের মুঠোয় খেলা করে। কাউকেই তো ফোন নিয়ে ত্রস্ত বলে মনে হয় না।
কিন্তু তিনি এই ফোনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেন না কেন? এটা কি জেনারেশন গ্যাপ? তাই বা হয় কী করে? তার বয়সি অনেকেই তো দিব্যি এই ফোন ব্যবহার করছে। তাহলে রাতুল সরকারের কথা মতো সত্যিই কি তিনি আজকের যুগে অবসোলিট? আউটডেটেড? তিনি কি লিভিং ফসিল? খাটে শুয়ে এই সব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ভুবনবাবু ঘুমিয়ে পড়লেন।
ঘুমের মধ্যে তিনি স্বপ্ন দেখলেন। মেসেজ করে মিটিং ডেকেছেন রাতুল সরকার। যথারীতি ভুবনবাবু মেসেজটা দেখতে ভুলে গিয়েছেন। মিটিং-এ পৌঁছেছেন দেরিতে। ঘর ভর্তি লোকের সামনে অসহায় ভাবে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। রাতুল সরকার খেপে ব্যোম। তার চোখ দিয়ে আগুন ঝরছে। ঘুম ভেঙে ধড়ফড় করে উঠে বসে ভুবনবাবু বেজায় চমকে গেলেন।
আশ্চর্য! ঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটা লোক। নীচের দিক থেকে আলো গিয়ে পড়েছে তার মুখে। মুখটাকে বীভৎস লাগছে। অনেকটা সদ্য স্বপ্নে দেখা রাতুল সরকারের ভয়ানক মুখের মতো। মশারির গা বেয়ে বাইরে ঝুলতে থাকা বেডসুইচটা টিপে দিয়ে ভুবনবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, 'কে? কে? কে?'
আলো জ্বলে উঠল ঘরে। ভুবনবাবু মশারি তুলে বাইরে বেরিয়ে দেখলেন, অল্পবয়স্ক একটি ছেলে মোবাইল ফোন হাতে খুটখাট করছে। তার গায়ে কালো জামা, কালো প্যান্ট।
ছেলেটি বিরক্ত হয়ে বলল, 'আরে ধুর মশায়! চেঁচিয়ে উঠে দিলেন তো ব্যাপারটাকে চটকে। মেসেজটা বেরিয়ে গেল। 'রিগার্ডস স্যার' কথাটা লেখা হল না। এখনই কৃপাসিন্ধু সরখেল ধাতানি দেবে। ডোন্ট বি ইমপোলাইট ইন ইওর রেসপনসেস।'
এসব কথার মাথামুন্ডু বুঝতে না পেরে ভোম্বলের মতো চোখ-মুখ করে ছেলেটার দিকে চেয়ে রইলেন ভুবনবাবু।
'দাঁড়ান ক'টায় ব্রেক-ইন করলাম সেটা মেসেজ করে দিই। শুধু মেসেজ করলে হবে না, ঘরের ছবি পাঠাতে হবে। কৃপাসিন্ধু সরখেল বেজায় ঘুঘু লোক। মুখের কথা বিশ্বাস করে না। এই ফোন হয়েছে এক জ্বালাতনের ব্যাপার।'
ভুবনবাবু আরও বোমকে গেলেন। যাই হোক, মনে সাহস এনে বললেন, 'কে তুমি? রাতে আমার ঘরে ঢুকে মেসেজ করছ কেন?'
'আমি কৃপাসিন্ধু টেক অ্যাওয়ে সার্ভিসেস-এর একজন এমপ্লয়ি।'
'মানে?'
'মানেটা ধীরে ধীরে বুঝবেন।'
'ঢুকলে কোথা দিয়ে?'
'কেন? জানালা দিয়ে।'
ভুবনবাবু ভেবে দেখলেন কথাটা ঠিকই বলছে। বাড়িটা তাঁর পুরোনো আমলের। জানালার রডগুলোর মধ্যে ফাঁক বড় বেশি। একজন রোগাপাতলা লোক অনায়াসে সেখান দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়তে পারে। রোজ রাতে তিনি জানালা বন্ধ করে ঘুমোন। কাল রাতে জানালা বন্ধ করতে ভুলে গিয়েছিলেন।
'ভুবনবাবু বললেন, অ্যাঁ? জানালা দিয়ে মানে? চোর-ছ্যাঁচোড় নাকি?'
'চোর একটা অবসোলিট টার্ম। বলতে নেই। আপনি কি খোঁড়াকে খোঁড়া বলেন? বলতে হয়, ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড।'
'তোমার মতলব কী বলো তো ছোকরা?'
'মতলব খুব সোজা। আপনার ঘর থেকে দু-একটা জিনিস নিয়ে সরে পড়া।'
ভুবনবাবুর মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল। পুলিশ একটা নম্বর দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল বিপদে পড়লে ওই নম্বরে ফোন করতে। বিপিন নম্বরটা সেভ করে দিয়েছে। নিজের ফোনটা হাতে নিয়ে টুক করে তিনি ওই নম্বরে একটা মিসড কল করে দিলেন। অন্য সময় তিনি ফোন বুক থেকে নম্বর বের করতে গিয়ে খাবি খেয়ে যান। আজ তিনি খুব দ্রুতই ব্যাপারটা করে ফেললেন। আসলে বিপদে পড়লে অনেক সময় স্নায়ু খুব সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ভুবনবাবু বললেন, 'তার মানে তো তুমি চোর।'
'বললাম তো কৃপাসিন্ধু টেক অ্যাওয়ে সার্ভিসেস-এর একজন কর্মচারী।'
'অ্যাঁ? কৃপাসিন্ধু কী বললে?'
'কৃপাসিন্ধু টেক অ্যাওয়ে সার্ভিসেস।'
ভুবনবাবু হাঁ হয়ে গিয়ে বললেন, 'সে আবার কী?'
'দীনু সরখেলের নাম শুনেছেন? একসময়ে নাম করা সিঁধেল চোর ছিল। কৃপাসিন্ধু হল দীনু সরখেলের ভালো নাম। এখন আর তিনি গায়ে তেল মেখে কাজে নামেন না। স্যুট-বুট পরে অফিসে আসেন। কোম্পানি তৈরি করেছেন। তার নামেই কোম্পানি। আমার মতো অনেকে তার কোম্পানিতে চাকরি করে। এই আপনাদের পাড়াতেই আরও চারটে বাড়িতে আমার মতো আরও চারজন লোক ঢুকেছে।
সব মিলিয়ে আজ রাতে পঞ্চাশ জায়গায় অপারেশন চলছে।'
ভুবনবাবু খাবি খেয়ে বলেন, 'অ্যাঁ? চোরেরাও কোম্পানি খুলেছে? ইংরেজি ঝাড়ছে?'
'দিন বদলেছে মশায়। এযুগে সিঁধেল চোরের মতো গেঁয়ো ব্যাপার নিয়ে আঁকড়ে থাকলে আপনি ফুটে যাবেন।'
ভুবনবাবু দেখলেন ছেলেটি বেশ বাচাল। চুরি করতে এসে কোনও চোর এত কথা বলে, এ তিনি বাপের জম্মে শোনেননি। যাই হোক, ছেলেটিকে কথা বলেই ব্যস্ত রাখতে হবে। আপৎকালীন নম্বরটায় তিনি ফোন করে দিয়েছেন। পুলিশ এল বলে।
ভুবনবাবু প্রশ্ন করলেন, 'চোরাই মাল কি তোমরা কোম্পানির ঘরে জমা দাও?'
'তা নয়তো কী, নিয়ে কেটে পড়ব? করাপশনের দায়ে চাকরি যাবে। চুরির মালে হাত দেওয়ার অধিকার আমাদের নেই। সব দীনু স্যারের কাছে জমা করতে হয়। আমাদের বাঁধা মাইনে। তবে ইনসেনটিভ আছে, কমিশন আছে।'
'কমিশন?'
'পঞ্চাশ হাজার টাকার মাল সরাতে পারলে, টু পারসেন্ট কমিশন। তারপরে ধরুন রাতের কাজ সবার প্রথমে শেষ করে যে ফিরতে পারবে, সে চোরাই মালের প্রাইসের উপর থ্রি পারসেন্ট ইনসেনটিভ পাবে। আমার আজ চান্স আছে। আমিই সবার আগে ব্রেক-ইন করেছি। এখন কাজ সেরে সবার আগে ফিরতে পারলেই হল।'
'তোমার কলিগরা এখনও যে কারও ঘরে ঢুকতে পারেনি, জানলে কেমন করে?'
'কেমন করে আবার? হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ! গ্রুপে অন্য কেউ এখনও ব্রেক-ইন মেসেজ দেয়নি। যাই বলুন ফোনটা খুব চাপের জিনিস। সবসময় সতর্ক থাকতে হয়। বসের মেসেজ খেয়াল রাখতে হয়। মেসেজ দেখে মেজাজ বুঝতে হয়। মেসেজ মিস করলেই দীনু সরখেল ঝাড় দেবে। বুঝলেন মশায়, ফোনের জন্য লাইফের চাপ খুব বেড়ে গেছে।'
ভুবনবাবু ফস করে বলে ফেললেন, 'রাতুল সরকার আর দীনু সরখেলের মধ্যে কোনও তফাত নেই দেখছি।'
'রাতুল সরকার কে?'
'আমার অফিসের বস।'
ছেলেটা খিকখিক করে হেসে বলল, 'বসের মেসেজ মিস করে ঝাড় খেয়েছেন বুঝি?'
'প্রায় রোজই খাচ্ছি। স্মার্ট ফোনটার সঙ্গে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছি না। তুমি তো ভাই মনে হচ্ছে ফোনের ব্যাপারে খুব এক্সপার্ট। আমায় ধীরে সুস্থে একটু শিখিয়ে দেবে?'
'কী শেখাব?'
'এই ফোনের খুঁটিনাটি।'
'ধ্যাত্তেরি! আমি কি প্রাইভেট টিউটর না কী?'
'না ভাই, মানে রাতে এসেই যখন পড়েছ?'
'আপনার মতলব কী বলুন তো মশাই! কথার প্যাঁচে আটকে রাখতে চাইছেন? পুলিশে খবর দেননি তো! ধরা পড়লে কিন্তু আমাদের মাইনে কাটা যায়।'
'এতই যখন ঝামেলা, তখন চোরের কোম্পানিতে চাকরি করার দরকার কী? নিজের মতো স্বাধীন ভাবে চুরি করলেই তো পারো। বস নেই। ফোন নেই। কোনও ঝুটঝামেলা নেই।'
'ঝুটঝামেলা নেই? এ লাইন সম্বন্ধে আপনার কোনও ধারণাই নেই দেখছি। ধরা পড়ে পাবলিকের ধোলাই খেলে কে বাঁচাবে? শিয়ালদা স্টেশনে পকেট মারতাম। ফেঁসে গিয়ে পাবলিকের হাতে কম মার খেয়েছি? সাধে কি আর দীনু সরখেলের কোম্পানিতে চাকরি নিয়েছি?'
'ধরা পড়লে পাবলিকের মার তো এখানেও খেতে পারো।'
'না তা হবে না। এখানে অন্য ব্যবস্থা আছে।'
ভুবনবাবু অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন, 'কীরকম?'
'রাস্তায় ধরা পড়লে, আমাদের কোম্পানিরই বেশ কিছু কর্মচারী সাধারণ লোক সেজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মারমুখী জনতাকে বুঝিয়ে ছাড়ে, আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে চোরটাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়াই ভালো। পুলিসের হাতে চলে গেলে উকিলের সাহায্যে কোর্ট থেকে ছাড়া পেতে আর কতদিন? এসব দীনু সরখেলের গেম প্ল্যান।'
'বাপরে! তোমাদের দীনু সরখেল দেখছি বেশ ঘোড়েল লোক।'
'এই যাঃ!'
ছেলেটি হঠাৎ আপশোসের সুরে এমন ভাবে কথাটা বলে উঠল
যে ভুবনবাবু রীতিমতো ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'কী হল?'
ছেলেটি বলল, 'ইডিয়ট।'
'কে?'
'আমি।' ছেলেটি ফোনের স্ক্রিন দেখে বলল, 'দীনু স্যার বেজায় গাল দিয়েছেন। কাজ কতদূর এগোল বলে হোয়াটস অ্যাপে জানতে চেয়েছিলেন, সময়মতো উত্তর দিইনি। এ কোম্পানির সবই ভালো। কিন্তু দিনু স্যার বড্ড কড়া। মেসেজ মিস করলেই বেজায় চটে যান। হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। 'ভুবনবাবু! দরজা খুলুন। আমরা পুলিশের লোক।'
ছেলেটি বলল, 'সব্বোনাশ! এবার কী হবে? আপনার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ফেঁসে গেলাম। সাধে কি দীনু স্যার আমাকে ইডিয়ট বলে? প্লিজ ধরিয়ে দেবেন না। ধরা পড়লে আমাদের মাইনে কাটা যায়। আমার টাকার দরকার। মাইনে কাটা গেলে খুব বিপদে পড়ে যাব। বাচ্চাটার কঠিন অসুখ।'
ভুবনবাবু বললেন, 'ভয় নেই, কাঠের আলমারিটার ভিতরে ঢুকে পড়ো।'
দরজা খুললেন ভুবনবাবু। পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রশ্ন করল, 'কী ব্যাপার? চোর-টোর ঢুকেছে না কি ঘরে?'
ভুবনবাবু আকাশ থেকে পড়ার মতো মুখচোখ করে বললেন, 'চোর? না তো!'
'আপনি যে আপৎকালীন নম্বরে ফোন করেছিলেন?'
'সরি স্যার। অফিসের মেসেজ এল কি না চেক করতে গিয়ে ভুল করে কল করে ফেলেছিলাম। নতুন স্মার্ট ফোন কিনেছি। এখনও সড়গড় হয়নি।'
'আপনার বস পাগল না কি? মাঝরাতে মেসেজ করে?'
'বোধ হয়। চোরের ভয়ে জেগে থাকেন। তখন অফিসের কাজগুলো সেরে নেন। জানেনই তো এখন অফিস মানে টুয়েন্টি ফোর ইনটু সেভেন।'
'সে তো মশায় হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। আচ্ছা চলি! সাবধানে থাকবেন। আপনাদের পাড়া থেকে চারটে চোর ধরা পড়েছে। সবাই না কি কৃপাসিন্ধু টেক অ্যাওয়ে সার্ভিসেসের কর্মচারী। মাথাটার খোঁজ চলছে। চিন্তা নেই। ধরা পড়বে।'
'বাপরে! বলেন কী?'
'একটু সাবধানে থাকবেন। মনে রাখবেন পুলিশ আপনার বন্ধু।'
পুলিশ ইন্সপেক্টর চলে যাওয়ার পর দরজা বন্ধ করে ভুবনবাবু বললেন, 'বেরিয়ে এসো ভাই, ভয় নেই।'
কোনও সাড়া দিল না ছেলেটি। ভুবনবাবু ছুটে গিয়ে কাঠের আলমারির দরজা খুললেন। না ছেলেটি ভিতরে নেই। টর্চ জ্বেলে খাটের তলা-টলা সব দেখলেন। না ছেলেটি কোথাও নেই। কিন্তু ফোনটা? ফোনটা গেল কোথায়? খাটের উপরেই তো ছিল। তাহলে কী...
একটা শব্দ শুনে খোলা জানালার কাছে দৌড়ে গিয়ে ভুবনবাবু দেখলেন, তাঁর বাড়ির পাঁচিলের উপর থেকে ঝুপ করে রাস্তায় গিয়ে পড়ল একটা ছায়ামূর্তি। তারপরে টেনে দৌড় লাগাল। বাইরে তখন আধো আলো, আধো অন্ধকার।
নিজের অজান্তেই ভুবনবাবুর মুখে চওড়া একটা হাসি খেলে গেল।
পরের দিন অফিসে গিয়েই ভুবনবাবু শুনলেন বড়সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন। ভুবনবাবু ঘরে ঢুকতেই রাতুল সরকার তিরিক্ষি মেজাজে বললেন, 'কী ব্যাপার বলুন তো মশায়, সকাল থেকে পাঁচবার আপনাকে ফোন করার চেষ্টা করে পেলাম না। ফোন সুইচ অফ করে রেখেছেন কেন?'
একগাল হেসে ভুবনবাবু বললেন, 'ফোনটা স্যার কাল রাতে চুরি হয়ে গেছে।'
রাতুল সরকারের গলা আরও চড়ে গেল, 'হোয়াট?'
'চুরি হয়ে গেছে। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে।'
'ভালো হয়েছে মানে?'
একটা কাগজ রাতুল সরকারের দিকে এগিয়ে দিয়ে ভুবনবাবু বললেন, 'এটা মঞ্জুর করে দিন স্যার। আমার ফোনহীন জীবনটাই ভালো ছিল।'
'কী এটা?'
ভুবনবাবু গভীর প্রশান্তির সঙ্গে বললেন, 'আমার স্বেচ্ছা অবসরের আবেদনপত্র।'
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন